তাঁর নিজস্ব নীতি অসুসরণ করে বিদ্রোহকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে পেরেছেন ভেবে নীল অত্যন্ত খুশী হলেন। তিনি বিদ্রোহী এবং নিরস্ত্র লোকদের ব্রিটিশ অস্ত্রের তেজ দেখাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। ম্যারি লিখেছেন, “আমাদের সামরিক অফিসারেরা সব রকমের অপরাধীদের খুঁজে এনে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন।” একমাস পর একজন পুরোহিত ব্রিটিশ নৃশংসতা প্রসঙ্গে লিখেছেন, “তাকালেই চোখে পড়বে সারি সারি ফাঁসি কাঠ, তাতে সাহসী কর্ণেল ধরে আনা বিদ্রোহীদেরকে লটকিয়ে দিচ্ছেন। বালক, রমণী, পথচারী, কেউ রক্ষা পায়নি। সকলকেই ফাঁসিকাষ্ঠে লটকিয়েছেন। ইউরোপীয়দের নৃশংসতা দেখে এদেশবাসীরা মনে করতে লাগলো, ইউরোপীয়রা মানুষের বেশে শয়তান ছাড়া আর কিছু নয়।
বেনারসের বিদ্রোহ ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এলাহাবাদ, ফতেহপুর, ফৈজাবাদ এবং জৈনপুরের সেপাইরা জানতে পারলো নির্দোষ সেপাইদের সঙ্গে সন্দেহপ্রবণ অফিসারেরা কি নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছে। তারা অনুভব করলো, তাদের মধ্যে সবচেয়ে যারা অনুগত তারাও অফিসারদের সন্দেহপ্রবণতা থেকে রক্ষা পাবে না।
পরের দিনেই এলাহাবাদের সংবাদ কানপুরে এসে পৌঁছালো। সে রাতেই দুর্গের ইউরোপীয় নারী এবং সামরিক অধিবাসীদের নিরাপদ স্থানে চলে যেতে আদেশ দেয়া হয়েছিলো। কেউ তাতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেনি। রাতে বিদ্রোহ করবে সেপাইরা, এ রকম অনুমান করা হয়েছিলো, কিন্তু কিছুই ঘটলো না। কতিপয় লোক সকালে তাদের নিজ নিজ বাঙলোতে ফিরে এলেন।
কানপুর থেকে নির্দেশ এসেছে, যে সকল ইউরোপীয় পাওয়া যায়, তাদের নিয়ে দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দৃঢ় করতে। কিন্তু ইউরোপীয়রা সংখ্যায় যথেষ্ট ছিলো না। চুনার থেকে মাত্র ৬০জন পেনশন ভোগী গোলন্দাজ সেনা এসেছে, সে সঙ্গে এসেছেন কয়েকজন সার্জেন্ট। তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যোগ দিলেন ষাটজন বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবক। সামরিক ছাউনির প্রধান অবলম্বন হলো ক্যাপটেন ব্রেসিয়ারের অধীন ৪৫০ জন শিখ সৈন্য এবং ৬নং দেশীয় অশ্বারোহী বাহিনীর ৮০ জন ঘোড়সওয়ার। বাকি সৈন্যদেরকে দু’মাইল দূরে তাদের লাইনে রাখা হলো। তারা স্বেচ্ছায় দিল্লীর বিরুদ্ধে যাত্রা করার প্রস্তাব দিয়েছিলো। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় প্যারেডে তারা সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করেছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করলো। এটা অনুমান করা হয়ে থাকে যে ৬নং বাহিনী প্রথম থেকেই বিশ্বাসঘাতকতা করছিলো। শিখদেরকেও ভিড়াবার জন্য তারা এতোকাল অপেক্ষা করেছিলো। বেনারস থেকে কতিপয় মানুষ সেপাই লাইনে এসে খবর দিলো যে সেপাইদেরকে পয়লা নিরস্ত্র করে তারপরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ব্রিটিশ অফিসারেরা বাঙালি পল্টনকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ফিচেট নামে এক জন ড্রামবাদক তাদেরকে জানালো যে ইউরোপীয়রা তাদেরকে নিরস্ত্র করতে ছুটে আসছে। কিন্তু সেপাইদের পূর্বের কোনো ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে তিনি জানতেন না। সেপাইরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলেই, তাদের সাথে এসে যোগ দিলো শহরের একদল উদ্খল জনতা। তারা কারাগারে গিয়ে কয়েদীদের মুক্তি দান করলো। ইউরোপীয়দেরকে খুঁজে এনে হত্যা করা হতে লাগলো। বাঙলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো। সর্বত্র অরাজকতা ছড়িয়ে পড়লো। শুধু খ্রীস্টান অধিবাসীরাই নয়, হিন্দু তীর্থযাত্রীরাও গুণ্ডা বদমায়েশদের অত্যাচার হতে রক্ষা পায়নি।
দুর্গের অভ্যন্তরে শিখেরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিলো, ক্যাপটেন ব্রেসিয়ার তাদের শান্ত রাখলেন। তিনি মালী হিসেবে জীবন শুরু করেছিলেন, আপন দক্ষতার গুণে কমিশন লাভ করে ক্যাপ্টেনের পদে উন্নীত হয়েছিলেন। তিনি শুধু তার অধীন সেপাইদেরকে শান্ত রাখেননি, তাদের সাহায্যে দুর্গের ভেতরের ৬নং বাহিনীর সেপাইদের নিরস্ত্র করতেও সক্ষম হয়েছিলেন। ৬নং রেজিমেন্ট আতঙ্কে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলো। বিদ্রোহ ঘোষণা করে লুঠতরাজ করতে মনোযোগ দিলো এবং পরবর্তী যুদ্ধের কথা না ভেবে লুটের মালপত্র নিয়ে সেপাইরা আপন আপন ঘরে চলে গেলো।
এ সঙ্কটকালে সেপাইদের নেতৃত্বদান করতে এগিয়ে এলেন, একজন অতি সাধারণ মানুষ। তার নাম মৌলবি লিয়াকত আলী। তিনি ছিলেন জাতে তাঁতী এবং পেশায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সমস্ত অধিবাসীরা তাকে শ্রদ্ধা করতো বলে তাঁর নেতৃত্বে কেউ কোনো আপত্তি তোলেনি। তার কোনো সম্পদ ছিলো না, ছিলো না কোনো আভিজাত্য। চরিত্রবান এবং দয়ালু বলেই তিনি অধিনায়ক হিসেবে ভর্তি হলেন। দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি দিল্লীর সম্রাটের নামে শাসনকার্য চালাতে শুরু করেন। তিনি শান্তি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন এবং আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতেও চেষ্টা করেছিলেন। তিনি যে তাতে ব্যর্থ হয়েছেন সে কথা বলাই বাহুল্য। একটুকু সামরিক অভিজ্ঞতাও তার ছিলো না। কিছুমাত্র সামরিক অভিজ্ঞতা থাকলে তিনি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতেন। তা না হলে জনসাধারণের এক বাক্যে আস্থা স্থাপন করার মতো কোন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বও যদি হতেন, হয়তো শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। তাঁর কৃতিত্ব হলো, অনেক ভারতীয় খ্রীস্টান ধর্ম ত্যাগ করে তাদের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলো।
