দীর্ঘকাল যাবত অযোধ্যার শাসনকর্তারা সর্বপ্রকারে মোগল দরবারের বশ্যতা মেনে চলতেন। নওয়াব সুজাউদ্দৌলা শাহজাদা শাহ আলমের সঙ্গে বিহার প্রদেশে অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। নওয়াব এবং শাহজাদার মিলিত সৈন্য ১৭৬৪ সালে বক্সারে স্যার হেকটো মুনরোর হাতে ভয়ঙ্করভাবে পর্যুদস্ত হন। লর্ড ক্লাইভ সম্রাট এবং তার উজিরের সঙ্গে এলাহাবাদের সন্ধি করে যে কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করেন, তার ফলে তারা সামরিক বিজয়ের পথ খোলাসা করেন। সম্রাট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার দেওয়ানী আদায়ের ভার দিলেন এবং বিদেশী শক্তির কাছে তাঁর সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিলেন।
অযোধ্যার পরবর্তী নওয়াবেরা এ সন্ধির সব শর্ত পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতেন। কিন্তু বলবান পক্ষ ধীরে ধীরে থাবা বিস্তার করে অযোধ্যার অর্ধেক রাজ্য গ্রাস করে নিলো এবং নওয়াবের অবস্থা এসে দাঁড়ালো একজন সামন্তের পর্যায়ে। সুজাউদ্দৌলা যিনি কোম্পানীর সঙ্গে অধীনতামূলক মিত্ৰতা করেছিলেন, তাঁর উত্তরাধিকারী আসফউদ্দৌল্লার মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র মির্জা আলী এবং আপন ভাই সাদত আলীর মধ্যে সিংহাসনে আরোহণ করার ব্যাপারে গণ্ডগোল বাধে। সে সময় বেনারসে থাকতত একদল ব্রিটিশ সৈন্য। সাদত আলীর দাবি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছে অধিকতরো সুবিধাজনক মনে হওয়ায় কোম্পানী তাঁকে সমর্থন করতে লাগলো। কিন্তু ব্রিটিশ প্রতিনিধির সঙ্গে নওয়াবের কল্যাণের জন্য যে ব্রিটিশ সৈন্য থাকবে তাদের জন্য অধিকতরো বার্ষিক বৃত্তি মঞ্জুর করিয়ে নিলেন। চার বছরের মধ্যে সন্ধিপত্র সংশোধন করতে হলো, নওয়াব আলীকে ১,৩৫,২৫,৪৭৪ টাকার বার্ষিক রাজস্বসম্পন্ন দোয়াব অঞ্চল পুরোনো পাওনার বাবদে ইংরেজকে ছেড়ে দিতে হলো। ১৮০১ সালে কৃত সন্ধিপত্রের ৬নং দফা অনুসারে নওয়াব সাদত আলী তার নিজ রাজ্য নিজের কর্মচারিদের মাধ্যমে প্রজাদের যেভাবে মঙ্গল হয়, সেভাবে শাসন করে যাচ্ছিলেন। তা ছাড়া তিনি এ ব্যাপারে সম্মানীত কোম্পানীর প্রতিনিধিদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নৈতিকভাবে নিজেকে অযোধ্যার জনসাধারণের মঙ্গলামঙ্গলের জন্য দায়ী মনে করতেন। কেননা রাজ্যের আভ্যন্তরীণ শাসন-ব্যবস্থাতেও তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিলো। নওয়াব সামন্তদের সঙ্গে যুদ্ধ করার সময়ে নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ সৈন্যের সহায়তা কামনা করতেন এবং ব্রিটিশ সৈন্যেরা সুরক্ষিত কেল্লার মধ্যে বাস করতো এবং মনে করতো রাজ্যের আইন তাদের ওপর প্রযোজ্য নয়। কিন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নওয়াব এবং তার অধীনস্থ ভূস্বামীদের মধ্যবর্তী বিবাদে যখন মনে করতো নওয়াবের কার্যই ন্যায়সঙ্গত তখন কোনো রকমের হস্তক্ষেপ করতো না। নওয়াব সাদত আলী সব সময় মনে করতেন, আপন নিরাপত্তার জন্য ব্রিটিশ সৈন্য পুষে তিনি অতিরিক্ত মূল্য প্রদান করছেন এবং নিজেকে অপমানিত জ্ঞান করতেন। ১৮১৪ সালে নওয়াব সাদত আলী মৃত্যুমুখে পতিত হলে তাঁর সন্তান গাজীউদ্দিন হায়দার সিংহাসনে আরোহণ করেন। নতুন নওয়াব নেপাল যুদ্ধে প্রবল মিত্রকে ব্যাপক আর্থিক সাহায্য করে তাঁদের সুনজরে পতিত হন। কোম্পানীর সরকার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলসমূহ তাঁর দখলে ছেড়ে দিলেন না শুধু, তাকে একজন প্রকৃত শাসকের মর্যাদাও দান করলেন। নতুন সৃষ্ট উপাধি ধারণ করে মুহম্মদ আলী শাহ্ এবং আমজাদ আলী শাহ্ পর পর সিংহাসনে আরোহণ করেন। ১৮৪৭ সালে শেষ নওয়াব ওয়াজিদ আলী শাহ্ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছাড়া অন্য নওয়াবেরা কোম্পানী সরকারকে প্রচুর পরিমাণে ঋণদান করে কোম্পানীর কর্মচারিদের সন্তুষ্ট করতেন, যাতে করে নওয়াবের মৃত্যুর পরে তার মনোনীত উত্তরাধিকারীদের ঠিকমতো বর্ধিত হারে সরকার থেকে বৃত্তি দান করা হয়।
১৮০১ সালের সন্ধি চুক্তি অনুসারে, সবকিছু সুনির্দিষ্ট করা হলেও শাসন কার্যে ধীরে ধীরে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। বিদেশী সঙ্গিনের তলায় নওয়াবের প্রকৃত ক্ষমতা চাপা পড়ে গেলো এবং তারা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করার জন্য স্বভাবতঃই উদগ্রীব ছিলেন। অধিকতর শক্তিশালী সামন্ত শাসকেরা দুর্নীতিপরায়ণ অফিসারদের অত্যাচারের বিরোধিতা করতেন। দুর্নীতি এবং খারাপ শাসনের ফলে অযোধ্যার অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। কোম্পানীর কর্তারা তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে সজাগ হয়ে উঠলেন। জোর করে ১৮৩৭ সালে ইংরেজরা মুহম্মদ আলী শাহকে একটি নতুন সন্ধি করতে বাধ্য করলেন। নতুন সন্ধিপত্রে ৭নং ধারার কড়াকড়ি অত্যন্ত ভয়াবহ ছিলো। পূর্বোল্লেখিত ৬নং ধারার সংশোধন করা হলো। এভাবে কোম্পানী পদে পদে নওয়াবের শাসনকার্যে হস্তক্ষেপ করার ফলে নওয়াব মুহম্মদ আলী মনে করলেন সন্ধির কারণে গুরুতরভাবে তাঁর সম্মানহানি হয়েছে। কিন্তু তিনি এও ভালো মতো জানতেন যে ব্রিটিশ সরকারের দয়ার ওপরই তার সবকিছু নির্ভর করছে। সুতরাং সন্ধিপত্রের শর্ত মেনে নেয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর রইলো না তার পক্ষে।
তাছাড়াও অধীনতামূলক মিত্রতার আরো কিছু দুর্বলতা ছিলো। ব্রিটিশ সরকারের অধীনতামূলক মিত্রতাসূত্রে আবদ্ধ দেশীয় রাজারা আভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক দিক থেকে নিরাপদ থাকে বিধায়, তাঁদের মধ্যে শৈথিল্য আসে, আলস্যের স্রোতে তাঁরা গা ভাসিয়ে দেন এবং ধীরে ধীরে রক্তের প্রখর তেজ কমে আসে। কোনো রকমের নীতির বন্ধনহীন এ সকল দেশীয় রাজপুরুষেরা নানারকম অপকর্ম এবং নিকৃষ্টতরো আনন্দে লিপ্ত হয়ে পড়েন। একমাত্র ব্রিটিশ রেসিডেন্ট ছাড়া আর কেউ তাঁদের অপমান থেকে নিষ্কৃতি পেতো না। তাদের ব্যবহার চূড়ান্তভাবে অসহ্য হয়ে না পড়লে ব্রিটিশ রেসিডেন্টও তাঁদের কোনো কার্যকলাপে সহজে হস্তক্ষেপ করতেন না। অযোগ্য অযোধ্যা শাসকেরা শাসনকার্যের সমস্ত দায়-দায়িত্ব তাদের খয়ের খা কর্মচারিদের হাতে দিয়ে নিজেদের হাল্কা করে নেন এবং কোম্পানীর কর্মচারির পরামর্শেও কোনো মনোযোগ দিতেন না।
