আমরা আছি তোমাদের সাথে, চার্চিল! অস্ত্র দাও আমাদের!
দ্রুত দুটো মাস্কেট তুলে দিল থম্পসন দুজনের হাতে। আবার ডেকের ওপর উঠে গেল ওরা।
আমার পাশের হ্যামকটা স্টুয়ার্টের। উঠে পড়েছে সে-ও। কিন্তু ইয়ং এত হৈ-চৈ, সত্ত্বেও ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্তে।
কি হয়েছে, চার্চিল। কেউ আক্রমণ করেছে আমাদের। অবশেষে আমি জিজ্ঞেস করতে পারলাম।
তাড়াতাড়ি কাপড় পরে নাও, মিস্টার বিয়্যাম, ও জবাব দিল। আমরা জাহাজ দখল করে নিয়েছি, ক্যাপ্টেন ব্লাই এখন আমাদের হাতে বন্দী।
ঘুম ঘুম ভাব ভাল করে কাটেনি আমার। বোধহয় সে কারণেই কথাগুলোর মর্ম সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝতে পারলাম না। বোকার মত মুখ করে তাকিয়ে রইলাম চার্চিলের দিকে।
ওরা বিদ্রোহ করেছে বিয়্যাম। চিৎকার করে বলল স্টুয়ার্ট। হায় ঈশ্বর! চার্চিল, তোমরা পাগল হয়ে গেছ যা করছ, তার ফলাফল সম্পর্কে কোন ধারণা। আছে তোমাদের?
কি করছি, ভাল করেই জানি আমরা, শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল চার্চিল। ব্লাই নিজে তার এ পরিণতি ডেকে এনেছে। ওর বারোটা এবার আমরা বাজিয়ে ছাড়ব, খোদার কসম বলছি!
কুত্তাটাকে গুলি করে মারব আমরা, ভয় দেখানো ভঙ্গিতে মাকেটটায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল থম্পসন। তোমরা যদি কোন রকম চালাকির চেষ্টা করো, কয়েকটা খুন বেশি করতে হবে আমাদের! চার্চিল, বেঁধে ফেল দুটোকে! ওদের বিশ্বাস করা ঠিক হবে না।
বেশি বকবক না করে যা বলেছি তাই করো, জবাব দিল চার্চিল। সিন্দুকটার দিকে খেয়াল রাখো। মিস্টার বিয়্যাম, জলদি কাপড় পরে নাও। কুইনটাল, তুমি ওই দরজার কাছে দাঁড়াও। আমার হুকুম ছাড়া কেউ যেন সামনে আসতে না পারে-বুঝেছ।
জি, জি, স্যার!
ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, বার্থের পেছন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ম্যাপ্ত কুইনটাল। যে মুহূর্তে আমি তাকিয়েছি ঠিক সেই সময় স্যামুয়েল এসে দাঁড়িয়েছে ওর পেছনে; পরনে কেবল ট্রাউজার, মাথার চুলগুলো উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে, মুখটা ফ্যাকাসে।
মিস্টার চার্চিল! স্যামুয়েল ডাকল।
যা ভাগ, ভটকু শুয়োর, নইলে তোর হুঁড়ি আমি ফাঁসিয়ে দেব! চেঁচাল কুইনটাল।
মিস্টার চার্চিল, স্যার! আবার ডাকল স্যামুয়েল, আমার দুটো কথা শুনুন দয়া করে।
ভাগাও বদমাশটাকে, চার্চিল বলল, এবং তক্ষুণি কুইটাল এমন এক হিংস্র ভঙ্গি করল মাস্কেট নেড়ে যে বেচারা কেরানী অদৃশ্য হয়ে গেল আর একটা কথাও না বলে।
কষে একটা লাথি লাগাও, কুইনটাল, হারামীটার পাছায়, কেউ একজন চিৎকার করল ওপর থেকে। মুখ তুলতেই দেখলাম, আরও দুজন সশস্ত্র মানুষ উঁকি দিচ্ছে যাচের ভেতর দিয়ে।
চার্চিলের আদেশ পালন করা ছাড়া আর কোন উপায় দেখলাম না আমি আর স্টুয়ার্ট। চার্চিল, থম্পসন দুজনেই শক্ত সমর্থ শক্তিশালী পুরুষ। যদি নিরন্তু থাকত তবু ওদের সাথে লড়ার কথা ভাবতাম না আমরা। সুতরাং আর দেরি না করে কাপড় পরে নিলাম দুজনেই। চার্চিল এবার আমাদের সামনের মইয়ের দিকে এগোনোর নির্দেশ দিল, ও আসতে লাগল পেছন পেছন। থম্পসন রইল বার্থে অন্য যারা ছিল তাদের পাহারায়।
মই বেয়ে উপরে উঠে দেখলাম সামনের ব্যাচের কাছে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কজন সশস্ত্র লোক। সবার অস্ত্র মিস্টার ব্লাইয়ের দিকে তাক করা।
ক্যাপ্টেন ব্লাই, গায়ে কাপড় বলতে একমাত্র জামা-ভাগ্য ভাল তার জামার ঝুলটা হাঁটু পর্যন্ত-দুহাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন সামনের মাস্তুলের কাছে। ক্রিশ্চিয়ান দাঁড়িয়ে তার সামনে, এক হাতে ধরে আছে ব্লাইয়ের হাত বাধা হয়েছে যে রশি দিয়ে তার এক প্রান্ত, অন্য হাতে একটা বেওনেট। বেশ কয়েকজন খালাসী তার চারপাশে, সবাই সম্পূর্ণ সশস্ত্র। লোকগুলোকে চিনতে পারলাম আমি-জন মিলস, আইজাক মাটিন, রিচার্ড স্কিনার এবং টমান বারকিট।
এখানে দাঁড়াও, আমাদের উদ্দেশ্যে বলল চার্চিল। আমাদের বিরুদ্ধে যদি না যাও তোমাদের কিছু করব না আমরা। বলে চলে গেল সে।
বুঝতে পারলাম, তাহিতিতে থাকতে জাহাজ ছেড়ে পালানোর অপরাধে যে কঠিন শাস্তি ওকে ব্লাই দিয়েছিলেন তার শোধ নিচ্ছে এখন চার্চিল। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ান!-ও কি করে যোগ দি বিদ্রোহীদের সাথে! যত দুর্ব্যবহারই পেয়ে থাক, ওর মত অফিসার এ কাজ করতে পারে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
মিস্টার ব্লাই তারস্বরে চিৎকার করছেন। জীবনে যত কুৎসিত শব্দ শিখেছেন সব ব্যবহার করে গালাগাল দিচ্ছেন বিদ্রোহীদের। আমি আর স্টুয়ার্ট কয়েক পা এগিয়ে যেতেই শুনতে পেলাম ক্রিশ্চিয়ানের শান্ত গলা, দয়া করে, স্যার, চুপ করবেন আপনি, না কি জোর খাটাতে হবে চুপ করানোর জন্যে
বিদ্রোহী কুত্তা! আগের চেয়ে জোরে চেঁচালেন ব্লাই। আমি তোকে দেখে নেব! তোকে ফাঁসি দেব! চাবকে তোর চামড়া মাংস…।
হাতের বেওনেটটা ঝট করে ব্লাইয়ের গায় ঠেকিয়ে ক্রিশ্চিয়ান গর্জে উঠল, চুপ করো এক্ষুণি। নইলে মৃত্যু তোমার কেউ ঠেকাতে পারবে না।
কুত্তাটার ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দাও। কেউ একজন চিৎকার করল।
ঠিক, ঠিক, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান! সমর্থন করল একজন।
সাগরে ফেলে দাও বদমাশটাকে! আরেক জন বলল।
হাঙ্গর দিয়ে খাওয়াও! যোগ করল অন্য একজন।
এবার যেন পরিস্থিতিটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারলেন ব্লাই। চুপ করে একবার চারপাশে তাকালেন। তারপর বললেন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, আমার কথা, শোনো, এখন অনেক শান্ত তার গলা। আমাকে ছেড়ে দাও-অস্ত্র সমর্পণ করো! আমরা আবার বন্ধু হতে পারি। কথা দিচ্ছি, দেশে ফিরে এ সম্পর্কে একটা কথাও উচ্চারণ করব না আমি।
