তারপরে কি ঘটলো তা আমরা ম্যারী থমসনের জবানীতেই ব্যক্ত করেছি, “সে সকালে নদীর তীরে প্রচুর লোক সমাগম হয়েছিলো। হাজার হাজার নরনারী অবাক বিস্ময়ে তাদের ভূতপূর্ব শাসকদের বিদায় দৃশ্য দেখছিলো। তারপরে যে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার বর্ণনা দেবার জন্য ম্যারী থমসন এবং ডালফোসে ছাড়া আর কেউ জীবিত ছিলেন না।
থমসন লিখেছেন, “মেজর ভাইব্রাট তার নৌকায় অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গেই নৌকা ছাড়তে নির্দেশ দেয়া হলো। তারপরে একটি দেশী নৌকা থেকেই প্রত্যেক নৌকার মাঝিকে নেমে আসার সঙ্কেত দেয়া হলো। সঙ্গে সঙ্গে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা তীরের দিকে চলে গেলো। সঙ্গে সঙ্গেই আমরা তাদেরকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লাম। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলো। নৌকা ছাড়ার পূর্বেই এ সকল মাঝি আমাদের নৌকার খড়ের ছাদে জ্বলন্ত কয়লা রেখে গিয়েছিলো। মাঝিদের ঝাঁপ দিয়ে পড়ে পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে সকল সেপাই মালপত্রসহ মেজর ভাইব্রাটকে এগিয়ে দিতে এসেছিলো, তারা ব্রিটিশ সৈন্যদের দিকে তাক করে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। ঠিক সেই সময়েই নৌকগুলোতে আগুন জ্বলে উঠলো। আমরা সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেলাম। পনেরো ষোলজন অশ্বারোহী সৈন্যের গুলির জবাবে আমরাও গুলি ছুঁড়েছিলাম। তারপরে শুরু হলো সবচেয়ে ভয়াবহ দুযোগ। অধিকাংশ নৌকা সরানো যায় না। যাত্রীরা নৌকা থেকে লাফ দিয়ে ঠেলে নৌকাকে ভাসিয়ে নিতে চেষ্টা করতে লাগলো। তীর থেকে ছুটে আসছে বন্দুকের গুলি আর নৌকার ছাউনিতে লকলকে আগুনের শিখা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। মহিলা ও শিশুরা নৌকা থেকে নেমে নৌকার পেছনে গলা অবধি ডুবিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসা গুলির আঘাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। শুধু ভাইব্রাটের নৌকাখানাই গভীর জলে গিয়ে পড়লো। তার ছাদেও আগুন লাগেনি। থমসন এ নৌকার কাছে সাঁতরে গেলে তাঁকে ওপরে টেনে তোলা হলো। ঘাট থেকে দ্বিতীয় নৌকাখানি ছাড়া হয়েছিলো। কিন্তু জলের নীচে গুলি এসে লাগায় তা ডুবে গেলো। যাত্রীদেরকে ভাইব্রাটের নৌকায় তুলে নিয়ে প্রাণ রক্ষা করা হলো। লগি এবং কাঠের টুকরোর সাহায্যে নৌকাটিকে গুলির রেঞ্জের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলো। চারদিক থেকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুটে আসছে। প্রায় দুপুরের সময়ে গাদা বন্দুকের রেঞ্জের বাইরে নৌকাকে নিয়ে আসতে সমর্থ হলো। কিন্তু সমস্ত দিন ধরে তাদের ওপর রাইফেলের গুলি চালানো হলো। রাতের বেলায় জ্বলন্ত তীর নিক্ষেপ করা হতে লাগলো এবং নৌকাখানায় আগুন লাগিয়ে দেবার জন্য একখানা জ্বলন্ত নৌকা স্রোতে ভাসিয়ে দেয়া হলো।
সকালের দিকে অল্পক্ষণের জন্য তাদের ওপর কোনো আক্রমণ করা হয়নি। কিন্তু তারা নদীতে স্নানরত কতিপয় লোকের কাছে জানতে পেলো বাবু রাম বক্স নামে একজন প্রভাবশালী জমিদার তাদের ওপর আক্রমণ করবার জন্য নজফগড়ে আঁটঘাট বেঁধে অপেক্ষা করছে। বেলা ২টার সময় তারা সে আতঙ্কিত স্থানে পৌঁছালো। দুর্ভাগ্য তাদের, সে সময় নৌকাখানি চড়ায় আটকা পড়লো। তারা তীরের রাইফেলের গুলির রেঞ্জের বাইরে নয়। একটা কামান আনা হলো, কিন্তু সেটা অকেজো হয়ে গেলো। সূর্যোদয়ের সময় কানপুর থেকে নৌকায় করে একদল সশস্ত্র সেপাই নিয়ে আসা হলো। তাদের নৌকাখানা বালুচরে আটকা পড়লো। আত্মরক্ষাকারীরা প্রাণপণে আক্রমণ করে অনুসরণকারীদের ধ্বংস করতে চাইলো। আবার তাদের নৌকা বালুচরে আটকা পড়লো। অতি শীগগির প্রবল এক ঘুর্ণিবায়ুর তাড়নায় নৌকা মুক্ত হলো। এখনো তাদের বিপদ কাটেনি। সকালবেলা দেখা গেলো, গাঙের অনাব্য অংশে চলে গেছে, অনুসরণকারী শত্রুরাও বেশি দূরে নয়। দু’টি পুরোদিন আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, নদীর পানি ছাড়া কিছুই খেতে পায়নি, শরীরে এককণা শক্তিও নেই। এ রকম অবস্থাতেও তারা আত্মরক্ষার প্রবল সংগ্রাম করে যাচ্ছে। ভাইব্রাট থমসন, ডালফোসে এবং অপর কয়েকজন আক্রমণকারীদের ওপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। সেপাই এবং জনতা তাদের আক্রমণ বরদাস্ত করতে পারলেন না। তারা ছত্রভঙ্গ করে পলায়ন করলো। কিন্তু ফিরে এসে দেখে, নৌকা চলে গেছে। অনুসরণকারীদের বাধা দিতে সক্ষম না হওয়ায় বেপরোয়া ব্রিটিশ সৈন্যের ক্ষুদ্র দলটি একটি মন্দিরের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেখানে তাদের কোনো খাদ্য ছিলো না। অল্পমাত্র পচা পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করেছিলো। অতি শীগগির সে আশ্রয়ও ত্যাগ করে তাদের আবার নদীতে আসতে হলো। এ সময়ে তাদের সংখ্যা সাতজনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে থেকে দু’জনকে সাঁতার দেয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হলো। তৃতীয় জন বালুচরে এলে তার মাথায় গুলি লাগে। অবশেষে অনুসরণকারীরা অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকলো। তিন ঘণ্টা অবিরাম নদীতে সাঁতার কাটার পরে অবশিষ্ট যারা জীবিত আছেন একটু বিশ্রাম নিতে মনস্থির করলেন। তারা তীরের কাছে জলে গলা অবধি চুবিয়ে বসে রইলেন। এ সময়ে তাঁরা তীরে বন্ধুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। প্রথমে সৌভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারেনি। যখন বুঝতে পারলেন তারা নিরাপদ, তখন কাঁদা থেকে উঠে আসার মতো শক্তিও তাদের শরীরে অবশিষ্ট ছিলো না। থমসনের গায়ে একটি ছেঁড়া সার্ট ডালফোসের কোমরে একখানা নেংটি, মারফি এবং সুলিভানের শরীরে সূতার আঁশ পর্যন্ত ছিলো না। অযোধ্যার মুরার মাওরের জমিদার দিগ্বিজয় সিং ছিলেন তাঁদের আশ্রয়দাতা। তাঁরা ২৯জন সন্ধ্যাবেলা তার বাসভবনে গিয়ে পৌঁছেন।
