পূর্বেই স্থির করা হয়েছিলো, কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্য একটি নতুন রাজস্ব জরীপ করা হবে। আগের শাসন ব্যবস্থায় কৃষকদের দুরবস্থার সীমা-পরিসীমা ছিলো না। তারা ছিলো জমিদার এবং অন্যান্য রাজস্ব আদায়কারী সরকারি অফিসারদের কৃপার পাত্র। তাদেরকে অনেক রকমের বিরক্তিকর কর এবং সেস দিতে হতো। পুরোনো অনেক রকম কর মওকুফ করে দেয়া হলেও রাস্তার লোকের তাতে বিশেষ কোনো উপকার হলো না। আবার তাদের ঘাড়ে নানা রকম অপমানজনক করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হলো। একমাত্র আফিমের ওপর কর ধার্য করার ফলে জনসাধারণ বিশেষ করে শহরের অধিবাসীরা ভয়ঙ্কর রকম ক্ষেপে উঠলো। চীনের মতো লখনৌতেও আফিম ব্যাপক ব্যবহারে লাগতো। হঠাৎ করে এ নেশাদায়ক বস্তুটি না পেয়ে দরিদ্র আফিমখোরদের দুর্দশার অন্ত রইলো না।
পুলিশ এবং বিচার ব্যবস্থার উন্নতি সাধনও অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব নয়। নতুন সরকার এক সঙ্গে সমস্ত পুরোনো অফিসারকে বরখাস্ত করতে পারে না যেমন, তেমনি পুরোনো অফিসারেরাও হঠাৎ করে পুরোনো রীতিপদ্ধতি বাদ দিতে পারে না। আগের মতোই ঘুষ এবং দুর্নীতি চলতে লাগলো, কিন্তু এজন্য নতুন সরকারকেই করা হলো দোষী। কেননা নতুন সরকার উচ্চকণ্ঠে নিজেকে সুবিচারের রক্ষক বলে ঘোষণা করেছে। এমনকি নতুন রাজস্ব সংগ্রহকারীরা কৃষকদের মধ্যে প্রচার করতে লাগলো যে কৃষকই জমির প্রকৃত মালিক, তালুকদার, জমিদার ইত্যাদি পরগাছা মাত্র। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে জমিদার তালুকদারেরা কেবল জমির মালিক নয়, মহল্লা কিংবা কওমের সর্দারও বটে। অনেক ভূস্বামী তলোয়ারের সাহায্যে যতোটা না, তারও চাইতে বেশি গোত্রীয় আনুগত্যের সূত্রে জমির মালিকানা দাবি করতেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা জমির মালিকানা স্বত্বের কোনো দলিল রক্ষা করেননি। সুতরাং তাদের অনেকেই পূর্বপুরুষের গ্রাম হারাতে বাধ্য হলো। প্রজাদের শস্য আত্মসাৎ করার দুর্নাম থাকার অপরাধে তাদের মাটির কেল্লা ভেঙ্গে দেয়া হলো এবং সশস্ত্র প্রহরী রাখার ব্যবস্থাও বন্ধ করে দেয়া হলো। কৃষকেরা জমিদারদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ে উঠলো, নতুন শাসনব্যবস্থার প্রতি কোনো আগ্রহই জাগলো না। গাবিন্সের মতে, কোনো কোনো ব্যাপারে তালুকদারদের সঙ্গে বড়ো অপ্রিয় ব্যবহার করা হয়েছিলো, কিন্তু তা ফৈজাবাদ বিভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। তাছাড়া সীতাপুরে খ্রীস্টান কমিশনার অভিজাত ভূস্বামী সম্প্রদায়কে একেবারে সহ্য করতেন না।
অযোধ্যাকে ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু ১৮৫৭ সালের মার্চ মাসে স্যার হেনরী লরেন্সকে অসন্তুষ্ট জনসাধারণের অসন্তোষের কারণসমূহ দূর করার জন্য চীফ কমিশনার করে পাঠানো হলো। স্যার হেনরীর সঙ্গে লর্ড ডালহৌসীর সদ্ভাব ছিলো না। লর্ড ডালহৌসী ভারতীয় রাজপুরুষদের রাজ্য কেড়ে নিলেন, তারা পথে বসলেন। তারপরে স্যার হেনরী কাটা ঘায়ে মলম লাগাতে এলেন। বৃত্তিভোগীরা বৃত্তি পেলেন, তালুকদারেরা আভিজাত্যের কারণে চীফ কমিশনারের কাছ থেকে দ্র ব্যবহার পেলেন। কোনো কোনো লোককে পেনশনের অর্থ প্রদান করা হলো। কিন্তু স্যার হেনরী এসেছেন অত্যন্ত দেরীতে। চর্বি মাখানো টোটার ব্যবহার নিয়ে সেপাইদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সঞ্চার হয়েছে। যে বিক্ষোভের ফুলকি জ্বলে উঠছে, তা যে কোনো মুহূর্তে দাবানলে পরিণত হতে পারে। কিন্তু সে সময়ে কিছু লোক ছিলো, যারা চলতো আপন খেয়ালে, কালের লেখনের প্রতি যারা সব সময়ই অন্ধ ছিলেন। ডঃ ওয়েল নামে ৪৮নং দেশীয় পল্টনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন সার্জন অজান্তে এমন এক ব্যাপার করে বসলেন, ভারতীয়দের কাছে তার কোনো ক্ষমা নেই। ঘটনাটি ঘটেছিলো মার্চের প্রথম দিকে। মেডিকেল স্টোর পরিদর্শনকালে তাঁর শরীর খারাপ লাগা বশতঃ একটি বোতল মুখে দিয়ে ঔষধ পান করে নিলেন। কিন্তু কোনো হিন্দু মেডিকেল স্টোরের দূষিত মিকচার গ্রহণ করতে পারেন না। হাসপাতালের রোগীরা কোনো ঔষধ স্পর্শ করতেও অস্বীকৃতি জানালো। এজন্য সার্জনকে তিরস্কার করা হলো। দেশীয় অফিসারদের সামনে দূষিত ঔষধের বোতলটি নষ্ট করে ফেলা হলো। কিন্তু ভুলে যাওয়া কিংবা ক্ষমা করার মতো মনের অবস্থা সেপাইরা হারিয়ে ফেলেছে। তারা ধরে নিয়েছিলো, এ হচ্ছে তাদের জাতি নষ্ট করার প্রচেষ্টা। কোনো রকমে তিনি প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হলেন। ১৮ই এপ্রিল তারিখে চীফ কমিশনারের গায়ে একটি ঢিল ছোঁড়া হলো। হতে পারে এ কর্ম সেপাইদের দ্বারা সম্পাদিত হয়নি। কিন্তু যেই করুক, গভীরভাবে অপমানিত হয়েছে বলেই তো প্রধান শাসককে ঢিল ছুঁড়তেও পরোয়া করেনি। ৪৮নং স্বদেশী পল্টনকে সরিয়ে নেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কিন্তু চীফ কমিশনার নিশ্চিত যে চর্বি মাখানো টোটা কিংবা অন্য কোনো বিশেষ কারণের সঙ্গে বর্তমান গোলমালের কোনো সম্পর্ক নেই। ২রা মে তারিখে ৭নং অযোধ্যা বাহিনীকে দাঁতে টোটা কেটে বন্দুকে পুরতে আদেশ করলে তারা টোটা কামড়াতে অস্বীকার করলো। পুনরায় ব্রিগেডিয়ার এসে আদেশ দিলেন। আবারও তারা অস্বীকার করলো। সে প্রথা পুরোপুরি বাতিল করে দেয়ার পরেও সেপাইদেরকে কেনো টোটা কামড়ে বন্দুকে ভর্তি করতে নির্দেশ দেয়া হলো, তা ব্যাখ্যা করা যায় না। সম্ভবতো কতিপয় অতি উৎসাহী অফিসারই এই স্বেচ্ছাকৃত ভ্রান্তির অপরাধে অপরাধী। শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য ব্রিগেডিয়ার তাদের সাহায্য করেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা হলো। অবাধ্য অযোধ্যার সেপাইদের শাস্তিদানের ব্যাপারে ভারতীয় সেপাইরা ইউরোপীয় সেপাইদের সহযোগিতা করেছিলো। কিন্তু তথাকথিত বিদ্রোহীরা কোনো বাধা দেয়নি। তারা ছিলো একেবারে প্রশান্ত, এমন কি যখন দেখতে পেলো, তাদেরকে গুলি করার জন্য বন্দুক আনা হচ্ছে, তখন ভয় পেয়ে অনেকে পালিয়ে গেলো। তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে কাউকে কাউকে ফিরিয়ে আনা হলো। নিরস্ত্র সেপাইদেরকে তাদের লাইনে চলে যেতে আদেশ দেয়া হলো এবং পরে রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং কিছুকালের জন্য গোলমাল মিটে গেলো।
