নব নির্বাচিত ওয়াজিদ আলী শাহ্ও তাঁর পূর্বপুরুষদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে লাগলেন। কবিতা এবং সঙ্গীতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন। কাব্যে তাঁর নিজ বংশের একটি ইতিহাস রচনার কাজে মনোনিবেশ করলেন। তার মেলামেশার ক্ষেত্র শুধুমাত্র কবি এবং শিল্পীদের মধ্যে ছিলো না। তার পিতা তাঁকে নীচ বংশীয় নাচিয়ে গাইয়েদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার অনুমতিও দিয়েছিলেন। আর ওয়াজেদ আলী শাহ্ নিজে কবি ও শিল্পীদের চাইতে নর্তকীদের সঙ্গে অধিককাল সময় ব্যয় করতে পছন্দ করতেন। মন্ত্রীরা সপ্তাহ কিংবা পনেরো দিনের মধ্যে পাঁচ অথবা দশ মিনিট তার দেখা পেতেন, সে-ও প্রাসাদে নয়, কোনো নর্তকী কিংবা বাইজির বাড়িতে। এসকল অকর্মণ্য মন্ত্রী ইচ্ছা করলে যে কোনো তালুক কিংবা জমিদারী বিক্রি করে দিতে পারতেন। ১৮৪৯ সালে স্লীম্যান লিখেছেন, “বর্তমানে এ কথা সত্য যে অযোধ্যায় কোনো সরকার নেই। নাচিয়ে বাজিয়েরা ছাড়া আর কারো সঙ্গে নওয়াবের দেখা হওয়ার জো নেই। জনসাধারণের কোনো বিষয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই। মন্ত্রী পরিবর্তন করেও কোনো লাভ নেই, কারণ নীচ বংশোদ্ভূত নওয়াবের প্রিয়পাত্রেরা সিংহাসনের পেছনে সব সময়েই থাকবে।” স্লীম্যানের পরামর্শ হলো, শাসন-ব্যবস্থা একটি বোর্ডের ওপর অর্পণ করা উচিত। তিনি বলেছেন, সাময়িকভাবে তাঁর কর্তৃত্ব হয়তো কোনো একটি বোর্ড, নয়তো কোনো উত্তরাধিকারীদের মনোনীত করে তার সপক্ষে মসনদ ত্যাগ করা উচিত। কিন্তু ভারত সরকার তেমন ঝুঁকি নিতে সাহস করতে পারলো না। সেজন্য নওয়াবকে এখনো পরামর্শ দেয়া এবং সতর্ক করা হতে লাগলো ভারত সরকারের তরফ থেকে। আগের দিনে নওয়াব সতর্কবাণী এবং পরামর্শের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করতেন। ১৮৩৭ সালের সন্ধি যে বাতিল করা হয়েছে সে সম্বন্ধে তিনি জানতেন না। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন, যতো ব্যয় পরিবর্তনই হোক না কেনো, তিনিই নওয়াব থাকবেন এবং নিজের ইচ্ছে মতো রাজস্ব ব্যয় এবং ভোগ করত পারবেন।
১৮৫৪ সালে স্লীম্যানের স্থলে আউটরাম রেসিডেন্ট হয়ে এলেন। তিনি এসে অযোধ্যার অবস্থা যা দেখতে পেলেন, তা কর্ণেল শ্লীম্যানের বর্ণিত অবস্থা থেকে একটুকুও ভালো নয়। নওয়াব সর্বক্ষণ মহিলা মহলে কাটান। ১৮৫১ সালের সন্ধিপত্রে রাজ্য নিয়ে যাওয়ার কোনো কথা ছিলো না। সন্ধির মর্ম ছিলো, দেশীয় কর্মচারিদের সাহায্যে শাসন ব্যবস্থার উন্নতি বিধান করা। কিন্তু ১৮৩৭ সালের সন্ধি অনুসারে রাজ্য নওয়াবের কাছ থেকে একেবারে কেড়ে নেয়া হলো। লর্ড ডালহৌসী নওয়াবকে একেবারে বঞ্চিত করা এবং নওয়াবী খেতাব কেড়ে নেয়ার পক্ষপাতি ছিলেন না। কিন্তু ডালহৌসীর সহকর্মীরা তার সঙ্গে একমত হননি। ব্রিটিশেরা আশা করেছিলেন যে নওয়াব এ-ব্যাপারে নিজের কর্তৃত্ব এবং খেতাবের দাবি ছাড়তে রাজী হবেন না। তিনি যদি পুরুষের মতো আপন সৈন্যদলের সাহায্যে ব্রিটিশ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন, তাহলে ব্রিটিশ রেসিডেন্টের পক্ষে তাঁকে পরাজিত করে রাজ্য দখল করে নেয়া একটুকুও অসুবিধা হবে না। কিন্তু নওয়াব ব্রিটিশ রেসিডেন্টের কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করলেন, তিনি তাঁর হাতে আনুগত্যের প্রমাণস্বরূপ পাগড়ি খুলে রেখে গভর্ণর জেনারেলের কাছে তার হয়ে ওকালতি করার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন। তিনি রেসিডেন্টকে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে তাঁর পূর্বপুরুষেরা সকলেই ইংরেজকে সহযোগিতা করেছেন এবং তিনি সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃত হলেন। তিনি এবং তার পরামর্শদাতারা আশা করেছিলেন, এতোকাল যাবত যে অনুকম্পা তারা ভারত সরকারের কাছ থেকে পেয়ে আসছেন, এবারেও পাবেন, কিন্তু ফল ফললো বিপরীত। ব্রিটিশ চরমপত্রে সই দিতে ওয়াজিদ আলী শাহ্ অস্বীকার করলেন বটে, কিন্তু অযোধ্যা একটি ব্রিটিশ প্রদেশে পরিণত হলো।
নতুন প্রদেশের শাসনকার্য পরিচালনার ভার জেনারেল আউটরামকে চীফ কমিশনার করে তার ওপর ছেড়ে দেয়া হলো এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক সৈন্যসহ তিনজন সিনিয়র সিভিল সার্ভিস সার্জেন্টকে তাড়াতাড়ি প্রেরণ করা হলো। ইংরেজরা আশা করেছিলো, এতোদিনের কুশাসনে জর্জরিত অযোধ্যাবাসীরা ব্রিটিশ শাসনকে স্বাগত জানাবে এবং ব্রিটিশ সৈন্যকে তাদের মুক্তিদাতা এবং বন্ধু মনে করবে। কিন্তু কার্যতঃ ঘটলো তার বিপরীত। রেসিডেন্ট কুশাসন এবং দুর্নীতির হাজারো অভিযোগ করেছেন নওয়াবের নামে। নওয়াবের অত্যাচারের কারণে কয়েকজন কৃষকও অযোধ্যা ত্যাগ করে অন্য ভারতীয় প্রদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। কিন্তু একটি দেশের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন বহু বছরের ধৈর্যশীল শ্রম।
একটি দেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন সাধন করাই হলো বিদেশী শাসনের বৈশিষ্ট্য। কোম্পানী অযোধ্যা দখল করে নেয়ার ফলে যে সকল উচ্চতম কর্মচারিরা দরবারে নিযুক্ত ছিলেন, তাঁরা বেকার হয়ে পড়লেন। একই সঙ্গে নওয়াবের ষাট সহস্র সৈন্য বেকার হয়ে গেলো, তাদের মধ্যে মাত্র অল্প সংখ্যক পুলিশ বাহিনীতে পুনরায় নিযুক্ত হতে পারলো। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো। দরবারের অধীনে কর্মরত ছিলো অনেক শিল্পী এবং কারিগর, তারাও সম্পূর্ণরূপে বেকার হয়ে পড়লো। তাদের জীবিকার আর কোনো সংস্থান ছিলো না, কারণ নতুন শাসকের রুচি ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, তাই তাদের আর নতুন শাসন-ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। স্যার জেমস আউটরাম যদি শাসক হিসেবে থাকতেন অথবা স্যার হেনরী লরেন্সের মতো কোনো রাজনীতিবিদের হাতে শাসন ক্ষমতা দীর্ঘকাল থাকতো, তাহলে জনগণের ক্ষোভ দূর করার জন্য অনেক কিছু করা হয়তো অসম্ভব হতো না এবং জনগণ ধীরে ধীরে নতুন শাসন-ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতো, বিশেষ গণ্ডগোল ঘটতো না। কিন্তু আউটরাম অত্যল্পকালের মধ্যেই ছুটি কাটাতে চলে গেলেন, তাঁর স্থলে এলেন কর্ভালে জ্যাকসন। তিনি হচ্ছেন অনেক বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন বেসামরিক সিভিল সার্জেন্ট। কোম্পানীর একটি প্রাথমিক প্রদেশে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু এ প্রদেশে তাঁর নতুন কর্তব্যের জন্য যেমন প্রয়োজন তেমন সহানুভূতি এবং কল্পনাশক্তি দু’টোর কোনোটিই তাঁর ছিলো না। রেসিডেন্ট হিসেবে এসেই ছত্তর মঞ্জিলকে আপন বাসভবন হিসাবে নির্দিষ্ট করলেন। কিন্তু সে প্রাসাদটিতে কেবল নওয়াব খান্দানের লোকেরাই বসবাস করতেন। সঙ্গে সঙ্গে তার ধৃষ্টতার প্রতিবাদ করা হলো, তিনি সরতে বাধ্য হলেন, কিন্তু জনতার ক্ষোভ একটুও কমলো না। মুসলিম জনসাধারণের কাছে কদম রসুল ভবনের প্রতিটি ইট-কাঠও পবিত্র। কেননা তাঁর একটি পাথরে রসুলের চরণচিহ্ন অঙ্কিত রয়েছে। কিন্তু কোম্পানীর সরকার সে অট্টালিকাকে গোলাবারুদের আগারে পরিণত করলেন। নওয়াবের অনেক আশ্রিত এবং বৃত্তিভোগী এক বছরেরও অধিক সময় ধরে কোনো বৃত্তি পাননি। এক বছর পরে স্যার হেনরী লরেন্স লখনৌতে এসে পৌঁছেই তিনি অত্যন্ত তাড়াতাড়ি তাঁদের বৃত্তিদানের ব্যবস্থা করেন। মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে গেছে। জনসাধারণের আতঙ্ক দূর করার জন্য কোম্পানীর তরফ থেকে কিছুই করা হয়নি। অধিকন্তু কোম্পানীর অফিসারদের নতুন নতুন সংস্কারের ফলে জনসাধারণের অসন্তুষ্টি বেড়েই যেতে লাগলো।
