• বইয়ের নামঃ সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস
  • লেখকের নামঃ আহমদ ছফা
  • প্রকাশনাঃ খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি
  • বিভাগসমূহঃ ইতিহাস

০. ভূমিকা ও সূচীপত্র

সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস – আহমদ ছফা

[রচনাকাল ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সাল। ১৯৭৯ সালে লেখাটি প্রথম বাংলাবাজারস্থ বুক সোসাইটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়। এই রচনাটিকে ওই একই সালে বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করা হয়। সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাসের পরবর্তী সংস্করণও বুক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। তৃতীয় সংস্করণটি ১৯৯৬ সালে প্রতিপক্ষ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যে কোলকাতার ইসলামী পাবলিকেশন্স সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাসের একটি পশ্চিমবঙ্গীয় সংস্করণও প্রকাশ করেন।]

উৎসর্গ
পিতৃপ্রতিম উলানিয়ার পুণ্যশ্লোক মরহুম আরিফ চৌধুরী
এবং
অবহেলিত জ্ঞানতাপস অজাতশত্রু ইতিহাসবেত্তা প্রফেসর আগা মাহদী হুসেইন
এই দুই মহান ব্যক্তির নামে এই অপরিপাটি গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হলো।

পরিচায়িকা

সমগ্র ভারতে এবং পাকিস্তানের অংশ বিশেষে ১৯৫৭ সালে সিপাই বিদ্রোহ শতবার্ষিকী পালন করা হয়েছিল, ঘটনাবহুল সভা-সমিতি ও উৎসবানুষ্ঠানের মাধ্যমে। তখন বহু ঐতিহাসিক সিপাই যুদ্ধের বিভিন্ন দিকের উপর আলোকপাত করে জনপ্রিয় ও গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ও বইপত্র লিখেছিলেন শতবার্ষিকীর বৎসরটিকে উজ্জ্বলভাবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে। তাঁদের মধ্যে অনেকের ধারণা ছিল, সিপাই যুদ্ধ ছিল ভারতবাসীদের জন্য একটি ব্যাপক স্বাধীনতা সংগ্রাম অথবা একটি সুসংহত জাতীয় আন্দোলন। অন্য এক দল ঐতিহাসিকের মতে এই বিদ্রোহ মূলতঃ একটি সামরিক অভ্যুত্থান, নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার আওতায় এসে যাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়েছিল, সেই অপরিতৃপ্ত রাজা, মহারাজা ও জমিদারশ্রেণী এই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ অথবা শ্ৰেণীস্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিলেন। পরস্পর বিরোধী এইসব মতামতের যথার্থ বিচার না করেও বলতে চাই, তখন আমার মনে হয়েছিল এবং এখনো মনে হয়) উপরোক্ত দু’ধরনের অভিমতের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মানসিকতা প্রশ্রয় পেয়েছিল; নইলে উপমহাদেশের খ্যাতনামা ঐতিহাসিকগণ বিশেষ প্রয়োজনের তাগিদে এবং বিশেষ রাজনৈতিক পরিবেশে সিপাই যুদ্ধ সম্বন্ধে মতামত প্রকাশের জন্য অতটা আগ্রহ কেন দেখিয়েছিলেন? ইংরেজ শাসন অবসানের মাত্র দশ বছর পর ঐতিহাসিকদের তরফ থেকে ঐ ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়ত বা স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেছিলাম যে, তখনকার দিনের পূর্ব-পাকিস্তানের সিপাই বিদ্রোহের উপর কোনো উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ অথবা প্রবন্ধ লেখা হয়নি। আজো এ-কথা ভেবে অবাক হতে হয় যে, যে দেশে মাতৃভাষার জন্য রক্তপাত হয় এবং সুদীর্ঘ ২৭ বছর ধরে ২১শে ফেব্রুয়ারি শোকদিবস হিসেবে গতানুগতিকভাবে উদযাপিত হয়, সেই দেশে ঐতিহাসিক ও দার্শনিক বিষয়বস্তু অবলম্বনে বাংলা ভাষায় কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ অথবা জনপ্রিয় গ্রন্থ লেখা হয়নি। আমাদের দেশের লেখক ও গবেষকদের সাম্প্রতিক এই বন্ধ্যাত্বসূচক মানসিকতা ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তপাতের চেয়েও বেশি শোকাবহ। কেননা সেই রক্তের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার অফুরন্ত সম্ভাবনা ছিল; আর লেখক ও গবেষকদের সাম্প্রতিক মানসিক পঙ্গুতা প্রমাণ করছে যে, সেই সম্ভাবনা প্রায় তিন যুগের মধ্যেও বাস্তবে পরিণতি পায়নি। ইতিহাস ও দর্শনের ব্যাপক অনুশীলন ছাড়া কোন ব্যক্তি বা সমাজ মানসিক পরিশীলন অর্জন করতে পারে না- সভ্যজীব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না। সেই জন্য ইতিহাস বা দর্শনের বিশেষ অংশের উপর বাংলায় লেখা যে কোন চলনসই গবেষণাগ্রন্থ অথবা জনপ্রিয় পুস্তকের আবির্ভাব নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য।

সিপাই বিদ্রোহের গুরুত্ব আধুনিককালের ইতিহাসে অপরিসীম। শাসিত ও শাসক উভয়েই এই ঘটনা থেকে বিশেষভাবে শিক্ষা নিয়েছিল। বিদ্রোহের চুড়ান্ত পর্যায়ে ভারতের ইংরেজ শাসনের মেরুদণ্ড প্রায় নুয়ে পড়েছিল। সেইজন্য বিদ্রোহ দমনের জন্য ব্যাপক প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল এবং এই পরিবর্তিত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ভারতে ইংরেজ শাসনের যে অধ্যায় রচিত হল তা বিভিন্ন কারণে বিশিষ্ট; তা ইংরেজ রাজত্বের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। বিদ্রোহের শেষে শাসিতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বুঝতে পারল যে ইংরেজ শাসন টিকে গেছে; অতএব শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পশ্চিমের ধ্যান-ধারণাকে স্বাগত না জানিয়ে আর উপায় নেই। উনিশ শতকের শেষার্ধে তাই ভারতের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকাল।

সিপাই বিদ্রোহ জাতীয় ঘটনার উপর লেখা ইংরেজি গ্রন্থ অসংখ্য, কিন্তু বাংলা লেখা বই প্রায় নেই বললেই চলে। আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক শূন্যতার ক্ষেত্রে যেখানে বাংলায় ইতিহাসচর্চা অত্যন্ত নিরুৎসাহজনক পর্যায়ে বিষয়বস্তুর গুরুত্বের জন্যও আহমদ ছফার এই রচনাটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আহমদ ছফা সৃজনশীল লেখক, কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে বহুদিন আগেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের উপর লেখা তাঁর কয়েকটি প্রবন্ধ ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। তবে ব্যাপক ইতিহাস আলোচনার ভিত্তিতে রচিত গ্রন্থ হিসেবে ‘সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাসই তাঁর প্রথম রচনা। এ-গ্রন্থে প্রকাশ পেয়েছে ঘটনার ধারাবাহিকতা চিহ্নিতকরণের প্রয়াস এবং সর্বোপরি লেখকের অনুসন্ধিৎসু মন। তাঁর ভাষার সাবলীল গতি লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারা যায়, এ-ভাষা এসেছে কোনো সৃষ্টিশীল শিল্পীর লেখনী থেকে। লেখক নিষ্ঠার সঙ্গে বহু প্রামাণ্য গ্রন্থ পড়ে রচনাটির জন্য তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

গ্রন্থের ভালমন্দের বিশদ আলোচনা এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকার উদ্দেশ্য নয়। সে ভার সাধারণ পাঠক ও বিশেষজ্ঞদের উপর ছেড়ে দিয়ে শুধু এই কথা বলতে চাই যে, এ গ্রন্থ আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজনা এবং আহমদ ছফার নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য।

মমতাজুর রহমান তরফদার
অধ্যাপক, ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২২শে অক্টোবর ১৯৭৯
ঢাকা

স্বীকারোক্তি

আমার যৌবনধর্মের অপরাধের প্রমাণ এই গ্রন্থ। বিএ পরীক্ষা দেয়ার পর পরই এ গ্রন্থ লিখতে প্রবৃত্ত হই এবং শেষ করতে একটানা দু’বছর লেগে যায়। আমাদের দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক শ্রী সত্যেন সেনের মহাবিদ্রোহের কাহিনী পড়ার পর এই বিষয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখার আকাক্ষা মনে প্রথম জাগ্রত হয়। তার আগে মরহুম আরিফ চৌধুরী সাহেব বার বার এ বিষয়ে আমাকে কিছু লিখতে উপদেশ দেন। সে যাক, সত্যেন বাবুর অনুপ্রেরণায় আমার আকাঙ্ক্ষাটিকে কাজে রূপ দেয়ার পাকা সংকল্প গ্রহণ করি। প্রকাশ ভবনের স্বত্বাধিকারী জনাব আবদুল হক। লিখিতব্য গ্রন্থটি প্রকাশ করবেন আশ্বাস দেন এবং যে পরিমাণ অর্থ না পেলে দু’বেলা অন্নসংস্থান করে দীর্ঘ একটি গ্রন্থ লেখার কাজে দীর্ঘকাল একটানা লেগে থাকা সম্ভব নয়, তার একটা অংশ সময়ে সময়ে তিনি আমাকে সরবরাহ করেছেন। সেই সময়ে এই গ্রন্থের নামকরণ করেছিলাম ‘মহাজাগরণ’। মলাট ইত্যাদিও আঁকাজোকা হয়ে গিয়েছিলো। তারপরে কি কারণে জানি না হক সাহেব পাণ্ডুলিপি প্রেসে দিতে দেরী করলেন।

তখন অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। গল্পকার, উপন্যাসিক, কবি, প্রবন্ধ লেখক হওয়া এবং গরম বক্তৃতা দেয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলে যে লিখিত গ্রন্থটির প্রতি আমি সব রকমের অনুরাগ হারিয়ে ফেলি। এরই মধ্যে প্রায় দেড় বছর সময় চলে যায়। মাঝখানে একবার হক সাহেবের সঙ্গে দেখা হলে তিনি জানালেন যে তাড়াতাড়ি পাণ্ডুলিপিটি প্রেসে পাঠাবার ব্যবস্থা করছেন। আমি তখন বেঁকে বসলাম। তাকে বললাম, ইতিহাস বিষয়ে আমার মতো অশিক্ষিত একজন লোকের লেখা অতোবড়ো একটি বই দেখলে আমার সাহিত্যিক বন্ধুরা হয়ত আমাকে ঠিশারা করবেন। আরো একটা ভয় আমার ছিলো। এ রকম জমকালো বিষয়ে গম্ভীর একখানি কেতাবের লেখক জানলে লোকে আমার লেখা গল্প, উপন্যাস, কবিতা, অন্যান্য রচনা পড়বে না। আমাদের দেশের পণ্ডিতদের লেখার প্রতি সাধারণ মার্জিত রুচির পাঠকদের একটা ভীতি এবং একটা অনীহার কথা আমি জানতাম। পাছে এ বইয়ের লেখক জেনে আমাকে পণ্ডিত মনে করে লোকে, সে আকাক্ষা করে প্রস্তাব করেছিলাম, হক সাহেব তাঁর নিজের নামে অথবা তাঁর স্ত্রীর নামে নিদেনপক্ষে তাঁর পরলোকগত পিতৃদেব কিংবা শ্বশুর সাহেবের নামে এ গ্রন্থ যদি প্রকাশ করেন আমার। কোনো আপত্তি থাকবে না, বরং সানন্দে স্বীকৃতি জানাবো। সেটিও ঘটেনি।

তারপরে প্রায় দশ বছর কেটে গেছে। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে দুটি বছরের কঠোর বিরতিহীন পরিশ্রমে আমার কলম থেকে একটি ইতিহাসগ্রন্থ জন্ম নিয়েছিলো। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমার সঙ্গে হক সাহেবের দেখা হয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো সময় তিনিও আমাকে কিছু বলেননি। এরই মধ্যে একদিন, আজ থেকে প্রায় ছ’মাস আগে হক সাহেব কথায় কথায় আমাকে জানালেন, আমার ইতিহাস বইটি ছাপতে তার অনেক টাকা খরচ হবে। উপস্থিত মুহূর্তে অতো টাকা তাঁর নেই। আমি যদি অন্য কোনো প্রকাশক কিংবা বাংলা একাডেমী বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বইটি ছেপে বের করতে পারি, তাহলে তিনি পাণ্ডুলিপিটি ফেরত দিতে রাজী আছেন। জন্মান্তরের স্মৃতির মতো আমার মনে ভেসে উঠলো এক সময়ে দৈনিক আট নয় ঘণ্টা খেটে দু’বছরে একখানা ইতিহাস লিখেছিলাম। অতীতের প্রতি একটা আকর্ষণ তো সকলেরই থাকে।

মুখ্যতঃ সে কারণে আমি পাণ্ডুলিপিটি কৌতূহলবশত দেখতে চাইলাম। তিনি দিন দশেক বাদে আমাকে পাণ্ডুলিপিটি প্রত্যর্পণ করলেন। দেখি জায়গায় জায়গায় উই পোকা পাণ্ডুলিপিটি কেটে ফেলেছে। প্রথম দিকের পৃষ্ঠাটি এবং শেষদিকের অনেকগুলো পাতা এই পাণ্ডুলিপিভুক কীটদের উদরে চলে গেছে। ভারী ব্যথা পেলাম।

এখানে সেখানে পড়ে দেখি যে বেশ ইতিহাস ইতিহাস একটা গন্ধ বইটার আছে। কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবকে দেখাই। তারাও আমার সঙ্গে একমত হলেন। কেউ কেউ বললেন যে আমাদের এই বাংলাদেশে সিপাহী যুদ্ধের ওপর বাংলা ভাষায় লেখা একখানিও বই নেই। ছাপলে পণ্ডিতদের না হোক সাধারণ আগ্রহী পাঠকদের চাহিদা পূরণ করবে। এতোসব শুনে বাংলা একাডেমীর শরণাপন্ন হলাম। একাডেমী কর্তৃপক্ষ জানালেন যে, তারা আমার বই গ্রহণ করলেও কবে ছাপা হবে সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দিতে অপারগ। দশ বছরও লাগতে পারে আবার কমও লাগতে পারে কিংবা বেশিও লাগতে পারে। নীরবে একটা দীর্ঘশ্বাস চাপলাম। পাণ্ডুলিপিটির যে মুমূর্ষ অবস্থা, ছ’মাসের পরমায়ু সম্বন্ধে আমার সন্দেহ ছিলো। কি আর করবো। ভারী বুক নিয়ে ফিরে এলাম।

এর অব্যবহিত পরে বাড়িতে ডাকাত পড়ার মতো কিছু টাকার প্রয়োজন আমাকে প্রায় ক্ষিপ্ত করে তোলে। উপায়ান্তর না পেয়ে পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে আমার বন্ধু বুক-সোসাইটির স্বত্বাধিকারী মোস্তফা কামালের কাছে গিয়ে মৃত্যু পরোয়ানার মতো হাজির হই এবং সরাসরি দাবি করে বসি যে আমাকে পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করতে হবে এবং পাণ্ডুলিপিটি অবিলম্বে ছেপে বের করতে হবে। তাঁর সম্পর্কে অধিক বলবো না। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি এ কারণে যে এরকম একজন বন্ধু আমার আছেন। তারপরে আর কোনো কথা নয়, দু’মাসের মধ্যে দশ বছর আগের লেখা পাণ্ডুলিপি কীট সহবাস পরিত্যাগ করে নতুন মোড়কে দিনের আলোর মুখ দেখলো। এরকম অবিশ্বাস্য কাণ্ড এই যুগে ঘটতে দেখলে কার না আনন্দ হয়!

সহৃদয় রম্য-সাহিত্যিক জনাব লুৎফর রহমান সরকার সাহেব এই গ্রন্থটি ছাপা হওয়ার সময়ে আমাকে এক হাজার টাকা ধার দিয়ে সাহায্য করেছেন। কল্যাণীয়া লুতফা হাসিন রোজী কীটদষ্ট প্রথম পৃষ্ঠা এবং শেষের ক’টি পৃষ্ঠা পুনরুদ্ধার করার কাজে সাহায্য করেছে। কল্যাণীয় মহিউদ্দিন প্রথম একশো পৃষ্ঠার নির্ঘণ্ট তৈরি করে দিয়েছে। শ্রদ্ধেয় ডঃ নাজমুল করিম মুদ্রণের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি অধ্যায় দীর্ঘ রাত্রি ধরে আমাকে দিয়ে পাঠ করিয়ে শুনেছেন এবং এতে মনে করেছি দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম কিছুটা যেনো হাল্কা হয়েছে। কবি আসাদ চৌধুরী অনুগ্রহ করে মলাটের পেছনের পৃষ্ঠার গ্রন্থ পরিচিতিটি লিখে দিয়েছেন। ধীমান ইতিহাসবিদ ডঃ মমতাজুর রহমান তরফদার পরিচায়িকা লিখেছেন এই বইয়ের। এটা তার স্বভাবসঞ্জাত উদারতা, গ্রন্থের কোনো গুণ নয়। চেনা জানা কতো মানুষ যে সাহায্য করেছেন, সকলের নাম উল্লেখ করার ক্ষমতা আমার নেই। সকলের কথা বলে শেষ করতে পারবো না।

আহমদ ছফা
১০৭, আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
২২ শে অক্টোবর, ১৯৭৯
ঢাকা।

তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা

এই গ্রন্থটা লিখেছিলাম দেশ স্বাধীন হবার আগে। ছাপা হয়েছিলো ষোল বছর পর। এ-সময়ের মধ্যে বইটির দু’টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। কোলকাতায়ও বইটির একটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। নতুন করে বইটি ছাপার প্রাক্কালে কিছু কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি।

প্রথম সংস্করণের ভূমিকা শুরু করেছিলাম একটি বাক্য দিয়ে আমার যৌবনধর্মের অপরাধের প্রমাণ এই গ্রন্থ। লিখেছিলাম বিএ পাশ করার আগে। মাঝে মাঝে বইটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার আকাঙ্ক্ষাও জেগেছিলো। কারণটা স্পষ্ট করে বলি, বর্তমানে অতো অমানুষিক পরিশ্রম করে এ রকম একটি রচনা লেখার ক্ষমতা আমার হবে না। তা ছাড়া যদি লিখতেই হতো আমি সিপাহী যুদ্ধের আনুপূর্বিক ঘটনা বর্ণনা করার বদলে সিপাহী যুদ্ধের কতিপয় কুশীলবকে নিয়ে একটি ভিন্ন রকমের গ্রন্থ রচনা করতে চেষ্টা করতাম।

দিল্লীর সম্রাট বাহাদুর শাহ্ থেকে শুরু করে যে-সমস্ত রাজা মহারাজা তাঁদের হারানো ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য বৃটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেপাইদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের সম্পর্কে নতুন কথা বলার অবকাশ নেই। তাঁরা পরাজিত হবার জন্যই লড়াই করেছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানে দীক্ষিত, আধুনিক মননে সমৃদ্ধ, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত বৃটিশ বাহিনীকে মুখোমুখী যুদ্ধে পরাজিত করার মানসিক শক্তি এবং সামরিক পারঙ্গমতা ভারতীয় সামন্ত সমাজের প্রতিভূ রাজা মহারাজ- নওয়াব-দিল্লীর সম্রাট কারো ছিলো না।

ঘেঁটে ঘেঁটে খুঁটিয়ে অনুসন্ধান করলে সিপাহী যুদ্ধের ওপর তথ্যের পাহাড় গড়া যায়। অনেক অকথিত কাহিনীও প্রকাশ পেতে পারে। কিন্তু সেই সত্যটির ব্যত্যয় কখনো ঘটবে না। সামন্ত প্রভুরা পরাজিত হবার জন্য যুদ্ধের দায়দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিয়েছিলেন। সিপাহী যুদ্ধের নায়কদের একের পর এক পরাজয়ের করুণ স্মৃতি মনকে বেদনা ভারাক্রান্ত করে এ কথা সত্য বটে, কিন্তু এ সামন্তদের থেকে শ্রদ্ধা করার মতো একজন মানুষকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না একজন ব্যতিক্রম ছাড়া।

আসলে ইংরেজ, ফরাসি, ডাচ ইত্যাদি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে দখল করে তাদের সাম্রাজ্যের অংশ করে নিয়েছিলো, বৃটিশের ভারত অধিকার তার একটা পর্যায়কে সূচিত করে মাত্র। ভারতবর্ষ যদি ইংরেজরা দখল না করতো তাহলে ফরাসিরা ভারতবর্ষে অধিকার বিস্তার করতো।

ভারতীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে যাঁরা বৃটিশের সৈন্যকে বাধা দিতে চেষ্টা করেছিলেন প্রায় সকলেরই মর্মান্তিক পরাজয় বরণ করে নিতে হয়েছে। একমাত্র সে সকল রাজন্যবর্গই টিকে থাকতে পেরেছেন যাঁরা বৃটিশের দাসত্ব কবুল করে নিয়েছিলেন। মহীশূরের শার্দুল টিপু সুলতানই ছিলেন একমাত্র সম্মানজনক ব্যতিক্রম। তিনি দীর্ঘদিন পর্যন্ত ইংরেজের সাফল্যজনকভাবে প্রতিরোধ করে আসছিলেন, তার প্রধান কারণ টিপু সুলতান আধুনিক মানসিকতা সম্পন্ন নরপতি ছিলেন। তিনি আধুনিক যুগের মর্মবাণী অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং রাষ্ট্র নায়কের আধুনিক ভূমিকা কি হওয়া উচিত মোটামুটি সে সম্পর্কেও একটা স্পষ্ট ধারণা তার ছিলো। তিনি নতুন শাসনপদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন, অর্থনীতির নতুন বিলিবন্টন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, সেনাবাহিনীকে ইউরোপীয় ধাঁচে ঢালাই ও সুশিক্ষিত করে তুলেছিলেন। এ সকল কারণেই টিপু সুলতান দীর্ঘদিন পর্যন্ত ইংরেজ শক্তিকে সাফল্যজনকভাবে প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। টিপু সুলতানকে পরাজিত করে মহীশূর দখল করার জন্য বৃটিশের মতো বিশ্বের একটি প্রথম শ্রেণীর শক্তিকে তাদের মিত্র রাজন্যবর্গের সহায়তা সত্ত্বেও যথেষ্ট রকম বেগ পেতে হয়েছে। ছল-বল কল-কৌশল সব কিছু একযোগে প্রয়োগ করে টিপু সুলতানকে পরাজিত করা সম্ভব হয়েছিলো। টিপু সুলতানের পরাজয় মহৎ পরাজয়। তাঁর আত্মদানের ট্র্যাজিক মহত্ব কোনোদিন ম্লান হবার নয়।

২.

সিপাহী যুদ্ধের কতিপয় কুশীলবের প্রতি আমার মনে এমন এক ধরনের শ্রদ্ধা ঘনীভূত হয়েছে। যদি সময় এবং সুযোগ থাকতত এই মহান চরিত্রসমূহের গুণকীর্তন করে আমি আরেকটা নতুন বই লিখতাম এবং বর্তমান গ্রন্থটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিতাম। সিপাহী বিদ্রোহের মূল পরিকল্পনাকার আজিমুল্লাহর জীবনের ঘটনাবলী পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে তুলে ধরতাম। এ অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিটির জন্ম অভিজাতকুলে নয়। পাঁচক হিসাবেই তিনি জীবন শুরু করেছিলেন। তারপর নিজের চেষ্টায় লেখাপড়া শিখে সম্পূর্ণ আধুনিক মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। তিনি নানা সাহেবের উপদেষ্টার আসন অলংকৃত করেছিলেন এবং নানা সাহেবই তাঁকে তাঁর পক্ষে ওকালতি করার জন্য বিলাতে পাঠিয়েছিলেন। বিলাতের অভিজাত সমাজ আজিমুল্লাহকে গ্রহণ করেছিলো এবং মহিলারা প্রিন্স আজিমুল্লাহর প্রতি আসক্তও বোধ করতেন। সমস্ত আকর্ষণ, সমস্ত যোগ্যতা এবং প্রতিভা সত্ত্বেও আজিমুল্লাহ বৃটিশ প্রভুদের মনে তার মনিবের প্রতি অনুকম্পা সৃষ্টি করতে পারেননি। তাই বলে আজিমুল্লাহ ব্যর্থতাকেও মেনে নেননি। তিনি দেশে ফেরার পথে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সেটা হলো এই বৃটিশরাও পরাজিত হয় এবং তাদের পরাজিত করা সম্ভবও বটে। বৃটিশকে পরাজিত করা যায় এ মন্ত্র নিয়েই তিনি দেশে ফিরেছিলেন। প্রকৃত প্রস্তাবে সিপাহী যুদ্ধের বীজটি আজিমুল্লাহই বপন করেছেন। সে মহীরুহকে পরিণত করার পেছনে আজিমুল্লাহ যে ভূমিকা পালন করেন, এক কথায় সেটাকে অনন্য বললে যথেষ্ট বলা হবে না। অথচ আজিমুল্লাহর জীবনের পুরো কাহিনী আমরা কেউ জানিনে।

তাঁতিয়া টোপী ছিলেন নানা সাহেবের সামান্য একজন কর্মচারী মাত্র। সামরিক অভিজ্ঞতাও তার ছিলো না। কিন্তু তিনি গেরিলা যুদ্ধের নব নব কলা-কৌশল উদ্ভাবন করে বৃটিশ সেনাবাহিনীকে যেভাবে বারে বারে পর্যদস্ত করেছিলেন তার সবটুকু গৌরব এখনো তাকে দেয়া হয়নি।

একই কথা ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ সম্পর্কেও বলবো। রাজকুলে এই মহীয়সী নারীর জন্ম হয়নি; যদিও রাজার সঙ্গে তার পরিণয় ঘটেছিলো। যুদ্ধের সময় এই অসাধারণ তেজস্বী মহিলা যে সাহস কৌশল এবং দেশপ্রেম প্রদর্শন করেছিলেন তা ইতিহাসের এক গর্বের বস্তু।

মাওলানা আহমদউল্লাহও অভিজাতদের কেউ ছিলেন না। তিনি নিতান্তই সাধারণ মানুষের সন্তান এবং নিজেও ছিলেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু যুদ্ধের সময় সেপাইদের যেভাবে সংগঠিত করতে পেরেছিলেন, পরাজয় নিশ্চিত জেনেও একের পরে এক যুদ্ধ করে শাহাদত বরণ করেছেন। সেই কাহিনীও কোনোদিন ভুলে যাবার নয়।

কুমার রাম সিং ছিলেন একজন সামন্ত ভূস্বামী। সিপাহী যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিলো আশি বছর। এ বয়সেও বুড়ো সিংহ সিংহের বিক্রম নিয়ে লড়াই করে গেছেন। নৌকাযোগে গঙ্গা পার হবার সময় বৃটিশ কামানের গোলায় তার ডান হাত অকেজো হয়ে গেলে বাঁ হাতে তলোয়ার ধরে এক কোপে ডান হাত কেটে ফেলে দিয়ে বলেছিলেন, মা গঙ্গা তোমার বুকে আমার দক্ষিণ হস্ত অঞ্জলি দিলাম।

বাবর, আকবর, আওরঙ্গজেব যে বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, প্রায় পাঁচশ বছর স্থায়ী সেই তৈমুর বংশের উত্তরাধিকারীরা কোনো সাহস, কোনো বীরত্ব, কোনো রকম রণচাতুর্য প্রদর্শন করতে পারেনি। একমাত্র শাহজাদা ফিরোজ শাহই ছিলেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। বাবর-আকবরের বংশের সব মোগল যে কাপুরুষ নয়, একজন তার ব্যতিক্রম আছে এটা শাহজাদা ফিরোজ শাহ্ প্রমাণ করে মোগল বংশকে কিছুটা কলংকের হাত থেকে রক্ষা করে গেছেন।

সিপাহী যুদ্ধের ঘটনাটি ব্যাপ্তিতে এবং গভীরতায় ভারতবর্ষের ইতিহাসে অতুলনীয়। এই যুদ্ধের গুরুত্ব মহাভারতের কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধের মতোই ভয়াবহ এবং তাৎপর্য সম্পন্ন। এই যুদ্ধের ফলে ভারতের সামন্ত প্রভুরা ঝাড়ে বংশে ধ্বংস হয়েছে এবং বৃটিশ শাসন সম্পূর্ণরূপে নিষ্কন্টক হয়েছে। বৃটিশ ঐতিহাসিকেরা সিপাহী যুদ্ধ ঘটে যাওয়ার অনেকদিন পর পর্যন্ত এ যুদ্ধকে তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে যখন জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের উন্মেষ ঘটতে আরম্ভ করে ভারতীয় ঐতিহাসিকেরা সিপাহী যুদ্ধের মধ্যে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগামের উৎস অনুসন্ধান করতে থাকেন। অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন এমন ঐতিহাসিকও যথেষ্ট রয়েছেন।

আমি আজিমুল্লাহ, তাঁতিয়া টোপী, ঝাঁসির লক্ষ্মীবাঈ, মাওলানা আহমদউল্লাহ এ সমস্ত সাধারণ মানুষের অসাধারণ পুত্র কন্যাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার উদ্দেশ্যে এ নতুন ভূমিকা রচনা করলাম। সামন্তবাদের জগদ্দল ঠেলে এ অসাধারণ মানুষ মানুষীরা যদি যথার্থ ভূমিকায় অভিনয় করতে পারতেন তাহলে এই যুদ্ধের ইতিহাস ভিন্নভাবে লিখিত হতো।

আমার বন্ধু উবিনীগ প্রধান কবি ফরহাদ মজহার আমার গ্রন্থের এ সংস্করণটি প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছেন, তারিফ করে তাঁকে বেকায়দায় ফেলা উচিত হবে না।

বিনীত
আহমদ ছফা
১২/১ ময়মনসিংহ রোড
ঢাকা ১০০০
১-২-৯৬

সূচীপত্র

এক. বিদ্রোহের কারণ
দুই. ঘটনা পরম্পরা
তিন. এই সে দিল্লী–এই সে নগরী
চার. কানপুর ও ধাবমান দাবানল
পাঁচ. অযোধ্যা : গজল কাননের অগ্নি-গোধুলি
ছয়. বিহার ও ওহাবী-সিপাহী যুগল সম্মিলন
সাত. ‘মেরে ঝাঁসী নেহী দেওঙ্গী’
আট. অবনমিত রোহিলা ঝাণ্ডা

১. বিদ্রোহের কারণ-বীজ

১৮৫৭ সালে সমগ্র হিন্দুস্থানের সেপাইরা বিদেশী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে মেতে উঠেছিল। এর কারণ কি?

এই সেপাইদের তপ্ত রক্ত বিসর্জনেই তো কলকাতা থেকে পেশোয়র পর্যন্ত কোম্পানীর রাজত্ব বিস্তৃত হয়েছে। এই সেপাইরাই তো ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে একের পর এক রাজ্য জয় করে, আসমুদ্র হিমাচলব্যাপী বিরাট ভূখণ্ডের অধীশ্বর করেছে বেনিয়া ব্রিটিশ কোম্পানীকে। হঠাৎ করে তারা এমন করে দাবানলের মত ক্ষেপে উঠলো কেনো? কোন সে কারণ, যা ইংরেজভক্ত সেপাইদেরকে এমন ব্যাপক প্রচণ্ড বিদ্রোহে উদ্দীপিত করেছিলো।

একবাক্যে সকলেই বলবেন, চর্বি মাখানো টোটার প্রবর্তনই বিদ্রোহের সাক্ষাৎ এবং প্রত্যক্ষ কারণ। তাতো বটেই। কিন্তু এতো বড় একটি বিদ্রোহ যা দমন করতে ইংরেজের মতো একটি বিরাট শক্তিকেও এতো হিমশিম খেতে হয়েছে শুধুমাত্র টোটার মতো সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে অমন বিরাট একটি বিদ্রোহ তো সংঘটিত হওয়ার কথা নয়।

এই বিদ্রোহের পেছনে সংগুপ্ত ছিলো আরো অনেক কারণ। সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে গোপনে গোপনে শক্তি সঞ্চয় করে আসছিলো। অবশেষে অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ালো যে, সেপাইরা কোম্পানী রাজের উপর বিশ্বাসের রেশটুকুও হারাতে বাধ্য হলো। তারা নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করতে লাগলো। এতোদিন ধরে বৃথাই আমরা রক্ত ঢেলেছি, বৃথাই ইংরেজ রাজ্য বিস্তারের জন্য মরণপণ সংগ্রাম করেছি। বিনিময়ে আমাদের কি দিয়েছে ইংরেজ? তারা আমাদের দেশের দেশীয় রাজ্যগুলো একের পর এক গ্রাস করে চলেছে। রাজন্যবর্গের সম্মান ধরে টান দিয়েছে। সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশার সীমা নেই। চৌকিদারির ট্যাক্স চার পাঁচ গুণ বৃদ্ধি করেছে। আগে বাদশাহী আমলে খাজনার দাবি যেখানে ছিল দু’শ টাকা ইংরেজ আমলে তা তিনশ করা হয়েছে। চার’শ টাকা খাজনার স্থলে পাঁচ’শ ধার্য করা হয়েছে। তারপরেও তো কোম্পানী বাহাদুরের খাই মেটে না। তারা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় কাজের তালাশে গমনকারী লোকদের ওপর মাথাপিছু ছ’পয়সা করে কর ধার্য করলো। জেলায় সীমানা অতিক্রম করার সময় প্রতিটি গরুর গাড়ি পিছু চার থেকে ছ’আনা কর দিতে হতো ব্যবসায়ীদের। পুরনো সম্ভান্তশ্রেণীর লোকদের আয় একেবারে কমে এলো। এতেই শেষ নয়, কোম্পানীর লোকেরা তাদেরকে দিয়ে চর্বি মেশানো টোটা ব্যবহার করিয়ে পিতৃপুরুষের ধর্ম নাশ করতে চায়। পেটের দায়ে কোম্পানী বাহাদুরের চাকুরি করে বটে কিন্তু ধর্ম তো তাদের প্রাণের চেয়ে কম প্রিয় নয়। বিদেশী শাসকগোষ্ঠির কোন নির্দেশেই তারা ধর্মীয় অনুশাসনের সামান্য খেলাপ করেও পরকাল ঝরঝরে করতে প্রস্তুত নয়। এমন কি প্রাণ গেলেও না। এ ব্যাপারে দিল্লীর সম্রাট লখনৌর ওয়ালী এবং পেশোবার উওরাধিকারীরা তাদের সঙ্গে একমত।

ইংরেজরা কিন্তু সেপাইদেরকে আহত করতে চায়নি। তলোয়ার এবং কূটকৌশলের বলেই ইংরেজ কোম্পানী হিন্দুস্থানের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে পাকাঁপোক্ত হয়ে বসেছে। কিন্তু তারা এটাও জানতো যে শুধুমাত্র তলোয়ারের ওপর নির্ভর করে চিরকাল হিন্দুস্থান শাসন করা যাবে না। আবার তাদের বিশ্বাস, স্থির বিশ্বাস, জাত হিসেবে তারা হিন্দুস্থানীদের তুলনায় শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান-দর্শন এবং রাজ্যশাসন বিষয়ে অনেক উন্নততরো জাতি। প্রাচ্যের অশিক্ষিত সভ্যতা সংস্কৃতিহীন মানুষদের প্রতীচীর সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী করে তোলার অল্প বিস্তর ইচ্ছাও তাদের মধ্যে ছিলো। ইংরেজরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গী অনুসারে এদেশের জনসাধারণকে উন্নত করতে আগ্রহী ছিলো না এ কথাও সর্বাংশে সত্য নয়।

শাসক এবং শাসিতের দৃষ্টিভঙ্গী কিছুতেই এক হতে পারে না। এই দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্যের কারণে ইংরেজের ভালো কাজগুলোও এদেশবাসীর দৃষ্টিতে খারাপ ঠেকলো। ইংরেজকৃত সামাজিক সংস্কারগুলোকে এদেশের হিন্দু-মুসলমান তাদের খৃস্টানে পরিণত করার দুরভিসন্ধি মনে করলো।

আগের স্বৈরাচারী শাসনের স্থলে ইংরেজ এক ধরনের আইনের শাসন কায়েম করেছিলো। কিন্তু অবস্থার বৈগুণ্যে ইংরেজের সমস্ত ভালো কাজই বিষময় ফল প্রসব করলো।

ইংরেজরা ভুল করেছিলো। একটি ভিন্ন দেশের প্রায় অচেনা অধিবাসীদের সামাজিক রীতিনীতি এবং ধর্মীয় সংস্কারের প্রতি তাদের আত্যন্তিক আগ্রহ পরবর্তীকালে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সংস্কার করতে গিয়ে কোনটা প্রয়োজনীয়, কোনটা অপ্রয়োজনীয় অতোটুকু বাছবিচার করার সময় ইংরেজদের ছিলো না। তাতে করে হিন্দুস্থানের জনসাধারণের মধ্যে ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের অনলই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে।

১৮০৬ সালে স্যার জর্জ বার্লো নামে এক নিরীহ ভদ্রলোক ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ভারতের গভর্ণর জেনারেল। সে সময়েই সেপাইদের মধ্যে সর্বপ্রথম ধর্মীয় বিক্ষোভের সূচনা। তখন তিনটা প্রেসিডেন্সীর প্রত্যেকটিই সামরিক দিক দিয়ে স্বাধীন ছিলো। মাদ্রাজের ইংরেজ অফিসারদের মাথায় একটা নতুন ভাবনা এলো-সেপাইদের শুধু কাজে চটপটে হলে তো চলবে না, দেখতেও তাদের চটপটে হতে হবে। বাস হুকুম জারি হয়ে হয়ে গেলো। হিন্দু সেপাইরা কপালের গোত্রচিহ্ন মুছে ফেলো, মুসলমান সেপাইরা লম্বা দাড়ি কেটে ফেলো। আর গোঁফ রাখতে চাও তো তাহলে কেটেছেটে ছুঁচোলো করে রাখো। ইংরেজ কর্তারা দাড়ি, গোঁফ, তিলক সংস্কারের নির্দেশ দিয়ে ক্ষান্ত হলেন না। বলা হলো, কাপড়ের পাগড়ী বদলে পরতে হবে চর্মনির্মিত মস্তকাবরণ। তাতে থাকবে একটি থোবা। তবেই তো দেখাবে সেপাইর মতো।

আজকের দিনের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে দেখলে এসব সংস্কারকে কিছুই মনে হবে না। কিন্তু আজ থেকে একশো পঞ্চাশ বছর আগে এদেশের হিন্দু মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গী ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা। সেপাইদের মনে ইংরেজদের প্রতি বিদ্বেষ ফেনিয়ে উঠলো। বিদেশী ইংরেজ তাদের চালচলন রীতিনীতি সবকিছু এদেশের হিন্দু-মুসলমানের কাছে ছিলো দুর্বোধ্য। মুসলমানদের দাড়ি রাখা ধর্মীয় কর্তব্য। হিন্দুদের কাছে কপালে গোত্রচিহ্ন ধারণ করাও কম পবিত্র নয়। তদুপরি কাপড়ের পাগড়ীর বদলে চর্মনির্মিত মস্তকাবরণ পরিধান করা। সে চামড়া গরুর কি শূয়রের কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। তার চাইতে হীন কাজ আর পৃথিবীতে নেই। ও যদি মাথায় একবার পরে, তাহলে ধর্ম হারাবে, জাত হারাবে, পরকাল হারাবে। আত্মীয়স্বজনেরা কেউ সমাজে গ্রহণ করবে না। একি আপদ! এর চেয়ে বরং মরণ অধিক শ্রেয়।

ইংরেজেরা শাসক গোষ্ঠি। এসব ভাবনা তারা ভাববে কেননা । নির্দেশ মাত্রই নির্দেশ। দাড়ি রাখলে ভালো দেখায় না, দাড়ি কেটে ফেলো, গোত্র-তিলক মুছে ফেলো। এমন ভালো কাজটা করতে যে কেননা আপত্তি করবে, ইংরেজ অফিসারেরা এ কথা চিন্তা করতে পারে না।

এদিকে সেপাইরা মনে করলো শাসকদের মনে নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ দূরভিসন্ধি আছে। আজ বলছে দাড়ি কেটে ফেলো, পাগড়ীর বদলে চামড়ার টুপী পরো। কাল বলবে খ্রীস্টনাম জপ করো। পরশুদিন বলবে তোমার বাপ-দাদা সকলে পাপী… তুমি প্রভু যীশুর মতে দীক্ষা নিয়ে পরিত্রাণ প্রার্থনা করো। যুদ্ধ করা সেপাইদের পেশা। তারা তেজারতি করে না, চাষবাস করে না, আর কোনো হুনুর হেকমত জানে না। যুদ্ধই তাদের চাষবাস, যুদ্ধই তাদের তেজারতি। যুদ্ধ করা সম্মানজনক পেশা… তাতে আয়ও হয় মন্দ না। মনিবের হুকুম মানতে তারা প্রস্তুত। এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় বদলী করুক, তারা যেতে রাজী আছে। কিন্তু উপর অলার আদেশে পিতৃপুরুষের ধর্মের অবমাননা তারা কখনো করতে পারবে না। এমন কি প্রাণ গেলেও না। এদেশীয় কানুন মতে তারা নিমক হালাল হলেই হলো! তারা কখনও নিমক হারামি করেনি। তারপরেও তাদের পিতৃপুরুষের ধর্মের ওপর হামলা করার অর্থ তাদের অজু, নামাজ, সন্ধ্যা আহ্নিককে অবজ্ঞা করতে পারে। এনিয়ে তারা ঠাট্টা–বিদ্রূপও করতে পারে। কিন্তু এগুলো তাদের কাছে মুক্তির উপায়। ধর্ম বিশ্বাসে অটল থাকলেই সহযোদ্ধার শ্রদ্ধা আকর্ষণ করতে পারে। একজন নিষ্ঠাবান হিন্দু একজন মুসলমানকে শ্রদ্ধা করে। আপন ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাহীন লোককে অন্য ধর্মের মানুষও ঘৃণার চোখে দেখে। চামড়ার মস্তকাবরণ পরলে তাদের জাত যাবে, ধর্ম নষ্ট হবে, আত্মীয়স্বজনের চোখে পতিত হবে, চৌদ্দ পুরুষের মুক্তির উপায় থাকবে না। সুতরাং তারা তা পারবে না। কঠোর পণ! কঠিন প্রতিজ্ঞা। দুনিয়ার কোনো শক্তি তাদেরকে চামড়ার মস্তকাবরণ পরতে বাধ্য করতে পারবে না। বেলুড়ে চর্বি মাখানো টোটার প্রবর্তন নিয়ে সহস্র শিখায় মহাবিদ্রোহের যে আগুন জ্বলে উঠেছিলো, পঞ্চাশ বছর আগে চামড়ার মস্তকাবরণ প্রবর্তনের প্রতিবাদে তার প্রথম ফুলকি জাগে।

সেপাইদের অসন্তোষ দেখে ইংরেজ অফিসারেরা বিস্মিত হয়েছিলেন। হ্যাঁ, তাঁদের বিস্মিত হওয়ার কথাই বটে। সেপাইরাও মানুষ, তাদেরও মন আছে। সে মনে আছে ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি অটুট শ্রদ্ধা! সেপাইদের মনের খোঁজ যারা রাখে না তাদের বিস্মিত হওয়া ছাড়া আর কীই-বা করার আছে। কিন্তু মাথা খারাপ করেনি। সামরিক ঘাঁটির অধ্যক্ষ অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে বিক্ষোভ এবং অসন্তোষ দমন করলেন। বিদ্রোহীদের কঠোর দণ্ডদান করলেন। খবর কিন্তু চেপে রাখতে পারলেন না, দাবানলের মতো অন্য তিনটি কেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়লো। সেপাইরা

অতি সহজে পিতৃপুরুষের ধর্মের প্রতি এ অপমান হজম করতে পারলো না। অন্য তিনটি প্রেসিডেন্সীর সেপাইদের মনে প্রতিশোধের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে। অবশেষে ইংরেজরা তাদের ভুল বুঝতে পারলো। এ প্রথা রহিত করা হলো। সেপাইদের ধর্মীয় ব্যাপারে ইংরেজরা কোনো রকম হস্তক্ষেপ করবে না এ মর্মে গভর্ণরের নির্দেশ প্রচারিত হলো। তখন বেলুড়ের দুর্গে টিপু সুলতানের ছেলেরা নজরবন্দী অবস্থায় ইংরেজদের প্রদত্ত বৃত্তি ভোগ করে অবস্থান করছিলেন। ইংরেজদের অনেকেই বেলুড়ের সেপাইদের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহকে রাজনৈতিক রঙ দেবার চেষ্টা করেছে। বিদ্রোহের সঙ্গে টিপু সুলতানের ছেলেদের কোনো যোগাযোগ ছিলো না। সেপাইদের সম্বন্ধে ইংরেজদের অজ্ঞতার কারণেই বেলুড় বিদ্রোহের সূত্রপাত। সরকারের অভিপ্রায়ের প্রতি সেপাইরা সন্দিহান হয়ে না উঠলে কোনো রাজনৈতিক প্ররোচনাই সেপাইদেরকে বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করতে পারতো না।

বেলুড় বিদ্রোহের আঠারো বছরও অতীত হয়নি। ইংরেজদের প্রতি সেপাইদের আনুগত্য আবার এক মহাপরীক্ষার সম্মুখীন হলো। ভারতের পূর্বৰ্তম সীমান্তে আসাম। আসামের সঙ্গে ব্রহ্মদেশকে সংযুক্ত করা হয়েছে। দুর্যোগ ঘনিয়ে আসছিলো। ১৮২৪ সালে শুরু হয় যুদ্ধ। সেপাইদের ব্রহ্মদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলো। আসামের ওপর দিয়ে ব্রহ্মদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যুদ্ধ করতে তাদের আপত্তি ছিলো না। ভারতবর্ষীয়, সুপ্রাচীন হিন্দু প্রথা অনুসারে কালাপানি অতিক্রম করা হিন্দুদের পক্ষে মহাপাপ। তাই বাঙালি পল্টন আপত্তি তুললো। কিন্তু বাঙালি পল্টনকে যেতে হলো না। মাদ্রাজী সেপাইরা কোনো রকমের হাঙ্গামা হুজ্জত ছাড়াই কালাপানি পেরিয়ে যুদ্ধ করতে রেঙ্গুন যাত্রা করলো। বাঙালি পল্টনের ওপর নির্দেশ দেয়া হলো স্থলপথে মার্চ করে চট্টগ্রামের উপর দিয়ে ব্রহ্মদেশের স্থল সীমান্তে গিয়ে জড়ো হতে। কিন্তু সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করেও সেপাইদের জন্য যানবাহন সংগ্রহ করতে পারলো না। ৪৭ নং রেজিমেন্টের সেপাইদের ব্যারাকপুর ছাউনি থেকে মার্চ করতে আদেশ দেয়া হলো। বলা হলো তাদেরকে আপন আপন মালপত্র বহন করার জন্য বলদ এবং গরুর গাড়ি যোগাড় করে নিতে। সেপাইরা হতাশ হয়ে পড়লো। সরকার যেখানে যথাসাধ্য চেষ্টা করে বিফল হয়েছে সেখানে তারা কেমন করে বলদ এবং গরুর গাড়ি যোগাড় করবে? সামান্য সেপাইদের শক্তি কতদূর? তাদের কাছে এ সরকারি নির্দেশ অন্যায্য মনে হলো। এ সময়ে গুজব ছড়িয়ে পড়লো, একবার যদি চট্টগ্রাম গিয়ে পৌঁছে তারা পছন্দ করুক আর না করুক, তাদেরকে শেষ পর্যন্ত যাত্রা করতেই হবে। তারা একজন অফিসারকে দায়িত্ব নেয়ার প্রতিশ্রুতির জন্য আবেদন করলো। কোনো রকম প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত তারা ছাউনি ত্যাগ করলো না। ফিরতি পথে রামুতে এ গুজব শুনবার পর সেপাইদের মধ্যে কি রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো, জানবার উপায় নেই। যাহোক, সেপাইরা তাদের জাত, কুল, ধর্মনাশের ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়লো। এ সময়ে সর্বাধিনায়ক ছিলেন স্যার এডওয়ার্ড প্যাজেট। তিনি ছিলেন কঠোর মানুষ। সেপাইদের মধ্যে শৃঙ্খলার সামান্য হেরফেরও তিনি বরদাশত করতে পারতেন না। তা ছাড়া কোনো সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা প্রশ্রয় দেয়া যায় না। যুদ্ধের সময়ে তা আরো কঠোরতার সঙ্গে দমন করা হয়। স্যার এডওয়ার্ড এ দেশীয় সেপাইদের কুসংস্কারের প্রতি ছিলেন খড়গহস্ত। অল্পসংখ্যক ইউরোপীয় সৈন্য নিয়ে তিনি ব্যারাকপুর যাত্রা করলেন। সেপাইদের তাদের অপরাধের জন্য তীব্র ভাষায় তিরস্কার করলেন। তাদের হয়তো মার্চ করতে অথবা অস্ত্র সংবরণ করতে আদেশ দিলেন। সেপাইদের কোনো অযৌক্তিক অনুরোধ এ ইংরেজ সন্তানটি কানে তুলতে রাজী ছিলেন না। কিন্তু সৈন্যরা গালাগালি সহ্য করেও শৃঙ্খলার উর্ধ্বে ধর্মকে স্থান দিয়ে ছাউনির ভেতর রয়ে গেলো। তাদের পক্ষে যুক্তি হলো, ধর্মবিশ্বাসে আঘাত আসতে পারে এমন কোনো অভিযানে অংশগ্রহণ করতে তারা চুক্তিবদ্ধ নয়। তারা মনে করলো, সর্বাধিনায়কের আদেশ না মেনে তারা একটুকুও অন্যায় করছে না। তাই বলে কোনো সশস্ত্র বাধাও দেয়নি। আদেশ অমান্যকারী সেপাইদের শাস্তি দেয়ার জন্য বদ্ধপরিকর স্যার প্যাজেটের আদেশে এ হতভাগাদের নিষ্ঠুরভাবে গুলী করে হত্যা করা হলো। অনেকে আতঙ্কে পালিয়ে গেলো। এখানেই শেষ নয়। দলপতিকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হলো। ৭নং রেজিমেন্টের নাম সম্পূর্ণভাবে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হলো। এভাবে ব্রিটিশ শাসকেরা ব্যারাকপুরে এদেশীয় সেপাইদের ধর্মীয় অনুভূতিকে আহত করার আরেকটা নজীর স্থাপন করলো।

এর পাঁচ বছর পরে হিন্দু সেপাইদের মধ্যে গোঁড়া কুসংস্কারাচ্ছন্ন সম্প্রদায় সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার মধ্যে ব্রিটিশের ধর্মবিরোধী ভূমিকা আবিষ্কার করলো। সমস্ত মানবিক নীতি বহির্ভূত এ প্রথাটি অনেকদিন আগেই রহিত করার প্রয়োজন ছিলো, এ কথা কে অস্বীকার করবে? প্রথম দিকে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এদেশীয় হিন্দু মুসলমানের ধর্মীয় ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকার কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিলো। কারণ তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। এমনকি কোম্পানীর রাজ্যসীমার মধ্যে খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারকদের প্রবেশও নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো। তাই বলে, কোনো সুসভ্য শাসন ব্যবস্থা কি এ প্রথা রহিত না করে পারে? বোর্ডের পরিচালকেরা ধর্মের নামে এভাবে জীবন্ত মানুষ দগ্ধ করার প্রথা বন্ধ করার জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। লর্ড আমহার্স্ট ঠিকই ধরেছিলেন, যে কোনো সংস্কার তা যতোই প্রয়োজনীয় হোক না কেন, তার ফলে অসন্তোষের সৃষ্টি হতে পারে। তাই সতীদাহ প্রথা রহিত করতে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কই এ অমানবিক প্রথা বন্ধ করার সবটুকু কৃতিত্বের যোগ্য দাবিদার। তিনি সাহস করে এগিয়ে এসেছিলেন বলেই এ প্রথা বন্ধ হয়েছিলো। লর্ড বেন্টিঙ্ক সতীদাহকে প্রাণদণ্ডনীয় অপরাধ বলে আইন করে দিলেন। তিনি দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখের সক্রিয় সমর্থন পেয়েছিলেন। তারা সংখ্যায় অত্যন্ত স্বল্প। ধর্মোন্মত্ত মানুষেরা এর পেছনে শাস্ত্রের সমর্থন রয়েছে বলে এ আইনের বিরুদ্ধে প্রচার কাজ চালাতে থাকে। ইংরেজের এ প্রশংসনীয় সংস্কারটিকেও পরবর্তীকালের বিদ্রোহী নেতারা মূলধন করেছিলো। খান বাহাদুর খান তাঁর এক ফরমানে বলেছেন, হিন্দু কুলবধূদের মৃত স্বামীর সঙ্গে একই চিতায় সহমরণে গমন করা একটি সুপ্রাচীন ধর্মীয় প্রথা। ইংরেজরা তা রহিত করে নিজেদের আইন জারী করেছে। সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার ফলে হিন্দু প্রজাদের মধ্যে শুধু অসন্তোষের সৃষ্টি হয়নি, মুসলমানেরাও সমানভাবে বিক্ষুব্ধ হয়েছে। আজকে হিন্দুর ধর্মে আঘাত করেছে। আগামীকাল মুসলমানের ধর্মেও আঘাত করতে পারে।

রাত্রে (Rattray) র শিখ সেপাইদলের সুবাদার সর্দার বাহাদুর হেদায়েত আলীর কথাতেই তার সমর্থন পাওয়া যাবে। তিনি ছিলেন রাজভক্ত সেপাই। তার বাবা এবং বাবার বাবাও সেপাই হিসেবে পল্টনে জীবন কাটিয়েছিলেন। সুতরাং তাঁর রাজভক্তি যে সকল রকমের সন্দেহের অতীত এ রকম বিশ্বাস করার সঙ্গত কারণ রয়েছে। সরকারের কাছে তিনি বাঙালি পল্টন এবং বাংলা প্রেসিডেন্সীতে সৈন্যদলের মধ্যে অসন্তোষ, বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহের কারণ নির্দেশ করেছেন অল্প কথায়। এর জন্য তিনি আফগান যুদ্ধকেই দায়ী করেছেন। আইনানুগ পদ্ধতিতে সেপাইরা কাবুল যেতে অস্বীকার করতে পারলো না। অথচ তাদেরকে ভারতের বাইরে যেতে হচ্ছে, সেখানে গেলে তাদের জাতকুল রক্ষা হবে কিনা সে কথা ভেবে শঙ্কিত হয়ে উঠলো। কাবুলে হিন্দু সেপাইরা নিয়মিত সন্ধ্যা আহ্নিক এবং স্নান ইত্যাদি করতে পারতো না। দু’বেলা মুসলমানদের দোকান থেকে খাদ্যবস্তু ক্রয় করতে হতো। ভারতে তা ছিলো রীতিবিরুদ্ধ। কাবুলের যুদ্ধে অনেক সেপাই বন্দী হলো এবং জোর করে তাদেরকে মুসলমান বানানো হলো। দেশে ফিরে এসে দেখে তারা জাতিচ্যুত হয়ে গেছে। স্ব সমাজের কোথাও আর তাদের স্থান নেই। অজ্ঞ গ্রামবাসীরা তাদের সঙ্গে এক সাথে বসে তামাক খেতে পর্যন্ত রাজী ছিলো না। শুধু গ্রামবাসী নয়, সেপাই ভাইরাও কেউও তাদের সঙ্গে আহার করতে রাজী হলো না। মুসলমানদের ওসব সংস্কারের বালাই নেই। কিন্তু আপন ধর্মের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে স্বভাবতঃই তাদের প্রবৃত্তি ছিলো না। হেদায়েত আলী বলেছেন, মুসলমান সেপাই পল্টনে গর্ব করে বেড়াতে কিভাবে ইংরেজের আদেশ অবহেলা করে বন্দুক ছোঁড়া থেকে বিরত ছিলো।

সীতারাম নামে এক হিন্দু সুবাদারকে চরম লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়। তার চাচা ছিলেন জমাদার। সীতারামের নিজের ছেলেও পল্টনে সেপাইর চাকুরি করতো। বিদ্রোহের সময় ছেলে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়। কিন্তু সীতারাম নিমক হারামি করতে পারেনি। বিদ্রোহ দমন করার পর তার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করার আদেশ দেয়া হয়। আপন সন্তানকে বধ্যভূমিতে গুলি করে হত্যা করার ভার পড়ে সীতারামের উপর। পরে অবশ্য এক দয়ালু অফিসার এ অমানবিক কর্তব্য থেকে তাকে রেহাই দেন।

সীতারাম আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর হিন্দু সহকর্মীদের মনোভাব সম্বন্ধে যা লিখে রেখে গেছেন, তা অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য। তিনি লিখেছেন, সেপাইদের মধ্যে আফগানিস্তান গমন করার প্রশ্নে প্রচণ্ড আতঙ্কের সঞ্চার হয়। সিন্ধু নদ অতিক্রম করার কথা শুনে তারা অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে উঠে। এমনকি গুজব উঠলো যে, কাবুলে সরকারের সৈন্যরা গো-হারা হারবে। আবার কেউ কেউ বলতে লাগলো ইংরেজরা কাবুল দখল করে নেবে। সে যাকগে, সিন্ধু নদ অতিক্রম করার কথা শুনে সেপাইরা ভীত হয়ে পড়লো। তাহলে তাদেরকে ভারতের বাইরে যেতে হবে এবং তার ফলে তারা জাতিচ্যুত হবে। এ কারণে সেপাইদের অনেকেই চাকুরি ছেড়ে দিলো, অনেককেই বরখাস্ত করা হলো। দুস্তর মরুভূমি পাড়ি দিয়ে তাদের যাত্রা করতে হলো। কান্দাহার গিরিপথের পাশে এক পাপপূর্ণ দেশে তাদের অবস্থান করতে হলো। সেখানে তারা নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে লাগলো। একজন মারা গেলে দাহ করার জন্য কোনা জ্বালানী কাঠ পাওয়া গেলো না এবং ভাসিয়ে দেবার মতো পবিত্র গঙ্গাও সেখানে নেই। কাশীও অনেক দূরে। হিন্দু সেপাইদের দুর্দশার সীমা রইলো না। মৃতদেহ শৃগাল এবং গৃধিনীদের ভক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলো।

কাবুল যুদ্ধে পরাজয়ের পর হতভাগা সীতারাম শত্রু কর্তৃক বন্দী হলো এবং দাসরূপে তাকে বিক্রয় করা হলো। ইংরেজদের কাবুল পরিত্যাগ করার বহুদিন পরে সীতারাম এক ব্যবসায়ীকে পাঁচশ টাকা দিয়ে তার সাহায্যে পালিয়ে এসেছিলেন। তখনকার দিনে পাঁচশ টাকা কম টাকা নয়। ফিরোজপুরের কমিশনার এ টাকার অর্ধেক দিয়েছিলেন, বাকী অর্ধেক স্টেশনের এক পুরোনো পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে সে গ্রহণ করেছিলো। সেপাইদের কাছে ফিরে এসে সীতারাম যখন আত্মপরিচয় দান করলো তখন সেপাইদের সকলে একবাক্যে সীতারামকে অশুচি অপবিত্র এবং মুসলমান বলে ঘোষণা করলো। প্রায়শ্চিত্ত না করা পর্যন্ত সীতারামকে ব্রাহ্মণেরা অস্পৃশ্য বলে জানিয়ে দিলো এবং খ্রীস্টান ড্রামবাদক ছাড়া অন্য কোনো হিন্দুর সঙ্গে মেলামেশার অধিকার সীতারামের নেই। ইংরেজ অফিসারেরা সীতারামের এ হেনস্থার কথা জানতেন। তারা তার উপর যথেষ্ট সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন। তাহলে কি হবে, জাত ফিরে পেতে যতো টাকার প্রয়োজন, তখন সীতারামের হাতে ততো টাকা ছিলো না। সেপাইদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার পরেও কিন্তু সীতারামের দুর্দশার শেষ হলো না। গ্রামে সীতারামের জন্য আরো অপমান অপেক্ষা করছিলো। সে যে আফগানিস্তানে দাস হিসেবে জীবনযাপন করেছে এ খবর বাতাসের বেগে সীতারামের গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো। তাকে পিতৃগৃহে থাকতে দেয়া হলো না। আপন ভাই তার শত্রু হয়ে দাঁড়ালো। তার বাবা জাতে তুলবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন এবং তাকে সেপাইয়ের পেশা ছেড়ে দিতে জোর করতে থাকেন। নিজের স্ত্রী এবং পুত্রের কারণে সীতারাম বাবার প্রস্তাবে রাজী হতে পারেনি।

আফগান যুদ্ধের ফলে সেপাইদের শিক্ষা হলো, বিদেশে অভিযানে গমন করলে তাদের গৌরব তো বাড়ে না, বরঞ্চ স্বার্থ এবং সম্মানের যে ক্ষতি হয় তা পূরণ করা তাদের সাধ্যের সম্পূর্ণ বাইরে। ব্রহ্মদেশে যুদ্ধ করতে সেপাইদের বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। বিজয়েই সে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু বিদেশে গোলামী এবং স্বদেশে অস্পৃশ্য হওয়ার যে ক্ষতি তা পূরণ করার জন্য ইংরেজ অফিসারদের সহানুভূতিই যথেষ্ট নয়। এতোকাল ব্রিটিশ সেনাপতিরা অজেয় বলে যে ধারণা পোষণ করে আসছিলো ভারত এবং নেপালের যুদ্ধে এশীয় সেনাপতি কর্তৃক পরিচালিত এশীয় বাহিনীর হাতে তাদের পর্যদস্ত অবস্থা সেনাপতিদের প্রতি পূর্বের সে অটল বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়ে দিলো।

১৮৩৯ সালে শাসকদের তাদের নিজেদের ধর্মের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ভারতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যাই হোক না কেন, তারা অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে এ পবিত্র দায়িত্ব পালন করতেন। আওরঙ্গজেবকেও হিন্দুদের সামাজিক বিরোধে রায় দিতে দেখা গেছে। হিন্দু পেশবা একজন রোমান ক্যাথলিক যাজকের অধিকার স্বীকার করে নিয়েছেন। এ সুপ্রাচীন প্রথা অনুসারে মন্দির এবং অন্যান্য ধর্ম স্থানসমূহের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এসে পড়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর উপর। এমনকি পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরের দায়িত্ব প্রত্যক্ষভাবে কোম্পানীর ওপর অর্পিত হয়। স্বদেশে খ্রীস্টান মতামত কোম্পানীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠলো এবং কোম্পানী মূর্তিপূজার পৃষ্ঠপোষকতা করছে বলে গোঁড়া খ্রীস্টান মহলে অভিযোগ উঠতে থাকলো। বস্তুতঃ কোম্পানী মন্দির ইত্যাদি ধর্মস্থান থেকে প্রচুর অর্থ আয় করছিলো। দর্শনার্থীদের প্রদত্ত অল্প টাকাই মন্দির সংস্কারের জন্য ব্যয় করতে হতো তাদের। কিন্তু ধর্মীয় ন্যায়-নীতির সঙ্গে পার্থিব লাভ-লোকসানের কোন সম্বন্ধ নেই। ভারতে হিন্দু-মুসলমান ধর্ম স্থানসমূহের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পরিত্যাগ করার জন্য কোম্পানীর সরকারের ওপর ব্রিটেন হতে চাপ আসতে থাকে। এতোকাল ধরে ইংরেজরা যে ধর্মীয় নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আসছিলো হঠাৎ সে মনোভাবের পরিবর্তন দেখা গেলো। ইউরোপ থেকে খ্রীস্টধর্ম প্রচারকের আগমন ঘটতে থাকে। হাট, ঘাট, বন্দর, জেল, হাসপাতাল, স্কুল সর্বত্রই খ্রীস্টধর্ম প্রচারের ভিড় লেগে গেলো।

বাজারে বাজারে খ্রীস্টধর্মের প্রচারকেরা বড়োই উৎপাত শুরু করে দিলো। তাদের নিজেদের ধর্মের গুণ-গান প্রচার তারা তো করলেই সে সঙ্গে এদেশের অধিবাসীদের সামাজিক রীতিনীতি ইত্যাদিকে জঘন্য ভাষায় বিদ্রূপ করা তাদের ধর্ম প্রচারের একটি অঙ্গ হয়ে দাঁড়ালো। মুর্তিপূজক হিন্দু এবং একেশ্বরবাদী মুসলমান উভয় ধর্মের প্রতি সমান তাদের আক্রোশ এবং যীশুখ্রীস্ট যে একমাত্র প্রেরিত পুরুষ তাই জোরগলায় প্রচার করতে লাগলো। বিক্ষুব্ধ জনসাধারণ খ্রীস্টান প্রচারক এবং খ্রীস্টান শাসকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পেলো না। এর কারণ, অনেক সময় সঙ্গে পুলিশ নিয়ে খ্রীস্টান প্রচারকেরা ধর্ম প্রচার করতে যেতো।

স্যার সৈয়দ আহমদের ভাষায়, জনসাধারণ বিশ্বাস করতে লাগলো, সরকার ধর্ম প্রচারকদের মাইনে দিয়ে নিয়োগ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, জনসাধারণ যখন মন্দিরে, মসজিদে অথবা বাসগৃহে কোনো ধর্মানুষ্ঠানের আয়োজন করতো সেখানে খ্রীস্টান প্রচারকেরা গিয়ে অত্যন্ত আপত্তিজনক ভাষায় তাদের ধর্মের নিন্দা করতো। সেপাইরাও জানতো যে সেনাবাহিনীর প্রধান পুরোহিতেরা সরকারের কাছ থেকে মাইনে পেয়ে থাকে। সেনাবাহিনীর প্রধান পুরোহিতকে বলা হতো পাদরী লাট।

খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারকেরা শিক্ষক হিসেবে সুযোগ্য। তাদের শিক্ষাদান শুধু ছাত্রদের মন উন্নত করার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রইলো না, তারা ছাত্রদের আত্মা শুদ্ধ করার জন্যও উঠে-পড়ে লেগে গেলো। এর ফলে জনগণের মধ্যে উদ্বেগের সঞ্চার হলো। তারা প্রচার করতে লাগলো-খ্রস্টধর্মই হলো সত্যের একমাত্র পন্থা। শিক্ষিত হিন্দুরা সহিষ্ণু মনোভাব নিয়ে বিচার করতে লাগলো সব ধর্মই ভগবানের কাছে পৌঁছার পথ। কিন্তু মুসলমানেরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, একমাত্র ইসলামই সর্বশেষ সত্য ধর্ম। অপরপক্ষে, অধিকাংশ হিন্দু যারা অশিক্ষিত বিশ্বাস করে যে, সনাতন আচার-অনুষ্ঠান থেকে একটু নড়চড় হলেই তারা ধর্ম থেকে পতিত হবে। সুতরাং এদেশীয় ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে খ্রীস্টান ধর্ম বিশ্বাসের সংঘর্ষ চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হলো। ভারতীয়েরা মনে করতে লাগলো অন্যায্যভাবে খ্রীস্টধর্ম তাদের পিতৃপুরুষের ধর্মের ওপর আঘাত হানছে। অনেক সময় সরকার প্রকাশ্যে তাতে সহায়তা দান করছে। খ্রীস্টধর্ম প্রচারের আদর্শে অনুপ্রানিত কতিপয় সরকারি এবং সামরিক অফিসার ভাবতে লাগলেন এ ধর্মহীন ভারতীয়দের তারা যদি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সত্য ধর্মের আলোকে দীক্ষিত না করে, তাহলে স্বর্গপ্রাপ্তির মহামূল্য সুযোগ হেলায় হারিয়ে ফেলবেন। আবার অনেকের মনের ধারণা শাসক এবং শাসিতের মধ্যে যে ব্যবধান রয়ে গেছে, দেশীয় অধিবাসীদের খ্রীস্টধর্মে দীক্ষিত করতে পারলেই সে ফাঁক ভরাট হয়ে যাবে। খ্রীস্টান প্রচারকদের পরিচালিত বিদ্যালয়সমূহে তো বটেই অধিকন্তু কতিপয় সরকারি বিদ্যালয়েও বাইবেল শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলো। হেনরী কেয়ারটুকার নামে একজন প্রচারক এ পদ্ধতির পুরোপুরি সমর্থক ছিলেন। তিনি কানপুরের অবৈতনিক বিদ্যালয় প্রসঙ্গে বলেছেন, বারানসীর জয়নারায়ণ অবৈতনিক বিদ্যালয় সরকারি হলেও পাদরীরা কড়াকড়িভাবে খ্রীষ্ট্রীয় পদ্ধতিতেই তার শিক্ষাদানের ভার গ্রহণ করেছে। স্যার সৈয়দ আহমদ বাইবেল পড়ানোর জন্য ততোটা আপত্তি করেননি, কিন্তু পড়ানোর ধরন সম্বন্ধে ভয়ানক আপত্তি তুলেছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, কোন কোন বিদ্যালয়ে ছাত্রদের জিজ্ঞেস করা হয় তোমাদের প্রভু কে এবং কে তোমাদের মুক্তিদাতা? ছাত্ররা শেখানো খ্রীস্টীয় পদ্ধতিতেই তার উত্তর দিয়ে থাকে। তার মতে, সামরিক পুরোহিত এবং সামরিক অফিসারেরা তাদের অধীনস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে ধর্ম বিষয়ে আলাপ করে তাদের প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করতো।”

খ্রীস্টধর্ম প্রচারকদের কর্মতৎপরতা শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। রেভারেণ্ড গোপীনাথ নন্দী নামে একজন বাঙালি যাজক ছিলেন ফতেহপুরে। সে সময়ে আর. টি. টুকার ছিলেন ফতেহপুরের জেলা শাসক। তিনি লিখেছেন, প্রত্যেক দিন জেলখানায় একজন খ্রীস্টান যাজক কয়েদিদের মধ্যে খ্রীস্টীয় নীতিমালা প্রচার করতেন এবং আমি প্রতি রবিবার সকাল বেলা তাদের মধ্যে সুসমাচার প্রচার করতাম। আমাদের ধর্মপ্রাণ মেজিস্ট্রেট এ সুবিধা করে দিয়েছেন। প্রশাসক, বিচারক এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মচারিদের সকলেই প্রচারকার্যে সক্রিয় সহযোগিতা দান করেছিলেন। তারা আমাদের প্রার্থনাসভা পরিচালনা, সদুপদেশ এবং আর্থিক সহায়তা দান করেছেন। এ দেশীয় দীক্ষিতদের সংখ্যা যখন বৃদ্ধি পেতে থাকলো, সম্মানীয় মি: কলভিনের পরামর্শে তাঁদের ছ’জনকে কৃষক গেরোস্তে পরিণত করা হলো। এভাবেই ফতেহপুরের জেলা শাসক কয়েদিদেরকে ধর্মান্তরিতকরণে সাহায্য করেছিলেন এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সহকারী গভর্ণর নিজে এ সকল নবদীক্ষিতদের বৈষয়িক উন্নতির প্রতি যত্নবান হয়ে উঠেছিলেন। সাধারণ মানুষের মনে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল হলো যে, সরকার প্রজাদের খ্রীস্টানে পরিণত করার মনোভাব গ্রহণ করেছেন।

১৮৪৫ সালে জেলে খাবার পদ্ধতি নিয়ে নতুন আইন প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বিশ্বাস তাদের মনে আরো পল্লবিত হয়ে উঠলো। ভারতীয় কারাগারে কতিপয় কয়েদিকে অন্য সকল কয়েদিদের পাঁচকরূপে নিয়োগ করা আজকের দিনের অতি সাধারণ পদ্ধতি। আগেকার দিনে কারাগারের কয়েদিরাও কড়াকড়িভাবে তাদের স্ব স্ব গোত্রের নিয়মকানুন পালন করতো। কয়েদিদেরকে আপন আপন খাবার পাক করতে দেয়া হতো। এ ব্যবস্থায় অসুবিধার অন্ত নেই। সেজন্য সকলের পাক করার জন্যে একজন ব্রাহ্মণকে নিয়োগ করা হলো। তার ফলে বর্ণ হিন্দুরা অত্যন্ত অপমানিত অনুভব করলো। ব্রাহ্মণদের মধ্যেও আবার বহু শ্ৰেণী গোত্র রয়েছে। একের ছোঁয়া অপরে খায় না। সরকার তাদেরকে ধীরে ধীরে খ্রীস্টানে পরিণত করতে চায়, এ বিশ্বাস তাদের মনে শিকড় প্রসারিত করতে লাগলো। জনগণের মধ্যে নয় শুধু সেনাবাহিনীতেও গুজব ছড়িয়ে পড়লো, সরকার সেখানেও সাধারণ মেস প্রথা চালু করবে। তার ফলে ১৮৪৫-৪৬ সালে পাটনা ষড়যন্ত্রের উদ্ভব হয়। তারপরেও কিন্তু কতিপয় কারাগারে নতুন ব্যবস্থা বলবৎ থাকে। জনমত ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলো, খান বাহাদুর খানের কথায় তার প্রমাণ মেলে। “তারা জোর করে কয়েদিদেরকে রুটি খাইয়ে তাদের ধর্মে দীক্ষিত হতে বাধ্য করে।”

গোপীনাথ নন্দী আরো বলেছেন, পাটওয়ারী অথবা গ্রামের হিসেব রক্ষকদের যখন দেবনগরী হরফে হিন্দী শিক্ষা করার প্রয়োজন দেখা দিলো, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তাদেরকে খ্রীস্টান যাজক পরিচালিত বিদ্যালয়ে যেতে হলো। মুসলমান সহকারী কালেক্টর হিকমত উল্লাহ খানের আপত্তি সত্ত্বেও তাদের শিক্ষা ভাষা কিংবা হরফের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। এ তিনশ বয়স্ক মানুষকে সুসমাচার পড়তে হলো, প্রার্থনাসভায় যোগ দিতে হলো। এবং বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য এক এক খণ্ড নতুন বাইবেল উপহার দেয়া হলো। যাজক কর্ণেল এবং পাদরী লেফটেন্যান্টের আদেশে সেপাইদের মধ্যে দেশীয় যাজকেরা খ্রস্টধর্ম প্রচার করতে থাকে। জেলা শাসকের অনুমতি নিয়ে কারাগারের কয়েদিদের কাছে পাদরীরা দৈনিক হাজির হতে লাগলো এবং পরিশেষে তিন’শ পাটওয়ারীর নতুন বাইবেল নিয়ে ঘরে ফেরা, দেশের জনসাধারণের মনোভাব সরকারের প্রতি পরিপূর্ণভাবে বিষিয়ে তুলেছিলো।

তারপরে ১৮৫০ সালের নতুন উত্তরাধিকারী আইন তাদের বিদ্বেষ বাড়িয়ে। তুললো। প্রকৃত প্রস্তাবে এই আইনের বলে ধর্মান্তরিতরা পূর্বপুরুষের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার লাভ করে। এই আইনের বিরোধিতা করার মতো কোনো কিছু ছিলো না। দেশের আইনের কোনো ক্ষতি না করলে সত্তাবে দীক্ষিত হওয়ার কারণে, পূর্বপুরুষদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায় মনে করতে লাগলো, নবদীক্ষিত খ্রীস্টানদের সুবিধা দেয়ার জন্য শাসকগোষ্ঠি এই আইনের সৃষ্টি করলেন। তাদের বিদ্বেষ উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের জনহিতকর প্রতিষ্ঠান এবং কাজের মধ্যেও পক্ষপাতমূলক মনোভাবের অনুপ্রবেশ ঘটে। রাস্তা নির্মাণের সময় একটা দুটা মন্দিরকে ভেঙ্গে ফেলা হলো। অশিক্ষিত জনগণ মনে করতে লাগলো তাদের পবিত্র মন্দিরকে ভেঙ্গে ফেলবার জন্যই সরকার রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের দৃষ্টিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন কোন মর্যাদাই পেলো না। একইভাবে ইংরেজের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাও দেশের জনমতকে ইংরেজের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে তুলেছিলো। হেদায়েত আলীর অভিজ্ঞতা থেকে জানতে পারি সুপ্রাচীন পর্দা প্রথার ওপর আঘাত এসেছিলো। হাসপাতালে রোগীদের স্থান দেয়ার ব্যপারে ব্রাহ্মণ-শূদ্রের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করা হতো না। অসহায় শিশুদেরকে অনাথ আশ্রমে নিয়ে গিয়ে তাদেরকে খ্রীস্টান হিসেবে বড়ো করা হতো।

১৮৫২ সালে ব্রহ্মদেশের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ ঘোষণা করতে হলো। সাগরের ওপারে আবার সেপাইদের সাহায্যের প্রয়োজন দেখা দিলো। লর্ড ডালহৌসী বাঙালি সেপাইদেরকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কালাপানি অতিক্রম করতে বাধ্য করলেন না। তবে তাদের স্বেচ্ছাকৃত সাহায্যের জন্য অন্য আমন্ত্রণ জানালেন। প্যাজেটের শিক্ষার কথা ভুলে গিয়ে ৩৮ নং দেশী পদাতিক বাহিনী যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করলো। লর্ড ডালহৌসী অত্যন্ত বিজ্ঞোচিতভাবে সেপাইদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা থেকে বিরত রইলেন। সেপাইদের মনে আফগান যুদ্ধের স্মৃতি এখনো জীবন্ত। সরকার এখানে তাদের ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত করার মতলব পরিহার করেনি, এ বিশ্বাস আবার তাদের মনে জাগরুক হয়ে উঠলো।

১৮৫৫ সালে একটি অতর্কিত ঘটনা ঘটে। এ থেকে সরকারের হুঁশিয়ার হওয়া উচিত ছিলো। হায়দরাবাদের নিকটে বেলারাম নামক স্থানে কতিপয় মুসলমান অশ্বারোহী কর্ণেল কলিন মেকেঞ্জীর প্রাণের উপর হামলা চালায়। কারণ তারা মনে করেছিলো, কর্ণেল মেকেঞ্জী মুসলমানদের মুহররমের মিছিলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিলেন। ভুলবশতঃ কর্ণেল মেকেঞ্জী এক আদেশ জারী করেছিলেন ২০শে সেপ্টেম্বর তারিখে। নির্দেশের মর্ম হলো ২২শে সেপ্টেম্বর রাত বারটা থেকে পরদিন রোববার রাত বারটা পর্যন্ত কোন মিছিল, শ্লোগান অথবা শোরগোল কেউ করতে পারবে না। ২১শে সেপ্টেম্বর যখন দেখলেন, ২৩ শে সেপ্টেম্বর হলো পরদিন। ঐদিন মিছিল বের না করলে চলে না। তাই তিনি পূর্বে জারিকৃত নির্দেশের সংশোধন করলেন। এ নির্দেশগুলো একটু অস্বাভাবিক ছিলো। প্রথম নির্দেশটি তো রীতিমতো আপত্তিকর। তার ফলে মুহররম এবং রোববারের উপাসনার সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরের দিনই সব নির্দেশ প্রত্যাহার করা হলো। ক্ষতি যা হবার ছিলো ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। সংশোধিত নির্দেশ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়নি। শহরের প্রধান প্রধান সড়ক দিয়ে মিছিল পরিক্রমা বন্ধই ছিলো। অশ্বারোহীরা রোষবশত: শনিবারে মিছিল তো বের করলোই শহরে প্রধান প্রধান সড়ক দিয়ে মিছিল পরিক্রমা করিয়ে ক্ষান্ত ছিলো না, এমনকি তারা নিষিদ্ধ সড়ক বেয়ে ব্রিগেডিয়ারের বাঙলোর দিকে ধাওয়া করলো। তখন তিনি বসে বসে কতক অফিসার এবং ভদ্রমহিলাদের সঙ্গে আলাপ করছিলেন। গোলমাল, শোরগোল এবং উচ্চ মাতম শুনে তিনি স্পষ্টত:ই বিরক্ত হলেন। ব্যক্তিগতভাবে কর্ণেল মেকেঞ্জী মিছিলকারীদের বাধা দিলেন । তাদেরকে পেছনে হটতে বললেন। মিছিলকারী জনতার মধ্যে বিক্ষুব্ধ কয়েকজন জানালেন এ রাস্তা তাদের, তারা এর উপর দিয়েই যাবে। রাগে দিশেহারা কর্ণেল হঠাৎ মিছিলকারীর কয়েকজনের হাত থেকে নিশান কেড়ে নিলেন। জনতা পেছনে হটলো, তবে একটু পরে ফিরে এসে শুধু তার উপর নয়, কতিপয় ভদ্রমহিলা এবং অফিসারকেও আক্রমণ করে বসলো। তারা বেরিয়ে ছিলেন সান্ধ্যভ্রমণের জন্য। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা কর্ণেল কার্পেন্টারকে জানালো, তারা হচ্ছে সরকারের চাকর, সরকারের জন্য তারা প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে পারে। কিন্তু ধর্ম তাদের কাছে প্রাণের চাইতে প্রিয়। সে ধর্মকে অপমান করা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার এবং ব্রিগেডিয়ার মেজরের বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা কিছুতেই অস্ত্র সংবরণ করবে না। পরে একটি অনুসন্ধানের ব্যবস্থা করা হলো। সে কমিটি ব্রিগেডিয়ার এবং ব্রিগেডিয়ার মেজরের আচরণের কোনো খুঁতই ধরলো না। তবে ব্যক্তিগতভাবে লর্ড ডালহৌসীর আভিমত হলো তারা অন্যায় করেছেন। দু’জন ছাড়া ৩নং অশ্বারোহী বাহিনীর সমস্ত দেশীয় সেপাইদের বরখাস্ত করা হলো। বিশৃঙ্খল জনতাকে কেননা বাধা দিতে পারেনি, এ অপরাধে হিন্দু সেপাইদের শাস্তি দেয়া হলো।

একই বছরে বোলারামের ঘটনার অব্যবহিতকাল পরে নতুন ঘটনা সংযুক্ত হয়ে ঘটনার বেগকে আবেগ দান করলো। সরকারের জনহিতকর প্রত্যেকটি কাজকে ভারতীয় জনসাধারণ ঘোরতর সন্দেহের চক্ষে দেখতে আরম্ভ করেছে। রেলপথ এবং টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা সরকার তাদের সামাজিক ব্যবস্থার মর্মমূলে আঘাত হানার জন্যই প্রবর্তন করেছে বলে তারা মনে করলো। সৌভাগ্যবশতঃ কলকাতা থেকে মিঃ এডমন্ডের লিখিত এক পত্রে তার নির্দেশ পাওয়া যায়। রেলগাড়িতে বিভিন্ন বর্ণের মানুষদের বসবার জন্য কোনো আলাদা ব্যবস্থা করা হয়নি। উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণকে অস্পৃশ্য শূদ্রের সঙ্গে পাশাপাশি আসনে বসতে হতো। এতে করে তাদের শুচিতা রক্ষার কোনো উপায় ছিলো না। ভ্রমণকালে হয়তো উপোস করতে হতো। নয়তো সামাজিক প্রথা ভঙ্গ করে তাদের দৈনিক ক্রিয়াকর্ম বাদ দিতে হতো। সেজন্য তাদেরকে কড়া রকমের প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো। এতেকরে অনেক টাকা পয়সা খরচ হয়ে যেতো। সকলে বলাবলি করতে লাগলো-ম্লেচ্ছ শাসকেরা এদেশে অভিশপ্ত কলিকাল ডেকে আনতে চায়। মি: এডমন্ড তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন দেশের বিভিন্ন অংশ দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার অধীনে আনয়ন করা হয়েছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবে ধীরে ধীরে সমাজকাঠামোর পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। এখন দরকার দেশে একটি ধর্ম প্রচার করে সকলের পরিত্রাণের ব্যবস্থা করা। এ হলো গিয়ে ধর্ম প্রচারকদের চরম ঔদ্ধত্য। সকলে বিশ্বাস করলো এ প্রচারপত্রখানা সরকারই সমস্ত অফিসারের কাছে বিলি করেছে। লেফটেন্যান্ট গভর্ণর অস্বীকার করে বলেছেন, এ প্রচারপত্রের সঙ্গে সরকারের কোনো সংযোগ নেই। তারপরেও কিন্তু গণমনের সন্দেহ দূরীভূত হলো না। তার পরের বছরে সরকারের দু’টি ব্যবস্থার ফলে সংস্কারাচ্ছন্ন গণমনে সরকারের প্রতি সন্দেহ আরো ঘণীভূত হলো।

মেয়াদ ফুরালে ১৮৫৬ সালে লর্ড ডালহৌসী ভারত পরিত্যাগ করে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ভারতে আসেন লর্ড ক্যানিং। নতুন বড়লাট সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায়নি তখনো। ক্ষুরধার বুদ্ধি এবং হৃদয়ের যে ঔদার্যবলে ভারতের জনসাধারণের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন এবং ভারতবর্ষকে ইংল্যান্ডের জন্য রক্ষা করতে পেরেছেন, সে মহান গুণাবলী তখনো জনসাধারণের কাছে সম্পূর্ণ অবিদিত ছিলো। প্রথমে এসে যে দুটি ব্যবস্থা অবলম্বন করলেন তার জন্য তিনি জনসাধারণের বিরাগভাজন হয়ে পড়লেন। তাতে করে গুজব অনুসারে লোকে বিশ্বাস করলো কোম্পানী তাকে এদেশের হিন্দু-মুসলমানকে খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার জন্য পাঠিয়েছে বিলাত থেকে। লর্ড ডালহৌসী হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইনের খসড়া তৈরি করেছিলেন। আইনটি লর্ড ক্যানিং-এর অনুমোদন লাভ করে শাসনভার হাতে নেয়ার পয়লা বছরেই চালু করা হয়। সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রথাটি চালু হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। এ সংস্কারের পুরোভাগে ছিলেন বাঙালি কৃতি পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁর বিধবা বিবাহের যুক্তির পশ্চাতে ছিলো শাস্ত্রের সমর্থন। এতে সংস্কারাচ্ছন্ন ব্যক্তিদের ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা নয়। বিধবারা রাজী না থাকলে বিয়ে তো হওয়ার কথা নয়। এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে ভারতের বিভিন্ন অংশে অব্রাহ্মণ বিধবারা ইচ্ছে করলে আবার বিয়ে করে নতুন জীবনযাপন শুরু করতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সাথে শাসকগোষ্ঠির কোনো সংযোগ ছিলো না। তারা মনে করতে লাগলো শাস্ত্র থেকে সামান্য রকম বিচ্যুত হওয়ার অধিকারও তাদের নেই। ব্রিটিশ সরকার এ ব্যবস্থা করে দিয়ে তাদের মধ্যে আতঙ্কের সঞ্চার করলো। যেহেতু আগে থেকেই তারা ধরে নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার তাদের খ্রীস্টান করার জন্য মতলব আঁটছে। সংস্কারাচ্ছন্ন অংশ শাস্ত্রের ওপর হস্তক্ষেপকারী আইনের অপব্যাখ্যা করতে লাগলো। ধর্ম গুরুতর বিপদের সম্মুখীন, সারাদেশে এবং সেপাইদের ছাউনিতে ছাউনিতে এই গুজব ছড়িয়ে পড়লো।

ঐ বছরের জুলাই মাসে জারীকৃত এক ইশতেহারের ফলে বাঙালি পল্টনে যে সকল শ্রেণী থেকে সৈন্য সংগ্রহ করা হতো, সে শ্ৰেণীসমূহকে সাংঘাতিকভাবে আহত করলো। দু’দুবার উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণ সেপাইরা সাগর পাড়ি দিতে অস্বীকার করেছে। কিন্তু মাদ্রাজী সেপাইরা সাগর পাড়ি দিতে কোনো আপত্তি উত্থাপন করেনি… যদিও চাকুরির চুক্তিপত্রে সাগর পাড়ি দেয়ার কথার উল্লেখ নেই, যদিও মাদ্রাজী সেপাইদের মধ্যে ব্রাহ্মণের অভাব নেই, তবু তারা দু’দুবার সাগর পাড়ি দিয়েছে। একই শর্তে বাঙালি পল্টনের ৬নং রেজিমেন্টকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ব্রহ্মদেশে গিয়ে যুদ্ধ করতে তাদের কোনো আপত্তি ছিলো না। তাই বলে একই নিয়ম ভবিষ্যতের সকল বাহিনীকে কেননা মেনে নিতে হবে সে কথা তাদের বোধগম্য নয়। লর্ড ডালহৌসী নির্দ্বিধায় ৩৮নং পদাতিক বাহিনীর রাজপুত এবং ব্রাহ্মণদের সঙ্গে চুক্তির শর্ত রক্ষা করেছেন। ব্রহ্মদেশে গমনে অনিচ্ছুক সেপাইদেরকে কঠিন দণ্ড দান করার জন্য স্যার প্যাজেটের মতো কোনো শক্তিশালী সর্বাধিনায়কও ছিলো না। যে সকল সেপাই ব্রহ্মদেশে অবস্থান করছে, তাদেরকে দেশে আসতে দেয়া সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। তাই লর্ড ক্যানিং নতুন সংগৃহীত সৈন্যদের কাছে চুক্তির শর্তের ব্যাপারে কোনো রকমের নমনীয়তা প্রদর্শন না করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। সংশোধিত আইনের ফলে সেপাইদের ধর্মীয় অনুভূতি যে আহত হতে পারে এ ছিলো তাঁর ধারণার সম্পূর্ণ অতীত। কারণ এ শর্তে ভর্তি হবে কি হবে না এ ছিলো সম্পূর্ণ তাদের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু একবার ভর্তি হয়ে গেলেই আফগানিস্থান অথবা ব্রহ্মদেশ অথবা সাগরের পাড়ের যে কোন দেশে যেতে আপত্তি করতে পারবে না। সর্বসাধারণের জন্য জারীকৃত ঢালাও নির্দেশ সেপাইদের সচকিত করে তুললো। তাতে ব্যক্তিগতভাবে সেপাইরা ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও মনে করতে লাগলো তাদের সন্তান-সন্ততির জন্য সামরিক বাহিনীতে চাকুরির দরোজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলো। পূর্বপুরুষেরা পেশা গ্রহণ করা ছাড়া সেপাইদের গত্যন্তর নেই। কিন্তু পেশার জন্য পূর্ব পুরুষের ধর্মকে বিসর্জন দিতে হবে। তাদের মনে হলো সরকার ধর্মের প্রতি বিশ্বাসহন্তা ছাড়া আর কাউকে সম্মানজনকভাবে চাকুরিতে বহাল করবে না। ধর্ম বিশ্বাস হত্যা করার বদলে সে দৈনিক ডাল-রুটি সংগ্রহ করবে। তারা যদিও রেহাই পেয়েছে, তাদের ছেলেপিলে, নাতি কেউই এ জঘন্য প্রথা থেকে রক্ষা পাবে না। পাপের অন্নে তাদের জীবন ধারণ করতে হবে। এভাবে ইহকাল এবং পরকাল দুইই তারা হারাতে বাধ্য হবে। উচ্চবর্ণের তরুণেরা আবার তুলনায় অনেক কম সংখ্যায় সামরিক বিভাগে চাকুরির আবেদন করতে আরম্ভ করলো। পঞ্চাশ বছরের অসময়োচিত অসুচিন্তিত শাসনব্যবস্থার ফলে জনগণ ধরে নিলো এ ফিরিঙ্গী শাসককুল না করতে পারে এমন কোনো জঘন্য কাজ নেই।

একজন সামরিক অফিসার যিনি পঁচিশ বছর চাকুরির পর অবসর গ্রহণ করেছেন এবং বাঙালি পল্টনের সেপাইদের ভালোমতে চেনেন বলে দাবি করেছেন তার মতে সরকারের অন্যায় বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্যই সংঘটিত হয়েছে প্রতিটি বিদ্রোহ। উদাহরণ স্বরূপ জাভার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সেখানে যখন বিদ্রোহ দেখা দিলো সেপাইরা স্বেচ্ছায় কালাপানি পেরিয়ে বিদ্রোহ দমন করতে রাজি হলো। কিন্তু একটি শর্ত, কিছুকাল পরে তাদের আবার ফিরে আসতে দেয়া হবে। কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারায় গোলমাল দেখা দিলো। বেলুড় বিদ্রোহ, ব্যারাকপুর বিদ্রোহ এ সবের মূল কারণ হলো ধর্মীয় আচারের প্রতি অশ্রদ্ধা। সেপাইদের সুযোগ সুবিধা অবহেলা করা হয়েছিলো। নিম্নস্তরে কর্তৃপক্ষ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে অথবা পূরণে সরাসরি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে। সেপাইরা ধরে নিলো তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তারা সরকারের সর্বোচ্চ পরিষদ এবং তাদের অধীনস্থ কর্মচারিদের কথার মধ্যে যে কোনো প্রভেদ আছে তা ধরতে পারেনি। তার ফলে তারা উভয়ের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেললো। এ বিশ্বাসহীনতা তাদের নৈতিকতার উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করলো।

১৮৩৩ এবং ১৮৩৪ সালে যে গোলযোগ মাদ্রাজ এবং বাঙালি পল্টনের মধ্যে দেখা দেয় সরকারের প্রকৃত এবং আরোপিত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাই হলো তার কারণ। তার ফলে সেপাইদের চোখে সরকারের মর্যাদা রইলো না। সীমিত দৃষ্টিভঙ্গীর সেপাইরা বিদেশে যেতে স্বভাবত:ই অনিচ্ছুক ছিলো। অপরিচিত পরিবেশে গেলে তাদের যে কষ্টের সম্মুখীন হতে হয় তার জন্য অর্থ আদায় করতে চাইতো। তাদের দৃষ্টিতে ভারতবর্ষ এক দেশ নয়। পাঞ্জাব কিংবা সিন্ধু প্রদেশে যুদ্ধ করা ও বিদেশে যুদ্ধ করা একই কথা। প্রথম আফগান যুদ্ধের সময় সিন্ধু নদ অতিক্রম করলে জেনারেল পোলোক সেপাইদের একটা আলাদা বাট্টা দান করেছিলেন। এ দৃষ্টান্তের উল্লেখ করে যতোবার সিন্ধু নদ অতিক্রম করতো প্রতিবারই সেপাইরা আলাদা অর্থ দাবি করতো। ১৮৪৩ সালে সিন্ধু প্রদেশ ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হলো এবং ভারতবর্ষের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়ালো। সাধারণ ছাউনি থেকে যতো দূরে হোক

কেন, কোনো একটি ভারতীয় প্রদেশে যুদ্ধ করার সময়ে তারা আলাদা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে না। কর্তৃপক্ষের এ যুক্তি সেপাইরা মানবে কেনো? সিন্ধুনদ এখনো আছে। ১৮৪২ সালে সিন্ধুর জীবন যাত্রা যে রকম কঠোর ছিলো, এখনো সে রকম আছে। সুতরাং ১৮৪৪ সালে তারা কেননা ক্ষতিপূরণ পাবে না! সিন্ধু নদ অতিক্রমণ বাট্টা না পেলে ৩৪নং বাঙালি রেজিমেন্ট সিন্ধুনদ অতিক্রম করতে অস্বীকার করলো। ৭নং বাঙালি অশ্বারোহী বাহিনীও একই ধূয়া ধরলো। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাদের একগুঁয়েমীর শায়েস্তা করা হলো না। গুজব রটলো, ইউরোপীয়ানরা সেপাইদের দাবির প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন, কারণ তারা ন্যায্য পাওনার চেয়ে বেশি কিছু দাবী করছে না। কিছু সময়ের জন্য বিদ্রোহীদেরকে আলাদা থাকতে হলো।

তারপরে ৪র্থ এবং ৬৯নং রেজিমেন্ট ৩৪নং বাঙালি রেজিমেন্টের অনুসরণে সিন্ধু নদ অতিক্রমণ বাট্টা না পাওয়া পর্যন্ত সিন্ধু নদ পার হতে রাজী হলো না। ৬৪নং রেজিমেন্টও একই দাবি তুললো এবং সর্বাধিনায়ক তাদের দাবি সঙ্গত মনে করলেন। সিন্ধু প্রদেশে যে সকল সেপাই যুদ্ধ করবার জন্য যায় তাদের নদ অতিক্রমণ বাট্টা ছাড়া অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এখনো দেয়া হয়ে থাকে। যে সকল সেপাই সিন্ধুতে চাকুরি করার সময় মারা যায় তাদের উত্তরাধিকারীদের পারিবারিক পেনশন দেয়া, হয়। অবশ্য তার জন্য সেপাইর ভালো আচরণ থাকতে হবে। কিন্তু তাদের সর্বাধিনায়ক মোসৃলি ভরসা দিলেন পোলোক যে বাট্টা দিয়েছিলেন, তারা তারও প্রত্যাশা করতে পারে। প্রধান সেনাপতির কথামতো তারা শিকারপুরে পৌঁছে প্রতিশ্রুত বর্ধিত অর্থ ছাড়া তাদের মাইনে নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। তাদের সাথে যে প্রতারণা করা হয়েছে তার প্রতিবাদে তারা সোচ্চার হয়ে উঠলো এবং সমস্ত ব্যাপারটা এক অপ্রীতিকর রূপ পরিগ্রহ করছিলো। কিন্তু জর্জ হান্টার অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বিষয়টির মোকাবেলা করলেন। তিনি তাদেরকে শুক্কুরে গিয়ে বাট্টাসহ তাদের মাইনে নেয়ার জন্য প্রলুব্ধ করলেন। সেখানে অন্যান্য ইউরোপীয় অফিসারদের উপস্থিতিতে সেপাইদের শান্ত করা হলো। কারো সম্মানের হানি করা হলো না। কিন্তু যে ক্ষতি সাধিত হলো, তার কোনো তুলনা নেই। সেপাইরা দেখলো, উধ্বতন অফিসারদের তারা আর বিশ্বাস করতে পারছে না। ১৮৫৭ সালের সঙ্কটকালে অফিসারদের গ্যারান্টিতে যে তারা আর বিশ্বাস করতে পারেনি তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিই-বা আছে।

মাদ্রাজী সেনাবাহিনীর অবস্থা আরো ভয়াবহ। বাঙালি রেজিমেন্টের সেপাইদের বালবাচ্চা, স্ত্রী সকলেই গ্রামের অধিবাসী। কিন্তু মাদ্রাজ রেজিমেন্টের সেপাইদের স্ত্রী পুত্র তাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকে এবং একই সঙ্গে এগুতে হয়। এক অর্থে দূরদেশে গমন তাদের পক্ষে আরো অসম্ভব। ৬নং মাদ্রাজ অশ্বারোহী বাহিনীকে কাম্পতি থেকে জব্বলপুর যাত্রার আদেশ দেয়া হলো। জব্বলপুর মাদ্রাজের বাইরে। তাদেরকে জানানো হয়েছিলো, সেখানে অল্পকাল অপেক্ষা করার পরে তাদেরকে আবার প্রেসিডেন্সিতে ফিরে আসতে দেয়া হবে। পরে তারা জানতে পেলো, তাদেরকে শুধুমাত্র জব্বলপুরে বদলী করা হয়নি, স্থায়ীভাবে নশ’ মাইল দূরবর্তী আড়কোটেও তাদের চাকুরি করতে হবে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় নিতান্ত অল্প ভাতাতেই তাদের চাকুরি করতে হবে। স্বভাবতঃই তাদের অসন্তোষ আর রাখাঢাকা রইলো না। এ জন্য রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর ফিল্ডকে দোষারোপ করতে লাগলো। তারা ডিউটি থেকে ফিরে এলো। অধিনায়কের বিরুদ্ধে তারা প্রচণ্ড বিক্ষোভে মেতে উঠলো। কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আরেকটি তাজা দৃষ্টান্ত হলো জব্বলপুরের ঘটনা।

দুর্ভাগ্যবশত : এ অসন্তোষ শুধুমাত্র সেপাইদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইলো না। পদাতিক বাহিনীরও অভিযোগ ছিলো। সিন্ধু প্রদেশে ছাউনি ফেলতে হবে, অথচ তখন বাঙালি রেজিমেন্টগুলো বিশেষ ভাতা ছাড়া সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। সে সময়ে মাদ্রাজ সরকার দু’রেজিমেন্ট পদাতিক বাহিনী পাঠাতে সিদ্ধান্ত নিলেন। মাদ্রাজের গভর্ণর যিনি, তিনি প্রধান সেনাপতিও ছিলেন, ব্রহ্মদেশে গেলে যে সুযোগ-সুবিধা পেতো সে সুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা করলেন সেপাইদের। এই ব্যবস্থা আনুসারে মাদ্রাজের সেপাইরা তাদের পরিবারবর্গকে সেখানে রেখে নিজেদের খরচের অল্পস্বল্প টাকা পয়সা মাত্র সম্বল করে বোম্বাইয়ে এসে হাজির হলো। এখানে এসে তাদেরকে হতবাক হতে হলো। তারা জানতে পারলো ভারত সরকার মাদ্রাজের গভর্ণরের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে রাজী নন। কারণ তা বেঙ্গল রেগুলেশানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তারা সরকারের এ ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত নিষ্ঠুর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ বলে মনে করলো। সেপাইরা চরম বিশৃঙ্খলভাবে খাদ্যের দাবি করতে থাকে। কিছু টাকা অগ্রিম দেয়া হলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে টাকা তারা গ্রহণ করলো। এখানে ব্যাপারটা শেষ হয়ে গেলো।

তবে ভারতের গভর্ণর জেনারেল একটি প্রদেশের গভর্ণরের প্রতিশ্রুতিকে সম্মান করার ফলে সেপাইরা গোটা সরকারকেই অবিশ্বাস করতে আরম্ভ করলো। এর জন্য সেপাইদের কোনো দোষ দেয়া চলে না। তারা শুধু দেখলো, যে সরকারের অধীনে তারা চাকুরি করে, সে সরকারের প্রতিশ্রুতির উপর আর নির্ভর করবার কোনো উপায় নেই। লর্ড এলেনবরোও নিজের ভাবে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন।

লর্ড ডালহৌসীর বড়লাট থাকার সময়ে ১৮৪৯ সালে একই ব্যাপার ঘটেছিলো। কতিপয় রেজিমেন্ট রাওয়ালপিণ্ডিতে আলাদা ভাতা দাবি করলো। ভাতা ছাড়া তারা তাদের মাসিক মাইনে নিতে রাজী হলো না। তৎকালীন প্রধান সেনাপতি স্যার চার্লস নেপিয়ের শক্তি প্রয়োগ করে সেপাইদের বিদ্রোহ দমন করলেন। সতর্কমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করেই তিনি সন্তুষ্ট রইলেন না। তিনি অনুসন্ধানে বের হলেন এবং সেপাইদের মধ্যে অসন্তোষ লক্ষ্য করলেন। ডিসেম্বর মাসে ৬৬নং রেজিমেন্ট গোবিন্দগড়ে বিদ্রোহ করে বসলো। কিন্তু অশ্বারোহী বাহিনীর সহায়তায় সে বিদ্রোহ সম্পূর্ণভাবে দমন করা হলো। নেপিয়ের দেখতে পেলেন যে সেপাইদের সত্যিকারের অভিযোগ রয়েছে। তাদের অসুবিধার ক্ষতিপূরণ না করে নতুন অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলে তাদেরকে বদলী করা অসঙ্গত। তাই তিনি গভর্ণর জেনারেলের আদেশ মুলতবী রেখে পুরোনো কায়দা অনুসারে সেপাইদের উচ্চহারে ভাতা দিতে নির্দেশ দান করলেন। লর্ড ডালহৌসী নেপিয়েরের এই কাজকে অনুমোদন করলেন না। তাঁর নির্দেশ অমান্য করার জন্য তিনি নেপিয়েরকে তিরস্কার করলেন। নেপিয়ের এই অপমান হজম করতে না পেরে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। সেপাইদের মধ্যে তার কি রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো অনুমান করতে মোটেই অসুবিধা হয় না।

ধর্মীয় ভীতি ছাড়াও সেপাইদের অনেক অভাব অভিযোগ ছিলো। মাইনে এবং ভাতাই হলো সরকার এবং সেপাইদের মধ্যে একমাত্র বন্ধন। কিন্তু তাও এমন কিছু আকর্ষণীয় নয়। পদাতিক সেপাইদের মাইনে ছিলো মাসিক সাত টাকা। অশ্বারোহী সেপাইরা প্রতি মৌসুমের জন্য পেতো সাতাশ টাকা এবং এ টাকা থেকেই খরচ করে আপনাপন ঘোড়া কিনতে হতো। সাদা সেপাইদের তুলনায় তাদের বেতন বেদনাদায়ক ভাবে অল্প ছিলো। হোমস বলেছেন, হায়দার আলীর মতো সামরিক প্রতিভার হলেও একজন সেপাইকে কিছুতেই অধীনস্থ একজন ইংরেজ সেপাইর মাইনে দেয়া হবে না। একজন অবসরপ্রাপ্ত অফিসারের মতে ভারতের মোট সৈন্যসংখ্যা ৩,১৫,৫২০ জন। তাতে খরচ পড়ে ৯৮,০২,৮৩৫ পাউণ্ড। তার মধ্যে ৫১,৩১৫ জন ইউরোপীয় সৈন্য এবং অফিসারের পেছনে ৫৬,৬৮,১১০ পাউণ্ড খরচ হয়ে যায়। কিন্তু ইউরোপীয় সৈন্যরা কোনো কাজ করে না। তারা কীভাবে থাকে, খায় এবং কীভাবে মাইনে দেয়া হয়, অন্যান্য সেপাইদের তা জানা নয়। এই বৈষম্যের কারণে কর্তৃপক্ষের প্রতি সেপাইদের বিশ্বাস ক্রমশ: শিথিল হয়ে আসে।

এটা বিশ্বাস করা হতো যে মাইনে অল্প হলেও সেপাইদের অবস্থা বেশ স্বচ্ছল। তাদের প্রয়োজন অল্প, জীবনযাত্রার মান অনুন্নত। কিন্তু তাদের প্রথম কয় মাসের মাইনে অফিসারদের অন্যায়ভাবে তোষণ করতেই ব্যয় হয়ে যায়। সীতারাম বলেছেন, ড্রিল হাবিলদার এবং তাঁর রেজিমেন্টের ইউরোপীয় সার্জেন্ট তাকে পছন্দ করতো না। কারণ ভর্তি হবার সময়ে তিনি উপযুক্ত ফি দেননি। এই ফির পরিমাণ ছিলো ১৬ টাকা যার অধীনে পয়লা চাকুরি করতে হতো সে ইউরোপীয়ান এ টাকা থেকে ৫ কিংবা ৬ টাকা পেতেন। তিনি আরো বলেছেন, মাসে ৭ টাকা মাইনে দিয়ে একজন পাঞ্জাবী অথবা একজন মুসলমান চলতে পারে না।

বেরিলীর অশ্বারোহী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন বাঙালি কেরাণীর বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, সেপাইদেরকে সামরিক পোশাকের জন্য টাকা দিতে হতো। রেজিমেন্টের বাজারের বানিয়াদের কাছ থেকে দৈনিক রসদ সংগ্রহ করতে হতো। মাইনের দিন রসদ ইত্যাদির দাম কেটে রাখার পর যা বাকী থাকে সৈনিকদের হাতে তা আসতো। কোনো সেপাই মাসে এক টাকা আট আনা এবং কোনো কোনো সেপাই কয়েক আনার বেশি সঞ্চয় করতে পারতো না। শুধু ডাল রুটি খেয়েই তাদের জীবনধারণ করতে হতো। অল্প মাইনের কারণে কোনো রকমের ভাল খাবার-দাবার তাদের ভাগ্যে জুটতো না বললেই চলে। কঠিন কঠোর জীবনযাপন করতে হতো সেপাইদের। নয় টাকার বেশি কখনো আশা করতো না। সেও পদোন্নতি হলে। উৎকর্ষ বিচার না করে চাকুরির মেয়াদ অনুসারেই পদোন্নতি হতো। অশ্বারোহী সেপাইদের অবস্থাও সাধারণ সেপাইদের চাইতে এমন কিছু ভালো ছিলো না। তারা একুশ থেকে ত্রিশ টাকা পর্যন্ত মাইনে পেতো। তা থেকে অনেকভাবে টাকা কেটে রাখা হতো।

বেতনের পরিমাণ সেপাইদের মনস্তত্বে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তারা লক্ষ্য করলে অধিক মাইনেধারী ইউরোপীয় সৈন্যের সংখ্যা নিতান্তই অল্প। সেপাইদেরকে সাগরের পরপারের দেশে যুদ্ধ করতে পাঠালে তাদের খরচা যে কম হয়, এ কথাও বেশ পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলো। সুতরাং তারা ধর্মের বিরুদ্ধে ব্রিটিশের বর্তমান গুজবকে সত্য বলে বিশ্বাস করলো।

সংখ্যালঘিষ্ঠ শ্বেতকায় এবং দেশীয় সেপাইদের মধ্যে আগে যে ভালো সম্পর্ক ছিলো, এখন তা অতীতের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সীতারাম আপন জবানীতে যা বলেছেন, আমি সবসময় ইংরেজ সেপাইদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রক্ষা করতাম। আগে তারা আমাদেরকে অপরিমিত স্নেহ সহানুভূতি দেখাতেন। আমরা কি তাদের সমস্ত কঠিন কাজগুলো করি না? প্রখর উত্তাপ মাথায় নিয়ে আমরা তাঁদের পাহারা দিয়েছি। তাঁদের বাসার সামনে প্রহরীগিরি করেছি, আমাদের খাদ্যদ্রব্যের অংশ দিয়েছি। বর্তমানের সৈন্যদের সকলেই ভিন্ন ধরনের মানুষ। আগেকার সাহেবদের মতো দীর্ঘকায় এবং সুদর্শন নন। গালাগালি ছাড়া আমাদের ভাষায় একটা কথাও বলতে পারবেন না। বস্তুত:, একজন শ্বেতকায় সৈনিক রেগে গেলে মুখ দিয়ে গালাগালি ছাড়া কিছু বের হতো না। সীতারামের মতে আগেকার দিনেও ইউরোপীয়ান সার্জেন্টরা দেশীয় সেপাই বা এ্যডজুট্যান্টের নামে হাজার রকম নালিশ করতেন। তার ফলে সেপাইদের কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হতো না।

উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে বসবাসকারী একজন ইংরেজ ভদ্রলোকের মতে, কমিশন প্রাপ্ত অফিসারদের এবং সেপাইদের মধ্যে সৌহার্দমূলক সম্বন্ধ ছিলো না। একে অন্যের কাছে ছিলো সম্পূর্ণ অচেনা। সেপাইদেরকে তারা মানবেতর জীব বলে মনে করতেন। বিশ্রী গালাগাল দিতেন, শূয়র ছাড়া ডাকতেন না। সম্মানীয় দেশীয় সেপাই বিশেষ করে মুসলমানেরা তা ভয়ংকর অপমানজনক মনে করতো। বুড়ো অফিসারেরা অপেক্ষাকৃত শান্ত ছিলেন; কিন্তু তরুণ অফিসারেরা তাতে বেশ মজা পেতেন। সেপাইদের সঙ্গে মানবেতর জীবের মতো আচরণ করাকে তারা খুবই প্রশংসনীয় কাজ মনে করতেন। ইউরোপীয় সাধারণ সৈন্যটিও সেপাইদের যে মানুষের সম্মান দিতো না, এ কথা বাঙালি পল্টনে লেফটেন্যান্ট কর্ণেল উইলিয়াম হান্টার সাহেবও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করেছেন।

শুধু সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করে একটি বিদেশী সরকার চলতে পারে না। শাসকদেরকে শ্রদ্ধাও আকর্ষণ করতে হয়। সেপাইরা যদি অফিসারদের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তা হলে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা নষ্ট হবে, তা একরকম অবশ্যম্ভাবী। আগে অফিসারেরা তাঁদের অধীনস্থ সেপাইদের ছিলেন সহায়। তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে সেপাইদের ভালোমন্দ দেখাশোনা করতেন। যখন প্রয়োজন তারা নিঃসংকোচে গিয়ে অফিসারদের সঙ্গে দেখা করতে পারতো। সীতারাম বলেছেন, আগেকার দিনে সাহেবরা নাচের অনুষ্ঠান করতেন রেজিমেন্টে। আগ্রহ সহকারে খেলাধুলা দেখতে আসতেন। শিকারে যাওয়ার সময় সমস্ত সেপাইদের নিয়ে যেতেন। পরবর্তীকালের সাহেবরা যে আগেকার সাহেবদের মতো নন তাঁদের মর্জি-মেজাজ আলাদা সে কথা সীতারাম এবং হেদায়েত আলী দু’জনেই উল্লেখ করেছেন। হেদায়েত আলী বলেছেন, ‘কোনো সেপাই সাহেবদের বাঙলোতে তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তারা ভয়ানক চটে যেতেন। পাদরীরা সাহেবদের উপর প্রভাব বিস্তার করাতেই সাহেবরা সেপাইদের চাইতে দূরে সরে গেছে বলে সীতারামের ধারণা। হেদায়েত আলী সাহেবদের এই ঔদাসীন্যকেই সিপাহী বিদ্রোহের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন।

আবার অফিসার এবং সেপাইদের ঘনিষ্ঠতা বেশি হলে শৃঙ্খলার উন্নয়ন সম্ভব নয়। একজন দায়িত্বহীন অফিসার অধীনস্থ সেপাইদের সামনে নিজের অভাব অভিযোগের কথা বলে ফেলে অতি সহজে সরকারের মর্যাদাকে সেপাইদের চোখে অবনমিত করতে পারে। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে ইউরোপীয় অফিসারবৃন্দের মধ্যে মহা-অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। তারা খোলাখুলি ইউরোপীয় এবং ভারতীয় সৈন্যদের সামনে বিদ্রোহের আলাপ করতো। এ বিষয়ে সীতারাম কিঞ্চিৎ আলোকপাত করেছেন। ভারতে যে নতুন লাট সাহেব এসেছেন, অফিসারেরা তাকে মোটেই পছন্দ করে না। তিনি তাদের মাইনে কমিয়ে দিয়েছেন। অফিসারেরা তো বিদ্রোহ করে করে অবস্থা। তারা ঘরে ঘরে অনেক সভা করলো, তাদের মন খারাপ হয়ে গেলো। অনেকে সরকারের অধীনে চাকুরি করবে না বলাবলি করতে লাগলো। কোম্পানী বাহাদুর এই লাট সাহেবকে টাকা বাঁচাবার জন্য পাঠিয়েছেন, কারণ যুদ্ধে অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। তারা বলতে লাগলেন, তাঁরা গরীব হয়ে পড়বে। কিন্তু একথা কে বিশ্বাস করে? কোম্পানী বাহাদুরের আবার টাকার অভাব কিসের? আমি এক রেজিমেন্টের লোকদের বলতে শুনেছি কলকাতা গিয়ে লাটসাহেবকে তাদের হক্তের দাবি মানতে বাধ্য করার জন্য তাদের সঙ্গে যেতে রাজী আছে কিনা। আমাকেও বলা হলো স্বদেশীয় অফিসারদের বাট্টার দাবির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় অফিসারেরা কিছুই বলবে না। এ সময়ে সমস্ত অফিসারেরা লাট সাহেবের উপর ভয়ংকরভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো এবং সরকারের বিরুদ্ধে অনেক কথাই বললো। তারা লাট সাহেবকেই দোষারোপ করলেন সবচেয়ে বেশি, তিনি নাকি কোম্পানীর খোশামোদ করতে চান। ১৮৪৩ সালে এবং ১৮৪৯ সালে সশস্ত্র– অভ্যুত্থান করে দাবি আদায় করার পেছনেও একই বোধ সেপাইদের মধ্যে সক্রিয় ছিলো। ইউরোপীয় অফিসারদের তাঁদের লোকজনের ভরণপোষণের কারণে, বেশি মাইনের জন্য বিদ্রোহ করতে যদি নৈতিকভাবে না বাধে-তাহলে দেশীয় সেপাইদের ধর্মের সমর্থনে বিদ্রোহ করতে বাধবে কেনো?

অনেক সময় বাঙালি পল্টনের জুনিয়র অফিসারদের অবিমৃষ্যকারিতা সামরিক আইনের বাইরে চলে যেতো এবং প্রকাশ্যে তারা নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতেন। জন জেকব বেদনাদায়কভাবে অফিসারদের মধ্যে উচ্চ নৈতিকতাবোধ এবং এ্যাংলো স্যাকসন সতোর অভাব দেখেছেন। একজন জুনিয়র অফিসার অনেকগুলো চাকর বাকর রাখতেন। তিনি রৌদ্রে যাবেন না, ঘোড়ার বদলে পাল্কীতে চড়ে ভ্রমণ করবেন। অন্য লোক তাঁকে পায়খানা ও প্রস্রাবখানায় নিয়ে যাবে। তার একজন খানসামা, একজন পরিচারক, একজন সর্দার বেয়ারা এবং অনেকগুলো বেয়ারা না হলে চলবে না। তাছাড়াও তাঁর বহু চাকরের প্রয়োজন। একজন হুঁকো বইবে, একজন বইবে ছাতা, একজন পানপাত্র এগিয়ে দেবে, চেয়ার এগিয়ে দেবে একজন। বলাই বাহুল্য সকল কাজ একজন মানুষের পক্ষে যথেষ্ট। ভারতে বসবাসকারী একজন সাধারণ ইউরোপীয় নিজের পানি উঠাতে পারেন না, নিজের পাক নিজে করতে পারেন না। এমন কি নিজের দাড়িও নিজে কামাতে পারেন না। অফিসারদেরকে সকালবেলা আধো ঘুম, আধো জাগ্রত অবস্থায় নাপিতেরা গিয়ে দাড়ি কামিয়ে দিয়ে আসতো। এ ধরনের আরাম-আয়েসের জীবন ধারণের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন পড়তো। জুয়া ইত্যাদি না খেললেও তাদের ন্যায্য মাইনের সাহায্যে এতো খরচ মেটানো সম্ভবপর ছিলো না। জুয়া খেলা ছিলো সামরিক মেসে একটি নিত্যনৈমিত্তিক প্রথা। তাই তাদের সব সময়ে দেনাদার অবস্থাতেই কাটাতে হতো। পাওনাদারদের দাবি মেটানোর জন্য তাদের অন্যায় পথ অবলম্বন না করে উপায় থাকতো না অনেক সময়ে। আরো আগে যে বেরিলীর বাঙালি কেরাণীর কথা উল্লেখ করেছি তিনি সেপাই, অশ্বারোহী এবং ইউরোপীয় অফিসারদেরও চড়া সুদে টাকা ধার দিতেন। ভারতবর্ষে দেনাদারদের প্রতি এক ধরনের অনুকম্পা মিশ্রিত মনোভাব প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। অফিসারদের তাঁদের অধীনস্থ দেশীয়দের কাছ থেকে টাকা ধার করে সম্মান হারানোর কোনো ভয় না থাকলেও তাদেরকে কিছু কিছু সুবিধা দেয়া হতো। বাঙালি কেরাণী সরকারি তহবিল থেকে টাকা ধার দিতো না। কিন্তু সীতারামের কথামতো প্রত্যেক পে হাবিলদার অফিসারদের প্রয়োজনের সময় তহবিল থেকে টাকা ধার দিতেন। সীতারাম বলেছেন পে হাবিলদারেরা সাহেবদের টাকা ধার দিতেন। সমস্ত অফিসারের মাইনে তাঁদের হাত দিয়ে বিলি হতো বলে টাকা মারা যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিলো না। কোনো অফিসার মারা গেলে আমরা সে দাবি তুলতাম না। এ ছিলো নিষিদ্ধ প্রথা। একবার শুনলে তার জন্য শাস্তি পেতে হতো। অফিসারেরা যথেষ্ট মাইনে পেলেও তাদের খরচের জন্য সে টাকা যথেষ্ট ছিলো না এবং সকল সময়ে তাঁদের অভাব লেগেই থাকতো। আমাদের রেজিমেন্টে মাত্র দু’জন অফিসার ছিলেন, যারা কোনো কর্জ গ্রহণ করেননি। মাইনের বেশির ভাগ টাকা তারা ভোজানুষ্ঠানে, জুয়াখেলা এবং রেসের পেছনে খরচ করে ফেলতেন। বিবাহিত সাহেবদের প্রায়শ: দেনাদার থাকতে হতো। পে হাবিলদার হিসেবে সীতারাম তাঁর কাছে গচ্ছিত সেপাইদের পাঁচশ টাকা ধার দিয়েছিলেন। একবার এক দুর্ঘটনায় তার কোম্পানীর এক সাহেব সর্বহারা হয়ে পড়েন। তিনি তাঁকে পাঁচ’শ টাকা ধার দিয়েছিলেন। একবার এক দুর্ঘটনায় তার কোম্পানীর এক সাহেব সর্বহারা হয়ে পড়েন। তিনি তাঁকে পাঁচ’শ টাকা ধার দিতে বলেন। কিন্তু সীতারামের সঞ্চিত টাকা ধার দিয়ে ফেলায়, তিনি তাঁর হেফাজতে রক্ষিত সেপাইদের টাকা হাওলাত দিয়ে ফেলেন। সে অফিসারটি যথাসময়ে টাকা ফেরত দিতে পারলেন না। সেপাইরা টাকা চাইলে সীতারাম তাদের দাবি মেটাতে পারলেন না। তার নামে কর্ণেলের কাছে নালিশ করা হলো এবং তাকে কোর্ট মার্শালের সম্মুখীন হতে হলো। কিন্তু সীতারাম সেজন্য ক্যাপ্টেনদের দোষী না করে দেশীয় সেপাইদেরকেই দোষী করেছেন।

ইউরোপীয়ান অফিসারদের হারেম, তাদের এবং তাদের অধীনস্থ সেপাইদের সখ্যতা সূত্র বলে বিবেচিত হতো। ধীরে ধীরে হারেমে দুর্নীতি ভয়ানকভাবে ছড়িয়ে পড়লো। আমাদের অধিকাংশ অফিসার তাদের সঙ্গে হিন্দুস্থানী স্ত্রীলোক রাখতেন। রেজিমেন্টের উপর এর খুব প্রভাব ছিলো। সেপাইরা সব সময়ে এমন ভাব দেখাতো, তাদের কাছে অনেক স্ত্রীলোক আছে যাতে করে অফিসারেরা তাদেরকে ঘুষ দেয়। আবার অনেক সেপাই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে টাকার লালসায় আপন আত্মীয়াদেরকেও সাহেবদেরকে দিয়ে দিত। অবশ্য তাদের অনেকেই ছিলো নিম্নশ্রেণীর।

বলা হয়ে থাকে যে, বেদণ্ড তুলে দেয়ার কারণে সামরিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়েছিলো। সামরিকশৃঙ্খলা মহৎ, সূক্ষ্ম যা মানুষের উচ্চতরো অনুভূতিতে নাড়া দেয় তার উপরই নির্ভরশীল। শুধুমাত্র শারীরিক নির্যাতনের সাহায্যে সামরিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কিন্তু শৃঙ্খলা বলার বদলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেই প্রতিষ্ঠা করা যায়। বাঙালি পল্টনের অভিজ্ঞ সেপাইরা ভালোমানুষী ব্যবহারের ফলে উজ্জ্বল হয়ে পড়েছিলো। হেদায়েত আলী কঠোর শাস্তিদানের সুপারিশ করেছেন। বাঙালি পল্টনের সেপাইরা জুনিয়র অফিসারদের খারাপ গালাগালির কারণে মারমুখো হয়ে উঠেছিলো। তারা তাদের দুর্মুখ অধিনায়কদের বিরুদ্ধে সব সময় আপত্তিজনক কথাবার্তা বলতো। সবসময় তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করতো, যার ফলে তার অধীনস্থ সেপাইদের ওপর যতোদূর অফিসারের নৈতিক প্রভাব ছিলো তা অবসিত হয়ে এলো। বিভিন্ন রকমের পেশাদার সৈন্যের সাহায্যে কোনো বিদেশী একটা দেশ যখন শাসন করে, শীগগির অথবা বিলম্বে তাতে বিদ্রোহ বিক্ষোভ ইত্যাদির উদ্ভব হবেই হবে। শাসকদের যুদ্ধ সেপাইরা এতোকাল ব্যস্ত ছিলো বলে আগে তা ঘটতে পারেনি। অপরিসীম বীর্যবান অধিনায়কদের অধীনে চাকুরি করার পেশাগত গর্বই এতোকাল তাদেরকে রাজভক্ত রেখেছিলো। খারাপ পদ্ধতি নৈতিকতাহীনতা এবং বিশ্বাসহীনতার কারণে বহুকাল আগেই সে গর্ব অন্তর্হিত হয়েছে।

সেনাবাহিনী অত্যন্ত প্রয়োজনের সময় উপযুক্ত অফিসারদের হারালো। রাজনৈতিক এবং শাসনকার্যে অধিক সুবিধা দেয়া হলে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণেরা সেদিকে ঝুঁকে পড়লেন। কেউ সেনাবিভাগে বড় একটা আসতে চাইতেন না। রেজিমেন্টগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সমগ্র সেনাবাহিনীতে কখনও প্রতিভার অভাব হয়নি। অনেকেই ছিলেন, যারা ১৯৫৬-৫৭ সালের সঙ্কটে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণিত করেছিলেন এবং কেউ কেউ ফিল্ড মার্শাল হওয়ার সম্মান পর্যন্ত লাভ করেছেন। নতুন শাসনব্যবস্থা অনুসারে তরুণ অফিসারদের উপর রেজিমেন্টগুলোর দায়িত্ব দেয়া হলো, যাদের অনেকেই ছিলেন সেপাইদের কাছে আগন্তুক। সেজন্য সঙ্কটের সময়ে সেপাইদের মতামত ফেরানোর মতো ওজন তাঁদের ছিলো না। ব্রেসিয়ারের মতো অফিসার যখন এলাহাবাদের শিখ সেপাইদের বিদ্রোহ করা থেকে নিরস্ত করতে পেরেছিলেন, এটা বিশ্বাস করা যায় যে, অনুরূপ দক্ষতা এবং প্রাণশক্তিসম্পন্ন অফিসার অন্যান্য স্থানে থাকলেও তারা বিদ্রোহ দমন করতে পারতেন। ভালো ভালো বেসামরিক অফিসারদের নতুন অধিকৃত পাঞ্জাবে বদলী করা হয়। শুধুমাত্র কিছু সংখ্যক ভালো সিভিলিয়ান অযোধ্যা এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কর্মরত ছিলেন।

শান্তির সময়ে ছাড়া দেশীয় অফিসারদের খুব বেশি কিছু করার ছিলো না। অনেকেই নিমকহারামী করেননি। কিন্তু বেশি বয়সে প্রমোশনের জন্য, তাদের যে পরিমাণ শক্তি, সাহস এবং উদ্দীপনার প্রয়োজন, তা আর তাদের শরীরে ছিলো না। ৪৫ বছর একটানা চাকুরী করার পর ৬৫ বছর বয়সে সীতারাম সুবাদার পদে উন্নীত হন। দেশীয় সেপাইরা এর চেয়ে কোনো উচ্চতরো পদে অধিষ্ঠিত হতে পারতো না। মিথ্যা অর্থনীতির অজুহাত দেখিয়ে ইউরোপীয় এবং দেশীয় সেপাইদের যে বয়সে অবসর গ্রহণ করা উচিত, সে বয়সে অবসর নিতে দেয়া হতো না। তার ফলে, ইউরোপীয়ান অফিসারেরা তাদের অধীনস্থ ভারতীয় সৈন্যদের সঙ্গে মেলামেশা করতে চাইতো না এবং ভারতীয় সেপাইরা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়তে এবং মানসিক ক্ষিপ্রতা হারিয়ে ফেলতো। সে কারণে অনেক রেজিমেন্টের শৃঙ্খলা ভয়ানকভাবে আহত হতো। অবশেষে পরিস্থিতি এমন জটিল আকার ধারণ করলো যে কালা আদমীরা প্রশ্নকর্তাদের সন্তুষ্ট করার জন্য আসল জবাব না দিয়ে, বানিয়ে বানিয়ে প্রশ্নের জবাব দিতো। অফিসারেরা তাঁদের অধীনস্থ সেপাইদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞই রয়ে গেলেন। কারণ জমাদার এবং সুবাদারেরা তাদের অফিসারের সামনে মন খুলে কথা বলতো না। উপরিঅলাকে সন্তুষ্ট করার জন্য পরিকল্পিত পদ্ধতিতে প্রশ্নের জবাব দিতো।

সেপাইদের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে যখন অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে, জনগণের মনোভাবও তখন সরকারের প্রতি প্রসন্ন নয়। প্রেসিডেন্সী শহরগুলোর মাত্র অল্প সংখ্যক শিক্ষিত লোক সরকারের শাসনব্যবস্থা এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তনকে ভালো বলে গ্রহণ করতে পেরেছেন। উত্তর ভারতের একজন অধিবাসী কলকাতার বাবুদের বিদ্রূপ করে বলেছেন, “তারা শেক্সপীয়র, মিল্টন পড়াবার শিক্ষক এবং এটর্ণি হবারই উপযুক্ত।” এই শিক্ষিতরাও কিন্তু সকলে ইংরেজদেরকে সমর্থন করতো না। বাঙলার একজন শিক্ষিত হিন্দু অভিযোগ করেছেন, “একশো বছরের নির্মম অত্যাচারের দাগ কোনো মহত্বের স্পর্শে মুছে যাবার নয়।” এদেশের হিন্দু এবং ইংরেজরা একশ বছর ধরে পাশাপাশি বাস করলেও তারা বন্ধু কিংবা শান্তিপ্রিয় প্রতিবেশীতে পরিণত হতে পারেনি। শাসক গোষ্ঠির সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই বিদ্রোহের সময়ে যে অসন্তোষ বিরাজ করেছিলো তার একটি প্রধান কারণ বলে শানোন-এর লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ভার্ণির ধারণা। আমার মনে হলো ইংরেজ অধিবাসীরা এদেশীয়দের প্রতি অনেকটা বিতৃষ্ণ, তা তাদের আচার আচরণেই দেখতে পেলাম। আমার ধারণা, ভারতের প্রতিটি ইংরেজের মনে এদেশীয়দের প্রতি যে গভীর ঘৃণাবোধ ছিলো তা-ই বিদ্রোহের একটি কারণ। এদেশীয়দের প্রতি ইংরেজরা যখন কোনো দয়া করতেন, তখন তাঁদের চোখে-মুখে ঘৃণাবোধটাই সুস্পষ্টভাবে প্রকটিত হয়ে উঠতো। এমনকি যাজক এবং অন্যান্যরা, যারা হিন্দুদের ভালো করতে চেষ্টা করতেন, তারাও আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে, যারা আমাদেরকে অস্পৃশ্য বলে গণ্য করে, তাদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করতে হয়। আমাদের ভোলা উচিত নয় যে মুষ্টিমেয় বিদেশী-যারা অসংখ্য বিদেশীর উপর শাসনকার্য পরিচালনা করেন, তারা যদি এদেশের জনস্রোতে মিশে যেতে রাজী না হন, তাহলে তাদেরকে একটি সংঘবদ্ধ একক হিসাবে একটি উন্নত সম্প্রদায় বলে নিজেদের প্রমাণিত করতে হবে। অন্যথা, শুধুমাত্র নিরাপদ ব্যবধানে রেখে তারা শাসিতদের শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হবে না। শাসক এবং শাসিত দু’শ্রেণী যখন দু’টি বিভিন্ন জাতি তখন জাতিগত কৌলীন্য থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন মারমুখী প্রভেদ ঘুচাবার মধ্যপন্থা বের করে নেয়া সত্যিই অসম্ভব। ভারতীয়দেরকে ইংরেজরা সব সময় অবজ্ঞা করতেন। কোম্পানীর বিশ্বস্ত কর্মচারী স্যার সৈয়দ আহমদ খান বলেছেন, প্রথমদিকের বছরগুলোতে জনগণ কোম্পানীর শাসন পছন্দ করেছিলো। তিনি বলেন, “সরকার আপনা থেকেই জনগণের শুভেচ্ছার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন এবং সেজন্য সঙ্গত কারণেই জনগণ মনে করে যে তাদের সঙ্গে অসম্মানজনকভাবে আচরণ করা হয়। একজন ডিউকের কাছে একজন সাধারণ অফিসারের মূল্য যতোটুকু একজন এদেশীয় ভদ্রলোককে ঐ অফিসার এতোটুকু মূল্যও দেন না। একথা সরকার ভালোভাবে জানেন না যে অভিজাত দেশীয় ভদ্রলোকদের কোম্পানীর অফিসারের সামনে আসতে হৃদকম্প হতো আতঙ্কে। কিশোরীচাঁদ মিত্র, যিনি নিজেকে অনুগত নাগরিক এবং শিক্ষিত শ্রেণীর প্রতিভূ বলে দাবি করতে পারেন, তিনিও নালিশ করেছেন যে, ইউরোপীয় অফিসারদের রুষ্ট মেজাজই তাদের সাধারণ জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলো। তাঁদের মধ্যে তার ফলে আসমান জমিন দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিলো এবং একে অন্যের মনোভাব বুঝতে পারতো না। ইংরেজরা ভারতীয়দের থেকে অনেক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। রাসেল বারানসী যাবার সময় লক্ষ্য করেছেন, কোনো সাদা মানুষের গাড়ির প্রতি জনসাধারণ প্রতিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়নি। তিনি বলেছেন, সে চোখের ভাষা কে পারে ভুল বুঝতে? শুধুমাত্র তা থেকেই আমি জানতে পারলাম আমার জাতকে এক সময়ে অনেকে ভয় করেছে, এখন ঘৃণা করতে শুরু করেছে।

উপযুক্ত দেশীয়দেরকে সরকারি চাকুরি থেকে ধারাবাহিকভাবে বহিষ্কার করার কারণে ভারতীয়দের অসন্তোষ আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। ভারতীয়রা শাসন বিভাগে ডেপুটি কালেক্টর এবং বিচার বিভাগে সদর আমীনের চাইতে কোনো উচ্চতরো চাকুরিতে নিয়োজিত হতে পারতো না। কিন্তু ভারতীয়দের মধ্যে কোনো প্রতিভার অভাব ছিলো না। তাদের পিতা পিতামহরা যে এদেশ শাসন করেছে, সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছে, সে স্মৃতি এখনো তাদের মনে জীবন্ত। আইনের চোখে সকলকে সমান করে দেয়ার কারণে, ভারতের অভিজাত সমাজের অভিযোগ ফেনিয়ে উঠলো। ব্রিটিশ আইন ধনী-নির্ধন, উঁচু-নীচ, রাজা এবং প্রজার মধ্যে কোনো ভেদাভেদ রাখেনি। লখনৌর ওয়ালী বিরজিস কাদের তাঁর এক ফরমানে বলেছেন, হিন্দু মুসলমান সকলের কাছেই চারটি জিনিস পরম মূল্যবান। প্রথম হলো ধর্ম, দ্বিতীয় হলো সম্মান, তৃতীয় জীবন, চতুর্থ সম্পদ। দেশীয় শাসকদের অধীনে এ চারটি জিনিস সব সময় নিরাপদ। তিনি আরো বলেছেন, আগের শাসনামলে অভিজাত মুসলমান এবং উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের সম্মান রক্ষা করা হতো। কিন্তু ইংরেজরা উল্লেখিত চারিটি জিনিসের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ এবং নীচের সম্মান এবং মর্যাদা তাদের আইনে এক করে ফেলা হয়েছে। নীচ সম্প্রদায়ের তুলনায় উচ্চবর্ণ এবং অভিজাতদের সঙ্গে তারা আরো খারাপ ব্যবহার করে। এ অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়। কিন্তু তাতে ইংরেজদের কৃতিত্বই প্রমাণিত হয়। তারা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কারণেই তা করেছিলেন। সে যাহোক, অনেক ইংরেজ ভদ্রলোক এবং অধিকাংশ ভারতীয় এর বিরোধিতা করেছিলেন। লখনৌ ঘোষণার মধ্যেও একই মনোভাবের প্রকাশ দেখা যায়। রাজা এবং নওয়াবদের যে ইংরেজরা হাজির হতে বাধ্য করে তাদের সঙ্গে চামারের তুলনা করা হয়েছে। আইন লোকের সম্মানের রক্ষক রইলো না। আর, এতোকাল যে সকল লোক আইনের উর্ধ্বে ছিলেন, তাঁদেরকে আইনের আওতায় আসতে বাধ্য করার ফলে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষের সীমা রইলো না। তাছাড়া এ আইন জনগণের কাছেও প্রিয় ছিলো না। তার কারণ এ নয় যে, আইন নিষ্ক্রিয় ছিলো, বিচারালয়গুলোর দুর্নীতিই আইনের অপ্রিয় হওয়ার কারণ। তা ছাড়া এদেশের অশিক্ষিত জনগণ ইংরেজদের আইনের অতো ঘোরপ্যাঁচ বুঝতে পারে না। তাদের বক্তব্য পেশ করার জন্য একজন উকিল নিয়োগ করা তাদের অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিলো না। আগেকার প্রথা অনুসারে ধনী-দরিদ্র সকলেরই অবাধে বিচারালয়ে প্রবেশ করতে কোনো বাধা ছিলো না। সকলেই খোলাখুলি আপনাপন অভিযোগ ব্যক্ত করতে পারতো। একজন দরিদ্র কৃষককেও কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হতো না। ডেপুটি কমিশনারের বিচারালয়কে খোলা বিচারসভা বলে শোনার পর একবার সীতারাম চাপরাশীর নির্দেশ অমান্য করে বিচার কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন এবং সে জন্য দশ টাকা অর্থদণ্ড হয়েছিলো। সীতারাম কিভাবে যে আইন লঙ্ঘন করেছিলেন, এ কথা কোনোদিন বুঝতে পারেননি; পুলিশ এবং ছোটখাট কর্মচারীদের দুর্নীতির কুখ্যাতি এবং মন্দ আচরণের জন্য বিচারালয়গুলো আরো অপ্রিয় হয়ে পড়লো। দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে লাগলো অধীনস্থ কর্মচারীরা যে টাকা উৎকোচ গ্রহণ করে তার একাংশ বড়ো সাহেবের কাছেও যায়। সুতরাং বিচারালয় ধনীদের হাতের একটি অস্ত্র হয়ে দাঁড়ালো, বিচারালয়ের মাধ্যমে অত্যাচার করা হতে লাগলো। মিথ্যা সাক্ষ্য দেবার মানুষ কিনতে পাওয়া যেতো এবং মিথ্যা দাবি হাজির করা হতো। জমি বিক্রয়ের আইনটা ছিলো সবচেয়ে অপ্রিয়। প্রাচীন প্রথা অনুসারে জমি বেহাত হতো না। একজন মালিক যদি বকেয়া খাজনা শোধ না করতে পারতো তা হলে, আত্মীয় স্বজনেরা মুক্ত করে না নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাদেরকে আটক করে রাখা হতো। তাছাড়া ফসলের মাধ্যমে খাজনা পরিশোধ করতে হতো। তাও পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ফসলের সময়ে আদায় করা হতো। এ পদ্ধতিটা সেকেলে এবং সংস্কার সাপেক্ষ ছিলো তাতে সন্দেহ নেই। কোম্পানীর সরকার বকেয়াদারদের জমি দখল করে নেয়ার কার্যকরী, সরল এবং দ্রুত পদ্ধতির প্রবর্তন করলেন। থিয়োরীগতভাবে দেখতে গেলে এ পদ্ধতির কোনো দোষ পাওয়া যাবে না। যদি সে খাজনা শোধ করতে না পারে তা হলে স্বত্ব হারাবে। কিন্তু জমির প্রতি তাদের ছিলো অন্তহীন মমতা। খাজনা ছাড়াও জমির মাধ্যমে একটা সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিলো। যারা কেউ হয়তো তাদের আত্মীয় নয়, একই গ্রামবাসী কৃষক হয়তো সকলে। জমি হারালে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হতো না, সামাজিক মর্যাদাও চলে যেতো।

খাজনার পরিমাণ পরিমিত হলে জমি বিক্রয়ের আইন প্রজা সাধারণের তেমন ক্ষতি করতো না। সরকার খাজনা নিরূপণের স্পষ্ট আইন করে দিয়েছেন। কড়াকড়ি ভাবে আইনানুসারে সবকিছু করা হলে কখনো অঘটন ঘটতো না। মথুরার কালেক্টর মিঃ থর্ণহিল এ সম্বন্ধে বলেছেন, সরকারি আইনের প্রতি নিয়মিত আনুগত্য পোষণ করা হলে, কর্মচারীদের পদোন্নতি হয় না। খাজনা নির্ধারণের জন্য জমি জরীপের ভার ছিলো তরুণ কর্মচারীদের ওপর-যদের চাকুরি জীবনের সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ এর ওপর নির্ভর করছিলো। তারা এমন বেশি খাজনা ধার্য করলো যা জমিদারদের পক্ষে দীর্ঘদিন নিয়মিতভাবে শোধ করা অসম্ভব ছিলো। ভাল ফসলের সময় অল্পস্বল্প খাজনার দাবি মেটালেও অজন্মর বছরে তারা দাবি মেটাতে গিয়ে একেবারে ধ্বংস হয়ে গেলো। উইলিয়াম এডওয়ার্ড নামে এক ব্যক্তি যিনি বদাউনের ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টর ছিলেন তাঁর বক্তব্যেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। জমিদার তালুকদার এবং বেশি জমিনের মালিকদের দুর্দশার অন্ত নেই। অন্যদিকে কোম্পানীর শাসনের সুযোগ নিয়ে নতুন গজানো বেনিয়া সম্প্রদায় ফেঁপে ফুলে উঠতে লাগলোলা। সামন্ত এবং দেশীয় রাজন্যবর্গ পেনশনভোগীতে পরিণত হলেন। সুতরাং বিপদের সময়ে সরকারি ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়লে শান্তি এবং শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য গ্রামাঞ্চলে কেউ সচেষ্ট হননি।

শাহরানপুরের ম্যাজিস্ট্রেট বলেছেন, “কতিপয় সুদখোর মহাজন সম্প্রদায়, যাদের নীতি বলতে কিছু নেই তাদেরকে অজ্ঞ দরিদ্র কৃষক শ্রেণীর উপর জোরজুলুম করার সুযোগ করে দেয়ার কারণেই কৃষিজীবীরা আমাদের শাসনকে মন-প্রাণ দিয়ে ঘৃণা করে। আমি দেখেছি সামান্য জমির মালিকেরাই আমাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিশোধের মননাভাব পোষণ করছে। কারণ বেনিয়ারা আইন এবং আদালতের সাহায্যেই তাদের দখলী স্বত্ব থেকে উচ্ছেদ করেছে।

শুধুমাত্র জমিদার এবং তালুকদার শ্রেণী পিতৃপুরুষের পেশা থেকে বঞ্চিত হয়নি, নতুন আইন কৃষকদেরও চরম সর্বনাশ করেছে। মহাজনদের কাছে তারা সব সময় ঋণের দায়ে আবদ্ধ থাকতো। কুসিদজীবী বেনিয়ারা জাল জুয়াচুরি করে আইনের বলে দখলী জমি আদালতের সাহায্যে নিজেদের দখলে নিয়ে এলো। একই বিপদের কারণে নয় শুধু, সামন্ততান্ত্রিক প্রশ্রয় এবং আনুগত্য ভূমিহারা কৃষক এবং জমিদারের ঐক্য জোরদার করে তুললো। জমিদারেরা বাস করতেন গ্রামে। মাঝে মধ্যে কৃষকদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন করলেও কৃষকেরা বিপদের দিনে জমিদারের পক্ষই সমর্থন করতো। বেনিয়ারা হলো বহিরাগত। তারা লাভের আশায় কৃষকের জমির মালিকানা স্বত্ত্ব ক্রয় করতো। সুতরাং তাদের এবং কৃষকদের মধ্যে কোনো আনুগত্য, স্নেহ কিংবা গভীর অনুভূতির বন্ধন সম্ভব ছিলো না। এখনও কৃষকেরা সামন্ত প্রভুদের সমর্থন করতে বাধ্য।

গ্রামের রাত্রিকালীন চৌকিদার, যাদেরকে বলা হতো পাচি, সরকারের বিরুদ্ধে তাদেরও অভিযোগ আছে। ভূমি মালিক শ্রেণীর ন্যায় তারা পিতৃপুরুষের পেশা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। লখনৌর ওয়ালী বিরজিস কাদের আরেক ফরমানে জনিয়েছেন, “প্রতিটি শহর এবং গ্রাম পাহারা দেয়ার প্রহরীরা জেনে রেখো, ইংরেজ সরকার তোমাদের স্থলে বরকন্দাজ বাহিনী নিয়োগ করে তোমাদেরকে পূর্বপুরুষের পেশা থেকে বঞ্চিত করেছে।” এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ওলোট পালোট হয়ে গেলো এবং উৎসাহী ইংরেজ সরকার যে সকল সংস্কার করেছিলো সেগুলো জীবনের সকল ক্ষেত্রে নির্যাতনরূপে দেখা দিলো। ফলে অসন্তোষ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো। সময় এবং শিক্ষার প্রভাবে হয়তো ক্ষতি পুরিয়ে নেয়া যেতো। কিন্তু নতুন প্রবর্তিত এ সকল আইনকানুনের একটি ভালো দিকও তারা দেখতে পায়নি।

সীতাপুরের কমিশনার জি. জে. ক্রিশ্চিয়ান সাহেব বিদ্রোহ আরম্ভ হওয়ার পরে রাইক সাহেবের কাছে লেখা এক চিঠিতে আক্ষেপ করে বলেছেন যে সকল গ্রামীণ সংস্কার দারিদ্র্যের দিক দিয়ে যা সকল মানুষকে এক সমান করে ফেলেছে, বিক্ষুব্ধ জেলাসমূহে তারাও এখন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। তাদেরকে বশে রাখতে পারার মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও সরকারের নেই। সেনাবাহিনীর এই রকম অবস্থা। বলতে গেলে মৃতকল্প। একজনও ভদ্রলোক নেই। সামরিক মর্যাদা ছাড়া তাদের আর কিছুই নেই।

নতুন আইন এবং শাসন ব্যবস্থার ফলে এক শ্রেণীর মানুষের উদ্ভব হলো, যারা আইনের সুযোগ নিলো পুরোপুরি এবং এটাকে তাদের অধিকার মনে করলো। কিন্তু খ্রস্টান ধর্ম প্রচারকদের বাড়াবাড়ির ফলেই বিপত্তি ঘনিয়ে আসতে লাগলো। সৈয়দ আহমদ বলেছেন, ১৮৩৭ সালের দুর্ভিক্ষের সময় অনেকগুলো অনাথ শিশুকে খাবার এবং আশ্রয় দেয়া হয়। পরে তাদেরকে খ্রীস্টান করে ফেলা হয়। দেখে জনগণের মনে গভীর সন্দেহের উদ্রেক হলো, সরকার প্রথমে সমস্ত অধিবাসীদেরকে দরিদ্র করবে এবং পরে তাদেরকে খ্রীস্টান বানাবে। হিন্দুস্থানের বাসিন্দারা ভাবতে লাগলো তাদেরকে গরীব করার জন্য ও তাদের ধর্মনাশ করার জন্যই সমস্ত আইন পাশ করা হয়েছে।

আজমগড় বিদ্রোহীদের ঘোষণায়, স্পষ্টতঃ এ মনোভাবের প্রকাশ দেখা যায়। বিধর্মী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সকল শ্রেণীর অধিবাসীকে তারা আহ্বান করেছিলেন। জমিদারদের বলা হলো ব্রিটিশ সরকার জমির দাম বেশি দিয়ে থাকে এবং তা আপনাদের জানা কথা। তা ছাড়া আপনাদের বিরুদ্ধে কোনো চাকর কিংবা চাকরাণী নালিশ করলে কোনো রকমের তদন্ত ছাড়াই আপনাদেরকে আদালতে হাজির হতে হবে। এভাবে আপনাদের সম্মান এবং মর্যাদা ধূলায় লুটিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের আদালতে কোনো নালিশ রুজু করতে চাইলে আপনাদের ষ্ট্যাম্প কিনতে হবে, কোর্টে ফি দিতে হবে, এ সব অত্যন্ত জঘন্য প্রথা। তার বাদেও আপনাকে পথ কর এবং স্কুলের শিক্ষা কর দিতে হবে।

ব্যবসায়ীদের বলা হলো, আপনারাও ভালোভাবে জানেন যে বিধর্মী ইংরেজ নীল, আফিম, কাপড় সমস্ত লাভের ব্যবসা দখল করে বসেছে। অলাভজনক ব্যবসাগুলোই আপনাদের জন্য রয়েছে। আপনাদের তাদের আদালতের আশ্রয় নিতে হয়, স্ট্যাম্প ইত্যাদি ক্রয় করে টাকা খরচ করতে হয়। অধিকন্তু তারা জনগণের কাছ থেকে ডাকটিকেট এবং স্কুলের তহবিলের জন্য টাকা আদায় করে। জমিদারদের মতো আপনাদেরও ছোট-লোকেরা নালিশ করলে তাদের আদালতে নিয়ে গিয়ে আপনাদের সম্মানের হানি করে, দণ্ড দিতে বাধ্য করে।

সরকারি কর্মচারীদের সজাগ না হয়ে উপায় নেই, কারণ সামরিক এবং সাধারণ সমস্ত কম মাইনের অসম্মানের চাকুরি ভারতীয়দের আর বেশি মাইনের, মর্যাদার সমস্ত চাকুরিতে ইউরোপীয়রাই বহাল হয়!” কারিগর শ্রেণীর চেয়ে দেখুন, ইউরোপীয়রা সমস্ত রকমের জিনিস ইউরোপ থেকে নিয়ে আসে। আপনাদের হাতের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, ঘোষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মবেত্তা পণ্ডিত এবং মৌলানারা ভুলে যাবেন না যে, ব্রিটিশেরা হলো আপনাদের ধর্মের দুশমন। আপনাদের আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ লাভে ধন্য হওয়া উচিত। নয়তো আপনারা পাপী বলে বিবেচিত হবেন।

শুধুমাত্র রাজপুরুষদের বাদ দেয়া হয়েছে। তাদেরও ধ্বংস এবং রাজ্যহীন করার ভয় দেখানো হয়েছে। ১৮৪৯ সালে ইংরেজরা পাঞ্জাব দখল করে নিলো। পাঞ্জাবের রাজা ছিলেন কোম্পানীর অধীনস্থ মিত্র। মুলতান অভ্যুত্থান, যার ফলে দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধের সূত্রপাত, তার সঙ্গে পাঞ্জাবের রাজার কোনো সম্বন্ধ ছিলো না। আসল ওয়ারিশের অভাবে সাতারা, ঝাসী, তাঞ্জোর ইত্যাদি ছোট ছোট রাজ্যগুলো কোম্পানী গ্রাস করে নিলো। পেশবার রাজ্যকে সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার সময় মারাঠাদের আত্মাভিমান অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য সাতারায় সর্দার প্রথার প্রবর্তন হয়। এই ক্ষুদ্র রাজ্যটিতে পুরোনো অভিজাত বংশের উত্তরাধিকারীরা তখনো সামরিক এবং শাসন বিভাগীয় উচ্চপদে আসীন হওয়ার আশা পোষণ করতেন। ঝাসীর শাসকেরা কোম্পানীর অনুগ্রহে একবার ওয়ারিশ নির্বাচন করেছেন। পুত্রহীন অবস্থায় এক ভাই মারা গেলে আরেক ভাইকে উত্তরাধিকারী করা হয় একবারের বেশি। অনেক দিন ধরে তাঞ্জোর ছিলো কোম্পানীর অধীন মিত্র। রাজবংশ ছিলো মারাঠা। কিন্তু এসব মারাঠা রাষ্ট্র নয় শুধু, বৈধ পুত্র সন্তানহীন অবস্থায় নাগপুরের শেষ রাজা মৃত্যুমুখে পতিত হলে তাঁর রাজ্য কোম্পানীর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত রাজবাড়ির মহিলাদের আপত্তি সত্ত্বেও এভাবে রাজ্যগ্রাস করার নীতি এবং পদ্ধতি জনগণের মধ্যে অপরিসীম অসন্তোষের সৃষ্টি করে। ভোঁসলার অস্থাবর এবং স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে যাওয়া হয়। দুটো রাজকীয় হস্তী, অনেকগুলো ঘোড়া এবং বলদ সিতাবলদীতে পশু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। রাজবাড়ির আসবাবপত্র সরাতে চাইলে বিদূষী মহিলা রাণী বঙ্ক বাঈ রাজবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবার ভয় দেখায়। কিন্তু আসবাবপত্র তারা নিয়ে গেলেই গেলো। ভেসলা পরিবারের অলঙ্কার এবং মণি মাণিক্য কলকাতার বাজারে প্রেরণ করা হলো। রাজ্য দখল করার চাইতে স্থাবর অস্থাবর জিনিসপত্র ও অলঙ্কার নিয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া খুবই খারাপ হয়েছিলো।

সম্বলপুরের সর্দারের ক্ষুদ্র রাজ্যকে একসময়ে নাগপুরের অধীনে করা হয়েছিলো, পরে সাম্রাজের অন্তর্ভুক্ত করে নিলো। মুর্শিদাবাদের নওয়াবদের মতো কর্ণাটকের নবাবেরাও বহুকাল আগেই রাজ্যশাসন করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ১৮৫৪ সালে নওয়াব খ্যাতিরও অবসান হলো। পরবর্তী বছরে হিন্দুরাজ্য তাঞ্জোরও গেলো। রাজপুত রাজ্য কারৌলীর উপর কোনো জোর প্রয়োগ করা হয়নি। সাতারা এবং ঝাঁসীর মতো যে সকল রাজ্য ব্রিটিশের সৃষ্ট নয় সেগুলো যতোই ক্ষুদ্র হোক না কেনো, গ্রাস করার ব্যাপারে বিচার বিবেচনা করতে পারতেন। বড়লাট ডালহৌসী। আইনের কোনো সুবিধা পেলেই ব্রিটিশ শাসনের কল্যাণে হস্ত প্রসারের ব্যাপারে কোনো রকম বিলম্ব করতেন না। এ জাতীয় সমস্যা দেখা দিলে তার সহকর্মীদের পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজনও অনুভব করতেন না। তার উদ্দেশ্যের মধ্যে গলদ আবিষ্কার করা অসম্ভব। রাজ্যসমূহের অন্তর্ভূক্তির ফলেই ভারত সংযুক্ত করতে পেরেছে, যাকে ভারতীয় জাতীয়তার ভিত্তি বলা যেতে পারে। কিন্তু ডালহৌসীর তেমন কোনো আকাক্ষা ছিলো না। ডালহৌসীর নির্জলা সাম্রাজ্যবাদী নীতি কোনো উপকার করেনি। ঝাঁসীর রাণী এ অন্তর্ভুক্তিকে মেনে না নিয়ে সুপ্রীম কোর্টে প্রতিনিধি পাঠালেন। সাঁতারা রাজ্যের পক্ষে ওকালতী করার জন্য রঙ্গ বাপুজী লন্ডন যাত্রা করলেন। সম্বলপুরের রাজবংশীয়েরা যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। কর্ণাটক এবং তাঞ্জোরের এহেন পরিণতিতে ভারতীয় জনমত বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। কারণ, ও দু’টো রাজ্য সব সময় অনুগত ছিলো এবং দীর্ঘদিন যাবৎ কোম্পানীর সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রক্ষা করে আসছে। তারপরেও ব্রিটিশের সুবিচার সম্পর্কে যতোটুকু শ্রদ্ধা ছিলো ১৮৫৬ সালে অযোধ্যা গ্রাস করার পর তার তিলমাত্র অবশিষ্ট রইলো না।

সীতারামের মতে, তালুকদার এবং সর্দারেরা মতামত পোষণ করলো, সরকার নওয়াবকে অসম্মান করেছেন, তাঁর প্রতি অবিচার করেছেন। হেদায়েত আলী আরো পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, “অযোধ্যার অন্তর্ভূক্তির সময় হিন্দুস্থানের সকলেই বলাবলি করছিলো ব্রিটিশ সরকার অযোধ্যার নওয়াবের সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে (আমার বিশ্বাস, এরকম একটা সন্ধিপত্র ছিলো) তারা কখনো নওয়াবের রাজ্যদান করেছেন। হিন্দুস্থানের সকলে বলাবলি করতে লাগলো রাজা নওয়াবের, তিনি নিজের সরকারের ব্যাপারে যাই করে থাকুন না কেনো, কোনোক্রমেই ইংরেজদের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করেননি। এতে অনুগত এতো বিশ্বস্ত নওয়াবের যখন এ অবস্থা, স্বাধীন রাজা এবং নওয়াবদের অবস্থা কি হবে?

অযোধ্যা দখলের সংবাদে ইংরেজ ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলারাও উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছিলো। এ দুঃখজনক ঘটনা তাঁদের বিচলিত করে তুলেছিলো। এটাকে তারা অন্যায় কাজ বলেছেন। মিসেস হ্যারিস লিখেছেন সে সম্বন্ধে, “আজকে ডিনার পার্টিতে অযোধ্যায় অন্যায়ভাবে অন্তর্ভুক্তির কথা আলোচনা হচ্ছিলো, আমরা শাসিতদের প্রতি যে অবিচার করছি তাতে করে জাতীয় মর্যাদাকেই অবনমিত করছি। আমাদের নওয়াবের আপন লালসা এবং লোভের শেষ বলী হতে হলো অযোধ্যাকে।”

বাঙ্গালী পল্টনে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ এবং রাজপুতদের ভর্তি করানোই বিদ্রোহের কারণ বলা হয়। কর্ণেল হান্টার সে কথা অস্বীকার করেছেন। সাঁওতাল এবং ভীলদের কোন গোত্র নেই, কোনো কোনো অঞ্চলে তারা বিদ্রোহী সেপাইদের সহায়তা করেছে। নিম্নশ্রেণীর যোগানদার সৈন্যরা মীরাটে সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছে। উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণ যেমন, তেমনি নিম্নশ্রেণীর পাচিরাও ধর্মযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে। সুপরিকল্পিত অথচ সুচিন্তিত নয়, এমন কতেক আইন এবং শাসন পদ্ধতি প্রবর্তনের ফলে সেপাইদের মনে অবিশ্বাস এবং সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। তার ফলে সরকারের প্রতি সেপাইরা সম্পূর্ণ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। তা ছাড়া পরবর্তী গভর্ণর জেনারেলদের অপ্রিয় শাসনের ফলে জনগণ বিশ্বাস হারাতে থাকে। লর্ড ডালহৌসীকে সাধারণভাবে অভ্যুত্থানের জন্য দায়ী করা হয়। কিন্তু অন্য কোন কারণ না থাকলে তার কোনো কাজের ফলে অভ্যুত্থান হতে পারতো না। এ জন্য লর্ড আমহার্স্ট, লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক, লর্ড অকল্যান্ড, লর্ড এলেনবরো সকলেরই নিজের নিজের অবদান রয়েছে। বিদেশী সরকার জনগণের আনুগত্যের ওপর নয়, সামরিক শক্তির ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিলো। সেপাইরা উপলব্ধি করতে পারলো, এতোকাল তারাই তো বজ্রবাহু দিয়ে এ সাম্রাজ্য রক্ষা করেছে, এখন ইচ্ছে করলে ভেঙ্গে ফেলতে পারে। তবু তারা নিমকহারামী করেনি। কিন্তু যখন দেখতে পেলো যে পিতৃপুরুষের ধর্মের উপর আঘাত আসছে সে আনুগত্যের ভিত্তিমূল বিদীর্ণ হয়ে গেলো। শিক্ষিত সম্প্রদায় জনগণের সঙ্গে সংযোগ করে হয়তো এ অভ্যুত্থান ঠেকাতে পারতেন, সরকার তাঁদের সে সুযোগ দেননি। বিদ্রোহের কারণগুলো অনেকদিন ধরে সঞ্চিত হয়েছিলো-চর্বি মাখানো টোটা বেগকে ত্বরান্বিত করেছিলো মাত্র।

২. ঘটনা পরম্পরা

সেনাবাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত করতে হবে। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যকাল যাবত ব্রাউন বেস নামক আগ্নেয়াস্ত্রই ছিলো সেপাইদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। ১৮৫২ সালে মাষ্টার জেনারেল অব দ্যা অর্ডন্যান্স ভাইকাউন্ট হার্ডিঞ্জ-এর আদেশানুক্রমে এনফিল্ড অস্ত্র উন্নয়নের পরীক্ষা করা হয় এবং নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এক ধরনের রাইফেলের উদ্ভাবন করা হয়। ১৮৫৩ সালের ক্রিমিয়ার যুদ্ধে নতুন রাইফেল পরীক্ষা করে বেশ সুফল পাওয়া যায় এবং ১৮৫৬ সালে ভারতে এ রাইফেল চালু করা হয়। রাইফেলের সঙ্গে লন্ডন থেকে এলো চর্বি মাখানো টোটা। পরে ভারতীয় সেপাইদের ব্যবহারের জন্য কলকাতা দমদম এবং মীরাটে এ টোটা তৈরি হতে থাকে। এ উন্নত ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার শিক্ষা করার জন্য নির্বাচিত সেপাইদের দমদম, আমবালা এবং শিয়ালকোটের ট্রেনিং কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। একজন উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণ একজন নীচ শ্রেণীর লস্করের কাছে জানতে পারলো যে। টোটার সঙ্গে মাখানো রয়েছে আপত্তিজনক পশুর চর্বি। এ খবর জানার পূর্বে পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। দাবানলের মতো খবর ছড়িয়ে পড়লো। সেপাইদের মধ্যে অসন্তোষ এবং বিক্ষোভের সঞ্চার হতে থাকে। কলকাতা ধর্মসভা এ খবর প্রচার করে ইংরেজ অফিসারকে সতর্ক করে দিলো। তারাও এ সম্বন্ধে ভালোভাবে ওয়াকেবহাল হলেন।

১৮৫৭ সালের ২২শে জানুয়ারি লেফটেনান্ট রাইট বিষয়টি দমদম আগ্নেয়াস্ত্র বিভাগের কম্যাণ্ডিং অফিসার মেজর বন্টেনের দৃষ্টিগোচর করলেন। মেজর বন্টেন তাঁর ঊর্ধ্বতন অফিসারের কাছে লিখলেন, “গতকাল সমস্ত দেশীয় সেপাইদেরকে প্যারেড করবার সময়, কোন অভিযোগ থাকলে জানাতে বলেছিলাম। কমপক্ষে তিনভাগের দু’ভাগ সৈন্য সামনে এসে দাঁড়ালো। তার মধ্যে কমিশন প্রাপ্ত সমস্ত দেশীয় অফিসারেরাও ছিলো। অত্যন্ত ভদ্রোচিতভাবে তারা জানালো যে বর্তমান কার্তুজ তৈয়ারীর পদ্ধতির বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি আছে। তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছে যে কার্তুজে যে চর্বি মেশানো হয়, তা তাদের ধর্ম-বিশ্বাসের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এর বিকল্প স্বরূপ সেপাইরা নোম এবং তেলের ব্যবহার করে কাজ চালাবার পরামর্শ দান করেছে।” এটা পরিষ্কার সেপাইদের মনে প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়, তার মূলে ছিলো ভয়, কোন প্রকারের ক্রোধ নয়। তারা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বন্টেনের কাছে কেননা টোটা ব্যবহার করতে পারবে না তার সঙ্গত কারণ নির্দেশ করেছে। তার বিকল্প ব্যবস্থাও দেখিয়ে দিয়েছে। প্রচারিত খবরে সেপাইদের সন্দেহ করার যথার্থ কারণ ছিলো যে কার্তুজের সঙ্গে অবশ্যই আপত্তিজনক কিছু মাখানো রয়েছে। কীথ ইয়ং-এর কাছে এক পত্রে প্রদান সেনাপতি স্বয়ং লিখেছেন, “কার্তুজের সঙ্গে মেশানো স্নেহ পদার্থের (চবি) পরিমাণ দেখে সেপাইরা যে আপত্তি করেছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।” মার্চ মাসের ২৩ তারিখে এ পত্র লেখা হয়েছিলো। কিন্তু পয়লাদিকে সেপাইদের মনে যে কোনো সন্দেহের উদয় হয়নি, সে সম্বন্ধে একরকম নিশ্চিত করেই বলা যায়। ফোর্ট উইলিয়ামের অস্ত্র বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল কোনো প্রমাণ দেখাতে পারলেন না যে চর্বি আপত্তিজনকভাবে সংগৃহীত হয়নি। ২৯শে জানুয়ারি তিনি লিখেছেন যখন আমি শুনতে পেলাম, সামরিক ডিপোর দেশীয় সেপাইরা দমদমে চর্বি ব্যবহারে আপত্তি করেছে, আমি তখনই পরীক্ষা করে দেখলাম যে লন্ডনের ডিরেকটর সভা যেভাবে তৈরি করতে নির্দেশ দান করেছেন, সেভাবেই তা তৈরি করা হয়েছে। তাতে চর্বি এবং মৌমাছির মোম মেশানো হয়েছিলো। আপত্তিজনক চর্বি ব্যবহার না হতে পারে তার জন্য পূর্ব থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এখানে অবশ্য স্বীকার করা হয়নি যে কোনো গরুর চর্বি মেশানো হয়েছে। তেমনি এ মসৃণকারী পদার্থ কিভাবে তৈরি করা হচ্ছে সে সম্বন্ধে ব্রাহ্মণ সন্তানদেরও কোনো ধারণা ছিলো না। চর্বি এবং মোম সরবরাহ করতো একজন বাঙালি ব্রাহ্মণ ঠিকাদার। তার লোকজন হয়তো বাজার থেকে সস্তা চর্বি কিনেও সরবরাহ করতে পারে। তখন ইংরেজরা ধরে নিয়েছিলো ঠিকাদার খারাপ চর্বি সরবরাহ করেছে, কারণ তাকে অন্য চর্বি ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়নি। ২৩শে ফেব্রুয়ারী ‘টাইম পত্রিকার সংবাদদাতা লিখেছেন, “নতুন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে চর্বি মাখানো হয়, যাতে করে সহজে নলের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়। সরকার ঠিকাদারকে ছাগলের চর্বির জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন, সামান্য পয়সা বাঁচাবার জন্য ঠিকাদার গরু অথবা শুয়রের চর্বি সরবরাহ করেছে।” কতিপয় সেপাই কলকাতা দুর্গের অধ্যক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন একজন উচ্চ বর্ণের হিন্দু এবং একজন মুসলমানকে চর্বি মাখানোর কারখানায় নিয়োগ করলে সমস্ত সন্দেহের অবসান হয়। অধ্যক্ষের নিয়োগে কোনো আপত্তি ছিলো না, কারণ তার ফলে সেপাইদের মনের সন্দেহের নিরসন হবে। কিন্তু অস্ত্র বিভাগ তা অনুমোদন করলো না। স্বভাবতই সেপাইরা ভাবতে লাগলো যে কর্তৃপক্ষের নিশ্চয়ই কোনো খুঁত আছে, নয়তো দুর্গের অধ্যক্ষের এমন ভালো পরামর্শ তারা গ্রহণ করলো না কেনো?

চর্বি মাখানো টোটার ব্যবহারের পেছনে সত্যিকারের কোনো ভালো মনোভাব ছিলো না। ১৮৫৩ সালে এ কার্তুজ ব্যবহারের জন্য নয়, আবহাওয়ায় উপযুক্ত কিনা পরীক্ষা করে দেখবার জন্য ভারতে আমদানী করা হয়। ভারতীয়দের দিয়ে পরীক্ষা করালে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে এ সম্বন্ধে কর্ণেল টুকার সামরিক বোর্ডকে হুঁশিয়ারী করেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র ইউরোপীয় সৈন্যদের মধ্যেই টোটা বিতরণ করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন সে সময়ে। তাঁর সতর্কবাণীর কোনোই আমল দেয়া হয়নি পরবর্তীকালে। ভারতীয় সেপাইদেরকেও থলিতে করে টোটা বইতে দেয়া হয়। সে যাকগে, কিসের চর্বি সে সম্বন্ধে একবারও সেপাইদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়নি, দুর্যোগের পূর্ব পর্যন্ত। ১৮৫৭ সালে সেপাইরা ন্যায্য কারণে আপত্তি তুললো। যদি তারা টোটা কামড়ে বন্দুকে পূরে তাহলে তাদের ভীষণ সামাজিক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। সরকার টোটার ব্যবহার বন্ধ অথবা সেপাইদেরকে আপনাপন চর্বি তৈরি করতে দেবে কিনা এবং এ সম্বন্ধে তাদের ভয়ের কোনো কারণ আছে কিনা তা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। কিন্তু দমদমে যে টোটা বিলি করা হয়েছিলো, তাতে সন্দেহ নেই। কোনো নিষিদ্ধ চর্বি ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা সে সম্বন্ধে কোনো সর্তকতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য অস্ত্র বিভাগ গুরুতরভাবে অপরাধী।

সরকার ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। ব্যারাকপুরের সৈন্যাধ্যক্ষ জেনারেল হীয়ার্সে সেপাইদেরকে তাদের পছন্দ অনুসারে চর্বি তৈরি করতে অনুমতি দিলেন। ২৮শে জানুয়ারি তারিখে সরকার তাঁর পরামর্শে অনুমোদন দান করলেন। লেফটেনান্ট রাইটের রিপোর্ট এবং কলকাতা থেকে সরকারের উত্তর পৌঁছাবার সময়ের মধ্যে সেপাইদের বিক্ষোভ তীব্র হতে তীব্রতর হয়ে উঠতে লাগলো। গুজব ছড়িয়ে পড়লো, সরকার ইচ্ছে করেই তাদের জাতি এবং ধর্মনাশ করার জন্য চর্বি মাখানো টোটার প্রবর্তন করেছে। তাদের খ্রীস্টান না বানিয়ে সরকার ছাড়বে না। ইতিমধ্যে এ্যাডজুট্যান্ট জেনারেলের ওপরে পরিদর্শনের দায়িত্ব দেয়া হলো, যাতে করে মীরাট, আমবালা এবং শিয়ালকোটে কোনো চর্বি মাখানো টোটা না বিতরণ করা হয় এবং সেপাইরা আপন আপন ইচ্ছা মতো মসৃণকারী পদার্থ ব্যবহার করতে পারে। তিনি বলেছেন, কিছুদিন আগে থেকে মিনি রাইফেলধারী সেপাইরা নির্দোষ চর্বি মাখানো টোটা ব্যবহার করে আসছে। তার ফলে অবচেতন মনে তারা ভাবতে পারে যে সরকার ইচ্ছে করেই তাদের দিয়ে আপত্তিজনক চর্বি ব্যবহার করিয়ে তাদের ধর্মনাশের ব্যবস্থা করেছে। তখন আর কিছুই করা হয়নি এবং সেপাইদের সন্দেহ ক্রমবর্ধমান হারে ঘনীভূত হতে থাকে। এ ছিলো মারাত্মক প্রমাদ। মীরাটের সেপাইরা জানতেও পেলো না যে তারা নিদোষ কার্তুজ ব্যবহার করছে।

অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সেপাইদের সন্তুষ্ট করা যেতো কিনা সত্যিই মুশকিল। বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা জানতে পেরেছে এবং নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করেছে, যে কার্তুজ তারা ব্যবহার করছে তার সঙ্গে আপত্তিজনক চর্বি মাখানো ছিলো, যার সামান্য ছোঁয়া লাগলেই তাদের ধর্ম নষ্ট হয়ে যায়। হিন্দুরা গরুর চর্বি যেমন জঘন্য মনে করে, তেমনি মুসলমানেরা শুয়রের চর্বি একই রকম মনে করে। চর্বির সঙ্গে যে আপত্তিজনক কোনো পদার্থ নেই কর্তৃপক্ষ সত্তাবে সে কথা অস্বীকার করেনি। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে স্বাভাবিক পন্থা ছিলো অসাবধানতাবশতঃ যে ভুল হয়ে গেছে তা স্বীকার করা। কিন্তু তার ফলে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে প্রচণ্ডভাবে জ্বলে উঠার সম্ভাবনা ছিলো। অথবা মিনি রাইফেল ব্যবহার কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা যেতো। আবার, তার ফলেও সেপাইদের একগুঁয়েমী থেকে যেতে পারতো এবং সামরিক শৃখলায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ ভয় করলেন। মিঃ হিয়ার্সে জানাচ্ছেন যে মার্চ মাসে দমদম ঘাটিতে ভরতির উপাদানের অভাবে নতুন অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সেপাইদের উত্তেজনা বাড়তে লাগলো। তারা অস্বাভাবিক ঝলোমলো কার্তুজের কাগজের প্রতি ঘৃণাব্যঞ্জক দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করলো। কাগজে কোনো চর্বি ছিলো না, কিন্তু একটি আদালতে মানুষের পর মানুষ এসে প্রমাণ দিলো যে তার সঙ্গে চর্বি আছে। আরেকটা প্রবল গুজব রটলো যে হাড় চূর্ণ করে আটা কুয়োর পানিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে করে কারো ধর্ম রক্ষা না পায়। ধর্মনাশ করার জন্যই সরকার সুপরিকল্পিতভাবে এ গর্হিত কাজ করেছে।

সেপাইদের ক্রমশ: বিশ্বাস হারানোর সময়ে অফিসারেরা শুধু নির্বাক দর্শক ছিলেন না। প্রেসিডেন্সী ডিভিশনের অধিকর্তা জেনারেল হীয়ার্সে ছিলেন কৌশলী এবং সাহসী পুরুষ। বিদ্রোহের প্রারম্ভিক সময়ে তিনি তার অধীনস্থ সেপাইদের পাঞ্জাব নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। সেপাইদের ভাষাতেই তিনি কথা বলতেন। যে ভুল হয়ে গেছে, সেজন্য তিনি তাদের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করতেন। তিনি বলতেন, ইংরেজরা হলো প্রোটেস্টান্ট ধর্মাবলম্বী। তাদের নীতিতে বিশ্বাস না করলে এবং স্বেচ্ছায় তাদের ধর্ম গ্রহণ না করলে, কাউকে তারা আপনার মনে করে না। জেনারেল হীয়ার্সের কথায় সত্যতা না থাকলে সে জন্য সেপাইদের দোষ দেয়া যায় না। সে সময় ব্যারাকপুর ঘাটিতে আরেকজন অফিসার ছিলেন, যিনি এ সম্বন্ধে অন্য রকম ধারণা পোষণ করতেন, তাও তিনি গোপনে রাখতেন না। তাঁর নাম ছিলো কর্ণেল হুইলার। তিনি বলেছেন, দু’বছর ধরে তিনি এদেশীয় সেপাইদের মধ্যে সুসমাচার প্রচার করে আসছেন। কর্ণেল হুইলার সেনাবাহিনীতে একমাত্র মানুষ নন, ভগবানের শ্রীমুখের বাণী মূর্তিপূজকদের পরিত্রাণের জন্য প্রচার করেছিলেন, এমন আরো অনেকে ছিলেন।

চর্বি এবং কাগজ সম্বন্ধে গুজব যখন একবার রটে গেলো, একস্থানে যে তা আর আবদ্ধ রইলো না, সে কথা বুঝিয়ে বলবার প্রয়োজন নেই। আকাশ-বাতাস সন্দেহে ভারী হয়ে উঠলো। সেপাইদের উত্তেজনা এতো প্রচন্ড আকার ধারণ করলো যে ব্যারাকপুর এবং আশেপাশের কয়েকটি স্থানে অগ্নি সংযোগ করা হলো। প্রায় একশো মাইল দূরে রাণীগঞ্জে একই ঘটনা ঘটলো। দুষ্কৃতিকারীদের সন্ধান না পাওয়া গেলেও সেগুলোকে সাধারণ ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটলো নামমাত্র নওয়াবের বাসভূমি মর্শিদাবাদের নিকটস্থ বহরমপুরে। বিশেষ ডিউটিতে ৩৪নং রেজিমেন্টের দু’টো দলকে ব্যারাকপুরে থেকে বহরমপুরে পাঠানো হয়েছিলো। সেখানে আগে থেকে কর্ণেল মিচেলের পরিচালনাধীন ১৯নং বাহিনী ছাউনী ফেলেছিলো। হীয়ার্সের মতো কর্ণেল মিচেল উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন কিন্তু চর্বি মাখানো কার্তুজের খবর তার অধীনস্থ সেপাইদের কানে এসে পৌঁছেছে। একজন ব্রাহ্মণ হাবিলদার তা সত্য কিনা জানতে চাইলো। সে যাক, ৩৪নং রেজিমেন্ট এসে না পৌঁছানো পর্যন্ত কিছুই ঘটলো না। কিন্তু রেজিমেন্টে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ১৯নং রেজিমেন্টের সৈন্যদের মনে গভীর সন্দেহের শিকড় বিস্তার করলো। চর্বিতে সন্দেহ হওয়ায়, তারা বন্দুকের ক্যাপ স্পর্শ করলো না। তাদের মনে কোন নৃশংস ইচ্ছা ছিলো না। কারণ সংঘর্ষ ক্যাপের অভাবে তাদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু মিচেল তাদেরকে গালাগালি করলেন এবং দণ্ডদানের ভয় দেখালেন। তিনি নিজে পল্টনে গিয়ে দেশীয় অফিসারদের ডেকে বললেন, এক বছরেরও আগের তৈরি কার্তুজ ব্যবহার করতে আগামীকাল অস্বীকার করলে কঠোর দণ্ডদান করা হবে। চতুর্থ কোম্পানীর সুবেদার শেখ করিম বক্স বলেছেন, তিনি কর্ণেলকে বলতে শুনেছেন, তাদেরকে অবশ্যই কার্তুজ ব্যবহার করতে হবে নইলে ব্রহ্মদেশ, চীন ইত্যাদি দূরদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। দুর্ভাগ্যবশত সেপাইদের সন্দেহের নিরসন হলো না। তদুপরি কর্ণেলের কড়া নির্দেশের কারণে, সন্দেহ আরো গাঢ়রূপ ধারণ করলো। সকালের প্যারেড শুরু হওয়ার আগেই গোলযোগ শুরু হলো। জোর করে সেপাইরা অস্ত্রশালা থেকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে নিলো এবং বন্দুকে গুলি ভর্তি করলো। মিচেল কাপুরুষ ছিলেন না, তিনি অস্ত্রের সাহায্যে অস্ত্রের সম্মুখীন হতে ইচ্ছা পোষণ করলেন। কিন্তু ধারে কাছে কোথাও ইউরোপীয় সৈন্য ছিলো না। কিন্তু কিছুতেই তাঁকে দমাতে পারলো না। দেশীয় অশ্বারোহী এবং পদাতিক বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়ে গেলেন। দেশীয় সেপাইরা কর্ণেলকে বুঝালেন যে তাদের লোকেরা বিদ্রোহের বশবর্তী হয়ে নয়, ভয়েই উচ্ছল হয়ে পড়েছে। কর্ণেলকে অশ্বারোহী এবং পদাতিক বাহিনী ফেরত পাঠাতে পরামর্শ দিলেন। কারণ তাদের উপস্থিতি সৈন্যদের অসংযত করে তুলতে পারে। কর্ণেল মিচেল তাদের কথা শোনার ফলে এ ঘটনা আর বেশিদূর গড়ালো না। তিনি প্যারেডের নির্দেশ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেপাইরা শান্ত হয়ে এলো।

১৯নং রেজিমেন্ট যেমনি উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন, তেমনিভাবে শান্ত হয়ে পড়লো। তারা সেনাবাহিনীর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে চলতে লাগলো। মহারাণীর ৮৪নং রেজিমেন্ট তখন রেঙ্গুনে ছিলো। তাদের বাঙলায় ফিরিয়ে আনার জন্য একখানা ষ্টীমার পাঠানো হলো। সেপাইদের কাছে এটা কোনো গোপন খবর ছিলো না। স্যার এডওয়ার্ড প্যাজেটের নিষ্ঠুর বিচারের কথা সেপাইরা ভুলতে পারেনি। সমস্ত রেজিমেন্ট ভীত হয়ে পড়লো। ৮৪নং রেজিমেন্ট এসে পড়লে সমস্ত রেজিমেন্টের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে কঠিন দণ্ডদান করা হবে। জেনারেল হীয়ার্সে তাঁর অধীনস্থ সেপাইদের কাছে বললেন, সেপাইদের ধর্ম এবং জাতের উপর সরকারের কোন বিদ্বেষ নেই। তিনি নিশ্চিত করে বললেন, অপরাধী ছাড়া আর কারো ডর ভয় করার কারণ নেই। অল্পদিনের মধ্যেই ৮৪ং রেজিমেন্ট এসে পড়লো ব্রহ্মদেশের চিনশুরা থেকে। ১৯নং রেজিমেন্টকে ব্যারাকপুর থেকে মার্চ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য কর্ণেল মিচেলকে নির্দেশ দেয়া হলো। দেশে ফেরার সময় ৮৪নং রেজিমেন্ট বহু কষ্টে পরিকল্পিত বিদ্রোহ করা থেকে বিরত থেকেছে। তাদের দৃষ্টিতে সমপেশায় নিযুক্ত সেপাইরা চর্বি মাখানো কার্তুজ ব্যবহার না করে উত্তম কাজ করেছে।

২৬শে ফেব্রুয়ারি বহরমপুরের সেপাইরা বিক্ষোভ শুরু করলো। ২৯শে মার্চ ব্যারাকপুরের ভীত-সন্ত্রস্ত সেপাইরা আরো প্রচণ্ডভাবে বেপরোয়া বিক্ষোভ শুরু করলো। ৩৪নং পদাতিক বাহিনীর একজন তরুণ সেপাই মঙ্গল পান্ডে। চাকুরীতে তার রেকর্ড খুবই ভালো। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলী তাকে উৎক্ষিপ্ত করে তুলেছে। কিছুদিন আগে দু’জন সেপাইকে ষড়যন্ত্র করার অপবাদে ১৪ বছরের সশ্রমদন্ড দেয়া হয়েছে। জমাদার শালিগ্রাম সিংকে তাঁর সাথীদের চর্বি মাখানো টোটা ব্যবহার করতে নিষেধ করার কারণে কোর্ট মার্শালের সামনে হাজির হতে হয়েছে। চাকুরি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ধর্মীয় কারণে ১৯নং রেজিমেন্টের একজন সেপাইয়ের কাছে যা মূল্যবান সবকিছু বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এ সকল ঘটনা সেপাইদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলো তা থেকে অনুমান করতে কষ্ট হয় না-এ সকল ঘটনা মঙ্গল পান্ডের মনেও গভীর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিলো। ২৯শে মার্চ রোববার দ্বি-প্রহরে ৩৪নং রেজিমেন্টের এ্যাডজুট্যান্ট লেফটেনান্ট বাগ জানতে পারলেন, তাঁর রেজিমেন্টের একজন সেপাই ক্ষিপ্ত হয়ে সার্জেন্ট মেজরকে গুলী করেছে। তিনি তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে গমন করলেন। তাঁকেও গুলি করা হলো। গুলি এসে ঘোড়ার গায়ে লাগলো। বাগ এবং সার্জেন্ট মেজর দু’জনে সেপাইটির দিকে ধাওয়া করলে, শেখ পন্টু নামে একজন মুসলমান সেপাই তাদেরকে বাধা দিলেন। নয়তো দুজনেই মারা পড়তেন। তখন ডিউটিরত কোয়ার্টার গার্ডরা দূরে ছিলেন না। তারা কিন্তু নীরব দর্শক হয়েই রইলেন। আহত লেফটেনান্ট বাগ ঘটনাস্থল পরিত্যাগ করে চলে গেলেন। ইতিমধ্যে গোলমালের খবর জেনারেল হীয়ার্সের কানে গিয়ে পৌঁছলো। সকলে ধারণা করলো যে সমস্ত সেপাই বিদ্রোহ করেছে। জেনারেল হীয়ার্সে তাঁর পুত্রগণ এবং দেহরক্ষীদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে প্যারেড ময়দানে এলেন। জেনারেলকে এ রকম সুসজ্জিত অবস্থায় দেখে মঙ্গল পান্ডে বুঝে নিলো, তার অন্তিম সময় উপস্থিত। মঙ্গল পান্ডে জ্বালাময়ী ভাষায় আপন ধর্মাবলম্বীদের আহবান করলো অস্ত্র তুলে নিতে, কিন্তু কেউ সাড়া দিলো না। তারপরে বুকের কাছে বন্দুক তুলে নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলো। কিন্তু জখম মারাত্মক হয়নি। তাকে হাসপাতালে পাঠানো হলো এবং পরে ফাঁসি দেয়া হয়। ঈশ্বরী পান্ডে নামে অপর একজন প্রহরী, যে মঙ্গল পান্ডেকে গ্রেফতার করতে অস্বীকার করে তার ওপরও ফাঁসির নির্দেশ দেয়া হয়, কিন্তু কতিপয় কারণে কিছু দিনের জন্য তা স্থগিত রাখতে হয়। ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলবার সময় সে তার বক্তব্য পেশ করেছে এবং সাথীদেরকে বলেছে এ মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে।

৩৪নং রেজিমেন্টের সাম্প্রতিক রেকর্ডকে কিছুতেই খারাপ বলা যায় না। অধিনায়ক হুইলার এ রেজিমেন্টকে অত্যন্ত ভালোভাবে গড়ে তুলেছেন। এ রেজিমেন্টের সুবাদারের কাছে পদাতিক বাহিনীর দু’জন সৈন্য এসে ষড়যন্ত্রের প্রস্তাব করলে, তিনি তাদের দু’জনকেই গ্রেফতার করেন। ৩৪নং রেজিমেন্টের সঙ্গে বহরমপুরের ঘটনার কোনো সম্পর্ক ছিলো না। কিন্তু তাদের এসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ঘটলো এক দুঃখজনক ঘটনা। যখন মঙ্গল পান্ডের হত্যা প্রচেষ্টা এবং ঈশ্বরী পান্ডের নিষ্ক্রিয়তার ফলেই কর্তৃপক্ষ ধরে নিয়েছিলেন, সমস্ত সেপাইর মনেই বিদ্রোহের চেতনা সঞ্চারিত হয়েছে। মঙ্গল পান্ডে সে সময় ভাং খেয়ে নেশাগ্রস্ত ছিলো কিনা তা আলোচনা করার প্রয়াজন আছে। স্পষ্টতই দেখা যায়, সে কোনো ষড়যন্ত্র করেনি এবং অন্যান্যদের নিয়ে কোনো দল গড়েনি। তার সাথীরা তার ডাকে সাড়া দিলেও ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে তাদের মনে প্রবল বিদ্বেষ ছিলো। সে জন্য তারা নিরপেক্ষ দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। তাদের মধ্যে যে একজন সক্রিয় হয়েছিলো সেও মঙ্গল পান্ডের পক্ষ নিয়েছিলো। চর্বি মাখানো টোটা সেপাইদের মন বিষিয়ে দিয়েছিলো। তার ফলে তারা সামরিক কর্তব্যের প্রতিও নিষ্ঠা রাখতে পারেনি।

কোনো রকমের দুর্ঘটনা ছাড়াই ১৯নং রেজিমেন্টের সেপাইদের নিরস্ত্র এবং বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলো। সরকার নিজ সিদ্ধান্তে অটল রইলেন, কিন্তু কম্যান্ডিং অফিসারদের ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কেও সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন না। প্রধান সেনাপতি গভর্ণর জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করলেন না। আমবালা হচ্ছে তিনটি সামরিক ট্রেনিং কেন্দ্রের একটি। বিভিন্ন রেজিমেন্টের কিছু কিছু নির্বাচিত সেপাইকে নতুন রাইফেল চালনা শিক্ষা দেয়ার জন্য আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছিলো কাশীরাম তেওয়ারী নামে একজন হাবিলদার। আর ছিলো জিউলাল দুবে নামে ৩৫নং রেজিমেন্টের একজন নায়েক। এই ৩৬নং রেজিমেন্টেই ছিলো প্রধান সেনাপতির অগ্রবর্তী বাহিনী।

সুবাদার কমিশনপ্রাপ্ত নয়, এমন দু’জন অফিসারকে ডাকলেন। তিনি জানালেন, তাঁরা কার্তুজ স্পর্শ করেছেন এবং সে জন্য ধর্ম থেকে পতিত হয়ে খ্রীস্টান হয়ে গেছেন। চোখের জল মুছতে মুছতে তারা ইন্ট্রাক্টর মার্টিনোর কাছে এলেন। তাঁর কাছে সবিস্তারে সবকিছু জানালেন। আপন রেজিমেন্টের একজন সুবাদার যখন তাদের ধর্ম থেকে পতিত বলে ঘোষণা করেছেন, গ্রামে যে কি রকম ভয়ঙ্কর দুর্ভোগ পোহাতে হবে সে সম্বন্ধে তাঁকে জানালেন। লেফটেনান্ট মার্টিনো বিষয়টিকে প্রধান সেনাপতির গোচরীভূত করলেন। জেনারেল এ্যানসন পরিদর্শন করে সমবেত সেপাইদের জানালেন, যে গুজব রটেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

লেফটেনান্ট মার্টিনোর মতে, তাদের ভয় অকারণে হয়নি। এতে তারা বাড়াবাড়ি করেনি। ট্রেনিং কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা ভদ্রভাবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাদের অসুবিধার কথা নিবেদন করেছে। সুবাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করার জন্য তাড়াতাড়ি একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের সুপারিশ করেছে। কিন্তু কোনো অনুসন্ধান করা হয়নি। ১৬ই এপ্রিল সেপাইরা জানতে পারলো যে সুবাদার ছকু পাল সিংয়ের আচরণ অন্যায় এবং সৈনিকোচিত নয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ফরিয়াদী দু’জনকে এতো সহজে ছেড়ে দেয়া হলো না। তারা ডিপোতে সুবাদারের অসৈনিকোচিত আচরণের কথা জোর করে প্রচার করেছে, সেপাইরা মনে করতে লাগলো, আপনাপন সৈন্যদলে ফিরে যাওয়ার পর তাদের একই রকম হেনস্থা ভোগ করতে হবে। এ ধরনের আপত্তিকর কাজের জন্য সেপাইদের প্রকাশ্যে সাজা দেয়া হলো।

কম্যান্ডিং অফিসারেরা ব্যগ্রভাবে প্রমাণ করতে চাইতেন যে সেপাইরা তাদের সদাশয় প্রভুর ইচ্ছা ভুল বুঝেছে। তারা মনগড়া কতিপয় ধারণার সৃষ্টি করেছিলো। সেপাইকে অস্ত্র রাখার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলেও ইউনিফর্ম পরার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। তাদের বেতন এবং পেনশন থেকে বঞ্চিত করা হলো, কিন্তু সরকার ঘরে ফিরবার পথ খরচ দিলেন। ঘরে ফেরার পথে ইচ্ছা করলে যে কোনো মাজার, যে কোনো তীর্থস্থানে যেতে পারতো। সরকারের তাদের ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো দুরভিসন্ধি নেই। ধর্মীয় সকল আচার আচরণের স্বাধীনতা মেনে নিতে সদা প্রস্তুত। ১৯নং রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়ার পরে উত্তরে ভারতের শত শত গ্রামে চাকুরীহারা সেপাইরা চর্বি মাখানো কার্তুজের খবর রটিয়ে দিয়েছিলো এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় না। তেমনি করে তারা অগুণতি গ্রামীণ জনতার মধ্যেও বিদ্রোহের বীজ ছড়িয়ে দিলো। প্রকৃত ঘটনা ঘটে যাবার পরে সহজেই জ্ঞানী হওয়া যায়। সেপাইদেরকে পারস্য কিংবা চীনে পাঠিয়ে দেয়া যেতো। কিন্তু তার বিপক্ষেও যুক্তি ছিলো। সাগর পরপারে পাঠানোর জন্য দু’বার বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগ তালিকাভূক্তিকরণ আইনের (General Service Enlistment Act) ফলে সেপাইদের মধ্যে কম আতঙ্কের সঞ্চয় হয়নি। কারণ খ্রীস্টান সরকারের শয়তানী মনোভাবের পরিচয় তারা ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছে। স্যার অবফিয়ার কেভেনাগ আবিষ্কার করেছেন, অধিকাংশ সেপাই বিশ্বাস করে সাগরের পরপারে চাকুরী করা আর অস্ত্রহীন থাকা একই কথা। সুতরাং তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেপাইদের চীনদেশে পাঠিয়ে দেয়া হোক, সেখানে তাদের প্রয়োজন ছিলো। এই পরামর্শ গ্রহণ এবং সে অনুসারে কাজ করা হলো। সরকারের সততা সম্বন্ধে যখন সেপাইদের মনে সন্দেহ জেগেছে এবং প্রত্যেক ভুলের মধ্যে ধর্মচ্যুত হওয়ার সতেজ সম্ভাবনা যখন দেখা যাচ্ছে, ততোই তারা মনে করতে থাকলো তাদের বিদ্রোহের পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।

অস্ত্র হারালে যে অপমান ভোগ করতে হয়, জনমত তার চাইতেও অপমানজনক পদ্ধতির উদ্ভাবন করতে পারে। সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করার পরেও সরকার সে অপমান থেকে নিষ্কৃতি পেলো না। ১৮৫৭ সালের মার্চ মাসে প্রধান সেনাপতি সিমলা যাওয়ার পথে আমবালাতে এলেন। স্পষ্টতঃই সরকার কলকাতার নিকটে সেপাইদের বিক্ষুদ্ধ চীকারে যথেষ্ট গুরুত্বদান করেননি এবং এ সম্বন্ধে আপন রেজিমেন্টে গুজব ছড়াবার কারণে তাদের পেনশন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে শেষ নয়, সেপাইদের ভয় এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কার্তুজ ব্যবহার করতে বাধ্য করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন সরকার। পরের দিন সকালেই তাদের কার্তুজ ব্যবহার করতে হলো। তারা যদি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রধান সেনাপতির কাছে কার্তুজ ব্যবহারে তাদের ভয়ের কারণ নিবেদন করতো তাহলে প্রধান সেনাপতি তাদের রাজভক্তিতে সন্তুষ্ট হতেন, কিন্তু ভয়কে আমলই দিতেন না। সেপাইদের দোষ দেয়া যায় না, কারণ ধর্ম এবং মনিবের মধ্যে একটাকে বেছে নিতে বাধ্য করা হয়েছিলো।

সরকার যখন ড্রিলের পদ্ধতি এভাবে বদলালেন যে দাঁতে কার্তুজ কেটে বন্দুক ভর্তি করা অপ্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়লো, তখন প্রধান সেনাপতির এরকম নির্দেশ সত্য সত্যই আপত্তিকর। মীরাটের লেফটেনান্ট কর্নেল হুগ উল্লেখ করেছেন ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে, কার্তুজের পেছনটা ছিঁড়ে ফেলা হলে দাঁতে কামড়ানো বন্ধ করা যেতো। অন্যান্য অফিসারেরাও তা সমর্থন করেছেন। এ ব্যাপারে গভর্ণর জেনারেল প্রধান সেনাপতির কাছে লিখেছিলেন এবং তার জবাব দেবার পূর্বেই দমদমে বন্দুকে টোটা ভর্তি করা বন্ধ করতে নির্দেশ দান করলেন। ৫ই মার্চ সরকার দাঁতে কামড়িয়ে টোটা ভর্তি করা বন্ধ করতে নির্দেশ দিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, সেপাইদের কাছ থেকে এই নির্দেশটি গোপন রাখা হয়। মে মাসের পয়লা দিকে লখনৌতে বিপদের লক্ষণ দেখা গেলো। আমবালার ঘটনার খবর সে সময়ে অয্যোধ্যায় এসে পৌঁছেছিলো কিনা সে বিষয়ে কিছু জানার উপায় নেই। অফিসারদের আপত্তি সত্ত্বেও সেপাইরা কার্তুজ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলো এবং দাঁতে কামড়াতে অস্বীকৃতি জানালো। দু’মাস আগে কার্তুজের প্রচলন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, অথচ তাদের দাঁতে কেটে কেনো বন্দুকে পুরতে হবে তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। কোম্পানীর সেপাইদের সঙ্গে অযোধ্যার সেপাইদের পরিচয় খুবই সাম্প্রতিক। স্যার হেনরী লরেন্সের মতো সুবিবেচক চীফ কমিশনার, যিনি ভারতবর্ষ এবং ভারতবাসীকে ভালো করে চেনেন, তাঁর শাসনের সময়েও এমন বিক্ষোভের প্রবল হাওয়া ছড়িয়ে পড়তে পারলো। তা-ই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়। এখানে উল্লেখ্য যে অযোধ্যার ৭নং অনিয়মিত পদাতিক বাহিনী কার্তুজ নিতে গররাজি হলো না, কিন্তু দাঁত দিয়ে কাটতে অস্বীকার করলো। মার্চের ৩ তারিখে স্যার হেনরী লরেন্সের কাছে খবর দেয়া হলো অযোধ্যার ৭নং অনিয়মিত বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে খুন-খারাবীর নেশায় মেতে উঠেছে। তিনি তাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। গুলিভর্তি বন্দুকের সামনে থেকে বিদ্রোহীরা পলায়ন করলো। এক’শ বিশজন সেপাই মাটিতে অস্ত্র রেখে দিলো। সরকার বিদ্রোহীদের রুটিন মাফিক শাস্তি দিতে মনস্থ করলেন।

মে মাসের ৪ তারিখে ব্যারাকপুরের মঙ্গল পান্ডের রেজিমেন্টকে ভেঙ্গে দেয়া হয়। সেপাইদের কাছ থেকে ইউনিফর্ম কেড়ে নেয়া হলো। এ খবর সমস্ত ঘাঁটিগুলোতে পড়ে শোনানো হলো। তাদের সমপেশার অন্যান্য সেপাইরা শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের নিন্দা করার বদলে বীরের সম্মান দেবে এ কথা কর্তৃপক্ষ ভাবতেও পারেনি। এ সেপাইরাও ধর্মের কারণে পার্থিব সমস্ত কিছুর মায়া মোহ পরিত্যাগ করেছিলো। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না, ধর্মপ্রচারক কর্ণেল এস. জি. হুইলার ছিলেন ৩৪নং রেজিমেন্টের কম্যান্ডার।

১৮৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম সরকারকে অস্ত্রের সাহায্যে উৎখাত করার জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। সরকার যদি শান্তিপূর্ণ উপায়ে সেপাইদের বিক্ষোভ প্রশমিত করার চেষ্টা করতো তাহলে জল্পনা কল্পনার প্রয়োজন হতো না। সম্মানবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো বিদেশী সরকার কর্তৃত্ব বিস্তার করতে পারে না। তা হলে তার শক্তির মূল উৎসেই আঘাত আসবে। অনেক অফিসার সত্তাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে সেপাইদের দাবির সামনে শৈথিল্য প্রদর্শন করা উচিত হবে না। কারণ এ ধরণের শৈথিল্য দুর্বলতারই পরিচয় দিয়ে থাকে। অবিশ্বাসী সেপাইদের জেনারেল হীয়ার্সে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে সেপাই এবং দেশীয় অফিসারদের চর্বি সম্বন্ধে কথা বলার জন্য শাস্তিও দান করা হলো। ১৯নং রেজিমেন্টে যেমনটি ঘটেছে, তেমনি সম্পূর্ণভাবে রেজিমেন্টের বিলুপ্তিকরণ সৈন্যদের আতংক কমানোর চাইতে বরঞ্চ বহুল পরিমাণে বাড়িয়েই দিয়েছিলো। আমবালার ব্যাপারে প্রধান সেনাপতি খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সুবিবেচনাকে তো তিনি জলাঞ্জলি দিয়েছেন বরঞ্চ ন্যায় নীতির খেলাফ করেছেন। সেপাইরা বুঝে নিলো তাদের অসুবিধার সময়ে তারা উধ্বতন অফিসারদের কোনো সহানুভূতি পাবে না। যদিও ব্যক্তিগতভাবে হুগ মার্টিনো এবং বন্টেনের মতো অফিসারেরা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। যদি মনে করে থাকে সরকার তাদেরকে দিয়ে জোর করে কার্তুজ ব্যবহার করাতে চায় তা হলে মোটেও অন্যায় করেনি। আরো দুঃখজনক হলো, অবিবেচক অফিসারেরা আপন ইচ্ছামতো কাজ করেছে এবং স্যার হেনরী লরেন্স মে মাসের প্রথম দিকে সম্ভবতঃ তাঁর অতি উৎসাহী সহকর্মীদের দ্বারা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। আগের মাসে শৃঙ্খলার একনিষ্ঠ রক্ষাকর্তারা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তার ফলশ্রুতিস্বরূপ ১০ই মে তারিখে প্রচণ্ড বিক্ষোভ দেখা দেয়।

মীরাটের ৩নং দেশীয় অশ্বারোহী বাহিনী পরিচালনা করতেন কারমাইকেল স্মিথ। তিনি ছিলেন আত্মমতসর্বস্ব এবং গোঁয়ার মানুষ। অধীনস্থ সেপাইরা তাকে পছন্দ করতো না। যে সকল ঘটনা ঘটে গেছে তার প্রেক্ষিতে বিচার করলে তাকে কিছুতেই সাহসী বলা যায় না। ৩১মে তারিখে স্থিরীকৃত উপমহাদেশ জুড়ে বিদ্রোহের পরিকল্পনা বানচাল করে তিনি উপমহাদেশকে রক্ষা করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি যদি সে রকম ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেন, তাহলেও তিনি সমপেশার কম্যান্ডিং অফিসারকে তা জানাননি। ২৩শে এপ্রিল তারিখে তিনি নির্দেশ দিলেন, পরের দিন সকালে এক প্যারেড অনুষ্ঠিত হবে। তাতে সমস্ত রেজিমেন্ট নয়, বিভিন্ন বাহিনীর মাত্র নব্বই জন সেপাইকে অংশগ্রহণ করতে হবে। উদ্দেশ্য প্রশংসনীয় ছিলো। কর্ণেল তার অধীনস্থ সেপাইদের দেখাতে চাচ্ছিলেন কিভাবে দাঁতে না কামড়ে হাত দিয়ে বন্দুক কার্তুজ প্রবিষ্ট করাতে হয়। এর আগে সেপাইদের নতুন অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি। সুতরাং কোনো রকমের কোনো ভয়ের কারণ ছিলো না। অধিকন্তু তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দুরাই চর্বি মাখানো কার্তুজকে ভয় করে মুসলমানদের মধ্যে সে রকম কোনো সংস্কার নেই। বিলুপ্তকৃত ১৯নং রেজিমেন্টের মধ্যে হিন্দুরা ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং স্মিথের অশ্বারোহীদের মধ্যে মুসলমানরাই সংখ্যায় অধিক। যে কার্তুজ নিয়ে ঘাঁটিতে এতো ঝড় বৃষ্টি হয়ে গেছে, নির্দোষ এবং ক্ষতিকর না হলে এর পরীক্ষা করার কি প্রয়োজন আছে, কোনো কোনো সেপাইয়ের মনে এ প্রশ্ন উদিত হলো। ব্রজমোহন নামে একজন সেপাইকে কার্তুজ ব্যবহারের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছিলো। তার নৈতিকতা বলতে কিছুই ছিলো না। নীচ জাতীয় এ লোকটা পয়লা পদাতিক বাহিনীতে ভর্তি হয়। চুরি করার অপরাধে সেখান থেকে বহিষ্কৃত হয় এবং নাম ভাড়িয়ে পরে অশ্বারোহী বাহিনীতে ভর্তি হয়। সে দিনের বেশিরভাগ সময় কর্ণেল স্মিথের বাসাতেই কাটাতো এভং কার্তুজ পরীক্ষা করাবার জন্য নিজে কর্ণেলকে প্ররোচিত করে। সে আবার সেপাইদের কাছে এসে নিজের দোষ খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে এবং জানায় যে, সে যা করছে, সকলকে তা-ই করতে হবে বাধ্যগতভাবে। তখন অশ্বারোহীরা কঠিন শপথ নিলো, সেনাবাহিনীর সমস্ত সেপাইরা যতো দিন বিরত থাকবে, ততোদিন তারা ঐ অপবিত্র কার্তুজ স্পর্শও করবে না।

এ খবর কর্ণেল জানতেন না। প্যারেড বন্ধ করার জন্য তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। কারণ তিনি শুনেছেন যে সেপাইরা বিদ্রোহ করতে যাচ্ছে। মীরাটে কোনো বিদ্রোহের সম্ভাবনা ছিলো না। কারণ অল্প যে ক’টি সামরিক ঘাঁটিতে সশস্ত্র ইউরোপীয়রা অধিক সংখ্যায় ছিলো, তার মধ্যে মীরাট অন্যতম। সুতরাং কর্ণেল মনে করলেন, ভীত হয়ে প্যারেড বন্ধ করলে কাপুরুষতার পরিচয় দেয়া হবে। আবার, তিনি প্রধান নির্দেশনা পরিষদকে একটি অ্যুত্থানের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে কোন পূর্বাভাষ দান করেননি। শুধুমাত্র নব্বইজন সেপাই প্যারেড করতে এলো সকালে। নতুন নির্দেশকে তারা কিভাবে বুঝেছে, কর্ণেল সে কথা বুঝিয়ে দিলেন। তাঁর ব্যাখ্যাতে কোন কাজ হলো না। একটি অনুসন্ধান কমিটি নিয়োগ করা হলো, তারা দেখতে পেলেন, অশ্বারোহীদের ভীতিই তাদের বিরূপ মনোভাবের কারণ। প্রধান সেনাপতি আদেশ দিলেন, স্বদেশীয়দের দ্বারা পরিচালিত কোর্ট মার্শালে অপরাধীদের বিচার করা হবে। অপরাধীদের মধ্যে অভিজাত যারা তাদেরকে দিয়ে বিচার করানো ছাড়া ব্রিটিশ আইনে আর কোন ভালো ব্যবস্থা ছিলো না। কিন্তু দেশীয়দের দৃষ্টিতে সেপাইদের দ্বারা পরিচালিত কোর্ট মার্শালের মধ্যে দুর্নীতির অন্ত ছিলো না। তারা ধরে নিলো যে স্বদেশীয় কোর্ট মার্শালের কর্মকর্তারা আপন আপন রেজিমেন্টের কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট করবে কিন্তু তারা এ সম্বন্ধে মন খুলে কিছু বললো না। জেনারেল হাফগাফ তখন মীরাটে ছিলেন, তিনি বলেছেন, “পরিদর্শনকারী অফিসার বলে একজন ইউরোপীয় অফিসার সাহায্য করার জন্য স্বদেশীয়দের দ্বারা পরিচালিত মার্শাল কোর্টে ছিলেন। তাঁর উপদেশ এবং আইন সম্পর্কে পরামর্শ সম্ভবত তাদের মতামতকে প্রভাবিত করেছিলো।” কয়েদীরা আত্মপক্ষ সমর্থন করলো না, সাক্ষীদের কোনো জেরা করা হলো না, যদিও একইভাবে উচ্চস্বরে মেলভিল ক্লার্কের কাছে তারা নির্জলা মিথ্যা কথা বললেন। কোর্টের সকলে একমত হতে পারেননি। বিচারকদের পনেরো জনের মধ্যে একজনকে সেপাইদের দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দান করার বিপক্ষে রায় দিতে দেখা যায়। অবশ্য রায়ে এ সুপারিশ করা হয়েছিলো যেহেতু সেপাইদের পূর্ববর্তী রেকর্ড ভালো এবং ভিত্তিহীন গুজব তাদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে, সে জন্য তাদের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। বিভাগীয় কম্যান্ডার জেনারেল হিওইট ছিলেন সাদাসিধা মানুষ, বয়সের কথা বিবেচনা করে ১১ জন ছাড়া অন্যান্যদের কারাবাসের মেয়াদ কমানোর কোনো কারণ তিনি খুঁজে পাননি।

হোমস্ বলেছেন, ৮ই মে তারিখের সকালবেলা মেঘাচ্ছন্ন এবং এলোমেলো প্রবল ঝড়ো হাওয়া আক্রান্ত অবস্থায় ব্রিগেডের সমস্ত মানুষ সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীদের দেখতে এলো। তাদের ইউনিফর্ম ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে, কামার এনে তাদের হাতে পায়ে লোহার বেড়ি পরানো হয়েছে। কামারেরা আস্তে আস্তে এক ঘন্টারও অধিককাল সময় বেড়ি পরাতে ব্যয় করলো এবং সেপাইরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাথীদের এ শোচনীয় দুর্দশা দেখলো। বিচারে তারা অপরাধী হতে পারে কিন্তু তারা এ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিকর কাজ অথবা ওজাতীয় কিছু করেনি। জেনারেল গাফ বলেন, “তাদের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক বিশিষ্ট লোক ছিলো।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের রেজিমেন্টের সৈন্যদের মধ্যে ব্রিটিশ অফিসারদের উপস্থিতিতেই বেশ শোরগোল উঠে। ব্রিটিশ অফিসাররা না থাকলে কি ঘটতে তা বলা যায় না। কিন্তু কোনো কিছুই ঘটলো না। শান্তভাবে প্যারেড শেষ হলো। কোনো কোনো সেপাইকে বিষণ্ণ দেখালেও কোনো রকমের বিক্ষোভ কিংবা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত কয়েদীরা যখন দেখলো তাদের সবকিছুই হারাতে হচ্ছে… তখন তারা একেবারে অধৈর্য হয়ে উঠলো। বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগলো।” জেনারেল গাফ বলেন, “এ বুড়ো সেপাইরা বহু সংগ্রামে ইংরেজ প্রভুদের জন্য বেপরোয়া সংগ্রাম করেছে, ইংরেজদের জন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছে, তাদের ভবিষ্যত করেছে উজ্জ্বল। তরুণেরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। সমস্ত জীবনে আমি এরকম মর্মান্তিক দৃশ্য কোনদিন দেখিনি। আমি হচ্ছি চার বছরের চাকুরীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক তরুণ সৈনিক। আমার মনে হয়, তাদের দুঃখে সমবেদনা জানাবার ক্ষমতা আমার নেই। এ সকল ঘটনা ঘটতে পারে, আমরা কিংবা তারা কেউ কখনো ধারণা করতে পারেনি।

গ্রীষ্মের সুদীর্ঘ দিনের অবসান হয়ে এলো। কোন বিশৃঙ্খলার চিহ্নমাত্রও নেই। সে রাতে নতুন করে কোনো অগ্নি সংযোগ করা হয়নি। সকালেও সেপাইরা শান্ত ছিলো। এর বিরুদ্ধে কোনো আপীল সম্ভবপর কিনা জানার জন্য কেউ কেউ আইনজীবীর কাছে ছোটাছুটি করলো। গাফের বাহিনীর একজন দেশীয় অফিসার তাঁকে সন্ধ্যাবেলা জানালো যে পরদিন সেপাইরা বিদ্রোহ করবে। কিন্তু কর্ণেল মাইকেল স্মীথ খবরটাকে অবজ্ঞা করে উড়িয়ে তো দিলেনই, তদুপরি অলস গুজবে কান দেয়ার জন্য তিরস্কার করলেন। একইভাবে ব্রিগেডিয়ার উইলসনও বিশ্বাস স্থাপন করলেন না। অন্যান্য দিনের মতো সেপাইরা বাজারে তাদের আড্ডার জায়গায় গিয়ে জমায়েত হলো। লোহার বেড়ি পরানো কয়েদীদেরকে সিভিল জেলে ঢুকানো হলো। কোথাও আসন্ন ঝড়ের কোনো রকম পূর্বাভাস নেই। কিন্তু গুজবের শেষ নেই।

একজন দাসী একটি কাশ্মিরী মেয়ে অথবা তার মায়ের কাছে শুনেছে যে সেপাইরা একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র করেছে। সেপাইরা শুনলো, দু’হাজার বেড়ি নাকি তৈরি হয়ে গিয়েছে। তা সমস্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ভেঙ্গে দেবার জন্যই করা হয়েছে। নাগরিকেরা এসব কথায় কান দিলো না। প্রতিদিনের মতো দোকানগুলো ভোলা হলো, ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকমতো চলতে লাগলো এবং শহরে রাস্তা এবং গলিতে লোকজন চলাফেরা করেছিলো ঠিক আগের মতোই।

হঠাৎ বেলা পাঁচটার পরে ভেঙ্গে পড়লো ঝড়। একটি পাঁচক বালক সেপাই লাইনে দৌড়ে গিয়ে খবর জানালো যে গোলন্দাজ এবং রাইফেল বাহিনী রেজিমেন্টের অস্ত্রাগার দখল করার জন্যে ধাওয়া করছে। এ সংবাদ শুনে সেপাইরা হতচকিত হয়ে গেলো। কাপড়চোপড় না পরে নিরস্ত্র অবস্থায় কি করতে হবে স্থির করতে না পেরে আপন আপন লাইনের দিকে ছুটতে শুরু করলো। ৩নং অশ্বারোহী বাহিনীর লোকেরা পুরানো জেলখানায় দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে পুরোনো সাথীদের মুক্ত করে আনলো। ২০নং রেজিমেন্টে প্যারেড ময়দানে এসে সাবধানী ঘন্টা বাজিয়ে দিলো। ১১নং রেজিমেন্টও সমানভবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়েছে, তবে তারা অতোটা বিশৃখল নয়। দোকানদারেরা তাড়াতাড়ি তাদের দোকানের দরোজা জানালা বন্ধ করে ফেললো। বাজারের চোর-গুণ্ডারা একটা সুযোগ পেয়ে গেলো।

চার ঘণ্টা অতীত হবার পর পাশের গ্রামের দুর্ধর্ষ গুর্জরেরা গোলমালের খবর আঁচ করতে পেরে দলে দলে শহরে এসে পড়লো। সাহসী কর্ণেল মাইকেল স্মীথ প্রায়শঃ অনুপস্থিত থাকতেন। তার অধীনস্থদের হাতে দায়িত্ব অর্পন করে তিনি তাড়াতাড়ি কমিশনার, পরে ব্রিগেডিয়ার এবং তার পরে প্রধান কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করে গোলন্দাজ বাহিনীর পাহারায় ক্যান্টনমেন্ট রাত্রি যাপন করলেন। গোলন্দাজ বাহিনীতে সাহসী অফিসারের অভাব ছিলো না। মেজর টমর এ বাহিনী পরিচালনা করছিলেন। পরে তিনি দিল্লীর প্রাচীরের সামনে যথার্থ বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। তাছাড়া ছিলেন তরুণ গাফ, যিনি হডসনের অভিযানে অংশগ্রহণ করে ভিক্টোরিয়া ক্রস পেয়েছিলেন। আরো ছিলেন জন, যিনি দিল্লীতে একটি অগ্রবর্তী বাহিনীর পরিচালনায় ছিলেন। বিগ্রেডিয়ার আর্কডেল উইলসন দৃঢ় সিদ্ধান্তের মানুষ না হলেও দিল্লী দখলে তিনি সাফল্য অর্জন করেছিলেন।

প্রধান কম্যাণ্ডার জেনারেল হিওইট এ সময়ে যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেননি। সত্তর বছর বয়স্ক এ বৃদ্ধ নিজের বয়সের ভারেই কাবু হয়ে পড়েছিলেন। এ ছাড়া তাঁর নিজস্ব অসুবিধা ছিলো। তার অধীনস্থ সেপাইরা অনেকেই ঘোড়ার পিঠে চাপতে জানত না, যারা জানতো তাদের ঘোড়া ছিলো না। আক্রমণকারীরা অনেকে আগেই অস্ত্রশস্ত্র দখল করে ফেলেছে। কিন্তু কোথায় শত্রুর সন্ধান করতে হবে তাদের কেউ জানতো না। কারণ সেপাইদের কোনো পূর্বনিধারিত পরিকল্পনা ছিলো না। প্রত্যেক দল আপন অভিরুচি অনুসারেই ধাওয়া করলো। পরিস্থিতি এখনো আয়ত্বের বাইরে চলে যায়নি। অল্প চেষ্টা এবং উদ্যম ব্যয় করলে অবস্থাকে বশে আনা যায়। জেনারেল হিওইটকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কিন্থালে নাসিরী রেজিমেন্টের বিদ্রোহ করার সময়ে জেনারেল পেনী এবং তার সহ-অফিসারেরা এবং সে অশুভ রোববারে কলকাতার ইংরেজরাও সাহসের পরিচয় দিতে পারেননি।

পাঁচক বালকেরা চীঙ্কারে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু তার আরো একটি দিক আছে। তখন রাইফেল বাহিনী গীর্জার প্যারেডের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তাদের আচরণে প্রাথমিক গুজবের কিছুটা সত্যতা পরিলক্ষিত হয়। নরমপন্থীরা উকিলের পরামর্শ নিতে গিয়েছিলো যখন, তখন চরমপন্থীরা কারাগার ভেঙ্গে ফেলে সাথীদের সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে মুক্ত করার জন্য তোড়জোড় করেছিলো। এ সংশয় বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কারাগারের ফটক ভেঙ্গে ফেলতে লেগে গেলো। তার নিজেদের লোকদেরকে শুধু মুক্ত করতে চেয়েছিলো; নাকি সমস্ত কয়েদীদের মুক্তি দিতে ইচ্ছে করেছিলো তা জানা যায় না। কারাগারের ডিউটিরত প্রহরী তাদেরকে কোন বাধা দেয়নি। তারা কারাধ্যক্ষ এবং তার পরিবারের ওপর অত্যাচার করেনি। কিন্তু পরবর্তীকালে নারী-পুরুষ, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ সবকিছু যে তারা করেছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে প্রচুর। ভয়ের কারণে সেপাইরা উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলো, কিন্তু তাদের দিয়ে খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি সংসাধিত হয়নি। প্রকৃতপ্রস্তাবে, যারা ডিউটি করেছিলো, তারা ঘাঁটিতেই ছিলো। তৃতীয় অশ্বারোহী বাহিনীর একজন বাজারে এসে ম্যাক কার্টনি, ম্যাক অলরয় এবং ম্যাক কেওকে পালিয়ে যেতে অনুরোধ করলো। একজন ইউরোপীয় মেডিকল অফিসারকে একজন ১১নং রেজিমেন্টের হাবিলদার মেজর সতর্ক করে কর্ণেল ফিনিশের মৃত্যু এবং বিদ্রোহের খবর জানিয়েছিলো। একজন রাজভক্ত ননকমিশণ্ড অশ্বারোহী ঘোড়ায় চেপে কর্ণেল গাফের বাঙলোয় এসে ব্যক্তিগতভাবে পুরুষ এবং ভদ্রমহিলাদের বিদ্রোহের খবর জানিয়েছিলো। ভদ্রমহিলারা অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে সে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ দিনের ঘটনা লিখে রেখে গেছেন। কিন্তু তা সম্পূর্ণ নয়। পরদিন জেনারেল হিওইট যে সরকারি রিপোর্ট লিখেছেন, তাও সম্পূর্ণ নয়। একেকটা হিংস্র আক্রমণের পরে আরেকটা আক্রমণ এবং নৃশংসতা ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত হয়েছিলো কিনা তা আমরা জানতে পারি না। কোনো রেজিমেন্টকে সম্পূর্ণভাবে দোষযুক্ত বলা যায় না-আবার রেজিমেন্টের অনুগত সেপাইও ছিলো। ৩নং অশ্বারোহী বাহিনীর ভূমিকাই সবচেয়ে দুঃখজনক। এক’শ অশ্বারোহী বাহিনীর ভূমিকাই সবচেয়ে দুঃখজনক। এক’শ অশ্বারোহী সৈনিক স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলো। ১১নং রেজিমেন্টের ক্ষতি সবচেয়ে কম, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পরেই তারা শান্তভাবে প্রস্থান করেছে এবং তাদের মধ্যে থেকে একশো বিশজন পরে মীরাটে ফিরে এসেছিলো। এমনকি দুর্ধর্ষ ২০নং রেজিমেন্টেও কিছু অনুগত সেপাই ছিলো। যারা বেশিরভাগ সেপাইদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলো, তার অনুগত সেপাইদের মতামত গ্রাহ্য করেনি। একজন নকমিশণ্ড দেশীয় অফিসার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ব্রিটিশ মনিবদের পক্ষই সমর্থন করেছিলো। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের উর্ধ্বে রেজিমেন্টের প্রতি আনুগত্যকে স্থান দিয়েছিলো। সে এবং তার রেজিমেন্টের অন্য দু’জন সেপাই নিরাপদে লেফটেন্যান্ট গাফকে গোলন্দাজ বাহিনীতে পৌঁছে দিয়ে মৃত্যুকে পরোয়া না করে রেজিমেন্টে ফিরে এসেছিলো।

৩নং অশ্বারোহী দল পুরোনো কারাগার ভাঙতে যাওয়ার পরে ২০নং রেজিমেন্ট এবং ১১নং রেজিমেন্ট প্যারেড ময়দানে গিয়ে জমায়েত হলো। তাদের কম্যান্ডার কর্ণেল ফিনিস তাড়াতাড়ি ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চেষ্টা করলেন। প্রথম দিকে তিনি কিছু সাফল্যও লাভ করেছিলেন। এমনকি ২০নং রেজিমেন্টও তার নির্দেশ মানার কথা চিন্তা করেছিলো। এ সময়ে ৩নং অশ্বারোহী বাহিনীর একন অশ্বারোহী ঘোড়ায় চেপে এসে সংবাদ দিয়ে গেলো ইউরোপীয়রা আসছে। একজন তরুণ সেপাই গুলি করে কর্ণেল ফিনিসকে হত্যা করলো। কম্যান্ডারকে হত্যা করার পর ১১নং রেজিমেন্টের দোদুল্যমানতা ঘুচে গেলো ২০নং রেজিমেন্ট সত্যি সত্যি বিদ্রোহীরা আক্রমণ শুরু করে দিয়েছিলো। কিন্তু তারা ভয় করছিলো কর্ণেল ফিনিসের মৃত্যুর পর সেপাইদের সঙ্গে যোগ দেয়াটাই যুক্তিযুক্ত মনে করলো। ১১নং কিংবা ২০নং রেজিমেন্ট তাদের নিজেদের অফিসারদের কোনো ক্ষতি করেনি। কর্ণেল গাফ বলেন, আমাদের নিজেদের অধীনস্থ সেপাইরা একজন অফসারকেও হত্যা করেনি। ওয়াজির আলী খান নামে একজন ডেপুটি কালেক্টর বলেছেন যদিও রাতভর লুঠতরাজ চলছিলো, সেপাইরা কিন্তু একটা জিনিসও স্পর্শ করেনি। তারা শুধু বাঙলোতে আগুন লাগিয়েছিলো এবং ইউরোপীয়দের হত্যা করেছিলো-সদরে এবং শহরে এ খবরই প্রচারিত হয়েছিলো। এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়, সেপাইরা নিরস্ত্র মানুষের ওপর আক্রমণকারী লুঠেরাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেছে।

বস্তী অঞ্চল এবং ফটক মুক্ত কারাগার থেকে দুর্ধর্ষ অপরাধীরা বেরিয়ে এসেছিলো। শহরের পুলিশেরাও তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলো। ক্ষমতাসীন কোতোয়াল ধনা সিং ছিলো জাতে গুর্জর এবং গুর্জরেরা নিকটবর্তী বস্তী অঞ্চলের অধিবাসী ছিলো। সঙ্কটকালে ধনা সিংয়ের কোন কর্তৃত্ব ছিলো না, তাদের উপর। নিরীহ নাগরিকদের অর্থ তারা লুণ্ঠন করলো, নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করলো। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হলো। এবং কৈলাশ চন্দ্র ঘোষ নামে বাঙালির শুড়িখানা আক্রান্ত হলো। মিঃ ক্রেইগীর বাঙলোতে একা ছিলেন মিসেস চেম্বার্স। সামরিক ঘটিতে তিনি এসেছেন নতুন। তাঁর স্বামী ডিউটি করতে বাইরে গেছেন। তিনি ছিলেন পরিণত অন্তঃসত্ত্বা। অনুগত অশ্বারোহীরা মিঃ ক্রেইগীর বাঙলো পাহারা দিচ্ছিলো। মিসেস চেম্বার্স প্রতিবেশীর কথা ভুলে যাননি। তিনি চাকরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু দুষ্কৃতিকারীদের একজন চাকরকে জবাই করে ফেললো। সে ছিলো একজন সেপাই, পরে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। তারপর মিসেস চেম্বার্সকে হত্যা করা হলো। মিসেস চেম্বার্সের নৃশংস হত্যাই ইউরোপীয়দের প্রচণ্ড প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তুলেছিলো এবং তারা সর্বত্র সেপাইদেরকে এর জন্য দায়ী করছিলো।

বিদ্রোহের ফলে প্রহরীরা ঘাটি ছেড়ে দিয়েছিলো। লেফটেন্যান্ট গাফ ডিউটিতে যাওয়ার জন্য পোশাক পরছিলেন, দু’জন সামরিক যাজক গীর্জাতে গেছে। মিঃ ম্যাকেঞ্জী তাঁর বাঙলোতে নীরবে একটা বই পড়ছিলেন। মিসেস ম্যাকেঞ্জী এবং মিসেস ক্রেইগী সান্ধ্যভ্রমণে বের হচ্ছিলেন। এ সময়েই সেপাই লাইনে হল্লা শুরু হয়। তাড়াতাড়ি গাফ ঘোড়ায় চেপে সেপাই লাইনে না গিয়ে ২০নং রেজিমেন্টের পাশ দিয়ে প্যারেড ময়দানে এলেন। দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক লোমহর্ষক দৃশ্য আমার মনে গেঁথে গেলো-বলেছেন গাফ। কুটিরগুলোতে আগুন দাউ দাউ জ্বলছে। সশস্ত্র সেপাইরা পরস্পরকে ডাকাডাকি করে দানবীয় অট্টহাস্যে নর্তন-কুর্দন করছিলো। বন্য উন্মত্ত ক্ষিপ্ত কাঁপালিকের মতো অফিসারদের এবং সাধারণত: ইউরোপীয়দের রক্তের তৃষ্ণায় তারা পাগল হয়ে উঠেছে। তিনি কোনোরকমে তাঁর আপন অধীনস্থ সেপাইদের মধ্যে চলে এলেন। তাঁর জীবনের উপর কোনো হামলা করা হয়নি এবং তাঁর উপস্থিতির কোনো গুরুত্বই তারা দিলেন না। সবকিছু এলোমেলো বিশৃঙ্খল। আসবার পথে তিনি গ্রেটহেডদেরকে সাবধান করে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তখন তারা পালিয়ে গেছেন এবং তাঁদের বিশ্বস্ত চাকরটি তাঁকে পালাবার পথ প্রদর্শন করলো। ম্যাকেঞ্জীও নিজেকে অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত করে সাহসের সঙ্গে ঘোড়ায় চেপে সেপাই লাইনের দিকে ছুটলেন। তিনি পথে অগণিত অশ্বারোহী সেপাই দেখতে পেলেন এবং পরে ঘটনাক্রমে ক্যাপ্টেন ক্রেইগীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সেপাইরা তাকে কয়েকটি কোপ দিতে চেষ্টা করে অন্যদিকে ধাওয়া করলো। তারা বুঝতে পারলো তাদের স্থান হচ্ছে প্যারেড ময়দান। দু’জন ব্রিটিশ অফিসার প্যারেড ময়দানে গেলেন। রেজিমেন্টের প্রায় প্রতিটি অফিসারই প্যারেড ময়দানে এসেছিলেন, শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা করলেন। এমনকি ভয়ও দেখালেন। তাতে কোনোও ফলোদয় হলো না। সেপাইদের ধন্যবাদ তারা অফিসারদেরকে আক্রমণ করেনি এবং ফিরে যেতে বলেছে এবং বলেছে চীৎকার করে কোম্পানীর রাজত্বের শেষ হয়েছে। ক্রেইগী দেখলেন, কিছু সংখ্যক সেপাই বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিতে সংশয় এবং দ্বিধাবোধ করেছে। তিনি সাহস করে তাঁদের আপন ভাষায় তাঁদের নির্দেশ দিলেন। এতে কাজ হলো, চল্লিশজন সেপাই তার চারপাশে এসে জড়ো হলো। তাদের নিয়ে তিনি পুরোনো জেলখানার দিকে ছুটলেন। কিন্তু তারা অনেক দেরী করে ফেলেছেন। কয়েদীরা বেরিয়ে এসেছে এবং প্রহরীরাও বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। এ সময়ে সমস্ত ক্যান্টনমেন্টে আগুন লাগানো হয়ে গেছে। ক্রেইগী এবং ক্লেয়ার্ক অনুগত সেপাইদের নিয়ে প্যারেড ময়দানে এলেন। ক্ষুদ্র একটি দেহরক্ষী দল কর্তৃক পরিবেষ্টিত হয়ে তার বোন এবং ম্যাকেঞ্জীর স্ত্রীর খবর নেয়ার জন্য দ্রুতবেগে ছুটলেন। কোচম্যানের সাহস এবং উপস্থিত বুদ্ধিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারা বাঙলোয় এসে পৌঁছলেন। চারদিকে মৃত্যু এবং আগুনের তাণ্ডবলীলা চলেছে। তখন ম্যাকেঞ্জী তাঁর সেপাইদের কাছে সম্মান রক্ষার আবেদন করলেন। আমি অসমসাহসিক কাজ করার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছিলাম। আমি মহিলাদের ঘরের দরোজার কাছে নিয়ে এলাম। সঙ্গে সঙ্গে সেপাইরা অশ্ব থেকে অবতরণ করে মহিলাদের পায়ে হাত দিয়ে অশ্রুসিক্ত স্বরে প্রাণপণে তাঁদের রক্ষা করবেন বলে শপথ করলেন।

সেপাইরা মীরাটে বেশিকাল ছিলো না। থাকলে তারা বোকামীর পরিচয় দিতো। তাদের বিরুদ্ধে পনেরো’শ সশস্ত্র ইউরোপীয়ান সৈন্য মোতায়েন ছিলো এবং সেপাইদের সংগ্রাম ক্ষমতা সম্পর্কে কোন নিশ্চিত ধারণা ছিলো না। কারণ তাদের মধ্যে সংশয়াচ্ছন্ন এবং দোদুল্যমান মানুষের অভাব নেই, এটা তারা বেশ ভালোভাবেই জানতো। তা সত্ত্বেও তারা কি করবে, কোথায় যাবে সে সম্বন্ধেও তাদের কোন ধারণা ছিলো না। কেউ কেউ সদলবলে তাদের রোহিলাখণ্ডে যেতে এবং অন্য কেউ কেউ মাত্র চল্লিশ মাইল দূরের নগরীতে যেতে পরামর্শ দিলেন। নিরাপত্তার আশায় তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়লো। তাদের লাইন জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করা হয়েছে। খাদ্য এবং আশ্রয়ের কোন রকম ব্যবস্থা ছাড়াই নারী এবং শিশুদের ফেলে যেতে হলো। কেউ হাপুরের পথ ধরলো, কেউ ভাগপতের দিকে এগুতে থাকলো। আবার অন্যান্যরা গুরগাঁওয়ের আশে পাশে কয়েকদিন অবস্থান করলো। সেপাইদের বেশিরভাগই দিল্লী অভিমুখে পথ দিলো।

সকাল হবার সঙ্গে সঙ্গেই উচ্ছখল জনতা চলে গেলো। মিসেস প্রীথিড় লিখেছেন, দিনের আলোতে দেখলাম, একরাতের মধ্যে সবকিছু কীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। আমাদের প্রফুল্লিত সুখের নীড় কৃষ্ণবর্ণ অঙ্গারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সরকারের শোক প্রকাশ করার জন্য অনেক ক্ষয়ক্ষতি অপেক্ষা করছিলো। রেভারেন্ড টি. মি. স্মীথ বলেছেন, এ পর্যন্ত আমি এবং মি: রটন ৩১ জন নিহতকে কবরস্থ করেছি। এখনো ১১নং রেজিমেন্টের নিহতদের আনা হয়নি। তিনি বলেছেন ১১নং কে সম্পূর্ণভাবে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, নিহতদের পরিমাণও অনেক। তবে মহিলা এবং শিশুদের রক্ষা করা হয়েছিলো, এ কথাও তিনি বলেছেন।

১০ তারিখের রাতে অনেক ভয়াবহ এবং নিষ্ঠুর কার্য সংসাধিত হয়েছিলো, এ কথা সত্য। কিন্তু সাহস এবং করুণার মহৎ দৃষ্টান্তও আছে। কমিশনারের জমাদার গোলাব খানের কাহিনী তার একটি। তাঁর সাহায্য না হলে গ্রীথিরা জ্বলন্ত ছাদের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতো। বওয়ার নামে একজন চৌকিদার তার মনিব গিন্নী মিসেস ম্যাকডোনাল্ডকে বাঁচাবার জন্য নিজের প্রাণ বিসর্জনের ঝুঁকি গ্রহণ করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ তার চেষ্টা সফল হয়নি। মিসেস ম্যাকডোনাল্ডের হত্যার পর তার শিশুদেরকে আয়া নসিবনের সহায়তায় রক্ষা করা সম্ভবপর হয়েছিলো। অশ্বারোহী বাহিনীর একদল অশ্বারোহী মিসেস কোর্টনীর জীবন রক্ষা করেছিলো। আসগর আলীর বাঙলো আক্রান্ত হয়েছিলো, নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়ার ভয় দেখানো হলেও তিনি খ্রীস্টান ভাড়াটেদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে অস্বীকার করলেন। স্থানীয় ভারতীয়রা যদি মহানুভবতা না দেখাতেন, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হতো।

গ্রীষ্মের দিনের ঘূর্ণি হাওয়ার মতো মীরাটের অভ্যুত্থান ক্ষণস্থায়ী এবং আকস্মিক ছিলো। কোনো রকমের পূর্বসঙ্কেত ছাড়াই অভ্যুত্থান ঘটেছিলো, যতোক্ষণ তা চলছিলো ব্যাপকভাবে ক্ষয়ক্ষতি করেছে। তারপরে যেমন আকস্মিকভাবে এসেছিলো তেমনি দ্রুততার বেগও প্রশমিত হয়ে এলো। কর্ণেল স্মীথের প্যারেডই ছিলো অ্যুত্থানের সাক্ষাৎ কারণ। জেনারেল হিওইট দুঃখের সাথে কর্ণেলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কেন আপনি প্যারেড করাতে গিয়েছিলেন? আমার ডিভিশন একমাস কিংবা তার কিছুকাল পরে শান্ত হয়ে যেতো। অথবা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে দিতাম। গভীর সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং বিতৃষ্ণ সেপাইদের মধ্যে ছিলো এ কথা সত্য। কিন্তু প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি সতর্ক থাকতেন, যদি তারা সুবিবেচনার সঙ্গে কাজ করতেন তাহলে অপ্রিয় কিছুই ঘটতো না।”

অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার অল্পকাল পরেই সামরিক কর্তৃপক্ষ সেপাই লাইনের সামনে তাদের দুর্বলতার লক্ষণ দেখান। রাইফেলধারী গোটা একটি কোম্পানীকে কালেক্টরের কাঁচারীর তহবিল সংরক্ষণের জন্য নিয়োগ করা হয়। বাকী রাইফেলধারী সেপাই এবং গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে উইল্সন প্যারেড ময়দানে গেলেন। সেখানে একজন বিদ্রোহী সেপাইয়েরও দেখা পেলেন না। শুধুমাত্র অল্পসংখ্যক সেপাই অশ্বারোহী লাইনের কাছে ঘোরাঘুরি করছিলো। রাইফেলের আওয়াজ শুনেই তারা পালিয়ে গেলো। উইলসন ভয় করছিলেন, হয়তো সেপাইরা ইউরোপীয়দের বাসাবাড়িতে হানা দেয়ার পরিকল্পনা করেছে এবং সেদিকেই তিনি ধাবিত হলেন। পথে তাঁর সঙ্গে বন্দুকধারী সেপাইরা এসে যোগ দিলো। সে রাতে আর কিছুই করা হলো না। সেপাইদের পশ্চাদ্ধাবনের কোনো চেষ্টাই করা হলো না। পরবর্তী কয়দিন মীরাট ব্রিগেড ব্যারাকে অলসভাবে কাটিয়ে দিলো। তারা এখনো আকস্মিকতার রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এটা নিশ্চিত যে বিদ্রোহীদের পশ্চাদ্ধাবন করে আক্রমণ করলে দিল্লীকে রক্ষা করা যেতো। দু’চারটা অভ্যুত্থান এখানে সেখানে ঘটলেও বিভিন্ন স্থানের বিদ্রোহ পূর্বাহ্নে দমন করা যেতো। তাতে করে সরকারের বিরুদ্ধে যে ব্যাপক বিদ্রোহ মাথা তুললো শীগগির তা অংকুরেই বিনষ্ট করা সম্ভব ছিলো।

বীর হৃদয়ও যে মাঝে মাঝে ভীত হয়ে পড়ে, তার স্বীকৃতি না পেলে মীরাটে ইউরোপীয়দের অলসতা এবং নিষ্ক্রিয়তাকে সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভবপর হতো না। সে সময় মিঃ রটন সেখানে ছিলেন। তিনি বলেছেন, সত্য করে বলতে গেলে আমাদের সামরিক কর্তৃপক্ষ পর্যদস্ত হয়ে পড়েছিলো; কী করলে বেশি ভালো হয়, সে সম্বন্ধে কেউ কিছু জানতেন না এবং কিছু করাও হয়নি। আগে ব্রিটিশেরা কোনোদিন ভারতে নিজেদেরকে এতো অসহায় এবং বিপর্যস্ত মনে করেননি। অনাত্মীয় অসংখ্যের মধ্যে স্বল্পসংখ্যক ইউরোপীয় প্রত্যেক মুখে অবিশ্বাস এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রেই বিশ্বাসঘাতকতা প্রত্যক্ষ করছিলো। সকলে আশা-আকাঙ্খা করতে লাগলো, তাদের এদেশীয় চাকরেরা কোনো মুসলমানী ভোজানুষ্ঠানোপলক্ষে তাদের সকলকে হত্যা করে আরাম করে ভক্ষণ করবে। নানা রকমের অশুভ সন্দেহের দোলায় তারা দুলতে লাগলো। নারী এবং শিশুদের দমদমের দেয়ালঘেরা আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলো। তার মধ্যে নিরস্ত্র সিভিলিয়ানেরাও ছিলেন। সামরিক প্রধান এবং অন্যান্য অফিসারেরা ব্যারাকের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। ব্যারাকের ওপরে এবং ভেতরে পাহারা বসানো হলো। বড় বাজারের গুণ্ডা বদমায়েস এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের গুর্জরদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবরকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো।

৩. এই সে দিল্লী-এই সে নগরী

দিল্লীতে এক সম্রাট ছিলেন। তাঁর কোনো সাম্রাজ্য ছিলো না। কিন্তু তাঁর পিতা পিতামহের সাম্রাজ্যের স্মৃতি এখনো লোকের অনুভূতিতে সজীব-জীবন্ত। রাজপ্রাসাদের বাইরে কোনো ক্ষমতা ছিলো না সম্রাটের। অভ্যন্তরের ক্ষমতাও নিয়ন্ত্রিত করতে ইংরেজ। অতীতের সকল প্রথা এবং রীতি তাকে মেনে চলতে হতো। তাঁর সরকারের প্রতি সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা ছিলো, কিন্তু সরকারের কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিলো না। তিনি পেনশনের অর্থে জীবনধারণ করতেন এবং সভাসদেরা তাকে ভালোবেসে শ্রদ্ধা জানাতেন। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশের করুণার ওপরেই তাঁর রাজকীয় প্রতিষ্ঠা। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের কাছে এখনো তিনি একচ্ছত্র ভারত সম্রাট, প্রতাপান্বিত সম্রাট বাবর এবং আকবরের মহিমান্বিত উত্তর পুরুষ। সকলে এখনো তাকে আসল শাসনকর্তাদের ন্যায্য প্রভু বলে মনে করে। কোম্পানীর সরকার বংশানুক্রমে এই অনিঃশেষিত সার্বভৌমত্বকে লালন করে আসছিলেন, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। সাম্রাজ্যের সোনালী দিনে পূর্বপুরুষেরা যে ধরনের সম্মান ভোগ করতেন, অল্প কদিন আগেও ইংরেজ সরকার তাঁকে সেই সম্মান নিবেদন করেছেন। গভর্ণর জেনারেল শহর দিল্লীতে এলে তার প্রতিনিধিকে সম্রাটের সামনে নগ্ন পায়ে দাঁড়াতে হতো, বিনম্রভাবে সম্রাটের স্বাস্থ্যের খবর নিতে হতো এবং একান্ত কর্তব্যপরায়ণতার সাথে দিল্লীশ্বরো জগদীশ্বরের সামনে উপঢৌকন তুলে ধরতে হতো। সম্রাট নিজে এসব তার প্রাপ্য রীতিগত সম্মান বলে গণ্য করতেন। অতীত দিনের মতো দরবারের ফরমান জারী করা হতো। মহামান্য সম্রাট এই বলেছেন, এই করেছেন, তা বাইরের লোকে জানতে পারতো। কোনো কোনো ভারতীয় দেশীয় রাজ্যে তখনো বাদশাহর নামাঙ্কিত মুদ্রা প্রচলিত ছিলো। গৌরবময়ী অতীতের জীবন্ত প্রতাঁকের দিকে এখনো অনেকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বিদেশী শাসকদের কাছে সম্রাট বিপদের একটি সক্রিয় উৎস বিশেষ। কারণ একমাত্র তিনিই কোম্পানীর সরকারের সশস্ত্র অভ্যুত্থান অনুমোদন করার একমাত্র আইনসঙ্গত দাবিদার।

সরকার এ বিপদের কথা বেশ ভালোভাবেই জানতেন। তাঁরা অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য রাজবংশের উচ্ছেদ সাধন করেছেন। আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারীদেরকে রাজ্যের বাইরে নির্বাসিত করেছেন। যে পেশবা বংশের উপর অর্পিত ছিলো সমগ্র মারাঠা জাতির আনুগত্য, তাঁকে উত্তর ভারতের একটি গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। টিপু সুলতানের উত্তরাধিকারীদের বেলুড় থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছে। রণজিৎ সিংয়ের ছেলেদের গ্রেটব্রিটেনে স্থানান্তরিত করেছে। কিন্তু নামমাত্র সম্রাট এখনো পূর্বপুরুষ শাজাহানের প্রাসাদে অবস্থান করছেন। এক সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী দিল্লীর সম্রাটের অপ্রতিহত ক্ষমতার থিয়োর প্রচার করে নিজের সুবিধা আদায় করেছিলেন। বাঙলা ও কর্ণাটকে তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে এবং মারাঠা ও শিখ শক্তি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেলে দিল্লীর সম্রাটের পদবী রাজনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেললো। পক্ষান্তরে, কিন্তু দিল্লীর সম্রাট প্রকৃত শাসক ও আসল সরকারের বিপদের জীবন্ত কারণ হিসেবে রয়ে গেলো। সুতরাং সম্রাটের পদবীর বিলুপ্তি এবং দিল্লীর সুসজ্জিত প্রাসাদ থেকে তাঁকে বের করে আনা কোম্পানীর সরকারের কাছে আশু প্রয়োজন হয়ে দেখা দিলো।

১৮৩৭ সালে বাহাদুর শাহ সম্রাট হলেন। তাঁর পিতার মতো তিনিও বাদশাহ এবং গাজী উপাধি ধারণ করলেন। রাজ্যহীন সম্রাটের এবং বিনাযুদ্ধে গাজীকে জনসাধারণ সহ্য করে নিয়েছিলো। এ রকম একটি সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা তার ছিলো না। স্বাভাবিক সময়ে অল্পস্বল্প আড়ম্বরের সাথে নিজের মুখোশটা রক্ষা করা ছাড়া তাঁর কাছে আর কিছু আশা করা যেতো না। যুদ্ধপ্রিয় পূর্বপুরুষদের অজেয় সাহস তার ছিলো না। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো কোনো পূর্বপুরুষের সাহিত্য রুচি লাভ করেছিলেন। অবসর সময়ে তিনি নিজেই কবিতা রচনা করেন। তিনি জন্মেছেন এবং বড়ো হয়েছেন প্রাসাদের শঠতা, ছলনা এবং ষড়যন্ত্রপূর্ণ পরিবেশে। যুগের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না, তাই দায়িত্বহীন অভিযানের দ্বারা তিনি চালিত হতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর মন্ত্রণাদাতা হাসান আসকারী তোষামুদে বাকসর্বস্ব মানুষ। প্রত্যেক মোঘল শাহজাদা পরিবারের সম্মান ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু বাহাদুর শাহের মনে ইংরেজ প্রভুদের সঙ্গে সামান্যতম বিবাদে লিপ্ত হওয়ার আকাভ ক্ষাও ছিলো না। তার পিতার মতো তিনিও কোম্পানীর কাছে পেনশন বৃদ্ধি করার জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু কোম্পানীর সরকার সম্রাট পদবী এবং রাজপ্রাসাদ ত্যাগ না করলে পেনশন বৃদ্ধি করতে রাজী ছিলো না। বর্তমানে তিনি অন্য বিষয়ের প্রতি সম্পূর্ণভাবে মনোযোগী হয়ে উঠেছেন। তিনি বেগম জিনাতমহলের গর্ভজাত শেষ বয়সের নাবালক সন্তান জওয়ান বখৃতকে সিংহাসনের নিরাপদ উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করতে চান। কিন্তু পদবী এবং নাবালক ছেলের মাঝামাঝি ছিলেন কয়েকজন শাহ্জাদা। কোম্পানীকে এজন্য চাপ প্রয়োগ করার সকল সুযোগের সদ্ব্যবহারই করেছেন সম্রাট। অন্যদিকে সরকার নামমাত্র সম্রাটকে প্রাসাদের বাইরে এনে, পদবী ছাড়তে প্রলুব্ধ করে নিকটবর্তী কুত্‌ব-এ পাঠিয়ে দিতে একটা সুযোগের অপেক্ষা করেছিলেন।

বাহাদুর শাহ তাঁর খান্দানের প্রতি অসম্মানজনক এ প্রস্তাবে রাজী হতে পারেননি। ব্রিটিশ সরকার সম্রাটের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর প্রহসন সহ্য করতে রাজী ছিলো না। কিন্তু তারা শক্তি প্রয়োগ করতেও আগ্রহী ছিলো না। বহুযুগ আগের মতো এখনও মোঘল দরবার লক্ষ লক্ষ মানুষের নিষ্ক্রিয় শ্রদ্ধা পেয়ে আসছে। তাতে কিন্তু ইংরেজদের কোনো ক্ষতি হয়নি। আনুগত্যের বাহ্যিক চিহ্নগুলো তারা একের পর এক দূর করতে লাগলো। লর্ড এলেনবোরো তার পক্ষ থেকে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কোনো নজর দিতে রেসিডেন্টকে বারণ করেছিলেন, যদিও সমপরিমাণ অর্থ অন্যভাবে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ তাঁর খান্দানের মর্যাদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। বাহাদুর শাহ এবং পরিবারের সকলে চরম অপমানবোধ করলেও প্রকাশ্যে তিনি কোনো নালিশ করলেন না। লর্ড ডালহৌসী সম্রাটের পদবী কেড়ে নেয়া এবং প্রাসাদ থেকে অন্য কোনো উপযুক্ত পরিবেশে স্থানান্তরের জন্য বিলাতের কর্তাদের ওপর চাপ দিতে থাকেন, তা করা সঙ্গত হবে কি না এ নিয়ে কোর্ট অব ডিরেকটরস, বোর্ড অব কন্ট্রোলের সঙ্গে একমত হতে পারছিলো না। গভর্ণর জেনারেল এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ক্ষমতা লাভ করার পরেও এ ব্যাপারে তাকে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হলো। অবশেষে বৃদ্ধ, অশক্ত সম্রাট বাহাদুর শাহের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করাই স্থির করলেন। ১৯৪৯ সালে আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারী মারা গেলো, দিল্লীর রেসিডেন্ট পরবর্তী উত্তরাধিকারী শাহজাদা ফকরুদ্দীনের সঙ্গে একটা বোঝা-পড়ায় এলেন। তাঁর পিতার অন্তর্ধানের পর তাকেই সম্রাটের বংশের প্রধান বলে স্বীকার করে নেয়া হবে। তার পদবী থাকবে শাহজাদা। কিন্তু তার বিনিময়ে প্রাসাদ, রাজধানী, দুর্গ সবকিছু ত্যাগ করতে হবে। এ ব্যবস্থা গোপন রইলো না। অধিকাংশ রাজপুত্র তাতে অস্বীকৃতি জানালেন। ১৮৫৬ সালে শাহজাদা ফখরুদ্দীনও মারা গেলেন। তাঁকে বিষপান করিয়ে হত্যা করানো হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়। এ সময়ে সম্রাটের ওপর বেগম জিনাত মহলের অপ্রতিহত প্রভাব ছিলো। জওয়ান বখতের ভাগ্যকে নিষ্কন্টক করার জন্য আবার চেষ্টা করা হলো, কিন্তু তাতে বিশেষ ফলোদয় হলো না। দিল্লী সাম্রাজ্যের অন্তিমক্ষণ ঘনিয়ে আসছিলো। বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পরে শাহজাহান এবং আলমগীরের অযোগ্য বংশধরেরা অস্বাভাবিক কিছু একটা না ঘটলে পূর্ব পুরুষের প্রাসাদ থেকে বিতাড়িত হবে এ সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ রইলো না।

১৮৫৭ সালের ১১ই জুন সকালবেলা মীরাটের বিদ্রোহীরা নৌকা দিয়ে সেতু বানিয়ে যমুনা পার হয়ে দিল্লীতে এলো। গরমের দিনে সকালবেলা কলেজ বসেছে। গোটা দিনে কি ঘটবে না জেনে অধ্যাপক রামচন্দ্র সেখানে গেলেন। বিখ্যাত ভ্রমণকারী মুনশী মোনেলাল তাঁর এক ইংরেজ বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলেন। কলকাতা থেকে গতদিনের সংবাদপত্র এসে পৌঁছেছে। ঝিজ্জার নওয়াবের এজেন্ট কালীপ্রসাদ প্রতিদিনের মতো সকালবেলা অশ্বারোহণে বেড়াতে বেরিয়েছেন। তিনি আসন্ন বিপদের কোনো সূচনাই দেখতে পেলেন না। মুনশী জীবনলাল ক্যাপ্টেন ডগলাসের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং বাড়িতে ফিরে গিয়ে কোর্টে যাবার পাল্কী তৈরি করতে আদেশ দিলেন। থানার অফিসার ইনচার্জ মুইনুদ্দীন হাসান একটি ফৌজদারী মামলার ব্যাপারে কালেক্টরের কোর্টে এসে হাজির হয়েছেন। কমিশনার সাইমন ফ্রেসার এখনো ঘুমিয়ে আছেন। হঠাৎ খবর রটলো-মীরাটের অশ্বারোহীরা নগরীর ফটকের সামনে এসে হাজির হয়েছে। তারা উসুলী কালেক্টরকে হত্যা করেছে এবং তাঁর অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছে। কালেক্টর হাচিনসন তাড়াতাড়ি কমিশনারের বাঙলোতে পালিয়ে এলেন। শান্তভাবে শুরু হওয়া গ্রীষ্মের মনোরম সকাল পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লীর রাজপথে নৃশংস বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড চলতে লাগলো।

কমিশনারের মতো সম্রাট নিজেও আশ্চর্য হয়ে গেছেন। প্রাসাদের গবাক্ষর কাছে একটা আওয়াজ শুনে বুড়ো সম্রাট বুঝতে পারলেন যে বিদ্রোহীরা এসেছে। আগেকার দিনে, সাম্রাজ্য যখন প্রাণপূর্ণ ছিলো, সম্রাটেরা অলিন্দে দাঁড়িয়ে নীচের প্রজাদের দেখতেন। অবাধ্য জনতার সামনে এসে দাঁড়াবার মতো সাহসও বাহাদুর শাহের ছিলো না। তিনি ক্যাপ্টেন ডগলাসকে ডেকে পাঠালেন। ডগলাস তাদেরকে চলে যেতে বললেন, কারণ তাদের শোরগোল সম্রাটের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। তারপরে বিদ্রোহীরা কলকাতা ফটকের দিকে গেলো। কিন্তু আগে থাকতেই ফটক বন্ধ ছিলো। ইতিমধ্যে কমিশনার সাইমন ফ্রেসার এবং হাচিনসন অকুস্থলে এসে হাজির হলেন। তারা এসে ক্যাপ্টেন ডগলাসের সঙ্গে যোগ দিলেন। সবগুলো ফটক আগে থাকতে বন্ধ রাখা হলে নগরে প্রবেশ করা অসাধ্য না হলেও বেশ কষ্টসাধ্য হতো বিদ্রোহীদের পক্ষে। কিন্তু নগরের অভ্যন্তরে সেপাইদের সমমর্মীর অভাব ছিলো না। গুজব রটে গেলো যে সেপাইরা মীরাটের ইউরোপীয়দের হত্যা করে দিল্লীতে ধর্মের জন্য সগ্রাম করতে এসেছে। কৌতূহলী জনতার ভিড়ে রাজপথ মুখরিত হয়ে উঠলো। তারপরেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। তাদের অনেকেই ইংরেজদের জবরদখলকারী এবং বহিরাগত বলে ঘৃণা করতো। দিল্লীর নাগরিকদের ইংরেজদের বিতাড়িত করতে আবেদন জানিয়ে ইরানের শাহ মাত্র কিছুদিন আগে একটি ফরমান পাঠিয়েছেন। কে রাজঘাট ফটক খুলে দিয়েছিলো, জানা সম্ভবপর হয়নি। সেপাইরা পরে সেখানে গিয়ে হাজির হলো। তাদের মনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিলো না। লুট করার লোভ ছিলো প্রবল, তাও বলবার উপায় নেই। দুর্ধর্ষ অশ্বারোহীরা নগরে প্রবেশ করার পরে তাদের সঙ্গে স্থানীয় দুষ্কৃতিকারীরাও যোগ দিলো।

ডঃ চমনলাল নামে ডিসপেনসারীর সামনে দণ্ডায়মান একজন ভারতীয় খ্রীস্টান হলেন নগরীর প্রথম নিহত ব্যক্তি। তারপরে সেপাইরা দলে দলে প্রাসাদ অভিমুখে ধাওয়া করলো। প্রাসাদের প্রহরীরা কোনো বাধা দিলো না, আবার সেপাইদের সঙ্গে যোগও দিলো না। হাচিনসন, ফ্রেসার এবং ডগলাস প্রাসাদে ফিরে এলেন এবং সেখানেই নিহত হলেন। যাজক মিঃ জেনিংস, তাঁর পত্নী এবং কন্যাকেও বিদ্রোহীরা নিহত করলো। বিদ্রোহীরা বাদশাহকে আহ্বান করে নেতৃত্বদান করতে বললো। সম্রাট দারিদ্র্যের কথা বললেন, বুড়ো বয়সের কথা বলে নিরস্ত করতে চেষ্টা করলেন। সেপাইরা সে কথা শুনবে কেনো? তারা তাদের আসল প্রভুর সেবা করতে এসেছে, ধর্ম রক্ষা করতে এসেছে, বেতন এবং প্রমোশনের কথা উঠবে কেনো? কিন্তু তিনি বন্ধু এবং শুভানুধ্যায়ীদের অনুরোধে এখনো বিষয়টি চিন্তা করে দেখবেন। তাঁর বন্ধু এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক হেকিম আহসানউল্লার পরামর্শ অনুসারে আগ্রায় লেফটেন্যান্ট গভর্ণরের কাছে মীরাটের বিদ্রোহ এবং সেপাইদের দিল্লী আগমনের সংবাদ উটযোগে পাঠাবেন কিনা গভীরভাবে চিন্তা করছেন। তিনি দৃঢ়বিশ্বাস পোষণ করছিলেন মীরাট থেকে ইউরোপীয় সৈন্যরা সাহায্যের জন্য ছুটে আসবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেলো, কিন্তু কোনো দিক থেকে কোনো সাহায্য এলো না। অবস্থা প্রতি মুহূর্তে ভয়াবহ আকার ধারণ করছিলো। প্রথমতঃ সম্রাট ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন, কারণ সেপাইরা অশ্বারোহণে ভেতরে ঢুকে তাঁর প্রাসাদের সম্মান নষ্ট করেছে, যে প্রাসাদে ঢুকতে সকল সম্ভ্রান্ত বংশের লোক, এমন কি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর এজেন্টদের পর্যন্ত ঘোড়া থেকে অবতরণ করতে হয়। কিন্তু ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসের মুখে বুড়ো সম্রাট কাবু হয়ে পড়লেন। সূর্য ডোবার পরে তাঁকে স্বেচ্ছায় অনিবার্যকে মেনে নিতে হলো। এ বিয়োগান্তক নাটকে শাহজাদারা কোন্ ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, সে সম্বন্ধে আমরা জানতে পারিনি। স্বভাবতঃই তাঁরা আরো আন্তরিকভাবে সেপাইদের অভিনন্দন জানিয়ে থাকবেন। তাদের বংশের লুপ্তপ্রায় গৌরব পুনরুজ্জীবিত করার একটা সুযোগ পেয়ে সম্ভবতো তাঁরা আনন্দিত হয়ে উঠেছিলেন। তা না হলে তো তাদেরকে সম্রাটের প্রাসাদ ছেড়ে চলে যেতে হবে এবং চিরদিনের জন্য সম্রাট পদবী ত্যাগ করতে হবে। সহজেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান এবং আবুবকর অবস্থার সবচেয়ে বেশি সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন, ঘটনা পরম্পরা বিচার করলে আমরা তাই দেখতে পাই। মধ্যরাতে একুশটা তোপধ্বনি করে ঘোষণা করা হলো বাবুরের বংশধর আবার স্বহস্তে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

মীরাটের মতো দিল্লীতে কোনো ইউরোপীয় সৈন্য ছিলো না। দিল্লীর কতেক সেপাই অফিসার কোর্ট মার্শালে সেপাইদের বিচার করেছিলেন। চর্বি মাখানো কার্তুজ হতভাগ্য সেপাই যাদেরকে তারা দণ্ডদান করেছিলো তাদের কাছে যেমন, তেমনি অফিসারদের কাছেও অনুরূপ ভয়ের কারণ ছিলো। আমরা সে দণ্ডিত জমাদারের কর্ম কিভাবে বিচার করবো? সত্যি কি সে রাজদ্রোহের অপরাধী ছিলো? তার প্রাণদণ্ডাজ্ঞা কি আইনসঙ্গত হয়েছে? ধর্মের কারণে শহীদ? নাকি ব্রিটিশ প্রতিহিংসার সময়ের শিকার? সে বিশেষ দলিলটি ইংরেজদের মে মাসের ১১ তারিখে প্রচার করা উচিত ছিলো। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ইংরেজরা করেনি। ঐ একই দিনে ৩৮নং রেজিমেন্ট ব্রহ্মদেশে যেতে অস্বীকার করলো। এ সকল ঘটনা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অনেক সময় দুর্ঘটনাই ইতিহাসের গতিধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে বর্তমানে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানেই রাজাপুর গ্রামে অবস্থিত ছিলো ক্যান্টনমেন্ট। অল্পক্ষণ পূর্বে ব্রিগেডিয়ার গ্রেভস বিপদের আঁচ করতে পেরেছেন। সেপাইরা মারমুখো হয়ে রয়েছে। কর্ণেল রিপ্লের নেতৃত্বে ৫৪নং দেশীয় বাহিনী কাশ্মিরী ফটকের দিকে যাত্রা করলো। তাদের অধিনায়ককে কেটে ফেলা হলো, অফিসারদের গুলী করে মারা হলো, কিন্তু তারা যুদ্ধ করতে স্বীকৃত হলো না। মেজর এ্যাবোট পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে পারলেন না। দ্বিপ্রহর পর্যন্ত শহরের প্রধান প্রতিরক্ষীরা বাধা দিয়ে আসছিলো। বিকেলবেলা ৩৮নং-এর সেপাইরা তাদের অফিসারদের গুলি করতে থাকে। মহিলাদের কোনো রকমে সঙ্গে নিয়ে অফিসারদের পলায়ন করতে হয়। এ সময়ে শহরে একজনও ইউরোপীয় কিংবা ভারতীয় খ্রীস্টান ছিলো না। দারিয়াগঞ্জ অঞ্চলে ভারতীয় এবং ইউরোপীয় খ্রীস্টানেরা থাকতো। সে এলাকা ছারখার করে দেয়া হলো, প্রত্যেক খ্রীস্টানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। ব্যাঙ্ক লুট করা হলো। ম্যানেজার এবং তার পরিবারকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। স্থানীয় সংবাদপত্র অফিস আক্রমণ করে একজন ছাড়া কম্পোজিটরদের মেরে ফেলা হলো। কিষেণগড়ের রাজার বাড়িতে দুদিন ধরে বহু নরনারী লুকিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। রাজা তাদের রক্ষা করার জন্য তার বড়ো ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি হয়তো দেরীতে পৌঁছেছিলেন, অথবা সময় মতো এসেও তাদেরকে নিবৃত্ত করতে পারেননি। আত্মগোপনকারীদের সকলকেই নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। পঞ্চাশজনকে বন্দী করে প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হলো, সেখানে তাদেরকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। অধিকাংশ আশ্রয়প্রার্থী ফ্যাগ স্টাপ টাওয়ারে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো, কিন্তু সেখানে নিরাপদ মনে না করায় তারা রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বিভিন্ন দিকে বেরিয়ে পড়লো। কেউ কেউ নিরাপদে মীরাটে এসে পৌঁছালো, কেউ কেউ আমবালা এবং কর্ণাটকের দিকে এগুতে লাগলো। তারা দিনের বেলায় রাস্তার পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতো এবং রাতের বেলায় পথ চলতো। ক্লান্ত পায়ে নানারকম ঘুরতি পথে বহু কষ্ট করে এগিয়ে যেতে লাগলো। গ্রামাঞ্চলের বহু কৃপালু মানুষ তাদেরকে দয়া করে খাদ্য এবং আশ্রয় দান করেছে।

পরবর্তীকালের গৌরবময় বীরত্বই তাদের এ বিপত্তি অতিক্রমণে সাহায্য করেছে। শহর খালি হয়ে গিয়েছিলো, ক্যান্টনমেন্ট পরিত্যাগ করতে হলো, কিন্তু অস্ত্রাগার এখনো পুরোপুরি তাদের দখল থেকে যায়নি। দুর্গরক্ষী ছিলেন নয়জন পরাক্রান্ত ইংরেজ। সকালবেলা স্যার থিওফিলাস মেটকাফ অস্ত্রাগারে এসে দু’টো কামান নিয়ে গোলার সাহায্যে সেতু উড়িয়ে দেবার জন্য এসেছিলেন। কামান স্থানান্তর করার জন্য গরুর গাড়ি পাওয়া গেলো না। ইতিমধ্যে বিদ্রোহীরা সেতু পার হয়ে এসেছে। লেফটেনান্ট উইলোবি অস্ত্রাগার রক্ষা করার জন্য তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করলেন এবং শেষ পর্যন্ত না পারলে অস্ত্রাগার উড়িয়ে দেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনি কোনো সাহায্যের প্রত্যাশা করতে পারছিলেন না এবং বাইরের উচ্ছখল জনতা বারে বারে ভীতিপ্রদ হয়ে উঠছে।

তাঁদের আত্মসমর্পণের দাবি জানানো হয় সম্রাটের নামে। অবশেষে জোর করে প্রাচীর অতিক্রম করার জন্য মই আনা হলো। শেষ পর্যন্ত পূর্বসংকেত অনুসারে গোলা নিক্ষেপ করা হলো। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ সেপাইরা সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয়ই রয়ে গেলো। মীরাট থেকে তাদের দমন করার জন্য কোনো সৈন্যসামন্ত এলো না। কোথায় কি ঘটলো, তা সেপাইদের জানা নেই। সম্রাটের কিন্তু দুর্দশার অন্ত নেই। আগে তাঁর জন্য সকল ব্যবস্থা করতে অন্যেরা। এখন তার ঘাড়ে সেপাইদের প্রতিপালন করবার দায়িত্ব এসে পড়েছে। তার বিশ্বস্ত বন্ধু হেকিম আহসান উল্লাহও ছিলেন, সম্রাটের মতো একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ। শাসনকার্যে অভিজ্ঞতা বলতে যা বোঝায় তার একটুকুও ছিলো না। তাছাড়া সেপাইদের ওপর তার আস্থা ছিলো না, সেপাইরাও তাকে বিশ্বাস করতো না। তার দৃঢ় বিশ্বাস শীগগির হোক অথবা দেরীতে হোক ইংরেজ ফিরে আসবেই আসবে। সুতরাং বিদ্রোহে নেতৃত্বদান করতে হলে যে অটুট মনোবলের প্রয়োজন তা তার ছিলো না। সম্রাট ১২ তারিখে সম্ভ্রান্ত মুসলমান রাজপুরুষদের দরবারে আহ্বান করলেন। নিমন্ত্রিতদের মধ্যে ঝিজ্জরের নওয়াবের পিতৃব্যও ছিলেন একজন। একটা শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করার জন্য সকলকে আহ্বান করা হয়েছে। নগরে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে, সেপাইদের রসদ এবং বাসস্থানের সংস্থান করতে হবে। নতুন সেপাইদের ভর্তি করতে হবে। রাজধানীর সর্বত্রই হট্টগোল আর বিশৃঙ্খলা। দুষ্কৃতিকারীরা খ্রীস্টান এবং ইউরোপীয়দের সন্ধান করবার অজুহাতে সম্পদশালী মানুষদের ভয়ানক দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। রাজকোষে টাকা নেই অথচ সেপাইদের ব্যয়ভার মেটাতে অর্থের প্রয়োজন। এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ের মোকাবেলা করার জন্য যে রকমের সাহসী এবং উদ্যমশীল পুরুষের প্রয়োজন ছিলো, দুর্ভাগ্যবশতঃ নব আহূত দরবারে সে রকম মানুষ একজনও ছিলো না। সম্রাটের ‘ আবেদনে যে কাপুরুষেরা কান দেননি, তাতে আশ্চর্য হওয়ার বেশি কিছুই নেই। একজন তো সরাসরি সম্রাটকে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানালেন। সে যাকগে, তারপরে একজন শাসনকর্তা নিয়োগ করা হলো। মীর্জা মোগলকে দেয়া হলো প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব এবং অন্যান্য সম্রাটপুত্রদের উচ্চ সামরিক পদসমূহে বসানো হলো। সম্রাটের মতো, সম্রাটপুত্ররাও উজ্জ্বলতার স্বাদ পাওয়া সেপাইদের মধ্যে নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার উপযুক্ত ছিলেন না। সম্রাট হাতীর পিঠে চড়ে নগর প্রদক্ষিণ করলেন, ব্যবসায়ী এবং অন্যান্যদের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে আবেদন জানালেন। কিন্তু এতো সহজে আতঙ্ক কাটলো না। প্রাসাদের বাগানে সেপাইরা ডেরা পেতেছে। তারা সকল উপায়ে নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি করে যাচ্ছে। এ সম্বন্ধে মুন্সী জীবনলাল লিখেছেন। প্রতিটি বাড়ি থেকে আবেদন, নালিশ অনিচ্ছুক সম্রাটের কানে আসতে লাগলো। নিহত ইউরোপীয়দের চাকর-বাকরেরা আবেদন করছে। আবেদন করছে দোকানদার-যাদের দোকান লুট হয়ে গিয়েছে। তৎক্ষণাৎ প্রতিকারের জন্য সকল সম্রাটের দিকে তাকাতে লাগলো। লুণ্ঠন এবং অত্যাচার বন্ধ করার জন্য সম্রাটের কাছে আবেদনের পর আবেদনপত্র আসতে থাকে। সম্রাট যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন কিন্তু একজন দুর্বল অশক্ত অশীতিপর বৃদ্ধের যথাসাধ্য চেষ্টার কীই-বা ফল ফলবে। তিনি সেপাইদের আবেদন করলেন, অনুরোধ করলেন, শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত করে দেবার নির্দেশ দিলেন। সম্রাট তো নির্দেশ দিলেন কিন্তু সে অনুসারে কাজ করা হলো না। দুর্বল মানুষের সম্রাট হওয়া সাজে না। শেষ মোগলদের কেউই বিপ্লবী সংগ্রামে নেতৃত্বদানের জন্য উপযুক্ত ছিলেন না।

শেষ পর্যন্ত বেসামরিক এবং সামরিক বিভাগের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সকল রকম অব্যবস্থার নিরসন করার জন্য একটি সামরিক এবং বেসামরিক কমিটি বা আদালত গঠন করা হলো। কমিটির সভ্য সংখ্যা ছিলো দশ। তার মধ্যে সেপাইরা দু’জনকে নির্বাচিত করেছিলো, পদাতিক অশ্বারোহী এবং গোলন্দাজ প্রতিটি বিভাগের দু’জন করে প্রতিনিধির সমবায়ে। বাকী চারজনের উপর অর্পণ করা হয়েছিলো বেসামরিক দায়িত্ব। সামরিক প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ছিলো সেনাবাহিনীর সবকিছু দেখাশোনা করা। কারা বেসামরিক প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করেছিলো এবং সে নির্বাচনের ভিত্তি কি ছিলো তাও জানা যায়নি। কিন্তু সামরিক প্রতিনিধিদের নির্বাচনের বেলায় অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতা বিচার করা হতো সে সঙ্গে সংখ্যাধিক্যের মতামতকেই প্রাধান্য দেয়া হতো। কমিটিকে একজন সভাপতি নির্বাচন করার অধিকার এবং নির্বাচিত সভাপতিকে আরেকটা অতিরিক্ত ভোটের অধিকার দেয়া হয়েছিলো। এই আদালত অথবা কমিটি প্রধান সেনাপতির অধীনে ছিলো। তাঁর অনুমোদন না পেলে কমিটির কোনো সিদ্ধান্তই কার্যকরী হতো না। প্রধান সেনাপতি দরবারের কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে না পারলে সে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার জন্য দরবারে ফেরত পাঠাতে পারতেন। তারপরেও যদি দরবারীরা তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকতেন, তা হলে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সম্রাটের কাছে পাঠাতে হতো। সম্রাট এবং প্রধান সেনাপতি ইচ্ছা করলেই এ কমিটির সভায় উপস্থিত থাকতে পারতেন। কাগজে কলমে এ কমিটি ছিলো গণতান্ত্রিক, কিন্তু কার্যতঃ তার কোনো প্রভাব ছিলো না বললেই চলে। কখন যে এ আদালত গঠন করা হয়েছিলো, সে সম্বন্ধে সঠিকভাবে কিছু জানার উপায় নেই। কারণ শাসনতন্ত্রে কোনো সন তারিখের উল্লেখ নেই। দিল্লীর পতনের পূর্বেও এ কমিটি সক্রিয় ছিলো। সক্রিয় থাকলে কি হবে, এ কমিটি ক্ষণস্থায়ী সরকারের সেনাবাহিনী অথবা বেসরকারি কর্মচারিবৃন্দের উপর বিশেষ প্রতিপত্তি বিস্তার করতে পারেনি। মে মাসে সম্রাট নতুন বিপদের সম্মুখীন হলেন। ২৮শে মে তারিখের একটি রিপোের্ট মতে সেপাইরা তিনদিন ধরে দিল্লীতে লুঠতরাজ করেছে। তারা বেগম জিনাতমহলকে ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে সন্দেহ করতে লাগলো। সম্রাট আশেপাশের জমিদারদেরকে সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ করতে নির্দেশ দান করলেন। টাকার অভাবে শাসনকার্য প্রায় অচল হয়ে পড়লো। শহরের কোষাগারিকদের পরোয়ানাজারী করে দুর্গে নিয়ে যাওয়া হলো এবং রাজকোষে টাকা দেয়ার জন্য নির্দেশ দান করা হলো। নবনিযুক্ত কোষাগারিক এবং কর্মচারীরা সম্রাটের চাপ সহ্য করতে না পেরে সেপাইদের বেতন মিটিয়ে দেবার জন্য কোনো মতে এক লাখ টাকা আদায় করে রাজকোষে জমা দিলো। এক লাখ টাকাতে সাক্ষাৎ প্রয়োজনের অল্পও মিটলো না। কিছুদিনের মধ্যেই সেপাইরা হায়দারাবাদের একজন সম্পদশালী ব্যক্তির বাড়ি লুঠ করলো। যে সকল কোষাগারিক এবং সম্পদশালী লোকদের সঙ্গে ইংরেজদের বন্ধুত্ব আছে, তাদের আটক করে টাকা আদায় করার কথা ঘোষণা করা হলো। মে মাসের শেষ সপ্তাহে রোহতক থেকে এক লাখ সত্তর হাজার টাকা আসার ফলে অবস্থার অল্প একটু উন্নতি হলো। কিন্তু পরিবেশ এখনো সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের বাষ্পে আচ্ছন্ন।

ইসলামগড় দুর্গের কামানগুলোকে কে বা কারা অকেজো করে দিলো। এ সম্বন্ধে গুজব ছড়িয়ে পড়লো, সম্রাটের বিশ্বস্ত মন্ত্রী এবং বন্ধু আহসান উল্লাহ্ খানের সঙ্গে এর গোপন যোগাযোগ রয়েছে। দিল্লী এবং মীরাটের বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিলো না। তার ফলে অবস্থা আরো ঘোরালো হয়ে উঠলো। মীরাটের সেপাইরা নালিশ করতে লাগলো যে দিল্লীর সেপাইরা স্থানীয় রাজকোষ লুট করে প্রচুর বিত্তের অধিকারী হয়েছে, অথচ তাদের দুঃখ-দুর্দশার সীমা নেই।

ইংরেজ সরকারের প্রস্তুতির অভাবই বিদ্রোহীরা এবং তাদের নেতৃবৃন্দকে দীর্ঘদিন নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ দান করেছিলো। ১২ই মে থেকে ৮ই জুন অর্থাৎ বাদল কি সরাইর খণ্ডযুদ্ধ এবং ঢিলা দখলের পর থেকে দিল্লী দখল পর্যন্ত বিদ্রোহীদের নেতৃবৃন্দ আপন ঘর সামলে নিয়ে চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হওয়ার প্রচুর সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা সব সুযোগ নষ্ট করলেন। জুন মাসে দেখা গেলো সেপাইদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরেছে এবং ব্যবসায়ী শ্রেণীর সৈন্যদের প্রতি বিদ্বেষের অন্ত নেই। শাহজাদাদের অত্যাচার থেকে প্রজাদের রক্ষা করার জন্য বৃথাই চেষ্টা করলেন সম্রাট।

ইংরেজ সেনাপতি জেনারেল আনসনের স্বাস্থ্য বিদ্রোহের প্রথম সূত্রপাতের সময় ভালো ছিলো না। অন্যান্য অক্ষম ইংরেজরা যেমন যায়, তেমনি তিনিও হিমালয়ে গিয়ে আরোগ্য লাভ করলেন। দাগসাই, কাসৌলি এবং সুবাতু ইত্যাদি গ্রীষ্মকালীন ঘাঁটিগুলোতে ব্রিটিশ সৈন্য মোতায়েন করা হলো। পাঞ্জাবের কমিশনার জন লরেন্স তখন রাওয়ালপিন্ডি থেকে মারী আসছিলেন। কিন্তু বৈদ্যুতিক তার সেপাইদের বিদ্রোহের খবর জানিয়ে দিলে, তিনি তাঁর কর্মসূচি বদল করলেন এবং তাড়াতাড়ি লাহোর এবং পেশোয়ারে সহকর্মীদের কাছে ফিরে গেলেন। আনসন দাগসাইয়ের ব্রিটিশ সৈন্যদের যাত্রা করতে নির্দেশ করলেন। দেরাদুন থেকে মীরাটে একটি গুর্খা রেজিমেন্ট তলব করা হলো। আমবালার সেপাইরা তখনও সম্পূর্ণ অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ১৬ তারিখে জেনারেল আনসন সেখানে গিয়ে পৌঁছালেন। এখনো সময় আছে, দিল্লী যদি রক্ষা করা যায়, তাহলে হয়তো সমগ্র ভারতবর্ষও রক্ষা করা যেতে পারে। লরেন্স তাড়াতাড়ি অগ্রসর হওয়ার জন্য আনসনকে চিঠির পর চিঠি লিখছেন। কিন্তু আনসনের নিজস্ব অসুবিধা আছে। তাঁকে যানবাহন পেতে হবে, প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র তাঁর হাতে থাকা চাই, তাঁবুর সরঞ্জামপত্রের ব্যবস্থা করতে হবে, তা নইলে সাত মাইল পরিধির একটি সুরক্ষিত নগরী কীভাবে তিনি আক্রমণ করবেন। তদুপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ অফিসারদের কাছে ট্রেনিংপ্রাপ্ত স্বদেশীয় সশস্ত্র সেপাইরা সে নগর রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। এক আঘাতে দিল্লীর দুর্গ প্রাচীর চূর্ণ করা যায় এমন আশা করা কিছুতেই উচিত হবে না। সবচেয়ে সাহসী সৈন্যরাও হাওয়াতে লাফ দিতে পারে না। অসাবধানে যদি কিছু করে বসে, তাহলে সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ত্যাগ করাই হবে সে অসাবধানতার মূল্য। সেজন্য আনসনকে ধীরে ধীরে যেতে হচ্ছিলো। সৈনিক হিসেবে তাঁর নিজের এবং সহকর্মীদের দায়িত্ব তিনি বোঝেন, সেজন্য একজন বেসামরিক কর্মচারির তাড়াহুড়ায় কান দিয়ে সমগ্র পরিকল্পনা বানচাল করতে তিনি রাজী ছিলেন না।

সে সময়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের মনোবলও ভেঙ্গে গিয়েছিলো। শুখাদের নাসিরি রেজিমেন্টকে সিমলার নিকটস্থ জুতোঘে স্থাপন করা হয়েছিলো। অন্যান্য পার্বত্য বাহিনীর মতো তাদেরকেও আমবালা যেতে নির্দেশ দেয়া হলে তারা অবিলম্বে পথ দিতো। কিন্তু তাদের বাকী মাইনে পরিশোধ করা হয়নি। তাদের অবর্তমানে স্ত্রী পুত্রদের খাওয়া-পরার জন্য কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়নি। স্ত্রী-পুত্রদের ভরণ পোষণের কোনো সন্তোষজনক ব্যবস্থা না করে অতোদূরে যাওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলো না। তারা অসন্তুষ্ট হলো, দু’পক্ষে কড়া বাক্য বিনিময় হলো। এমনকি তাদের আচরণে অনানুগত্যও প্রকট হয়ে উঠলো। গ্রীষ্মবাসের ইউরোপীয়েরা শুনতে পেলো গুর্খারা বিদ্রোহ করেছে এবং সিমলার দিকে এগিয়ে আসছে। খবর শুনেই হৈ চৈ পড়ে গেলো। এ গোলমালের মধ্যেও লর্ড উইলিয়াম মে নামক একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মাথা ঠিক রেখেছিলেন। তিনি অরক্ষিত শিশু এবং নারীদের ব্যাংক প্রাঙ্গণে এনে জমায়েত হতে বললেন, যাতে করে বিপদের সময়ে তাদের রক্ষা করা যায়। কিন্তু ভীত-সন্ত্রস্ত আতঙ্কিত ইউরোপীয়দের কেউই তাঁর পরামর্শে কান দিলো না। অল্প সময়ের মধ্যে বিক্ষুব্ধ নগরীর বাইরে চলে যেতে শুরু করলো, যাতে বিদ্রোহীরা তাদের নাগাল না পায়। দুর্ভাগ্যবশতঃ কিছু সামরিক অফিসারও সাহসের পরিচয় দিতে পারেননি। তাঁরা কিয়োন্থালের রাজার সিমলার প্রাসাদ নিরাপদ মনে করতে পারেননি। অধিকতররা নিরাপত্তার আশায় তারা রাজধানীর প্রাসাদের উদ্দেশ্যে ধাওয়া করলেন। মেজর জেনারেল পেনি, লেফটেনান্ট কর্ণেল কিথ, ইয়ং গ্রীথিড, কুইন কোলিয়ার চারজন ক্যাপটেন এবং তিনজন লেফটেনান্ট রাজা সংসার সেনের রাজধানীতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু গুর্খারা সিমলাতে হামলা করলো না এবং পলাতকেরা নিরাপদে ঘরে ফিরে এলেন।

পূর্বদিকে যাত্রা শুরু করার আগে হিওইটের সঙ্গে যোগাযোগ করে মীরাটের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন মনে করলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিলো, মীরাটের সৈন্যরা ভগপতে এসে তাঁর সঙ্গে যোগ দেবে এবং সম্মিলিত বাহিনী দিল্লী অভিযানে যাত্রা করবে। প্রধান সেনাপতির নির্দেশ পেয়ে কিছু সংখ্যক শিখ অশ্বারোহী সমেত লেফটেনান্ট হডসন মীরাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তৃতীয় অশ্বারোহী বাহিনীর বিশজন সেপাইসহ ক্যাপটেন স্যানফোর্ডও পথ দিলেন। অফিসার দু’জনে কেউ পথে কোনো বাধার সম্মুখীন হননি। পাতিয়ালার রাজা, ঝিন্দের রাজা, কর্ণেলের নওয়াব ইংরেজের প্রতি অনুগত থাকতে মনস্থ করলেন এবং তাদের সাধ্যমতো সর্বপ্রকারে ইংরেজদের সহায়তা করতে লাগলেন। ওদের উপর আমবালা থেকে দিল্লী যাওয়ার পথের পাহারা ভার দেয়া হলো। এভাবে নিশ্চিন্ত হয়েই ব্রিটিশ বাহিনী গৌরবময় মুসলিম রাজধানী দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলো। কিন্তু আনসন এতো সহজে দিল্লীতে পৌঁছাতে পারলেন না। গ্রীষ্মকালে উত্তর ভারতের উত্তপ্ত সমভূমির উপর দিয়ে মার্চ করতে ব্রিটিশ সৈন্যরা অভ্যস্ত ছিলো না। সুতরাং দিবাভাগের অধিকাংশ সময় বিশ্রাম করতে হতো এবং রাতে তারা পথ চলতো। শিবিরের স্বাস্থ্যরক্ষা বিধি একেবারেই সন্তোষজনক ছিলো না। কলেরা এবং সর্দিগর্মি রোগে মৃত্যু ছিলো একটি অতি সাধারণ ব্যাপার। ২৭শে মে তারিখে রুগ্ন এবং উৎকণ্ঠিত প্রধান সেনাপতি জেনারেল আনসন মারা গেলেন। তাঁর স্থলে জেনারেল স্যার হেনরী বার্নাড সেনাবাহিনীকে পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।

বার্নাড ছিলেন ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সৈনিক। দিল্লীতে তিনি নতুন এসেছেন। ব্রিগেডিয়ার উইলসনের নেতৃত্বাধীন মীরাট বাহিনী পরিকল্পনা অনুসারে ভগপতে এসে তাঁর সঙ্গে যোগ দিলো। গন্তব্যে উপনীত হবার পূর্বে গাজী উদ্দীন নগর এবং হিন্দান নদীর তীরে বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাদের দু’টি সংঘর্ষ হয়। এতে ইংরেজরাই জয়লাভ করে । ৮ই জুন তারিখে দিল্লী থেকে পাঁচ মাইল দূরে বাদল-কি সরাইতে তারা বিদ্রোহী সৈন্যেদের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। সামনাসামনি যুদ্ধে বিদ্রোহীরা পরাজিত হলো এবং ২৪টি কামান তাদের হারাতে হলো। সেপাইরা অধিক সংখ্যক এবং বেশি অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সুযোগ্য সেনাপতির পরিচালনার গুণে ইংরেজেরাই জয়লাভ করলো। তাদের পক্ষে নিহতের সংখ্যা ছিলো চার এবং কয়েকজন আহত হয়েছিলো। সেনাবাহিনীর এ্যাডজুটেন্ট জেনারেল কর্ণেল চেষ্টারও ছিলেন নিহতদের মধ্যে একজন। সেদিনই বিজয়ী বাহিনী সামনে অগ্রসর হতে থাকে এবং দিল্লীর বহিঃপ্রকারের ধারের নীচু টিলা-শ্রেণী দখল করে। সেপাইদের মধ্যে সাহসের অভাব ছিলো না, কিন্তু তাদের পরিচালনা করার মতো কোনো সামরিক প্রতিভা ছিলো না। তা না হলে প্রচণ্ড সংগ্রাম ছাড়া ইংরেজেরা এসে সহজে টিলা শ্রেণী দখল করতে পারতো না। ব্রিটিশ সৈন্য ১১ই মে তারিখে দিল্লী অভিযান শুরু করে এবং ৮ই জুন এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তারা ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসতে সক্ষম হয়।

টিলা-শ্রেণী নগরের উত্তর দিকে অবস্থিত ছিলো। তিনটি প্রধান ফটক নিয়ন্ত্রিত করা যেতো এ টিলা-শ্রেণী থেকে। জেনারেল বার্নাডের সেনাবাহিনী আর কোনো আক্রমণ করেনি বললেই চলে। ১৮৫৭ সালে দিল্লী প্রাচীরের অভ্যন্তরে বিদ্রোহী কিংবা টিলার ওপরে মোতায়েন বিরোধী সেনাবাহিনী কেউ কাউকে আক্রমণ করেনি। মথুরার রাস্তা খোলা ছিলো। অযোধ্যা, রোহিলাখণ্ড, ঝাঁসী, কানপুর এবং নাসিরাবাদ থেকে দলে দলে বিদ্রোহীরা নগরের ভেতরে প্রবেশ করে সেপাইদের শক্তি বৃদ্ধি করছিলো। এতে তারা সামান্যতম বাধার সম্মুখীনও হয়নি। অন্যদিকে আমবালার সঙ্গে ব্রিটিশ সৈন্যের যোগাযোগও অব্যাহত ছিলো। সে ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার জন্যও বিদ্রোহীরা কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি। সুতরাং রসদ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র পেতে ব্রিটিশ সৈন্যদের কোনো অসুবিধা হচ্ছিলো না। টিলা-শ্রেণীর সামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করাই হলো বার্নাডের প্রথম কাজ। সোজাসুজি দক্ষিণে যেখানে নগরীর উপকণ্ঠের সবজীমণ্ডির কাছে টিলা ঢালু হয়ে নেমে এসেছে, সেখানে দণ্ডায়মান একখানা পাথরের প্রাসাদ। সে প্রাসাদ হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদ নামেই খ্যাত। দৌলতরাও সিন্ধিয়ার নিকট-আত্মীয় মৃত হিন্দু রাওয়ের বাড়িটাতে সে সময়ে কোনো ভাড়াটে ছিলো না। গুর্খা সেনাবাহিনীসহ মেজর রীড এখানেই তাঁর ঘাঁটি স্থাপন করলেন। টিলার বামে ছিলো ফ্ল্যাগস্টাফ টাওয়ার-একটি ইস্টক নির্মিত দ্বিতল গোলাকার অট্টালিকা। সামরিক পর্যবেক্ষণের উপযুক্ত জায়গা। সেখানে কিছু সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন রাখা হলো। টাওয়ার থেকে অল্প দূরেই একটা পুরানো পাঠান মজিদ এবং হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদের কাছেই ছিলো একটি মানমন্দির। এ দু’টো অট্টালিকাকেই প্রহরাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হলো। ফ্ল্যাগস্টাফ টাওয়ারের পেছনে নদীর তীরে স্যার থিয়োফিলাস মেটকাফের গ্রামনিবাস। সুরক্ষিত প্রাসাদের মধ্যে থেকে সেপাইরা ব্রিটিশ বাহিনীর বামদিকে আক্রমণ করতে পারতো। লাডলো ক্যাসেল নামে একটি গম্বুজবিশিষ্ট ইস্টক প্রাসাদ থেকে সেপাইরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মর্মকেন্দ্রে হানা দিতে পারতো। কিন্তু সেপাইরা এ সকল অবস্থানের সুযোগ খুব অল্পই গ্রহণ করেছে। হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদে যে প্রচণ্ড আক্রমণ করা হবে সে কথা ব্রিটিশ অফিসারেরা তখনই মাত্র বুঝতে পারলো। নগর আক্রমণ করে শত্রুদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরবে কিনা পরক্ষণেই বার্নাডকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলো।

তিন তিনটি পরাজয়ের পর সেপাইরা যে দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করতে পারবে না, এ আশা পোষণ করেছিলো ইংরেজরা। তড়িৎগতিতে মোগল রাজধানী দখল করা এবং মোগল সম্রাটকে পরাজিত করতে পারলে যে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে, তার তুলনা হয় না কোননা। স্যার জন লরেন্স এ ব্যাপারে সেনাপতিকে দুঃসাহস দেখাতে সর্বপ্রকারে প্ররোচিত করতে লাগলেন। রবার্ট ক্লাইভ এবং প্রাথমিক ব্রিটিশ বীরদের নাম প্রবল আশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারিত হতে লাগলো। কলকাতায়ও সকলে বিশ্বাস করতে লাগলো যে দিল্লীর ফটক ভাঙতে পারলেই নগরী অধিকার করা সম্ভব। একবার দিল্লী অধিকৃত হয়ে গেলে অন্যান্য স্থানের বিদ্রোহ সমূলে ধ্বংস করা সম্ভবপর। টিলা-শ্রেণীর ওপরের সেনা শিবিরে জুনিয়র অফিসারেরা এ সকল বিশ্বাসে আস্থাবান হয়ে উঠেন। কিন্তু তাদের সাহস এবং বীরত্বের কোনো পরীক্ষা এখনো হয়নি। ইঞ্জিনীয়ারদের মধ্যে উইলবার ফোর্স গ্রীথিড একটি আক্রমণের পরিকল্পনা খাড়া করলেন, অনেক ভাবনা-চিন্তার পর জেনারেল বার্নাড সে পরিকল্পনা অনুমোদন করলেন। বার্নাডের ভারত সম্বন্ধে কোনো অভিজ্ঞতা ছিলো না। সে জন্য তাঁকে বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যেই কাল কাটাতে হচ্ছে। এ রকম অবস্থায় যে সামরিক দিকের চাইতে রাজনৈতিক দিকে অধিকতররা গুরুত্বদান করতে হয়, সে সম্বন্ধে তিনি সজাগ ছিলেন। গ্রীথিডের পরিকল্পনা ছিলো রাতের অন্ধকারে নগরের দু’টি প্রধান ফটক উড়িয়ে দেয়া এবং দিবাভাগে শহরের অভ্যন্তরে সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান আক্রমণ পরিচালনা করা। সম্পূর্ণ গোপনীয়তার ওপরেই এ পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করছিলো। রাতে দু’টি বাহিনীর প্রস্তুতিপর্ব যখন সমাপ্তপ্রায়, সেদিনের ফিল্ড অফিসার ব্রিগেডিয়ার গ্রেভস্ শুধুমাত্র মৌখিক আদেশে অভিযান চালাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। অশ্বারোহণে তিনি জেনারেল বার্নাডের তাবুতে গেলেন। জেনারেল বার্নাড এ আক্রমণের সাফল্য সম্বন্ধে নিশ্চয়তা দাবি করলেন। নগর না হয় নেয়া হলো, পরিশেষে কিভাবে তা রক্ষা করা হবে, সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। শিবিরের সকলের চেয়ে গ্রেভস্ দিল্লী সম্বন্ধে অনেক বেশি ওয়াকেবহাল। সুতরাং তার মতামত হাল্কাভাবে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু কোনো রকমে পরিকল্পনার কথা একবার প্রকাশ হয়ে গেলে তার সাফল্যের আশা তিরোহিত হবে। কিন্তু সকলে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন যে ইতিমধ্যে আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। সুতরাং পরিকল্পনা বাদ দিতে হলো। তার ফলে ভয়ঙ্কর অসন্তোষের সঞ্চার হলো। কেউ পরিকল্পনার সামান্য সমালোচনাও করলো না। পরে অবশ্য সকলেই বুঝেছিলেন, বিজ্ঞোচিত কাজই করেছেন বার্নাড। সে সঙ্কটকালের ব্যর্থতা বড়ো মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারতো। রটন মনে করেন অল্পসংখ্যক সৈন্য এবং অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দিল্লী আক্রমণ করা বোকামীরই পরিচয় হতো। তিনি বলেন, নগরের অভ্যন্তরের শত্রুরা যদি এশীয় না হয়ে ইউরোপীয় হতো তাহলে কোনো জেনারেলই সে সময়ে তাদেরকে আক্রমণ করতে সাহস করতো না।

টিলাতে শিবির স্থাপন করে তিন দিনের ভেতর ব্রিটিশ সৈন্যরা যেমন একটি প্রধান আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিলো, অন্যদিকে সেপাইরাও বসে ছিলো না। চালনা করার মতো সামরিক প্রতিভা না থাকলেও তাদের সাহস এবং উদ্দীপনার অভাব ছিলো না। ৯ই জুন, বাদল-কি সরাইয়ের যুদ্ধের পরের দিন তারা হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদে আক্রমণ চালায়, ব্রিটিশের সৌভাগ্যই বলতে হবে, যেদিনই ৫৮০ মাইল অবিরাম মার্চ করে বিখ্যাত ডেলীজ গাইড বাহিনী পেশোয়ারের নিকটস্থ মর্দান থেকে এসে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। পরের দিন সেপাইরা ব্রিটিশ সৈন্যের সম্মুখভাগে আক্রমণ চালালো। কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্য মেটকাফ হাউজ দখল করে তাদের বামদিকের রক্ষণভাগকে নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত করলো। তারপরে উভয় দলের গোলন্দাজদের মধ্যে একদিন গুলি বিনিময় চলে। ১৫ তারিখে সেপাইরা মেটকাফ হাউজ অধিকার করার জন্য আবার আক্রমণ চালায়। কিন্তু তাদের আক্রমণ ব্যর্থ করে দেয়া হলো। দুদিন পর তার আরো বেপরোয়াভাবে আক্রমণ চালাতে শুরু করে। তারা হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদের নিকটবর্তী ঈদগাঁর প্রাকার ঘেরা ময়দানে একটা ব্যাটারী স্থাপন করতে চেষ্টা করে। বিচক্ষণ বার্নাড বুঝতে পারলেন, ব্যাটারী স্থাপনে সেপাইরা সক্ষম হলে পরে তাদের ডানদিকের রক্ষণভাগের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে দাঁড়াবে। যে কোনো উপায়ে বাধা দিতে সংকল্প গ্রহণ করলেন। ইংরেজদের সৌভাগ্য সেপাইদের কোনো উপযুক্ত সেনাপতি ছিলো না। ঈদগাঁতে ব্যাটারী স্থাপন করতে পারলেও কিভাবে কামান দাগাতে হয়, সে সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান ছিলো না।

১৯ তারিখে ব্রিটিশ সৈন্যদের রক্ষণভাগ ভয়ঙ্করভাবে ভীত হয়ে পড়লো। টমের গোলন্দাজ বাহিনীর পরাজয় এক সময় প্রায় অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। ব্রিগেডিয়ার হোপ গ্র্যান্ট আহত হয়ে পড়লেন। একজন নিঃস্বার্থ মুসলিম ঘোড়সওয়ার তার প্রাণরক্ষা করতে অত্যন্ত সাহসের পরিচয় দিয়েছে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে অমীমাংসিতভাবেই সেদিনকার সংগ্রাম শেষ হলো। তারপরে শত্রুরা কোনদিকে আক্রমণ করবে সে সম্বন্ধে সেপাইরা কোনো স্থির ধারণা পোষণ করতে পারছিলো না। ব্রিটিশ সৈন্য যদি অনড়ভাবে টিলা-শ্রেণীতে অবস্থান করতো, তাহলে তাদের পাঞ্জাবের যোগাযোগ সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। সকালবেলা ব্রিটিশ সৈন্য যুদ্ধ করতে এসে দেখে, রাতের অন্ধকারে সেপাইরা সকলেই চলে গেছে। টিলার ওপরের অনেক ইংরেজ অকপটভাবে বিশ্বাস করলেন যে সৃষ্টিকর্তা তাদের পক্ষে। তিনিই রাতের বেলা সেপাইদের নিয়ে গিয়েছেন। ক্লাইভের পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের একশ বছর অতীত হয়ে গেছে। সকলে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতো-এক’শ বছর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানীর রাজত্বের অবসান হবে। সব সময় তারা বেপরোয়া সগ্রাম করলো এবং বিশ্বাস করতে থাকলো ভাগ্য তাদের স্বপক্ষে। মেজর রীড, যার অবস্থান ছিলো হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদের নিকটে, ভীষণ বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন কোনো সেনাবাহিনী এর চাইতে কঠোরভাবে সংগ্রাম করতে পারে না। তারা রাইফেল বাহিনী, গাইড বাহিনী, এমনকি আমার পরিচালনাধীন সৈন্যদের উপর আক্রমণের পর আক্রমণ চালাচ্ছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো, এই বুঝি হেরে গেলাম। নগরের কামানের অগ্নিবৃষ্টি, এবং যে সকল ভারী কামান বের করে নিয়ে এসেছিলো সেগুলোর ভয়ঙ্কর গোলা বর্ষণের সামনে আমি বারবার অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু বিজ্ঞান শেষ পর্যন্ত সংখ্যার ওপর জয়লাভ করলো। মগজের শক্তি পেশীর শক্তির চাইতে অধিক প্রমাণিত হলো। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সেপাই-এই দুই প্রবল বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে লড়তে হচ্ছিলো।

২৪ তারিখে নেভিলি চেম্বারলেন ব্রিটিশ শিবিরে এলেন। প্রথমে তাকে পাঞ্জাবের ভ্রাম্যমাণ বাহিনীর অধিনায়কের পদে নিয়োগ করা হয়েছিলো। কর্ণেল চেষ্টারের মৃত্যুর পর এ্যাডজুট্যান্ট জেনারেলের পদ এতোদিন খালি পড়েছিলো। তাঁকে সে পদে বৃত করে পাঠানো হয়েছে। তার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে টিলা-শ্রেণীর উপরের সেনাবাহিনীর মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার হলো। একটি প্রধান আক্রমণ পরিচালনা করে দিল্লী ছিনিয়ে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে উঠলো। উইলবার ফোর্স গ্রীথিড় এখনো তার পরিকল্পনার কাজে রূপদানের জন্য পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সেই দিনই তাঁর আপন ভাই হার্ভে তার স্ত্রীর কাছে লিখেছিলেন, নেভিলী চেম্বারলেন এসে পড়েছেন, তার ফলে আমরা সকলে আনন্দিত। এবারে জেনারেল উইলবির দুঃসাহসী পরিকল্পনা কাজে রূপায়িত হতে পারে। জেনারেল বানার্ড সব সময়ে এ সম্বন্ধে আশাবাদী, কিন্তু তিনি আরো সমর্থন চাইতেন। জেনারেল চেম্বারলেনের সঙ্গে লেফটেনান্ট আলেকজান্ডার টেইলার নামে একজন তরুণ ইঞ্জিনীয়ার এসেছেন। কর্ণেল বেয়ার্ড স্মীথের সঙ্গে তাঁকেই সেপ্টেম্বরের চূড়ান্ত আক্রমণ পরিচালনার পরিকল্পনা সংশোধনের ভার দেয়া হয়েছে। কর্ণেল বেয়ার্ড স্মীথকেও রুঢ়কি থেকে ডেকে আনা হয়েছে। মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করে ২৯শে জুন তিনি দিল্লীর উদ্দেশ্যে পথ দিলেন। পাঞ্জাব থেকে সৈন্য এসে ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। বর্তমানে ইংরেজ দলের সৈন্য সংখ্যা ছ’শ থেকে ছ’হাজারে উন্নীত হয়েছে। পরিস্থিতি সুবিধাজনক, পরিকল্পনা প্রস্তুত, শিবিরে এখন সাহসী সেনাপতির অভাব নেই। হডসন এখন গোয়েন্দা বিভাগের কর্তা। এক চোখ কাণা সৈয়দ রজব আলী শুধু গুপ্তচর বৃত্তিই করছে না শত্রুদের মধ্যে বিভেদের বীজও রোপণ করে চলেছে। বানার্ড জানতে পেলেন বিদ্রোহীরা তাঁদেরও নির্দিষ্ট তারিখ ৩রা জুলাইয়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের আক্রমণ করা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ইংরেজদের পরিকল্পনার প্রধান সাফল্য নির্ভর করছে, নিরস্ত্র এবং অপ্রস্তুত অবস্থায় শক্রদের আক্রমণ করার ওপর। সেভাবে যদি আক্রমণ না করা যায় তাহলে এক থাবায় নগর ছিনিয়ে নেয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা নেই। তিনি কোনো ব্যর্থতার ঝুঁকি বহন করতে রাজী ছিলেন না।

দিল্লীর বিদ্রোহী সেপাইরাও আঁটঘাট বেঁধে তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ের ১ এবং ২ তারিখে বেরিলীর সেপাইরা এসে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। ২ তারিখে অধিনায়ক বখৃত খান স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সম্রাটকে সহায়তা করার প্রস্তাব দান করলেন। তিনি হচ্ছেন চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গোলন্দাজ বাহিনীর একজন সুবাদার। তিনি প্রথম আফগান যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ১৮৫৭ সালে আর তার শরীরে যৌবনের সে অমিততেজ ছিলো না। এখন ঘোড়ার পিঠে চড়তে রীতিমতো কষ্ট হয়। জীবনলালের মতো তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশের মানুষ। দিল্লীর সম্রাট এবং তাঁর বংশ একই। কিন্তু জীবনলাল তাকে অন্যত্র অযোধ্যার নওয়াব পরিবারের আত্মীয় বলে বর্ণনা করেছেন। সম্রাটের সঙ্গে বখত খানের গোপন আলোচনার পর মীর্জা মোগলকে সরিয়ে তাকে প্রধান সেনাপতির পদ দেয়া হলো এবং একই দিনে মীর্জা মোগলকে সেনাবাহিনীর এ্যাডজুট্যান্ট জেনারেলের পদে রত করা হলো। সবদিক দিয়ে বিচার করলে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, প্রধান সেনাপতি হওয়ার যোগ্য কোনো গুণ বখ্‌ত খানের ছিলো না। তিনি তার অধীনস্থ সেনাবাহিনীকে ছ’মাসের মাইনে আগাম পরিশোধ করেছেন। টাকার জন্য সম্রাটকে চাপ দেবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বখ্‌ত খান বেরিলী থেকে প্রচুর টাকা-পয়সা নিয়ে এসেছিলেন এবং তাকে প্রধান সেনাপতি পদে নিয়োগ করার কারণে সম্রাট কিছুকাল টাকা-পয়সার ভাবনা থেকে নিশ্চিন্ত হতে পারলেন।

অন্যদিকে আবার সম্রাটের উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। শান্তিপ্রিয় মানুষ তিনি, সামরিক প্রবৃত্তিকে শাসনে রাখবার মতো ক্ষমতা তার নেই। সেজন্যই তিনি নগরে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বখৃত খানকে নির্দেশ দান করেছেন। ২৩শে জুনের পরাজয় স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়ীশ্রেণীর মধ্যে আতঙ্কের সঞ্চার করে। সতর্কতা স্বরূপ তারা দোকানপাট বন্ধ করলো এবং ব্যবসাপত্র গুটিয়ে ফেললো। এ অবস্থা কিছুতেই চলতে দেয়া যায় না। তাই ম্রাট জোর করে দোকান-পাট খুলবার নির্দেশ দিলেন। এ নির্দেশ দিয়ে তিনি ভেবেছিলেন, সেপাইরা নগরীর মানুষদের শান্তিতে থাকতে দেবে এবং তাদের যা প্রয়োজন আইনসঙ্গত উপায়ে খরিদ করবে। কিন্তু সেপাইদের তখন শৃঙ্খলা মেনে চলার মতো অবস্থা নয়। ১৪ তারিখে তারা যমুনা দাসের দোকান লুট করলো, কারণ সে নির্ধারিত দামের চাইতে আটার বেশি দাম চেয়েছিলো। ২০ তারিখে সেপাইরা বিল্লী মহল্লাতে লুটতরাজ এবং বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। তাদের হাতে পাহারাগঞ্জ এলাকার অধিবাসীরাও নিষ্ঠুরভাবে লাঞ্ছিত হলো। দু’জন নাগরিক সম্রাটের কাছে এ-মর্মে নালিশ করেছে যে সেপাইরা দাম না দিয়ে জোর করে দোকানের জিনিসপত্র নিয়ে গেছে এবং দরিদ্র মহল্লাবাসীদের ঘরে ঢুকে তাদের বালিশ, বিছানা, ঘটিবাটি সবকিছু জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। বাহাদুর শাহের আর যাই দোষ থাকুক, তিনি সভাবে অমাত্যদের দ্বারা কাজ করাতে চেয়েছিলেন। অশক্ত, বৃদ্ধ এবং দুর্বল হলেও তিনি কখনো কর্তব্য কর্মে ফাঁকি দেননি। পৌনপুনিক নালিশে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ২৭শে জুন তারিখে মীর্জা মোগল এবং মীর্জা খায়ের সুলতানের কাছে লিখলেন। সেপাইরা আসার এবং শহরে ডেরা পাতার একটি দিনও অতীত হয়নি, ইতিমধ্যে পদাতিক সেপাইদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দরখাস্তের স্তূপ জমে গেছে। সম্রাটকে আইন শৃঙখলার রক্ষা করার জন্য যে রাজকুমারদের ওপর সব সময় নির্ভর করতে হতো, তারাও অনেক সময় অন্যের সম্পদ হরণ করার ব্যাপারে সক্রিয় সহযোগিতা করার লোভ সামলাতে পারতেন না। যুগল কিশোর এবং শিও প্রসাদের তারিখবিহীন একটি অভিযোগপত্র থেকে আমরা জানতে পারি, রাষ্ট্রের কর্মচারি এবং শাহজাদারাই তাদের নানাভাবে হয়রানি করে। এতেই লাঞ্ছনার শেষ নয়। সরকারি সেপাই এসে তাদের ঘরবাড়ি লুট করে এবং বেঁধে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখায়। ৪ঠা জুলাই বখত খানের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণের দুদিন পরে আহসান-উল হক নামে এক ব্যক্তি, সম্রাটের নাতি আবু বাকারের বেআইনী কার্যকলাপের কথা উল্লেখ করে সম্রাটের দরবারে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তারপরের দিন সম্রাট প্রথম বাহাদুর শাহের দৌহিত্রী ঈমানী বেগমের মতো একজন মহিলা সম্রাটের কাছে অভিযোগ করে বলেছেন, আগের রাত মীর্জা আবু বাকার সুরামত্ত অবস্থায় কয়েকজন সওয়ারসহ তাঁকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য আসেন এবং রাইফেল আর পিস্তলের আওয়াজ করেন ও মহল্লার কিছু লোককে প্রহার করেন। আবু বাকারকে ধরতে গেলে তিনি তরবারির সাহায়্যে কোতোয়ালকে আহত করেন। তাকে আটক করেন। আরো নানাভাবে অসম্মান করার পর শেষমেষ তাঁর বাড়ি লুঠ করে। খবর শোনার পর সম্রাট ভীষণভাবে কুপিত হয়ে উঠলেন। তার সামরিক পদ কেড়ে নিলেন এবং গ্রেপ্তার করতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু শাহজাদার পক্ষে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া বেশি কিছু অসম্ভব ছিলো না। সম্রাট শাহজাদাদের সম্মান কেড়ে নিলেন এবং প্রতি মহল্লার প্রধান পাহারাদারদের নির্দেশ দিলেন, শাহজাদারাও যদি আইন ভঙ্গ করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে, তাহলে তাঁদের সঙ্গেও অন্যান্য দুষ্কৃতিকারীর মতো আচরণ করতে হবে। সম্রাটের অসন্তুষ্টি যে এ সকল অকর্মণ্য যুবকদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পেরেছিলো তার কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি।

নগরবাসীরা বিদ্রোহীদের হাতে যেমন, তেমনি যে সকল শাহজাদা সেপাইদের নেতৃত্ব দিতেন, তাদের হাতেও তেমনি একইভাবে লাঞ্চিত হতেন। প্রামাঞ্চলের অবস্থাও ভালো নয়। সে কথা আমরা ১৮৫৬ সালের ২৯শে জুন তারিখে লিখিত সৈয়দ আবদুল্লাহর একখানি অভিযোগপত্র থেকে জানতে পারি, তিনি লিখেছেন, গোটা শস্য বছরের হৈমন্তিক ফসল ধ্বংস হয়ে গেছে। তদুপরি কৃষির প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি যেমন লাঙ্গল এবং কুয়ো থেকে জল উঠাবার কাঠের সরঞ্জাম সব সৈন্যরা লুঠ করে নিয়েছে। লুঠতরাজ করে গুর্জরেরা দেশের লোকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে।

শান্তির সময়ে যুদ্ধের সময়ের মতো রাস্তায় বের হতে মানুষ নিরাপত্তাবোধ করতো না। দেশের জনগণ সরকার এবং সরকারি আমলা উভয়ের দ্বারাই লাঞ্ছিত হতে লাগলো। সেপাই নেতৃবৃন্দের এ সকল কাজের সমর্থনে বলা যায় তাদের ইংরেজদের দালালদের বিরুদ্ধে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য এ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছিলো। কিন্তু নগর প্রাচীরের অভ্যন্তরে ইংরেজ সমর্থকদের সংখ্যা কম ছিলো। কেউ সন্দেহের উর্ধ্বে ছিলো না। সম্রাটের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং মন্ত্রী হেকিম আহসান উল্লাহ্ খানকে সন্দেহ করা হলো, তাঁকে প্রাসাদের অভ্যন্তরের একটি কক্ষে আটক রাখা হলো। সম্মানী এবং বিত্তবান অনেক ভদ্রলোককে অকারণে সন্দেহ করে হয়রানি করতে লাগলো। পাতিয়ালার মহারাজা হচ্ছেন ইংরেজদের মিত্র, তাঁর সেনাবাহিনী ইংরেজদের যোগাযোগ পথে পাহারা দিচ্ছে। সে সময়ে অজিত সিং নামে পাতিয়ালার মহারাজের এক বৈমাত্রেয় ভাই দিল্লীতে অবস্থান করছিলেন। ১০ই জুন তারিখে কতিপয় সেপাই তাঁকে সম্রাটের কাছে বন্দী করে নিয়ে আসে। আহসান উল্লাহ খান যখন সম্রাটকে বোঝালেন অজিত সিং আর তার ভাইয়ের মধ্যে সদ্ভাব নেই, তখন তাঁকে মুক্তি দিলেন। কুলী খান নামে একজন গোলন্দাজ সৈন্য সম্রাটের পক্ষের বিশিষ্ট লোক বলে পরিচিতি লাভ করেছিলেন, কিন্তু ২৩শে জুন তারিখে সারাদিন যুদ্ধ করে ফেরার সময় তার গোলার আঘাতে তিনজন সেপাই আহত হলো। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ইংরেজের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছে বলে ঘোষণা করে গ্রেফতার করা হলো। ইংরেজদের যদি একবারও পরাজিত করতে পারতো তাহলে পরিস্থিতি একটু সন্তোষজনক রূপ পরিগ্রহ করতো। ভীতি এবং সন্দেহের কারণেই সবদিকে বিশ্বাসঘাতকতা আবিষ্কার করছিলো। সেপাইরা নিরাপত্তাবোধ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলতে লাগলো।

যদিও ব্রিটিশ সৈন্যদের নৈতিকতা অপেক্ষাকৃত উন্নত, তবুও সেখানকার পরিস্থিতিও ভুল বোঝাবুঝি থেকে মুক্ত নয়। ভারী কামান চালাবার মাল-মশলা সুপ্রচুর নয়। শক্রর অবিস্ফোরিত কামানের গোলাগুলি সংগ্রহ করে আবার শত্রুর প্রতি ছোঁড়া হতো। রটনের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি অল্পসংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য এবং সেপাইদের সংখ্যার স্ফীতির ফলে প্রথম তিন সপ্তাহে যুদ্ধের ভাবী ফলাফল সম্পর্কে কোনো অনুমান করা সম্ভবপর হয়নি। যখন তারা শুনলো স্যার হাফ হুইলার একদল শক্তিশালী সৈন্যসহ পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছেন, তখন তাদের মনে সাহস সঞ্চার হলো। আবার নানা গুজবও কানে আসতে লাগলো। ভারতীয় সেপাইদের আনুগত্যের ওপর কিছুতেই আস্থা রাখতে পারছিলো না। অথচ তারাই জীবন এবং শরীরকে তাদের বিজয়ের খাতিরে নিয়োগ করেছে। শত্রুদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন সংবাদ থেকে নিশ্চিত ধরে নিলো যে তাদের শিবিরের মধ্যেও বিশ্বাসঘাতক রয়েছে। তিনজন পুরবীয়াকে ফাঁসিকাষ্ঠে লটকাতে হলো এবং গোটা কোম্পানী ভেঙে দিতে হলো। গোটা মাস ধরে বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে সেপাইদের বিদ্রোহের সংবাদ আসতে থাকলো। তদুপরি, প্রধান সেনাপতির নেতৃত্বের ওপর তাদের কোনো ভরসা ছিলো না। কীথ ইয়ং প্রধান সেনাপতি সম্বন্ধে লিখেছেন, “যদিও জেনারেল বার্নাড চমৎকার মানুষ, দয়ালু এবং অত্যন্ত সাহসী তবু এ বুড়ো বয়সে তিনি সেনাপতির চাইতে রোমের পোপ হওয়ারই অধিক যোগ্য। আমার মতে, জেনারেল রীডও এমন কিছু ভালো না, তবে তিনি বিজ্ঞোচিত পদ্ধতিতে কোনো সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেন । জেনারেল বার্নাড কড়াকড়িভাবে দায়িত্ব পালন করতেন এবং একটুকুও চ্যুতি প্রদর্শন করেনি। ভারতের জল-হাওয়ার সঙ্গে অপরিচিত বুড়ো মানুষটি সর্বক্ষণই শিবিরে কাটাতেন, রাতে একবারও ঘুমোতেন না। অবশেষে অতিরিক্ত শারীরিক চাপ এবং মানসিক দুর্ভাবনায় ৫ই জুলাই তারিখে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। দিল্লীর দরবারে খবর গেলো ইংরেজ সেনাপতি আত্মহত্যা করেছেন।”

জেনারেল রীড স্যার হেনরী বানাডের স্থলে দিল্লী সৈন্যদের অধিনায়ককের পদ অধিকার করলেন। তিনি ছিলেন বলতে গেলে এক রকম অকর্মণ্য। যুদ্ধ করার চাইতে বিছানায় শুয়ে থাকারই অধিক উপযুক্ত। আরো কিছুদিন না গেলে আক্রমণ করে নগর অধিকার করার কোনো কথাই উঠতে পারে না। তাছাড়াও সৈন্যরা রসদের অভাবে কষ্ট পেতে লাগলো। ৮ই জুলাই তারিখে লবণাক্ত প্রতি পাউণ্ড শূয়রের মাংসের দাম আট টাকা এবং অতি প্রয়োজনীয় মোমবাতি প্রতি পাউণ্ডের দাম ছিলো তিন টাকা। অবশ্য অন্যান্য জিনিষপত্রের দাম তুলনামূলকভাবে সস্তাই ছিলো। ৯ তারিখে একদল বিদ্রোহী অশ্বারোহী সৈন্য সাহস করে একটি কামান পাহারা অতিক্রম করে আক্রমণকারীদের পর্যদস্ত করে সেপাইদের কামান ঘাঁটিতে চলে গেলো। সবজীমণ্ডিতে দু’দলের মধ্যে প্রবল সংঘর্ষ বাঁধে। উভয় দলের ক্ষয়ক্ষতি বিস্তর হয়েছিলো। ব্রিটিশ পক্ষে নিহত এবং আহতদের সংখ্যা ছিল ২২৩ আর সেপাইদের ১৫০০। এই যুদ্ধেই লেফটেনান্ট হিলস্ এবং মেজর টমস্ ভিক্টোরিয়া ক্রস লাভ করেছিলেন।

শিবিরের মালপত্রবাহক নিরীহ লোকেরা ইংরেজ সৈন্যদের রোষানল থেকে রক্ষা পায়নি। তারা ভালোভাবে তাদের প্রভুদের সেবা করতো। অনেক সময় মনিবদের খাবার খাওয়াতে গিয়ে তাদের জীবন-মরণের ঝুঁকি গ্রহণ করতে হতো। তারা অবিস্ফোরিত গোলাগুলি সংগ্রহ করে শুণ্য ভাণ্ডার পূরণ করতো। ব্রিটিশ সৈন্য তাদের ছাড়া এক কদমও চলতে পারতো না।

১৪ তারিখে আরেকটা খণ্ডযুদ্ধ হয়ে গেলো। সেপাইরা হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদ এবং সবজীমণ্ডির ঘাঁটি আক্রমণ করলো। নগরের প্রাচীর থেকে সারাদিন প্রবলভাবে গোলাবৃষ্টি করলো। সন্ধ্যার সময় ব্রিগেডিয়ার চেম্বারলেন কিছু সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তাদের তাড়িয়ে দিতে গেলে তিনি ঘাড়ে চোট পেয়ে আহত হয়ে পড়েন। দিল্লীর পতন পর্যন্ত তিনি কোনো আক্রমণ কিংবা প্রতি-আক্রমণে অংশ নিতে পারেননি।

অতি অল্প সময়ের মধ্যে পরপর তিনজন সেনাপতি হারানো-যে কোনো ভারতীয় সেনাবাহিনী সহজে তার ক্ষতিপূরণ করতে পারতো না। কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্যরা আঘাত সামলে উঠলো না শুধু, বিপদের সময়ে বলতে গেলে প্রায় বিশৃঙ্খল সেনাবাহিনীতে শৃখলাও ফিরিয়ে আনলো। বর্তমান প্রধান সেনাপতি আর্কডেল উইলসন শিবিরের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ অফিসার ছিলেন না। ১০ তারিখে রাতে মীরাটের বিদ্রোহের সময়েও তিনি কোনো সাহস কিংবা বীরত্বের পরিচয় দিতে পারেননি। কিন্তু তিনি ছিলেন ধীরস্থির প্রকৃতির মানুষ। গাজীউদ্দিন নগর এবং হিন্দালে সেপাইদের পরাজিত করে তিনি ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীতে সুনাম অর্জন করেন। ক্ষমতা বুঝে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেনাশিবিরের দৈনন্দিন কর্মপদ্ধতির প্রতি তিনি মনোযোগী হয়ে উঠলেন। কীথ ইয়ং ২২শে জুলাই তারিখে লিখেছেন, “ব্রিগেডিয়ার উইলসন প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, এখন শিবিরের দৈনন্দিন কাজ আগের তুলনায় দ্রুতগতিতে এবং মসৃণভাবে চলছে। তিনি খুবই দ্র, ধীরস্থির। সব কিছু নিজেই দেখাশোনা করেন এবং তাঁর নির্দেশ পরিষ্কার সুস্পস্ট। আমরা সকলে নিশ্চিন্ত অনুভব করছি যা আমার পূর্ববর্তী সেনাপতির কাছ থেকে পাইনি। তিনি অতি সাবধানী, কিন্তু তাও আবার দক্ষিণপন্থী প্রমাদ। তাঁর সাহসের অভাব সে সময়ে কোনো ক্ষতির কারণ হয়নি, কারণ বিদ্রোহীদের রাজধানী আক্রমণ করার কোনো সম্ভাবনা ছিলো না। হার্ভে গ্রীথিড বিলম্বের জন্য তো খুশি হয়েছেনই, বরঞ্চ প্রাথমিক আক্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করলে আরো বুদ্ধিমানের কাজ করা হতো বলে মনে করেন। ২৯ শে জুলাই তারিখে তিনি লিখেছেন, স্রোতের গতি এখন ফিরতে শুরু করেছে। জোয়ারের ঢেউ আমাদের প্রতিরক্ষার শিলাদৃঢ় প্রাচীরে দুর্বলভাবে আঘাত করেছে। সমস্ত অসুবিধা অপসারিত করার জন্য এ সেনাবহিনী যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা আমি মনে করিনে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেবে। সেনাবাহিনী হয়তো আরো সাহসিকতা এবং বীরত্বের পরিচয় দিতে পারতো, কিন্তু সামান্য রকম ভুলচুকের জন্য মারাত্মক ফলও করতে পারতো। এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দেরী করলে সাম্রাজ্যের কোনো ক্ষতি হবে না। যে সময়ে প্রচণ্ড হত্যাকাণ্ড চলেছিলো, লুটপাট হয়েছিলো এবং দিল্লী দখল করে নিয়েছিলো, আমি মনে করি সে সকল দিনের উল্লেখ করে লাভ নেই, কারণ আমরা আসার আগেও সেপাইরা দিল্লী অধিকার করে নিয়েছিলো। পূর্বদিক থেকে দুঃসংবাদ আসছে। কানপুরে হুইলারের পরিণতির কথাও তাদের অজানা নয়। তবে আমার কথা, নগরের অভ্যন্তরের অবস্থাও ভালো নয়। খবর আসছে, সেপাইরা মাইনে তলব করছে, না পেয়ে চলে যাচ্ছে দলে দলে, অপমানিত লাঞ্ছিত ব্যাংক মালিক, দোকানদারেরা অধীর আগ্রহে ইংরেজদের প্রত্যাগমনের প্রতীক্ষা করছে। সেপাইদের নেতৃবৃন্দ এবং সম্রাটের পরামর্শদাতাদের মধ্যে মতান্তর চলছে। অস্ত্রশস্ত্রে ঘাটতি এবং সর্বোপরি ঈদের কোরবানী নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিবাদের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

কিন্তু সংবাদ সবগুলো সত্য নয়। বেনিয়ারা যদিও ব্রিটিশ শিবিরে বন্দুকের ঝাঁকুনি দেয়ার ক্যাপ বিক্রয় করছে তথাপি নগরের অভ্যন্তরে গোলাগুলির কোনো অভাব দেখা দেয়নি। বারুদের অভাব পড়েছে এ কথা সত্যি। ১৮ই জুলাই তারিখে অস্ত্রাগারের দারোগা রজব আলী জানাচ্ছেন যে বারুদের অভাব পড়েছে। ২৪শে মে জুলাই তারিখে মুহম্মদ বখত খানও সম্রাটের কাছে একই ধরনের তথ্য পেশ করেছেন। নগরের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত পরিমাণে সালফার পাওয়া যায় না এবং সেপাইরা যে বারুদ তৈরি করে, তা মানের দিক দিয়ে ব্রিটিশদের তৈরি বারুদের মতো উৎকৃষ্ট নয়। জুলাই মাসের প্রথম দিকে সম্রাট প্রধান সেনাপতিকে কোষাগারিক এবং বণিকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাজকোষে আর কোনো টাকা ছিলো না। ঋণ এবং চাদা তুলে আশু প্রয়োজন মেটাবার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিলো। সত্যি সত্যি সম্রাট বৃন্দাবন নামক এক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা ধার করেছিলেন। রেওয়ারীর রাও তুলারামকে তার এলাকার রাজস্ব আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং অন্যান্য এলাকার রাজস্ব আদায়কারীদের প্রতিও একই নির্দেশ জারী করা হয়েছিলো। জুলাই মাসে সম্রাটের খুব বেশি টাকা প্রয়োজন পড়েছিলো বলে মনে হয় না, কারণ তিনি চাঁদার উপর জোর না দিয়ে ঋণ চেয়েছিলেন। রামজী মল নামে একজন ব্যাংক মালিকের কাছে তিনি লিখেছিলেন, আমি আপনার কাছে কর হিসেবে টাকা চাইনি, ঋণ দিতে বলেছিলাম। দেখুন আমার বন্ধু জ্যোতিপ্রসাদ ইংরেজদেরকে ৩০ হাজার টাকা অগ্রিম ধার দিয়েছেন, কি অজুহাতে আপনি টাকা দিতে আমাকে অস্বীকার করেন?

এখনো চাঁদা দাবি করা হয়নি। কিন্তু সেপাইরা আইন হাতে তুলে নিয়েছে। তাদের হাতে নাগরিকদের ভোগান্তির অন্ত নেই। আবার যারা ইংরেজের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ হতো, তাদেরকে কড়া নজরে রাখাও তাদের কর্তব্য ছিলো। ৭ই জুলাই তারিখে কর্ণেল বেচার কীথ ইয়ং-এর কাছে বল্লভগড়ের রাজা নাহার সিংহের একখানি চিঠি দিলেন। এ পর্যন্ত রাজা রসদপত্র এবং লোকজন দিয়ে দিল্লীর সম্রাটের সহায়তা করে আসছেন। এখন তিনি ইংরেজদেরকেই সাহায্য করবেন বলে নিশ্চয়তা দান করেছেন এবং শিবিরে আসতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। একই অফিসার মাসের শেষ তারিখে ঝুঝঝুরের নওয়াবেরও একখানা পত্র এনে হাজির করলেন। একইভাবে নওয়াবও ইংরেজ শিবিরে এসে সালাম জানাবার বাসনা প্রকাশ করেছেন। প্রধান সেনাপতি বখৃত খান সম্রাটের কাছে অভিযোগ করলেন যে কতেক দুষ্ট লোক রটাচ্ছে। তিনি ইংরেজদের সঙ্গে গোপন চুক্তি করেছেন। রাও তুলারাম দু’দিকেই হাত রেখেছেন। সম্রাটকে নজর এবং মৌখিক সমর্থন জানাচ্ছেন, আবার অন্যদিকে ইংরেজদের সর্বপ্রকারে সাহায্য করছেন। যে সকল সামন্ত সম্রাটকে সমর্থন জানিয়েছিলেন প্রকাশ্যে, তারাই আবার সেপাইদের কোনো উল্লেখ্য পরাজয় বরণ করার আগে, গোপনে ইংরেজদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। এ সামন্তদের বিশ্বাসঘাতকতা বেশির ভাগই অনুদঘাটিত ছিলো।

কোরবানীর ঈদ এগিয়ে আসছে। হডসন একরকম নিশ্চিত আশা করতে লাগলেন যে জামে মসজিদে গরু কোরবানী নিয়ে ধর্মান্ধ মুসলমান এবং হিন্দুদের মধ্যে একটা বিরোধ বাধবে। তাঁর চরেরা খবর দিয়েছে বিরোধ আরম্ভ হয়ে গেছে। গোড়া মুসলমানেরা তাদের ধর্মীয় অনুশাসন পালন করা থেকে বিরত থাকবে না। তাতে করে হিন্দু মুসলমানে যে একটা প্রচণ্ড বিবাদ বাধবে সে সম্বন্ধে ইংরেজরা এক রকম নিশ্চিত ছিলো। দিল্লীর অধিক সংখ্যক মোগল নিজেদেরকে জেহাদী বা ধর্মযোদ্ধা বলে ঘোষণা করলো। টঙ্ক থেকে আগত সেপাইদের সমবায়ে সৈনিক সংখ্যা অনেকগুণে বেড়ে গেলো। জেহাদীরা সামরিক শিক্ষাপ্রাপ্ত সৈনিক ছিলো না। তারা মৃত্যুকে ভয় করতে না বটে, কিন্তু উন্নত ধরনের কোনো যুদ্ধের কৌশলও তাদের জানা ছিলো না। মাথার উপর দিয়ে তলোয়ার ঘোরানো ছাড়া আর কোনো কৌশল তারা জানতো না। তাদের মধ্যে একজন মহিলাও ছিলেন, যিনি কামান দেগে দু’জন ইংরেজ সৈন্যকে ধরাশায়ী করেছেন। বিরোধী সৈন্যের গুলির আঘাতে আহত হওয়ার পর তিনি বন্দিনী হন। এই জেহাদী সেপাইয়েরা সম্রাট এবং তাঁর মন্ত্রীদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের যুদ্ধ না করতেও বলা যায় না, আবার তারা ধর্মযুদ্ধ বা জেহাদ ঘোষণা করেছে তাও উৎসাহিত করা যায় না। লখনৌতে ওয়ালী নিজে জেহাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, কিন্তু দিল্লীতে তা হতে পারে না, কারণ সেপাইদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা প্রচুর এবং প্রভাবশালী মুসলমানেরা হিন্দুদের আলাদা করে রাখতে রাজী ছিলেন না। একই কারণে বেরিলীতে খান বাহাদুর খান গরু জবাই নিষিদ্ধ করেছেন যাতে করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে হিন্দুরাও সহযোগিতা করতে পারে। একথা রক্ষা করার জন্য সম্রাট কি উপায় অবলম্বন করেন সে বিষয়ে সকলে অবাক হয়ে ভাবছিলেন। এটা জানা কথা যে এ সকল বিষয়ে কোনো বিকল্প সিদ্ধান্ত জনসাধারণের সমর্থন লাভ করতে পারে না। হেকিম আহসান উল্লাহ দীর্ঘদিনের প্রথা বন্ধ করতে ভয় পাচ্ছিলেন এবং মৌলভীদের তিনি সবচেয়ে বেশি ভয় করেছিলেন। কিন্তু সম্রাট অপূর্ব সাহসের পরিচয় দিলেন। প্রধান সেনাপতি এবং অপরাপর সামরিক কর্মচারিদের তিনি জানিয়ে দিলেন, ঈদপর্বে নগরের মধ্যে কোনো গরু জবাই হতে পারবে না। যদি কেউ গরু কোরবানী করে তাহলে তাকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেয়া হবে এবং কোনো মুসলমান তিনি যেই হোন না কেন গরু জবাই করতে সাহায্য করলে, তাকেও হত্যা করা হবে। ঈদগার ময়দানে একটা ভেড়া কোরবানী করে সম্রাট নিজেই প্রজাদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। সুতরাং আগস্ট মাসের পহেলা তারিখে কোরবানীর ঈদের দিনে কোনো সাম্প্রদায়িক বিবাদ বাধলো না।

সকালে নামাজ পড়া হলো। দ্বিপ্রহর থেকে যুদ্ধ শুরু হলো। সারারাত যুদ্ধ চললো এবং পরের দিন দুপুরেই বন্ধ হলো। কামান থেকে অবিরাম গোলাবর্ষণ অগ্রাহ্য করে সেপাইরা ব্রিটিশ সৈন্যের রক্ষণভাগে বারবার প্রচণ্ডভাবে হামলা চালাতে থাকে। কিন্তু গুলীর আঘাতের জন্য বারবার তাদের ফিরে আসতে হচ্ছিলো। সেপাইদের সাহসের প্রশংসা করতে হয়, কিন্তু তার পেছনে বিজ্ঞানের শক্তি না থাকায় কিছুই করতে পারলো না। টিলার ওপর ছাউনি পাতা সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীর কাছেও তারা ঘেঁষতে পারলো না। তারা দু’মাস ধরে শত্রুদের অসুবিধাজনক স্থান থেকে বিতাড়িত করার জন্য চেষ্টা করে আসছে। সবসময় ডান দিকেই আক্রমণ করেছে। সম্মুখ ভাগে এবং মাঝে মাঝে দু’য়েকবার হামলা মাত্র করা করেছে। সামনে, পিছে, ডান, বাম চারদিক থেকে ঘিরে কখনো শত্রুর ওপর আক্রমণ করেনি। নতুন কোনো সেপাইদল দিল্লীতে এসে পৌঁছালেই তাদের ব্যর্থতা এবং বুদ্ধিহীনতার পরিচয় দেয়ার জন্য টিলার ওপর আক্রমণ চালাতো। আক্রমণ পরিচালনা করার জন্য কোনো সুচিন্তিত পরিকল্পনা ছিলো না এবং অভিযান সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য কোনো সামরিক প্রতিভার সত্যিই অভাব ছিলো। সংখ্যার দিক দিয়ে বেশি হওয়া অনেক সময় শক্তিবৃদ্ধির কারণ না হয়ে অসুবিধার কারণ হয়েই দাঁড়ায়। শিক্ষিত সৈন্যদের সঙ্গে উচ্ছল সৈন্যদের মেশামেশি ঘটলে সাফল্যের বদলে ব্যর্থতাকে বরণ করতে হয়। বারবার পরাজয়ের ফলে তাদের সাহস কমে গেছে এবং সেপাইরা উচ্চতর মহলের বিশ্বাসঘাতকতা আবিষ্কার করার কাজে নিজেদের নিয়োগ করেছে। আগস্ট মাসের ৭ তারিখে অস্ত্রাগার বিস্ফোরণ হওয়ার পর তারা হেকিম আহসান উল্লাহ্কে বিশ্বাসঘাতক বলে সন্দেহ করতে লাগলো।

প্রথম থেকেই হেকিম আহসান উল্লাহর কোনো সহানুভূতি ছিলো না সেপাইদের প্রতি এবং সেপাইরাও এ কথা জানতো। কিভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে কেউ জানে না। হতে পারে একটা দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা, অথবা ইংরেজদের কোনো লোক ইচ্ছাকৃতভাবে এ নাশকতামূলক কাজ করেছে। কিন্তু হেকিমের অস্ত্রাগার পরিদর্শন করার পরেই বিস্ফোরণ ঘটে। ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে তাকে সন্দেহ করা হলো। হেকিমের বাড়ি আক্রমণ করে যখন তালাস করা হলো, সন্ধিসূচক একখানি চিঠিও পাওয়া গেলো। কুপার বলেন, “হেকিমকে সন্ধিপ্রার্থী হিসেবে প্রমাণ করাবার জন্যই রজব আলী চক্রান্ত করে পত্রখানা তার বাড়িতে রেখেছিলো।” হেকিমকে যে তারপরে কয়েদ করা হবে সে তো একদম জানা কথাই। অবশ্য জীবনলাল বলেছেন সম্রাট বিশ্বস্ত বন্ধুকে প্রাসাদের কোনো গোপন কক্ষে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সম্রাটকে আবার হেকিমকে সেপাইদের হাতে সমর্পণ করতে হলো। হেকিমের পরিবার-পরিজনেরা আগে থাকতেই পলায়ন করেছিলো।

সম্রাটের এ রকম বিশ্বস্ত পরামর্শদাতার বিশ্বাসহানির ফলে সেপাইদের নৈতিক বল হ্রাস পেয়েছিলো এবং দরবারের প্রতি শ্রদ্ধাও তারা হারিয়ে ফেললো। সেপাইরা জানতো যে এ ব্যাপারে সম্রাট ও হেকিমের মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। তিনি জুন মাসের পয়লা থেকেই ইংরেজদের সঙ্গে পত্রালাপ শুরু করেছেন। কিন্তু সম্রাট একাকীই তার সৈন্যদলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং ধর্মহানির অভিযোগে অভিযুক্ত হলেন। সেপাইদের বিদ্রোহ তার বহুদিনের লালিত পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দিয়েছে। তিনি তাঁর পুত্র জওয়ান বখৃতকে সিংহাসনে বসাবার চেষ্টা করে আসছেন। দু’জন প্রতিদ্বন্দির স্বাভাবিক অথবা অস্বাভাবিক মৃত্যু তার সংকল্পের পথ অনেকটা পরিষ্কার করে দিয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে রাজী করাতে পারলেই জওয়ান বখৃতকে সিংহাসনে বসিয়ে সম্রাট উপাধিতে ভূষিত করা অসম্ভব হবে না। বিদ্রোহের কারণে মীর্জা মোগল এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ শাহজাদারাই পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছেন। ইংরেজরা পরাজিত হলে সেনাবাহিনী সম্রাট হিসাবে মীর্জা মোগলকেই পছন্দ করবে, জওয়ান বখৃতকে নয়। মীর্জা ইলাহী বক্স ইংরেজের স্বপক্ষে প্রাণপণে কাজ করছিলেন। হতে পারে হেকিম আহসান উল্লাহ্ এ সময় তাঁকে সহায়তা করে থাকবেন। এ যোগাযোগের ব্যাপারে মৌলবি রজব আলীর সক্রিয় ভূমিকাই সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য। পরিকল্পনা ছিলো অতি সরল। ইংরেজরা সম্রাটকে আগের মতো বৃত্তি দিতে এবং প্রাসাদে অবস্থান করতে দিতে রাজী হয়েছেন। বিনিময়ে সম্রাটের লোকেরা নৌকার সেতু উড়িয়ে দেবে, যাতে করে অশ্বারোহী বাহিনীকে পরাজিত করা যায়, তারপর পদাতিক বাহিনীকে পরাজিত করে ইংরেজরা নগরীতে প্রবেশ করবে। বর্তমানে ব্রিটিশের সামরিক অবস্থা অনেক সুবিধাজনক এবং তারা দুর্বল মুহূর্তে এ সকল যোগাযোগ করছিলো। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বিজয়লাভ সম্বন্ধে নিশ্চিত হলে সে সকল প্রস্তাব কানেও নিলো না।

ঠিক কখন সম্রাট এবং ইংরেজদের মধ্যে আবার নতুন করে যোগাযোগ শুরু হলো সে সম্বন্ধে নিশ্চিত করে বলা যায় না। ৬ই আগস্ট তারিখের একখানা পত্রে গ্রীথিড স্যার উইলিয়াম মুইরকে জানাচ্ছে, মেটকাফ ডাকযোগে সম্রাটের একখানা চিঠি পেয়েছেন এবং তাতে সম্রাট তাঁর শারীরিক কুশল জানতে চেয়েছেন। এতে কোনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ২০শে আগস্ট গভর্ণর জেনারেলের কাছে সম্রাটের প্রস্তাব এসেছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লো। এডমনস্টোন কলভিনকে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে এ তথ্য ওয়াকেবহাল করেছিলেন। সম্রাট দিল্লীর সেনাবাহিনীর প্রধানের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন যে দিল্লী এবং মীরাটে বিদ্রোহের আগে সম্রাট যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন, তা মেনে নিলে হয়তো নতুন করে আপোষ করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু গভর্ণর জেনারেল মনে করেন সম্রাটকে আগের সুযোগ-সুবিধা দান করার ব্যাপারে বর্তমানে এ সরকার কিছুতেই সমর্থন প্রদান করতে পারে না। ২৭শে আগস্ট মুইর হ্যাভলকের কাছে লিখেছেন, মিঃ গ্রীথিডের কাছ থেকে দু’খানা কি তিনখানা চিঠি পেয়েছেন। তাঁরা সাহায্য করার প্রস্তাব করেছেন, কিন্তু তাঁদের কোনো জবাব দেয়া হয়নি। গ্রীথিডের কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে শাহজাদারা ব্রিগেডিয়ার উইলজনের সাথে পত্রালাপ শুরু করলেন। সে সম্বন্ধে পরে মুইর হ্যাভলককে বলেছেন, “কয়েকজন সম্রাট পুত্র সহায়তা করার যে প্রস্তাব করেছেন মিঃ গ্রীথিড তা সরাসরি বাতিল করে দিয়েছেন। অন্যভাবে সম্রাট পুত্রেরা আবার জেনারেল উইলসনের কাছেও একই প্রস্তাব করেছেন। সেতু ধ্বংস করে অশ্বারোহী বাহিনীর সাহায্যে পদাতিক বাহিনীকে পরাজিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, কিন্তু তার বিনিময়ে সম্রাট পরিবারের পূর্ব সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। জেনারেল উইলসন প্রাসাদের সঙ্গে কোনো রকম পত্রালাপ করতে সরাসরিই অস্বীকার করলেন। সুতরাং অনুমান করতে কষ্ট হয় না, বিশ্বাসী অনুচরগণের মাধ্যমেই কথাবার্তা হতো। চিঠি লেখার পথ তাঁরা এড়িয়ে চলতেন। ২১শে আগস্ট সম্রাটের প্রধানা মহিষী বেগম জিনাতমহলের পক্ষ থেকে একজন দূতকে পাঠানো হলো। তিনি প্রস্তাব করেছেন সম্রাটের সঙ্গে ইংরেজদের আপোষ মীমাংসার জন্য তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব কাজে খাটাতে পারেন। গ্রীথিড বলেছেন, “আমরা ব্যক্তিগতভাবে তার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করলাম, কারণ মহিলা এবং শিশুদের সঙ্গে আমাদের কোনো বিবাদ নেই। কিন্তু জানিয়ে দিলাম সম্রাট প্রাসাদের কারো সঙ্গে আমরা কোন যোগাযোগ রাখতে ইচ্ছুক নই। মহিষীকে সন্দেহ করা হলো, তার ষড়যন্ত্রের সবটা জানতে পারলে তাকে ছেড়ে দেবে না। সেপাইদের প্রতি সম্রাটের কোনো ভালো মনোভাব যে ছিলো না, সে তো এক রকম জানা কথাই। ব্রিটিশ সৈন্যদের বারবার চেষ্টা করেও টিলাশ্রেণী থেকে তাড়িয়ে দিতে না পারায় তাদের পারঙ্গমতার প্রতি সম্রাটের কোনো বিশ্বাসই রইলো

এবং প্রকাশ্যেই অভিযোগ করলেন, পাঁচ’শ বছর ধরে যে সাম্রাজ্য চলে আসছে, তারা সে সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছে। হেকিম আহসান উল্লাহকে কয়েদ করা হলে তিনি আত্মহত্যার ভয় দেখালেন। সামরিক অত্যাচার থেকে নগরের লোকদের রক্ষা করতে না পারার জন্য তিনি প্রকাশ্যে দুঃখ করতেন। অনেক সময় তিনি কাবের কথা উল্লেখ করতেন এবং প্রাসাদ ও পদবী চিরতরে ছেড়ে দিয়ে মক্কা শরীফ গিয়ে অবস্থান করার কথাও উল্লেখ করতেন। শাহজাদারা তাকে মানতেন না। সেপাইরা তাকে অপমান করতো। মাঝে মাঝে তিনি কবিতা রচনা করে শান্তি খুঁজে পেতে চেষ্টা করতেন।

একবার তিনি লিখলেন–

‘কাফন বস্ত্রে শরীর ঢেকে
শেষ দিনগুলো আমি কোনো বাগানে একাকীই কাটিয়ে দেবো।’

কিন্তু ভাগ্য তার জন্য কি রেখেছে তা জানতেন না। মহিষী এবং শাহজাদারা আশা করছেন যে তাদের আগের অবস্থায় ফিরে গিয়ে নিরাপদে জীবনযাপন করার এখনো সুযোগ আছে।

পত্রালাপ এবং প্রস্তাব বিনিময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যাপার। সমস্ত ব্রিটিশ সৈন্যের বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার আরো কারণ ছিলো। ব্যবসায়ীরা এখন আবিষ্কার করলো যে টিলা হচ্ছে ব্যবসায়ের জন্য একটি খাসা জায়গা। সেপাইরা যে সকল জিনিসপত্রের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন থেকে অনুভব করে আসছিলো, ব্যবসায়ীরা সে সকল জিনিসপত্র নিয়ে দোকান খুলে বসলো। ১৮ তারিখে কীথ ইয়ং তাঁর স্ত্রীর কাছে লিখেছেন, “তোমাকে আমি বলেছি কি পিক এণ্ড এ্যালেন এখানে অনেক প্রতিনিধি পাঠিয়ে অনেকগুলো দোকান খুলে দিয়েছেন। শিবিরে দু’জন পার্সি ব্যবসায়ীও আছেন। জাহাঙ্গীর এবং কাওয়াসজী নামে এ দু’জন ব্যবসায়ীর বিক্রয়ের প্রচুর জিনিসপত্র মজুত রয়েছে। বিশেষ করে, বীয়ার, ব্রাণ্ডি এবং সোডা ওয়াটার। প্রথমে প্রতি ডজন বীয়ারের বোতলের জন্য ২৩ টাকা দাবি করছিলো, কিন্তু পরে তাঁরা সেরা ইংলিশ পানীয় ৫ টাকা ডজনে বিক্রয় করতে রাজী হয়েছে। সদর দফতরের মেস একশো ডজন ঐ দামে খরিদ করেছে।” লাভের আশায় পার্সিরা দোকান পেতেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের আগমনের ফলে ইংরেজরা নিশ্চিত হলো যে রাস্তাঘাটে এখন সেপাইদের উপদ্রব নেই।

বিদ্রোহী সেপাইরা আকাঙ্খিত বিশ্বাসঘাতকতার কথা কিছুই জানে না, তাই এখনো সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আশা পোষণ করে। আগস্ট মাসেও টিলার ওপরে শিবিরের ইংরেজদের কোনো অসুবিধা পোহাতে হলো না। বরং তার নতুন আশা এবং উদ্দীপনায় অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেছে। ৭ তারিখে জন নিকলসন তাঁর বাহিনীর আগে অশ্বারোহণে শিবিরে এসে পৌঁছেছেন। মানসিক দিক দিয়ে নিকলসন ছিলেন বীরত্বের গৌরব-গাঁথার যুগের মানুষ। দুর্দান্তভাবে সাহসী এবং যমের মতো নির্মম। একখানা মাত্র তলোয়ার হাতে তিনি সবচেয়ে হিংস্র বাঘের মুখোমুখী দাঁড়াতে পারতেন। তিনি ক্লান্তি কাকে বলে জানতেন না। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে সুদীর্ঘ পথ অশ্বারোহণেও তিনি এতোটুকু শ্রান্ত হয়ে পড়েননি। নানা অসুবিধার মধ্যেও যুদ্ধ করবার জন্য তিনি প্রস্তুত। বিদ্রোহীদের প্রতি তার মনে কোনো দয়া কিংবা অনুকম্পার স্থান ছিলো না। আনন্দিত মনে সেপাইদের হত্যা, তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালাননা এবং স্ত্রী ও শিশুকে নির্মূল করার অনুমতি দিতে পারতেন তিনি। তাঁর সমসাময়িক অন্যান্যদের মতো তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান খ্রীস্টান। সীমান্তে তাঁকে সবাই যেভাবে ভয় করে এবং তিনি যে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন, তাতে করে দেবতা হয়ে উঠেছেন। ভারত এবং ভারতের অধিবাসীদেরকে তিনি পছন্দ করতেন না। চেম্বারলেনের স্থলাভিষিক্ত হতে যখন তাঁকে আহ্বান করা হলো তাঁর বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ। যদিও তখন তিনি সেনাবাহিনীর মাত্র একজন ক্যাপ্টেন, তাঁকে ব্রিগেডিয়ারের পদ প্রদান করা হলো। তিনি পিলাউয়ের সেপাইদের নিরস্ত্র করে এবং শিয়ালকোট থেকে বিদ্রোহী সেপাইদের তাড়িয়ে দিয়ে নিজেকে সে পদের যোগ্য বলে প্রমাণিত করেছিলেন। তিনি তাঁর সেনাবাহিনীর পূর্বেই আমবালা থেকে যাত্রা করেছিলেন দিল্লীতে জেনারেল উইলসনের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য। ১৪ তারিখে ২ হাজার ৪’শ জন পদাতিক সৈন্য, ৬টা কামান এবং কিছু সংখ্যক অশ্বারোহী সৈন্য দিল্লীতে এসে পৌঁছালো।

নিকলসনের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই একটি প্রধান আক্রমণ করার কথা আবার জীবন্ত হয়ে উঠে। নিকলসন ছিলেন গরম মানুষ, তখন আক্রমণ করতেই তিনি প্রস্তুত ছিলেন। অস্ত্রশস্ত্রের সম্পূর্ণ উপস্থিতি, কামানের ব্যাটারী পোঁতা এবং শত্রুদের অবস্থান সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান অর্জন, ইত্যাদি ছাড়া অন্য কোনো অজুহাতে অপেক্ষা করার মানুষ তিনি ছিলেন না। কিন্তু উইলসন তখনও মনস্থির করে উঠতে পারেননি। তখন একমাত্র তিনিই ভালোভাবে জানতেন যে একবার ব্যর্থ হলে তার সেনাবাহিনীর নয়, সমগ্র ভারত সাম্রাজ্যে তাঁদের প্রভুত্বের অবসান ঘটবে। এতোদিন পর্যন্ত পাঞ্জাব শান্ত ছিলো, কিন্তু সেখানেও এখন বিদ্রোহের দোলা লাগতে শুরু করেছে। প্রত্যেক গ্রামে ব্রিটিশ-বিরোধী প্ল্যাকার্ড পোঁতা হয়েছে। বোম্বাইয়ে প্রচণ্ড তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। এই বুঝি ভারতবর্ষ ইংরেজদের হাত থেকে সরে পড়লো। উইলসনের প্রকৃতিতে বীরত্ব ছিলো না। তাই স্বভাবতঃই ভাগ্যকে নিয়ে জুয়া খেলতে তিনি রাজী ছিলেন না। বিজয় লাভ সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হলেই তিনি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নগরের ভেতর থেকে সংবাদ পেয়েছেন, বিদ্রোহী সেপাইদের সংখ্যা ব্রিটিশ সৈন্যদের চাইতে চল্লিশগুণ বেশি। চরম সঙ্কটের দিনে শত্রুরা যদি সম্মুখভাগে আক্রমণ করতো তাহলে প্রকৃত প্রস্তাবে উইলসনকে শত্রুদের হাতে শিবির ছেড়ে দিয়ে পলায়ন করতে হতো। কেননা ব্রিটিশ সৈন্য সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, সে সময়ে সেপাইরা একটু বুদ্ধি করে আক্রমণ করলে সহজেই ব্রিটিশ বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে দিতে পারতো।

নিকলসনের সৈন্য যেদিন পৌঁছলো, সেদিন কিছুসংখ্যক সেপাইকে মার্চ করে বেরিয়ে আসতে দেখা গেলো। অবশেষে সেপাইরা অনুভব করেছে যে তাদের আক্রমণ করার প্রাথমিক পর্যায়ে বার্নাডের সময়ে হাজার চেষ্টা করেও দূর এলাকার সেনাবাহিনীর যোগাযোগ-ব্যবস্থা রক্ষা করতে পারেনি। সেপাইরা পুরোপুরি সাফল্যের সঙ্গেই ইংরেজ সৈন্যের পাঞ্জাব থেকে রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে পেরেছিলো। ঝিন্দের সৈন্যরা নৌকার সেতু রক্ষা করতে পারেনি। দিল্লীর সেপাইরা তা মিসমার করে দিয়েছিলো। এ ব্যাপারে পাতিয়ালার সৈন্যরাও কোনো সাফল্যের পরিচয় দিতে পারেনি। কিন্তু বর্তমানে অবস্থান সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। নতুন সংগৃহীত দু’শ সৈন্যসহ হডসনকে সৈন্যদের ওপর দৃষ্টি রাখতে নির্দেশ দেয়া হলো। কিন্তু হডসনও এ যুগের মানুষ ছিলেন না। মধ্যযুগে হয়তো তিনি সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব বলে পরিচিত হতে পারতেন। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে যারা তাঁর যোদ্ধা মনোবলের প্রশংসা করতেন, তারাও তার দম্ভকে পছন্দ করতেন না। তাঁর নিজ মাতৃভূমির সেবা করতে গিয়ে আপন স্বার্থোদ্ধারের কথাও ভুলে যাননি তিনি। তাঁর সাহসিকতা এবং অপরাজেয় শৌর্য যেমন একদিকে অনেক ভালো লোকের বন্ধুত্বলাভে সাহায্যে এসেছে তেমনি তার খেয়ালী নির্মমতার কারণেই অনেকে আবার তার ওপর বিরূপ ছিলেন।

হডসনের অনিয়মিত অশ্বারোহী বাহিনীর এখনো বিশৃঙ্খল অবস্থা। শিখ, পাঞ্জাবী, পাঠান, মুসলমান, আফ্রিদি, সীমান্তের অন্যান্য গোত্রের লোক, এমনকি হিন্দুস্থানী সেপাইরা এখনো ইংরেজের প্রতি অনুগত রয়েছে, তাদের সকলকে নিয়েই এ পাঁচমিশেলী অশ্বারোহী বাহিনী গঠন করা হয়েছে। তাদের নিয়ে হডসন প্রথমে একটি সুরক্ষিত গ্রামে আশ্রয়গ্রহণকারী কতিপয় অশ্বারোহী সেপাইকে আক্রমণ করেন। কিন্তু তারা ইংরেজদের প্রতি অনুগত ছিলেন না। বিদ্রোহের পরে ভয়ে ডিউটিতে যেতে পারেনি। প্রথম অনিয়মিত অশ্বারোহী বাহিনীর একজন স্বদেশী অফিসার হডসনকে অভ্যর্থনা জানাতে এলেন, কিন্তু তাঁকে তখনই গ্রেফতার করা হলো। এ খবর শুনে অন্যান্য অশ্বারোহী সেপাইরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। তারা ছোটো ছোটো অট্টালিকাসমূহের মধ্যে আত্মগোপন করে রইলো। সমগ্র গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হলো এবং একজন বাদে অপর সকলকে হত্যা করা হলো।

তারপরে হডসন রোহতকের দিকে যাত্রা করলেন। কাছেই একটা পুরোনো দুর্গ, যেখানে বেশকিছু সশস্ত্র অশ্বারোহী সেপাই অবস্থান করছিলেন। হডসন শহরে গেলেন। শহরের লোকেরা আপন পৌরসীমার মধ্যে শত্রুকে আক্রমণ করা অধর্মের কাজ মনে করে, তার সৈন্যদলের রসদপত্র যোগাড় করে দিলেন। হডসন তাদের নগর সীমার বাইরের যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাবার জন্য এক ফন্দী আঁটলেন। তিনি প্রত্যাবর্তনের ভান করলেন। রোহতকের অশ্বারোহীরা যখন পেছন পেছন বেরিয়ে এলো, তার সেনাদল তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের পরাজিত করে। চারদিনের মধ্যে দু দু’বার বিজয় অর্জন করে তিনি দিল্লীতে প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি যেভাবে বিদ্রোহীদের দমন করেছেন, সেজন্য শতমুখে তার প্রশংসা করতে লাগলো সকলে।

ব্রিটিশরা দেখলো যে নগরের অভ্যন্তরে তাদের গোপন বন্ধু থাকলেও আপন সেনাবাহিনীর মধ্যেও বহু গুপ্ত শত্রু রয়েছে। হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদের কাছে একটি ষড়যন্ত্র ধরা পড়লো। দু’টি কামানের বারুদের মধ্যে নুড়িপাথর দিয়ে অকেজো করে দেয়ার চেষ্টা করা হলো। এ খবর কাউকে জানানো হয়নি। খালাসীদের মধ্যে কয়েকজন কামান দাগতে না পারার জন্য অথবা দাগলেও গোলা যাতে আশানুরূপ দূরে গিয়ে না পৌঁছে সেজন্য বারুদের সঙ্গে নুড়ি পাথর মিশিয়ে দিয়েছে। তাদের দু’জনকে ফাঁসিতে লটকানো হলো। জেনারেল উইলসন সবসময় ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর লোকদের সন্দেহ করতেন এবং তাদের অনেকেই ছিলো পুরবীয়া। ভাগ্যের এমন পরিহাস, তিনি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সৈন্যদের বাদও দিতে পারেন না, আবার তাদের বিশ্বাসও করতে পারেন না। কীথ ইয়ং-এর মতে, এ পর্যন্ত গুর্খা এবং পাঞ্জাবীদের সন্দেহ করার মতো কিছু ঘটেনি। কিন্তু শিখদের কথা বলা যায় না। তারা যেমন নগরের ভেতরে আছে, তেমনি বাইরেও আছে।

সেপাইরা এখন মর্মে মর্মে আসন্ন ভয়ঙ্কর বিপদের কথা উপলব্ধি করছে। তারা জানতে পারলো যে অবরোধ করবার জন্য সেনাবাহিনী পথ দিয়েছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অবরোধ ব্যর্থ করে দেবার জন্য তারা অনেক দিন থেকে চেষ্টা করে আসছে। মাঝপথে যদি আগত বাহিনীকে বাধা দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা যায়, তাহলে আরো কিছুদিনের জন্য রাজধানী রক্ষা করা সম্ভবপর হবে। সুতরাং তারা ২৪শে আগস্ট তারিখে ১৮টি কামান নিয়ে যাত্রা করলো কিন্তু তাদের অভিযানের কথা গোপন রইলো না। প্রকৃত প্রস্তাবে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ এত তৎপর ছিলো যে নগরীর অভ্যন্তরের যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ইংরেজ সদর দফতরে এসে অবশ্যই পৌঁছাতো। পরের দিন নিকলসন ২ হাজার পদাতিক এবং ১৬টি অশ্ববাহী কামানসহ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলেন। দুর্গম পথ, আবহাওয়া আর্দ্র। বালু এবং কাদার মধ্য দিয়ে ১৬টা কামান টেনে টেনে নিয়ে যাওয়া খুব সহজ কাজ ছিলো না। কিন্তু নিকলসন ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সেপাইদের তিনি কামান টেনে নেয়ার কাজে নিয়োজিত রাখলেন। নজফগড় খালের ওপারে তিনি শত্রুদের দেখা পেলেন এবং শত্রুর শিবির আক্রমণ করতে মনস্থ করলেন। কামানের গোলা বর্ষণ উপেক্ষা করে ব্রিটিশ সৈন্য সামনে এগুতে লাগলো। কামান থেকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরে ব্রিটিশ সৈন্য এসে পড়েছে। এখনো যুদ্ধ শেষ হয়নি। কিন্তু সঙ্গীন আক্রমণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেপাইরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করতে আরম্ভ করলো। আর কিছুসংখ্যক একটি গ্রামের কাছে ছাউনি পেতে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছিলো। সেদিনের জন্য যুদ্ধ বন্ধ হলো। কিন্তু রাত্রির অন্ধকারে সেপাইরা সে গ্রাম ছেড়ে পলায়ন করলো। নিকলসনের কাজ শেষ হয়েছে, তিনি আবার টিলার ওপর চলে এলেন। আশ্চর্যের বিষয়, আগত সৈন্যদলকে বাধা দেবার জন্য দিল্লী থেকে আর কোনোও প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি। ৩রা সেপ্টেম্বরে ৩০টি ভারী কামান এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্রসহ নতুন সৈন্যদল দিল্লীতে এসে ব্রিটিশ সৈন্যের সাথে যোগ দিলো। বখত খান এবং নিমক রেজিমেন্টের বিদ্রোহীদের সেনাপতি গওস খানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতোখানি দায়ী, তা আমরা জানি না। প্রকাশ্যে বখ্‌ত খান অভিযোগ করেছেন যে তার নির্দেশ প্রতিপালিত হয়নি এবং পরে তিনি প্রধান সেনাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন।

আগস্ট মাসে সম্রাটের অর্থসঙ্কট ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো। এখন আর ঋণ করার ভড়ং নেই, ঋণদাতাদের দলিল দেয়ার সময় বয়ে গেছে। সুদের প্রশ্নই তো উঠে না। দিল্লীতে একটা টাকশাল বসানো হলো। তার ফলেও কিন্তু কোনো সুবিধা হলো না। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছ থেকে একইভাবে দাবি করা হতে লাগলো। বড়ো ব্যাংক মালিক এবং ক্ষুদ্র দোকানদার সকলকেই সমর তহবিলে চাঁদা দিতে নির্দেশ জারী করা হলো। শুধু মাত্র দরিদ্র জনসাধারণকেই এ সময় কর থেকে রেহাই দেয়া হলো। কিন্তু ব্যাংক মালিকেরা সরকারের আসন্ন পতন লক্ষ্য করে চুপ করে রইলো। পরোয়ানা এলেও দরবারে হাজির হলো না। অন্যেরা নিজেদের ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখলো। আবার অতি অল্পসংখ্যক লোক সাহস সঞ্চয় করে চাঁদা দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। সম্রাটের বৃহত্তর স্বার্থের দিকে নজর না দিয়ে সরকারি কর্মচারিরা নিজেদের ব্যক্তিগত লাভ-লোভের জন্য উৎকোচ গ্রহণ করতে লাগলো। এতে করে অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে উঠলো। পাতৌদির মুহম্মদ আকবর আলী খান নামে এক ব্যক্তি সম্রাটের কাছে অভিযোগ পেশ করেছেন যে, লখনৌর সেপাইদের রিসালদার আকবর আলী খান নামে এক ব্যক্তি তার কাছে থেকে অনেক চাঁদা নেওয়ার পরেও তাঁর সম্পত্তি লুঠ করেছে। দুর্ভাগ্যবশতঃ চাঁদা এবং ঋণ গ্রহণের ভার নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত ছিলো না। সেনাবাহিনী, শাহজাদাবৃন্দ, প্রধান সেনাপতি বখৃত খান, বিদ্রোহী দরবার সকলেই অর্থ সংগ্রহ করছিলেন আলাদা আলাদাভাবে। একজনের কাছ থেকে দুতিনবার চাঁদা দাবি করা হলো। যে সমস্ত লোক ইংরেজদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন বলে সন্দেহ করা হলো। তাদের আলাদা করে মোটা টাকা দাবি করা হলো। এ ব্যাপারে জীবনলাল একা ছিলেন না। আগস্ট মাসে তাঁকে পঁচিশ হাজার টাকা দিতে বলা হলো। মীর্জা ইলাহী বখশ তার পক্ষ সমর্থন করে অনুরোধ করলে জীবনলালকে কিছু দিনের জন্য রেহাই দেয়া হয়। কিন্তু পরে জীবনলালকে আটক এবং তার বাড়ি লুঠ করা হয়। মুফতি সদর উদ্দীন নামে আরেক ব্যক্তিকে সন্দেহ করা হলো। সেপাইরা তাঁর কাছ থেকে দু’লাখ টাকা দাবি করলো। টাকার দাম ভয়ংকরভাবে কমে গিয়েছিলো। নতুন এক টাকার পরিবর্তে পুরোনো এক আনার চেয়ে বেশি দাবি করা হলে শাস্তি দেবার জন্যে কোতোয়ালকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। গুজব উঠলো যে সলিমগড় দুর্গের মধ্যে গুপ্তধন রক্ষিত আছে। সেপাইদের অনেক গুপ্তধনের সন্ধানে ছুটলো। সে যাকগে, ৩১শে আগস্ট ঘোষণা করা হলো চাঁদা এবং ঋণ আদায় করার একমাত্র ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ হলো দরবার।

ইতিমধ্যে বারুদ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র ফুরিয়ে এসেছে। খোলাবাজারে সালফার পাওয়া গেলো না। দেবী দাস নামে এক ব্যক্তির দোকান অবরোধ করে প্রচুর সালফার পাওয়া গেলো। ইংরেজদের জিনিসপত্র সরবরাহ করছে, এ সন্দেহে অনেককে গ্রেপ্তার করা হলো। চাঁদনী চক থানার দারোগা সৈয়দ নাজির আলীর কয়েকখানা চিঠি থেকে আমরা জানতে পারি যে ঐ অঞ্চলে কোনো কসাই পাওয়া যাচ্ছে না, পাটের বস্তা অদৃশ্য হয়েছে, আগের বাকি শোধ না করায় রুটিওয়ালারা রুটি সরবরাহ করতে রাজী হচ্ছিলো না। তিনি একবারের বেশি কুলি এবং দুলিবাহক পাঠিয়েছেন, কিন্তু কোনো মুচি কিংবা কোনো ঘোড়া বা উট যোগাড় করতে পারেননি। চাঁদনী চকে ময়লা জমে স্থূপাকার হয়ে রয়েছে। কোনো মেথর কিংবা ঝাড়ুদার তা পরিষ্কার করছে না। অফিসারদের কাঠ সরবরাহ করা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক সেপাইয়ের অতীব প্রয়োজনীয় তাম্রপাত্র কিংবা হুঁকা দেয়া হয়নি। নাজির আলী আরো অভিযোগ করেছেন, তিনি যে মহিষের গাড়ি যোগাড় করেছিলেন, সেপাইরা তা ছেড়ে দিয়েছে। সেনাপতির পক্ষে যা না হলে চলে না, সে কুলি এবং কারিগরদের অত্যন্ত অভাব ছিলো। সেপাইদের ওপর নাগরিকদের কোনো শ্রদ্ধা ছিলো না, দোকানদারদের তারা নাজেহাল করতো এবং ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের টাকাকড়ি লুট করে নিতো। প্রধান সেনাপতি নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে বিশেষ ফলোদয় হয়নি। একজন অশ্বারোহী কর্তৃক এক মেয়েকে ধর্ষণই হলো সবচেয়ে মারাত্মক। এমনকি সেনাবাহিনীর ঘোড়ার ঘাস কাটিয়েরাও নিজেদের পদ্ধতিতে সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছিলো। ইংরেজদের মতে, দলে দলে সেপাইরা চলে যাচ্ছিলো, তা সত্য হতে পারে, নাও হতে পারে।

নতুন সৈন্য এবং অস্ত্রশস্ত্র এসে পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারেরা মনে-প্রাণে আক্রমণের পরিকল্পনা করতে লাগলেন। একটা পরিখা খনন করা হলো এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের একেবারে দক্ষিণ দিক ঘেঁষে কামানের ব্যাটারী পাতা হলো। সেপাইদের আকস্মিক আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করার জন্যে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো। জুনের প্রথম থেকে যখন অল্পসংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য টিলা অধিকার করেছিলো, তখন থেকে চূড়ান্তভাবে নগর আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা পর্যন্ত হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদে ব্রিটিশ সৈন্যের দক্ষিণ বাহুর সৈনিকদের কঠোর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হয়েছে। যদি বিদ্রোহীরা এখান থেকে ব্রিটিশ সৈন্য সরাতে পারতো, তাহলে অন্যান্য স্থান থেকে তাদের তাড়িয়ে দিতে বিশেষ বেগ পেতে হতো না। সুতরাং সেপাইরা মনে করলো, ডান দিক থেকেই নগর আক্রমণ করা হবে। পরিখা খননের জন্যে পুরষ্কার ঘোষণা করা হলো। এ যুদ্ধে যারা মারা যাবে বিদ্রোহী দরবার তাদের পরিবার পরিজনদের ভরণপোষণের প্রতিশ্রুতি দান করলো। কিন্তু ইংরেজরা বাম দিকের অরক্ষিত কাশ্মীরি ফটক, লাভলো ক্যাসল এবং জলের ট্যাঙ্ক থেকেই আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। টেইলর একাই লাভলো ক্যাসলে প্রবেশ করে আক্রমণের সব বিধি-ব্যবস্থা সেরে নিরাপদে ফিরে এলেন। লাভলো ক্যাসেল দখল করার পর ইংরেজরা সেখানে প্রহরার স্থান বাছাই করে দিলেন। নগর প্রাকারের বাইরের এ পুরানো আট্টালিকাগুলো শক্রর জন্যে এতো সুবিধাজনক হবে, আগেভাগে চিন্তা করে তা ভেঙ্গে ফেলার ইচ্ছা সেপাইদের মনে একবারও উদিত হয়নি। লাভলো ক্যাসলের সামনে তিনটা ব্যাটারী, জলের ট্যাঙ্কের কাছে একটা এবং কাঁদেসিয়া বাগে একটা ব্যাটারী তাড়াতাড়ি স্থাপন করলো।

কিছু প্রাণহানি ছাড়া এটা করা সম্ভব হতো না। কিন্তু সশস্ত্র সৈনিকেরা কেউ মারা গেলো না। যারা মরলো তারা সকলেই নিরস্ত্র এদেশীয় মানুষ। ১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের যুদ্ধে টিলার ওপর যে সকল সংগ্রামরত সৈনিক ছিলো, তার অর্ধেকেরও বেশি ছিলো ভারতীয় এবং সমস্ত শিবির পরিচারক যাদের সংখ্যা সগ্রামী সৈন্যদেরও ছাড়িয়ে যায়, তাদেরও সকলে ভারতীয়। এই নীরব সাহসী মানুষদের কোনো তুলনা হয় না। গোলার আঘাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিঁড়ে যাচ্ছে, তাদের কোনো ভাবান্তর নেই। ১০ই সেপ্টেম্বরে তৃতীয় ব্যাটারী স্থাপন করার সময় দেখা গেলো তাদের মধ্যে ৩৯জন হতাহত হয়েছে।

চার রাতের মধ্যে পরিখা খনন এবং তিনটা ব্যাটারী স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। চার নম্বর ব্যাটারীর কাজ সমাপ্ত প্রায়। ইঞ্জিনীয়ারেরা আরো তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে পারবেন বলে আশা দিয়েছিলেন। এ বিলম্বের জন্য সহযোদ্ধারা বারংবার ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। ৩নং ব্যাটরী প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ হওয়ার আগে ১৬ তারিখে কীথ ইয়ং লিখেছিলেন, “ইঞ্জিনীয়ারেরা প্রধান সেনাপতিকে ব্যাটারী স্থাপন করার জন্য যে সময়ের কথা বলেছিলেন, সে সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেনি। সে জন্য তাঁরা ভয়ংকরভাবে দায়ী। এক রাতের মধ্যে সবকিছু শেষ করতে পারবেন বলে বলেছিলেন। আমরা মনে করেছিলাম, হয়তো দু’তিনদিন লাগতে পারে। কিন্তু আজকে চারদিন অতিবাহিত হতে চলেছে, এখনো শেষ হয়নি। ইঞ্জিনীয়ারেরা চমৎকার মানুষ, কিন্তু তাঁরা অসম্ভবকে সম্ভব করার বাসনা পোষণ করেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন তরুণ, তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা সম্ভাব্য বিপদ সম্বন্ধে কিছুই ভাবেননি। কিন্তু বয়স্কেরা সে সম্বন্ধে আগেই ভাবনা-চিন্তা করতেন। কিন্তু তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। ইতিহাস দিল্লী অধিকারের মাধ্যমে তাঁদের পুরস্কৃত করেছেন।

১১ই সেপ্টেম্বর সকাল থেকে ব্যাটারী হতে নগর প্রাচীরে গোলা নিক্ষেপ করা হতে লাগলো। ১৩ তারিখে নগর প্রাচীরের দুটি স্থান বিদীর্ণ হয়ে গেলো। লেফটেন্যান্ট মেডলী রাতের অন্ধকারে প্রাচীরের ভগ্নস্থান পরীক্ষা করে জানালেন যে ওতে তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে। পরদিন সকালে নগরীর মধ্যে ঝড়ের বেগে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। প্রতীক্ষার দিনের অবসান হয়েছে, আক্রমণের প্রত্যাশিত মুহূর্তটি এসেছে হাতের কাছে। জন নিকলসন হচ্ছেন সময়ের উপযুক্ত মানুষ। কোনো দ্বিধা, কোনো সন্দেহ তাঁকে দমাতে পারে না। কোনো ভয় কোনো ভীতি তাঁর বিশ্বাসকে টলাতে পারে না। সুতরাং তাঁকেই নগর আক্রমণের নেতা নির্বাচন করা হলো। আক্রমণকারী সেনাবাহিনীকে চারটি দলে বিভক্ত করা হলো। প্রথম দল স্বয়ং নিকলসনের পরিচালনাধীনে কাশ্মীর দুর্গের পাশ দিয়ে ঝটিকা বেগে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিলো। দ্বিতীয় বাহিনী ব্রিগেডিয়ার জোনসের অধীনে জলের ট্যাঙ্কের কাছের ভগ্ন অংশ দিয়ে এবং তৃতীয় বাহিনী কর্ণেল ক্যাম্পবেলের নেতৃত্বে কাশ্মীর ফটক উড়িয়ে দিয়ে নগরে প্রবেশ করবে বলে স্থির হলো। চতুর্থ দল পাহারপুর এবং কিষাণগঞ্জের সেপাইদের হটিয়ে দিয়ে উপকণ্ঠ ঘুরে লাহোর ফটক দিয়ে নগরে প্রবেশ করার কথা ঠিক হলো। মেজর রীড, যিনি হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদের অসংখ্য সেপাই আক্রমণ বহুবার প্রতিহত করেছেন, তিনিই চতুর্থ বাহিনীর অধিনায়ক। বাদবাকী সেপাইদের ব্রিগেডিয়ার লংফিল্ডের অধীনে রাখা হলো। সেনাবাহিনী প্রস্তুত কিন্তু আক্রমণ স্থগিত রাখতে হলো। রাতের মধ্যে প্রাচীরের ভগ্ন অংশ মেরামত করে ফেলা হয়েছে। ইংরেজদের সৌভাগ্য, এ ভগ্ন অংশে ইট এবং কামান না বসিয়ে সেপাইরা বালির বস্তা স্থাপন করেছে। আবার কামান থেকে গোলা বর্ষণ করা হলে মেরামতকৃত ভগ্নস্থানসমূহ পুনরায় ফাঁক হয়ে গেলো।

বেয়ার্ড স্মিথ দিল্লীকে ভালোভাবে চিনতেন। তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা মিলে যে পরিকল্পনা করেছেন, তাতে খুঁটিনাটি কিছুই বাদ পড়েনি। প্রত্যেক অধিনায়ককে এ পরিকল্পনার এক একটি কপি দেয়া হলো। কিন্তু যুদ্ধেরও তো দুর্ঘটনা আছে। রীডের বাহিনী লক্ষ্যে তো পৌঁছাতে পারলোই না, বরঞ্চ ফিরে আসতে হলো। আর, সি, লরেন্সের অধীন গুর্খা বাহিনীও তাঁর সঙ্গে যোগদান করেছিলো। দক্ষিণ দিক থেকেই সেপাইরা প্রচণ্ড আক্রমণের প্রতীক্ষা করছিলো, সে জন্য সেখানে তারা বেপরোয়াভাবে বাধা দিতে থাকে। জম্মু বাহিনীকে ফিরে আসতে বাধ্য হতে হলো। অন্যান্য বাহিনীও সাফল্যের পরিচয় দিতে পারলো না। সমগ্র বাহিনীকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়া হলো। হোপ এ্যান্টের সেনাদলকে লাহোর ফটকের কাছ থেকে গোলন্দাজদের নির্মম আক্রমণের মুখে ফিরে আসতে হলো। সেপাইদের যদি একজন প্রতিভা এবং পারঙ্গমতাসম্পন্ন নেতা থাকতো তাহলে এ সাফল্যের ওপর নির্ভর করে অনেক কিছু করতে পারতো। যদি সম্মুখভাগে ব্রিটিশ সৈন্যদের আক্রমণ করা হতো, তাহলে শুধুমাত্র নগর রক্ষাই হতো না, শত্রুরা দু’দিকের গোলা বর্ষণের পাল্লায় পড়ে হতাশ হয়ে যেতো। দুর্ভাগ্য, দিল্লীর সেপাইদের মধ্যে এমন একজন নেতাও ছিলো না, কখন এবং কোথায় আঘাত করতে হবে এ জ্ঞান যার ছিলো। চতুর্থ সেনাবাহিনীর ওপর জয়লাভ করার পরেও সেপাইরা দিল্লীর পতন রোধ করতে পারলো না।

নিকলসন পরিচালিত বাহিনী প্রাচীরের ভগ্ন অংশ অতিক্রম করে শীগগিরই মোরি দুর্গ অধিকার করলো। কাবুল ফটক দখল না করা পর্যন্ত নিকলসনের অধীন সেনাবাহিনী সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলো। কাবুল ফটকের পেছনে বার্ন দুর্গ পর্যন্ত তারা এগিয়ে গেলো। কিন্তু তার পরে আর অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। প্রতি ইঞ্চি মাটি ছেড়ে দেয়ার আগে সেপাইরা মরণপণ সংগ্রাম করছে। আক্রমণকারী সেনাদল সেপাইদের গোলাগুলির আঘাতে ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অফিসারেরা নিজেরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, সেপাইদের অনুপ্রাণিত করছেন। কিন্তু মানুষের সাহসেরও তো সীমা আছে। আক্রমণকারীরা বারবার সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। কিন্তু প্রতিরক্ষীদের অবিরাম কামানের গোলাগুলি তাদেরকে বারবার পেছনে হটিয়ে দিচ্ছে। মেজর জেকব গোলার আঘাতে আহত হয়ে পড়লেন। সামনে এলেন নিকলসন। তাঁর মানুষদের অনুসরণ করতে আদেশ দিয়ে তুমুল গোলাবর্ষণ অগ্রাহ্য করে তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন এবং গোলার আঘাতে মারা গেলেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতো ব্যাপক যে সেনাবাহিনী কাবুল ফটকে ফিরে যাওয়াই উপযুক্ত মনে করলো।

জোনস পরিচালিত দ্বিতীয় দল ভগ্নপ্রাচীর অতিক্রম করলো। কিন্তু নিকলসনের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। তৃতীয় বাহিনী পরিকল্পনা অনুসারে আক্রমণে সাফল্যলাভ করে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে। তারা কাশ্মীর ফটকে এসে দেখে যে সেতু আংশিকভাবে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু অবশিষ্ট দণ্ডগুলো বেয়ে তারা সেতু অতিক্রম করতে লেগে গেলো। গোলার পর গোলা এসে আঘাত করছে। আহত নিহত হয়ে নীচে পড়ছে। আবার তারা সামনে এগিয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত তারা আক্রমণ করতে সক্ষম হলো। ফটক প্রবল শব্দে ভেঙ্গে পড়লো। বিউগলের উচ্চনিনাদ তাদের সাফল্যের প্রতিধ্বনি করলো। এই আক্রমণের বীর হলেন, লেফটেন্যান্ট শ্যালকেল্ড, হোম, কর্পোরাল বার্গেস, সার্জেন্ট স্মীথ, কাৰ্মাইকেল, হাবিলদার মধু, হাবিলদার তিলক সিং এবং সেপাই রামনাথ। তৃতীয় বাহিনী তাদের অবস্থান দৃঢ় করে জামে মসজিদ পর্যন্ত অগ্রসর হলো। মসজিদ থেকে অবিরাম গোলাবর্ষণ অবশ্য তাদেরকে পেছনে হটতে বাধ্য করলো। দিনের শেষভাগে ব্রিটিশ সৈন্য নগর প্রাচীরের একাংশ দখল করে নগরের মধ্যে নিজেদের আধিপত্য প্রসারিত করলো। সে রাতে ব্রিটিশ সৈন্য স্কীনারের বাড়িতে ঘুমোলেন। গীর্জা এবং কলেজের অট্টালিকাও তাদের হাতে চলে এলো। ক্ষয়ক্ষতি যা হয়েছে মারাত্মক। ১১০৪ জন সৈন্য, ৬৬ জন অফিসার এবং প্রতি ৯ জনের ২ জন হয়তো মারা গেছে অথবা আহত হয়ে পড়ে আছে। ইঞ্জিনীয়ারদের সঙ্গে কর্মরত সতেরো জন অফিসারের মধ্যে আটজন ভয়ঙ্করভাবে আহত হয়েছেন এবং একজন নিহত হয়েছেন। স্বভাবতই উইলসন দুঃখিত হয়েছেন। সেলিমগড়ের সুরক্ষিত দুর্গপ্রাসাদ এবং অস্ত্রশস্ত্র এখনো সেপাইদের হাতে রয়েছে। সে দুর্গের ছিদ্র দিয়ে গোলাগুলি বর্ষণ করে দু’দিকে এখনো প্রত্যেকটা রাজপথ ওরা আগলে রাখতে পারবে। তিনি চিন্তা করলেন, তার সেনাবাহিনীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে, এখনো অপেক্ষা করা যুক্তিযুক্ত হবে কি? না কি তাঁর উচিত নগর পরিত্যাগ করে আবার টিলা-শ্রেণীর ওপর চলে গিয়ে নতুন সৈন্য আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা? এ হতাশাজনক পরামর্শের নিন্দা করলেন বেয়ার্ড স্মীথ। যাহোক শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সৈন্যরা সাহস করে নগরের মধ্যেই রয়ে গেলো।

চালর্স জন গ্রিফিথ, যিনি উইলসনের অধীনে চাকুরি করতেন, এভাবে ১৫ই সেপ্টেম্বরের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। “সব বয়সের সব সৈন্যরা এখন কড়া মদের নেশায় বিভোর। এটা ব্রিটিশ সৈন্যদের পক্ষে ভয়ঙ্কর লজ্জার কথা। কে এবং কার দ্বারা প্রথম এ কাজ হয়েছে আমি বলতে পারবো না। ১৫ তারিখ সকাল বেলা দেখা গেলো মদের ভাঁড়ারের দরজা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে এবং সৈন্যরা মদের নেশায় বিভোর হয়ে হৈ হল্লা শুরু করেছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক, সে সময়ে যদি শত্রু আমাদের ওপর আক্রমণ করতো, তাহলে আমাদেরকে বেকায়দায় পড়তে হতো। তাদের মদ খাওয়া থেকে বিরত করার জন্য চেষ্টা করা হলো। কিন্তু তাতে কোন ফল হলো না। শেষ পর্যন্ত প্রধান সেনাপতি মদের সমস্ত ভাড়ার নষ্ট করে ফেলার আদেশ দিলেন। এ কাজ পাঞ্জাবী এবং শিখদের দ্বারাই করা হয়েছিলো। দিল্লীর রাজপথে মদের স্রোত বয়ে গিয়েছিলো।” সেপাইরা এসব দিকে কিন্তু নজর রাখেনি। শুধুমাত্র সন্ধ্যে বেলাতেই তারা কলেজ চত্বরে বন্দুক এবং সেলিমগড়ের আশপাশের বাড়িগুলোতে কামানের গোলা ছুঁড়তে লাগলো।

১৬ তারিখে ইংরেজরা অস্ত্রাগার অধিকার করে নিলো। ১৭ থেকে ১৯ তারিখের মধ্যে সেলিমগড় দুর্গে ভারী কামানের গোলা বর্ষণ করতে লাগলো। ইংরেজদের অধিকারের সীমা এখন বিস্তার লাভ করেছে। ২০ তারিখে তারা প্রাসাদ এবং সেলিমগড় দুর্গের চারদিকে স্থান দখল করে নিলো। এ সুরক্ষিত দুর্গ প্রাসাদ রক্ষা করার জন্য কেউ ছিলো না। কেবল কয়েকজন প্রহরী প্রাণপণে বাধা দিয়ে সম্মান রক্ষার চেষ্টা করেছে। এই নামহারা বীরেরা সেদিন ইংরেজদের বাধা দিয়েছিলো, মৃত্যুবরণ করেছিলো। ইংরেজরাও এ বীরদের বীরত্বের প্রশংসা না করে পারেনি। জেনারেল উইলসন প্রাসাদের মধ্যেই ইংরেজদের সদর দফতর স্থানান্তরিত করলেন। দেওয়ান-ই খাসে নৈশ ভোজের আয়োজন করে ইংরেজরা বিজয় উৎসব করলো।

এভাবে দিল্লী দখল করা হলো, কিন্তু কতো মানুষকেই না এজন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। ৩০শে মে হতে ২০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধুমাত্র ব্রিটিশ পক্ষেই ৩,৮৩৭ জন লোক নিহত, আহত অথবা নিখোঁজ হয়েছে। রেজিমেন্টগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও সামান্য নয়। গুর্খা সৈন্য, যারা হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদে ব্রিটিশ সৈন্যের ডান দিকে ছিলো তাদের ৫৫০ জনের মধ্যে শতকরা ৬০ জন নিহত বা আহত হয়েছে। বিদ্রোহীদের মধ্যে কতজন নিহত কিংবা আহত হয়েছিলো সে খবর আমরা জানি না।

একদিক দিয়ে ধরতে গেলে এ বিজয় এখনো সম্পূর্ণ নয়। কারণ সম্রাট এবং শাহজাদারা এখনো মুক্ত অবস্থায় আছেন। প্রধান সেনাপতি বখৃত খান সম্রাটকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে অযোধ্যায় চলে গিয়ে সেখানে যুদ্ধ শুরু করতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু ইলাহী বক্স শৰ্তমূলকভাবে আত্মসমর্পণ করতে উপদেশ দিলেন। মহিষীর প্ররোচনাতেই তিনি এ পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ মহিষী তাঁর ছেলে, স্বামী এবং তাঁর কিছু রত্ন-অলঙ্কার ফিরে পাবার প্রত্যাশা করেছিলেন। একজন ছাড়া সম্রাটপুত্রদের কারো বাবুরের সে অদম্য সাহসের একবিন্দুও ছিলো না। শাহজাদা ফিরোজ শাহ তখন দিল্লীতে ছিলেন না। মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান এবং আবু বাকার এতাদিন পর্যন্ত সাম্রাজ্যের পুনর্জীবনের অসম্ভব আশায় মেতে উঠেছিলেন, কিন্তু বর্তমানে তারা আপন আপন প্রাণ বাঁচাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। সম্রাট পয়লা কাতবে গিয়েছিলেন। মীর্জা ইলাহী বক্স তাঁকে হুমায়ুনের মাজারে আশ্রয় গ্রহণ করতে বললেন। ব্রিটিশ গুপ্তচর মৌলবি রজব আলী ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগকে পলাতকদের অবস্থান জানিয়ে দিলেন। হডসন উইলসনের কাছে গেলেন, শুধুমাত্র প্রাণের দাবিতে সম্রাটের আত্মসমর্পণের বিষয়ে মীর্জা ইলাহী বক্সের মাধ্যমে আলোচনা চালাবার জন্য অনুমতি পেলেন। এটা ছিলো বেসামরিক অফিসারের দায়িত্ব। কিন্তু বেসামরিক অফিসার হার্ভে গ্রীথিড ২০ তারিখে কলেরায় মারা গেলেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মিঃ স্যাণ্ডার্স। হডসন মৌখিকভাবে তাঁকে জানালেন যে শুধুমাত্র প্রাণ রক্ষার তাগিদে, সম্রাটের আত্মসমর্পণের ব্যাপারে আলোচনা চালাবার অনুমতি তিনি প্রধান সেনাপতির কাছ থেকে লাভ করেছেন। হডসন শাহজাদা জওয়ান বস্তৃত এবং তার শ্বশুর আহমদ কুলী খানকেও প্রাণের দায় থেকে রেহাই দিয়ে তার ওপর প্রদত্ত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করলেন। সে সময়ে সম্রাটের মুক্তির জন্য তার আলোচনার কড়া সমালোচনা করেছেন অনেক দায়িত্বশীল ইংরেজ, কারণ প্রাসাদের অনেক ইংরেজকে হত্যার জন্য তাঁরা সম্রাটকেই দায়ী মনে করেন।

২১শে সেপ্টেম্বর তারিখে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ হডসনের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন, তাঁকে দিল্লীতে আনা হলো। তারা পরের দিন হডসন হুমায়ূনের মাজারে অভিযান চালিয়ে শাহজাদাদের শর্তহীন আত্মসমর্পণ দাবি করলেন। শাহজাদারা প্রাণ রক্ষার নিশ্চয়তা পেতে চেয়েছিলেন। মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান এবং মীর্জা আবু বাকারকে একটি গরুর গাড়িতে ভোলা হলো। হডসন বলেছিলেন শাহজাদাদের এ অবস্থা দেখে একদল সশস্ত্র জনতা জমা হয়েছিলো। কিন্তু তাদের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিতে তাঁকে বেগ পেতে হয়নি। তারপর তিনি বন্দীদের নিয়ে দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করলেন, জনতাও তাঁকে অনুসরণ করতে লাগলো। তারা দিল্লীর ফটকের কাছে এসে পৌঁছালে হডসন বন্দীদের কাপড় খুলতে আদেশ করলেন। তারপর আপন হাতেই তিনজনকে গুলি করে মারলেন। তার একটু পরেই সম্রাটের বংশের ২১ জন শাহজাদাকেই ফাঁসিকাষ্ঠে লটকানো হলো। বল্লভগড়ের রাজা এবং ঝজঝরের নবাবকেও ফাঁসি দেয়া হলো।

সম্রাট আপন প্রাণ রক্ষার জন্য দরাদরি না করলেই হয়তো ভালো করতেন। জঘন্য অপরাধীর সঙ্গে যে ব্যবহার করা হয়, তার সঙ্গেও তেমন ব্যবহার করা হলো। তাঁকে শেকল পরানো হয়নি এ কথা সত্য। কিন্তু এমন খারাপ জায়গায় তাঁকে রাখা হয়েছে যে প্রত্যেক ইংরেজ নরনারী সম্রাটের গোপনীয়তা ভঙ্গ করতো এবং তার দিকে রোষকষায়িত লোচনে তাকাতো। গ্রীফিথ ২২শে সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ করার পরের দিন একটি সাধারণ চারপায়ার কুশনের উপর সম্রাটকে উপবিষ্ট দেখেছিলেন এবং লিখেছেন, “মোগল সাম্রাজ্যের শেষ বংশধর দরবারের বারান্দা অথবা বিছানায় একখানা সাধারণ দেশী চারপায়ার কুশনের উপর বসে আছেন হাঁটু বাঁকা করে। বুকের ধার অবধি নেমে আসা লম্বা দাড়ি ছাড়া তাঁর চেহারার মধ্যে আর কোন আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য নেই। মাঝামাঝি দীর্ঘ, সত্তর বছরের উপরে বয়স, পরনে সাদা কাপড়, মাথায় চূড়াকৃতি একটি সাদা পাগড়ি। পেছনে দু’জন পরিচারক দাঁড়িয়ে বৃহৎ ময়ূরের পালকের পাখা দিয়ে হাওয়া করছে। এ হলো তার সার্বভৌমত্বের প্রতীক। কিন্তু যে সম্রাট শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, তারপরেও তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রহসন দেখে মনে করুণারই উদয় হয়। তাঁর মুখ থেকে একটা কথাও বেরুচ্ছে না। রাতদিন তিনি স্থির হয়ে মাটির দিকে চেয়ে চুপচাপ বসে আছেন। দেখে মনে হয় যে অবস্থার মধ্যে পড়েছেন, তার বিপত্তি সম্বন্ধে তিনি পুরোপুরি সজাগ। তার থেকে মাত্র তিন ফুট দূরে আরেকটি বিছানায় বসে আছেন প্রহরারত অফিসার। দুপাশে দু’জন ইউরোপীয় প্রহরী যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের রাইফেলের সঙ্গিনগুলো চকচক করছে। প্রহরারত অফিসারের কাছে নির্দেশ দেয়া আছে, সম্রাট যদি পালাবার কোনো চেষ্টা করেন, তিনি যেন নিজের হাতে সম্রাটকে গুলি করেন। রেইকস তাঁকে ১৮ই ডিসেম্বর তারিখে দেখে ১৯ তারিখে লিখেছিলেন, আমার অনেক ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলাকে নিয়ে গতকাল সম্রাটকে দেখতে গিয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে মিঃ ও মিসেস স্যাণ্ডার্সও ছিলেন। সম্রাট নব্বই বছরের একজন আশাহত বৃদ্ধ। আমি দেখলাম, তিনি একটি ছোটো ঘরে, আগে যেখানে সামান্য চাকর থাকতো সেখানে কুশনের ওপর বসে আছেন। আমি তার পাশে গিয়ে চেয়ারে বসলাম এবং তাঁকে স্বপ্নের কথা বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম। তারপরে তিনি স্বরচিত কবিতা আবৃতি করতে লাগলেন অনুচ্চস্বরে। সম্রাটকে কিছু না বলে আমি স্থান পরিত্যাগ করলাম।”

মহিষীকেও রেহাই দেয়া হয়নি। ইউরোপীয় মহিলারা তার দিকে ঘৃণাব্যঞ্জক দৃষ্টিতে তাকাতেন এবং অনেক সময় কঠোর মন্তব্যও করতেন। মিসেস কুপল্যাণ্ড যার স্বামী গোয়ালিয়রে নিহত হয়েছেন, তিনিও সম্রাটকে দেখতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর মধ্যে রাজ্যহারা সম্রাটের কোনো মহিমা, কোনো মহানুভবতা তিনি প্রত্যক্ষ করেননি। তিনি লিখেন, আমরা সিঁড়ি বেয়ে কয়েক কদম অগ্রসর হয়ে একটা নোংরা ঘরে প্রবেশ করলাম। ঘরের সামনে প্রহরীরা ঘোরাফেরা করছে। তারপরে রাজার রাজা মোগল সম্রাটের ঘরে প্রবেশ করলাম। তারপরে পর্দা ঠেলে আমরা নিচু নোংরা একটি কক্ষে এসে ঢুকলাম। সেখানে একটি নিচু চারপায়ার ওপরে সাদা সুতী কাপড়ের পোশাক পরা ক্ষীণাঙ্গী এক বুড়ো মহিলাকে দেখতে পেলাম। শীতের জন্য তিনি ময়লা চাদর এবং লেপে সারা শরীর ঢেকে আছেন। আমাদের প্রবেশ পথে তিনি হুঁকাটা রেখেছেন। যে সম্রাট অতীতে তাঁর সামনে কেউ বসলে সে অপমান সহ্য করতে পারতেন না, অত্যন্ত দীনভাবে আমাদের সালাম করে বলতে লাগলেন, আমাদের দেখে তিনি খুবই খুশি হয়েছেন।”

শাহজাদা জওয়ান বখতের অবস্থাও ভালো নয়। তিনি অসুখে ভুগছেন। তথাপিও তাঁকে প্রত্যেক দর্শককে সম্মান জানাবার জন্য উঠে দাঁড়াতে হয়। কমিশনার বসবার অনুমতি না দিলে বসতে সাহস করতেন না। বিচারের সময় বিচারক এবং প্রসিকিউটাররা সম্রাটকে সাধারণ ভদ্রতাটুকুও দেখাতে পারেননি। এখনো তিনি কবিতা লিখতে চান। কিন্তু তাঁকে কাগজ-কলম দেয়া হয়নি। তার অভাবে কয়লা দিয়ে তিনি বদ্ধঘরের দেয়ালে কবিতা লিখতেন। এক সময় বলা হলো তাঁকে আন্দামানের বন্দী উপনিবেশে আফ্রিকায় অথবা অন্য কোনো দেশে পাঠিয়ে দেয়া হোক। সিসেন বিডন তাকে চীনা উপকূলের হংকং শহরে পাঠিয়ে দিতে পরামর্শ দিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ব্রহ্মদেশের রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হলো। কয়েক বছর পর সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাহাদুর শাহ নিজের মন্দভাগ্যের জন্য কাউকে দোষ দিতে পারেন না। তিনি যদি সাহসিকতায় ভর করে সেপাইদের সঙ্গে যেতেন এবং বীরের মতো মৃত্যুকে যুদ্ধক্ষেত্রে আলিঙ্গন করতেন তাহলে দেশবাসী এমন কি শত্রুদের শ্রদ্ধাও তিনি আকর্ষণ করতে পারতেন। প্রথমে সেপাইদের দ্বারা প্রলুব্ধ হলেন ক্ষমতার জন্য, তারপরে রজব আলী এবং ইলাহী বক্সের দ্বারা প্রলুব্ধ হলেন আপন প্রাণের জন্য। নিষ্ঠুর ভাগ্যের হাতের ক্রীড়নক বাহাদুর শাহ আপন সাম্রাজ্য থেকে দূরে বন্দী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন।

দিল্লী এবং তার অধিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশার অন্ত নেই। জেনারেল উইলসন নারী এবং শিশুদের প্রতি কোনো রকমের নৃশংসতা না করার জন্য কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এমন সৈন্য কোথায় আছে যে বিজয়ের মহেন্দ্রলগ্নে করুণা দেখবার আদেশ মেনে নেবে? এখন শিখরা মনে করতে লাগলো, গুরু যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তাঁর শিষ্যেরা দিল্লীকে ছারখার করে দেবে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছে। লুণ্ঠনের আশা এবং পূরবীয়া সম্প্রদায়ের ওপর প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করার প্রবল বাসনায় তারা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে লাগলো। ব্রিটিশ সৈন্যরা শুনেছে শিশু হত্যা এবং মহিলাদের অসম্মানের কথা এবং শুনেছে তাদের বন্ধুদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এতোদিন তাদের মনে প্রতিহিংসার আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিলো। এমনকি খ্রীস্টান ধর্মযাজকেরা একে ধর্মসঙ্গত কাজ বলে মেনে নিতেও কোনো আপত্তি করেনি।

২১শে সেপ্টেম্বর গ্রফিথ দিল্লীর রাজপথ এবং জনাকীর্ণ দিল্লী নগরী সম্বন্ধে লিখেছেন, “রাজপথে একজন মানুষও নেই। বিপত্তির কারণে সমগ্র নগরীকে মৃত মানুষের শহর বলে ভ্রম হয়। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় আমরা যে রাজপথ দিয়ে যাচ্ছিলাম, মাত্র কয়েকদিন আগেও তার দু’দিকে হাজার হাজার লোক বাস করতো, সেপাই এবং নগরবাসীদের শব চারদিকে ছড়ানো রয়েছে। অনেক দিন ধরে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। শ্বাস নেয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু পরিকল্পিত লুণ্ঠনের কাজ অব্যাহত গতিতে চলছে। পরিত্যক্ত গৃহের মেজ খনন করে গুপ্ত ধনের সন্ধান করতে লাগলো। গুপ্তধন পাওয়া গেলে অফিসারেরা তার অংশগ্রহণ করতে লাগলেন কোনো রকমের কুণ্ঠা না করে। সোমনাথের কাহিনী এখনো জীবন্ত। হিন্দু প্রতিমাগুলোকে অপসারণ করা হলে রহমাণিক্যের সন্ধানে কতোগুলোকে ভেঙ্গে ফেলা হলো। ৩১শে অক্টোবর তারিখে গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী সার্জনের রিপোর্টের উপর নির্ভর করে মুঈর শেরারকে লিখলেন, “এখনো দিল্লী তার সবরকম ঐশ্বর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কামান কিংবা গুলির সামান্যতম চিহ্ন কোথাও দৃষ্টিগোচর হয় না, কিন্তু বাড়িগুলো সব পরিত্যক্ত এবং লুণ্ঠিত। হতভাগ্য অধিবাসীরা পালিয়ে উপোস করছে এবং আমি কিছুতেই মনে করতে পারি না যে তাদের ওপর নির্মম ব্যবহার করা হয়েছে। সেপাইদেরকে নির্দয়ভাবে হত্যা করার জন্য আপনি আমাকে দোষারোপ করতেন, কিন্তু আমারও মনে হয় সরকার হতভাগা বেনিয়া এবং কায়েতদের প্রতি খুবই রূঢ় ব্যবহার করছেন। নগরে প্রতিদিন বর্ধিত হারে লুণ্ঠনকার্য চলছে। আমার ধারণা প্রত্যেক অফিসার যারা অবরোধ কাজে লিপ্ত আছেন, এ মুহূর্তে অবসর গ্রহণ করলেও কোনো ক্ষতি হবে না। এটা কোনো অহেতুক অনুমান ছিলো না। গ্রীফিথ এমন একজন অফিসারের কথা বলেছেন যার অন্যায়ভাবে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ছিলো দু’লাখ টাকা। তিনি আরো বলেছেন, “ আমার রেজিমেন্টের অনেক সৈন্য লুণ্ঠনের অনেক দুর্মূল্য বস্তু সামগ্রীর অধিকারী হতে পেরেছিলেন। আমাদের ইংল্যান্ডে ফিরে আসার পরই পুরোপুরি দেখতে পেয়েছিলাম। অধিকসংখ্যক নকমিশন্ড অফিসার এবং সৈন্য স্বেচ্ছায় চাকুরি ছেড়ে দিয়েছিলেন, কারণ মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী যা দিল্লীতে হস্তগত করেছেন এবং তিন বছর ধরে রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন, এখন বিক্রয় করার উপযুক্ত সুযোগের সন্ধান করছেন। অনেক দোকানে রত্ন-অলঙ্কার বিক্রয়ের জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। দেখলেই প্রাচ্যের অণুকরণীয় সূক্ষ্ম শিল্পের কথা মনে পড়ে যায়। আমরা জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছি সৈন্যদের কাছ থেকেই তারা সে সব খরিদ করেছে।”

সমগ্র নগরী এখন বিজয়ীদের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি নভেম্বর মাসেও তাদের লুণ্ঠনকার্য থামেনি। শুধু সম্পত্তির নিরাপত্তা নয়, মানুষের প্রাণেও কোনো নিরাপত্তা ছিলো না। সে সময়ে উর্দু কবি গালিব দিল্লীতে ছিলেন। তিনি শোক-সন্তপ্ত মনে লিখেছেন, আমার সামনে রক্তের বিশাল দরিয়া। আমার সহস্ৰ সখা প্রাণ হারিয়েছে। কার কথা আমি স্মরণ করবো? কাকে আমি নালিশই বা জানাবো? সম্ভবতো আমার মৃত্যুর পরে আমার জন্য অশ্রুপাত করবার মতোও কেউ নেই। আমরা কবিসুলভ অত্যুক্তির প্রতি পুরোপুরি আস্থা নাও রাখতে পারি। তাহলেও সেপাইদের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদেরকেও যে একই ভাগ্যের শিকার হতে হয়েছে, তার অন্য প্রমাণ মিলে। জহির দেহলভী দস্তানী গফর’ গ্রন্থে লিখেছেন, অনেক সময় দোষীদের সঙ্গে নির্দোষ মানুষদেরও হত্যা করা হয়েছে। বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ের এ হলো এক নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ইংরেজ সৈন্যরা রাস্তায় যাকে দেখা পায় তাকেই গুলিকরে মারতে লাগলো। নগরের মধ্যে এমন কতিপয় মানুষ ছিলেন যাদের সমান প্রতিভাধর মানুষ অতীতে জন্মগ্রহণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও জন্ম গ্রহণ করবে না। মিয়া মুহম্মদ আমিন পাঞ্জাকুশী নামে একজন বিখ্যাত লেখক মৌলভি ইমান বক্স এবং তাঁর দু’পুত্রও কাঁচা চেহলানের অন্যান্য সকলকে বন্দী করে রাজঘাট ফটকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সেখানে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের মৃতদেহ যমুনা গর্ভে নিক্ষেপ করেছে। মহিলারা তাদের সন্তানের হাত ধরে বেরিয়ে এসে কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কাঁচা চেহলানের সমস্ত কুয়া মৃতদেহে ভরে উঠেছিলো। আমার লেখনীর সাধ্য নেই আর বেশি কিছু লেখে । কত জনকে যে ফাঁসি দেয়া হয়েছে একমাত্র আল্লাহই তার সংখ্যা বলতে পারে। এ কথা লিখেছেন গালিব তাঁর দাসতাম্বু’ কাব্যগ্রন্থে। প্রধান রাজপথ দিয়ে বিজয়ী বাহিনী নগরে প্রবেশ করেছিলো। পথে যার সঙ্গেই দেখা হয়েছে তাকেই হত্যা করেছে। গোরা সৈন্যরা নগরে প্রবেশ করে নির্দোষ এবং নিরপেক্ষ মানুষদের হত্যা করতে লাগলো। দু’টো তিনটে মহল্লাতে ইংরেজরা সম্পদও লুট করেছে এবং মহল্লাবাসীদেরও নির্মমভাবে হত্যা করেছে।”

রাজনীতি এবং ধর্মের মধ্যে কোনোরকম ভেদাভেদ ব্যতিরেকেই ব্রিটিশ সামরিক অফিসারেরা সমস্ত ভারতীয়দের প্রতি একই রকমের ব্যবহার করতে লাগলো। অধ্যাপক রামচন্দ্র ছিলেন একজন খ্রীস্টান। প্রাণের ভয়ে তাঁকেও ১১মে তারিখে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো। উচ্চ মহলে তাঁর বন্ধু-বান্ধব ছিলেন। মি. মুঈর (পরে স্যার উইলিয়াম মুঈর) তাঁকে মুক্তি দিলেন এবং পরে দিল্লীর পুরোনো কাগজপত্র রক্ষা করার জন্য তাকে দিল্লীর প্রাইজ এজেন্টের অফিসে নিয়োগ করলেন। অঙ্কিত চিত্র, দলিলপত্র, আসবাবপত্র, গৃহসজ্জার উপকরণ কিছুই সেপাইদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। অধ্যাপক রামচন্দ্র নিজেকে খ্রীস্টান এবং সরকারি কর্মচারী বলে পরিচয় দিলেও শিক্ষিত খ্রীস্টান সামরিক অফিসারেরা তাকে অপমান এবং অসম্মান হতে রেহাই দেয়নি।

শুধু তিনি একা নন, তাঁর মতো অন্যান্যেরাও রাজভক্তির কারণে লাঞ্ছিত এবং নিগৃহীত হয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। সম্পত্তি লুণ্ঠিত হয়েছে। সশস্ত্র বিদ্রোহীদের মতো তাদেরও গৃহত্যাগী হতে হয়েছে। তারা যে নির্দোষ, তা তাদের এ দুঃখ-যন্ত্রণার উপশম করতে পারেনি।

সৌভাগ্যবশতঃ বেসামরিক অফিসারেরা সামরিক অফিসার বন্ধুদের চোখে চোখে তাকাতে পারতো না। সকলের প্রতি যেভাবে সমান অত্যাচার করা হচ্ছে, যার ফলে সকলকেই শাস্তিভোগ করতে হচ্ছে সে বিষয়ে মিঃ স্যান্ডার্স পুরোপুরি সজাগ ছিলেন। তিনি নাগরিকদের দুঃখ-যন্ত্রণা এবং অসুবিধার কথা কঠোরভাবে ব্যক্ত করলেন। তার মত অনেক উচ্চপদস্থ বেসামরিক কর্মচারী সমর্থন করলেন, তার মধ্যে স্যার জন লরেন্স একজন। মুঈর বিডনের কাছে ১৮ নভেম্বর লিখেছিলেন, সামরিক কর্তৃপক্ষ যে নীতি অনুসরণ করছে, তাতে অপরাধী এবং নিরপরাধের মধ্যে যে কোনো প্রভেদ করা হয়নি, তা এক রকম স্পষ্ট এবং তার ফলে নাগরিকেরা যে পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তার অন্ত নেই। এমনকি যারা বিদ্রোহীদের হাতে চরমভাবে নির্যাতিত হয়েছে তাদের রেহাই দেয়া হয়নি। আমার মনে হচ্ছে বর্তমানে এর কোনো বিকল্প নেই। আমি আশা করছি, দিন গত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকতরো ন্যায়ানুগ নীতি অনুসরণ করা হবে। যে সকল লোক আগ্রার সঙ্কটের সময় অটলভাবে আমাদের সমর্থন করেছে যার জন্য তাদের পরিবারকে চরম দুর্ভোগ ভোগ করতে হয়েছে। কাপড়চোপড়, খাদ্য, আশ্রয় এমন কি জীবনের ভয়েও কম্পিত শিহরিত ছিলো, তাদের প্রতি সুবিচারের জন্য অন্ততঃ সুশাসনের প্রয়োজন। সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের মানুষের অভাবের দরুন নগরীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো।

প্রহরার সুবন্দোবস্ত করতে না পারায় দু’টো ছাড়া দিল্লীর আর সব ফটকগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হলো। নগরে প্রবেশের জন্য কাশ্মীর ফটক এবং নগর থেকে বেরোবার জন্য লাহোর ফটক ভোলা রাখা হলো। প্রাক্তন শাসন ব্যবস্থার সমর্থকদের ওপর জরিমানা করা হলো। ইংরেজদের ধারণা, হিন্দুরা মুসলমানদের চাইতে ইংরেজদের প্রতি অধিকতররা প্রসন্ন। আর মুসলমানেরা পুরোপুরি ইংরেজ বিদ্বেষী । সেজন্য হিন্দুদের জরিমানার অর্থ পরিশোধ করার দায় থেকে রেহাই দেয়া গেলো। জরিমানা পরিশোধ করতে গিয়ে অধিবাসীরা, তাদের সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি হারালো। তাদের শূন্য ঘরের চারটি দেয়াল ছাড়া আর কিছুই রইলো না। তারপর দিল্লীকে পাঞ্জাবের সঙ্গে সংযুক্ত করা হলো।

৪. কানপুর : ধাবমান দাবানল

দিল্লিতে সম্রাট ছিলেন। আর কানপুরের সেপাইরা মহারাষ্ট্রের রাজবংশের কারো নেতৃত্ব গ্রহণ করার অপেক্ষা করছিলো। ১৮১৭ সালে পেশবা দ্বিতীয় বাজীরাও ব্রিটিশ শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, পরে মে মাসে তাঁকে ইংরেজ সৈন্যের হাতে সম্পূর্ণভাবে পরাজয় বরণ করতে হয়। তাঁকে সাম্রাজ্য থেকে দূরে নির্বাসিত করা হলো। এ নির্বাসনের স্থান হিসেবে তিনি কাশীকে পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁর পছন্দে মত দিতে পারলেন না, কারণ সেখানে অনেক রাজপুত্র রয়েছে। তদুপরি কাশী হলো, প্রাচীন হিন্দু সাম্রাজ্যের রাজধানী। সেখান থেকে তিনি অতি সহজেই হারানো সাম্রাজ্যের প্রজাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ মুঙ্গের অথবা গোরক্ষপুরকে তার নির্বাসনের স্থান হিসেবে মনোনীত করলেন। কিন্তু পেশবা আপত্তি করলেন, মুঙ্গেরে অত্যধিক গরম এবং গোরক্ষপুরে কোনো উপাসনা মন্দির নেই, সুতরাং যেতে রাজী নন। তিনি গঙ্গা তীরবর্তী কোন স্থান এমনকি বংশানুক্রমিক শত্রুতার কেন্দ্র দিল্লীতেও যেতে রাজী ছিলেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ পেশবার রাজধানী কানপুর থেকে কয়েক মাইল দূরে বিঠোরে তাঁকে নির্বাসিত করতে মনস্থির করলেন। সেখানে পেশবাকে একটি জায়গীর দেয়া হলো। তার এবং তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য বার্ষিক ৮০ লক্ষ টাকা বৃত্তি ধার্য করা হলো। বৃত্তির ওপর নির্ভর করে তিনি দৈনন্দিন জীবন ধারণের নিষ্ক্রয়তায় অভ্যস্ত হয়ে পড়লেন। এখনো অনেক প্রজা রয়েছে যারা তাঁর প্রতি মহারাজোচিত সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। তার পুরোনো খেতাব পান্থপ্রধান এবং মহারাজ খেতাব ইংরেজ মেনে না নেয়ার ফলে তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হলেন সবচেয়ে বেশি। তাঁর সঞ্চিত অর্থ থেকে তিনি সরকারী ঋণ পরিশোধ করতে সমর্থ হলেন, কিন্তু তিনি তাঁর ঘোড়ার ঘেসুড়ের নৌকা ভাড়া দিতে অস্বীকার করলেন, কারণ তা তাঁর মতো সামন্তরাজ্যের মর্যাদার পরিপন্থী। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ রাজ্যহারা সামন্তরাজ্যের এ রকম সামান্য বিষয়ে আহত হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না। বাজীরাও এখন ইংরেজদের রীতিমতো উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। গুজব রটলো এক সময়ে তিনি নেপাল দরবারের সঙ্গে মতলব আঁটছেন। আরেক সময় ব্রহ্মদেশ এবং তিব্বতের সঙ্গে মিলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাঁর ষড়যন্ত্রের কথা ব্যাপক জনশ্রুতি লাভ করে। পেশবা বংশের কেউ দীর্ঘদিন ধরে বাঁচে না। ব্রিটিশ সরকার আশা করেছিলো যে বৃত্তির টাকাও পেশবা বেশিদিন ভোগ করতে পারবেন না, খুব শীগগিরই মারা যাবেন এবং পেশবা মারা গেলে ইংরেজদের হাড় জুড়াবে। বিঠুড়ের নিরুদ্বেগ সহজ জীবন তাঁর আয়ুসীমাকে সত্তর বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিলো। তিনি ১৮১৫ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বেঁচেছিলেন।

পেশবার কোনো পুত্র সন্তান না থাকায়, তিনি তিনজনকে দত্তক সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন। সে তিনজন হলো, ধুন্ধু পান্থ অথবা নানা, সদাশিব পান্থ অথবা দাদা এবং গঙ্গাধর রাও অথবা বালা। পেশবার মৃত্যুকালে নানা সাহেব এবং বালা সাহেব জীবিত ছিলেন। দাদা সাহেব পান্ডুরঙ্গ রাও বা রাও সাহেব নামে একটি শিশুসন্তান ফেলে আগেই প্রাণত্যাগ করেছিলেন। দু’জন নাবালিকা কন্যাসন্তান যোগ বাই এবং রুশমাবাইও বাজীরাওয়ের মত্যুর পরে বেঁচেছিলেন। পেশবার ভাই চিমনজী আপ্পার কন্যা দ্বারকা বাইয়ের সন্তানও মৃত পেশবার ওপর ভরণপোষণের জন্য নির্ভরশীল ছিলেন। ১৮৩৯ সালে দ্বিতীয় বাজীরাও লিখিতভাবে দলিল সম্পাদন করে তার খেতাব এবং জায়গীর জ্যেষ্ঠ দত্তক পুত্র নানা সাহেবকে দিয়ে যান।

নানা সাহেবের বাল্যকাল এবং শিক্ষাদীক্ষা সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না। কিন্তু তিনি ছিলেন অসাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন অনেক গুণে গুণান্বিত একজন পুরুষ। কিন্তু সমসাময়িক ইংরেজ অফিসার যারা তার সঙ্গে এসেছেন, মিশেছেন, তার মধ্যে অসাধারণত্বের কোনো সন্ধান খুঁজে পাননি। তারা তাকে একজন সাধারণ মারাঠা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অবশ্য শান্তির সময়ে নামে মাত্র মারাঠা প্রধানের দক্ষতা প্রতিনিধি এবং কর্মচারীদের জানার কথা নয়।

দ্বিতীয় বাজীরাও তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্য অনেক টাকা-কড়ি রেখে গিয়েছিলেন কিনা বলা কষ্টকর। সরকারি রেকর্ডপত্র থেকে জানা যায়, তাঁর রক্ষিত টাকার পরিমাণ কিছুতেই তিরিশ লাখের বেশি ছিলো না। নানা সাহেব এ টাকা থেকে তাঁর এবং বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের ব্যয়ভার বহন করবেন, তাই আশা করেছিলেন ইংরেজ সরকার। মুরল্যান্ড নানা সাহেবকে ভালোভাবে চিনতেন, তিনি লিখেছেন, “যদিও নানা খুব দরাজ হাতের যুবক নন এবং তাঁর কোনো খারাপ স্বভাব নেই, তবু তিনি এ আয়ের মধ্যে জীবন ধারণ করতে পারবেন না।” সরকার দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের জীবদ্দশায় পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে তাঁর মৃত্যুর পরে, উত্তরাধিকারীরা আর বৃত্তি পাবে না। এ নীতি অনুসারে তাঁরা ১৮৩২ সালে চিমনজী আপ্পার মৃত্যু হলে তাঁর বিধবা পত্নী এবং কন্যার ভাতা বন্ধ করে দিলেন।

সুতরাং বাজীরাওয়ের মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরদের ভাতাও যে বন্ধ হয়ে যাবে, তাতে আশ্চর্যের কিছুই ছিলো না। কিন্তু ব্রিটিশ উদারতা এবং ন্যায়পরায়ণতার ওপর নানা সাহেব অবিমিশ্র শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। অনেক ইংরেজ মনে করতে লাগলেন বিধিগত ব্যবস্থা যাই হোক না কেননা, পেশবার বৃত্তির কিছু অংশ অন্ততঃ তাঁর পরিবারবর্গকে প্রদান করা উচিত। নানা এবং তার সমর্থকদের যুক্তি হলো মৃত পেশবা এবং তার আত্মীয়-স্বজনের ভরণপোষণের জন্য বৃত্তি মঞ্জুর করা হয়েছিলো, জীবদ্দশায় পেশবা যতো টাকাই রেখে যান বৃত্তির প্রতি তার পরিবারের আইনতঃ দাবি রয়েছে।

দুর্ভাগ্যবশতঃ পেশবা পরিবার আবার নিজেদের মধ্যে দু’ভাগ হয়ে গেলো। দু’টি শিশুকন্যার পক্ষ থেকে তাদের পিতা বলবন্ত রাও যে দাবি করলেন, তা অধিক জোরালো হয়ে দেখা দিলো। বলবন্ত রাওয়ের পক্ষে যুক্তি হলো, হিন্দু আইন অনুসারে পিতা পুত্র-সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেলে কন্যা-সন্তানেরা পুত্র-সন্তানের মতো পিতৃসম্পত্তি দাবি করতে পারে। কন্যা-সন্তানদের দাবিকে অগ্রাহ্য করে পালিত পুত্র-পুত্রসন্তানদের দাবিকে অগ্রাধিকার দান করা কিছুতেই সঙ্গত নয়। সরকার এ আবেদন নাকচ করে দিলেন এবং জানালেন যে পেশবাই আসল এবং একমাত্র দাবিদার। এ ব্যাপারে মৃত দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের বিধবা পত্নীরা কি ভূমিকা পালন করেছিলেন সে সম্বন্ধে অমরা জানতে পারিনি। তবে সম্ভবত চিমনজী আপ্পার দৌহিত্র চিমনজী থাষ্ট্রেও একইভাবে নিজের দাবিকে উপস্থিত করেছিলেন। মৃত পেশবার চাকর-বাকর এবং আশ্রিত অনুগৃহীতরাও এ পারিবারিক বিবাদে যে ইন্ধন যোগাননি, সে কথা সত্যি নয়।

১৮৩২ সালের আইন অনুসারে, পেশবা এবং তার সঙ্গে তার জায়গীর বিড়ের মধ্যে যারা অবস্থান করছিলেন, সকলকেই আদালতে উপস্থিত না হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছিলো। কিন্তু পেশবার পরলোক গমনের সঙ্গে সঙ্গেই সে অধিকার কেড়ে নেয়া হলো। এ আঘাতও হয়তো কালের প্রভাবে মৃত বাজীরাওয়ের পরিবার কাটিয়ে উঠতে পরতো, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর পরই দেখা গেলো গোটা পরিবারের আপন বলতে এক ইঞ্চি জমি কোথাও নেই। একজন পেশবা মৃত্যুমুখে পতিত হলে ব্রাহ্মণেরা শ্রাদ্ধ উপলক্ষে পাঁচ রকমের মহাদান (হাতী, ঘোড়া, সোনা, মণি-মাণিক্য এবং জমি) তাঁর বংশধরদের কাছে পায়, এটাই হলো রেওয়াজ। কিন্তু দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের শ্রদ্ধে তাঁর বংশধরেরা চার রকমের দান ব্রাহ্মণদের করলেও জমি দিতে পারলেন না। তারা এক কণা জমির মালিক নন। এ সময়ে সর্দার রঘুনাথ রাও ভিনচরকর বিষুড়ে ছিলেন, জমি সম্প্রদান করতে না পারায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তিনি নানা সাহেবের কাছে বিনীতভাবে নিবেদন করেছিলেন, তার জায়গীর এবং যৌতুক সূত্রে প্রাপ্ত গ্রামসমূহের আসল মালিক পেশবা এবং তিনি সেখান থেকে মৃত পেশবার শ্রাদ্ধে যতো ইচ্ছা জমি দান করতে পারেন। এতে নানা সাহেব কেঁদে ফেলেন।

একটু সহানুভূতি সহকারে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যদি এসব ছোটোখাটো ব্যাপারে নজর করতেন, তাহলে অনেক অসন্তুষ্টি রোধ করতে পারা যেতো। কিন্তু তাঁদের সে মন ছিলো না। ন্যায়সঙ্গতভাবে তিনি পেশবার শীলমোহর ব্যবহার করতে পারেন। জনসাধারণের কাছে তিনি তার ন্যায্য উত্তরাধিকারী। এমন কি ইংরেজ অফিসারেরাও তাঁকে মহারাজ’ সম্বোধন না করে পারেন না। ইংরেজ কমিশনার মিেরল্যাণ্ড তাঁকে পেশবার শীলমোহর ব্যবহার করতে দিলেন না। তিনি নিজের নামে ‘পেশবা বাহাদুর’ খেতাব যুক্ত করে নতুন শীলমোহর তৈরি করলেন, কমিশনার তাতেও আপত্তি তুললেন। জানিয়ে দিলেন শীলমোহরে তিনি শুধু শ্ৰীমান নানা ধুন্ধু পান্থ বাহাদুর খেতাব ব্যবহার করতে পারবেন। বৃত্তি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ কর্তৃপক্ষের এ অপ্রীতিকর ব্যবহার তার অসন্তোষকে বাড়িয়েই তুললো।

সে সময়ে ভারতীয় দেশীয় রাজারা ভারত সরকারের পরিষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্রিটেনে কোর্ট অব ডিরেক্টর্সদের সভায় আপীল করতেন। বৃত্তিহারা সমস্ত দেশীয় রাজপুরুষদের মতো নানা সাহেবও আশা করেছিলেন, তার আবেদন বৃথা যাবে না এবং তাঁর ওপর সুবিচার করা হবে। লেফটেনান্ট গভর্ণর এবং গভর্ণর জেনারেলের কাছে আবেদন করার পরে যখন কোনো ফলোদয় হলো না, তখন তিনি কোর্ট অব ডিরেক্টর্সের সভায় আবেদন করলেন। কোর্ট অব ডিরেক্টর্সের সভা ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে রাজী না হলে তিনি লন্ডনে তাঁর একজন ব্যক্তিগত প্রতিনিধি পাঠাবার কথা স্থির করলেন।

তাঁর প্রতিনিধি আজিমুল্লাহ খান অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন। এক সময় তিনি পরিচারকের কাজ করতেন। নীচকুলে জন্ম হলেও তিনি আপন চেষ্টার বলে নিজেকে সুশিক্ষিত করে তোলেন। ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষা শিক্ষা করে তিনি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার বৃত্তি গ্রহণ করেন। যে লোক এভোগুলো বাধার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন তাঁর জন্য এ কম কৃতিত্ব নয়। তাঁর ছিলো সুদর্শন চেহারা এবং মধুর ব্যক্তিত্ব, তদুপরি আপন ব্যক্তিত্ব তিনি সুচারুভাবে কর্ষণ করতে পেরেছিলেন, সে কারণে ইংল্যান্ডে যাওয়া মাত্রই তাঁকে সম্ভ্রান্ত সমাজ অতি সহজেই গ্রহণ করলো। ব্রিটিশ অভিজাত মহিলাদের প্রীতি এবং কুমারীদের ভালোবাসা যে আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন, তাও তাঁর পক্ষে কম কৃতিত্বের কথা নয়। কিন্তু শীগগিরই আজিমুল্লাহ উপলব্ধি করলেন যে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের ঘড়েল রাজনীতিবিদদের কাছে আবেদন নিবেদন করে, তার মনিবের কোনো উপকারই করা সম্ভব হবে না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কোর্ট অব ডিরেক্টরর্সদের সভা যেমন, তেমনি মহারাণীর উপদেষ্টাবৃন্দও তাঁর মনিবের আবেদনের কোনো মূল্য দিলেন না। তিনি দেশে ফিরে আসবেন স্থির করলেন। কিন্তু অন্যান্য ভারতীয় প্রতিনিধির মতো ভারতে আসার জন্য সোজাসুজি জাহাজে চড়ে বসলেন না। তিনি শুনেছেন, মালটাতে ইংরেজ এবং ফরাসী সৈন্য সম্মিলিতভাবে রুশ সৈন্যের হাতে পরাজিত হয়েছে। জাহাজে তিনি কনস্টান্টিনোপলের টিকিট কাটলেন এবং সেখানে বিখ্যাত সাংবাদিক উইলিয়াম হাওয়ার্ড রাসেলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। রাসেল এ অনুসন্ধিৎসু তরুণ মুসলিম সম্বন্ধে লিখেছেন, “কয়েকদিনের জন্য আমি কনস্টান্টিনোপল গেলাম। সেখানে মিশরীয় হোটেলে থাকার সময়ে একজন সুন্দর ছিপছিপে চেহারার ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম কয়েকবার। গাঢ় জলপাইয়ের রঙ তাঁর শরীর। পরনে প্রাচ্যের পোশাক। আঙুলে আংটি এবং অঙ্গে নানা সুন্দর বেশভূষা। তিনি হোটেলের টেবিলে বসে খাবার খেলেন, ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায় কথা বললেন। আমি অনুসন্ধান করে জানতে পারলাম, তিনি হচ্ছেন একজন ভারতীয় রাজপুত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীল করার জন্য তিনি ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন, এখন দেশে ফিরছেন।” আজিমুল্লাহ্ ক্রিমিয়াতে যেতে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। কারণ রাশিয়ান সে সকল বীর রুস্তমদের স্বচক্ষে দেখতে চান, যাদের হাতে ইংরেজ এবং ফরাসি বাহিনী এক সঙ্গে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। তিনি নিরাপদ দূরত্ব থেকে রাশিয়ান ব্যাটারী থেকে কিভাবে গোলা নিক্ষেপ করা হয়, নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি ধর্মীয় বিধিনিষেধ একদম পালন করতেন না বললেই চলে। জন রাসেলকে তিনি বলেছিলেন, এতো বোকা নই যে আমি ওসব বাজে জিনিসে বিশ্বাস স্থাপন করবো। আমি কোনো ধর্ম মানিনে। তারপরে রাসেল তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ক্রিমিয়াতে যা ঘটছে আপন চোখে দেখার এতো গভীর আগ্রহ দেখে কি অবাক না হয়ে পারা যায়? একজন ইউরোপবাসীর এ রকম কৌতূহল থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু অসামরিক গোত্রের একজন এশিয়াবাসীর এ কৌতূহল অস্বাভাবিক নয় কি? তিনি ব্রিটিশ সৈন্যদের ভীতিবিহ্বল অবস্থায় দেখেছেন। ফরাসীদের সঙ্গে স্বাস্থ্য এবং নৈতিকতার তুলনায় তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনী সম্পর্কে খুবই নিকৃষ্ট ধারণা পোষণ করেছেন।

এদিকে নানা সাহেব ধনী ভারতীয় দেশীয় রাজার স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেছেন। তিনি স্বেচ্ছায় কানপুরের ইংরেজ অফিসারদের খাতির করতে লাগলেন। নিমন্ত্রণ করে তাঁদের বর্ধিতভাবে আপ্যায়ন করতে শুরু করেছেন। মাঝে মাঝে তিনি শহরে যেতেন। কিন্তু তার ইউরোপীয় বন্ধুরা তাঁর আদর-আপ্যায়নের প্রতিদান দিতে পারতেন না। কারণ তিনি তাদের সঙ্গে পান ভোজন করতে রাজী ছিলেন না। নির্বাসিত জীবনের একঘেঁয়েমী দূর করার জন্য নানা সাহেব কাশী, প্রয়াগ, গয়া ইত্যাদি তীর্থকেন্দ্রে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কিন্তু তার গতিবিধির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছিলো। স্থান পরিবর্তনের কারণে তার মধ্যে প্রফুল্লতার সঞ্চার হয়েছে। বাড়িতে নানা সাহেবের ঘোড়া, ভালো জাতের কুকুর, নানা রকম হরিণ এবং ভারতের নানা স্থান থেকে সংগৃহীত জীবজন্তু ছিলো। নিষ্ক্রিয় জীবনের জড়তা ভাঙ্গার জন্য তিনিও সক্রিয় আনন্দের কথা ভাবলেন। ভ্রমণোপলক্ষে তিনি ১৮৫৬ সালে লখনৌ শহরে গেলেন। কাভানাগ তাকে সেখানে দেখেছেন।

রাসেল আরো বলেছেন, তীর্থযাত্রার ছলে তিনি গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডের সমস্ত সামরিক ঘাঁটি পরিদর্শন করেছেন, এমন কি সিমলাতে যাওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। তার তীর্থযাত্রার সহগামী ছিলেন আজিমুল্লাহ খান। একজন হিন্দু তীর্থযাত্রীর প্রকৃত সঙ্গী বটে। যে সকল ইঙ্গ-ভারতীয় কর্মচারীর অনুমতি ব্যতীত নানা তার প্রাসাদ থেকে এক মাইলও ভ্রমণ করতে পারেন না, রাসেল তাঁদের অসাবধানতার নিন্দা করেছেন। এমন কি কল্পি এবং লখনৌতে কোনো হিন্দু তীর্থ নাই জেনেও গ্রীফিথ তাঁকে ভ্রমণ করতে অনুমতি দিয়েছেন। সরকারী রেকর্ডপত্রে তাঁর সফরসূচির কোনো বিবরণী পাওয়ার যায় না। তবে মার্টিনো ১৮৫৭ সালে জানুয়ারি মাসে আজিমুল্লাহ খানকে আমবালাতে দেখেছেন, তখন তাঁর সঙ্গে নানা সাহেব ছিলেন না। বলা হয়ে থাকে লখনৌতে তাঁর গতিবিধি স্যার হেনরী লরেন্সের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছিলো। এ কথা টের পেয়ে তিনি আগে-ভাগে লখনৌ ত্যাগ করে চলে যান। কিন্তু সেখানে অবস্থান কালে তিনি সামরিক অফিসারদের সঙ্গে খোলাখুলি মেলামেশা করেছিলেন। হেনরী মেটকাফের মতে, নানা সাহেব লখনৌতে সামরিক খেলাধুলায় উপস্থিত ছিলেন। এ খেলাধুলা তিনদিন স্থায়ী ছিলো। এ তিনদিন সব সময়ে আমাদের অফিসারদের সঙ্গে দুষ্ট নানা কফি ইত্যাদি পান করেছেন এবং সর্বক্ষণ বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেছেন।

ইতিমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে চিমনজী আপ্পার তরফ থেকে একখানা মামলা দায়ের করা হলো, কিন্তু তা আদালত বাতিল করে দিলো।

তখন কানপুর ছিলো একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। যে জেলার সদরে সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত ছিলো, অযোধ্যার নবাবই ছিলেন তার আসল মালিক। এ জেলার সংগৃহীত রাজস্ব থেকে একদল অতিরিক্ত ব্রিটিশ সৈন্য পোষণ করা হতো। সৈন্যদের আস্তানা ছিলো ক্যান্টনমেন্ট। এ জেলাটি ১৮০১ সালে ব্রিটিশকে ছেড়ে দেয়া হয়। গঙ্গা তীরবর্তী এ শহরটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিলো। সারা বছর ক্ষুদ্র নৌকা এবং বর্ষাকালে বড়ো বড়ো নৌকা যাতায়াত করতো এই শহরের পাশ দিয়ে। লখনৌর প্রসারমান চর্ম ব্যবসার কেন্দ্র ছিলো এ শহর। এলাহাবাদ থেকে একশ মাইল এবং লখনৌ থেকে চল্লিশ মাইল দূরবর্তী এ স্থান থেকে একদিকে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড এবং অন্যদিকে অযোধ্যার উঁচু সড়ক পাহারা দেয়া যায়। কানপুরের সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৮৭৫ সালে মে মাসে কানপুরে ৬১ জন ইউরোপীয় গোলন্দাজ, ৬টি কামান এবং ৩টি ভারতীয় পদাতিক বাহিনী ছিলো। সবশুদ্ধ সৈন্য সংখ্যা ছিলো তিন হাজারেরও কম। মেজর জেনারেল হাফ হুইলার ছিলেন দলের অধিনায়ক। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় তিনি কৃতিত্বের সাথে সামরিক বাহিনীতে কাজ করে আসছেন। তিনি লর্ডলেকের অধীনে চাকুরি করেছেন এবং ১৮০৪ সালে দিল্লী অধিকারের সময় তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ করেছিলেন। বয়স বেড়ে গেলেও পরবর্তীকালে তিনি আফগানিস্তান এবং পাঞ্জাবে যুদ্ধ করে রেকর্ড স্থাপন করেছেন। তার সুনাম সৈন্যবাহিনীতে এতো ছড়িয়ে পড়েছিলো যে দিল্লীর টিলার ওপর অল্পসংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য সব সময়েই প্রত্যাশা করেছিলো যে আর কেউ না এলেও তিনি তাদের সাহায্য করতে ছুটে আসবেন। স্যার হেনরী লরেন্সের মতে, “হুইলার হচ্ছেন সময়োচিত মানুষ, এই বিপদের সময়ে শক্তির একটি দৃঢ় মিনারস্বরূপ।”

১৪ই মে তারিখে মীরাট এবং দিল্লীর খবর কানপুরে এসে পৌঁছালো। তার ফলে সামান্য উদ্বেগেরও সঞ্চার হয়নি। এ সম্বন্ধে হুইলার পুরোপুরি সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন। ১৮ তারিখে তিনি গভর্ণর জেনারেলকে টেলিগ্রাম করে জানালেন যে কানপুরে কোনো গোলমাল হয়নি। তার অধীনস্থ সেপাইদের প্রভাবিত করার মতো অশুভ যদি কিছু না ঘটে অন্য কোথাও, তাহলেও ঘাঁটি রক্ষা করতে প্রত্যাশী। ঘাঁটি ছেড়ে যাওয়ার তো কোনো কথাই উঠে না। উত্তর-পশ্চিম ভারতের প্রদেশগুলোর মতো কানপুরের ইউরোপীয় এবং খ্রীস্টান অধিবাসীদের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। মহারাণীর ৩২নং রেজিমেন্টের অনেক অফিসার তাঁদের পরিবার-পরিজনকে লখনৌতে রেখে গেছেন। তার অধীনস্থ সেপাইরা বিদ্রোহ করলে তাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সামরিক অফিসারদের পরিবারবর্গকে নিরাপদ স্থানে প্রেরণ করার কোনো প্রচেষ্টাই হুইলার গ্রহণ করেন নি। সেপাইদের মধ্যে বৈরীভাবের সামান্যতম চিহ্নও পরিদৃশ্যমান নয়। যে হুইলার অর্ধশতাব্দী ধরে সেপাইদের সঙ্গে রয়েছেন, তিনি ভালোভাবে জানেন যে তিনি একটু অসতর্ক হলেই বিক্ষোভ ফেটে পড়তে পারে। পক্ষান্তরে তিনি যদি একটুকুও অবিচলিতভাব না দেখাতেন তা হলে একটা গুলি খরচ না করেও সেপাইদের আয়ত্বের মধ্যে রাখতে পারতেন। ১৯ তারিখে তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে এ মর্মে টেলিগ্রাম পেলেন, ক্যান্টনমেন্টে ইউরোপীয় সৈন্য আসছে এবং তাদের স্থান দেয়ার জন্য সমস্ত ব্যবস্থা করার নির্দেশ তাঁকে দেয়া হয়েছে এবং আরো নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সে খবর যেনো তিনি প্রচার করেন। সময়মতো ইউরোপীয় সৈন্য এসে পৌঁছালে খবর প্রকাশ করার পরেও হুইলারের ভয় করার মতো কিছু ছিলো না। কিন্তু এখন খবর প্রকাশ করার অর্থ হলো, সেপাইদের জানিয়ে দেয়া, সরকার তাদের প্রতিও বিশ্বাস হারিয়েছেন এবং তাদের চক্রান্ত সম্বন্ধে সজাগ হয়ে উঠেছেন। ২১শে মে তারিখে ২নং অশ্বারোহী বাহিনী অস্থির হয়ে উঠলো। গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে তাদের কাছ থেকে ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি কেড়ে নিয়ে ইউরোপীয়দের মধ্যে বিতরণ করা হবে। অবশ্য গুজবের কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিলো না। অশ্বারোহী সেপাইরা পদাতিক সেপাই ভাইদের সঙ্গে আলোচনা করতে লাগলো, ঘোড়া এবং অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার আগে তাদের কি করা উচিত।

২২শে মে তারিখে সত্যি সত্যি ৫৫ জন ইউরোপীয় অনিয়মিত অযোধ্যা অশ্বারোহী দলের ২৪০ জন অশ্বারোহীসহ এসে হাজির হলো ক্যান্টনমেন্টে। সব কিছু যদিও শান্তভাবে চলছে, তবু কানপুরের সেপাইদের মধ্যে ভেতরে ভেতরে বিক্ষোভ জমা হতে থাকে, এর জন্য সেপাইদের দোষী করা যাবে না। ইউরোপীয় ও বঙ্গ ভারতীয় সৈন্যরা অস্পষ্টভাবে বিপদের আঁচ করতে চেষ্টা করেছেন। ছাউনির সকলেই প্রত্যাশা করতে লাগলো মারাত্মক কিছু, ভয়ঙ্কর কিছু অনিবার্যভাবেই ঘটবে। কিন্তু তা কি কেউ স্পষ্টভাবে ধরতে পারছে না। দেশীয় সেপাইরা তখনো শান্ত ছিলো রোজকার মতো। তা সত্ত্বেও সকলের মনে মনে প্রবল আতঙ্ক বাসা বেঁধে আছে।

ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের ধনসম্পদ সব কিছু চাকরবাকরের হেফাজতে রেখে এলাহাবাদ চলে যাবার জন্য নৌকা ভাড়া করেছেন। প্রত্যেক লোক তার সাধ্য সঙ্গতি অনুসারে চৌকিদার নিয়োগ করতে লেগে গেলো। সংঘর্ষ যদি হয়, তাহলে অবশ্যই ছড়িয়ে পড়বে। বাইরে শান্ত অবস্থা বজায় থাকলেও ভেতরে ভেতরে সেপাইরাও কম আতঙ্কিত হয়নি। একজন তো তার বন্ধুদের বললো, সাহেব লোকেরা যেভাবে আমাদেরকে ধ্বংস করতে চায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। ৩নং কোম্পানী এবং ৬নং ব্যাটালিয়নের কামান সম্পূর্ণ তৈরি এবং অশ্বারোহী বাহিনীর ওপর গুলি চালাবার অপেক্ষায় রয়েছে। সে সেপাইকে গ্রেফতার করা হলো, বিচার করে ফাঁসিকাষ্ঠে লটকানো হলো, কিন্তু এ ঘটনা তার সাথীদের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুললো। এ সময়ে লখনৌর সৈন্যদের উপস্থিতিতে তাদের আতঙ্ক আরো বেড়ে গেলো। আবার সেপাইদের দমন করার মতো লখনৌর সৈন্যরাও সংখ্যায় যথেষ্ট নয়।

দুর্ভাগ্যবশতঃ সে সময়ে সামরিক বাহিনীর জন্য বরাদ্দকৃত কিছু পঁচে যাওয়া আটা বাজারে নিয়ে যাওয়া হলো এবং সস্তা দামে বিক্রি করা হলো। সে পুরোনো আটা দিয়ে রুটি তৈরি করলে পরে দুর্গন্ধ ছড়াতে লাগলো, তখনো স্বাভাবিকভাবেই সকলে সন্দেহ করতে লাগলো আটায় গরু-শুয়রের হাড্ডি গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেখা হয়েছে। সেপাইরা ভয়ঙ্কর রকম উত্তেজিত হয়ে উঠলো। অনুসন্ধান করে দেখা গেলো, তাদের সন্দেহ অমূলক। তাহলেও কিন্তু সন্দেহপ্রবণ ধর্মান্ধ মানুষের দ্বিধা গেলো না। তারা এজন্য শুধু দোকানদারদের একা দায়ী করলো না।

২১ তারিখে একটি বিক্ষোভ ঘটবে অনুমান করে, হুইলার আগে থেকেই তৈরি ছিলেন। কিন্তু সেদিন কিছুই ঘটলো না। তিনি সুখবরটা গভর্ণর জেনারেলকে জানিয়ে দিলেন। লখনৌ থেকে নতুন সৈন্য আসার সংবাদটা কলকাতায়ও জানিয়ে দেয়া হলো। আরো সুখের খবর বিড়ের মহারাজ ৩০০ সেপাই দু’টি কামানসহ প্রেরণ করেছেন। কলকাতা থেকে ইউরোপীয় সৈন্যেরা এসে পৌঁছালে তিনি প্রধান সেনাপতির কাছে জানালেন, আমি আশা করছি, সবকিছু ভালোয় ভালোয় কেটে যাবে। বর্তমানের অবস্থা শান্ত, পরে কি ঘটবে সে সম্বন্ধে কিছু বলা যায় না। কলকাতা থেকে ইউরোপীয় সৈন্যেরা অত্যন্ত দেরীতে এসে পৌঁছালো। কিন্তু অন্যদিকে মারাঠারা পশ্চিম দেশীয় হিন্দু এবং মুসলমান সেপাইদের প্রভুত্বসুলভ প্রভাবে ইতিমধ্যে বশ করে ফেলেছে।

এখানে অত্যন্ত একটা জরুরী প্রশ্ন উঠে। তাহলে নানা সাহেব কি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সৈন্য পাঠিয়েছিলেন? নাকি ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন? অবশ্য তিনি ইংরেজ মহিলাদের রক্ষার জন্য এবং বিস্তুড়ে তাঁদের পাঠিয়ে দেবার প্রস্তাব করেছিলেন, সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এখন কথা হলো, তিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সৈন্যদের সশস্ত্র বিদ্রোহে কোনো ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন কী না?

শেফার্ডের ধারণা হলো, অবশ্যই তিনি সশস্ত্র বিদ্রোহের সহায়তা করেছেন। কারণ তিনি লক্ষ্য করেছেন, নগরীর অনেক দেশীয় সামরিক অফিসারের সঙ্গে তার হৃদ্যতা ছিলো। তিনি ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টর মিঃ হিলাসডনকে এমনভাবে রাজী করিয়েছিলেন-বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পূর্বে, তাঁরা যেনো তাঁদের পরিবারবর্গকে তাঁর হেফাজতে প্রেরণ করেন। তাঁরা রাজী হয়েছিলেন, কিন্তু মহিলারা যেতে রাজী হননি। তাঁর ওপর এ গভীর বিশ্বাসের কারণেই নবাবগঞ্জের রাজকোষ রক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তাঁর অধীনে ৫০০ অশ্বারোহী এবং পদাতিক সেপাই ছেড়ে দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা মার্চ করে ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে গেলে তিনি তাদের সাহায্যেই অস্ত্রাগার অধিকার করেন। আমাদেরকে আরো বলা হয়েছে যে, নানা সাহেব নামে একজন বিঠুড়ের অধিবাসী এবং সরকারের ভক্ত প্রজা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সেপাইদের সঙ্গে সরকারি রাজকোষ রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে দেখে মনে হয়, তাকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা হয়েছে। তারপরে তিনি ৫০০ সৈন্য এবং ২টি ক্ষুদ্র কামানসহ রাজকোষের পাশাপাশি একটি বাঙলোতে গিয়ে উঠলেন। এ সময়ে হিলার্সডনের কথাকে বিশ্বাস করা যেত। কিন্তু পরিখা বেষ্টিত অবস্থায় তাঁকে নানা রকম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। ম্যারী থমসন ছিলেন বিদ্রোহের পরে জীবিত চারজনের একজন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “ম্যাজিস্ট্রেট নানা সাহেবকে রাজকোষের দায়িত্ব গ্রহণ করতে আমন্ত্রণ করেছিলেন। এ সময়ে হিলার্সর্ডনের ওপর প্রায় এক লক্ষ পাউন্ডের মতো অর্থ রক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিলো। তিনি মেজর হুইলারের সঙ্গে আলোচনা করে বিঘুড়ে নানা সাহেবের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন। দেহরক্ষীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে এলেন। রাজকোষ রক্ষা করার জন্য দু’শ অশ্বারোহী সেপাই এবং চার’শ পদাতিক বাহিনী নিয়োগ করা হলো। সে সঙ্গে রইলো মহারাজের নিজের সৈন্যদল। সৈন্য শিবিরের থেকে পাঁচ মাইল দূরে ছিলো রাজকোষ। বিঠুড়ের সৈন্যদল এবং ৫৩নং দেশীয় পদাতিক বাহিনীর উপর রাজকোষ রক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হলো। তা ছাড়া স্বয়ং নানা সাহেবও ক্যান্টনমেন্টের সিভিল লাইনে অবস্থান করতে লাগলেন। এ ভদ্রলোক এতো বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছিলেন যে তাঁর সম্বন্ধে কোনো রকমের সন্দেহ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের মনে উদিত হয়নি। তখন হিলার্সড়ন কিংবা হুইলারের দু’জনে নানা সাহেবকে সন্দেহ করেননি, তাঁর কোনো কারণও ছিলো না।

স্বভাবতঃই স্যার হাফ হুইলার শহর এবং সেপাই লাইনের খবর জানার জন্য কিছু সংখ্যক গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁরা তাঁদের সংবাদ শুধু মাত্র সেনাপতিকেই জ্ঞাত করেননি, নিজেদের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও এ নিয়ে গল্প গুজব করেছেন। তার ফলে কিন্তু কম ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়নি। ২৪ তারিখে একটি নিশ্চিত বিদ্রোহের আশঙ্কা করা গিয়েছিলো, কিন্তু সেদিন কিছুই ঘটলো না। ইউরোপীয় এবং ইঙ্গ-ভারতীয়দের কাছে সেপাইরাই একমাত্র ভয়ের কারণ নয়, দুর্ধর্ষ গুর্জরদের ভয়ে তারা ক্ষণে ক্ষণে শঙ্কিত হয়ে উঠতে থাকলো। সর্বক্ষণব্যাপী উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা এবং অব্যবস্থিত চিত্ততার কারণে অনেকেই কাণ্ডজ্ঞান এবং সাহস হারিয়ে ফেলেছিলেন। এ উৎকণ্ঠাজনক পিরিস্থিতির মধ্যে তারা যে কোনো কাজ করতে পারতেন। তাঁদের মধ্যে একজন স্বদেশে লিখেছেন, “আমার একমাত্র ইচ্ছা হলো আমার রেজিমেন্টসহ অথবা একা আমাকে এ সকল লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হোক। যাতে করে যে সকল লোক আমাদেরকে এতোকাল ধরে উৎকণ্ঠাজনক পরিস্থির মধ্যে রেখেছে। তারা আমাদের সঙ্গে থাকতে চায় নাকি বিরুদ্ধাচরণ করতে চায় সে সম্বন্ধে আমরা নিশ্চিত হতে পারি। ৩০শে মে তারিখে কর্ণেল এওয়ার্ট লিখেছেন, আমি দুঃখিত হয়ে লিখতে চাইনে, আমরা চরম বিপদের মধ্যে পড়েছি সে সম্বন্ধে রাখা ঢাকা করে কোনো লাভ নেই। আমি আগেই বলেছি, সেপাইরা যদি বিদ্রোহ করে, তাহলে নিশ্চিতভাবে আমাকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে। তবে এ সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত যে তারা ইউরোপীয় সৈন্যদের আক্রমণ করতে সাহস করবে না। মিসেস এওয়ার্ট নারীমনের সূক্ষ্মতার সাহায্যে আরো নিখুঁতভাবে পরিস্থিতি যাচাই করেছেন। তিনি লিখেছেন, একটা মাত্র স্ফুলিঙ্গ উড়ে এসে পড়লেই সমস্ত পদাতিক এবং অশ্বারোহী রেজিমেন্টগুলো বিদ্রোহ করবে। যেখানে পরিখা বেষ্টিত অবস্থায় আমরা আছি, সেখানে ছটি কামান আছে। তার ফলে আমরা রক্ষা পেলেও আমাদের অফিসারদের প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে। গোপন করে লাভ নেই, সমস্ত সেনাবাহিনীতে আমার স্বামীকেই সর্বাধিক বিপদের ঝুঁকি ঘাড়ে নিতে হবে।

সে আকাক্ষিত স্ফুলিঙ্গটি ছড়িয়ে দিলো একজন অফিসার। তিনি মাতাল অবস্থায় ২নং অশ্বারোহী বাহিনীর কয়েকজন সেপাইকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লেন। তাকে কোর্ট মার্শালের সামনে হাজির হতে হলো। কিন্তু এ যুক্তিতে তাকে ছেড়ে দেয়া হলো যে তিনি মাতাল ছিলেন, স্বাভাবিক বোধ তাঁর ছিলো না। এটা একটা মহৎ উদারতা। আইনে মাতাল অবস্থার জন্য রেহাই দেয়ার কোনো শর্ত নেই। তার ফলে সেপাইদের মনের সন্দেহ আরো দৃঢ় হলো যে তাদের অফিসারেরা তাদের গুরুতর শাস্তি দেয়ার জন্য মতলব ফাঁদছেন। শেফার্ড কিছু সংখ্যক ক্রুদ্ধ ঘোড়সওয়ার সেপাইয়ের দেখা পেয়েছিলেন। তারা মনের এ ভাব গোপন করেনি। একজন অভিযোগ করলো যে গরু এবং শূয়রের চর্বি মিশ্রিত কার্তুজ তাদের দিয়ে ব্যবহার করাতে ব্যর্থ হয়ে অফিসারেরা প্রতিহিংসার বশে রুঢ়কি থেকে গরু এবং শূয়রের চর্বি মেশানো আটা আমদানি করেছেন ধর্মনাশ করার জন্য। আরেকজন নালিশ করলো, অফিসারদের মনে দুরভিসন্ধি না থাকলে তারা কেন পরিখা বেষ্টিত অবস্থার মধ্যে রয়েছেন? আরেকজন বললো, অফিসারদের উপর আর কোনো বিশ্বাস নেই, কারণ তারা অস্ত্রাগার এবং রাজকোষে দেশী অফিসারদের বদলে ইউরোপীয় প্রহরী নিয়োগ করার চেষ্টা করছে। মিরাটের অশ্বারোহী সেপাই যারা কার্তুজ দাঁতে কামড়াতে অস্বীকার করছে, তাদের সঙ্গে কী রকম ব্যবহার করা হয়েছে, সে সম্বন্ধেও আলোচনা করা হলো। ইউরোপীয়ান সৈন্য কানপুরে এসে পড়লে আমাদের সঙ্গেও একই রকম ব্যবহার করা হবে। আমরা ততোক্ষণ অপেক্ষা করবো না। আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েক রাত আগে আমাদের একজনকে টহল দেবার সময় একজন অফিসার গুলি করে হত্যা করেছে। কোর্ট রায় দিয়েছে অফিসারটি পাগল। আমাদের একজন যদি কোনো ইউরোপীয় অফিসারের উপর গুলি ছুঁড়তো তাহলে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হতো। এটাই হলো সেপাইদের চরমতম ক্ষোভের কারণ, কিন্তু তৃতীয় রাতও শান্তভাবে অতিবাহিত হয়ে গেলো।

যে পরিখাবেষ্টিত শিবির সেপাইদের মধ্যে এত বেশি অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে, আদতে তা সুরক্ষিত এবং দুর্ভেদ্য নয়। দু’টো ইষ্টক নির্মিত ইটের ব্যারাক মাত্র। একতলা আবার খড়ের ছাউনি। চারপাশে পরিখাও যথেষ্ট গভীর নয়। দেয়াল উঁচু এবং মজবুত নয়, হাল্কা। আজিমুল্লাহ্ একে উপহাস করে বলেছিলেন, ‘হতাশার দুর্গ’। এটা স্যার হুইলারের অস্থায়ী বাসস্থান হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছিলো। গোয়েন্দাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, সেপাইরা বিদ্রোহ করলে এদিকে আক্রমণ করবে না, সোজাসুজি দিল্লী অভিমুখেই অভিযাত্রা করবে। কারণ কানপুরের ইংরেজ এবং খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের কোনো বিদ্বেষ নেই, কড়া আক্রমণের মুখে দুর্গের প্রতিরোধ গুড়ো হয়ে যাবে, বেসামরিক কর্মচারির দৃষ্টিভঙ্গী অনুসারে অস্ত্রাগার নিরাপদ স্থানেই অবস্থিত রয়েছে। কিন্তু স্যার হাফ হুইলার সেপাই লাইনের চাইতে দূরে যেতে চাইলেন না। সে জন্য সে ইটের একতলা দালানেই ঘুমোত নির্দেশ দিলেন। তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে সেপাইদের সন্দেহ নিরসন করতে চেষ্টা করেছিলেন এবং ইউরোপীয় অধিবাসীদেরকে হঠাৎ বিক্ষোভে ফেটে পড়লে তাড়াতাড়ি কোনো নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। প্রত্যেক বিপদ সঙ্কেত শুনেই শাসকগোষ্ঠির নারী এবং শিশুরা পরিখার অভ্যন্তরে চলে আসতো। বিপদ সঙ্কেত মিথ্যা প্রমাণিত হলেই আবার তারা গৃহে প্রত্যাবর্তন করতো। সেপাইরা এ সিদ্ধান্তে এলো যে অফিসারদের তাদের প্রতি আর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। কোন দৃঢ় নীতি অবলম্বন করলে, কানপুরকে হয়তো রক্ষা করা সম্ভবপর হতো। যদি হুইলার ইউরোপীয় সামরিক, বেসামরিক অধিবাসীদের নিয়ে অস্ত্রাগার দখল করে ফেলতেন তাহলে সেপাইরা এভাবে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি করার জন্য সাহসী হতে পারতো না। তিনি যদি ভারতীয় সৈন্যদের সম্মানের ওপর নিজের বিশ্বাস স্থাপন করতেন, তাদেরকে অত্যাচার না করার নিশ্চয়তা দিতেন, তাহলে অবস্থা আয়ত্বের মধ্যে আসতে পারতো। শান্তির পর্দার অন্তরালে অবিশ্বাস এবং অর্ধবিশ্বাসে এ মিশ্রিত নীতি কোনো কাজে আসেনি। খোলামেলা আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সবকিছু নিষ্পত্তি করার সময় অতীত হয়ে গেছে।

৩০ মে তারিখে স্যার হাফ হুইলার মহারাণীর ৩২নং রেজিমেন্টকে লখনৌতে পাঠিয়ে দিতে মনস্থ করলেন। কারণ এখনো কানপুর শান্ত আছে, কিন্তু সেখানে বিদ্রোহের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখনো তাঁর নিজস্ব বাহিনী তাঁর সঙ্গে রয়েছে। তা ছাড়া আছে মহারাণীর ৮৪নং পদাতিক বাহিনীর কতিপয় সৈন্য এবং অফিসার। তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদলে বিভক্ত হয়ে কলকাতা থেকে এসেছিলেন। ৩০ মে তারিখে লখনৌতে প্রকাশ্য বিদ্রোহ দেখা দিলো এবং ৩রা মে তারিখে ২জন অফিসার এবং ৫০জন সৈন্য সেখানে পাঠানো হলো। হুইলার লর্ড ক্যানিংকে লিখেছিলেন, “আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি। আরো ইউরোপীয় সৈন্য না আসা পর্যন্ত আমার নিজের সৈন্য নিয়ে আমি প্রতিরক্ষা করে যাবো বলে স্থির করেছি।” সেদিন বিকেলবেলা খবর পৌঁছালো যে একটি অভ্যুত্থান অত্যাসন্ন হয়ে পড়েছে। যারা ওতে যোগ দেবে না, তাদেরকে পরিখা দুর্গের অভ্যন্তরে চলে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পরের দিন রাজকোষ থেকে এক লাখ টাকা ওঠানো হলো। পরিখার ভেতরের সকলকে এক মাসের টাকা অগ্রিম দেয়া হলো। এ কাজ বিদ্রোহের পূর্বে সঙ্কেত হিসেবেই কাজ করেছে। উত্তেজিত সেপাইরা শেফার্ডকে বলেছে, ইউরোপীয় সৈন্য আসা পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবে না, বাস্তবে করেওনি।

৪ তারিখ রাতের শেষ দিকে সেপাইরা বিদ্রোহ করলো। অনেক দিনের উৎকণ্ঠারও অবসান ঘটলো।

মনে হয়, অশ্বারোহী বাহিনীই বিদ্রোহে নেতৃত্বদান করেছিলো। শীগগির তারা ১ম পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিলো। কিন্তু তারা অফিসারদের ওপর কোনো রকম হামলা করেনি। ৫ তারিখে সকাল পর্যন্ত ৫৩ এবং ৫৬ নং রেজিমেন্ট লাইনে ছিলো। কিন্তু শীগগির ৫৬নং রেজিমেন্ট তাদের সেপাই ভাইদের ডাকে সাড়া দিলো। এ সম্বন্ধে থমসন লিখেছেন,সেনাপতির ভুলবশতঃ তাদের ওপর গুলি চালানো পর্যন্ত ৫৩নং রেজিমেন্ট স্থির ছিলো। এই কাজের ফলাফলের কথা চিন্তা করে আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম। সেপাইরা শান্তভাবে তাদের লাইনে অবস্থান করছিলো, কেউ কেউ পাক চড়িয়েছে, বিদ্রোহ করার কোনো লক্ষণ পর্যন্ত নেই। বিদ্রোহীরা তাদের সঙ্গে যোগ দিতে বার বার অনুরোধ করেছে, কিন্তু তাতে তারা কর্ণপাত করেনি। যখন স্যার হাফ হুইলারের নির্দেশে ব্যাটারী থেকে তাদের গোলাবর্ষণ করা হতে থাকলো, বলতে গেলে তখই তারা বিদ্রোহে যোগ দিয়েছে। তারা আগে পরিখা ও প্রাকারের অভ্যন্তরস্থ দেশী সেপাইদের আহ্বান করেছিলো! কিন্তু তাদের সকলেই শেষ পর্যন্ত আমাদের পক্ষে ছিলেন। ১৫০ জন প্রাইভেট সেপাই ছাড়া তাদের আর বাকী সকলে ছিলো গোলন্দাজ বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত। ৫৩নং রেজিমেন্টের যে দলটিকে রাজকোষ রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিলো, তারা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চার ঘণ্টা কঠোর সংগ্রাম করেছে। দূর থেকে আমরা তাদের বন্দুকের শব্দ শুনতে পেলাম, কিন্তু তাদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারলাম না। এই রাজভক্ত রেজিমেন্টের অবশিষ্ট সেপাইরা শেষ পর্যন্ত তাদের অফিসারদের হয়ে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত ছিলো। পরিখা থেকে ছ’শ গজ পূর্বদিকে তাদেরকে রাখা হয়েছিলো। ব্যারাকে আগুন না ধরা পর্যন্ত তারা নয় দিন তাদের অবস্থান রক্ষা করেছিলো। স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে তাদেরকে পরিখা প্রকারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। কিছু টাকা এবং বিশ্বস্ততার একখানা সার্টিফিকেটসহ বিদায় করে দেয়া হলো। স্যার জর্জ ফরেস্ট অবশ্য শেফার্ডের কথার উপর নির্ভর করে হুইলারের এ কাজের প্রতিবাদ করেছিলেন। কানপুর বিদ্রোহের ঘটনাবলী সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অল্প; তবু আমরা নিশ্চিত যে বিদ্রোহ হয়েছিলো, জুন এবং জুলাই মাসের নিমর্ম হত্যাকাণ্ডের কথাও সত্য। সেপাইরা রাজকোষ অভিমুখে ধাওয়া করলো। তালা ভেঙ্গে তারা রাজকোষ লুট করলো। কারাগারও আক্রমণ করা হলো, তারপরে বন্দীদের মুক্তি দেয়া হলো। তারপরে তারা দিল্লীর পথে মার্চ করে গেলো এবং কল্যাণপুরে গিয়ে থামলো। আকস্মিকভাবে সেপাইরা যখন কানপুরে ফিরে এলো, তখন নানা সাহেব জেনারেল হুইলারকে লিখে জানালেন যে তিনি পরিখা প্রাকার আক্রমণ করতে যাচ্ছেন, এ থেকে জেনারেল হুইলারের ভবিষ্যদ্বানী সত্য মনে হয়। মধ্যবর্তী সময়ে কি ঘটেছিলো? তাঁতিয়া টোপী নানাকে বলপূর্বক সেপাইদের সংগ্রামের নেতৃত্বদান করতে বাধ্য করেছিলেন। প্রথমে তিনি দিল্লী যেতে কিংবা কানপুরে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজী হননি। পরে তাঁর ওপর জোর প্রয়োগ করে তাকে রাজী করানো হয়েছিলো। ব্রিটিশ সরকার কোনো বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে তোপধ্বনি করার জন্য দ্বিতীয় বাজীরাওকে দুটো কামান উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের কাজে সেগুলোকে একেবারেই অকেজো বলা চলে। নানার অধীনে যে সকল সেপাই ছিলো তাদের সর্বমোট সংখ্যা ছিলো তিন’শ, তারা তিনটি পদাতিক এবং একটি অশ্বারোহী রেজিমেন্টকে বাধা দিতে পারতো তা বিশ্বাস করা কষ্টকর। সুতরাং তাতিয়া টোপী বাধ্য করেছে বলে গুজব শোনা যায়, তার মধ্যে কিছু পরিমাণ সত্য থাকলেও থাকতে পারে। একবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে নানার সেপাইরা ইন্দোর এবং গোয়ালিয়রেযেমন হয়েছে, তেমনিভাবে সেপাইদের সঙ্গে হাত মিলাতে পারতো।

অন্য বর্ণনা থেকে জানা যায়, দেশীয় কিছুসংখ্যক অফিসারের একটি প্রতিনিধিদল নানার সঙ্গে দেখা করে জানান যে গোটা একটা রাজত্ব তার জন্য অপেক্ষা করে আছে, তিনি যদি গ্রহণ না করে শত্রুর পক্ষ সমর্থন করেন তাহলে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। সম্ভবতো নানা দু’দিক চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের টোপই গিলেছিলেন। এর সঙ্গে তাঁতিয়া টোপী তাঁকে জোর করেছিলেন বলে যে বণর্না আছে, তার কোনো মিল নেই। নানা চরিত্র সম্বন্ধে অল্প হলেও যেটুকু জানতে পারা যায় তার সঙ্গেও কোনো সঙ্গতি নেই। তবে এ দু’টো গল্পের মধ্যে কোনটা সত্য সে সম্বন্ধে আমাদের মতামত ব্যক্ত করার কোনো অবকাশ নেই। নানা নিজে সেপাইদের কল্যাণপুর গিয়ে তাদেরকে ফিরে আসতে প্রলুব্ধ করেছিলেন, না কি তাঁর প্রতিনিধি কল্যাণপুরে সেপাইদের সঙ্গে দেখা করে, অতিরিক্ত পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে পরিখা প্রকারের অল্প সংখ্যক ইংরেজ সৈন্যকে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করেছিলেন, সে সম্বন্ধে কোনো কিছু নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। নানক চাঁদ নামে নানা সাহেবের এক চরম শত্রুর মতে, মারাঠা রাজপুত্রদের সঙ্গে সেপাই নেতৃবৃন্দের দীর্ঘদিন থেকে যোগাযোগ ছিলো। বিদ্রোহ হওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে তাদের কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু শেরারের মত হলো, পূর্বাহ্নে সেপাইদের সঙ্গে নানার কোনো স্পস্ট যোগাযোগ ছিলো না। তাই যদি থাকতো, তাহলে রাজপথে গিয়ে প্ররোচিত করে; অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনতে হতো না। থর্ণহিলও ভিন্নভাবে একই সিদ্ধান্তে এসেছেন, তিনি বলেন, “নানার সঙ্গে সেপাইদের কোনো যোগাযোগ থাকলে তারা দিল্লী অভিমুখে ধাওয়া করতো না। কর্ণেল উইলিয়াম কানপুর বিদ্রোহ সম্পর্কে তদন্ত করেছেন, কিন্তু তিনি নানার সঙ্গে সেপাইদের কোনো ষড়যন্ত্র কিংবা পূর্ব সম্পর্ক খুঁজে পাননি। ঘটনার গতি থেকে এটুকু অনুমান করা যায় যে সেপাইরা সম্ভ্রান্ত বংশের কোনো নেতার প্রয়োজন অনুভব করছিলো। সে কারণে ভয় এবং প্রলোভন দু’টিই নানার চোখের সামনে তুলে ধরেছিলেন, প্রথমে তিনি দ্বিধা করেছিলেন, পরে অবশ্য তিনি তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ১৮৫৯ সালে লিখিত এক পত্রে নানা স্বীকার করেছেন যে তখন তিনি এবং তার পরিবার ছিলো সেপাইদের কৃপার উপর নির্ভরশীল। সেজন্য তিনি তাদের সঙ্গে যোগ দিতে রাজী হয়েছেন। জনশ্রুতি আছে, দিল্লী যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু আজিমুল্লাহ্ তাকে এই বলে বুঝিয়েছিলেন যে দিল্লীতে তিনি প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন না, কিন্তু কানপুরে তিনি প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করতে পারবেন। তারপরে সেপাইরা শহরে ফিরে এসে ধনী ব্যক্তিদের বাড়ি আক্রমণ করতে লাগলো। নানা পরিখা প্রাচীর আক্রমণ করবেন, এ খবর হুইলারকে কেননা জানিয়েছিলেন তা ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রতিদিন পরিখা প্রকারের ওপর কামানের গোলা ছোঁড়া হতে লাগলো। বিদ্রোহীদের সুযোগ-সুবিধা যথেষ্ট থাকলেও তারা একটাও প্রধান আক্রমণ পরিচালনা করেনি।

হতাশার দুর্গে আশ্রিত যারা তার মধ্যে অধিক হচ্ছে নারী এবং শিশু। প্রত্যেক সক্ষম পুরুষ মানুষ ছুটির সময়ে হলেও যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক ছিলেন। তা ছাড়া, অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের রাতদিন অত্যন্ত সতর্কভাবে থাকতে হতো। স্যার হাফ হুইলারও বৃদ্ধ বয়সের জন্য যুদ্ধের পুরোপুরি দায়িত্ব বহন করতে পারছেন না। অনেক ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত তরুণ সুদক্ষ ক্যাপটেন মুরকেই বহন করতে হচ্ছে। অস্ত্রশস্ত্রের কোনো অভাব নেই। একেক জন সৈন্যের জন্য তিনটা থেকে সাতটা এমনকি আটটা পর্যন্ত বন্দুক বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য সরবরাহও হয়ে উঠছিলো না। খুব শীগগির খাদ্য নিঃশেষ হয়ে এলো। তারপরে সকলে দিনে একবেলা আহার করতে লাগলেন। খাদ্যের অভাব মেটানোর জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা করা হলো। একাধিকবার ব্রাহ্মণী ষাড় চরতে এলে গুলি করে মারা হলো। কিন্তু জন্তু শিকার করার চেয়ে প্রাকারের ভেতরে নিয়ে আসাই হচ্ছে সবচেয়ে কষ্টকর। যাহোক ষাঁড়ের মাংস দিয়ে তাড়াতাড়ি সূপ তৈরি করা হলো। সে মাংসের পরিমাণ এতো কম যে বাইরের পোস্টে পাহারা রত মানুষের ভাগে একটুকু মাংসও পড়লো না। একবার একটা ঘোড়ার মাংস দিয়েও অনুরূপ সূপ তৈরি করা হয়েছিলো, কিন্তু মহিলারা ঘোড়ার মাংস খেতে রাজী হলেন না। ক্যাপটেন হ্যালি ডে ঘোড়ার সূপ বানানোর সময়ে বিদ্রোহীদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। এমন কি দেশী পেঁকি কুকুরের মাংস খেয়েও জীবন ধারণ করতে হয়েছে।

ব্যারাকের হাল্কা দেয়াল জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে কোনো বাধা দিতে পারলো না। অনেকেই গর্মী রোগে প্রাণ হারালো। বন্দুক ধরা অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো অনেক সময়। দ্বিপ্রহরের প্রচণ্ড গরমে বন্দুকের ক্যাপে বিস্ফোরণ হয়ে যেতো। অথবা অসহ্য গরমের জন্য নল স্পর্শ করা যেতো না। প্রচণ্ড উত্তাপে শীগগিরই মরা জন্তু জানোয়ারের শরীর থেকে গন্ধ ছুটতে লাগলো। বাতাস দূষিত হয়ে উঠলো। অবরুদ্ধ প্রাকার বাসীদের জীবন অতীষ্ঠ হয়ে উঠলো।

শুধু খাদ্য নয়, পানীয় জলেরও অভাব পড়েছে। দুর্গ প্রকারের একমাত্র কুয়োর কোনো ঢাকনা ছিলো না। কেউ পানি আনতে গেলে সেপাইরা তাদের উপর গুলি করে। এমন কি গভীর রাতেও পানি আনা সম্ভব ছিলো না। এক বালতি পানির মূল্য ছিলো দশ থেকে বারো শিলিং। জন ম্যাক কিলপ নামে একজন বেসামরিক কর্মচারি নিজেকে কুয়ো ক্যাপটেন’ বলে ঘোষণা করে কষ্টেসৃষ্টে পানি এনে দুর্বল অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করতে লাগলেন। তিনি অনেকবার পানি আনতে সমর্থ হলেন, কিন্তু একবার গিয়ে গুলির আঘাতে আহত হলেন এবং তার একটু পরেই প্রাণত্যাগ করলেন। মারী থমসনের ভাষায়, মহিলা এবং শিশুরা ভয়ঙ্করভাবে জলকষ্ট ভোগ করতে লাগলো। পুরুষ মানুষেরা জলকষ্ট বিশেষ করে শিশুদের পানি পানি’ বলে চীৎকার কিছুতেই সহ্য করতে পারতেন না। অনেক সময় বিপদের কথা জ্ঞান না করে ছুটে যেত। বহু কষ্ট করে অল্প পরিমাণ পানি সংগ্রহ করা যেতো। আমি নিজে দেখেছি, আমার ভায়ের ছেলেমেয়েকে জলের বদলে পুরোনা জলের ব্যাগের এক টুকরো চামড়া চুষতে দেয়া হয়েছিলো।

অবরোধ করার এক সপ্তাহ পরেই অবরুদ্ধ ব্যক্তিবৃন্দ এক ভয়াবহ বিপত্তির সম্মুখীন হলেন। গুলি বা অন্য কিছু থেকে ব্যারাকের খড়ের চালে আগুন ধরে গেলো। তারই তলায় অসুস্থ লোকেরা ঠাঁই নিয়েছে। আগুন নেভাবার জন্য সাধ্যমতো সকল রকমের চেষ্টা করা সত্ত্বেও গোলন্দাজ বাহিনীর দু’জন সৈন্য আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেলো। সমগ্র ব্যারাক পুড়ে যাওয়ার দরুন আহতদের কোনো ঔষুধপত্র দেয়াও সম্ভবপর হয়নি। তৃষ্ণার্তদের জলের জন্য কাতরানি, জ্বরের উত্তাপ এবং দগ্ধীভূত শরীর এসব দেখলে বুক ভেঙ্গে যায়। আমরা কি করবো জানতাম না। মাথায় উপরের ছাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে কোনো মহিলা পরিখার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানে মাটির উপর তাঁদেরকে ঘুমোতে হতো।

সবসময় মানুষ মরছে। মেজর লিন্ডসে একটা গুলির আঘাতে অন্ধ হয়ে কদিন পরেই মারা গেলেন। তার একদিন কি দু’দিন পরে তাঁর স্ত্রীও মারা গেলেন। হেভারডেন এক মহিলাকে কিছু পানি দেয়ার সময় আহত হলেন, এক সপ্তাহ অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগে প্রাণ হারালেন। লেফটেনান্ট এফফোর্ড বারান্দায় উপবিষ্ট অবস্থায় গুলির আঘাতে নিহত হলেন। মিসেস হোয়াইট দু’বাহুর আড়ালে দুটি যমজ শিশু নিয়ে স্বামীসহ দেয়ালের পাশে হাঁটছিলেন। মাত্র একটি গুলি তাঁর স্বামীকে নিহত করলো এবং তার দুটি বাহু ভেঙ্গে দিলো। ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ হিলার্সর্ডন বারান্দায় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময়ে আহত হলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মারা গেলেন। সেনাপতির সন্তান লেফটেনান্ট হুইলার পরিখাতে আহত হয়েছিলেন। তিনি তার কক্ষে একটি সোফার উপর উপবিষ্ট অবস্থায় গুলি খেয়ে বৃদ্ধ বাবা এবং বোনের সামনে ধড়ফড় করে মারা গেলেন।

ইউরোপীয় অফিসারদের ভারতীয় পরিচারকেরাও তাদের প্রভুদের দুঃখে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। পরিখা প্রাকারে যে সকল ভারতীয় পরিচারক ছিলো, তাদের সংখ্যা অল্প ছিলো না। থমসন বলেন, লেফটেনান্ট ব্রিজকে সাহায্য করবার সময় গুলির আঘাতে তাদের তিনজনেই প্রাণ হারায়। লেফটেনান্ট গোডের এক চাকর কিছু খাবার হাতে এক ব্যারাক থেকে অন্য ব্যারাকে যাবার সময় মাথায় গুলি লেগে প্রাণ হারায়। আরো বহু ভারতীয় চাকর মারা যায়।

মৃতদেহ ভালোভাবে সমাহিত করার অবকাশ কই? কোনো রকমে রাতের বেলা একটু গর্ত খুঁড়ে চাপা দিলেই হলো। প্রথম সকালের প্রথম নিহত লাশকে কফিনে ঢেকে সমাহিত করা হয়েছিলো। তার পরে আর কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধিস্থ করা হয়নি।

মানুষ যখন মানুষের বুকে মৃত্যুবাণ ছুঁড়ে মারছে, তখনো প্রকৃতি তার সৃষ্টিকার্য বন্ধ করেনি। এই ভয়ংকর দুঃসময়েও শিশু জন্ম নিচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। কিছুসংখ্যক গর্ভবতী মহিলা মাতৃত্বের সংকটকালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ছেলেমেয়েরা মা বাবাদের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাইরের বিপদ সম্পর্কে অজ্ঞান এবং ভেতরের একটানা একঘেঁয়ে জীবনে বিরক্ত হয়ে মা-বাবার দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে তারা দেয়ালের বাইরে চলে আসতো। কিন্তু গুলি নারী-পুরুষ, শিশু এবং বৃদ্ধের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করতো না।

এ ছিলো এক ভয়ংকর যুদ্ধ। এতে অতীত প্রথা এবং মানবিক আইনের প্রতি কোনো শ্রদ্ধাই প্রদর্শন করা হয়নি। দু’পক্ষের কোনো পক্ষই অপর পক্ষের বন্দীকে রেহাই দেয়নি। অবরুদ্ধদের হাতে প্রথমে যে বিপক্ষের সেপাইটি ধৃত হয়েছিলো, সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলো। ম্যারী থমসন লিখেছেন, “এটা আমাদের কাছে আকাঙ্ক্ষিত ছিলো না। আমরা কিছুতেই চাইনি যে আমাদের এ দুরবস্থার কথা বিদ্রোহীরা জানতে পারুক। এ ভুলের প্রতিকার স্বরূপ সিদ্ধান্ত নিলাম, ভবিষ্যতে কোনো সেপাইকে বন্দী করা হলে সদর দপ্তরের অনুমতি না নিয়েই হত্যা করবো।”

অল্প সংখ্যক রসদপত্র এবং উপাদান নিয়ে ক্রমশঃ ক্ষীয়মাণ প্রতিরক্ষা বাহিনী অনির্দিষ্ট কালের জন্য রুদ্ধ অবস্থায় থাকতে পারে না। যদিও পূর্বদিক থেকে ইউরোপীয় সৈন্যের আগমন সম্ভব, তবু কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন। হয়ে গেছে। লখনৌ হচ্ছে একমাত্র স্থান যেখান থেকে অবরুদ্ধরা অবিলম্বে সাহায্য চাইতে পারে। লখনৌতে জেনারেল হুইলার অবরোধের ২য় সপ্তাহেই সাহায্যের জন্য আবেদন করেছেন। “আমরা গত ৬ তারিখ থেকে নানা সাহেব কর্তৃক অবরুদ্ধ অবস্থায় আছি। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে ৪ঠা মে তারিখের বিদ্রোহী সব দেশীয় সেপাইরা।” শত্রুর কাছে ২টা ২৪ পাউন্ড গুলি ছোঁড়ার মতো কামান এবং আরো কয়েকটি কামান রয়েছে। আমাদের কাছে আছে মাত্র ৯ পাউন্ড গুলি ছোঁড়ার মতো আটটি কামান। সমস্ত খ্রীস্টান অধিবাসীরা অমাদের সঙ্গে রয়েছে পরিখা প্রাচীরের অন্তরালে। আমরা অত্যন্ত মহৎ এবং বিস্ময়করভাবে প্রতিরক্ষা করে আসছি। আমাদের ক্ষয়ক্ষতি সীমাহীন এবং মর্মন্তুদ। আমরা সাহায্য চাই, সাহায্য, সাহায্য। যদি মাত্র দু’শ মানুষ আমরা পাই তাহলে বদমায়েশদের শায়েস্তা করতে পারি এবং তোমাদের সাহায্য করতে পারবো। কিন্তু লখনৌরও নিজস্ব অসুবিধা রয়েছে। এখন লখনৌ কর্তৃপক্ষ একজন সৈন্যকে বাইরে যেতে দিতে পারেন না। এখনো অবরোধ কাজ শেষ করা হয়নি, শত্রুসৈন্য খুব দূরে নয়। হেনরী লরেন্স এবং তাঁর উপদেষ্টাবৃন্দ কানপুরের তাদের দেশীয় ভাইদের ভগবানের দয়ার উপর সোপর্দ করলেন। স্যার হেনরী লরেন্স লিখলেন, “আমরা এখানে শক্তিশালী, কিন্তু নদী পার হয়ে আপনাদের সাহায্য করতে গেলে আমরা একটা বিরাট প্রতিরোধের সুযোগ হারাবো। আমাকে স্বার্থপর মনে করবে না।” সুতরাং গভর্ণর জেনারেল সাহায্যের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া ইউরোপীয় সৈন্যদের সামনে আর কোন পথ খোলা রইলো না। শত্রুদের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

জেনারেল হুইলার কিন্তু আশা ছাড়লেন না। ছাউনিতে ছিলো অনেক ইউরোপীয় লোক তারা স্থানীয় ভাষা ভালো রকমভাবে বলতে পারতেন। স্বদেশীদের মতো তাদের অনেকেই ছিলো কৃষ্ণাঙ্গ। কেউ তাদেরকে কোনো সন্দেহ করতো না। ব্লেনম্যান নামে একজন ইউরোপীয় ভদ্রলোক একবার কি দু’বার ছদ্মবেশে নানার শিবিরে গিয়ে কোনো প্রকার ক্ষতির সম্মুখীন না হয়েই ইউরোপীয় ছাউনিতে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। তার ওপর আদেশ হলো, তিনি যেনো এলাহাবাদ যেতে চেষ্টা করেন। কিন্তু পথে তিনি ধরা পড়লেন। যাবতীয় জিনিস-পত্র হারিয়ে কোনো রকমে ফিরে আসতে সক্ষম হলেন। পূর্বদিকের দেশের অধিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টাও করা হয় কয়েকবার। কিন্তু তাতে কোনো ফলোদয় হয়নি। তারপরে শেপার্ড নামে এক ভদ্রলোকের ওপর নির্দেশ দেয়া হলো তিনি যেনো শহরে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে আনেন। শুধু সংবাদ যোগাড় নয়, ব্রিটিশের প্রতি মৈত্রীভাবাপন্ন প্রভাবশালী স্বদেশীয়দের সাহায্যে বিদ্রোহী সেপাইদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরাতে চেষ্টা করারও নির্দেশ তাঁকে দেয়া হলো। শেপার্ড বলেছেন, সেনাপতি আমাকে শত্রুদের কার্যকলাপ এবং প্রকৃত ইচ্ছা কি, এ সম্বন্ধে সঠিক সংবাদ আনতে নির্দেশ করলেন। তা ছাড়া, লখনৌ কিংবা এলাহাবাদ হতে কোনো সাহায্য পাওয়া যেতে পারে কীনা সে সম্বন্ধেও নিশ্চিত হয়ে আসার কথা বললেন। তারপরে আরো কিছুক্ষণ এটা সেটা বলার পর তিনি আমাকে নান্নে নওয়াবের (মুহম্মদ আলী খান) সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বললেন। প্রধান সেনাপতি আমাকে জানালেন তিনি আমাদের প্রতি বিশ্বস্ত এবং আমরাও তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারি। বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো রকমের ভাঙ্গন ধরাতে পারা যায় কিনা, তাঁকে সে চেষ্টা করে দেখতে বলবে এবং তারা যদি আমাদেরকে নাজেহাল না করে এবং আপোষে এ স্থান থেকে চলে যেতে দেয়, তাহলে তাদেরকে আমি ভালোমতো সন্তুষ্ট করবো।” তিনি আরো জানালেন, যদি আমি নান্নে নওয়াবের সঙ্গে ব্যর্থ হই, তাহলে যেনো মহাজন এবং অন্যান্য প্রভাবশালী দেশীয় ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে স্বীয় অভিলাষ ব্যক্ত করি। তারা সাহায্য করতে রাজী হলে তদেরকে পুরস্কার দেয়ার কথা বলতেও আমাকে বলা হলো। ব্যক্তিগতভাবে আমাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেয়ার অধিকার দেয়া হলো। তা ছাড়া, আমাদের কাজ করতে দিয়ে কোনো লোক যদি প্রাণ হারায় তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ করার কথা বলার অধিকারও আমাকে দেয়া হলো।

এ সঙ্কটের সময়ে জেনারেল হুইলার যে নান্নে সাহেবের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করেছিলেন, সে সম্বন্ধে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ তিনি ব্যাটারী থেকে ইংরেজ ছাউনিতে রাত দিন সমানে গোলাবর্ষণ করে ইউরোপীয়দের জীবন অতীষ্ঠ করে তুলেছিলেন। সেপাইরা দিল্লীর রাস্তা থেকে কানপুরে ফিরে এসে নগরের প্রাসাদ আক্রমণ করলো। তিনি পরে সেপাইদেরকে বশ করেন এবং গোলন্দাজ বাহিনী তাঁর অধীনে ছেড়ে দেয়া হয়। অথচ কামান সম্বন্ধে তার সামান্য জ্ঞান ছিলো বলে মনে হয় না। এ রকমের দুর্বল মেরুদণ্ডের দোদুল্যমান মানুষ সেপাইদের সংগ্রামে নেতৃত্বদান করার উপযুক্ত মানুষ, কিছুতেই হতে পরে না। সুযোগ পেলেই বিশ্বাসঘাতকতা করবে। এ ধারণা ছিলো জেনারেল হুইলারের মনে। কিন্তু শেপার্ডের ভাগ্য ব্লেনম্যানের মতো প্রসন্ন ছিলো না। ছাউনি ত্যাগ করার অল্পক্ষণ পরেই তিনি ধৃত হলেন। তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো। হ্যাভলকের সৈন্য কানপুরে না আসা পর্যন্ত তিনি কারারুদ্ধ অবস্থাতেই কাটিয়েছিলেন।

এ সময়ের মধ্যে নানা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ক্ষমতা গ্রহণ করলেন। ২নং অশ্বারোহী বাহিনীর সুবাদার টিকা সিংকে প্রধান সেনাপতি এবং দলঞ্জন সিং এবং দীনদয়াল, এ দু’জন সুবাদারকে কর্ণেলের পদে প্রমোশন দেয়া হলো। ফৌজদারী বিচারের ভার নানার ভাই বাবা ভাটের ওপর অর্পণ করা হলো। তস্কর এবং অন্যান্য অপরাধীদেরকে তার সামনে আনা হতো। বিচার করে যথাযথ দণ্ড দেয়া হতো।

২৪শে জুন তারিখে জেনারেল হুইলার লখনৌতে তার সর্বশেষ সংবাদ প্রেরণ করেন। তা হলো হতাশাচ্ছন্ন প্রাণের সর্বশেষ চীৎকার। তিনি লিখেছিলেন, “আমাদের এখন ব্রিটিশ মনোবল ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। কিন্তু বেশিদিন এ মনোবলও অটুট থাকবে না। কিছুতেই আমরা খাঁচাবদ্ধ ইঁদুরের মতো বেশিদিন বাঁচতে পারবো না।” ছাউনিতে খাদ্য ফুরিয়ে এসেছে। এখন সকলে আধপেটা খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। এ অবস্থাও চারদিনের বেশি চলতে পারে না। তাদের গোলাবারুদও ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু কোথাও থেকে গোলা-বারুদ সংগ্রহ করার আশাও নেই। বৃষ্টি যে কোনদিন আসতে পারে। যদি আসে তাহলে ব্রিটিশ সৈন্যদের অসুবিধার অন্ত থাকবে না।

অবশেষে শক্ররা তাদেরকে মুক্তি দিলো। এক মহিলাই তাদের জন্য শান্তির অলিভ বৃক্ষের শাখা বয়ে এনেছিলেন। ম্যারী থমসন লিখেছেন, “অবরোধের ২৬ দিনের দিনে আমার অবস্থানে গোলাবর্ষণ কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ ছিলো। প্রহরীরা চীৎকার করে জানালো যে একটি মেয়েমানুষ এগিয়ে আসছে। সকলে তাকে গুপ্তচর মনে করলো এবং একজন প্রহরী তাঁর দিকে তাক করে রাইফেল বাগিয়ে ধরলো। আমি তার হাতে আঘাত করে মহিলাটিকে রক্ষা করলাম। তার বুকে জড়ানো একটি শিশু সন্তান। পায়ে জুতো কিংবা মোজা কিছু নেই। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আমি তাকে উঠিয়ে ছাউনিতে নিয়ে আসলাম। তখনই তাকে চিনতে পারলাম। তিনি হচ্ছেন এক ধনী পরিবারের মহিলা মিসেস গ্রীনওয়ে। তাঁরা কানপুর বাস করতেন এবং ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে ব্যবসা করছিলেন। মিসেস গ্রীনওয়ের সঙ্গে ইংরেজিতে লেখা কোনো নাম-স্বাক্ষরবিহীন একখানি পত্র ছিলো। তাতে সম্বোধন করা হয়েছে। অশেষ মমতাময়ী সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার প্রজাবৃন্দের মধ্যে যারা লর্ড ডালহৌসির কার্যকলাপের সঙ্গে কোনো প্রকারে সংযুক্ত নয়, তারা অস্ত্র সংবরণ করে নিরাপদে এলাহাবাদ চলে যেতে পারে।” প্রধান সেনাপতির কাছে পত্রখানি নিয়ে যাওয়া হলো। জেনারেল হুইলার তখনো কলকাতা থেকে সাহায্যের প্রত্যাশা করেছিলেন। সেজন্য নানা সাহেবের সঙ্গে কোনো রকমের আপোষ-মীমাংসার আলোচনায় তিনি আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু মুর সেনাপতিকে বোঝালেন যে মহিলা এবং শিশুদের খাতিরে তাদের এলাহাবাদে গমন করাই অধিকতররা সঙ্গত। ব্রিটিশ সৈন্যদের অবস্থা তখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ ছাড়া তাদের কাছে অপর কোনো সম্মানজনক পন্থা খোলা ছিলো না। তার পরের দিন আজিমুল্লাহ এবং জাওলা প্রাসাদ ইংরেজদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে এলেন। কথাবার্তায় ব্রিটিশ সৈন্যদের ছাউনি ত্যাগ করার কথা স্থির হলো। আরো স্থির হলো প্রত্যেক সৈন্যকে তার অস্ত্র এবং ৬০ রাউণ্ড গুলিগোলা নিয়ে যেতে দেয়া হবে। আহতদের জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা করা হবে। রসদসহ সৈন্যদের বয়ে নিয়ে যাবার জন্য নৌকা ঘাটে অপেক্ষা করবে, এ রকম কথাবার্তা পাকা হলো। আজিমুল্লাহ নানা সাহেবের কাছে এ সকল প্রস্তাব নিয়ে গেলেন, কিন্তু নানা সাহেব জিদ করলেন, সৈন্যদেরকে রাতের অন্ধকারেই ছাউনি ছাড়তে হবে। কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্য পরদিন সকাল হওয়ার আগে ছাউনি ত্যাগ করতে অক্ষমতা জানালো। অবশেষ দূত এসে নানা সাহেবের মৌখিক অনুমতি জানিয়ে গেলো।

পরের দিন ছাউনির সৈন্যদের নৌকায় বয়ে নেওয়ার জন্য এলো ১৬টি হাতী এবং ৭০ থেকে ৮০খানা পাল্কী। তাতে সকলের স্থান হয়নি। ক্যাপটেন মুর, যিনি ছাউনি ত্যাগের সবকিছু রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছিলেন। তাঁকে দ্বিতীয়বারে নৌকাতে আসতে হয়। নারী এবং শিশুদের হাতির পিঠে এবং গরুর গাড়িতে বসানো হলো। তাছাড়া পদমর্যাদা নির্বিশেষে সকল পুরুষ মানুষকে হেঁটে আসতে হলো। প্রথম দল ছাউনি ছাড়ার পরে সেপাইরা ছাউনিতে এসে প্রবেশ করলো। সেপাইরা তাদের পুরোনো অফিসারদের মধ্যে কে কে মৃত্যু বরণ করেছেন জানতে চাইলো। ম্যারী থমসন বলেছেন, অফিসারদের মৃত্যু সংবাদ শুনে সেপাইরা অত্যন্ত দুঃখিত হলো। হতভাগ্য বুড়ো স্যার হাফ হুইলারের পত্নী এবং কন্যাকেও হেঁটে নৌকাতে আসতে হলো। মেজর ভাইব্রাট সকলের শেষেই ছাউনি ত্যাগ করেছিলেন। বিদ্রোহী সেপাইদের অনেকে যারা এই অফিসারের অধীনে চাকুরি করতো তাঁর মালপত্র বয়ে আনার জন্য জেদ করতে লাগলো। গরুর গাড়িতে মালপত্র বোঝাই করে মেজরের পত্নী এবং পরিবারকে নৌকা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলেন। বেলা ৯টার সময়ে সর্বশেষ নৌকাতে যাত্রী বোঝাই করা হলো। পথে যে তাদের কোনো বিপদ ঘটতে পারে, এ প্রসঙ্গে ম্যারী থমসন এবং ভালফোসে ছিলেন সম্পূর্ণ রকমের অজ্ঞ। নদী অগভীর। নৌকাগুলো ভেসে চলছিলো না। নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সকল যাত্রীকেই নৌকা ঠেলে নিয়ে যেতে হচ্ছিলো।

তারপরে কি ঘটলো তা আমরা ম্যারী থমসনের জবানীতেই ব্যক্ত করেছি, “সে সকালে নদীর তীরে প্রচুর লোক সমাগম হয়েছিলো। হাজার হাজার নরনারী অবাক বিস্ময়ে তাদের ভূতপূর্ব শাসকদের বিদায় দৃশ্য দেখছিলো। তারপরে যে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার বর্ণনা দেবার জন্য ম্যারী থমসন এবং ডালফোসে ছাড়া আর কেউ জীবিত ছিলেন না।

থমসন লিখেছেন, “মেজর ভাইব্রাট তার নৌকায় অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গেই নৌকা ছাড়তে নির্দেশ দেয়া হলো। তারপরে একটি দেশী নৌকা থেকেই প্রত্যেক নৌকার মাঝিকে নেমে আসার সঙ্কেত দেয়া হলো। সঙ্গে সঙ্গে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা তীরের দিকে চলে গেলো। সঙ্গে সঙ্গেই আমরা তাদেরকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লাম। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলো। নৌকা ছাড়ার পূর্বেই এ সকল মাঝি আমাদের নৌকার খড়ের ছাদে জ্বলন্ত কয়লা রেখে গিয়েছিলো। মাঝিদের ঝাঁপ দিয়ে পড়ে পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে সকল সেপাই মালপত্রসহ মেজর ভাইব্রাটকে এগিয়ে দিতে এসেছিলো, তারা ব্রিটিশ সৈন্যদের দিকে তাক করে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। ঠিক সেই সময়েই নৌকগুলোতে আগুন জ্বলে উঠলো। আমরা সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেলাম। পনেরো ষোলজন অশ্বারোহী সৈন্যের গুলির জবাবে আমরাও গুলি ছুঁড়েছিলাম। তারপরে শুরু হলো সবচেয়ে ভয়াবহ দুযোগ। অধিকাংশ নৌকা সরানো যায় না। যাত্রীরা নৌকা থেকে লাফ দিয়ে ঠেলে নৌকাকে ভাসিয়ে নিতে চেষ্টা করতে লাগলো। তীর থেকে ছুটে আসছে বন্দুকের গুলি আর নৌকার ছাউনিতে লকলকে আগুনের শিখা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। মহিলা ও শিশুরা নৌকা থেকে নেমে নৌকার পেছনে গলা অবধি ডুবিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসা গুলির আঘাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। শুধু ভাইব্রাটের নৌকাখানাই গভীর জলে গিয়ে পড়লো। তার ছাদেও আগুন লাগেনি। থমসন এ নৌকার কাছে সাঁতরে গেলে তাঁকে ওপরে টেনে তোলা হলো। ঘাট থেকে দ্বিতীয় নৌকাখানি ছাড়া হয়েছিলো। কিন্তু জলের নীচে গুলি এসে লাগায় তা ডুবে গেলো। যাত্রীদেরকে ভাইব্রাটের নৌকায় তুলে নিয়ে প্রাণ রক্ষা করা হলো। লগি এবং কাঠের টুকরোর সাহায্যে নৌকাটিকে গুলির রেঞ্জের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলো। চারদিক থেকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুটে আসছে। প্রায় দুপুরের সময়ে গাদা বন্দুকের রেঞ্জের বাইরে নৌকাকে নিয়ে আসতে সমর্থ হলো। কিন্তু সমস্ত দিন ধরে তাদের ওপর রাইফেলের গুলি চালানো হলো। রাতের বেলায় জ্বলন্ত তীর নিক্ষেপ করা হতে লাগলো এবং নৌকাখানায় আগুন লাগিয়ে দেবার জন্য একখানা জ্বলন্ত নৌকা স্রোতে ভাসিয়ে দেয়া হলো।

সকালের দিকে অল্পক্ষণের জন্য তাদের ওপর কোনো আক্রমণ করা হয়নি। কিন্তু তারা নদীতে স্নানরত কতিপয় লোকের কাছে জানতে পেলো বাবু রাম বক্স নামে একজন প্রভাবশালী জমিদার তাদের ওপর আক্রমণ করবার জন্য নজফগড়ে আঁটঘাট বেঁধে অপেক্ষা করছে। বেলা ২টার সময় তারা সে আতঙ্কিত স্থানে পৌঁছালো। দুর্ভাগ্য তাদের, সে সময় নৌকাখানি চড়ায় আটকা পড়লো। তারা তীরের রাইফেলের গুলির রেঞ্জের বাইরে নয়। একটা কামান আনা হলো, কিন্তু সেটা অকেজো হয়ে গেলো। সূর্যোদয়ের সময় কানপুর থেকে নৌকায় করে একদল সশস্ত্র সেপাই নিয়ে আসা হলো। তাদের নৌকাখানা বালুচরে আটকা পড়লো। আত্মরক্ষাকারীরা প্রাণপণে আক্রমণ করে অনুসরণকারীদের ধ্বংস করতে চাইলো। আবার তাদের নৌকা বালুচরে আটকা পড়লো। অতি শীগগির প্রবল এক ঘুর্ণিবায়ুর তাড়নায় নৌকা মুক্ত হলো। এখনো তাদের বিপদ কাটেনি। সকালবেলা দেখা গেলো, গাঙের অনাব্য অংশে চলে গেছে, অনুসরণকারী শত্রুরাও বেশি দূরে নয়। দু’টি পুরোদিন আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, নদীর পানি ছাড়া কিছুই খেতে পায়নি, শরীরে এককণা শক্তিও নেই। এ রকম অবস্থাতেও তারা আত্মরক্ষার প্রবল সংগ্রাম করে যাচ্ছে। ভাইব্রাট থমসন, ডালফোসে এবং অপর কয়েকজন আক্রমণকারীদের ওপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। সেপাই এবং জনতা তাদের আক্রমণ বরদাস্ত করতে পারলেন না। তারা ছত্রভঙ্গ করে পলায়ন করলো। কিন্তু ফিরে এসে দেখে, নৌকা চলে গেছে। অনুসরণকারীদের বাধা দিতে সক্ষম না হওয়ায় বেপরোয়া ব্রিটিশ সৈন্যের ক্ষুদ্র দলটি একটি মন্দিরের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেখানে তাদের কোনো খাদ্য ছিলো না। অল্পমাত্র পচা পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করেছিলো। অতি শীগগির সে আশ্রয়ও ত্যাগ করে তাদের আবার নদীতে আসতে হলো। এ সময়ে তাদের সংখ্যা সাতজনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে থেকে দু’জনকে সাঁতার দেয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হলো। তৃতীয় জন বালুচরে এলে তার মাথায় গুলি লাগে। অবশেষে অনুসরণকারীরা অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকলো। তিন ঘণ্টা অবিরাম নদীতে সাঁতার কাটার পরে অবশিষ্ট যারা জীবিত আছেন একটু বিশ্রাম নিতে মনস্থির করলেন। তারা তীরের কাছে জলে গলা অবধি চুবিয়ে বসে রইলেন। এ সময়ে তাঁরা তীরে বন্ধুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। প্রথমে সৌভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারেনি। যখন বুঝতে পারলেন তারা নিরাপদ, তখন কাঁদা থেকে উঠে আসার মতো শক্তিও তাদের শরীরে অবশিষ্ট ছিলো না। থমসনের গায়ে একটি ছেঁড়া সার্ট ডালফোসের কোমরে একখানা নেংটি, মারফি এবং সুলিভানের শরীরে সূতার আঁশ পর্যন্ত ছিলো না। অযোধ্যার মুরার মাওরের জমিদার দিগ্বিজয় সিং ছিলেন তাঁদের আশ্রয়দাতা। তাঁরা ২৯জন সন্ধ্যাবেলা তার বাসভবনে গিয়ে পৌঁছেন।

যদিও কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই, তবু এ কাহিনী একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় । কামান পাতা হয়েছিলো এবং নদীতীরে সৈন্য পাঠানো হয়েছিলো সে কথা একেবারে অস্বীকার করা যায় না। নৌকার গুরু দয়াল এবং লোচন চৌধুরীর মতে, সংকেত অনুসারে একটি নৌকায় গুলি ছোঁড়া হয়েছিলো এবং তারপরে বিনা সঙ্কেতেই অপরাপর নৌকাগুলোর ওপর আক্রমণ চলে। চৌহান জমিদারদের উপস্থিতির আয়োজন হয়তো পূর্বাহ্নে করা হয়নি। কারণ এ খবর ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিলো। ইংরেজদের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখবার জন্য দূর-দূরান্তের গ্রামবাসীরা সকালে নদীতীরে জমায়েত হয়েছিলো। এ ষড়যন্ত্রে নানা সাহেব কোন অংশগ্রহণ করেছিলেন কিনা তা বলা সহজ নয়। বিদ্রোহী সেপাইদের নেতা হিসেবে সমস্ত দুস্কৃতির সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন বলে বলতে হয় এবং বাস্তবিক দিয়ে দেখতে গেলে তাঁকেই পুরোপুরি দায়ী করতে হয়। কিন্তু জনল্যাভ এ বিষয়ে তাঁকে সন্দেহ করেই ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, কানপুরে ১৮৫৭ সালে জুলাই মাসে যে সকল লোক বিশ্বাসঘাতকতা করে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের অনুষ্ঠান করেছে, সে সম্বন্ধে পত্রাদি পাঠ করার পরে আমি ভয়ঙ্করভাবে মর্মাহত হয়েছি, নানা সাহেব ইংরেজ ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রলোকদের অন্তরঙ্গভাবে না হলেও অনেক বেশি দেখেছেন। অনেক হতভাগ্যের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ছিলো। এটা বিশ্বাস করা যায়, তিনি নৌকা যখন তৈরি করতে আদেশ দিলেন, তিনি সরল ভাবে আশা করেছিলেন যে খ্রীস্টানদের কলকাতায় যেতে দেয়া উচিত। কিন্তু যা ঘটেছে তাতে নানা সাহেবের নির্দেশকে খেলাফ করা হয়েছে। কারণ সেপাইরা চেয়েছিলো, নানা সাহেব এবং ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে বিভেদ এতো প্রবল হোক যাতে করে নানা সাহেব এবং সরকারের মধ্যে কোন রকমের সন্ধি হতে না পারে। সুতরাং তারা ইচ্ছা করে এ কাজ করেছে। ব্রিটিশ যদি আবার ভারতের অধিপতি হয়ে বসে তাহলে যারা আত্মসমর্পণ করেছেন, তাদেরকে রক্ষা করার জন্য তাঁর আপন জীবনও রক্ষা পাবে এ কথা নানা সাহেবের চাইতে ভালোভাবে কেউ জানতো না। যে সকল মহিলা এবং শিশু সেপাইদের গুলি এবং তরবারি থেকে রক্ষা পেয়েছিলো তার জন্য নানা সাহেবই দায়ী ছিলেন। কারণ, তারই নির্দেশে হত্যাকান্ড বন্ধ করা হয়েছিলো। কর্ণেল মড এ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে নানা সাহেবকে শিশু এবং নারী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করতে গিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। তিনি লিখেছেন, কর্ণেল উইলিয়াম যে সকল প্রমাণ সগ্রহ করেছেন, সে সকল অতি সাবধানতা সহকারে এবং কোনো রকমের পক্ষপাত ছাড়া পাঠ করলে নানা সাহেব আমাদের শিশু এবং নারীদের হত্যার জন্য দায়ী ছিলেন কিনা এ সম্বন্ধে মনে সন্দেহের উদয় না হয়ে যায় না। অথচ সাধারণতঃ বিশ্বাস করা হয়ে থাকে যে এতে প্রধান ভূমিকা তিনিই গ্রহণ করেছিলেন। আমার নিজের মত হলো, ব্যক্তিগতভাবে তাঁর হাত থাকলেও, এ ব্যাপারে তিনি তাঁর রক্তপিপাসু অনুচরদের দ্বারা বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ তাদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার সাহস তাঁর ছিলো না। এমনকি আমাদের দেশেও বর্তমানে একই রকম নৃশংস জঘন্যতাকে মেনে নেয়া হয়। এটা নিশ্চিত যে আত্মসমর্পণ যারা করেছেন, নানা তাঁদের সঙ্গে একবারের বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করেছেন। ঘাটের হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো নৃশংস ব্যক্তিত্বের হাত ছিলো। সুদক্ষ ষড়যন্ত্রকারী না হলে এমনটি হয় না নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এতে নানার কোনো হাত ছিলো না।

এ ষড়যন্ত্রের পেছনে কোনো পরিণত বুদ্ধি কাজ করেছিলো, আজকের দিনে তা খুঁজতে যাওয়ার কোনো অর্থ হয় না। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, ১৮৫৭ সালে উভয় পক্ষই মানবতাকে পদতলে দলিত করেছে। এটা স্বীকৃত সত্য যে কানপুরে বিদ্রোহ ঘোষণার পরেও কোনো সেপাই অফিসারদের গায়ে হাত তোলেনি। ম্যারী থমসন স্বীকার করেছেন যে অবরোধের কয়েকদিন পরে ইংরেজরা কোনো বন্দীকে কোন রকম বিচার না করেই হত্যা করেছে। নীল এবং তার সঙ্গীরা যে অমানুষিক হত্যাকাণ্ডের আয়োজন করেছেন, সে সম্বন্ধে সেপাইরা পুরোপুরি ওয়াকেবহাল ছিলো। মৌলবি লিয়াকত আলী কানপুরে পৌঁছে নীলের হত্যাকাণ্ডের খবর সেপাইদের অবশ্যই দিয়েছেন। হোম বলেছেন, “বুড়ো মানুষ, দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ স্ত্রীলোকেরাও আমাদের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে।” নীল যে সাধ করে গ্রাম জ্বালাননি কিংবা নিরপরাধ লোককে হত্যা করেননি, এটা নিহত ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজনের সান্ত্বনার কারণ নয়। নীলের এলাহাবাদের হত্যাকাণ্ডের পরেই কানপুরের সতীচৌরার ঘাটের হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক ভাবে নানা সাহেবকে দায়ী করলে নৈতিকদিক দিয়ে নীলকে দায়ী করতে হয়। কঠোর পন্থা অবলম্বন করে তিনি যদি গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে না দিতেন, তা হলে জেনারেল হুইলার যখন সাহায্যের আবেদন করেছিলেন সে সময়ে তিনি কানপুর আসতে পারতেন।

জাওলা প্রসাদ, বলরাও এবং আজিমুল্লাহকে তাঁতিয়া টোপীর সঙ্গে ২৭শে জুন ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো। কোতোয়াল হুলাজ সিং দু’দিন আগে এ ষড়যন্ত্রের কথা শুনেছিলেন, সেজন্য তিনি সেদিন সকালবেলা নদীর ঘাটে যাননি। হুলাজ সিং-এর মতে কাজী ওয়াসিউদ্দীন নামে এক ব্যক্তি এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করছিলেন। তাঁর মতে, দুদিন আগে থেকে ইউরোপীয়দের জন্য নৌকা তৈরি করে রাখা হয়েছিলো। অশ্বারোহী বাহিনীর দু’জন সরদারের সঙ্গে এক সন্ধ্যায় তিনি কাজী সাহেবকে কিভাবে ইউরোপীয়দের হত্যা করা যায় সে বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে শুনেছেন। তিনি সে সময়ে ঘরে প্রবেশ করে আলোচনা শুনতে পেলেন। তাঁরা স্থির করে ফেলেছেন, ইউরোপীয়দেরকে হত্যা করাটা মোটেও বে-আইনী হবে না। এখানে আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে বিচারের সময় যারা সাক্ষ্য দিয়েছিলো তারা অনেকে আপন প্রাণ বাঁচাবার জন্য মিথ্যা কথা বলেছে। আবার অনেকে পুরস্কারের আশায়ও মিথ্যা কথা বলেছে। স্বাভাবিক সময়ে যে সকল সাক্ষীকে আগ্রাহ্য করা হতো কিন্তু বিদ্রোহের পরে সে সকল চাঞ্চল্যকর কাহিনীকেই সত্য বলে ধরে নেয়া হয়েছে।

ফোরজেট বলেন, বোম্বের ইউরোপীয়রা শুধু বিশ্বাসই করেনি বরঞ্চ লর্ড এলফিন স্টোনের কাছে অভিযোগ রয়েছে যে জগন্নাথ শঙ্কর শেঠের মতো একজন প্রগাঢ় পণ্ডিত ব্যক্তি এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিও নানা সাহেবের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, জামকান্দির রাজার স্বপক্ষে যদি বোম্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যারিস্টার মিঃ বারটোনকে নিয়োগ না করেন, তা হলে তাঁর ফাঁসি হয়ে যাবে।

অল্প সময়ের মধ্যে নৌকাগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিলো। সেগুলো মাঝিদের নৌকা ছিলো না। মহেশ্বরীর সাগেরওয়াল সম্প্রদায়ের বানিয়ারাই ছিলো মালিক। মালিকদেরকে যথোপযুক্ত ভাবে ক্ষতিপূরণ করা হয়েছিলো। ২৬ তারিখ সন্ধ্যায় অনেকে নৌকাগুলো পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন, তখনও অনেক নৌকায় বাঁশের ছাদ ইত্যাদি লাগানো হয়নি। তবে নৌকাগুলোকে উপযুক্ত করার জন্য হাজার হাজার শ্রমিক দিনে রাতে কাজ করে যাচ্ছিলো। নানা যদি এ ষড়যন্ত্রে অংশ নিতেন তাহলে এতো টাকা এবং শ্রম ব্যয় করার কি প্রয়োজন ছিলো, তা ভাবলে একটু অবাক হতে হয়। কারণ ছাউনিতে তো ইংরেজেরা নিরাশ্রয়ই ছিলেন, নদীতেও তাদেরকে একই রকম অবস্থার মধ্যে রাখার জন্য অতো সাধ্য সাধনার কি প্রয়োজন। তাদের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র ছিলো, বেপরোয়া সংগ্রামে পরাজিত না করে তাদের স্ত্রী এবং শিশুদের যে নিহত হতে দেবে না তা তো একরকম নিশ্চিতই ছিলো।

সে সময়ে হুইলার এবং তাঁর সঙ্গীরা মরীয়া হয়ে অনশনরত অবস্থায়ও সেপাইদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছিলেন কানপুরে। নীল তখন কঠোর হস্তে এলাহাবাদের বিদ্রোহ দমন করছেন। খুব শীগগিরই দিল্লী এবং মীরাটের সংবাদ লর্ড ক্যানিং-এর কাছে এসে পৌঁছালো। নীল এবং তার সহকর্মীদের মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় তলব করা হলো। নীল ছিলেন দৃঢ়চিত্ত এবং নির্দয় মানুষ। তাঁর মতো সেকেলে গোঁড়া খ্রীস্টান হয়তো ক্রমওয়েলের সময়ের জন্য যথোপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন। আত্মবিশ্বাসের কারণে তিনি নেতা হিসেবে উপযুক্ত হলেও সহকারি হিসেবে নিতান্তই অনুপযুক্ত ছিলেন। তিনি কলকাতায় এসে পৌঁছালেন। হাওড়ার রেলওয়ে কর্মচারিদের সঙ্গে তিনি যে ব্যবহার করেছিলেন তা থেকে মানুষটির ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে জানা যায়। সেনাবাহিনীকে ট্রেনে স্থান দিতে অক্ষম স্টেশন মাস্টার এবং ইঞ্জিনীয়ারকে প্রহরাধীনে রেখে দশ মিনিট পরে ট্রেন এসে পৌঁছালে তাঁর সৈন্যরা নির্বিবাদে স্থান দখল করে নেয়। নীল রেলওয়ের কর্মচারিদের বলতে ভোলেননি যে তাঁদের ব্যবহার বিদ্রোহীদের মতে, তাঁদের সৌভাগ্য যে সামরিক বাহিনীকে এজন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়নি। নীলের পরবর্তী লক্ষ্য হলো কানপুর এবং বেনারসে সৈন্য পাঠানো। তবে উপস্থিত মুহূর্তে তিনি বেনারস যাত্রা করলেন।

বেনারস ভারত সরকারের অপরিসীম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এ স্থান শুধুমাত্র হিন্দুদের তীর্থস্থান নয়, বর্তমানে ইসলাম ধর্মীয় দিল্লীর সম্রাটের কোন কোন বংশধর বেনারসে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করেছে। কোন গোলযোগ দেখা দিলে তারা সরকারের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে পারেন। তা ছাড়াও বেনারস পাটনা এবং এলাহাবাদের রাজপথের মাঝখানে অবস্থিত বলে এর সামরিক গুরুত্বও অপরিসীম। কঠোর শাসনকর্তাদের হাতে না পড়লে বেনারস সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ থাকতে পারতো। গাবিনস যিনি জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, অনেক সাহস, কৌশল এবং দৃঢ়তার পরিচয় দেখিয়েছেন। কালেক্টর লিন্ড সহজে ধৈর্য হারিয়ে বসেননি। কমিশনার টুকার সাহেব ছিলেন একজন গোঁড়া খ্রীস্টান। তিনি আপন ধর্মবিশ্বাসে অটল ছিলেন। নিজের প্রচেষ্টার চাইতে দৈবশক্তিতে অধিক বিশ্বাসী ছিলেন। উদাসীনভাবে তিনি তাঁর ওপর ন্যস্ত কর্তব্য শেষ করেন। শহরে নিরস্ত্র অবস্থায় বের হতেন। কেবল মাত্র চাবুকখানিই তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সামরিক ছাউনির কর্তাদের মধ্যে ধৈর্যের অভাব ছিলো। পনেরো বছর আগে ব্রিগেডিয়ার পসনবি আফগানিস্থানে প্রচুর সুনাম অর্জন করেছেন। সাহসে তার সমান কেউ ছিলো না। কিন্তু বেনারসে সেপাইদের বিদ্রোহের সংবাদ এসে পৌঁছালে অলফার্টস এবং ওয়াটসন তাকে বোঝালেন যে তাঁদের বেনারস ত্যাগ করে সুরক্ষিত চুনার দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বেসামরিক অফিসারেরা সম্মিলিতভাবে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেন। শুধু তাই নয়, যে সকল সৈন্য পূর্বাঞ্চল হতে কানপুরে এসেছিলো তাদেরকে কানপুরে পাঠিয়ে দিলেন। সামরিক কর্তারা সব সময় তার বিরোধিতা করেছে। কিন্তু টুকার স্যার হেনরী লরেন্সের বারবার সনির্বন্ধ অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারেননি।

৩রা জুন তারিখে নীল বেনারসে এলেন। কানপুরের অবস্থা তখনো শান্ত, তবে লখনৌতে সেপাইরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে ৪ তারিখে, খবর এলো আজমগড়ে গোলমাল আরম্ভ হয়েছে। সেপাইরা রাজকোষ দখল করে নিয়েছে। অনিয়মিত সেপাইরা অফিসারদের নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তারা বিদ্রোহী সেপাইদের বিপক্ষে অস্ত্র ধারণ করতে সাহসী হলো না। সামরিক কর্তারা সাহস হারিয়ে ফেললেন। তাঁরা ভয় করতে লাগলেন যে আজমগড়ের দেখাদেখি বেনারসের সেপাইরাও বিদ্রোহ করে বসবে। গাবিন্‌সের অতিরিক্ত কড়াকড়ি ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে সে ভয় আরো বহুগুণে বেড়ে গেলো। পসনবির সঙ্গে নীল কোথায় এবং কখন সাক্ষাৎ করেছিলেন, সে সম্বন্ধে কিছুই জানা যায়নি, তবে তিনি যে ৩৭নং দেশীয় বাহিনীকে নিরস্ত্র করবার জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বাহিনীর অধিনায়ক মেজর ব্রেট কিন্তু সেপাইদের আনুগত্যের প্রতি কোনোরকমের সন্দেহও পোষণ করেননি। সাধারণতঃ শিখেরা অন্যান্যদের তুলনায় অধিক অনুগত। অশ্বারোহী বাহিনী সম্বন্ধেও একই কথা খাটে। তাদের এবং ইউরোপীয় সৈন্যদের সাহায্যেই সন্দেহপ্রবণ সৈন্যদের নিকট হতে অস্ত্র কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। বিকেল পাঁচটায় প্যারেডের ব্যবস্থা করা হলো। ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে রাইফেল জমা দেয়ার নির্দেশ জারী করা হলো। একের পর এক ছ’টি কোম্পানী অস্ত্র পরিত্যাগ করলো। তারপরে গুলি ভর্তি বন্দুক হাতে ইউরোপীয় সৈন্যরা এসে উপস্থিত হলো। পাঞ্জাবে থাকার সময় থেকে সেপাইদের অভিজ্ঞতা হয়েছে যে ইউরোপীয়দের আসার অর্থ হলো তাদের মৃত্যু। চারদিকে চীৎকার উঠলো ইউরোপীয়রা তাদেরকে হত্যা করতে আসছে। পসনবি তাদেরকে নিশ্চিন্ত করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেপাইরা চীৎকার করে জানিয়ে দিলো যে তারা কোনো অপরাধ করেনি। আদেশ পালন করতে বলা ছাড়া পসনবির অন্য কোনো কিছু সেপাইদের কাছে বলার ছিলো না। বিনা দোষে এ কঠিন দণ্ড অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের ওপর নেমে আসতে দেখে সেপাইরা স্থির থাকতে পারলো না। কেউ কেউ অস্ত্রের জন্য হাত বাড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় সৈন্যরা তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করতে লাগলো। সেপাইরা গুলি ছুঁড়ে প্রত্যুত্তর দিলো। শিখ এবং অনিয়মিত সেপাইরা এসবের কিছুই জানতো না। এলোপাথাড়ি গুলিগোলা চলতে দেখে তারাও গুলি ছুঁড়তে লাগলো। এভাবেই অনুগত সৈন্যরা বিদ্রোহ করে বসলো। নীল অধিনায়কত্ব গ্রহণ করলেন। অল্পসংখ্যক সশস্ত্র সৈন্যের পক্ষে অনেকগুণ বেশি সেপাইদের নিরস্ত্র করা কম সাহসের কথা নয়। টুকার নিশ্চিত করে বলেছেন যে অতি কষ্টে সেপাইদেরকে নিরস্ত্র করা সম্ভবপর হয়েছিলো। তার সঙ্গে গভর্ণর জেনারেলের বক্তব্যের মিল রয়েছে।

তাঁর নিজস্ব নীতি অসুসরণ করে বিদ্রোহকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে পেরেছেন ভেবে নীল অত্যন্ত খুশী হলেন। তিনি বিদ্রোহী এবং নিরস্ত্র লোকদের ব্রিটিশ অস্ত্রের তেজ দেখাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। ম্যারি লিখেছেন, “আমাদের সামরিক অফিসারেরা সব রকমের অপরাধীদের খুঁজে এনে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন।” একমাস পর একজন পুরোহিত ব্রিটিশ নৃশংসতা প্রসঙ্গে লিখেছেন, “তাকালেই চোখে পড়বে সারি সারি ফাঁসি কাঠ, তাতে সাহসী কর্ণেল ধরে আনা বিদ্রোহীদেরকে লটকিয়ে দিচ্ছেন। বালক, রমণী, পথচারী, কেউ রক্ষা পায়নি। সকলকেই ফাঁসিকাষ্ঠে লটকিয়েছেন। ইউরোপীয়দের নৃশংসতা দেখে এদেশবাসীরা মনে করতে লাগলো, ইউরোপীয়রা মানুষের বেশে শয়তান ছাড়া আর কিছু নয়।

বেনারসের বিদ্রোহ ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এলাহাবাদ, ফতেহপুর, ফৈজাবাদ এবং জৈনপুরের সেপাইরা জানতে পারলো নির্দোষ সেপাইদের সঙ্গে সন্দেহপ্রবণ অফিসারেরা কি নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছে। তারা অনুভব করলো, তাদের মধ্যে সবচেয়ে যারা অনুগত তারাও অফিসারদের সন্দেহপ্রবণতা থেকে রক্ষা পাবে না।

পরের দিনেই এলাহাবাদের সংবাদ কানপুরে এসে পৌঁছালো। সে রাতেই দুর্গের ইউরোপীয় নারী এবং সামরিক অধিবাসীদের নিরাপদ স্থানে চলে যেতে আদেশ দেয়া হয়েছিলো। কেউ তাতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেনি। রাতে বিদ্রোহ করবে সেপাইরা, এ রকম অনুমান করা হয়েছিলো, কিন্তু কিছুই ঘটলো না। কতিপয় লোক সকালে তাদের নিজ নিজ বাঙলোতে ফিরে এলেন।

কানপুর থেকে নির্দেশ এসেছে, যে সকল ইউরোপীয় পাওয়া যায়, তাদের নিয়ে দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দৃঢ় করতে। কিন্তু ইউরোপীয়রা সংখ্যায় যথেষ্ট ছিলো না। চুনার থেকে মাত্র ৬০জন পেনশন ভোগী গোলন্দাজ সেনা এসেছে, সে সঙ্গে এসেছেন কয়েকজন সার্জেন্ট। তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যোগ দিলেন ষাটজন বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবক। সামরিক ছাউনির প্রধান অবলম্বন হলো ক্যাপটেন ব্রেসিয়ারের অধীন ৪৫০ জন শিখ সৈন্য এবং ৬নং দেশীয় অশ্বারোহী বাহিনীর ৮০ জন ঘোড়সওয়ার। বাকি সৈন্যদেরকে দু’মাইল দূরে তাদের লাইনে রাখা হলো। তারা স্বেচ্ছায় দিল্লীর বিরুদ্ধে যাত্রা করার প্রস্তাব দিয়েছিলো। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় প্যারেডে তারা সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করেছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করলো। এটা অনুমান করা হয়ে থাকে যে ৬নং বাহিনী প্রথম থেকেই বিশ্বাসঘাতকতা করছিলো। শিখদেরকেও ভিড়াবার জন্য তারা এতোকাল অপেক্ষা করেছিলো। বেনারস থেকে কতিপয় মানুষ সেপাই লাইনে এসে খবর দিলো যে সেপাইদেরকে পয়লা নিরস্ত্র করে তারপরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ব্রিটিশ অফিসারেরা বাঙালি পল্টনকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ফিচেট নামে এক জন ড্রামবাদক তাদেরকে জানালো যে ইউরোপীয়রা তাদেরকে নিরস্ত্র করতে ছুটে আসছে। কিন্তু সেপাইদের পূর্বের কোনো ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে তিনি জানতেন না। সেপাইরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলেই, তাদের সাথে এসে যোগ দিলো শহরের একদল উদ্খল জনতা। তারা কারাগারে গিয়ে কয়েদীদের মুক্তি দান করলো। ইউরোপীয়দেরকে খুঁজে এনে হত্যা করা হতে লাগলো। বাঙলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো। সর্বত্র অরাজকতা ছড়িয়ে পড়লো। শুধু খ্রীস্টান অধিবাসীরাই নয়, হিন্দু তীর্থযাত্রীরাও গুণ্ডা বদমায়েশদের অত্যাচার হতে রক্ষা পায়নি।

দুর্গের অভ্যন্তরে শিখেরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিলো, ক্যাপটেন ব্রেসিয়ার তাদের শান্ত রাখলেন। তিনি মালী হিসেবে জীবন শুরু করেছিলেন, আপন দক্ষতার গুণে কমিশন লাভ করে ক্যাপ্টেনের পদে উন্নীত হয়েছিলেন। তিনি শুধু তার অধীন সেপাইদেরকে শান্ত রাখেননি, তাদের সাহায্যে দুর্গের ভেতরের ৬নং বাহিনীর সেপাইদের নিরস্ত্র করতেও সক্ষম হয়েছিলেন। ৬নং রেজিমেন্ট আতঙ্কে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলো। বিদ্রোহ ঘোষণা করে লুঠতরাজ করতে মনোযোগ দিলো এবং পরবর্তী যুদ্ধের কথা না ভেবে লুটের মালপত্র নিয়ে সেপাইরা আপন আপন ঘরে চলে গেলো।

এ সঙ্কটকালে সেপাইদের নেতৃত্বদান করতে এগিয়ে এলেন, একজন অতি সাধারণ মানুষ। তার নাম মৌলবি লিয়াকত আলী। তিনি ছিলেন জাতে তাঁতী এবং পেশায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সমস্ত অধিবাসীরা তাকে শ্রদ্ধা করতো বলে তাঁর নেতৃত্বে কেউ কোনো আপত্তি তোলেনি। তার কোনো সম্পদ ছিলো না, ছিলো না কোনো আভিজাত্য। চরিত্রবান এবং দয়ালু বলেই তিনি অধিনায়ক হিসেবে ভর্তি হলেন। দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি দিল্লীর সম্রাটের নামে শাসনকার্য চালাতে শুরু করেন। তিনি শান্তি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন এবং আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতেও চেষ্টা করেছিলেন। তিনি যে তাতে ব্যর্থ হয়েছেন সে কথা বলাই বাহুল্য। একটুকু সামরিক অভিজ্ঞতাও তার ছিলো না। কিছুমাত্র সামরিক অভিজ্ঞতা থাকলে তিনি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতেন। তা না হলে জনসাধারণের এক বাক্যে আস্থা স্থাপন করার মতো কোন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বও যদি হতেন, হয়তো শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। তাঁর কৃতিত্ব হলো, অনেক ভারতীয় খ্রীস্টান ধর্ম ত্যাগ করে তাদের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলো।

কিন্তু নীলের এলাহাবাদে পৌঁছাতে বেশি দেরী লাগলো না। বেনারস থেকে যাত্রা করলেন ৯ই জুন এবং ১২ই জুন তারিখে এলাহবাদে এসে উপনীত হলেন। রাস্তা দুর্গম, কোনো ঘোড়া পাওয়া গেলো না। তা সত্ত্বেও তিনি চলে এলেন। তিনি কৃষকদের তার কোচ বয়ে নিতে বাধ্য করলেন বটে, কিন্তু প্রখর রৌদ্র থেকে বাঁচতে পারলেন না। এলাহাবাদে যখন এলেন, তাঁর শরীরে একটুকু শক্তিও অবশিষ্ট নাই। কিন্তু বিলম্ব করার সময় নেই তখন। দুর্গ কোনো রকমে রক্ষা পেলেও বিদ্রোহীরা শহর অধিকার করে নিয়েছে। দুর্গের অভ্যন্তরে শিখ এবং ইউরোপীয়রা অতিরিক্ত মদ্য পান করেছে। উপস্থিত মুহূর্তে কড়াকড়ি আইন-শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা যদি না করা হয়, তা হলে যে কোনো মুহূর্তে দুর্গ বিপন্ন হতে পারে। দারাগঞ্জ এবং কিদগঞ্জে গুলিবর্ষণ করা হলো। শহর ব্রিটিশ সেনাদের দখলে চলে এলো। ১৭ তারিখে মৌলবি লিয়াকত আলী তার সদর দফতর ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।

তার পরেই কিন্তু নীল কানপুর যাত্রা করেননি। অপরাধীদের শাস্তি দান এবং যারা দোদুল্যমান তাদের শঙ্কিত করে তোলাই হলো তাঁর চিরাচরিত নীতি। নদীপথে এবং স্থলপথে শাস্তিদানের জন্য অভিযান চালনা করা হলো। সামরিক অফিসারদের চাইতে বেসামরিক অফিসারেরা এ দেশী নিগারদের বাড়িঘর জ্বালাতে এবং তাদেরকে ফাঁসিকাঠে ঝুলাতে অধিক উৎসাহ দেখিয়েছে। শুধু দোষীদের নয়। সন্দেহভাজন, নির্দোষ, নারী-পুরুষ সকলকেই নির্বিশেষে ফাঁসিকাঠে ঝুলানোর খবর ভারত সরকার জানতে পারলো। তাতে করে অধিকাংশ অধিবাসীর মনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণার সঞ্চার হলো। নীল ভুলে গিয়েছিলেন যে সমস্ত ভারতীয়দের ফাঁসিকাঠে ঝুলানো যাবে না। স্থানীয় অধিবাসীদের সাহায্য এবং সহযোগিতা ছাড়া তিনি মালপত্র বয়ে নেবার জন্য পশু এবং গরুর গাড়ি যোগাড় করতে পারতেন না। তার কঠোর দণ্ডের ভয়ে গ্রামের কৃষক এবং তাদের সঙ্গে সৈন্যদের নিত্য প্রয়োজনীয় শ্রমিকেরাও অদৃশ্য হয়ে গেছে। এমনকি ২০ তারিখে এলাহাবাদ ছেড়ে গেলেও কানপুর রক্ষা পেতো। ২৩ তারিখে যদিও ৪০০ ইউরোপীয় ও ৩০০ শিখ সৈন্য মার্চ করবার জন্য তৈরি হলো, তবু মালপত্র বয়ে নেয়ার মতো পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থা তিনি করে উঠতে পারলেন না। পাঁচ দিন পরেও এ অচলাবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। অথচ মেজর রিও সৈন্যদের সঙ্গে ৩০ তারিখে যাত্রা করবেন বলে স্থির করেছিলেন। ৩০শে জুন তারিখে হ্যাভলক কানপুরে এসে আধিনায়কত্ব গ্রহণ করলেন। হুইলারকে যে অবরোধ করে রাখা হয়েছে এ সংবাদ তিনি লখনৌতেই পেয়েছেন।

হেনরী হ্যাভলক ৪২ বছর ধরে সামরিক বিভাগে চাকুরি করেছেন। কানপুর এবং লখনৌতে বিদ্রোহ দমন করার পূর্বে তিনি আফগানিস্তান, পাঞ্জাব এবং পারস্যে যুদ্ধ করেছেন। তিনি ছিলেন সমর বিজ্ঞানের পরিশ্রমী ছাত্র। নেপোলিয়নের সমস্ত অভিযান সম্পর্কে অন্তরঙ্গ পরিচয় তাঁর ছিলো বলে জানতো সকলে। লখনৌতে তিনি লর্ড মেকলের লেখা ইংল্যান্ডের ইতিহাস অধ্যয়ন করছিলেন অবসর সময়ে। নিষ্ঠাবান খ্রীস্টান এবং শ্রীরামপুরের মিশনের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ইস্পাতের তৈরি মানুষ ছাড়া কেউ নীলকে তাঁর নিজের জায়গায় স্থির রাখতে পারতো না। জেনারেল হ্যাভলক রিকে যেখানে আছে সেখানে থেকেই সামনে এবং দুদিকে দৃষ্টি রাখতে নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, আগামীকাল ৪ তারিখে যে সৈন্য আসবে তাদেরকে দিয়ে সংখ্যা বৃদ্ধি করবো এবং শক্তিশালী করে তুলবো। আর গ্রাম জ্বালিয়ো না, বিদ্রোহীদের দেখা না পেলে যতদূর সম্ভব ইউরোপীয় সৈন্যদের টানা হেঁচড়া করবে না। কিন্তু নীল তখনো বিশ্বাস করতে পারেননি যে কানপুরের পতন ঘটেছে। রিণ্ডের সৌভাগ্য, অতি দ্রুত কথামতো হ্যাভলক এসে তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন। পূর্বদিন মধ্যরাতে হ্যাভলক ছাউনি ছেড়েছেন এবং পরদিন অতিপ্রত্যুষে রিণ্ডের সঙ্গে যোগ দিলেন। উভয় পক্ষই অবাক হয়ে গেলো। রিও ফতেহপুরে অল্প সংখ্যক সেপাইয়ের কথা ভেবেছিলেন এবং নানার সৈন্যরা হ্যাভলকের আগমনের কোনো সংবাদই রাখতো না। হ্যাভলক যদি সময় মতো সমরসম্ভার নিয়ে হাজির না হতেন, তাহলে রিণ্ডের অল্প সংখ্যক সৈন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো।

বিচারক টুকার ছাড়া আর সকল ব্রিটিশ অফিসার ৯ তারিখে ফতেহপুর ছেড়ে চলে গেছেন। ৬ তারিখ পর্যন্ত সামরিক ছাউনি প্রশান্ত ছিলো। তারপরে সেপাইরা বাজারে বেনারসের সেপাইদের বিদ্রোহের গুজব শুনতে পেলো। গুজব রটলো শান্তভাবে প্যারেড করার সময়ে ইউরোপীয় সৈন্যরা শিখ এবং পুরবীয়া সম্প্রদায়ের সেপাইদের গুলি করে হত্যা করেছে। তিনদিন পরে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করলো। ছাউনিতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বত্রিশ দিন সময়ের প্রয়োজন হয়। তারপরে শুরু হয় আওঙ্গের যুদ্ধ। সেদিন জুলাই মাসের ১৫ তারিখ। একই দিনে পাণ্ডু নদী অতিক্রম করা হলো। নদীতে জলস্ফীতি ঘটেছে, কিন্তু সেতুটা তখনো অক্ষত ছিলো। আশঙ্কা হচ্ছিলো, যে কোনো মুহূর্তে সেতু ভেঙ্গে দেয়া হতে পারে। সেজন্য হ্যাভলক কালক্ষেপণ না করে সেতু অতিক্রম করতে ছুটলেন। তাঁর ক্লান্ত-শ্রান্ত সৈন্যদের কোনো বিশ্রামই দিলেন না। সেতুটা যে কেনো ধ্বংস করা হয়নি তা ব্যাখ্যা করা বড়োই মুশকিল। নদী অতিক্রম করা হলেও কানপুরের যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। হ্যাভলক বন্দীদের মুক্ত করার জন্য বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি মনে করেছিলেন নারী এবং শিশুরা নানার হাতে বন্দী অবস্থায় কাল যাপন করেছে। বিনা যুদ্ধে নানা তার সদর দফতর ছেড়ে যেতে রাজী হলেন না। কিন্তু তার শেষ প্রচেষ্টাও প্রাথমিক প্রচেষ্টার মতো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। ১৭ই জুলাই তারিখে এলাহাবাদ থেকে আসার পরের দিন তার বিজয়ী বাহিনী নিয়ে হ্যাভলক কানপুরে প্রবেশ করলেন। কিন্তু তার স্বজাতি মহিলাদের মুক্তি দেয়ার ভাগ্য তার ছিলো না।

ঘাটের হত্যাকাণ্ডের পরে যারা বেঁচেছিলেন, তাদেরকে বন্দী করে নেয়া হয়েছিলো। পুরুষদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো। নারী এবং শিশুদের আলাদা ভবনে রাখা হয়েছিলো। সেখান থেকে তাদেরকে বিবিঘর নামক স্থানে চালান দেয়া হয়েছিল। যখন বিদ্রোহী নেতারা বুঝতে পারলেন যে তাঁরা আর কানপুর রক্ষা করতে পারবেন না, তখন সমস্ত বন্দীদের হত্যা করে একটি কুয়াতে ফেলে দিলো। হ্যাভলকের সৈন্যরা কানপুরে প্রবেশ করে মৃতদেহ দেখতে পেলো। যে ঘরে তাদের রাখা হয়েছিলো, তার মেঝেয় তখনো তাজা রক্ত।

বিবিঘরের হত্যাকাণ্ডের জন্য নানাকেও দায়ী করা হয়েছে। কর্ণেল উইলিয়ামের সামনে যে সকল প্রমাণ হাজির করা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে কোনো ফৌজদারী আদালত নানাকে অপরাধী বলে রায় দিতে পারে না। তবে নানার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ না থাকার অর্থ নানা নিরপরাধ নন। রাজনৈতিক এবং নৈতিকভাবে তাঁর বন্দীদের জানের জন্য নানাই দায়ী এবং তাদের নানার নামেই হত্যা করা হয়েছে। নানা সাহেব নিজে অস্বীকার করেছেন যে তিনি কোনো হত্যা করেননি। মহারাণী ভিক্টোরিয়া, পার্লিয়মেন্ট, কোর্ট অব ডিরেক্টরস, গভর্ণর জেনারেল, সকল প্রদেশের লেফটেনান্ট গভর্ণরবৃন্দ এবং সকল অফিসারের কাছে নিবেদিত এক ইস্তাহারনামাতে তিনি বলেছেন, নারী এবং শিশুদের হত্যার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিলো না। এ ইস্তাহারনামাটি রিচার্ডসনকে ১৮৬৯ সালের এপ্রিল মাসে প্রদান করা হয়। তাতে তিনি বলেছেন, “কানপুরে সেপাইরা আমার আদেশ না মেনে ইংরেজ মহিলা এবং শিশুদের হত্যা করে। যাদেরকে আমি কোনো রকমে রক্ষা করতে পারতাম তাদেরকে রক্ষা করেছি। তারা ছাউনি ত্যাগ করলে আমি তাদের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করেছি এবং তাদেরকে ভাটির দিকে এলাহাবাদ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছি। তারপরে আপনাদের সেপাইরা তাদের আক্রমণ করেছে। তবু আমি আমার সৈন্যদের নিবৃত্ত করে ২০০ শিশু এবং নারীর প্রাণ রক্ষা করেছি। আমি শুনতে পেলাম, যে সময়ে আমার সৈন্যরা কানপুর থেকে পালিয়ে এসেছে এবং আমার ভাই আহত হয়েছে, সে সময়ে আপনার সৈন্যরা এবং বদমায়েরা তাদের হত্যা করেছে। আপনারা যে ইস্তাহারনামা প্রকাশ করছেন, সে সম্বন্ধে আমি শুনেছি এবং জানি আপনারা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন এবং এ পর্যন্ত আমিও আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে আসছি। যতোদিন বাঁচি যুদ্ধ করেই যাবো।” একই মাসে তাঁতিয়া টোপীও একই রকম বলেছেন। তিনি বলেছেন, “প্রকৃত প্রস্তাবে বিদ্রোহীরা নানাকে বন্দী করেই রেখেছিলো। তাঁতিয়া টোপী সতীচৌরার ঘাটের হত্যাকাণ্ডের জন্য সেপাইদের দায়ী করেন।

এখন কথা হলো বিবিনগরের হত্যাকাণ্ড কখন সংঘটিত হয়? নানা সাহেবের বিঠুর যাত্রার আগে না পরে? তা বলা সত্যিই অসম্ভব। সে যাহোক বাজীরাওয়ের কন্যা কুসুম বাই বিশ্বাস করেন যে তাঁর ভাই নির্দোষ। বুড়ো বয়সে যখন তিনি পুনাতে যান, তখন ভি.কে. রাজওয়াদ এবং পাণ্ডব পাটওয়ার্দন তাঁর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেছেন, নানা বিদ্রোহী সেপাইদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো রকম সম্বন্ধ ছিলো না।

১৮ই জুলাই তারিখে রাতের অন্ধকারে নানা সাহেব বিটুর ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি গঙ্গায় ডুবে আত্মহত্যা করলেন। কিন্তু গুজব রটলো যে তিনি অযোধ্যা চলে গেছেন।

১৯ তারিখে মেজর স্টিফেনসন বিরে মার্চ করে বসলেন এবং পেশবার প্রাসাদ ধ্বংস করে ফেললেন। ২০ তারিখে নীল এসে পৌঁছালেন এবং হ্যাভলক লখনৌতে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। ২৫ তারিখে হ্যাভলক গঙ্গা অতিক্রম করলেন। তার বিজয়ী সৈন্যরা অযোধ্যার দিকে ধাওয়া করলো।

নীলের হাতেই কানপুরের কর্তৃত্ব ছেড়ে দেয়া হলো। তার কর্তব্য তো নগরে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং বদমায়েশদের শায়েস্তা করা। কিন্তু হ্যাভলক স্পষ্টভাবে বলেছেন তাকে, যতোদিন তিনি কানপুরে আছেন, ততদিন নীলের একটি নির্দেশ দেয়ার অধিকারও নেই। ২৫ তারিখে তিনি স্বাধীনভাবে ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, “প্রথমে কড়াকড়ি মানেই তো শেষে করুণা দেখানো।” অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নীল একটা নতুন পদ্ধতি বার করলেন। সে অনুসারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নিধনশালায় নিয়ে গিয়ে জোর করে কিছু রক্ত পরিষ্কার করাতে হবে। হতভাগ্যদেরকে যে সকল লোকের রক্ত পরিষ্কার করতে হতো, তাদের হত্যার পেছনে এদের কোনো হাত নেই।

যে সকল লোককে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে তাদের সংখ্যা কম ছিলো না। ইউরোপীয়দের প্রতি মুসলমানের ক্ষোভ এবং তীব্র ঘৃণ্য দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আর হিন্দুরা পরম ঔদাসীন্যের সাথে মৃত্যুকে গ্রহণ করেছে।

৫. অযোধ্যা : গজল কাননের অগ্নি-গোধূলি

অযোধ্যা ছিলো একটি পুরোনো প্রদেশ। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তাতে এক রাজবংশ জেগে উঠেছে। মাত্র ৮৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে পাঁচজন রাজা সিংহাসনে আরোহণ করেছেন। ক্ষমতাসীন শাসকেরা পারস্য থেকে এদেশে আসেন এবং তারা শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছিলেন। এ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মোগল দরবারের একজন সামন্ত।

মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সময়ে উজির অথবা সম্রাটের শাসক প্রতিনিধির পদ বংশানুক্রমিক হয়ে যায় এবং অযোধ্যা প্রদেশে স্থাপিত হয় শাসনকর্তার সদর দফতর।

দীর্ঘকাল যাবত অযোধ্যার শাসনকর্তারা সর্বপ্রকারে মোগল দরবারের বশ্যতা মেনে চলতেন। নওয়াব সুজাউদ্দৌলা শাহজাদা শাহ আলমের সঙ্গে বিহার প্রদেশে অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। নওয়াব এবং শাহজাদার মিলিত সৈন্য ১৭৬৪ সালে বক্সারে স্যার হেকটো মুনরোর হাতে ভয়ঙ্করভাবে পর্যুদস্ত হন। লর্ড ক্লাইভ সম্রাট এবং তার উজিরের সঙ্গে এলাহাবাদের সন্ধি করে যে কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করেন, তার ফলে তারা সামরিক বিজয়ের পথ খোলাসা করেন। সম্রাট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার দেওয়ানী আদায়ের ভার দিলেন এবং বিদেশী শক্তির কাছে তাঁর সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিলেন।

অযোধ্যার পরবর্তী নওয়াবেরা এ সন্ধির সব শর্ত পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতেন। কিন্তু বলবান পক্ষ ধীরে ধীরে থাবা বিস্তার করে অযোধ্যার অর্ধেক রাজ্য গ্রাস করে নিলো এবং নওয়াবের অবস্থা এসে দাঁড়ালো একজন সামন্তের পর্যায়ে। সুজাউদ্দৌলা যিনি কোম্পানীর সঙ্গে অধীনতামূলক মিত্ৰতা করেছিলেন, তাঁর উত্তরাধিকারী আসফউদ্দৌল্লার মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র মির্জা আলী এবং আপন ভাই সাদত আলীর মধ্যে সিংহাসনে আরোহণ করার ব্যাপারে গণ্ডগোল বাধে। সে সময় বেনারসে থাকতত একদল ব্রিটিশ সৈন্য। সাদত আলীর দাবি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছে অধিকতরো সুবিধাজনক মনে হওয়ায় কোম্পানী তাঁকে সমর্থন করতে লাগলো। কিন্তু ব্রিটিশ প্রতিনিধির সঙ্গে নওয়াবের কল্যাণের জন্য যে ব্রিটিশ সৈন্য থাকবে তাদের জন্য অধিকতরো বার্ষিক বৃত্তি মঞ্জুর করিয়ে নিলেন। চার বছরের মধ্যে সন্ধিপত্র সংশোধন করতে হলো, নওয়াব আলীকে ১,৩৫,২৫,৪৭৪ টাকার বার্ষিক রাজস্বসম্পন্ন দোয়াব অঞ্চল পুরোনো পাওনার বাবদে ইংরেজকে ছেড়ে দিতে হলো। ১৮০১ সালে কৃত সন্ধিপত্রের ৬নং দফা অনুসারে নওয়াব সাদত আলী তার নিজ রাজ্য নিজের কর্মচারিদের মাধ্যমে প্রজাদের যেভাবে মঙ্গল হয়, সেভাবে শাসন করে যাচ্ছিলেন। তা ছাড়া তিনি এ ব্যাপারে সম্মানীত কোম্পানীর প্রতিনিধিদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নৈতিকভাবে নিজেকে অযোধ্যার জনসাধারণের মঙ্গলামঙ্গলের জন্য দায়ী মনে করতেন। কেননা রাজ্যের আভ্যন্তরীণ শাসন-ব্যবস্থাতেও তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিলো। নওয়াব সামন্তদের সঙ্গে যুদ্ধ করার সময়ে নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ সৈন্যের সহায়তা কামনা করতেন এবং ব্রিটিশ সৈন্যেরা সুরক্ষিত কেল্লার মধ্যে বাস করতো এবং মনে করতো রাজ্যের আইন তাদের ওপর প্রযোজ্য নয়। কিন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নওয়াব এবং তার অধীনস্থ ভূস্বামীদের মধ্যবর্তী বিবাদে যখন মনে করতো নওয়াবের কার্যই ন্যায়সঙ্গত তখন কোনো রকমের হস্তক্ষেপ করতো না। নওয়াব সাদত আলী সব সময় মনে করতেন, আপন নিরাপত্তার জন্য ব্রিটিশ সৈন্য পুষে তিনি অতিরিক্ত মূল্য প্রদান করছেন এবং নিজেকে অপমানিত জ্ঞান করতেন। ১৮১৪ সালে নওয়াব সাদত আলী মৃত্যুমুখে পতিত হলে তাঁর সন্তান গাজীউদ্দিন হায়দার সিংহাসনে আরোহণ করেন। নতুন নওয়াব নেপাল যুদ্ধে প্রবল মিত্রকে ব্যাপক আর্থিক সাহায্য করে তাঁদের সুনজরে পতিত হন। কোম্পানীর সরকার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলসমূহ তাঁর দখলে ছেড়ে দিলেন না শুধু, তাকে একজন প্রকৃত শাসকের মর্যাদাও দান করলেন। নতুন সৃষ্ট উপাধি ধারণ করে মুহম্মদ আলী শাহ্ এবং আমজাদ আলী শাহ্ পর পর সিংহাসনে আরোহণ করেন। ১৮৪৭ সালে শেষ নওয়াব ওয়াজিদ আলী শাহ্ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছাড়া অন্য নওয়াবেরা কোম্পানী সরকারকে প্রচুর পরিমাণে ঋণদান করে কোম্পানীর কর্মচারিদের সন্তুষ্ট করতেন, যাতে করে নওয়াবের মৃত্যুর পরে তার মনোনীত উত্তরাধিকারীদের ঠিকমতো বর্ধিত হারে সরকার থেকে বৃত্তি দান করা হয়।

১৮০১ সালের সন্ধি চুক্তি অনুসারে, সবকিছু সুনির্দিষ্ট করা হলেও শাসন কার্যে ধীরে ধীরে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। বিদেশী সঙ্গিনের তলায় নওয়াবের প্রকৃত ক্ষমতা চাপা পড়ে গেলো এবং তারা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করার জন্য স্বভাবতঃই উদগ্রীব ছিলেন। অধিকতর শক্তিশালী সামন্ত শাসকেরা দুর্নীতিপরায়ণ অফিসারদের অত্যাচারের বিরোধিতা করতেন। দুর্নীতি এবং খারাপ শাসনের ফলে অযোধ্যার অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। কোম্পানীর কর্তারা তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে সজাগ হয়ে উঠলেন। জোর করে ১৮৩৭ সালে ইংরেজরা মুহম্মদ আলী শাহকে একটি নতুন সন্ধি করতে বাধ্য করলেন। নতুন সন্ধিপত্রে ৭নং ধারার কড়াকড়ি অত্যন্ত ভয়াবহ ছিলো। পূর্বোল্লেখিত ৬নং ধারার সংশোধন করা হলো। এভাবে কোম্পানী পদে পদে নওয়াবের শাসনকার্যে হস্তক্ষেপ করার ফলে নওয়াব মুহম্মদ আলী মনে করলেন সন্ধির কারণে গুরুতরভাবে তাঁর সম্মানহানি হয়েছে। কিন্তু তিনি এও ভালো মতো জানতেন যে ব্রিটিশ সরকারের দয়ার ওপরই তার সবকিছু নির্ভর করছে। সুতরাং সন্ধিপত্রের শর্ত মেনে নেয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর রইলো না তার পক্ষে।

তাছাড়াও অধীনতামূলক মিত্রতার আরো কিছু দুর্বলতা ছিলো। ব্রিটিশ সরকারের অধীনতামূলক মিত্রতাসূত্রে আবদ্ধ দেশীয় রাজারা আভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক দিক থেকে নিরাপদ থাকে বিধায়, তাঁদের মধ্যে শৈথিল্য আসে, আলস্যের স্রোতে তাঁরা গা ভাসিয়ে দেন এবং ধীরে ধীরে রক্তের প্রখর তেজ কমে আসে। কোনো রকমের নীতির বন্ধনহীন এ সকল দেশীয় রাজপুরুষেরা নানারকম অপকর্ম এবং নিকৃষ্টতরো আনন্দে লিপ্ত হয়ে পড়েন। একমাত্র ব্রিটিশ রেসিডেন্ট ছাড়া আর কেউ তাঁদের অপমান থেকে নিষ্কৃতি পেতো না। তাদের ব্যবহার চূড়ান্তভাবে অসহ্য হয়ে না পড়লে ব্রিটিশ রেসিডেন্টও তাঁদের কোনো কার্যকলাপে সহজে হস্তক্ষেপ করতেন না। অযোগ্য অযোধ্যা শাসকেরা শাসনকার্যের সমস্ত দায়-দায়িত্ব তাদের খয়ের খা কর্মচারিদের হাতে দিয়ে নিজেদের হাল্কা করে নেন এবং কোম্পানীর কর্মচারির পরামর্শেও কোনো মনোযোগ দিতেন না।

নব নির্বাচিত ওয়াজিদ আলী শাহ্ও তাঁর পূর্বপুরুষদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে লাগলেন। কবিতা এবং সঙ্গীতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন। কাব্যে তাঁর নিজ বংশের একটি ইতিহাস রচনার কাজে মনোনিবেশ করলেন। তার মেলামেশার ক্ষেত্র শুধুমাত্র কবি এবং শিল্পীদের মধ্যে ছিলো না। তার পিতা তাঁকে নীচ বংশীয় নাচিয়ে গাইয়েদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার অনুমতিও দিয়েছিলেন। আর ওয়াজেদ আলী শাহ্ নিজে কবি ও শিল্পীদের চাইতে নর্তকীদের সঙ্গে অধিককাল সময় ব্যয় করতে পছন্দ করতেন। মন্ত্রীরা সপ্তাহ কিংবা পনেরো দিনের মধ্যে পাঁচ অথবা দশ মিনিট তার দেখা পেতেন, সে-ও প্রাসাদে নয়, কোনো নর্তকী কিংবা বাইজির বাড়িতে। এসকল অকর্মণ্য মন্ত্রী ইচ্ছা করলে যে কোনো তালুক কিংবা জমিদারী বিক্রি করে দিতে পারতেন। ১৮৪৯ সালে স্লীম্যান লিখেছেন, “বর্তমানে এ কথা সত্য যে অযোধ্যায় কোনো সরকার নেই। নাচিয়ে বাজিয়েরা ছাড়া আর কারো সঙ্গে নওয়াবের দেখা হওয়ার জো নেই। জনসাধারণের কোনো বিষয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই। মন্ত্রী পরিবর্তন করেও কোনো লাভ নেই, কারণ নীচ বংশোদ্ভূত নওয়াবের প্রিয়পাত্রেরা সিংহাসনের পেছনে সব সময়েই থাকবে।” স্লীম্যানের পরামর্শ হলো, শাসন-ব্যবস্থা একটি বোর্ডের ওপর অর্পণ করা উচিত। তিনি বলেছেন, সাময়িকভাবে তাঁর কর্তৃত্ব হয়তো কোনো একটি বোর্ড, নয়তো কোনো উত্তরাধিকারীদের মনোনীত করে তার সপক্ষে মসনদ ত্যাগ করা উচিত। কিন্তু ভারত সরকার তেমন ঝুঁকি নিতে সাহস করতে পারলো না। সেজন্য নওয়াবকে এখনো পরামর্শ দেয়া এবং সতর্ক করা হতে লাগলো ভারত সরকারের তরফ থেকে। আগের দিনে নওয়াব সতর্কবাণী এবং পরামর্শের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করতেন। ১৮৩৭ সালের সন্ধি যে বাতিল করা হয়েছে সে সম্বন্ধে তিনি জানতেন না। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন, যতো ব্যয় পরিবর্তনই হোক না কেনো, তিনিই নওয়াব থাকবেন এবং নিজের ইচ্ছে মতো রাজস্ব ব্যয় এবং ভোগ করত পারবেন।

১৮৫৪ সালে স্লীম্যানের স্থলে আউটরাম রেসিডেন্ট হয়ে এলেন। তিনি এসে অযোধ্যার অবস্থা যা দেখতে পেলেন, তা কর্ণেল শ্লীম্যানের বর্ণিত অবস্থা থেকে একটুকুও ভালো নয়। নওয়াব সর্বক্ষণ মহিলা মহলে কাটান। ১৮৫১ সালের সন্ধিপত্রে রাজ্য নিয়ে যাওয়ার কোনো কথা ছিলো না। সন্ধির মর্ম ছিলো, দেশীয় কর্মচারিদের সাহায্যে শাসন ব্যবস্থার উন্নতি বিধান করা। কিন্তু ১৮৩৭ সালের সন্ধি অনুসারে রাজ্য নওয়াবের কাছ থেকে একেবারে কেড়ে নেয়া হলো। লর্ড ডালহৌসী নওয়াবকে একেবারে বঞ্চিত করা এবং নওয়াবী খেতাব কেড়ে নেয়ার পক্ষপাতি ছিলেন না। কিন্তু ডালহৌসীর সহকর্মীরা তার সঙ্গে একমত হননি। ব্রিটিশেরা আশা করেছিলেন যে নওয়াব এ-ব্যাপারে নিজের কর্তৃত্ব এবং খেতাবের দাবি ছাড়তে রাজী হবেন না। তিনি যদি পুরুষের মতো আপন সৈন্যদলের সাহায্যে ব্রিটিশ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন, তাহলে ব্রিটিশ রেসিডেন্টের পক্ষে তাঁকে পরাজিত করে রাজ্য দখল করে নেয়া একটুকুও অসুবিধা হবে না। কিন্তু নওয়াব ব্রিটিশ রেসিডেন্টের কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করলেন, তিনি তাঁর হাতে আনুগত্যের প্রমাণস্বরূপ পাগড়ি খুলে রেখে গভর্ণর জেনারেলের কাছে তার হয়ে ওকালতি করার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন। তিনি রেসিডেন্টকে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে তাঁর পূর্বপুরুষেরা সকলেই ইংরেজকে সহযোগিতা করেছেন এবং তিনি সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃত হলেন। তিনি এবং তার পরামর্শদাতারা আশা করেছিলেন, এতোকাল যাবত যে অনুকম্পা তারা ভারত সরকারের কাছ থেকে পেয়ে আসছেন, এবারেও পাবেন, কিন্তু ফল ফললো বিপরীত। ব্রিটিশ চরমপত্রে সই দিতে ওয়াজিদ আলী শাহ্ অস্বীকার করলেন বটে, কিন্তু অযোধ্যা একটি ব্রিটিশ প্রদেশে পরিণত হলো।

নতুন প্রদেশের শাসনকার্য পরিচালনার ভার জেনারেল আউটরামকে চীফ কমিশনার করে তার ওপর ছেড়ে দেয়া হলো এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক সৈন্যসহ তিনজন সিনিয়র সিভিল সার্ভিস সার্জেন্টকে তাড়াতাড়ি প্রেরণ করা হলো। ইংরেজরা আশা করেছিলো, এতোদিনের কুশাসনে জর্জরিত অযোধ্যাবাসীরা ব্রিটিশ শাসনকে স্বাগত জানাবে এবং ব্রিটিশ সৈন্যকে তাদের মুক্তিদাতা এবং বন্ধু মনে করবে। কিন্তু কার্যতঃ ঘটলো তার বিপরীত। রেসিডেন্ট কুশাসন এবং দুর্নীতির হাজারো অভিযোগ করেছেন নওয়াবের নামে। নওয়াবের অত্যাচারের কারণে কয়েকজন কৃষকও অযোধ্যা ত্যাগ করে অন্য ভারতীয় প্রদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। কিন্তু একটি দেশের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন বহু বছরের ধৈর্যশীল শ্রম।

একটি দেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন সাধন করাই হলো বিদেশী শাসনের বৈশিষ্ট্য। কোম্পানী অযোধ্যা দখল করে নেয়ার ফলে যে সকল উচ্চতম কর্মচারিরা দরবারে নিযুক্ত ছিলেন, তাঁরা বেকার হয়ে পড়লেন। একই সঙ্গে নওয়াবের ষাট সহস্র সৈন্য বেকার হয়ে গেলো, তাদের মধ্যে মাত্র অল্প সংখ্যক পুলিশ বাহিনীতে পুনরায় নিযুক্ত হতে পারলো। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো। দরবারের অধীনে কর্মরত ছিলো অনেক শিল্পী এবং কারিগর, তারাও সম্পূর্ণরূপে বেকার হয়ে পড়লো। তাদের জীবিকার আর কোনো সংস্থান ছিলো না, কারণ নতুন শাসকের রুচি ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, তাই তাদের আর নতুন শাসন-ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। স্যার জেমস আউটরাম যদি শাসক হিসেবে থাকতেন অথবা স্যার হেনরী লরেন্সের মতো কোনো রাজনীতিবিদের হাতে শাসন ক্ষমতা দীর্ঘকাল থাকতো, তাহলে জনগণের ক্ষোভ দূর করার জন্য অনেক কিছু করা হয়তো অসম্ভব হতো না এবং জনগণ ধীরে ধীরে নতুন শাসন-ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতো, বিশেষ গণ্ডগোল ঘটতো না। কিন্তু আউটরাম অত্যল্পকালের মধ্যেই ছুটি কাটাতে চলে গেলেন, তাঁর স্থলে এলেন কর্ভালে জ্যাকসন। তিনি হচ্ছেন অনেক বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন বেসামরিক সিভিল সার্জেন্ট। কোম্পানীর একটি প্রাথমিক প্রদেশে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু এ প্রদেশে তাঁর নতুন কর্তব্যের জন্য যেমন প্রয়োজন তেমন সহানুভূতি এবং কল্পনাশক্তি দু’টোর কোনোটিই তাঁর ছিলো না। রেসিডেন্ট হিসেবে এসেই ছত্তর মঞ্জিলকে আপন বাসভবন হিসাবে নির্দিষ্ট করলেন। কিন্তু সে প্রাসাদটিতে কেবল নওয়াব খান্দানের লোকেরাই বসবাস করতেন। সঙ্গে সঙ্গে তার ধৃষ্টতার প্রতিবাদ করা হলো, তিনি সরতে বাধ্য হলেন, কিন্তু জনতার ক্ষোভ একটুও কমলো না। মুসলিম জনসাধারণের কাছে কদম রসুল ভবনের প্রতিটি ইট-কাঠও পবিত্র। কেননা তাঁর একটি পাথরে রসুলের চরণচিহ্ন অঙ্কিত রয়েছে। কিন্তু কোম্পানীর সরকার সে অট্টালিকাকে গোলাবারুদের আগারে পরিণত করলেন। নওয়াবের অনেক আশ্রিত এবং বৃত্তিভোগী এক বছরেরও অধিক সময় ধরে কোনো বৃত্তি পাননি। এক বছর পরে স্যার হেনরী লরেন্স লখনৌতে এসে পৌঁছেই তিনি অত্যন্ত তাড়াতাড়ি তাঁদের বৃত্তিদানের ব্যবস্থা করেন। মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে গেছে। জনসাধারণের আতঙ্ক দূর করার জন্য কোম্পানীর তরফ থেকে কিছুই করা হয়নি। অধিকন্তু কোম্পানীর অফিসারদের নতুন নতুন সংস্কারের ফলে জনসাধারণের অসন্তুষ্টি বেড়েই যেতে লাগলো।

পূর্বেই স্থির করা হয়েছিলো, কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্য একটি নতুন রাজস্ব জরীপ করা হবে। আগের শাসন ব্যবস্থায় কৃষকদের দুরবস্থার সীমা-পরিসীমা ছিলো না। তারা ছিলো জমিদার এবং অন্যান্য রাজস্ব আদায়কারী সরকারি অফিসারদের কৃপার পাত্র। তাদেরকে অনেক রকমের বিরক্তিকর কর এবং সেস দিতে হতো। পুরোনো অনেক রকম কর মওকুফ করে দেয়া হলেও রাস্তার লোকের তাতে বিশেষ কোনো উপকার হলো না। আবার তাদের ঘাড়ে নানা রকম অপমানজনক করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হলো। একমাত্র আফিমের ওপর কর ধার্য করার ফলে জনসাধারণ বিশেষ করে শহরের অধিবাসীরা ভয়ঙ্কর রকম ক্ষেপে উঠলো। চীনের মতো লখনৌতেও আফিম ব্যাপক ব্যবহারে লাগতো। হঠাৎ করে এ নেশাদায়ক বস্তুটি না পেয়ে দরিদ্র আফিমখোরদের দুর্দশার অন্ত রইলো না।

পুলিশ এবং বিচার ব্যবস্থার উন্নতি সাধনও অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব নয়। নতুন সরকার এক সঙ্গে সমস্ত পুরোনো অফিসারকে বরখাস্ত করতে পারে না যেমন, তেমনি পুরোনো অফিসারেরাও হঠাৎ করে পুরোনো রীতিপদ্ধতি বাদ দিতে পারে না। আগের মতোই ঘুষ এবং দুর্নীতি চলতে লাগলো, কিন্তু এজন্য নতুন সরকারকেই করা হলো দোষী। কেননা নতুন সরকার উচ্চকণ্ঠে নিজেকে সুবিচারের রক্ষক বলে ঘোষণা করেছে। এমনকি নতুন রাজস্ব সংগ্রহকারীরা কৃষকদের মধ্যে প্রচার করতে লাগলো যে কৃষকই জমির প্রকৃত মালিক, তালুকদার, জমিদার ইত্যাদি পরগাছা মাত্র। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে জমিদার তালুকদারেরা কেবল জমির মালিক নয়, মহল্লা কিংবা কওমের সর্দারও বটে। অনেক ভূস্বামী তলোয়ারের সাহায্যে যতোটা না, তারও চাইতে বেশি গোত্রীয় আনুগত্যের সূত্রে জমির মালিকানা দাবি করতেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা জমির মালিকানা স্বত্বের কোনো দলিল রক্ষা করেননি। সুতরাং তাদের অনেকেই পূর্বপুরুষের গ্রাম হারাতে বাধ্য হলো। প্রজাদের শস্য আত্মসাৎ করার দুর্নাম থাকার অপরাধে তাদের মাটির কেল্লা ভেঙ্গে দেয়া হলো এবং সশস্ত্র প্রহরী রাখার ব্যবস্থাও বন্ধ করে দেয়া হলো। কৃষকেরা জমিদারদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ে উঠলো, নতুন শাসনব্যবস্থার প্রতি কোনো আগ্রহই জাগলো না। গাবিন্‌সের মতে, কোনো কোনো ব্যাপারে তালুকদারদের সঙ্গে বড়ো অপ্রিয় ব্যবহার করা হয়েছিলো, কিন্তু তা ফৈজাবাদ বিভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। তাছাড়া সীতাপুরে খ্রীস্টান কমিশনার অভিজাত ভূস্বামী সম্প্রদায়কে একেবারে সহ্য করতেন না।

অযোধ্যাকে ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু ১৮৫৭ সালের মার্চ মাসে স্যার হেনরী লরেন্সকে অসন্তুষ্ট জনসাধারণের অসন্তোষের কারণসমূহ দূর করার জন্য চীফ কমিশনার করে পাঠানো হলো। স্যার হেনরীর সঙ্গে লর্ড ডালহৌসীর সদ্ভাব ছিলো না। লর্ড ডালহৌসী ভারতীয় রাজপুরুষদের রাজ্য কেড়ে নিলেন, তারা পথে বসলেন। তারপরে স্যার হেনরী কাটা ঘায়ে মলম লাগাতে এলেন। বৃত্তিভোগীরা বৃত্তি পেলেন, তালুকদারেরা আভিজাত্যের কারণে চীফ কমিশনারের কাছ থেকে দ্র ব্যবহার পেলেন। কোনো কোনো লোককে পেনশনের অর্থ প্রদান করা হলো। কিন্তু স্যার হেনরী এসেছেন অত্যন্ত দেরীতে। চর্বি মাখানো টোটার ব্যবহার নিয়ে সেপাইদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সঞ্চার হয়েছে। যে বিক্ষোভের ফুলকি জ্বলে উঠছে, তা যে কোনো মুহূর্তে দাবানলে পরিণত হতে পারে। কিন্তু সে সময়ে কিছু লোক ছিলো, যারা চলতো আপন খেয়ালে, কালের লেখনের প্রতি যারা সব সময়ই অন্ধ ছিলেন। ডঃ ওয়েল নামে ৪৮নং দেশীয় পল্টনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন সার্জন অজান্তে এমন এক ব্যাপার করে বসলেন, ভারতীয়দের কাছে তার কোনো ক্ষমা নেই। ঘটনাটি ঘটেছিলো মার্চের প্রথম দিকে। মেডিকেল স্টোর পরিদর্শনকালে তাঁর শরীর খারাপ লাগা বশতঃ একটি বোতল মুখে দিয়ে ঔষধ পান করে নিলেন। কিন্তু কোনো হিন্দু মেডিকেল স্টোরের দূষিত মিকচার গ্রহণ করতে পারেন না। হাসপাতালের রোগীরা কোনো ঔষধ স্পর্শ করতেও অস্বীকৃতি জানালো। এজন্য সার্জনকে তিরস্কার করা হলো। দেশীয় অফিসারদের সামনে দূষিত ঔষধের বোতলটি নষ্ট করে ফেলা হলো। কিন্তু ভুলে যাওয়া কিংবা ক্ষমা করার মতো মনের অবস্থা সেপাইরা হারিয়ে ফেলেছে। তারা ধরে নিয়েছিলো, এ হচ্ছে তাদের জাতি নষ্ট করার প্রচেষ্টা। কোনো রকমে তিনি প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হলেন। ১৮ই এপ্রিল তারিখে চীফ কমিশনারের গায়ে একটি ঢিল ছোঁড়া হলো। হতে পারে এ কর্ম সেপাইদের দ্বারা সম্পাদিত হয়নি। কিন্তু যেই করুক, গভীরভাবে অপমানিত হয়েছে বলেই তো প্রধান শাসককে ঢিল ছুঁড়তেও পরোয়া করেনি। ৪৮নং স্বদেশী পল্টনকে সরিয়ে নেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কিন্তু চীফ কমিশনার নিশ্চিত যে চর্বি মাখানো টোটা কিংবা অন্য কোনো বিশেষ কারণের সঙ্গে বর্তমান গোলমালের কোনো সম্পর্ক নেই। ২রা মে তারিখে ৭নং অযোধ্যা বাহিনীকে দাঁতে টোটা কেটে বন্দুকে পুরতে আদেশ করলে তারা টোটা কামড়াতে অস্বীকার করলো। পুনরায় ব্রিগেডিয়ার এসে আদেশ দিলেন। আবারও তারা অস্বীকার করলো। সে প্রথা পুরোপুরি বাতিল করে দেয়ার পরেও সেপাইদেরকে কেনো টোটা কামড়ে বন্দুকে ভর্তি করতে নির্দেশ দেয়া হলো, তা ব্যাখ্যা করা যায় না। সম্ভবতো কতিপয় অতি উৎসাহী অফিসারই এই স্বেচ্ছাকৃত ভ্রান্তির অপরাধে অপরাধী। শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য ব্রিগেডিয়ার তাদের সাহায্য করেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা হলো। অবাধ্য অযোধ্যার সেপাইদের শাস্তিদানের ব্যাপারে ভারতীয় সেপাইরা ইউরোপীয় সেপাইদের সহযোগিতা করেছিলো। কিন্তু তথাকথিত বিদ্রোহীরা কোনো বাধা দেয়নি। তারা ছিলো একেবারে প্রশান্ত, এমন কি যখন দেখতে পেলো, তাদেরকে গুলি করার জন্য বন্দুক আনা হচ্ছে, তখন ভয় পেয়ে অনেকে পালিয়ে গেলো। তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে কাউকে কাউকে ফিরিয়ে আনা হলো। নিরস্ত্র সেপাইদেরকে তাদের লাইনে চলে যেতে আদেশ দেয়া হলো এবং পরে রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং কিছুকালের জন্য গোলমাল মিটে গেলো।

কিন্তু স্যার হেনরীকে সচেতন থাকতে হয়েছিলো। ভবিষ্যতে যে গোলমাল হতে পারে, সে সম্বন্ধে তিনি ধারণা করেছিলেন এবং ক্যান্টনমেন্টও শহরের সাদা চামড়াঅলাদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করেছিলেন। তবে এতে তিনি অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ করে এবং অকারণে ভয় পেয়ে বিষয়টিকে জটিল করে তোলার কোনো যুক্তিই খুঁজে পেলেন না। তিনি অপেক্ষাকৃত শান্ত সেপাইদের সমবেত করতে পারতেন, কিন্তু সেপাইদের ক্ষোভ এতো প্রবল যে করবার মতো বিশেষ কিছু ছিলো না। ৭নং অযোধ্যা বাহিনী ৪৮নং দেশীয় বাহিনীর কাছে একখানা চিঠি লিখলো। ৪৮নং সেপাইরাও বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা হয়েছিলো। কিন্তু একজন সেপাই এবং দু’জন অফিসার যাদের হাতে চিঠিখানি পড়েছিলো, বিশ্বস্তভাবে উপরে অফিসারদের কাছে দিয়ে দিলো। ১৩নং দেশীয় বাহিনীর একজন সেপাই ক্যাপটেন গ্যামনের কাছে শহরের তিনজন মানুষকে সোপর্দ করলো। কারণ তারা সেপাইটির কাছে ষড়যন্ত্রের প্রস্তাব করেছিলো। লরেন্স এ সকল বিশ্বস্ত সেপাইকে প্রকাশ্যে দরবার করে পুরস্কার প্রদানের কথা ঘোষণা করলেন। ১২ই মে তারিখে দরবার বসলো। এই দরবারে ঘাঁটির সকল সামরিক বেসামরিক অফিসার, ক্যান্টনমেন্টের কমিশনপ্রাপ্ত দেশীয় অফিসার এবং প্রত্যেক রেজিমেন্ট থেকে পাঁচজন করে সেপাই অংশগ্রহণ করেছিলো। স্যার হেনরী সম্মেলনে বক্তৃতা দিলেন। যে সকল অফিসার এবং সেপাই এ রকম অপূর্ব আনুগত্যের দৃষ্টান্ত প্রদান করেছে, তাদেরকে পুরস্কার স্বরূপ সম্মানী পোষাক এবং টাকার তোড়া প্রদান করলেন। তিনি সমবেত জনতাকে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে সব সময় যে ভালো ব্যবহার তারা পায়, তা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি হিন্দুকে আওরঙ্গজেবের এবং মুসলমানদের রণজিৎ সিংয়ের কঠোর শাসনের কথা সব সময় স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি তাদের বাংলার সেনাবাহিনীর গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং তাদের পূর্ববর্তীরা যে সুনাম অর্জন করেছে তা হারিয়ে না ফেলার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন।

এ বক্তৃতার ফলে সেপাইরা যে গলেনি সে কথা সত্যি নয়, তবে স্যার হেনরীর বক্তৃতা সকলের ওপর সমান প্রতিক্রিয়া করেনি। কেউ কেউ তার বক্তৃতার প্রশংসা করলেও অন্যদের মনে ভয় ধরে গেলো। এটাই আশ্চর্য লাগে, স্যার হেনরী লরেন্স নিজে তার যুক্তির অসারতা ধরতে পারেননি। সৈন্যেরা যে হতাশায় ভুগছে, এ কথা তার চাইতে অপর কেউ ভালোভাবে জানেন না। তিনি নিজেই এ সম্বন্ধে গভর্ণর জেনারেলের কাছে লিখেছেন কয়েক বছর পূর্বে। সে যাহোক স্যার হেনরীর বক্তৃতা সকলকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ১২ তারিখে পুরস্কৃত এবং অনুগত মানুষদের মধ্য থেকে বেশ কিছুসংখ্যক লোক পরবর্তীকালে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু রাজভক্তদের সমবেত করার জন্য তাঁর যে প্রচেষ্টা তা কিন্তু সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়নি। ইউরোপীয় সাথীদের সাথে সাথে ভারতীয় সেপাইদেরও বেশ কিছুসংখ্যক লখনৌর প্রতিরক্ষার কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সামরিক পেনশনভোগীদের লখনৌতে আহ্বান করে তিনি যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন তার কোনো তুলনা হয় না।

মে মাসের ১৪ তারিখে মীরাট বিদ্রোহের সংবাদ লখনৌতে এসে পৌঁছালো। পরদিন এলো দিল্লীর বিদ্রোহের সংবাদ। স্যার হেনরী অযোধ্যাতে সর্বাত্মক ক্ষমতা পরিচালনার জন্য আবেদন করলেন এবং আবেদন মঞ্জুর হলো। তাঁকে ব্রিগেডিয়ারের পদে উন্নীত করা হলো এবং সামরিক ও বেসামরিক প্রধান হিসাবে তিনি শাসনকার্য চালিয়ে যেতে লাগলেন। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে সেনাবাহিনী। লখনৌ থেকে কয়েক মাইল দূরে মারিওন নামক স্থানের ক্যান্টনমেন্টে ৩টি পদাতিক বাহিনী এবং গোলন্দাজ বাহিনী তখন সাদিকপুরে অবস্থান করছিলো। স্যার হেনরী জানতেন ভালোভাবে অল্প সংখ্যক ইউরোপীয় এবং ভারতীয় সৈন্যদের সাহায্যে সবগুলো সামরিক ঘাঁটি তিনি রক্ষা করতে পারবেন না। তখনো তিনি ক্যান্টনমেন্টে বাস করেন। নগরের দুটি কেন্দ্রে তিনি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে মনস্থ করলেন। একটি হলো মচ্ছি-ভবন এবং অপরটি তাঁর নিজের বাসভবন। এ দু’টি স্থানকে শক্তিশালী করা হলো। ক্যান্টনমেন্টের নারী এবং শিশুদের এ দুটি স্থানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করবার নির্দেশ দেয়া হলো। স্যার হেনরী ভারতীয়দের সাহায্য যে পাবেন, সে আশা ছাড়তে পারেননি এবং তখনো নতুন সৈন্য সংগ্রহ করার কথা চিন্তা করছেন। স্যার হেনরী শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেই ক্ষান্ত ছিলেন না। তিনি জানতেন ভয় ভয়ের জন্ম দেয় এবং বিশ্বাস বিশ্বাসকে জীবন্ত করে। পর মুহূর্তে যদি তিনি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তা যেমন তাঁর পক্ষে বোকামোর কারণ হবে, তেমনি দোদুল্যমানদেরও অনুভব করতে দেয়া উচিত হবে না যে তিনি বড়ো বিচলিত হয়ে পড়েছেন। তার শক্তির প্রকাশ দেখালে একটা সংকট এড়ানো না গেলেও কিছুকালের জন্য হয়তো তা স্থগিত রাখা সম্ভব হবে। কানপুরে কিছু সংখ্যক সৈন্য সাহায্য স্বরূপ পাঠানো হয়েছে। ক্যাপটেন ফেচার হায়েসকে কিছু সংখ্যক অযোধ্যার সেপাইর সঙ্গে প্রেরণ করা হলো। হায়েস নিরাপদে কানপুরে এসে গেলেন। তিনি চিন্তা করলেন, পশ্চিম দেশসমূহের দিকে একবার অভিযানে বেরিয়ে পড়লে রাজপথে কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু পরে মনিপুরের নিকটে তাঁর সেপাইরা বিদ্রোহ ঘোেষণা করে এবং তাঁকে হত্যা করে।

সে যাকগে, মারিওনের ইউরোপীয় সৈন্যরা নিদারুণ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলো। কারণ প্রতি মুহূর্তে অভ্যুত্থানের নতুন নতুন গুজব তাঁদের কাছে আসছে। সব সময়েই তারা সেপাইদের অভ্যুত্থানের আশঙ্কা করছিলো। অবশেষে ৩০ তারিখে রাত্রি ন’টার সময় সেপাইরা সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যদিও কয়েকটি প্রাণহানি হয়েছে, এখন পর্যন্ত ভয়াবহ কোনো যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৩ এবং ৭১নং দেশীয় বাহিনীর দেশীয় সেপাইরা সে মুহূর্তেই ৩২নং ইউরোপীয় বাহিনীতে যোগদান করলো। ১৩নং বাহিনীর সেপাইদের একটি দল ক্যান্টনমেন্টে স্যার হেনরীর বাসভবন পাহারা দিতে বেষ্টনী রচনা করলো। শহরের রাস্তা একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো, সে জন্য সেপাইরা সে দিকে একদম অগ্রসর হতে পারেনি। পরের দিন সামনের দিক থেকে সেপাইদের উপর আক্রমণ করা হলো, কিন্তু তারা কোনো রকমের বাধা না দিয়ে সরে পড়লো। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের উৎকণ্ঠার অবসান ঘটলো। কারা বন্ধু এবং কারা শত্রু তা নির্দিষ্ট করে জানার উপায় নেই। শহরের একটি অভ্যুত্থান পুলিশের সাহায্যে অতি সহজে দমন করা সম্ভব হলো।

কোর্ট মার্শালে বন্দীদের বিচার করা হলো এবং তাদের অনেককেই ফাঁসিকাঠে ঝুলানো হলো। মচ্ছি-ভবনের সামনে এক সারি ফাঁসিকাঠ পোঁতা হলো এবং ৮০ পাউন্ড গুলি ছুঁড়তে সক্ষম একটি কামান বসানো হলো, যাতে করে সাহসী দুষ্কৃতিকারীরা কোনো সুবিধা করতে না পারে। কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে লাগলো, যে সকল সেপাইকে বিদ্রোহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেখা যাচ্ছিলো, তারা অনেকেই চরম দণ্ড লাভ করেছিলো। বিদ্রোহীরা এবার দিল্লী অভিমুখে ধাওয়া করলো, কিন্তু রাজভক্ত সেপাইদের নিয়ে কি করা হবে-সে ব্যাপারে একটা সমস্যা দেখা দিলো। তাদের অনেকেই স্বেচ্ছায় ৩০শে মে-র অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছে এবং পুরোনো সাথীদের সাথে হাত মিলিয়ে ফেলেছে। অর্থনৈতিক কমিশনার মর্টিন গাবিন্‌স দাবি করতে লাগলেন যে তাদেরকে নিরস্ত্র করে ফেলা হোক। কতেক ছাউনিতে অশুভ সংবাদ শুনে ইউরোপীয় অধিবাসীদের আতঙ্ক বেড়ে গেলো। কারণ অধিক পরিমাণে ভারতীয় সেপাই জড়ো করার ফলে ইউরোপীয় অধিবাসীরা ভারতীয়দের কৃপার পাত্র হয়ে পড়েছে। সুতরাং গাবিস তাদেরকে শক্তির বদলে দুর্বলতার উৎস বলে মনে করতে লাগলেন। তিনি বলেছেন, স্যার হেনরী লরেন্সও তার প্রস্তাবে প্রায় রাজী হয়ে এসেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি এমনভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেলো যে হঠাৎ করে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করাও অসম্ভব হয়ে পড়লো। স্যার হেনরী দুর্বল মানুষ ছিলেন না। তিনি বুড়ো পেনশনভোগী সেপাইদের আহ্বান করলেন, আগুনের গোলার মুখে তারা আপন সতোর পরিচয় দিয়েছিলেন। গাবিন্‌সের যুক্তি হলো, নিশ্চিত অবস্থায় তাদেরকে সকল রকমে বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে, একটু নড়চড় হলে ১২০০ লোকের তলোয়ার এবং সঙ্গিন তাদের বিপক্ষ দলে যাবে। সে জন্য এ সকল সেপাইদের নিরস্ত্র করে ফেলা হলে তাদের আর বিপদের কোনো আশঙ্কা থাকে না। গাবিন্‌সের সন্দেহ যে অমূলক, সে কথাও কিছুতে বলা যায় না। চিনহাটে গোলমাল দেখা দিয়েছে। কিন্তু এখনো পাঁচশো ভারতীয় সৈন্য কোম্পানীর পক্ষে লড়াই করছে। গাবিন্‌সের পরামর্শ মতো কার্যকর করা হলে ভারতীয় সেপাইরা এতো বড়ো অপমান মুখ বুজে সহ্য করতো কি না তা বলা যায় না। এমন কি স্থান পরিবর্তন ব্যতিরেকে সেপাইদের পিছু হটানো হলে সর্বনাশ হয়ে যেতো। কারণ যে সকল ইউরোপীয় সৈন্য সামরিক পোষ্টগুলো পাহারা দিচ্ছিলো, তাদের সংখ্যা ছিলো নিতান্তই অল্প। গাবিনস যদি যাত্রা করতেন তা হলে লখনৌর দশাও কানপুরের মতো হতো। অবরোধকৃত অঞ্চলসমূহে ভারতীয় সেপাইদের প্রতি সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের দৃষ্টিপাতে তাকানো হচ্ছিলো।

লখনৌতে বিদ্রোহ সীমাবদ্ধ রইলো না, খুব শীগগির অযোধ্যার প্রান্তস্থিত সামরিক ঘাঁটিসমূহেও এ খবর ছড়িয়ে পড়লো। সেপাইদের কোনো পরিকল্পিত কর্মসূচি কিংবা সুচিন্তিত পন্থা ছিলো না। প্রত্যেক রেজিমেন্ট নিজ নিজ ইচ্ছা অনুসারে চলতে লাগলো। কোনো কোনো ব্যাপারে সরকারি ব্যবস্থার প্রতি যে সন্দেহ ছিলো তা ভয়ে পরিণত হলো এবং শীগগিরই দোদুল্যমান সেপাইরা সক্রিয় বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে।

শাসনকার্যের সুবিধার জন্য অযোধ্যা প্রদেশকে ৪টি বিভাগ এবং ১২টি জেলায় বিভক্ত করা হয়। ৩রা জুন তারিখে খয়েরপুর বিভাগের সামরিক দফতর সীতাপুরে গোলমাল আরম্ভ হয়। কমিশনার জে. জি. খ্ৰীষ্টিয়ান সাহেব ছিলেন কড়া মেজাজের লোক, অধীনস্থ কর্মচারি হিসাবে একদম বেমানান ছিলেন তিনি। তিনি অর্থনৈতিক কমিশনার মার্টিন গাবিন্সকে দু’চোখে দেখতে পারতেন না। সে জন্য কিছুতেই পুরোনো জমিদারদের সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার নীতি মেনে নিতে পারলেন না। তাঁর বিভাগের অবস্থা অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে ভালো, কিন্তু শীগগির সংবাদ পাওয়া গেলো, জমিদারেরা তালুকহারা তালুকদারদের সঙ্গে মিলিত হতে শুরু করেছেন। সীতাপুরে ৪৮নং দেশীয় বাহিনী এবং অযোধ্যায় আরো দু’টি অনিয়মিত রেজিমেন্ট ছাউনি ফেললো। ৩০শে মে পর্যন্ত খ্রস্টিয়ান নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি অনিয়মিত বাহিনীর উপর আস্থা রাখতে পারেন এবং এ বিভাগের জন্য চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। প্রকৃত প্রস্তাবে ৪১নং দেশীয় বাহিনীর সেপাইরা লখনৌর বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মার্চ করে দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করে এবং বিদ্রোহী সেপাইদের বিরুদ্ধে গুলি বর্ষণ করে। তাদের সঙ্গে মেশার কোনো ইচ্ছে যে নেই তা গোপন করলো না তারা। সতর্কতার ব্যবস্থা স্বরূপ খ্রীস্টিয়ান সকল মহিলা এবং শিশুদের তাঁর বাঙলোতে এসে অবস্থান করতে আমন্ত্রণ জানালেন। প্রতিরক্ষার জন্য সেটা ছিলো খুবই উপযুক্ত স্থান, কিন্তু হঠাৎ করে সেখান থেকে পলায়ন করার কোনো উপায় ছিলো না। সাদা চামড়ার লোকেরা বাঙলোতে আশ্রয় নিয়েছে দেখে অনিয়মিত বাহিনীর লোকদের মনে সন্দেহের উদয় হলো। তারা মনে করলো অফিসারেরা তাদের অবিশ্বাস করতে শুরু করেছে। পরদিন সেপাইদের ছাউনিতে একটা গুজব রটলো, কোতোয়াল যে

আটা পাঠিয়েছে তাতে ভেজাল রয়েছে। সেপাইরা জেদ করতে লাগলো, এ ভেজাল আটা নদীতে ফেলে দেয়া হোক। যদিও পরে আটা নদীর জলে ফেলে দেয়া হলো, তথাপিও সেপাইদের ক্ষোভ গেলো না। পরদিন বিদ্রোহ শুরু হলো। কর্ণেল বার্চ যিনি ৪১নং স্বদেশী বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন, তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হলো। ৪১নং স্বদেশী বাহিনী এবং অনিয়মিত অযোধ্যা বাহিনী একই সঙ্গে বিদ্রোহ শুরু করলো। খ্রীস্টিয়ান পরিবার এবং বাঙলোতে আশ্রয় প্রাপ্ত সকল ইউরোপীয়কে নিয়ে পলায়ন করতে পরিকল্পনা করেছিলেন। কয়েকজন ছাড়া কেউই রেহাই পায়নি, সকলকেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

ফৈজাবাদের কাহিনী সম্পূর্ণ আলাদা। ফেব্রুয়ারি মাসে শহরে এলেন এক রহস্যময় মানুষ, পরে অবশ্য জানা গিয়েছিলো তিনি হলেন ফৈজাবাদের মৌলবি। তিনি কে এবং কোন্ স্থান থেকে এসেছেন, সে সম্বন্ধে কিছু জানতো না কেউ। তিনি আহমদ আলী শাহ্ এবং সেকান্দার শাহ্ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি কিছু সংখ্যক সশস্ত্র শিষ্য পরিবেষ্টিত অবস্থায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতেন। সমগ্র ভারতবর্ষে তাঁর শিষ্য ছড়িয়ে ছিলো। তিনি প্রকাশ্যে ফিরিঙ্গীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এবং গরম গরম বক্তৃতা দিতেন। পুলিশ জোর করে তাকে এবং তার শিষ্যবর্গকে নিরস্ত্র করলো এবং জনসাধারণের মধ্যে তাকে ছেড়ে দেয়া নিরাপদ মনে না করায় সামরিক তত্ত্বাবধানে তাঁকে রাখা হলো। বিদ্রোহের সূচনাকালে তিনি ছিলেন বন্দী।

ফৈজাবাদেও এলাহাবাদের মতো বিদ্রোহ শুরু হলো। তার ফলে বেনারসের সেপাইদের নিরস্ত্র করা হলো। বলা হয়ে থাকে, বেনারসের সেপাইদের নিরস্ত্র করে গোলন্দাজ বাহিনী এবং ইউরোপীয় পদাতিক বাহিনী তা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। ফৈজাবাদে সেপাইরা রাজকোষ দখল করে নিলো এবং ইংরেজদের শান্তিতে চলে যেতে নির্দেশ দিলো। তারা ইংরেজদের জন্য নৌকা সংগ্রহ করলো, অর্থ প্রদান করলো; এমনকি অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও করে দিলো। অশ্বারোহী বাহিনী শান্তিপূর্ণভাবে ছেড়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলো না, কিন্তু পদাতিক বাহিনী তাদের সিদ্ধান্তে অটল রইলো। সে যাহোক বৈরামঘাটে আজমগড় থেকে আগত সেপাইরা দু’খানি নৌকার ওপর হামলা করলো। কর্ণেল গোল্ডনি এবং কমিশনারসহ অনেকেই নিহত হলেন।

স্থানীয় ভদ্রলোকদের মনোভাব এখনো বন্ধুত্বপূর্ণ। ফৈজাবাদ থেকে আগত অনেক মহিলা এবং শিশু শাহগঞ্জ দুর্গে আশ্রয় লাভ করেছিলেন। শাহগঞ্জ ছিলো রাজা মানসিং-এর সদর দফতর। রাজা মানসিং পুরোনো অভিজাত খান্দানের ছিলেন না। তাছাড়া জাতিতে তিনি রাজপুত ছিলেন না। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ। তিনি দুর্গে মহিলা এবং শিশুদেরকে আশ্রয় দিলেন, কিন্তু পুরুষদের ঢুকতে দিলেন না। তাহলে বিদ্রোহীদের দৃষ্টি আকর্ষিত হবে বলে তিনি আশঙ্কা করতে লাগলেন। তাছাড়াও শাহগঞ্জে তিনি আশ্রয় প্রার্থীদের বেশিদিন রাখলেন না। তাঁদেরকে দানাপুরে পাঠিয়ে দিলেন নৌকাযোগে।

বাহরাইকের কমিশনার চার্লস উইংফিল্ড কিছু গোলমালের আভাস পেয়েই ঘাঁটি ছেড়ে চলে গেলেন। ১৮৫৭ সালের ১লা মে তারিখে তিনি তাঁর সদর দফতরে ছিলেন না। সিকরোরা সামরিক ঘাঁটিতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেখানে কোনো ইউরোপীয় সৈন্য ছিলো না। এক রেজিমেন্টে অশ্বারোহী, এক রেজিমেন্ট পদাতিক এবং কিছু সংখ্যক গোলন্দাজ সৈন্য মিলে প্রতিরক্ষাব্যুহ রচনা করেছিলো। মহিলা এবং শিশুদের নিরাপদে লখনৌতে পাঠিয়ে দেয়া হলো। সেজন্য অফিসারদের কোনো উদ্বেগ বা শঙ্কা ছিলো না। ইউরোপীয় সার্জেন্টদের সেপাইদের গতিবিধির ওপর দৃষ্টি রাখতে নির্দেশ দেয়া হলো। যদি কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখে তাহলে তাদের অফিসারদের জানাতে বলা হয়েছিলো। ৮ই জুনের মাঝরাতে এক সার্জেন্ট ভাবলেন, তিনি পদাতিক সেপাইদের মধ্যে অস্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ প্রত্যক্ষ করেছেন। তৎক্ষণাই একটা ব্যাটারি আনা হলো এবং ব্যারাকের সামনে স্থাপন করতে নিয়ে যাওয়া হলো। আর কিছুই ঘটলো না। পরদিন সকালে সৈন্যেরা অভিযোগ করলো যে অফিসারেরা তাদের ঘুমের মধ্যে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তারা শুধু বন্ধু গোলন্দাজদের কৃপাতেই রক্ষা পেয়েছে। পদাতিক এবং গোলন্দাজ বাহিনীর মধ্যে পুরোনো ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটলো এবং তারা মিলে দাবি করতে লাগলো যে এক্ষুণি তাদেরকে ক্যাপটেন বয়লিউ প্যারেডে আহ্বান করুন এবং তাদেরকে অস্ত্র ফিরিয়ে দেয়া হোক। বয়লিউ আত্মসমর্পণ করলেন, কিন্তু উইংফিল্ড ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে কোনো কিছু জানতে না দিয়ে গোন্ডাতে অশ্বারোহণ করে স্থানান্তরে চলে গেলেন। গোলন্দাজ বিভাগের অধ্যক্ষ, লেফটেন্যান্ট বনহ্যাম ছাড়া আর সকলেই ছাউনি পরিত্যাগ করলেন। গোলন্দাজ বাহিনী তাকে অধিনায়কত্ব গ্রহণ করতে বললেন, তিনি রাজী হলেন। এ শর্তে যে তারা মার্চ করে লখনৌ যাত্রা করবে। প্রথমতঃ সেপাইরা তাঁর কথা মেনে চলতে রাজী হলেন, কিন্তু পরে অবস্থা বিভিন্ন রকম দাঁড়ালো। তারা বনহ্যামকে পালিয়ে যেতে অনুরোধ করলেন। তাঁকে প্রধান রাজপথ দিয়ে না যেতে অনুরোধ করা হলো। তিনি নিরাপদে লখনৌতে এসে পৌঁছালেন।

উইংফিল্ড বেশিক্ষণ গোলাতে অবস্থান করেননি। তিনি এবং তাঁর বন্ধুরা বলরামপুরের রাজার বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয় লাভ করলেন। দলের মধ্যে একজন ছিলেন ডঃ বাড্রাম, তিনি তাঁর স্ত্রীর কাছে চিঠিতে লিখেছেন, শেষ পর্যন্ত সেপাইদের মনোভাব খুব ভালো ছিলো। আসবার পথে অনেকেই আমাদের সাথী হতে চেয়েছে, তাদের চোখের জল ঝরেছে। দেশীয় অফিসারেরা সালাম করেছে, কিন্তু কারো ইচ্ছা নয় যে আমরা অবস্থান করি। সকালবেলা হাবিলদার মেজর আমাদের কাছে এসে সিকরোরা থেকে প্রাপ্ত একখানা চিঠি দেখালেন। চিঠিখানার মর্ম হলো-‘অফিসারদেরকে বন্দী করো এবং রাজকোষ অধিকার করে। সুতরাং এ হলো আমাদের সর্বশেষ সুযোগ।’

জুনের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে সমস্ত অযোধ্যা প্রদেশে ব্রিটিশ শাসনের সম্পূর্ণ অবসান ঘটে। কিন্তু লখনৌ শহর এখনো তাদের জন্য ভোলা রয়েছে এবং দূরবর্তী ঘাঁটিসমূহ থেকে আশ্রয়প্রার্থীরা এসে সে শহরে আশ্রয় গ্রহণ করে।

বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পরেই স্যার হেনরী ক্যান্টনমেন্ট থেকে রেসিডেন্সিতে তাঁর সদর দফতর স্থানান্তরিত করলেন। তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা ভালো ছিলো না। তখন তাঁর বিশ্রামের প্রয়োজন ছিলো সবচেয়ে বেশি। কিন্তু অপরিসীম দায়িত্ববোধ তাকে অযোধ্যাতে নিয়ে এলো। উৎকণ্ঠিত অবস্থায় তিনি গভর্ণর জেনারেলের কাছে টেলিগ্রাফ করলেন, বর্তমানের গোলমালে যদি আমার খারাপ কিছু ঘটে, আমি আন্তরিকভাবে সুপারিশ করছি, মেজর ব্যাঙ্কসকে চীফ কমিশনার হিসেবে যেনো আমার স্থলে মনোনীত করা হয়। সুদিন না আসা পর্যন্ত কর্ণেল ইনগলিসকে যেনো সেনাদলের কর্তৃত্বদান করা হয়। উপরঅলার আদেশ যথাযথভাবে মেনে চলার সময় এখন নয়। তারা হলেন একমাত্র উপযুক্ত মানুষ। এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে সেক্রেটারী পুরোপুরি একমত। এ পর্যন্ত যে অবসর তিনি গ্রহণ করেননি তা গ্রহণ করার জন্য তাঁর চিকিৎসকেরা চাপ দিতে লাগলেন। পাঁচজন সদস্য বিশিষ্ট একটি অস্থায়ী কাউন্সিল গঠন করা হলো। সে সদস্য পাঁচজন হলেন-অর্থনৈতিক কমিশনার মার্টিন গাবিন্স, বিচার বিভাগীয় কমিশনার মিঃ ওম্যানি, মেজর ব্যাঙ্কস, কর্ণেল ইনগলিস এবং চীফ ইঞ্জিনিয়ার মেজর এন্ডারসন। স্বভাবতঃই মার্টিন গাবিন্‌স কাউন্সিলের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সেপাইদের নিরস্ত্র করার তাঁর প্রিয় প্রস্তাবটি তুলে ধরলেন। তাদের অস্ত্র কেড়ে নেয়া হলো। তবে অল্প দিনের ছুটিতে সকলকেই বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হলো। তাঁর নীতির পরিবর্তন করার সঙ্গে সঙ্গেই হেনরী লরেন্স আবার তার কর্তব্যকর্মে যোগ দিলেন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে কাউন্সিল বাতিল ঘোষণা করলেন এবং যে সকল সেপাইকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিলো, তাদেরকে ডেকে আনলেন। সেপাইদের অনেকেই ফিরে এলো এবং অবরোধকালীন সময়ে তারা যথেষ্ট বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছে।

৩০ এবং ৩১শে মে তারিখের বিক্ষোভ সম্বন্ধে অনুমান করা হয়েছিলো। ৩১শে মে তারিখের একটা ধর্মীয় বিক্ষোভ পুলিশ দমন করেছিলো। দশ দিন পরেই সেপাইরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো। স্যার হেনরী একটুও ঘাবড়ে না গিয়ে প্রতিরক্ষার কাজ করে যেতে লাগলেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্যান্টনমেন্ট এবং মচ্ছি-ভবন খালি করে সকলে রেসিডেন্সীতে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। উত্তরে এবং দক্ষিণে ব্যাটারী স্থাপন করা হলো। সুন্দর সুন্দর সুশোভিত বৃক্ষরাজি কেটে ফেলা হলো, পরিখা খনন করা হলো। সামরিক স্টোরের সরঞ্জামপত্র শান্তভাবে মচ্ছি-ভবন থেকে রেসিডেন্সীতে সরিয়ে দেয়া হলো। স্যার হেনরী সব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখাশোনা করতে লাগলেন।

ব্রিটিশ জনসাধারণের সৌভাগ্য যে স্যার হেনরী প্রস্তুতি গ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ এবং সময় পেয়েছিলেন। এভাবে জুন মাস কেটে গেলো। অযোধ্যার সামরিক এবং বেসামরিক ঘাঁটিগুলোর পতন ঘটতে থাকে একের পর এক। এমনকি যেখানে কোনো সামরিক ঘাঁটি ছিলো না, সেখানকার বেসামরিক কর্মচারিদেরও সময় মতো ঘাঁটি ত্যাগ করার নির্দেশ দান করা হয়েছিলো। কিন্তু লখনৌর অবস্থা করুণ হয়ে এসেছে। কিন্তু স্যার হেনরী নিশ্চিত যে বিপদ নিশ্চিতভাবেই আসবে। যতোই দেরী হবে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার অধিক সুযোগ তিনি পাবেন। জেনারেল হুইলার যে অবরুদ্ধ হয়েছেন, তিনি সে খবর পেয়েছেন এবং তিনি যথার্থই অনুমান করেছেন যে লখনৌ হবে সেপাইদের পরবর্তী আক্রমণের লক্ষ্য। আটাশ তারিখে শহর থেকে বিশ মাইল দূরে নবাবগঞ্জ নামক স্থানে সেপাইরা জড়ো হলো। তড়িৎগতিতে ব্রিটিশ সেনাদলকে মচ্ছি-ভবন এবং ক্যান্টনমেন্ট থেকে রেসিডেন্সীতে নিয়ে আসা হলো।

তারপরের কর্তব্য কি-এ ব্যাপারে চিন্তা করতে লাগলেন। ছাউনির মধ্যে আবদ্ধ থেকে শত্রুর মোকাবিলা করা উচিত, নাকি শহরের বাইরে গিয়ে শত্রুদেরকে বাধা দিলে ভালো হয়, সে সম্বন্ধে কিছুই স্থির করা হয়নি। একটি বিজয় যদি অর্জন করা যায় তাহলে তার লোকজনের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে এবং তাদের মধ্যে নতুন মনোবলের সঞ্চার হবে। দোদুল্যমান চিত্তের স্থানীয় মানুষেরাও তার ফলে নিশ্চিতভাবে তাদের পক্ষে চলে আসবে। স্যার হেনরী স্থির করলেন, তাঁরা যতো দুঃসাহসী হবেন, তাঁদের নীতি ততোটুকু নির্ভুল হবে। অযোধ্যার গোলন্দাজ সেনাদলের দুর্বলতা এবং দেশীয় গোলন্দাজ সেনাদের ভীরুতার প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষিত হতে পারেনি। শত্রুদের শক্তি সম্বন্ধে সঠিক খবর স্যার হেনরীকে জানানো হয়নি। সেজন্য যুদ্ধে ব্রিটিশপক্ষ চরমতম ক্ষতির সম্মুখীন হলো।

ব্রিটিশ সেনার পরাজয়ের সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। শিশু এবং মহিলারা ধন-সম্পদ অরক্ষিত রেখে সমস্ত ঘাঁটি থেকে রেসিডেন্টের বাড়িতে পালিয়ে যেতে লাগলেন। সকলেই আপনাপন প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত। সক্ষম পুরুষেরা অস্ত্র হাতে পরিখার মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করতে লাগলেন। সে যাহোক, বিজয়ী বাহিনী কিন্তু শত্রুদের এ শঙ্কার কোনো সুযোগ গ্রহণ করতে পারেনি। তারা যদি শত্রুর পিছু পিছু ধাওয়া করতো তাহলে সম্ভবততা শত্রুর ছাউনি অধিকার করে নিতে পারতো। বিরতিটুকু ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য দৈবী সুযোগ। এ সময়ের মধ্যে অন্য কোনো পথ খোলা না থাকায় দীর্ঘমেয়াদী অবরোধের মোকাবেলা করার জন্য উঠে পড়ে লাগলো।

কতেক ব্যাটারী এখনো স্থাপন করা হয়নি। শ্রমিকেরা রাত-দিন পরিশ্রম করছে। মজুরী অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। একজনের মজুরী যেখানে প্রতিরাতে দু’আনা, সেখানে স্যার হেনরীকে প্রতিরাতে দু’টাকা পর্যন্ত মজুরী দিতে হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাধারণ মজুরদের বিশেষ লাভ হয়নি। ঘেসুড়ে, গৃহভৃত্য, ঝাড়ুদার সকলেই অধিক মজুরীতে কাজ করতে লেগে গেলো। অবরোধের সময়ে কিছু চাকর প্রভুদের সঙ্গে ছিলো।

গবাদি পশু তাদের বর্ধিত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। দেখাশোনা করার কোন চাকর-বাকর ছিলো না এবং আশেপাশে কোথাও ঘাস ইত্যাদি পাওয়া যাচ্ছিলো না। কতেক পশু কুয়ার জলে ঝাঁপ দিয়ে জল বিষাক্ত করে তুললো। অন্যান্য প্রাণী গুলির আঘাতে প্রাণ দিয়ে বাতাস দুষিত করলো।

প্রত্যেক পরিবারের জন্য আলাদা আলাদা রান্না-বান্না করা অসম্ভব হয়ে পড়লো। পুরুষ মানুষেরা প্রাণপণ সংগ্রামে লিপ্ত। সময়ে সময়ে মাত্র তারা স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে দেখা করতে পারে। শিশু এবং নারীদের তয়খানা অথবা ভূগর্ভস্থ কক্ষে আশ্রয় দেয়া হলো। কারণ গুলি-গোলার আক্রমণ থেকে নিরাপত্তার জন্য সেটাই ছিলো সবচেয়ে প্রকৃষ্ট ব্যবস্থা। অনেকগুলো পরিবার এক সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকার ফলে অল্পদিনের মধ্যেই কলেরা বসন্ত ইত্যাদি মহামারী দেখা দিলো। রেসিডেন্সীতে অনেকগুলো পরিবার আশ্রয় পেয়েছিলো। তাছাড়া আরো কতিপয় পরিবার ডঃ ফেরিয়ার এবং মার্টিন গাবিনসের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলো। মার্টিন গাবিস আসন্ন অবরোধের আশঙ্কা করে ভাণ্ডারে প্রচুর খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। তাই অবরোধের সময় তাদেরকে অন্যান্যদের মতো অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়নি।

অবরুদ্ধ মানুষদের মধ্যে ছিল সকল শ্রেণীর মানুষ। সরকারি চাকুরে, কেরাণী, ব্যবসায়ী-সব রকমের মানুষ ছাউনিতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। এখন সকলকেই অস্ত্র ধরতে হচ্ছে। সমস্ত ইউরোপীয় অধিবাসী আবার ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দা নন। এমন একজনও ইউরোপীয় ছিলো না, বিদ্রোহের সময়ে যিনি গ্রেফতার হননি। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিদ্রোহীদের গুলিতে হতাহত হলেন।

অবরোধের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভ্রান্ত ভারতীয়দের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আটক করে রাখা হলো। তাঁদের প্রধান ছিলেন মোস্তাফা আলীখান। তিনি ছিলেন নওয়াব ওয়াজেদ আলী শাহের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। দুর্বল চিত্তের লোক ছিলেন বলে তাঁর পিতা তাঁকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করেন। দিল্লীর সম্রাটের বংশোদ্ভুত দু’জন রাজপুরুষ মীর্জা মুহম্মদ হুমায়ুন এবং মীর্জা মুহম্মদ শিকোহ্ যারা লখনৌ দরবারের প্রতিনিধি ছিলেন, তাঁদেরও বন্দী করে রাখা হলো। মুসলিম সম্ভ্রান্ত বংশীয়দের সাথে হিন্দু তালুকদার, জমিদার এবং রাজাদেরও বন্দী করা হলো। তাদের মধ্যে তুলসীপুরের অল্পবয়স্ক রাজাও ছিলেন। এ সকল রাজনৈতিক বন্দীদের মচ্ছি-ভবনে স্থান দেয়া হয়েছিলো।

অবরোধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ পক্ষ গোয়েন্দার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করতে থাকে, কেননা ছাউনির সঙ্গে তাবৎ জগৎ সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছে। ছদ্মবেশে মেজর গল এলাহাবাদ যাওয়ার চেষ্টা করে বিফল হলেন। সেপাইদের হাতে ধৃত হয়ে তিনি নিহত হলেন। গোয়েন্দা বিভাগের কর্তা ছিলেন গাবিন্স। তার অধীনে বিশ্বস্ত এবং সুদক্ষ কতিপয় গোয়েন্দা কাজ করছিলো। কিন্তু সেপাই বেষ্টনী ভেদ করা খুব সহজ ছিলো না।

রেসিডেন্সীর উত্তর দিকে গোমতী নদী অবস্থিত। সেদিক দিয়ে অবরোধকারীদের একক হামলা করার জন্য প্রচুর সৈন্য সমাবেশ করার স্থান ছিলো। নিরাপদ দূরত্ব থেকে গোলাবর্ষণ করে-দুর্গ প্রাকারও তারা ভেঙ্গে ফেলতে পারতো। দক্ষিণে কানপুর সীমান্ত, পশ্চিমদিকে শহর এবং প্রহরীরা রেসিডেন্সীর পূর্বদিক রক্ষা করে আসছিলো। রণাঙ্গনের মধ্যবর্তী অট্টালিকাগুলো গোলার আক্রমণ ব্যর্থ করে দিচ্ছিলো এবং অধিকসংখ্যক সৈন্যের সাহায্যে আক্রমণও অসম্ভব করে তুলেছিলো। উত্তরের রণাঙ্গনের কেন্দ্রবিন্দুতে কামান পাতা হয়েছে, দক্ষিণ প্রান্তে ইনসের ঘাঁটি এবং একবারে পূর্বদিকে হাসপাতাল ঘাঁটি। তার পাশে হলো বেইলী গার্ডদের অবস্থান। একটু দূরে দক্ষিণে পূর্ব কোণে কানপুর গোলন্দাজ বাহিনী এবং মার্টিন গাবিন্‌সের বাড়িতে এন্ডারসনের ঘাঁটি। চীনহাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে উত্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোটেই জোরদার করা সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ দিকটা অপেক্ষাকৃতভাবে নিরাপদ ছিলো। বিদ্রোহীরা সীমানার কাছাকাছি এসে যায়। অবরোধকারী সেপাইরা অবরুদ্ধ শিখ সেপাইদের সঙ্গে হামেশা কথাবার্তা বলতো। কিন্তু সমগ্র দক্ষিণ দিকে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিলো, তার ফলে সেপাইরা অগ্রসর হতে পারছিলো না এবং কামানের গোলাবর্ষণ থেকে অট্টালিকার নীচের দিক রক্ষা পেয়েছিলো। পূর্বদিকে হাসপাতাল এবং এন্ডারসনের ঘাটির মাঝখানে পেছনের সারিতে ডঃ ফেয়ারের বাড়ি। সামনের সারিতে বেইলী গার্ড, স্যান্ডার্স এবং ফ্যাগোর ঘাটি। এই লাইনের উত্তর-পূর্ব দিক অত্যন্ত সুরক্ষিত ছিলো। পশ্চিম প্রান্তে অথবা নগরের দিকে গাবিন্স এবং ইনসের ঘাঁটির মধ্যবর্তীস্থানে কসাইখানা, বকরীঘর এবং রেসিডেন্সীদের চাকর বাকরদের নিবাসকেন্দ্র। তা ছাড়া রয়েছে গীর্জা, খ্রীস্টান গোরস্থান এবং ইভানের কামান। বলতে হয়, সবদিক দিয়ে রেসিডেন্সী সুরক্ষিত ছিলো। অনুগত সেপাইরা চারটা ঘাঁটি পুরোপুরিভাবে রক্ষা করে আসছিলো। অবরুদ্ধ অধিবাসীদের সংখ্যা ছিলো ৩ হাজার। তার মধ্যে ১৭২০ জন ছিলেন যোদ্ধা। বাকী ১২৮০ জন ছিলেন শরণার্থী। সমস্ত সৈন্যের অর্ধেক ছিলো ভারতীয়। সেপাই ছাড়া আরো ৬৮০ জন ভারতীয় ছাউনির মধ্যে ছিলো। নিকটবর্তী উচ্চ অট্টালিকা হতে সুরক্ষিত দুর্গে রাইফেলের গুলি ছোঁড়া হতো।

অবরোধকারী সেপাইদের পুরোপুরি সংখ্যা সঠিকভাবে জানা যায়নি। ইনস মনে করেন, দু’টি নিয়মিত রেজিমেন্ট, অষ্টম অযোধ্যা স্থানীয় রেজিমেন্ট, ১৫ নং নিয়মিত রেজিমেন্ট, গোলন্দাজ বাহিনীর পুরো দুটি দল, অন্যান্য অশ্বারোহী বাহিনী এবং অযোধ্যার তালুকদারদের তিনটি দল বিদ্রোহী অবরোধকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। স্যার হেনরী লরেন্স প্রথমে অযোধ্যার তালুকদারদের সমর্থন লাভ করতে চেষ্টা করলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন শাহূগঞ্জের রাজা মানসিং। তিনি ইংরেজদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দান করলেন। কিন্তু রামগড়ের হিন্দুরাজা গুরুবক্স এবং মাহমুদাবাদের মুসলিম ভূস্বামী নওয়াব আলী কঠোর জবাব দান করলেন। জুলাই মাসে তাঁদের সৈন্যদল লখনৌর বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিলো। প্রথমদিকে রেসিডেন্সীর দেয়াল ভাঙ্গার কোনো প্রচেষ্টাই সেপাইরা করেনি। রেসিডেন্সীর অভ্যন্তরস্থ নিবাসসমূহই ছিলো সেপাইদের গোলাগুলির নিশানা। কথিত আছে, বরকত আহমদ নামে ১৫নং অশ্বারোহী বাহিনীর একজন অফিসার সেপাইদের নেতৃত্বদান করেছিলেন, মাহমুদাবাদের রাজার লেফটেন্যান্ট খান আলী খান, তালুকদারদের বাহিনীতে নেতৃত্ব দান করেছিলেন।

স্যার হেনরী লরেন্স অনুভব করলেন, এখন মচ্ছি-ভবন ত্যাগ করে সেনাবাহিনীকে রেসিডেন্সীতে নিয়ে আসাই উত্তম হবে। পরিত্যক্ত ঘাঁটি ছিলো কর্ণেল পামারের অধীনে। রেসিডেন্সীর ছাদের যন্ত্র অকেজো হয়ে পড়েছিলো। অবিরাম গোলাবর্ষণের মুখে দু’জন অফিসারকে ক্যাপটেন কালটন খবর দিতে সক্ষম হলেন, বন্দুকগুলো ভালোভাবে রক্ষা করো, দুর্গ উড়িয়ে দাও, তারপরে মধ্যরাতের দিকে পালিয়ে এসো। অধিকতর ক্ষয়ক্ষতির পূর্বে নির্দেশ পালন করা হয়েছিলো। তবে ভাণ্ডারের অনেক অস্ত্রশস্ত্র ছেড়ে আসতে হলো। সকাল বেলা ১টার মধ্যে সেপাইরা ঘেরাও করার কাজ শেষ করে ফেলেছে।

সকাল হওয়ার একটু পরেই স্যার হেনরী লরেন্স সবগুলো ঘাঁটি পরিদর্শন করতে গেলেন। সবকিছু নিজের চোখে দেখার পর তিনি রেসিডেন্সীতে নিজের কক্ষে এসে রেশন বণ্টন সম্বন্ধে একখানা নির্দেশ লিখিয়ে নিচ্ছিলেন। তার আগের দিন তাঁর কক্ষে গুলি এসে পড়েছিলো কিন্তু কারো কোনো ক্ষতি হয়নি। সকলে তাঁকে সে কক্ষ ছেড়ে অধিকতররা নিরাপদ কক্ষে চলে যাবার জন্য অনুরোধ করেছিলো। তিনি পরের দিন চলে যাবেন বলে স্থিরও করেছিলেন। শত্রুদের মধ্যে এমন অব্যর্থ লক্ষ্য মানুষ আছে সেকথা তিনি চিন্তাও করতে পারেননি। যা আশাও করতে পারেনি কেউ তাই ঘটে গেলো। ক্যাপটেন উইলসন আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। ধূলো এবং ধূয়ার জন্য উইলসন কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন “স্যার হেনরী, আপনি কি আহত হয়েছেন?” একটু পরেই এলো অস্ফুট চীৎকার “আমি মারা গেলাম।” ডঃ ফেরারের গৃহে স্যার হেনরী লরেন্সকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে তিনি ৪ তারিখে মারা গেলেন। তিনি মেজর ব্যাঙ্কসকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেন এবং তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নির্দেশ দান করলেন।

৩রা জুলাই তারিখে বিচার বিভাগীয় এম. এম. ওম্যানির মস্তকে গোলার আঘাত লাগলো এবং দুদিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে নতুন চীফ কমিশনার মেজর ব্যাঙ্কসও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারলেন না। গাবিন্‌সের ঘাঁটিতে তিনিও ২১শে জুলাই তারিখে মস্তকে গুলিবিদ্ধ হলেন। এভাবে এক সপ্তাহকাল সময়ের মধ্যে চীফ কমিশনারের আসন দু’দুবার খালি হলো। ব্রিগেডিয়ার ইঙ্গলিস স্থির করলেন, সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে প্রতিরক্ষার সমস্ত দায়িত্ব তাঁর গ্রহণ করা উচিত। তারপর থেকে শিবিরে বেসামরিক কর্তৃত্বের অবসান ঘটলো। অহরহ মৃত্যু ঘটছে। মিসেস ডোরিন নামে সীতাপুরের এক আশ্রয় প্রাথিনী গাবিন্‌সের ঘরের জানালা দিয়ে আসা একটি গুলির আঘাতে নিহত হলেন।

জুলাইয়ের পয়লা দিকে প্রকৃতি ব্রিটিশ পক্ষের সহায়ক হলো। ৫, ৭ এবং ১০ তারিখে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টির পানি অনেক ময়লা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, আবহাওয়া পরিষ্কার করে তুলেছে। ৭ তারিখে বৃষ্টি স্বাস্থ্যকর অবস্থা সৃষ্টি ছাড়াও যে সুযোগ দিয়েছে তা বলে শেষ করা যায় না। হাসপাতালের কামানের সামনে প্রচুর পরিমাণ ভুষি রাখা হয়েছিলো জমা করে। কতিপয় সাহসী সৈনিক এ ভূষির স্তূপে আগুন ধরিয়ে দিলো। ভীষণ দাহ্য ভূষিতে আগুন লাগানোর পরেও সময়মতো বৃষ্টির জন্য অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়নি।

পুরুষদের সঙ্গে সঙ্গে অবরোধকালে মহিলাদেরকেও অনেক দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। তয়খানা অথবা ভূগর্ভস্থ কক্ষে ইঁদুর বেড়ালের সঙ্গে তাঁদের কাটাতে হয়েছে। রসদের ঘাটতি পড়েছে। চারদিকে গুমোট অবস্থা। সকলের মনোবল ভেঙ্গে পড়েছে।

মিঃ রীস ধারণা করতে পারেন না যে এতো সকালে লখনৌ শহরের পতন ঘটবে। কিন্তু অতিসত্বর কোনো সাহায্যের প্রত্যাশাও তিনি করতে পারছেন না। সকলেই বলছে, সাহায্য আসছে, কিন্তু কোথায় সেই সাহায্য? কোত্থেকে আসছে? কখন আসছে? কানপুর শত্রুর অধিকারে চলে গেছে। সমগ্র ভারত জুড়ে দেখা দিয়েছে বিশৃঙখলা।

সুদীর্ঘকাল ধরে রেসিডেন্সী অবরোধকালে সেপাই নেতৃবৃন্দ মাত্র চারবার ব্যাপকভাবে আক্রমণ পরিচালনা করেছেন। ২০শে জুলাই তারিখে তারা প্রথমবারের মতো আক্রমণ করেন। কামানের নিকটের একটি গোলা বিস্ফোরিত হলো, কিন্তু তার ফলে কামানের কোনো ক্ষতি হয়নি। কারণ দূরত্ব সম্বন্ধে সঠিক ধারণা তারা পোষণ করতে পারেনি। তারপরে সেপাইরা চতুর্দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আক্রমণ চালিয়ে যেতে লাগলো। ধীরস্থির সুসংহত গতিতে তারা এগিয়ে আসছিলো। কোনো সুদক্ষ ইউরোপীয় অফিসার তাদেরকে নেতৃত্ব দান করেছিলো বলে সন্দেহ করা হয়। ব্রিটিশ পক্ষও সমান দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিরক্ষা করে চলেছে। দলে দলে সেপাই সৈন্য এগিয়ে আসে কিন্তু তাদের নেতৃবৃন্দ ভেতরে প্রবেশ করতে অপারগ। যুদ্ধ শুরু হয় সকাল নটায় এবং চার ঘণ্টা পর্যন্ত চলে। তারপরে অবরোধকারীরা চলে যেতে বাধ্য হয়। শত্রুদের তুলনায় সেপাইদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। ব্রিটিশ পক্ষে ২৩জন হতাহত হয়েছে, তার মধ্যে ১৪ জন হলেন ইউরোপীয় ।

একে তো যুদ্ধের গতি ভালোর দিকে। ২২ তারিখে আরো ভালো খবর এলো। ২৯ তারিখে এ্যানগাড কানপুর ত্যাগ করেছেন। তিনি ফিরেছেন ২২শে জুলাই। তাঁর সঙ্গে কোনো লিখিত নির্দেশ নেই। যে নির্দেশ তাকে দেয়া হয়েছিলো তিনি তা পথে হারিয়ে ফেলেছেন। তবে তিনি নানার সেনাবাহিনীর উপর হ্যাভলকের বিজয়ের অবিশ্বাস্য সংবাদ বয়ে এনেছেন।

উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে কয়েকদিন আকাশের দিকে তাকাতে থাকলেন। কিন্তু সাহায্যকারী বাহিনীর কোনো হাউই সঙ্কেত দেখতে না পেয়ে তারা নিরাশ হয়ে গেলেন। দিনের পর দিন অতীত হয়ে যাচ্ছে। শিবিরের লোকজনের মনোবল বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই।

জুলাইয়ের শেষের দিকে আহত মানুষে হাসপাতাল ভর্তি হয়ে গেলো। রক্তাক্ত আহত মানুষ বিছানায়, কৌচে সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। হাসপাতালের সেবক এবং পরিচারকের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। সকলকে সেবা করার সময় এবং সুযোগও নেই।

উল্কণ্ঠিত চিত্তে অবরুদ্ধ ব্রিটিশ সেনা যখন দিন যাপন করেছিলেন, হ্যাভলকও বসে সময় কাটাননি তখন। ১৭ জুলাই তারিখে তিনি কানপুর এসে পৌঁছেছেন। ২০ তারিখে তাঁর কিছু সৈন্য অযোধ্যার অংশে নদী অতিক্রম করলেন। ২৫ তারিখের মধ্যে নদী পার হওয়ার কাজ শেষ হলো এবং জেনারেল নিজেও সেনাদলের সঙ্গে যোগ দিলেন। ২৬ তারিখে তিনি লখনৌ থেকে ৫ মাইল দূরে মঙ্গলওয়ার নামক স্থানে শিবির স্থাপন করলেন। তিনদিন পরে উনাও নামক স্থানে তাঁর অগ্রগতি বাধার সম্মুখীন হলো। ঘোরতর যুদ্ধের পর তিনি সেপাইদের তাদের সুরক্ষিত স্থান থেকে তাড়িয়ে দিলেন। প্রাচীর ঘেরা শহর বশিরাতগঞ্জে তারা বিজয়ী শত্রুকে প্রচণ্ডভাবে বাধা দিলো। দ্বিতীয়বারেও হ্যাভলক জয়লাভ করলেন। কিন্তু এজন্য তাঁকে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। তিনি অবরোধ করলেন। দানাপুরে বিদ্রোহের সংবাদ শুনে তার দলের লোকেরা বিচলিত হয়ে উঠলেন। কলকাতা থেকে সাহায্য পাবার পূর্বেই বিদ্রোহীরা প্রত্যেক ঘাঁটিতে দৃঢ়চিত্তে তাঁকে বাধা দিতে লাগলো। টাইটলার শত্রুদের শক্তি এবং দৃঢ়তা সম্বন্ধে খুব নাজুক ধারণা পোষণ করেছিলেন। যারা তাকে বাধা দিচ্ছিলো, তাদেরকে পরাস্ত করার জন্য উপযুক্ত শক্তি তার ছিলো না। তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, তার ফলে তার সৈন্যদলকে কম দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি। তিনি মঙ্গলওয়ারে ফিরে গিয়ে কলকাতা থেকে সৈন্য না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত মনে করলেন।

আগস্ট মাসের ১৩ তারিখে হ্যাভলক অল্পসংখ্যক সৈন্য সাহায্য পেয়ে লখনৌর দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। তাঁর ফিরে আসার সুযোগে সেপাইরা বশিরাতগঞ্জ পুনরায় দখল করে নিয়েছে। তিনি বশিরাতগঞ্জের সেপাইদেরও পুনরায় পরাজিত করলেন। কিন্তু শীগগিরই স্পষ্ট হয়ে উঠেলো যে লখনৌকে মুক্ত করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী তিনি নন। এখন প্রশ্ন হলো অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে তিনি ঝুঁকি গ্রহণ করবেন, নাকি কর্ণেল ইঙ্গলিসকে ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করবেন? তার সৈন্যের পতন লখনৌর পতনকে ত্বরান্বিত করবে। পক্ষান্তরে তিনি যদি অপেক্ষা করেন এবং সেনাদলকে অক্ষত রাখেন, সেপাইদের কোনো ভুলের সুযোগ গ্রহণ করে হয়তো ইতিমধ্যে অবরুদ্ধদের মুক্ত করার কোনো পন্থা বের করতে পারবেন। বশিরাতগঞ্জে পরাজয় বরণ করার পরেও সেপাইরা কিন্তু নিরুত্সাহী হয়ে পড়েনি। পরাজয় বরণ কররার পূর্ব পর্যন্ত বুরিয়াকা চক নামক স্থানে তাঁকে আবার আরেকটি যুদ্ধ করতে হলো। ইতিমধ্যে তিনি সংবাদ পেলেন প্রবল বিদ্রোহী সৈন্যের মোকাবেলায় কানপুর এবং বিরের পতন আসন্ন হয়ে এসেছে।

আগস্ট মাসটি হলো লখনৌর অধিবাসীদের জন্য চরমতম দুঃসময়ের কাল। তারা প্রাথমিক সাহায্যের সমস্ত আশা হারিয়ে ফেলেছেন। ব্যর্থতা তাদেরকে এতোদূর সন্দেহপ্রবণ করে তুলেছে যে তারা হ্যাভলকের বিজয়ের সংবাদও বিশ্বাস করতে পারলেন না। রসদের পরিমাণ ভয়াবহভাবে কমে এসেছে। মোটা আটা, মাষকলাইয়ের ডাল ছাড়া তাদের খাবার মতো অন্য কোনো জিনিস নেই। খাদ্যের অভাবের চাইতে আফিমের অভাব আরো গুরুতরভাবে অনুভূত হতে লাগলো।

আগস্ট মাসের ১১ তারিখে রেসিডেন্সীর ছাদ ধ্বসে পড়লো। ৩২নং রেজিমেন্টের অর্ধডজন মানুষ ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা পড়লো। তাদের মধ্যে থেকে দু’জনকে বের করে আনা হলো। কেবলমাত্র এক জনকেই বাঁচানো সম্ভব হয়েছিলো। ২৩ তারিখে রেসিডেন্সীর পেছনের বারান্দা ধ্বসে পড়লো। কিন্তু তাতে কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ওই আগস্ট তারিখে অবরোধকারীরা ঘোষণা করলো যে তাদের রাজার রাজ্যাভিষেক হয়ে গেছে। ফিরিঙ্গি রাজত্বের অবসান হয়েছে। বিদ্রোহী সেপাইদের জন্য এমন একজন আনুষ্ঠানিক শাসকের প্রয়োজন, যার আহ্বানে তারা সকলে সমবেত হতে পারে। প্রকৃত নওয়াব কলকাতাতে বন্দী জীবন যাপন করছেন। কাজেই সেপাইরা তাঁর নাবালক পুত্রকে তাদের শাসক নির্বাচিত করলেন। তার নির্বাসিত পিতা দিল্লীর অধীন ছিলেন না। তাঁর রাজত্বের একটা নতুন দিক হলো তিনি, অথবা অধিকতরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে তার উপদেষ্টারা দিল্লীর সম্রাটের যাবতীয় আদেশ মেনে চলবেন। অধিকতরা দায়িত্বশীল সেপাই নেতৃবৃন্দ আনুগত্যের মাধ্যমে সংহতি আনয়ন করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। রাষ্ট্রের যাবতীয় দায়িত্বশীল পদ হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হলো। শরফুদ্দৌলাকে প্রধান মন্ত্রী এবং মহারাজ বালকিষাণকে অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করা হলো। মাম্মু খানকে প্রধান বিচারক এবং জয়লাল সিংকে সমর মন্ত্রীর পদ দান করা হলো। নাবালক ওয়ালী বিরজিস কাদিরের জননী বেগম হজরত মহল সমস্ত ক্ষমতা পরিচালনা করবেন।

বিরজিস কাদিরের রাজ্যাভিষেকের পরে শহরবাসীদের উৎসাহ উদ্দীপনা বহুগুণে বেড়ে গেলো। ওদিকে ব্রিটিশ সৈন্য তাদের আরেকজন নায়ককে হারালো। তিনি হলেন চীফ ইঞ্জিনিয়ার মেজর এন্ডারসন। তিনি গুলির আঘাতে নয়, পেটের অসুখে ভুগেই মারা গেলেন। অতিরিক্ত পরিশ্রম করা এবং অবসর গ্রহণ না করার জন্যই জেনারেল এন্ডারসন মারা গেলেন। হ্যাভলকের দ্বিতীয় দফা পশ্চাদপসরণ তালুকদারদের মধ্যে ভয়ানক প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করে। দীর্ঘদিন যাবত তারা ওয়ালীকে সমর্থন না করে পারেন না। আগস্ট মাসে অবরোধকারী শত্রুর সংখ্যা বিশ থেকে চল্লিশ হাজার বলে জানা গেলো। কিন্তু জেনারেল এন্ডারসন পরে শুনেছেন, তাদের সংখ্যা পুরোপুরি এক লক্ষ।

আগস্ট মাসটা হচ্ছে পরিখা কাটার উপযুক্ত সময়। এ ব্যাপারে পাচিরা হলো ওস্তাদ। বৃষ্টিতে মাটি নরম হওয়ায় তাদের কাজও সহজ হয়ে এসেছিলো। ব্রিটিশ সৈন্য অভ্যন্তরের অত্যন্ত শঙ্কিতভাবে সময় কাটাচ্ছিলো। ১০ই আগস্ট তারিখে রেসিডেন্সী দ্বিতীয়বার ভয়ঙ্করভাবে আক্রান্ত হলো। বেলা এগারোটার পর থেকে গোলার পর গোলা ফুটতে আরম্ভ করলো। কর্ণেল ইঙ্গলিস অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন। তার পাশে যে লোকটি ছিলো তাকে গুলি করে হত্যা করা হলো। গোলার পর গোলার আঘাতে প্রাচীর স্থানে স্থানে ধ্বসে পড়লো। এ সময় বিদ্রোহীরা যদি ভালোভাবে চেষ্টা করতো তাহলে ভেতরে প্রবেশ করতে পারতো।

আগস্ট মাসেও অবরুদ্ধ ব্রিটিশ সৈন্যদের মাথার ওপর থেকে দুর্যোগের কালো মেঘ অপসারিত হলো না, যদিও তারা একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। তবুও বন্ধুদের আগমনবার্তা তারা শুনতে পাচ্ছে। ফিরতে এ্যানগাডের অনেকদিন লেগে গেলো। কিন্তু ১৫ই আগস্ট তারিখে তিনি কর্ণেল টাইটলারের কাছে থেকে দ্বিতীয় সংবাদ বয়ে এনেছেন। ৪ তারিখের চিঠিখানিতে হ্যাভলকের দ্বিতীয়বার লখনৌ উদ্ধারের প্রচেষ্টার কথা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু পথিমধ্যে এ্যানগার্ড শহস্তে পতিত হলেন। তিনি যখন শত্রুর হাত থেকে মুক্তি পেলেন, ততোদিনে পুনর্বার নদী অতিক্রম করে হ্যাভলক কানপুরে ফিরে গেছেন।

সেপ্টেম্বর মাসটি ছিলো ইংরেজদের জন্য অত্যন্ত ভাগ্যবন্ত মাস। এ মাসেই ঘটে দিল্লীর পতন এবং এ মাসেই লখনৌতে সাহায্য আসে। সাহায্য আসার পরেও কিন্তু অবরুদ্ধ অধিবাসীদের মুক্তি আসেনি। খাদ্য-বস্তু এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অসম্ভব রকম চড়ে গেছে। আটা, মদ, সিগারেট ভীষণ দুর্মূল্য হয়ে উঠেছে। মিসেস কেসি বলেছেন ৫ই সেপ্টম্বর তারিখে মহিলারা যখন নৈশ ভোজনে রত, তাদের কক্ষের একটা দেয়াল ধ্বসে পড়লো। সুতরাং মহিলাদেরকে অভূক্ত অবস্থাতেই কক্ষান্তরে যেতে হলো।

সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে শাহগঞ্জের প্রভাবশালী তালুকদার রাজা মানসিং বিপুল সৈন্য নিয়ে লখনৌর নিকটবর্তী স্থানে শিবির রচনা করেছেন। তার উপস্থিতিতে অবরুদ্ধদের মনে একদিকে যেমন আশার সঞ্চার হলো, তেমনি অন্যদিকে তারা শঙ্কিত হয়ে উঠলেন ভয়ানক ভাবে। যদি রাজা মানসিং ব্রিটিশ পক্ষে যোগ দেন, তাহলে অবরুদ্ধরা হয়তো বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারে আর বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিলে সকলকে যে ভবলীলা সাঙ্গ করতে হবে, সে ব্যাপারে কারো কোনো সন্দেহ রইলো না। ১৪ তারিখে ক্যাপটেন কালটন মাথায় গুলি লেগে মারা গেলেন। কালটনের মৃত্যুতে ইংরেজদের মনে গভীর বিষাদের সঞ্চার হলো, কিন্তু অনতিবিলম্বে সুখপ্রদ সংবাদ এলো। ১৬ই সেপ্টেম্বর তারিখে এ্যানগাড একখানা চিঠিসহ আবার হ্যাভলকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।

প্রকৃত প্রস্তাবে ভারতীয় সৈন্যরা তাদের প্রভুদের কাছে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও লিখিত কোনো প্রমাণ নেই, এ্যানগার্ড একাধিকবার নালিশ করেছেন যে, বেষ্টনীর ভেতরের দেশীয় সেপাইদের সঙ্গে বাইরে সেপাইদের সংযোগ রয়েছে। সেজন্য শিবিরের সমস্ত খবর আগেভাগে সেপাইরা জেনে যায়। লেফটেন্যান্ট জেমস গ্রাহাম আত্মহত্যা করলেন। কিন্তু তা বিশেষ হতাশার সঞ্চার করতে পারেনি। অবরুদ্ধতার কারণে সাফল্যের সমস্ত আশা হারিয়ে ফেললো। এ্যানগাডের সংবাদও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলো না হতাশাগ্রস্থ সৈন্যদের। কেউ তাঁর কথাকে আর বিশ্বাস করতে পারলেন না। কিন্তু ২২ তারিখে তিনি খবর নিয়ে এলেন, উদ্ধারকারী সৈন্যদল আর বেশি দূরে নয়। এবার তিনি হ্যাভলকের কাছ থেকে নয়, জেনারেল আউটরামের কাছ থেকে একখানা চিঠি নিয়ে এসেছেন। ২৩ তারিখে কানপুরের দিকে দূরবর্তী বন্দুকের আওয়াজ শোনা গেলো। ২৫ তারিখে হ্যাভলক এবং আউটরাম রেসিডেন্সীর মধ্যে প্রবেশ করলেন।

বিদ্রোহের সময় তিনি পারস্যে ছিলেন। তাঁকে বিশেষ নির্দেশ দিয়ে ডেকে আনা হয়েছে। ইতিমধ্যে গভর্ণর জেনারেল প্রদেশগুলোর প্রতিরক্ষার ব্যাপারে ভয়ানক উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। সে জন্য তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

আউটরাম এবং হ্যাভলক ছিলেন পুরোনো বন্ধু। হ্যাভলক পারস্যে আউটরামের অধীনে কাজ করেছেন। আউটরামের নিয়োগের ফলে হ্যাভলক ব্যথিত হলেন। কানপুর অভিযানে তিনি অবিমিশ্র সাফল্যের দাবিদার। তাঁর বিরুদ্ধে যতোই নালিশ থাকুক না কেননা, আউটরাম হ্যাভলকের সামরিক কর্তৃত্বকে অস্বীকার করলেন না। আউটরাম ১৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে কানপুর পৌঁছলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন চীফ অব ষ্টাফ। মগডালার লর্ড ন্যাপিয়ের ছিলেন একজন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বশীল পুরুষ। ৮ তারিখে ভাসমান ব্রিজ অতিক্রম করা হলো। পরের দিন সেনাবহিনী আবার লখনৌ অভিমুখে মার্চ করতে লাগলো। এবারে তাঁরা লখনৌতে এসে পৌঁছালেন। এ বাহিনীতে ২৭৯৯ জন সশস্ত্র ইউরোপীয় সৈন্য ছিলো। তাদের মধ্যে দেশীয় সৈন্যদের সংখ্যা ছিলো ৪০০ জনের মতো। তার মধ্যে ৩৪১ জন ছিলো শিখ। তারা মঙ্গলওয়ারে প্রথম বাধার সম্মুখীন হলেন। কিন্তু এ সময়ে উনাও কিংবা বশিরাতগঞ্জে তাদের যুদ্ধ করতে হয়নি। সবচেয়ে আশ্চর্য হলো, সাইয়ের কাছে বান্নী ব্রিজে তাদেরকে কোনো বাধাই দেয়া হয়নি। ব্রিটিশ সেনাপতিরা এরকম সৌভাগ্য আশা করেননি। তাঁরা ২৩ তারিখে লখনৌর কাছাকাছি আলমবাগে এসে পৌঁছালেন। সেখানে তারা প্রবল বাধার সম্মুখীন হলেন। বিদ্রোহীরা পরাজিত হলো এবং লখনৌর পথ পরিষ্কার হয়ে গেলো।

হ্রস্বতম পথ সব সময়ে নিরাপদ নয়। ছারবাগ ব্রিজ এবং খাল অতিক্রম করে যাওয়াই হলো তাদের পক্ষে সবচেয়ে সোজা পথ। কিন্তু পথে যুদ্ধ হলে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। সবচেয়ে নিরাপদ রাস্তা হলো দিলখুসার ওপর দিয়ে মার্চ করে গোমতী নদী অতিক্রম করা। তারপরে বামে ঘুরে শহরের অদূরস্থ লোহার সেতু দখল করে পুনরায় শহরের পাশে নদী অতিক্রম করে বাদশাহবাগ অতিক্রম করে অবরুদ্ধদের মুক্তি দান করা। কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টিপাতের দরুন ভারী কামানপাতি বহন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো এবং সেজন্য এ পথও বাদ দিতে হলো।

অনেক ক্ষতি সহ্য করার পরে প্রথম মুক্তিবাহিনী এসে পৌঁছালো। কিন্তু তাদেরও অনেক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে হয়েছিলো। হ্যাভলক তাঁর ইউরোপীয় সৈন্যদের প্রত্যেক দেশীয় সেপাইদের শত্রু ভাবতে শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাদের প্রথম জিঘাংসার শিকার হলো সে সকল অনুগত দেশীয় সেপাই, যারা এতোকাল ধরে অবরুদ্ধদের সঙ্গে যথেষ্ট দুঃখ-কষ্ট এবং লাঞ্ছনা ভোগ করেছে। কিন্তু মিসেস বাটুসের সঙ্গে তার সৈন্যরা যে নিষ্ঠুর আচরণ করেছে তার কোনো তুলনাই চায় না।

ভদ্রমহিলার স্বামী ছিলেন গোণ্ডা অঞ্চলের সামরিক চিকিৎসক। স্যার হেনরী লরেন্স যখন বাইরের ঘাঁটির মহিলা এবং শিশুদেরকে লখনৌতে প্রেরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি প্রথমে সিকরোরাতে এসেছিলেন, সেখান থেকে একদল সেপাই তাঁকে রামনগর পৌঁছে দিয়ে আসে। সেখান থেকে অন্যান্য আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে তিনি লখনৌ অভিমুখে যাত্রা করেন। ডঃ বাট্রস যিনি পেছনে ছিলেন, বলরামপুরের রাজপ্রাসাদে নিরাপদ আশ্রয় লাভ করেছিলেন। তিনি বন্ধুভাবে সেপাইদের কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ করলেন অশুপূর্ণ নয়নে। ডঃ বাট্রস হ্যাভলকের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। পূর্বের দিন উদ্ধারকারী সেনাদল এসে পৌঁছেছে। মিসেস বাট্রুস জানেন যে তাঁর স্বামী সেনাবাহিনীর সঙ্গে আছেন। কতিপয় অফিসার জানালেন যে, ডঃ বাট্রস জানেন যে, তাঁর স্বামী পরের দিন আসবেন। কিন্তু তিনি পরের দিন এলেন না। অবশেষে তিনি জানতে পেলেন, রেসিডেন্সির ফটকের বাইরে তার স্বামী নিহত হয়েছেন।

রেসিডেন্সীর রসদ ফুরিয়ে এলো। কমিসারিয়েট আর আটা সরবরাহ করতে পারছেন না, তার বদলে গম দেয়া হলো। সকলকেই সাধ্যমতো গম পিষতে হতো। ডাল খাওয়া এখন পরিপূর্ণরূপে বন্ধ করা হয়েছে। নুনের পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়েছে। দৈনিক ৬ আউন্সের বেশি মদ কারো জন্য বরাদ্দ করা হয় না। ৩রা অক্টোবর তারিখে কোথাও চিনি পাওয়া গেলো না। এক সের চিনির জন্য পঁচিশ টাকা দিতেও তাঁরা রাজী ছিলেন। ২৪ তারিখে রেশনের পরিমাণ আরো কমিয়ে দেয়া হলো, যাতে করে জমা রসদে ১লা ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। স্যার জেমস আউটরাম একটা লোককে এক হাজার টাকাসহ চিনি যোগাড় করতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু একদানা চিনিও যোগাড় করা সম্ভবপর হয়নি।

এই সময়ের মধ্যে মানসিং আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বেশিদূর এগুতে পারেননি। তিনি নির্দিষ্টভাবে কোনো পক্ষ অবলম্বন করেননি, তবে কথা দিয়েছেন তিনি ইংরেজদের সমর্থন করবেন। তিনি দু’পক্ষের যুদ্ধের গতি দেখছিলেন। বিশেষ দিকে মোড় নেয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করছিলেন। জুলাই মাসে তিনি তাঁর অন্যান্য তালুকদার ভাইদেরকে ইংরেজ পক্ষ সমর্থন করার জন্য প্রচারপত্র পাঠালেন। কিন্তু তা তাদের সিদ্ধান্তকে বিশেষভাবে প্রভাবান্ব