কিন্তু স্যার হেনরীকে সচেতন থাকতে হয়েছিলো। ভবিষ্যতে যে গোলমাল হতে পারে, সে সম্বন্ধে তিনি ধারণা করেছিলেন এবং ক্যান্টনমেন্টও শহরের সাদা চামড়াঅলাদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করেছিলেন। তবে এতে তিনি অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ করে এবং অকারণে ভয় পেয়ে বিষয়টিকে জটিল করে তোলার কোনো যুক্তিই খুঁজে পেলেন না। তিনি অপেক্ষাকৃত শান্ত সেপাইদের সমবেত করতে পারতেন, কিন্তু সেপাইদের ক্ষোভ এতো প্রবল যে করবার মতো বিশেষ কিছু ছিলো না। ৭নং অযোধ্যা বাহিনী ৪৮নং দেশীয় বাহিনীর কাছে একখানা চিঠি লিখলো। ৪৮নং সেপাইরাও বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা হয়েছিলো। কিন্তু একজন সেপাই এবং দু’জন অফিসার যাদের হাতে চিঠিখানি পড়েছিলো, বিশ্বস্তভাবে উপরে অফিসারদের কাছে দিয়ে দিলো। ১৩নং দেশীয় বাহিনীর একজন সেপাই ক্যাপটেন গ্যামনের কাছে শহরের তিনজন মানুষকে সোপর্দ করলো। কারণ তারা সেপাইটির কাছে ষড়যন্ত্রের প্রস্তাব করেছিলো। লরেন্স এ সকল বিশ্বস্ত সেপাইকে প্রকাশ্যে দরবার করে পুরস্কার প্রদানের কথা ঘোষণা করলেন। ১২ই মে তারিখে দরবার বসলো। এই দরবারে ঘাঁটির সকল সামরিক বেসামরিক অফিসার, ক্যান্টনমেন্টের কমিশনপ্রাপ্ত দেশীয় অফিসার এবং প্রত্যেক রেজিমেন্ট থেকে পাঁচজন করে সেপাই অংশগ্রহণ করেছিলো। স্যার হেনরী সম্মেলনে বক্তৃতা দিলেন। যে সকল অফিসার এবং সেপাই এ রকম অপূর্ব আনুগত্যের দৃষ্টান্ত প্রদান করেছে, তাদেরকে পুরস্কার স্বরূপ সম্মানী পোষাক এবং টাকার তোড়া প্রদান করলেন। তিনি সমবেত জনতাকে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে সব সময় যে ভালো ব্যবহার তারা পায়, তা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি হিন্দুকে আওরঙ্গজেবের এবং মুসলমানদের রণজিৎ সিংয়ের কঠোর শাসনের কথা সব সময় স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি তাদের বাংলার সেনাবাহিনীর গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং তাদের পূর্ববর্তীরা যে সুনাম অর্জন করেছে তা হারিয়ে না ফেলার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন।
এ বক্তৃতার ফলে সেপাইরা যে গলেনি সে কথা সত্যি নয়, তবে স্যার হেনরীর বক্তৃতা সকলের ওপর সমান প্রতিক্রিয়া করেনি। কেউ কেউ তার বক্তৃতার প্রশংসা করলেও অন্যদের মনে ভয় ধরে গেলো। এটাই আশ্চর্য লাগে, স্যার হেনরী লরেন্স নিজে তার যুক্তির অসারতা ধরতে পারেননি। সৈন্যেরা যে হতাশায় ভুগছে, এ কথা তার চাইতে অপর কেউ ভালোভাবে জানেন না। তিনি নিজেই এ সম্বন্ধে গভর্ণর জেনারেলের কাছে লিখেছেন কয়েক বছর পূর্বে। সে যাহোক স্যার হেনরীর বক্তৃতা সকলকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ১২ তারিখে পুরস্কৃত এবং অনুগত মানুষদের মধ্য থেকে বেশ কিছুসংখ্যক লোক পরবর্তীকালে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু রাজভক্তদের সমবেত করার জন্য তাঁর যে প্রচেষ্টা তা কিন্তু সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়নি। ইউরোপীয় সাথীদের সাথে সাথে ভারতীয় সেপাইদেরও বেশ কিছুসংখ্যক লখনৌর প্রতিরক্ষার কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সামরিক পেনশনভোগীদের লখনৌতে আহ্বান করে তিনি যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন তার কোনো তুলনা হয় না।
মে মাসের ১৪ তারিখে মীরাট বিদ্রোহের সংবাদ লখনৌতে এসে পৌঁছালো। পরদিন এলো দিল্লীর বিদ্রোহের সংবাদ। স্যার হেনরী অযোধ্যাতে সর্বাত্মক ক্ষমতা পরিচালনার জন্য আবেদন করলেন এবং আবেদন মঞ্জুর হলো। তাঁকে ব্রিগেডিয়ারের পদে উন্নীত করা হলো এবং সামরিক ও বেসামরিক প্রধান হিসাবে তিনি শাসনকার্য চালিয়ে যেতে লাগলেন। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে সেনাবাহিনী। লখনৌ থেকে কয়েক মাইল দূরে মারিওন নামক স্থানের ক্যান্টনমেন্টে ৩টি পদাতিক বাহিনী এবং গোলন্দাজ বাহিনী তখন সাদিকপুরে অবস্থান করছিলো। স্যার হেনরী জানতেন ভালোভাবে অল্প সংখ্যক ইউরোপীয় এবং ভারতীয় সৈন্যদের সাহায্যে সবগুলো সামরিক ঘাঁটি তিনি রক্ষা করতে পারবেন না। তখনো তিনি ক্যান্টনমেন্টে বাস করেন। নগরের দুটি কেন্দ্রে তিনি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে মনস্থ করলেন। একটি হলো মচ্ছি-ভবন এবং অপরটি তাঁর নিজের বাসভবন। এ দু’টি স্থানকে শক্তিশালী করা হলো। ক্যান্টনমেন্টের নারী এবং শিশুদের এ দুটি স্থানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করবার নির্দেশ দেয়া হলো। স্যার হেনরী ভারতীয়দের সাহায্য যে পাবেন, সে আশা ছাড়তে পারেননি এবং তখনো নতুন সৈন্য সংগ্রহ করার কথা চিন্তা করছেন। স্যার হেনরী শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেই ক্ষান্ত ছিলেন না। তিনি জানতেন ভয় ভয়ের জন্ম দেয় এবং বিশ্বাস বিশ্বাসকে জীবন্ত করে। পর মুহূর্তে যদি তিনি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তা যেমন তাঁর পক্ষে বোকামোর কারণ হবে, তেমনি দোদুল্যমানদেরও অনুভব করতে দেয়া উচিত হবে না যে তিনি বড়ো বিচলিত হয়ে পড়েছেন। তার শক্তির প্রকাশ দেখালে একটা সংকট এড়ানো না গেলেও কিছুকালের জন্য হয়তো তা স্থগিত রাখা সম্ভব হবে। কানপুরে কিছু সংখ্যক সৈন্য সাহায্য স্বরূপ পাঠানো হয়েছে। ক্যাপটেন ফেচার হায়েসকে কিছু সংখ্যক অযোধ্যার সেপাইর সঙ্গে প্রেরণ করা হলো। হায়েস নিরাপদে কানপুরে এসে গেলেন। তিনি চিন্তা করলেন, পশ্চিম দেশসমূহের দিকে একবার অভিযানে বেরিয়ে পড়লে রাজপথে কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু পরে মনিপুরের নিকটে তাঁর সেপাইরা বিদ্রোহ ঘোেষণা করে এবং তাঁকে হত্যা করে।
