ক্যাপ্টেন কুক অঞ্চলটার নাম দিয়েছিলেন বটে ফ্রেন্ডলি আর্কিপিলাগো, কিন্তু হিটিহিটির মুখে বা এ এলাকা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল সতীর্থ দুএকজন নাবিকের কাছে যা শুনেছি তাতে মনে হয় না এখানকার লোকেরা স্বভাবগত ভাবে খুব একটা ফ্রেন্ডলি বা বন্ধুভাবাপন্ন। নামুকা থেকে পানি আর কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রমাণ হয়ে গেল ব্যাপারটা। চরম অসৎ রীতিমত ধড়িবাজ এখানকার মানুষ। সামান্য সুযোগ যদি দেয়া হয় যে কোন জিনিস চুরি করে এমন কি কেড়ে নিয়ে পালাতে পারে এরা। এসব কথা ভেবে ক্রিশ্চিয়ান তীরে যাওয়ার সময় ব্লাইকে বলল সঙ্গে সশস্ত্র রক্ষী দিতে। প্রস্তাব শুনে হাসলেন ক্যাপ্টেন।
এই অসভ্যগুলোকে ভয় পাচ্ছ তুমি, ক্রিশ্চিয়ান?
না, স্যার, ভয় নয়, জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান, আমি চাইছি সাবধান হতে। আমার মতে…
তোমার মতে? কে চেয়েছে তোমার মত? তোমার চেয়ে সহকারী হিসেবে একজন মেয়েমানুষকে আনলে ভাল করতাম দেখছি! এসো, নেলসম, ভীতুর ডিমগুলোকে দেখিয়ে দেই, কি করে তীরে যেতে হয়। বলে আর দাঁড়ালেন না ব্লাই, মই বেয়ে নেমে গেলেন কাটার-এ। নেলসন গেল পেছন পেছন–গত কয়েক দিনে বেশ কিছু রুটিফলের চারা মরে গেছে, শূন্যস্থান পূরণ করার জন্যে নতুন কিছু চারা সগ্রহ করতে চান উদ্ভিদবিজ্ঞানী।
দুই গোত্রপতি আগেই নেমে গিয়েছিল কাঁটার-এ। ব্লাই আর নেলসন নামতেই এবার নাবিকরা দাঁড় টানতে লাগল ডাঙার দিকে।
ছোট ঘটনা, কিন্তু ঘটল জাহাজের বেশির ভাগ নাবিকের সামনে। আমি খেয়াল করলাম কি প্রচণ্ড চেষ্টা করতে হলে ক্রিশ্চিয়ানকে রাগ সামলানোর জন্যে। এই বদ অভ্যাসটা আছে ব্লাইয়ের, যখন তখন এধরনের হুল বেঁধোনো কথা বলে বসেন অফিসারদের, সামনে কে আছে না আছে তা দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না।
যা হোক, সেদিন অস্বাভাবিক কিছু ঘটল না। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে ব্লাই যখন তীরে যান তার সাথে ছিল দুজন গোত্রপতি। তাদের সামনে তাকে হেনস্থা করার সাহস কেউ পায়নি। কিন্তু পরদিন যখন আমরা গেলাম তখন ক্রিশ্চিয়ানের ধারণাই সত্য প্রমাণিত হলো।
তীরে নেমে উপযুক্ত গাছ বেছে সবে কাটতে শুরু করেছি, এই সময় আমরা আক্রান্ত হলাম। কয়েকশো দ্বীপবাসী চারদিক থেকে ঘিরে ধরল আমাদের। আমাদের চেহারা পোশাক আশাক দেখে খুব মজা পাচ্ছে এমন ভঙ্গিতে হাসতে লাগল ওরা। কেউ কেউ এগিয়ে এসে খোঁচা মারল বুকে, পেটে, কোমরে। দুএকজন আরও দুঃসাহসের পরিচয় দিল, আমাদের যারা কাঠ কাটছিল তাদের হাত থেকে কুড়াল কেড়ে নিল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা, কোনমতে সসম্মানে পালিয়ে আসতে পারলে বাঁচি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ব্লাই সশস্ত্র রক্ষী দিয়েছিলেন সঙ্গে, তবে তাদের ওপর কড়াকড়ি নির্দেশ জারি করে দিয়েছিলেন, যেন কোন অবস্থাতেই গুলি চালানো না হয়। সেজন্যে হাতে অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও আমরা লেজ গুটিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হলাম।
জাহাজে পৌঁছে ক্রিশ্চিয়ান সব বলল ব্লাইকে। শুনে তার চেহারা যা হলো সে দেখার মত। তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাগলেন।
তুমি একটা-তুমি একটা অযোগ্য কাপুরুষ গাধা! চিৎকার করে উঠলেন তিনি। কয়েকটা অসভ্য বদামশের ভয়ে পালিয়ে এলে, সঙ্গে অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও?
ব্যবহার করতে নিষেধ করে অস্ত্র দিলে লাভ কি, শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান।
কথাটা যেন কানেই ঢুকল না ব্লাইয়ের। এমন গালাগালির তুবড়ি ছোটালেন যে পালিয়ে বাচল বেচারা ক্রিশ্চিয়ান।
আগেও দেখেছি, আজ আবার দেখলাম, রেগে গেলে একেবারে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যান ব্লাই। কিছুই তখন তার মনে থাকে না। নিজে যে কথা বলেছিলেন তাও ভুলে যান অবলীলায়। এধরনের মানুষকে যদি কোন প্রতিষ্ঠানের মাথায় বসিয়ে দেয়া হয়, সে প্রতিষ্ঠানের কপালে যে দুর্ভোগ নেমে আসবে তাতে সন্দেহ নেই। বাউন্টির ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়নি।
.
পরদিন অর্থাৎ ছাব্বিশ এপ্রিল বিকেলে আমরা রওনা হলাম নামুকা থেকে। বাতাস হালকা বলে জাহাজ খুব দ্রুত এগোচ্ছে না! সারা রাত আর পরের সারা দিন জাহাজ চালিয়েও উপকূল থেকে সাত আট লিগের বেশি দূরে আসতে পারলাম না।
সাতাশ তারিখ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কেবিনেই কাটালেন ব্লাই। বিকেলের শুরুতে ডেকে বেরিয়ে এলেন স্যামুয়েলকে কিছু নির্দেশ দেয়ার জন্যে। তাহিতি থেকে আনা জিনিসপত্রের বেশিরভাগই এখনও ছড়িয়ে আছে ডেকের ওপর। কোয়াটার ডেকে কামানগুলোর মাঝখানে স্তূপ করা রয়েছে বিপুল সংখ্যক নারকেল। স্যামুয়েল তখন হিসেব করে দেখছে তা থেকে দুএকটা খোয়া গেছে, বা নষ্ট হয়েছে কিনা। ব্লাইকে দেখেই সে কলকল করে উঠল:
নারকেল কয়েকটা কম মনে হচ্ছে, স্যার!
ভাল করে শুনে দেখেছ?
হ্যাঁ, স্যার।
তক্ষুনি সব অফিসারকে ডেকে আসার নির্দেশ দিলেন স্নাই। তারপর একে একে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন তারা ব্যক্তিগত ভাবে কে কতগুলো নারকেল কিনেছে, এবং কোয়ার্টার ডেক থেকে কাউকে নারকেল চুরি করতে দেখেছে কিনা ইত্যাদি। সবাই বলল তারা দেখেনি। এদিকে খেপতে শুরু করেছেন ব্লাই। তার ধারণা, চোরকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে অফিসাররা। অবশেষে ক্রিশ্চিয়ানের সামনে এলেন তিনি।
এবার, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, বলো, ঠিক কতগুলো নারকেল কিনেছিলে তুমি?
