যদিও কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই, তবু এ কাহিনী একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় । কামান পাতা হয়েছিলো এবং নদীতীরে সৈন্য পাঠানো হয়েছিলো সে কথা একেবারে অস্বীকার করা যায় না। নৌকার গুরু দয়াল এবং লোচন চৌধুরীর মতে, সংকেত অনুসারে একটি নৌকায় গুলি ছোঁড়া হয়েছিলো এবং তারপরে বিনা সঙ্কেতেই অপরাপর নৌকাগুলোর ওপর আক্রমণ চলে। চৌহান জমিদারদের উপস্থিতির আয়োজন হয়তো পূর্বাহ্নে করা হয়নি। কারণ এ খবর ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিলো। ইংরেজদের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখবার জন্য দূর-দূরান্তের গ্রামবাসীরা সকালে নদীতীরে জমায়েত হয়েছিলো। এ ষড়যন্ত্রে নানা সাহেব কোন অংশগ্রহণ করেছিলেন কিনা তা বলা সহজ নয়। বিদ্রোহী সেপাইদের নেতা হিসেবে সমস্ত দুস্কৃতির সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন বলে বলতে হয় এবং বাস্তবিক দিয়ে দেখতে গেলে তাঁকেই পুরোপুরি দায়ী করতে হয়। কিন্তু জনল্যাভ এ বিষয়ে তাঁকে সন্দেহ করেই ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, কানপুরে ১৮৫৭ সালে জুলাই মাসে যে সকল লোক বিশ্বাসঘাতকতা করে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের অনুষ্ঠান করেছে, সে সম্বন্ধে পত্রাদি পাঠ করার পরে আমি ভয়ঙ্করভাবে মর্মাহত হয়েছি, নানা সাহেব ইংরেজ ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রলোকদের অন্তরঙ্গভাবে না হলেও অনেক বেশি দেখেছেন। অনেক হতভাগ্যের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ছিলো। এটা বিশ্বাস করা যায়, তিনি নৌকা যখন তৈরি করতে আদেশ দিলেন, তিনি সরল ভাবে আশা করেছিলেন যে খ্রীস্টানদের কলকাতায় যেতে দেয়া উচিত। কিন্তু যা ঘটেছে তাতে নানা সাহেবের নির্দেশকে খেলাফ করা হয়েছে। কারণ সেপাইরা চেয়েছিলো, নানা সাহেব এবং ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে বিভেদ এতো প্রবল হোক যাতে করে নানা সাহেব এবং সরকারের মধ্যে কোন রকমের সন্ধি হতে না পারে। সুতরাং তারা ইচ্ছা করে এ কাজ করেছে। ব্রিটিশ যদি আবার ভারতের অধিপতি হয়ে বসে তাহলে যারা আত্মসমর্পণ করেছেন, তাদেরকে রক্ষা করার জন্য তাঁর আপন জীবনও রক্ষা পাবে এ কথা নানা সাহেবের চাইতে ভালোভাবে কেউ জানতো না। যে সকল মহিলা এবং শিশু সেপাইদের গুলি এবং তরবারি থেকে রক্ষা পেয়েছিলো তার জন্য নানা সাহেবই দায়ী ছিলেন। কারণ, তারই নির্দেশে হত্যাকান্ড বন্ধ করা হয়েছিলো। কর্ণেল মড এ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে নানা সাহেবকে শিশু এবং নারী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করতে গিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। তিনি লিখেছেন, কর্ণেল উইলিয়াম যে সকল প্রমাণ সগ্রহ করেছেন, সে সকল অতি সাবধানতা সহকারে এবং কোনো রকমের পক্ষপাত ছাড়া পাঠ করলে নানা সাহেব আমাদের শিশু এবং নারীদের হত্যার জন্য দায়ী ছিলেন কিনা এ সম্বন্ধে মনে সন্দেহের উদয় না হয়ে যায় না। অথচ সাধারণতঃ বিশ্বাস করা হয়ে থাকে যে এতে প্রধান ভূমিকা তিনিই গ্রহণ করেছিলেন। আমার নিজের মত হলো, ব্যক্তিগতভাবে তাঁর হাত থাকলেও, এ ব্যাপারে তিনি তাঁর রক্তপিপাসু অনুচরদের দ্বারা বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ তাদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার সাহস তাঁর ছিলো না। এমনকি আমাদের দেশেও বর্তমানে একই রকম নৃশংস জঘন্যতাকে মেনে নেয়া হয়। এটা নিশ্চিত যে আত্মসমর্পণ যারা করেছেন, নানা তাঁদের সঙ্গে একবারের বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করেছেন। ঘাটের হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো নৃশংস ব্যক্তিত্বের হাত ছিলো। সুদক্ষ ষড়যন্ত্রকারী না হলে এমনটি হয় না নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এতে নানার কোনো হাত ছিলো না।
এ ষড়যন্ত্রের পেছনে কোনো পরিণত বুদ্ধি কাজ করেছিলো, আজকের দিনে তা খুঁজতে যাওয়ার কোনো অর্থ হয় না। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, ১৮৫৭ সালে উভয় পক্ষই মানবতাকে পদতলে দলিত করেছে। এটা স্বীকৃত সত্য যে কানপুরে বিদ্রোহ ঘোষণার পরেও কোনো সেপাই অফিসারদের গায়ে হাত তোলেনি। ম্যারী থমসন স্বীকার করেছেন যে অবরোধের কয়েকদিন পরে ইংরেজরা কোনো বন্দীকে কোন রকম বিচার না করেই হত্যা করেছে। নীল এবং তার সঙ্গীরা যে অমানুষিক হত্যাকাণ্ডের আয়োজন করেছেন, সে সম্বন্ধে সেপাইরা পুরোপুরি ওয়াকেবহাল ছিলো। মৌলবি লিয়াকত আলী কানপুরে পৌঁছে নীলের হত্যাকাণ্ডের খবর সেপাইদের অবশ্যই দিয়েছেন। হোম বলেছেন, “বুড়ো মানুষ, দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ স্ত্রীলোকেরাও আমাদের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে।” নীল যে সাধ করে গ্রাম জ্বালাননি কিংবা নিরপরাধ লোককে হত্যা করেননি, এটা নিহত ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজনের সান্ত্বনার কারণ নয়। নীলের এলাহাবাদের হত্যাকাণ্ডের পরেই কানপুরের সতীচৌরার ঘাটের হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক ভাবে নানা সাহেবকে দায়ী করলে নৈতিকদিক দিয়ে নীলকে দায়ী করতে হয়। কঠোর পন্থা অবলম্বন করে তিনি যদি গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে না দিতেন, তা হলে জেনারেল হুইলার যখন সাহায্যের আবেদন করেছিলেন সে সময়ে তিনি কানপুর আসতে পারতেন।
জাওলা প্রসাদ, বলরাও এবং আজিমুল্লাহকে তাঁতিয়া টোপীর সঙ্গে ২৭শে জুন ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো। কোতোয়াল হুলাজ সিং দু’দিন আগে এ ষড়যন্ত্রের কথা শুনেছিলেন, সেজন্য তিনি সেদিন সকালবেলা নদীর ঘাটে যাননি। হুলাজ সিং-এর মতে কাজী ওয়াসিউদ্দীন নামে এক ব্যক্তি এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করছিলেন। তাঁর মতে, দুদিন আগে থেকে ইউরোপীয়দের জন্য নৌকা তৈরি করে রাখা হয়েছিলো। অশ্বারোহী বাহিনীর দু’জন সরদারের সঙ্গে এক সন্ধ্যায় তিনি কাজী সাহেবকে কিভাবে ইউরোপীয়দের হত্যা করা যায় সে বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে শুনেছেন। তিনি সে সময়ে ঘরে প্রবেশ করে আলোচনা শুনতে পেলেন। তাঁরা স্থির করে ফেলেছেন, ইউরোপীয়দেরকে হত্যা করাটা মোটেও বে-আইনী হবে না। এখানে আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে বিচারের সময় যারা সাক্ষ্য দিয়েছিলো তারা অনেকে আপন প্রাণ বাঁচাবার জন্য মিথ্যা কথা বলেছে। আবার অনেকে পুরস্কারের আশায়ও মিথ্যা কথা বলেছে। স্বাভাবিক সময়ে যে সকল সাক্ষীকে আগ্রাহ্য করা হতো কিন্তু বিদ্রোহের পরে সে সকল চাঞ্চল্যকর কাহিনীকেই সত্য বলে ধরে নেয়া হয়েছে।
