শব্দটা যেন দেওয়ালের গা থেকেই আসছে। দেওয়ালে কান পাততেই বুঝতে পারলো শব্দটা দেওয়ালের ভিতর থেকে আসছে। খুব ভালোভাবে দেওয়ালের দিকে নজর দিতেই একটি ফাটল চোখে পড়ল।
দূরবিন চোখে দিয়ে সেই ফাটলে চোখ রাখতেই এলিয়টের চোখ দুটি স্থির হয়ে গেল।
প্রাচীরের ভিতরে একটি ছোটো ঝরণা দিয়ে ঝিরঝির করে জল ঝরে পড়ছে। ঝরণার পাশে মা ও ছেলের মর্মর মূর্তি। ছেলেটা মায়ের কোলে ওঠার চেষ্টায় তার হাঁটু দুটি জড়িয়ে ধরেছে।
কী অপূর্ব সৌন্দর্যময়ী ঐ মর্মর নারী মূর্তিটি আর তার সন্তানের চোখে মায়ের কোলে ওঠার জন্য কী গভীর আকুলতা। দুটি মূর্তিই যেন জীবন্ত। মা একটু নীচু হয়ে আছে ছেলেটিকে কোলে তুলে নেওয়ার আগ্রহ নিয়ে।
কোন যুগে কোন ভাস্কর এমন মূর্তি তৈরি করেছিল কে জানে? কোন বইতে বা প্রত্নতত্ত্ববিদের আবিষ্কারে তো এই দ্বীপ ও তার ভাস্কর্যের কথা লেখা হয়নি।
এই দ্বীপে আসা তাহলে ব্যর্থ হয়নি। এখানকার এই ভাস্কর্যের কথা এলিয়ট সমগ্র বিশ্ববাসীর দরবারে পৌঁছে দেবে। এই আবিষ্কারের একমাত্র সাক্ষী সে। সেই হবে এই আবিষ্কারের কর্ণধার। কিন্তু এই মূর্তি দুটিকে এখান থেকে নিজের দেশে না নিয়ে গেলে তো আর কেউ বিশ্বাস করবে না।
এই মূর্তি দুটি তার দেশের মিউজিয়ামের শোভা যেমন বৃদ্ধি করবে, তেমনি তার পাশে তার নামও থাকবে। এই বাগানের মালিককে খুঁজে বের করবে সিদ্ধান্ত নিয়ে সে আবার ফিরে এল সেই সরাইখানায়।
.
সরাইখানার যে কামরায় তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল সেখানে নিজের জুতা পরিষ্কার করার জন্য এলিয়ট ব্যাগ থেকে ব্রাশ আর কালি বের করে জুতায় কালি করতে যাবে, হঠাৎ শুনতে পেলো কে যেন বলছে–দিন আমি করে দিচ্ছি।
পেছন ফিরে এলিয়ট দেখল বছর পনেরোর একটি ছেলে দরজার কাছে। দাঁড়িয়ে আছে। সে এলিয়টের হাত থেকে জুতাটা নিয়ে তাতে কালি দিতে লাগল আর এলিয়ট সেদিকে বিস্ময়ে চেয়ে রইল। এলিয়ট ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করল–প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ঐ বাগানটার মালিক কে বলতে পার?
না, আমি জন্ম থেকেই ওটাকে অমন দেখছি।
তুমি না জানতে পার, কিন্তু তোমার বাবা-মা নিশ্চয়ই জানেন।
আমার বাবা মা কেউ নেই। তবে যতদূর জানি গরডন নামে একজন ঐ বাগানের মালিক।
তুমি আমাকে তার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে পার?
কী করে পারব, ঐ পাঁচিলের ভিতরে ঢোকার তো কোনো পথ নেই।
কিন্তু সমুদ্রের দিকের পথ তো ভোলা। ছেলেটি একথা শুনে কোনো জবাব দিল না। এলিয়ট তাকে তার পারিশ্রমিক দিতে সে মৃদু হেসে চলে গেল।
এলিয়টের ঘরের সামনে তখন কয়েকজন কৌতূহলী লোক দাঁড়িয়ে জটলা করছিল।
এলিয়ট তাদের ভিতর একজনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল–আমি ঐ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাগানের মালিকের সঙ্গে একটু আলাপ করতে চাই। আপনাদের মধ্যে কেউ কি আমাকে সে সুযোগ করে দিতে পারেন?
এলিয়টের কথা শুনে আঁতকে উঠে সকলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করল।
এলিয়ট জানত এই লোকগুলো খুব গরিব তাই এদের টাকার লোভ। দেখালে এরা তাকে তার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছে দিতে দ্বিধা করবে না, তাই সে অনেকগুলো টাকা বের করে বলল–দেখ, তোমাদের মধ্যে আমাকে ঐ পাঁচিল ঘেরা বাগানের ভিতর যে নিয়ে যাবে তাকে আমি একশো ড্রাকমা দেবো।
কিন্তু এলিয়টের প্রস্তাবে কেউ সাড়া দিল না।
সমস্ত গ্রাম খুঁজেও এলিয়ট একটি লোককেও পেল না যে, তাকে ঐ পাঁচিল ঘেরা বাগানের ভিতর নিয়ে যাবে। তারা ঐ প্রাচীরের নাম শুনেই ভয়ে আঁতকে উঠে দ্রুত পালিয়ে গেল।
অগত্যা নিতান্ত নিরাশ হয়ে ওকে আবার সরাইখানায় ফিরে আসতে হলো।
.
গভীর রাত।
সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুম নেই শুধু এলিয়টের চোখে। তার চোখের সামনে তখন শুধু একটি দৃশ্য ফুটে উঠেছে। তা ঐ মা ও ছেলের প্রস্তর মূর্তির।
এমন সময় পদশব্দ শুনে ফিরে দেখল তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সকালের সেই জুতা পালিশ করা ছেলেটা।
এত রাতে এই ছেলেটা এখানে কেনো? ও কোথায় থাকে? ও কি এই সরাইখানাতে থাকে?
এলিয়ট ছেলেটির নাম জিজ্ঞাসা করার আগেই সে এগিয়ে এসে এলিয়টকে বলল–আমি আপনাকে আমার নৌকায় করে ঐ পাঁচিল ঘেরা বাগানের ভিতর নিয়ে যাবো। আমায় একশো ড্রাকমা দেবেন তো?
কেন দেবো না। নিশ্চয় দেবো। তবে আমরা যাবো কখন?
কাল সকালে। তবে কথাটা কাউকে যেন বলবেন না।
বেশ, তাই হবে।
ছেলেটি চলে গেল। এলিয়টের মন আবার স্বপ্নের জাল বুনতে বসল। সে ঐ বাগানের ভিতর থেকে মা ও ছেলের মূর্তি দেশে নিয়ে যাবে। ওটা একটি পরম বিস্ময় হিসেবে মিউজিয়ামে শোভা পাবে। তার নামও প্রত্নতাত্ত্বিকের খাতায় লেখা থাকবে।
পরেরদিন ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই এলিয়ট এসে হাজির সমুদ্রতটে।
সেই ছেলেটি একটি পালহীন ছোটো নৌকায় সেখানে অপেক্ষা করছিল।
এলিয়ট এসে নৌকায় পা রাখতেই ছেলেটি নৌকা ছেড়ে দিল। পাঁচিলটির বিপরীত দিকে তাকিয়ে সে নৌকা বেয়ে চলল। ওদিকে সে তাকাতেই চায় না। কেমন যেন একটা ভয় ভয় ভাব ছেলেটির চোখে মুখে।
হঠাৎ নৌকাটা থেমে গেল।
এলিয়ট দেখল একটি কালো পাথরের গায়ে নৌকাটা থেমেছে।
কী, এসে গেছি?
হ্যাঁ, আমি কিন্তু আর এগোব না। আপনি কি আমার পাওনাটা এখনি মিটিয়ে দেবেন?
কেন দেব না। এই নাও। মানি ব্যাগ থেকে টাকা বের করে এলিয়ট ছেলেটিকে দিল। তারপর বলল–আর একটু এগিয়ে নিয়ে চল না। ঐ তো ঘাট দেখা যাচ্ছে।
