ফোরজেট বলেন, বোম্বের ইউরোপীয়রা শুধু বিশ্বাসই করেনি বরঞ্চ লর্ড এলফিন স্টোনের কাছে অভিযোগ রয়েছে যে জগন্নাথ শঙ্কর শেঠের মতো একজন প্রগাঢ় পণ্ডিত ব্যক্তি এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিও নানা সাহেবের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, জামকান্দির রাজার স্বপক্ষে যদি বোম্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যারিস্টার মিঃ বারটোনকে নিয়োগ না করেন, তা হলে তাঁর ফাঁসি হয়ে যাবে।
অল্প সময়ের মধ্যে নৌকাগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিলো। সেগুলো মাঝিদের নৌকা ছিলো না। মহেশ্বরীর সাগেরওয়াল সম্প্রদায়ের বানিয়ারাই ছিলো মালিক। মালিকদেরকে যথোপযুক্ত ভাবে ক্ষতিপূরণ করা হয়েছিলো। ২৬ তারিখ সন্ধ্যায় অনেকে নৌকাগুলো পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন, তখনও অনেক নৌকায় বাঁশের ছাদ ইত্যাদি লাগানো হয়নি। তবে নৌকাগুলোকে উপযুক্ত করার জন্য হাজার হাজার শ্রমিক দিনে রাতে কাজ করে যাচ্ছিলো। নানা যদি এ ষড়যন্ত্রে অংশ নিতেন তাহলে এতো টাকা এবং শ্রম ব্যয় করার কি প্রয়োজন ছিলো, তা ভাবলে একটু অবাক হতে হয়। কারণ ছাউনিতে তো ইংরেজেরা নিরাশ্রয়ই ছিলেন, নদীতেও তাদেরকে একই রকম অবস্থার মধ্যে রাখার জন্য অতো সাধ্য সাধনার কি প্রয়োজন। তাদের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র ছিলো, বেপরোয়া সংগ্রামে পরাজিত না করে তাদের স্ত্রী এবং শিশুদের যে নিহত হতে দেবে না তা তো একরকম নিশ্চিতই ছিলো।
সে সময়ে হুইলার এবং তাঁর সঙ্গীরা মরীয়া হয়ে অনশনরত অবস্থায়ও সেপাইদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছিলেন কানপুরে। নীল তখন কঠোর হস্তে এলাহাবাদের বিদ্রোহ দমন করছেন। খুব শীগগিরই দিল্লী এবং মীরাটের সংবাদ লর্ড ক্যানিং-এর কাছে এসে পৌঁছালো। নীল এবং তার সহকর্মীদের মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় তলব করা হলো। নীল ছিলেন দৃঢ়চিত্ত এবং নির্দয় মানুষ। তাঁর মতো সেকেলে গোঁড়া খ্রীস্টান হয়তো ক্রমওয়েলের সময়ের জন্য যথোপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন। আত্মবিশ্বাসের কারণে তিনি নেতা হিসেবে উপযুক্ত হলেও সহকারি হিসেবে নিতান্তই অনুপযুক্ত ছিলেন। তিনি কলকাতায় এসে পৌঁছালেন। হাওড়ার রেলওয়ে কর্মচারিদের সঙ্গে তিনি যে ব্যবহার করেছিলেন তা থেকে মানুষটির ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে জানা যায়। সেনাবাহিনীকে ট্রেনে স্থান দিতে অক্ষম স্টেশন মাস্টার এবং ইঞ্জিনীয়ারকে প্রহরাধীনে রেখে দশ মিনিট পরে ট্রেন এসে পৌঁছালে তাঁর সৈন্যরা নির্বিবাদে স্থান দখল করে নেয়। নীল রেলওয়ের কর্মচারিদের বলতে ভোলেননি যে তাঁদের ব্যবহার বিদ্রোহীদের মতে, তাঁদের সৌভাগ্য যে সামরিক বাহিনীকে এজন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়নি। নীলের পরবর্তী লক্ষ্য হলো কানপুর এবং বেনারসে সৈন্য পাঠানো। তবে উপস্থিত মুহূর্তে তিনি বেনারস যাত্রা করলেন।
বেনারস ভারত সরকারের অপরিসীম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এ স্থান শুধুমাত্র হিন্দুদের তীর্থস্থান নয়, বর্তমানে ইসলাম ধর্মীয় দিল্লীর সম্রাটের কোন কোন বংশধর বেনারসে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করেছে। কোন গোলযোগ দেখা দিলে তারা সরকারের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে পারেন। তা ছাড়াও বেনারস পাটনা এবং এলাহাবাদের রাজপথের মাঝখানে অবস্থিত বলে এর সামরিক গুরুত্বও অপরিসীম। কঠোর শাসনকর্তাদের হাতে না পড়লে বেনারস সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ থাকতে পারতো। গাবিনস যিনি জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, অনেক সাহস, কৌশল এবং দৃঢ়তার পরিচয় দেখিয়েছেন। কালেক্টর লিন্ড সহজে ধৈর্য হারিয়ে বসেননি। কমিশনার টুকার সাহেব ছিলেন একজন গোঁড়া খ্রীস্টান। তিনি আপন ধর্মবিশ্বাসে অটল ছিলেন। নিজের প্রচেষ্টার চাইতে দৈবশক্তিতে অধিক বিশ্বাসী ছিলেন। উদাসীনভাবে তিনি তাঁর ওপর ন্যস্ত কর্তব্য শেষ করেন। শহরে নিরস্ত্র অবস্থায় বের হতেন। কেবল মাত্র চাবুকখানিই তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সামরিক ছাউনির কর্তাদের মধ্যে ধৈর্যের অভাব ছিলো। পনেরো বছর আগে ব্রিগেডিয়ার পসনবি আফগানিস্থানে প্রচুর সুনাম অর্জন করেছেন। সাহসে তার সমান কেউ ছিলো না। কিন্তু বেনারসে সেপাইদের বিদ্রোহের সংবাদ এসে পৌঁছালে অলফার্টস এবং ওয়াটসন তাকে বোঝালেন যে তাঁদের বেনারস ত্যাগ করে সুরক্ষিত চুনার দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বেসামরিক অফিসারেরা সম্মিলিতভাবে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেন। শুধু তাই নয়, যে সকল সৈন্য পূর্বাঞ্চল হতে কানপুরে এসেছিলো তাদেরকে কানপুরে পাঠিয়ে দিলেন। সামরিক কর্তারা সব সময় তার বিরোধিতা করেছে। কিন্তু টুকার স্যার হেনরী লরেন্সের বারবার সনির্বন্ধ অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারেননি।
৩রা জুন তারিখে নীল বেনারসে এলেন। কানপুরের অবস্থা তখনো শান্ত, তবে লখনৌতে সেপাইরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে ৪ তারিখে, খবর এলো আজমগড়ে গোলমাল আরম্ভ হয়েছে। সেপাইরা রাজকোষ দখল করে নিয়েছে। অনিয়মিত সেপাইরা অফিসারদের নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তারা বিদ্রোহী সেপাইদের বিপক্ষে অস্ত্র ধারণ করতে সাহসী হলো না। সামরিক কর্তারা সাহস হারিয়ে ফেললেন। তাঁরা ভয় করতে লাগলেন যে আজমগড়ের দেখাদেখি বেনারসের সেপাইরাও বিদ্রোহ করে বসবে। গাবিন্সের অতিরিক্ত কড়াকড়ি ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে সে ভয় আরো বহুগুণে বেড়ে গেলো। পসনবির সঙ্গে নীল কোথায় এবং কখন সাক্ষাৎ করেছিলেন, সে সম্বন্ধে কিছুই জানা যায়নি, তবে তিনি যে ৩৭নং দেশীয় বাহিনীকে নিরস্ত্র করবার জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বাহিনীর অধিনায়ক মেজর ব্রেট কিন্তু সেপাইদের আনুগত্যের প্রতি কোনোরকমের সন্দেহও পোষণ করেননি। সাধারণতঃ শিখেরা অন্যান্যদের তুলনায় অধিক অনুগত। অশ্বারোহী বাহিনী সম্বন্ধেও একই কথা খাটে। তাদের এবং ইউরোপীয় সৈন্যদের সাহায্যেই সন্দেহপ্রবণ সৈন্যদের নিকট হতে অস্ত্র কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। বিকেল পাঁচটায় প্যারেডের ব্যবস্থা করা হলো। ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে রাইফেল জমা দেয়ার নির্দেশ জারী করা হলো। একের পর এক ছ’টি কোম্পানী অস্ত্র পরিত্যাগ করলো। তারপরে গুলি ভর্তি বন্দুক হাতে ইউরোপীয় সৈন্যরা এসে উপস্থিত হলো। পাঞ্জাবে থাকার সময় থেকে সেপাইদের অভিজ্ঞতা হয়েছে যে ইউরোপীয়দের আসার অর্থ হলো তাদের মৃত্যু। চারদিকে চীৎকার উঠলো ইউরোপীয়রা তাদেরকে হত্যা করতে আসছে। পসনবি তাদেরকে নিশ্চিন্ত করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেপাইরা চীৎকার করে জানিয়ে দিলো যে তারা কোনো অপরাধ করেনি। আদেশ পালন করতে বলা ছাড়া পসনবির অন্য কোনো কিছু সেপাইদের কাছে বলার ছিলো না। বিনা দোষে এ কঠিন দণ্ড অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের ওপর নেমে আসতে দেখে সেপাইরা স্থির থাকতে পারলো না। কেউ কেউ অস্ত্রের জন্য হাত বাড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় সৈন্যরা তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করতে লাগলো। সেপাইরা গুলি ছুঁড়ে প্রত্যুত্তর দিলো। শিখ এবং অনিয়মিত সেপাইরা এসবের কিছুই জানতো না। এলোপাথাড়ি গুলিগোলা চলতে দেখে তারাও গুলি ছুঁড়তে লাগলো। এভাবেই অনুগত সৈন্যরা বিদ্রোহ করে বসলো। নীল অধিনায়কত্ব গ্রহণ করলেন। অল্পসংখ্যক সশস্ত্র সৈন্যের পক্ষে অনেকগুণ বেশি সেপাইদের নিরস্ত্র করা কম সাহসের কথা নয়। টুকার নিশ্চিত করে বলেছেন যে অতি কষ্টে সেপাইদেরকে নিরস্ত্র করা সম্ভবপর হয়েছিলো। তার সঙ্গে গভর্ণর জেনারেলের বক্তব্যের মিল রয়েছে।
