এখানে কোনো ঘাট নেই। আমি যে পর্যন্ত আসতে পারি এসেছি আর এক কদমও এগোতে পারব না।
বেশ তো তোমার নৌকাটি তবে খানিকক্ষণের জন্য আমায় ধার দাও–আমি ওখানে পৌঁছে মালিকের সঙ্গে দেখা করেই ফিরে আসব।
না। আমি তা পারব না। বলে সে বৈঠা তুলে নৌকাটাকে দূরে সরিয়ে নিতে গিয়ে তাল সামলাতে না পেরে জলের ভিতর পড়ে তলিয়ে গেল।
যে ছেলেটি এত কষ্ট করে এলিয়টকে এখানে নিয়ে এসেছে দ্বীপবাসীর কথা অগ্রাহ্য করে তাকে এভাবে চোখের সামনে ডুবে মরতে দিতে চায় না এলিয়ট। সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তার অচেতন দেহটাকে টেনে হেঁচড়ে পানি থেকে তুলে নিয়ে এল।
বালির চরায় পৌঁছে অনেক কসরত করে ছেলেটির পেট থেকে পানি বের করে তাকে সুস্থ করে তুলতেই ছেলেটি অবাক হয়ে এলিয়টের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
সে দিকে তাকিয়ে এলিয়ট বলল–এখন কেমন বোধ করছ?
ছেলেটির মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। এলিয়ট তাকে সেখানে বসিয়ে রেখে নৌকা খুঁজতে বের হলো। ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে নৌকাটাকে পাওয়া গেল। নৌকায় উঠে সেটিকে তীরের দিকে এনে নোঙর করে চেয়ে দেখল ছেলেটা একটা পাথরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে যেন গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছে।
কি হে, এখন আর আমার সঙ্গে যেতে তোমার কোনো আপত্তি নেই। তো? আপত্তি থাকলে এখানে অপেক্ষা করো। আমি বাগানের মালিকের সঙ্গে কথা বলে আসছি।
ছেলেটি নির্বাক। মুখ থেকে কোনো টু বের হচ্ছে না দেখে এলিয়টের বেশ রাগ হলো। চিৎকার করে বলল–কি, আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না।
তবুও কোনো জবাব নেই। এবার এলিয়ট এগিয়ে গিয়ে ছেলেটির কাঁধে হাত রাখল এবং সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিল। এতো মানুষের দেহ নয়। এ যে নিরেট পাথর।
এটা যদি পাথরের মূর্তি হয় তবে ছেলেটি কোথায় গেল? একথা মনে হতেই সাগরের যে বেলাভূমিতে ছেলেটিকে শুইয়ে রেখে সে নৌকার খোঁজে গিয়েছিল সেখানে গেল।
সেখানে বালির উপরে শায়িত ছেলেটির ছাপ দেখতে পেল এলিয়েট। আরও একটি পদচিহ্ন চোখে পড়ল। খুব সম্ভবত কোন নারীর পায়ের ছাপ।
তখনই ইতিহাসের ছাত্র এলিয়টের একটি পৌরাণিক কাহিনীর কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু সেটার তো কোনো ঐতিহাসিক স্বীকৃতি নেই। সেটা তো নিছক একটা কিংবদন্তি। গ্রিক পুরাণে বর্ণিত কাহিনীটি হলো স্থেনো, মেডুসা ও ইউরিয়েল নামে তিন দানবী বাস করত গরগন দ্বীপে। তারা ছিল মানুষের কাছে এক ভয়ঙ্কর আতঙ্ক।
তাদের মাথায় চুলের বদলে থাকত জীবন্ত সাপ। ওরা দেখতে এত কদাকার ছিল যে, যে কেউ ওদের দিকে তাকালে সে পাথরে পরিণত হয়ে যেত।
এসব কাহিনী যে মিথ্যা নয় তার প্রমাণ তো তার সামনেই। ঐ তো খানিক আগে যে ছেলেটির সঙ্গে এলিয়ট কথা বলেছে, সে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এলিয়টের তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে, কেনো গোটা দ্বীপ থেকে এই প্রাচীর ঘেরা স্থানটি বিচ্ছিন্ন। কেনো এই জায়গাটার কথা স্থানীয় লোকেরা মুখে পর্যন্ত আনতে চায় না। কেনো গরিব হয়েও লোকগুলো তার অতগুলো টাকার প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিল, কেনো ছেলেটি ঐ প্রাচীরের দিকে না তাকিয়ে নৌকা চালাচ্ছিল।
এই সেই গরগনের বাগান। পুরাণ শাস্ত্রে বর্ণিত কাহিনীতে জানা যায় মহাবীর পারসিউস তিন দানবীর মধ্যে মেডুসাকে হত্যা করতে সমর্থ হন, কিন্তু নো ও ইউরিয়েলকে হত্যা করতে পারেননি। কিন্তু সে তো কয়েক সহস্র বছর আগের কাহিনী। তারা কি এখনও বেঁচে আছে? তারা কি অমর? এসব নানান চিন্তা ঐ নির্জন দ্বীপের জমিতে দাঁড়িয়ে এলিয়টের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
কিংবদন্তি যে সত্যে পরিণত হতে পারে এটা তো এলিয়টের কল্পনাতেও স্থান পায়নি। কিন্তু বাস্তব তো তার সামনে। ঐ তো ঈষৎ ঘাড় বাঁকানো অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে তার দেখা সেই ছেলেটা। ওর কাঁধে এখনও সমুদ্রের নোনা জল লেগে আছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে জীবন্ত গ্রিক ভাস্কর্যের প্রতিরূপ। তাহলে তো ঐ মা ও ছেলের মূর্তিটিও এমনই একটি জীবিত মা ও ছেলের প্রতিমূর্তি।
ভাবনার স্রোত বেশি দূর গড়ানোর আগেই পেছনে লঘু পদ সঞ্চারের শব্দ শোনা গেল। মনে হলো কেউ যেন গাউন পরে তার দিকে আসছে। সমুদ্রের হাওয়ায় গাউনের খস্ খস্ শব্দ কানে আসছে। খুব কাছে থেকে একটি সুরভিত সুগন্ধি ভেসে এল। যা কেবল কোনো নারীর দেহ থেকে পাওয়া যায়। এবার শোনা গেল একটি ফ্যাসফেসে কণ্ঠস্বর। সে ভাষা বোঝার সাধ্য নেই এলিয়টের।
এলিয়টের বুঝতে বাকি রইল না যে, মূর্তিমতি মৃত্যু তার দিকে এগিয়ে আসছে। সে দিকে তাকালে সেও পাথরে পরিণত হবে।
এলিয়ট পেছন ফিরে না তাকানোর সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলল কিন্তু এক দুর্নিবার শক্তি তাকে বার বার পিছু ফিরে তাকানোর জন্য তাড়না শুরু করল। তাকাবে না তাকাবে না করেও সে ফিরে চাইল…
প্রতিহিংসা
লোকটা সূর্য ওঠার পরপর বেরিয়ে পড়েছে, এখন পাহাড়ের নিচের বালুর সরু রাস্তাটা ধরে হাঁটছে। আবর্জনার কথা বাদ দিলে জায়গাটা হাঁটাহাঁটির জন্য বেশ ভালো। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় ড্রাইভাররা ফাস্টফুডের আঠালো ব্যাগগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয় নিচের ভাঙা বীচ চেয়ার লক্ষ্য করে। ওদিকে নজর দেয় না লোটা, তবে আজ সকালে দুটো মস্ত বোল্ডারের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাতে তার চোখ আটকে গেল। কৌতূহল বোধ করার কারণ আবর্জনা থেকে আলাদা জিনিসটা। সে হেঁটে গেল ওখানে। হাতে তুলে নিল ওটা। ঘষা খেয়ে চামড়া ছিলে গেছে সামান্য, নিচের দিকটাতে বড়োসড় একটা ফাটল। তবে পাহাড়চূড়া থেকে ফেলে দেওয়া সত্বেও এটা ভেঙে টুকরো হয়ে যায়নি, সেটাই আশ্চর্য। ল্যাচের উপর আঙুল বোলাল সে, শক্ত ভাবে বন্ধ। তা ছাড়া হিমে তার হাতও খানিকটা অসাড়। সমতল একটা পাথরের উপরে বসল সে, ফুঁ দিতে লাগল আঙুলে। হাত গরম হলে আবার চেষ্টা চালাবে সে।
