কে চায় তোমার বন্ধু হতে? জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান। আর তোমার কথা-ও জিনিসের যদি কোন দাম থাকত অবস্থা এতদূর গড়াত না কখনও।
নীরব ব্লাই। একটু পরে আবার বললেন, আমাকে নিয়ে কি করতে চাও তোমরা?
গুলি করব তোমাকে, শয়তানের বাচ্চা! হাতের মাস্কেটে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করল বারকিট।
না, না, তাহলে তো ও বেঁচে যাবে। মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, আমাদের একটা সুযোগ দাও, চাবুকের ঘা খেতে কেমন ওকে দেখিয়ে দেই!
ঠিক, ঠিক! বাঁধো শালাকে! ওর নিজের বিষ নিজে একটু চেখে দেখুক!
চামড়া ছিলে নাও ওর।
হয়েছে, এবার তোমরা চুপ করো! কড়া গলায় আদেশ করল ক্রিশ্চিয়ান; তারপর ব্লাইয়ের দিকে তাকিয়ে: তোমার ওপর সুবিচার করা হবে, আমাদের ওপর কক্ষনো যেটা তুমি করোনি। আমরা তোমাকে শিকল বেঁধে ইংল্যান্ডে নিয়ে যা…
একসঙ্গে অনেকগুলো কণ্ঠস্বর প্রতিবাদ করে থামিয়ে দিল ওকে।
ইংল্যান্ডে! কক্ষনো না! না, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, এটা আমরা হতে দেব না!
শুরু হলো হৈ-চৈ। দেখা গেল বিদ্রোহীদের সবাই ক্রিশ্চিয়ানের প্রস্তাবের বিপক্ষে। ব্লাইকে নিয়ে এমন গুরুতর পরিস্থিতির মুখোমুখি কেউ হয়নি কখনও, ব্লাই নিজেও না। বিদ্রোহীরা সব বুনো হয়ে উঠেছে প্রতিহিংসায়। সামান্য ছুতো পেলে সত্যি সত্যিই ভূড়ি ফাঁসিয়ে দেবে ব্লাইয়ের।
ভাগ্য ভাল কয়েক মিনিট পরেই সবার মন অন্য দিকে ঘুরে যাওয়ার মত একটা ঘটনা ঘটল। হাতে বেনেট নাচাতে নাচাতে ছুটে এল এলিসন। বয়স খুব কম ছেলেটার। এখনও কৈশোর পেরোয়নি। ভীষণ চঞ্চল স্বভাবের। যখন যা মনে আসে করে বসে, পরিণাম নিয়ে ভাবাভাবির ধার খুব একটা ধারে না। ও এসেই এমন সব হাস্যকর অঙ্গভঙ্গি শুরু করল যে মুহূর্তে হালকা হয়ে গেল থমথমে ভাব। বিদ্রোহীরা সবাই এক সঙ্গে চিৎকার করে উঠল।
হুররে, টমি! তুই কি আমাদের দলে?
অর্বাচীন না হলে কেউ এমন প্রশ্নের জবাব দেয়-মুখে এরকম একটা ভাব ফুটিয়ে তুলে ক্রিশ্চিয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল এলিসন।
আমার হাতে ছেড়ে দিন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, সে বলল। আমি পাহারা দেই ওকে! এমন পাহারা দেব! বলে হাতের বেওনেটটা নাড়তে নাড়তে তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাগল সে। সেই সাথে চিৎকার: ব্যাটা বদমাশ! বুড়ো শয়তান! আর চাবুক মারবে আমাদের? মদ বন্ধ করে দেবে? ঘাস খাইয়ে তবে ছাড়বে না?
শুনে হৈ-হৈ করে উঠল বিদ্রোহীরা। চালিয়ে যা, টমি! আমরা আছি তোর পেছনে! লাগা শালার পেটে একটা খোঁচা!
তুমি আর তোমার স্যামুয়েল-চোরে চোরে মাসতুতো ভাই দুজন। আমাদের খারাপ জিনিস খাইয়ে ভালগুলো খেতে তোমরা! আর খাবে? কী, পাকা চোর?-কথা, নেই কেন মুখে? ছোট্ট একটা নৌকায় করে সাগরে ছেড়ে দেয়া উচিত তোমাদের।
এলিসনের শেষ কথাটায় চট করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল ক্রিশ্চিয়ানের মাথায়। ছেলেটাকে থামিয়ে দিয়ে সে বলল:
কাটারটা পরিষ্কার করে দাও! মিস্টার চার্চিল।
এই যে, এখানে, স্যার!
মিস্টার ফ্রায়ার আর মিস্টার পার্সেলকে নিয়ে এসো। বারকিট!
জি, স্যার!
তুর্মি আর সামনার আর মিলস আর মার্টিন-এখানে থাকো, মিস্টার ব্লাইকে পাহারা দাও।
বিশাল লোমশ একটা হাত বাড়িয়ে ক্রিশ্চিয়ানের কাছ থেকে রশির প্রান্তটা নিল বারকিট।
নিশ্চিন্ত থাকুন, স্যার, এক চুল নড়তে দেব না শালাকে।
আপনি ঠিক কি করতে চাইছেন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান নিশ্চয়ই আমাদের জানার অধিকার আছে, বলল সামনার।
দ্রুত ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে তাকাল ক্রিশ্চিয়ান। শান্ত কণ্ঠে বলল, তোমাকে যা বলেছি তাই করো, সামনার। এখন আমি এ জাহাজের ক্যাপ্টেন! কই, কাটারটা পরিষ্কার হলো?
বেশ কয়েকজন লোক একসঙ্গে হাত লাগাল ছোট নৌকাটার ভেতর থেকে ইয়াম, মিষ্টি আলু ইত্যাদি নামিয়ে রাখার কাজে। অন্য কয়েকজন দড়ি-দড়া ঠিক করতে লাগল কাটারটাকে সাগরে ভাসানোর জন্যে।
বারকিট দাঁড়িয়ে গেছে ক্যাপ্টেন ব্লাইয়ের সামনে। হাতের বেওনেটটার আগা তার বুক থেকে খুব বেশি হলে এক ইঞ্চি দূরে। ওর পেছনে সামনার মাস্কেট হাতে তৈরি। অন্য দুজন তার দুপাশে। তাদের হাতেও একটা করে মাস্কেট। ব্লাই চুপ। হম্বিতম্বি দূরে থাক, একটা শব্দও করছেন না। অন্য বিদ্রোহীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ডেকের বিভিন্ন জায়গায়। দুই মইয়ের মুখে আছে তিনজন করে। সবকিছু এমন সুলভাবে চলছে যে আমি না ভেবে পারলাম না, ব্যাপারটা পূর্ব পরিকল্পিত। কিন্তু পূর্ব পরিকল্পিতই যদি হবে আমরা কিছু টের পেলাম না কেন? এতগুলো লোক একজোট হয়েছে অথচ কোন ঘটনায়ই তা প্রকাশ পায়নি,তা কি করে সম্ভব?
ব্লাইকে কেন্দ্র করে যে ঘটনাগুলো এতক্ষণ ঘটছিল সব আমি এমন মগ্ন হয়ে দেখছিলাম যে স্টুয়াটের কথা মনেই ছিল না। খেয়াল হতে দেখলাম ও নেই আমার পাশে। ওর খোঁজে তাকাতে লাগলাম চারদিকে। এই সময় প্রথম বারের মত আমাকে দেখল ক্রিশ্চিয়ান। তক্ষুণি আমার কাছে এল সে। গলার স্বর শান্ত শোনালেও আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ফুটছে সে।
বিয়্যাম, ক্রিশ্চিয়ান বলল, জাহাজে কি ঘটছে এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছ। নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, কাউকে কিছু বলা বা করা হবে না, তবে কেউ যদি আমাদের বিরুদ্ধে কিছু করার চেষ্টা করে তাহলে কি হবে আমি বলতে পারি না। সুতরাং কিছু করলে বুঝে শুনে নিজের দায়িত্বে করবে।
