ঘাটের হত্যাকাণ্ডের পরে যারা বেঁচেছিলেন, তাদেরকে বন্দী করে নেয়া হয়েছিলো। পুরুষদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো। নারী এবং শিশুদের আলাদা ভবনে রাখা হয়েছিলো। সেখান থেকে তাদেরকে বিবিঘর নামক স্থানে চালান দেয়া হয়েছিল। যখন বিদ্রোহী নেতারা বুঝতে পারলেন যে তাঁরা আর কানপুর রক্ষা করতে পারবেন না, তখন সমস্ত বন্দীদের হত্যা করে একটি কুয়াতে ফেলে দিলো। হ্যাভলকের সৈন্যরা কানপুরে প্রবেশ করে মৃতদেহ দেখতে পেলো। যে ঘরে তাদের রাখা হয়েছিলো, তার মেঝেয় তখনো তাজা রক্ত।
বিবিঘরের হত্যাকাণ্ডের জন্য নানাকেও দায়ী করা হয়েছে। কর্ণেল উইলিয়ামের সামনে যে সকল প্রমাণ হাজির করা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে কোনো ফৌজদারী আদালত নানাকে অপরাধী বলে রায় দিতে পারে না। তবে নানার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ না থাকার অর্থ নানা নিরপরাধ নন। রাজনৈতিক এবং নৈতিকভাবে তাঁর বন্দীদের জানের জন্য নানাই দায়ী এবং তাদের নানার নামেই হত্যা করা হয়েছে। নানা সাহেব নিজে অস্বীকার করেছেন যে তিনি কোনো হত্যা করেননি। মহারাণী ভিক্টোরিয়া, পার্লিয়মেন্ট, কোর্ট অব ডিরেক্টরস, গভর্ণর জেনারেল, সকল প্রদেশের লেফটেনান্ট গভর্ণরবৃন্দ এবং সকল অফিসারের কাছে নিবেদিত এক ইস্তাহারনামাতে তিনি বলেছেন, নারী এবং শিশুদের হত্যার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিলো না। এ ইস্তাহারনামাটি রিচার্ডসনকে ১৮৬৯ সালের এপ্রিল মাসে প্রদান করা হয়। তাতে তিনি বলেছেন, “কানপুরে সেপাইরা আমার আদেশ না মেনে ইংরেজ মহিলা এবং শিশুদের হত্যা করে। যাদেরকে আমি কোনো রকমে রক্ষা করতে পারতাম তাদেরকে রক্ষা করেছি। তারা ছাউনি ত্যাগ করলে আমি তাদের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করেছি এবং তাদেরকে ভাটির দিকে এলাহাবাদ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছি। তারপরে আপনাদের সেপাইরা তাদের আক্রমণ করেছে। তবু আমি আমার সৈন্যদের নিবৃত্ত করে ২০০ শিশু এবং নারীর প্রাণ রক্ষা করেছি। আমি শুনতে পেলাম, যে সময়ে আমার সৈন্যরা কানপুর থেকে পালিয়ে এসেছে এবং আমার ভাই আহত হয়েছে, সে সময়ে আপনার সৈন্যরা এবং বদমায়েরা তাদের হত্যা করেছে। আপনারা যে ইস্তাহারনামা প্রকাশ করছেন, সে সম্বন্ধে আমি শুনেছি এবং জানি আপনারা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন এবং এ পর্যন্ত আমিও আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে আসছি। যতোদিন বাঁচি যুদ্ধ করেই যাবো।” একই মাসে তাঁতিয়া টোপীও একই রকম বলেছেন। তিনি বলেছেন, “প্রকৃত প্রস্তাবে বিদ্রোহীরা নানাকে বন্দী করেই রেখেছিলো। তাঁতিয়া টোপী সতীচৌরার ঘাটের হত্যাকাণ্ডের জন্য সেপাইদের দায়ী করেন।
এখন কথা হলো বিবিনগরের হত্যাকাণ্ড কখন সংঘটিত হয়? নানা সাহেবের বিঠুর যাত্রার আগে না পরে? তা বলা সত্যিই অসম্ভব। সে যাহোক বাজীরাওয়ের কন্যা কুসুম বাই বিশ্বাস করেন যে তাঁর ভাই নির্দোষ। বুড়ো বয়সে যখন তিনি পুনাতে যান, তখন ভি.কে. রাজওয়াদ এবং পাণ্ডব পাটওয়ার্দন তাঁর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেছেন, নানা বিদ্রোহী সেপাইদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো রকম সম্বন্ধ ছিলো না।
১৮ই জুলাই তারিখে রাতের অন্ধকারে নানা সাহেব বিটুর ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি গঙ্গায় ডুবে আত্মহত্যা করলেন। কিন্তু গুজব রটলো যে তিনি অযোধ্যা চলে গেছেন।
১৯ তারিখে মেজর স্টিফেনসন বিরে মার্চ করে বসলেন এবং পেশবার প্রাসাদ ধ্বংস করে ফেললেন। ২০ তারিখে নীল এসে পৌঁছালেন এবং হ্যাভলক লখনৌতে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। ২৫ তারিখে হ্যাভলক গঙ্গা অতিক্রম করলেন। তার বিজয়ী সৈন্যরা অযোধ্যার দিকে ধাওয়া করলো।
নীলের হাতেই কানপুরের কর্তৃত্ব ছেড়ে দেয়া হলো। তার কর্তব্য তো নগরে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং বদমায়েশদের শায়েস্তা করা। কিন্তু হ্যাভলক স্পষ্টভাবে বলেছেন তাকে, যতোদিন তিনি কানপুরে আছেন, ততদিন নীলের একটি নির্দেশ দেয়ার অধিকারও নেই। ২৫ তারিখে তিনি স্বাধীনভাবে ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, “প্রথমে কড়াকড়ি মানেই তো শেষে করুণা দেখানো।” অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নীল একটা নতুন পদ্ধতি বার করলেন। সে অনুসারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নিধনশালায় নিয়ে গিয়ে জোর করে কিছু রক্ত পরিষ্কার করাতে হবে। হতভাগ্যদেরকে যে সকল লোকের রক্ত পরিষ্কার করতে হতো, তাদের হত্যার পেছনে এদের কোনো হাত নেই।
যে সকল লোককে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে তাদের সংখ্যা কম ছিলো না। ইউরোপীয়দের প্রতি মুসলমানের ক্ষোভ এবং তীব্র ঘৃণ্য দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আর হিন্দুরা পরম ঔদাসীন্যের সাথে মৃত্যুকে গ্রহণ করেছে।
৫. অযোধ্যা : গজল কাননের অগ্নি-গোধূলি
অযোধ্যা ছিলো একটি পুরোনো প্রদেশ। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তাতে এক রাজবংশ জেগে উঠেছে। মাত্র ৮৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে পাঁচজন রাজা সিংহাসনে আরোহণ করেছেন। ক্ষমতাসীন শাসকেরা পারস্য থেকে এদেশে আসেন এবং তারা শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছিলেন। এ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মোগল দরবারের একজন সামন্ত।
মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সময়ে উজির অথবা সম্রাটের শাসক প্রতিনিধির পদ বংশানুক্রমিক হয়ে যায় এবং অযোধ্যা প্রদেশে স্থাপিত হয় শাসনকর্তার সদর দফতর।
