কোয়ার্টার ডেকের একটা কামানের কাছে চলে গেল টিঙ্কলার। একটা হাতকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে পড়ল। আর দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না, এবার আমারও উচিত কোথাও শুয়ে পড়া, ভেবে ঘুরে দাঁড়াতেই ডেকের উল্টোদিকে দেখতে পেলাম পেকওভারকে। কেমন একটু অস্বস্তি হলো আমার। টিঙ্কলারের কথা কি শুনে ফেলেছে ও? যদি শুনে থাকে তাহলে কি ক্যাপ্টেনকে জানাবে। আসলে নারকেল চুরি করেছে টিঙ্কলার আর আরও দুজন যাদের নাম ও বলেনি?
এই সব সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় নিচে নামার মইয়ের মুখে দেখতে গেলাম একটা ছায়া মূর্তি। মূর্তিটা ক্রিশ্চিয়ানেরবার কয়েক ডেকের এমাথা ওমাথা পায়চারি করার পর আমাকে দেখতে পেল ও।
এখনও ঘুমাওনি, বিয়্যাম? আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল ক্রিশ্চিয়ান।
নাহ, নিচে এত গরম…
হুঁ…। চুপ করে গেল সে। অনেকক্ষণ পর হঠাৎ বলল, রাতে আমাকে খেতে ডেকেছিল, জানো? বিকেলে গায়ে থুতু দিয়ে রাতে ডেকেছে খেতে! কেন বলতে পারো, বিয়্যাম?
আপনি যাননি?
মাথা খারাপ! আমার গায়ে তো কুত্তার চামড়া নয়!
ও গলায় এমন গম্ভীর হতাশার সুর, আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ক্রিশ্চিয়ান আবার বলল, আমরা সবাই ওর হাতের মুঠোয়। অফিসার নাবিক সবাই। কুত্তার চেয়ে ভাল কিছু আমাদের ও মনে করে না। জানো, বিয়্যাম, এক মুহূর্তও আর এ জাহাজে থাকতে ইচ্ছে করে না আমার।
আবার চুপ হয়ে গেল ক্রিশ্চিয়ান। অনেকক্ষণ পর বলল, আমার একটা কাজ করে দেবে তুমি, বিয়্যাম?
কি?
দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় কখন কি ঘটে কেউ বলতে পারে না। কোন কারণে, ধরো, আমি দেশে ফিরতে পারলাম না, তখন কি তুমি কাম্বারল্যান্ডে আমার বাড়ির লোকদের সাথে একটু দেখা করতে পারবে?
পারব না কেন? আমি জবাব দিলাম।
যেদিন বাউন্টিতে যোগ দিতে আসি সেদিন আসার আগে বাবা বলেছিলেন, জাহাজের কারও সাথে যেন এই ব্যবস্থা করে রাখি। যদি আমার কিছু ঘটে যায়, বাবা বলেছিলেন, আমার কোন বন্ধুর সাথে আলাপ করতে পারলে আর কিছু না হোক মনে অন্তত একটু স্বস্তি পাবেন তিনি। আমি কথা দিয়েছিলাম বাবাকে! এতদিন এ নিয়ে কাউকে কিছু বলিনি, এখন মনে হচ্ছে বলা দরকার!
আমার ওপর ভরসা রাখতে পারেন, স্যার, ওর হাত ধরে একটু নেড়ে আমি বললাম।
বেশ, তাহলে, এই কথা রইল।
পেছন থেকে ভেসে এল একটা গলা, এখনও জেগে আছ, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান?
সাঁ করে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি আর ক্রিশ্চিয়ান। খুব বেশি হলে এক গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছেন ব্লাই। খালি পা, সেজন্যে তার পায়ের আওয়াজ আমরা শুনতে পাইনি।
হ্যাঁ, স্যার, শীতল কণ্ঠে জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান।
আর তুমি, বিয়্যাম, ঘুম আসছে না?
নিচে ভীষণ গরম, স্যার।
তাতে কী? একটা কথা তোমার জেনে রাখা দরকার, মিস্টার বিয়্যাম, সত্যিকারের নাবিক হতে হলে, প্রয়োজন বোধে চুল্লীর ভেতর বা বরফের ওপর ঘুমানোর জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।
একথার কোন জবাব হয় না। হলেও ক্যাপ্টেনের মুখের ওপর তা দেয়া যায় না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। মিস্টার ব্লাইও দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন জবাব আশা করছেন। তারপর হঠাৎই ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে গেলেন মইয়ের দিকে।
শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নিল ক্রিশ্চিয়ান।
কামানের পাশে গাঢ় ছায়ায় শুয়ে ছিল টিঙ্কলার। এবার উঠে বসন্থ। দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে হাই তুলল লম্বা করে।
নিচে যাও, বিয়্যাম, প্রমাণ করো, তুমি সত্যিই সত্যিকারের নাবিক। যত্তসব, ঘুমটা যেই লেগে এসেছে অমনি হাজির ব্যাটা।
তুমি শুনছ ওঁর কথা?
হ্যাঁ, ক্রিশ্চিয়ানের কথাও। আমার বাবা ওর বাবার মত কোন অনুরোধ করেনি। তাতে কি প্রমাণ হয়?- আমার বাবা বেচারা ধরেই নিয়েছিল আমি ফিরব না…একটু পানি খাওয়া দরকার। এক ঘণ্টা ধরে শুয়ে শুয়ে এই একটা কথাই ভাবছিলাম। কি করি বলো তো? দুবার পানি খাওয়া হয়ে গেছে, সকালের আগে আর খেতে পাব না। আমার জায়গায় তুমি হলে কি করতে?
পেকওভার নিচে গেছে, আমি বললাম, সুযোগটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে দেখতে পারো।
তাই নাকি? লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল টিঙ্কলার। বিড়ালের মত নিঃশব্দে, বানরের মত দ্রুত উঠে গেল মাস্তুল বেয়ে। মগ পেড়ে এনে পানি খেল। ওটা আবার মাস্তুলে রেখে মাত্র ও নিচে নেমেছে এই সময় পেকওভারকে আবার দেখা গেল ডেকের ওপর। ওর দিকে একবারও না তাকিয়ে মইয়ের দিকে এগোলাম,আমি আর টিঙ্কলার। নিচে নামতে নামতে শুনলাম ঘণ্টার শব্দ। তিন বার। মানে রাত তিনটা। মাস্তুলের ওপর থেকে ভেসে এল পাঞ্জেরীর (পাহারাদার) চিৎকার: সব ঠিক আছে?
হ্যামকে উঠে শুয়ে পড়লাম আমি।
.
আট
দিনের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে কি করেনি।
কাঁধে কারও জোর ধাক্কা খেয়ে ঘুম ভেঙে গেল আমার। উঠে বসতে না। বসতেই ওপর থেকে ভেসে এল ভারী পায়ের ধুপধাপ আওয়াজ আর অনেক মানুষের সম্মিলিত চিৎকার। মিস্টার ব্লাইয়ের গলাও আছে তার ভেতর। হতবুদ্ধি হয়ে ভাবছি, কি হতে পারে, এই সময় লক্ষ করলাম বাউন্টির, মাস্টার অ্যাট আর্মস চার্চিল পঁড়িয়ে আমার হ্যামকের পাশে, হাতে পিস্তল। থম্পসন বেওনেট লাগানো একটা মাস্কেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে মেইন হ্যাঁচের কাছে, তার পাশেই মুখ ভোলা অবস্থায় পড়ে আছে অস্ত্র এবং গোলা-বারুদ রাখার একটা সিন্দুক। ব্যাপার কি কিছু বুঝতে পারছি না। ভাবলাম চার্চিলকে জিজ্ঞেস করি। কিন্তু আমি মুখ খোলার আগেই দুজন খালাসী ছুটতে ছুটতে ঢুকল আমাদের বার্থে। তাদের একজন চিৎকার করে উঠল:
