‘‘সেসব নজরানা কি বড়দেওরিই পেতেন? তাঁর স্বামী কিছু পেতেন না?’’
‘‘হা হা হা…ভাগ? পেতেন বই কি! সেদিনই সে হতভাগা ছেলের ভাগে বেঁচে থাকার মেয়াদ নির্দিষ্ট হয়ে যেত কি না৷’’
‘‘মা…মা…মানে? বেঁচে থাকার মেয়াদ নির্দিষ্ট হয়ে যেত মানে?’’ আমি তুতলে যাই৷
‘‘কারণ বড়দেওরির সন্তান, যে কিনা সবসময় মেয়েই হত, তার এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিনেই বড়দেওরির হতভাগ্য স্বামীটিকে কাউরীবুড়ির সামনে বলি দেওয়া হত৷’’
কথাটা শুনে বাক্যহারা হয়ে গেলাম৷ এর মানে? সন্তান জন্মানোর পরেই প্রধানা পুরোহিতের স্বামীকে কাউরীবুড়ির সামনে বলি দেওয়া হত? কেন?
বুড়ো বোধহয় আমার মনের কথাটা আঁচ করে নিল৷ ধীরে ধীরে বলতে লাগল, ‘‘কারণ মেয়ে জন্মানোর পরেই বড়দেওরিকে বিধবা হতে হত৷ এটাই ছিল ওদের প্রথা৷’’
আমি চুপ৷
‘‘সেই মেয়ের যেদিন এক বছর বয়েস হত, সেদিনই সাজিয়ে-গুছিয়ে তাকে আর তার হতভাগ্য বাবাকে নিয়ে যাওয়া হত কাউরীবুড়ির মন্দিরে৷ সেদিন ওদের গ্রামে মস্ত উৎসব৷ তারপর মহাধুমধাম করে পুজোর পর সেই ছেলেটিকে কাউরীবুড়ির সামনে বলি দেওয়া হত৷ বলির রক্তে স্নান করানো হত বাচ্চা মেয়েটিকে৷ সেটাই তার দীক্ষা, সেইদিনই সে যোগ্য বলে বিবেচিত হত পরের বড়দেওরি হওয়ার জন্য৷’’
হা ঈশ্বর, বাবার রক্তে এক বছরের মেয়ের স্নানদীক্ষা?
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ৷ আমার আর কথা বলার ইচ্ছে ছিল না একদমই৷ মনটা ভারী বিষণ্ণ হয়ে ছিল৷ চটকা ভাঙল পরাগের কথা শুনে, ‘‘তাহলে কী ভাবলেন বাবু?’’
‘‘কী ভাবব বলো? কীসের ব্যাপারে?’’
‘‘ওই গোলকপুষ্পের লতা তুলে আনার ব্যাপারে?’’
বুড়োর গল্প শুনে একটা বিষণ্ণ ভাব মনের মধ্যে ছেয়ে থাকাতে কথাটা মাথায় ঢুকতে একটু সময় নিল৷ অবাক হয়ে বললাম, ‘‘সে কী? এই যে বললাম ওই মহিলা বলেছেন ও লতা নাকি বলির রক্ত ছাড়া বাঁচে না, ও লতা তুলে কোনো লাভ নেই!’’
‘‘ধুস, কী যে বলেন দাদা’’, নার্ভাস হাসল পরাগ, ‘‘আপনারা হলেন গিয়ে লেখাপড়া জানা শহুরে লোক, সমাজের মাথা৷ এখন আপনারাও যদি এইসবে বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তাহলে আর আমরা যাই কোথায় বলুন তো? শুনুন দাদা’’, এই বলে আরও কাছে ঘেঁষে এল পরাগ, ‘‘বলছি কী, একবার যখন আপনি ওখানে যেতে পেরেছেন, আমার মনে হয় আরেকবারও পারবেন৷ কি, পারবেন না?’’
আমি চুপ করে রইলাম, পরাগ যেন সাহস দেওয়ার জন্যই বলতে লাগল আমাকে, ‘‘আর এবার নাহয় আমিও যাব আপনার সঙ্গে৷ এই এলাকার যাবতীয় খোঁজখবর আমার নখদর্পণে, বুঝলেন কি না৷ আমার ওই জঙ্গলের ব্যাপারে জানাশোনা, আর আপনার সাহস, এই দুটো মিলিয়ে আমরা একটা সামান্য লতা মাটি থেকে খুঁড়ে তুলে আনতে পারব না?’’
কথাটা শুনে বিস্মিত হলাম৷ আমার ধারণা ছিল এই উপজাতিদের মধ্যে কুসংস্কার জিনিসটা খুব প্রবল৷ এসব থেকে তারা শতহস্ত দূরে থাকতে চায়৷ কিন্তু এই পরাগ তো দেখছি একেবারে তার অ্যান্টিথিসিস৷ ইচ্ছে করে বাঘের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে!
বুড়োর দিকে তাকালাম৷ তিনি চোখ বন্ধ করে গুড়ুক গুড়ুক করে তামুক ফুঁকছেন৷ কথাগুলো তাঁর কানে যাচ্ছে কি না বোঝা যাচ্ছে না৷
‘‘শুনুন দাদা, কাল বাদে পরশু অমাবস্যা৷ জঙ্গলের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে যাওয়ার এর থেকে ভালো দিন আর হয় না৷’’
আশ্বিন মাসের অমাবস্যা? মানে মহালয়া?
‘‘কিন্তু…কিন্তু…কেন? একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না পরাগ’’, যে কথাটা মনের মধ্যে ঘূর্ণির মতো অনেকক্ষণ ধরে পাক খাচ্ছিল, সেইটে এবার সরাসরি আছড়ে পড়ল লোকটার ওপর, ‘‘তোমার এই বিষয়ে এত ইন্টারেস্ট কীসের? তোমাদের সমাজের এত গোপন বিষয়, যে কথা আমার জানার কথাই নয়, সে কথা নিজে এসে আমাকে জানিয়েছ৷ এখানে নিয়ে এসেছ তোমার বড় ঠাকুর্দার সঙ্গে কথা বলাতে৷ এখন বলছ ওই গোলকপুষ্পের লতা তুলে আনার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করতে চাও… সত্যি করে বলো তো পরাগ, তুমি চাইছটা কী?’’
পরাগ বসুমাতারি একবার আড়চোখে তার বড় ঠাকুর্দার দিকে চাইল৷ আমিও ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম বুড়ো একমনে তামুক টেনেই যাচ্ছে৷ উঠোনে বোনা সুপুরি গাছের ছায়া দুলছিল বুড়োর ভাঙা গালে৷ কেন জানি না ক্ষণিকের জন্য মনে হল চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠেছে লোকটার৷
গলাখাঁকারি দিল পরাগ, ‘‘দেখুন দাদা, আমি এ যুগের লোক৷ ওসব ফালতু পুরোনো গালগল্পে বিশ্বাস করি না বিশেষ৷ আমি বুঝি টাকা, বুঝলেন দাদা, টাকা, মানে হার্ড ক্যাশ,’’ এই বলে ডান হাতটা আমার সামনে একটু এগিয়ে তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে টাকা গোনার ইঙ্গিত করল পরাগ৷ ‘‘টাকা ছাড়া আমি আর কিচ্ছু বুঝি না দাদা৷’’ চোখের কোনা দিয়ে অল্প হাসল পরাগ৷
তখন নব্বই দশকের মাঝামাঝি৷ উদার অর্থনীতির খোলা হাওয়া আমাদের ঘরের অন্দরমহলের মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করেছে৷ চোখের সামনে দেখছি পারিবারিক মূল্যবোধ এক এক করে ভেঙে পড়ছে, শিক্ষাদীক্ষার বদলে দামি হয়ে উঠতে শুরু করেছে টাকার ঝনঝনানি৷ ভাবলাম পরাগও বুঝি তারই শিকার৷ সংস্কারহীনতার ঘোমটার আড়ালে লোভের খ্যামটা নাচতে চাইছে৷
আমি মনস্থির করে নিলাম৷ আমিও তো এসেছিলাম টাকার খোঁজেই, না কি? এখন একই পথের পথিক অন্য কাউকে ছিছিক্কার করলে চলবে? আমি করলে লীলা, আর পরাগ করলেই বিলা?
