গুনে দেখিনি, স্যার, জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান। কিন্তু তাই বলে আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন মা,আমি আপনারগুলো থেকে চুরি করেছি?
হ্যাঁ, শয়তানের বাচ্চা! আমি তা-ই ভাবছি। নিশ্চয়ই আমার নারকেল তুমি চুরি করেছ, না হলে নিজেরগুলোর হিসেব ঠিক মত দিতে পারতে! তুমি-তুমি শুধু না, তোমরা সবাই চোর-জঘন্য চোর, বদমাশ। আজ নারকেল চুরি করেছ, কাল করবে ইয়াম-তোমরা না করলেও তোমাদের হয়ে তোমাদের স্যাঙাৎ খালাসীরা করবে। কিন্তু ভেবো না এত সহজে আমি ছেড়ে দেব! কি ভাবে তোমাদের মত কুকরদের শায়েস্তা করতে হয়, আমি জানি
টকটকে লাল হয়ে উঠেছে প্রত্যেকটা অফিসারের মুখ। কিন্তু কেউ কোন কথা বলল না। দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল সব কজন। দুহাত পেছনে নিয়ে পায়চারি করছেন ব্লাই। মুঠো একবার খুলছে একবার বন্ধ হচ্ছে। হঠাৎ
দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁক ছাড়লেন তিনি।
স্যামুয়েল!
জি, স্যার?
পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এই বদমাশগুলোর মদ বন্ধ রাখবে! আর ইয়াম, দেবে মাথা পিছু এক পাউন্ডের জায়গায় আধ পাউন্ড করে! পরের আদেশটা জাহাজের সবার জন্যে প্রযোজ্য হবে। বোঝা গেছে?
জি, স্যার।
অফিসারদের দিকে তাকালেন ব্লাই। খোদার কসম বলছি, আর যদি কিছু খোয়া যায় সিকি পাউন্ডে নামিয়ে আনব বরাদ্দ, দেখে নিও!
এখানেই ক্ষান্ত হলেন না ব্লাই। এরপর তিনি আদেশ দিলেন যার কাছে যত নারকেল আছে সব জমা দিতে হবে জাহাজের ভাণ্ডারে। অফিসার নাবিক। সবাইকেই। একটা শব্দ উচ্চারণ করল না কেউ-না, নাবিকরা, না অফিসাররা, যার যে কটা নারকেল ছিল এনে জমা দিল স্যামুয়েলের কাছে।
নীরব নিথর একটা সন্ধ্যা এল জাহাজে। ইংল্যান্ড থেকে রওনা হওয়ার পর এমন নীরব সন্ধ্যা বাউন্টিতে আর এসেছে বলে আমার মনে পড়ে না। সবার মনে এক চিন্তা, এখনও দীর্ঘ সময় সাগরে থাকতে হবে। হয়তো দুমাস, হয়তো এক বছর। কেমন কাটবে সে দিনগুলো?
.
মাঝরাতে যখন আমার কাজের সময় শেষ হলো তখন চারপাশে সান্ত্রর পুকুরের মত শান্ত। কাঁচের মত চকচকে জলের উপর প্রতিফলিত হচ্ছে আকাশের তারা।
নিচে নেমে টের পেলাম আমাদের ছোট্ট কুঠুরিটা জ্বলন্ত চুল্লীর মত হয়ে আছে। কয়েক দিন ধরে বাতাস নেই বললেই চলে। উপরে খোল ডেকেই গরমে তিষ্ঠানো দায়, জাহাজের নিচে বদ্ধ জায়গায় অবস্থা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। এমনিতে মনে নানা রকম দুশ্চিন্তা, তার ওপর এই গরম-ঘুম আসবে না ভেবে আবার ডেকে উঠে এসে রেলিংয়ের ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম।
তাকিয়ে আছি কালো সাগরের দিকে হঠাৎ পাশে কারও নিশ্বাস ফেলার শব্দ পেয়ে, ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, টিঙ্কলার।
নিচে বড্ড গরম, সে বলল।
বেশ কিছুক্ষণ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইলাম দুজন। হঠাৎ টিঙ্কলার ফিসফিস করে, ডাকল আমাকে
বিয়্যাম!
ঘাড় ফেরালাম আমি। সতর্ক চোখে চারদিকে তাকাচ্ছে টিঙ্কলার। আশেপাশে কেউ নেই, নিশ্চিত হয়ে ও আবার ডাকল:
বিয়াম!
হ্যাঁ, বলো।
আমি একটা জঘন্য লোক, বিশ্বাস করো তুমি?
মানে!?
ক্যাপ্টেনের খোয়া যাওয়া নারকেলের একটা আমি চুরি করেছি।
তাহলে তুমিই সেই হতভাগা, আমাদের এই দুর্ভোগের জন্যে দায়ী?
হ্যাঁ, বিয়্যাম, ভাঙা গলায় বলল টিঙ্কলার। তবে আমি একা নই, আরও দুজন ছিল আমার সঙ্গে, নাম বলব না। ভীষণ পিপাসা পেয়েছিল, বুঝলে, কিন্তু এমন আলসেমী লাগছিল মাস্থলে উঠতে-এদিকে সামনে রয়েছে কচি ডাবগুলো, লোভ সামলাতে পারলাম না। জাহান্নামে যাক বুড়ো নেলসনের রুটিফলের বাগান!
রুটিফলের চারাগুলো সম্পর্কে আমাদের সবার মনের অবস্থা কম বেশি এরকম। কারণও আছে তার। পিপসার সময় নাবিকরা পানি পাক না পাক, চারাগুলোতে নিয়মিত পানি দিতেই হবে, না হলে মরে যাবে ওগুলো। সেজন্যে দিনে দুবারের বেশি পানি খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন ব্লাই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এতেও ক্ষান্ত হননি তিনি, আমরা যাতে বাধ্য হয়েই পানি কম খাই সেজন্যে অদ্ভুত এক কৌশল অবলম্বন করেছেন। বড় একটা মগ ঝুলিয়ে রেখেছেন প্রধান মালের মাঝামাঝি জায়গায়, সেই সাথে আদেশ জারি করে দিয়েছেন, কাজের সময় পানি খেতে হলেসে যে-ই হোক না কেন-এই, মগ পেড়ে এনে খেতে হবে, তারপর আবার মগটা রেখে আসতে হবে জায়গা মত। ব্লাই-এর বুদ্ধিটা যে কাজে লেগেছে তাতে সন্দেহ নেই। খুব বেশি তেষ্টা না পেলে পানি খাওয়ার কথা ভুলেও ভাবে না কেউ। বেচারা টিঙ্কলার অন্য দুজনও-এই কষ্টটুকুর হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে করে বসেছে অপকর্মটা।
বাবা, বড় বাঁচা বেঁচে গেছি, আমাকে সন্দেহ করেনি, বলে চলল টিঙ্কলার। অবশ্য যদি করতও আমি সোজা অস্বীকার করতাম। কিন্তু, ভাই, ক্রিশ্চিয়ানের জন্যে দুঃখ হচ্ছে আমার। আমি তো জানি ও দোষ করেনি।
ক্রিশ্চিয়ান জানে, তুমি যে, ডাব নিয়ে কয়েকটা?
কয়েকটা না-মাত্র একটা! আগেই তো বললাম, আমার সাথে আরও লোক ছিল। যা, ক্রিশ্চিয়ান জানে। ও দেখে ফেলেছিল আমাকে ডাব নিতে।
কিছু বলেনি।
না। না দেখার ভান করে অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল-যে কোন ভদ্র অফিসার এক্ষেত্রে তা-ই করত। এমন কোন অপরাধ আমি করিনি যার কথা ক্যাপ্টেনকে নালিশ করতে হবে। কয়েক হাজার নারকেলের ভেতর থেকে একটা মাত্র সরিয়েছি-তা-ও পিপাসায় অস্থির হয়ে। এর জন্যে যে শাস্তি ঈশ্বর আমাকে দেবেন আমি খুশি মনে ভোগ করব।
