কিন্তু নীলের এলাহাবাদে পৌঁছাতে বেশি দেরী লাগলো না। বেনারস থেকে যাত্রা করলেন ৯ই জুন এবং ১২ই জুন তারিখে এলাহবাদে এসে উপনীত হলেন। রাস্তা দুর্গম, কোনো ঘোড়া পাওয়া গেলো না। তা সত্ত্বেও তিনি চলে এলেন। তিনি কৃষকদের তার কোচ বয়ে নিতে বাধ্য করলেন বটে, কিন্তু প্রখর রৌদ্র থেকে বাঁচতে পারলেন না। এলাহাবাদে যখন এলেন, তাঁর শরীরে একটুকু শক্তিও অবশিষ্ট নাই। কিন্তু বিলম্ব করার সময় নেই তখন। দুর্গ কোনো রকমে রক্ষা পেলেও বিদ্রোহীরা শহর অধিকার করে নিয়েছে। দুর্গের অভ্যন্তরে শিখ এবং ইউরোপীয়রা অতিরিক্ত মদ্য পান করেছে। উপস্থিত মুহূর্তে কড়াকড়ি আইন-শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা যদি না করা হয়, তা হলে যে কোনো মুহূর্তে দুর্গ বিপন্ন হতে পারে। দারাগঞ্জ এবং কিদগঞ্জে গুলিবর্ষণ করা হলো। শহর ব্রিটিশ সেনাদের দখলে চলে এলো। ১৭ তারিখে মৌলবি লিয়াকত আলী তার সদর দফতর ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।
তার পরেই কিন্তু নীল কানপুর যাত্রা করেননি। অপরাধীদের শাস্তি দান এবং যারা দোদুল্যমান তাদের শঙ্কিত করে তোলাই হলো তাঁর চিরাচরিত নীতি। নদীপথে এবং স্থলপথে শাস্তিদানের জন্য অভিযান চালনা করা হলো। সামরিক অফিসারদের চাইতে বেসামরিক অফিসারেরা এ দেশী নিগারদের বাড়িঘর জ্বালাতে এবং তাদেরকে ফাঁসিকাঠে ঝুলাতে অধিক উৎসাহ দেখিয়েছে। শুধু দোষীদের নয়। সন্দেহভাজন, নির্দোষ, নারী-পুরুষ সকলকেই নির্বিশেষে ফাঁসিকাঠে ঝুলানোর খবর ভারত সরকার জানতে পারলো। তাতে করে অধিকাংশ অধিবাসীর মনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণার সঞ্চার হলো। নীল ভুলে গিয়েছিলেন যে সমস্ত ভারতীয়দের ফাঁসিকাঠে ঝুলানো যাবে না। স্থানীয় অধিবাসীদের সাহায্য এবং সহযোগিতা ছাড়া তিনি মালপত্র বয়ে নেবার জন্য পশু এবং গরুর গাড়ি যোগাড় করতে পারতেন না। তার কঠোর দণ্ডের ভয়ে গ্রামের কৃষক এবং তাদের সঙ্গে সৈন্যদের নিত্য প্রয়োজনীয় শ্রমিকেরাও অদৃশ্য হয়ে গেছে। এমনকি ২০ তারিখে এলাহাবাদ ছেড়ে গেলেও কানপুর রক্ষা পেতো। ২৩ তারিখে যদিও ৪০০ ইউরোপীয় ও ৩০০ শিখ সৈন্য মার্চ করবার জন্য তৈরি হলো, তবু মালপত্র বয়ে নেয়ার মতো পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থা তিনি করে উঠতে পারলেন না। পাঁচ দিন পরেও এ অচলাবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। অথচ মেজর রিও সৈন্যদের সঙ্গে ৩০ তারিখে যাত্রা করবেন বলে স্থির করেছিলেন। ৩০শে জুন তারিখে হ্যাভলক কানপুরে এসে আধিনায়কত্ব গ্রহণ করলেন। হুইলারকে যে অবরোধ করে রাখা হয়েছে এ সংবাদ তিনি লখনৌতেই পেয়েছেন।
হেনরী হ্যাভলক ৪২ বছর ধরে সামরিক বিভাগে চাকুরি করেছেন। কানপুর এবং লখনৌতে বিদ্রোহ দমন করার পূর্বে তিনি আফগানিস্তান, পাঞ্জাব এবং পারস্যে যুদ্ধ করেছেন। তিনি ছিলেন সমর বিজ্ঞানের পরিশ্রমী ছাত্র। নেপোলিয়নের সমস্ত অভিযান সম্পর্কে অন্তরঙ্গ পরিচয় তাঁর ছিলো বলে জানতো সকলে। লখনৌতে তিনি লর্ড মেকলের লেখা ইংল্যান্ডের ইতিহাস অধ্যয়ন করছিলেন অবসর সময়ে। নিষ্ঠাবান খ্রীস্টান এবং শ্রীরামপুরের মিশনের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ইস্পাতের তৈরি মানুষ ছাড়া কেউ নীলকে তাঁর নিজের জায়গায় স্থির রাখতে পারতো না। জেনারেল হ্যাভলক রিকে যেখানে আছে সেখানে থেকেই সামনে এবং দুদিকে দৃষ্টি রাখতে নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, আগামীকাল ৪ তারিখে যে সৈন্য আসবে তাদেরকে দিয়ে সংখ্যা বৃদ্ধি করবো এবং শক্তিশালী করে তুলবো। আর গ্রাম জ্বালিয়ো না, বিদ্রোহীদের দেখা না পেলে যতদূর সম্ভব ইউরোপীয় সৈন্যদের টানা হেঁচড়া করবে না। কিন্তু নীল তখনো বিশ্বাস করতে পারেননি যে কানপুরের পতন ঘটেছে। রিণ্ডের সৌভাগ্য, অতি দ্রুত কথামতো হ্যাভলক এসে তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন। পূর্বদিন মধ্যরাতে হ্যাভলক ছাউনি ছেড়েছেন এবং পরদিন অতিপ্রত্যুষে রিণ্ডের সঙ্গে যোগ দিলেন। উভয় পক্ষই অবাক হয়ে গেলো। রিও ফতেহপুরে অল্প সংখ্যক সেপাইয়ের কথা ভেবেছিলেন এবং নানার সৈন্যরা হ্যাভলকের আগমনের কোনো সংবাদই রাখতো না। হ্যাভলক যদি সময় মতো সমরসম্ভার নিয়ে হাজির না হতেন, তাহলে রিণ্ডের অল্প সংখ্যক সৈন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো।
বিচারক টুকার ছাড়া আর সকল ব্রিটিশ অফিসার ৯ তারিখে ফতেহপুর ছেড়ে চলে গেছেন। ৬ তারিখ পর্যন্ত সামরিক ছাউনি প্রশান্ত ছিলো। তারপরে সেপাইরা বাজারে বেনারসের সেপাইদের বিদ্রোহের গুজব শুনতে পেলো। গুজব রটলো শান্তভাবে প্যারেড করার সময়ে ইউরোপীয় সৈন্যরা শিখ এবং পুরবীয়া সম্প্রদায়ের সেপাইদের গুলি করে হত্যা করেছে। তিনদিন পরে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করলো। ছাউনিতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বত্রিশ দিন সময়ের প্রয়োজন হয়। তারপরে শুরু হয় আওঙ্গের যুদ্ধ। সেদিন জুলাই মাসের ১৫ তারিখ। একই দিনে পাণ্ডু নদী অতিক্রম করা হলো। নদীতে জলস্ফীতি ঘটেছে, কিন্তু সেতুটা তখনো অক্ষত ছিলো। আশঙ্কা হচ্ছিলো, যে কোনো মুহূর্তে সেতু ভেঙ্গে দেয়া হতে পারে। সেজন্য হ্যাভলক কালক্ষেপণ না করে সেতু অতিক্রম করতে ছুটলেন। তাঁর ক্লান্ত-শ্রান্ত সৈন্যদের কোনো বিশ্রামই দিলেন না। সেতুটা যে কেনো ধ্বংস করা হয়নি তা ব্যাখ্যা করা বড়োই মুশকিল। নদী অতিক্রম করা হলেও কানপুরের যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। হ্যাভলক বন্দীদের মুক্ত করার জন্য বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি মনে করেছিলেন নারী এবং শিশুরা নানার হাতে বন্দী অবস্থায় কাল যাপন করেছে। বিনা যুদ্ধে নানা তার সদর দফতর ছেড়ে যেতে রাজী হলেন না। কিন্তু তার শেষ প্রচেষ্টাও প্রাথমিক প্রচেষ্টার মতো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। ১৭ই জুলাই তারিখে এলাহাবাদ থেকে আসার পরের দিন তার বিজয়ী বাহিনী নিয়ে হ্যাভলক কানপুরে প্রবেশ করলেন। কিন্তু তার স্বজাতি মহিলাদের মুক্তি দেয়ার ভাগ্য তার ছিলো না।
