এ সঙ্কটের সময়ে জেনারেল হুইলার যে নান্নে সাহেবের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করেছিলেন, সে সম্বন্ধে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ তিনি ব্যাটারী থেকে ইংরেজ ছাউনিতে রাত দিন সমানে গোলাবর্ষণ করে ইউরোপীয়দের জীবন অতীষ্ঠ করে তুলেছিলেন। সেপাইরা দিল্লীর রাস্তা থেকে কানপুরে ফিরে এসে নগরের প্রাসাদ আক্রমণ করলো। তিনি পরে সেপাইদেরকে বশ করেন এবং গোলন্দাজ বাহিনী তাঁর অধীনে ছেড়ে দেয়া হয়। অথচ কামান সম্বন্ধে তার সামান্য জ্ঞান ছিলো বলে মনে হয় না। এ রকমের দুর্বল মেরুদণ্ডের দোদুল্যমান মানুষ সেপাইদের সংগ্রামে নেতৃত্বদান করার উপযুক্ত মানুষ, কিছুতেই হতে পরে না। সুযোগ পেলেই বিশ্বাসঘাতকতা করবে। এ ধারণা ছিলো জেনারেল হুইলারের মনে। কিন্তু শেপার্ডের ভাগ্য ব্লেনম্যানের মতো প্রসন্ন ছিলো না। ছাউনি ত্যাগ করার অল্পক্ষণ পরেই তিনি ধৃত হলেন। তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো। হ্যাভলকের সৈন্য কানপুরে না আসা পর্যন্ত তিনি কারারুদ্ধ অবস্থাতেই কাটিয়েছিলেন।
এ সময়ের মধ্যে নানা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ক্ষমতা গ্রহণ করলেন। ২নং অশ্বারোহী বাহিনীর সুবাদার টিকা সিংকে প্রধান সেনাপতি এবং দলঞ্জন সিং এবং দীনদয়াল, এ দু’জন সুবাদারকে কর্ণেলের পদে প্রমোশন দেয়া হলো। ফৌজদারী বিচারের ভার নানার ভাই বাবা ভাটের ওপর অর্পণ করা হলো। তস্কর এবং অন্যান্য অপরাধীদেরকে তার সামনে আনা হতো। বিচার করে যথাযথ দণ্ড দেয়া হতো।
২৪শে জুন তারিখে জেনারেল হুইলার লখনৌতে তার সর্বশেষ সংবাদ প্রেরণ করেন। তা হলো হতাশাচ্ছন্ন প্রাণের সর্বশেষ চীৎকার। তিনি লিখেছিলেন, “আমাদের এখন ব্রিটিশ মনোবল ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। কিন্তু বেশিদিন এ মনোবলও অটুট থাকবে না। কিছুতেই আমরা খাঁচাবদ্ধ ইঁদুরের মতো বেশিদিন বাঁচতে পারবো না।” ছাউনিতে খাদ্য ফুরিয়ে এসেছে। এখন সকলে আধপেটা খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। এ অবস্থাও চারদিনের বেশি চলতে পারে না। তাদের গোলাবারুদও ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু কোথাও থেকে গোলা-বারুদ সংগ্রহ করার আশাও নেই। বৃষ্টি যে কোনদিন আসতে পারে। যদি আসে তাহলে ব্রিটিশ সৈন্যদের অসুবিধার অন্ত থাকবে না।
অবশেষে শক্ররা তাদেরকে মুক্তি দিলো। এক মহিলাই তাদের জন্য শান্তির অলিভ বৃক্ষের শাখা বয়ে এনেছিলেন। ম্যারী থমসন লিখেছেন, “অবরোধের ২৬ দিনের দিনে আমার অবস্থানে গোলাবর্ষণ কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ ছিলো। প্রহরীরা চীৎকার করে জানালো যে একটি মেয়েমানুষ এগিয়ে আসছে। সকলে তাকে গুপ্তচর মনে করলো এবং একজন প্রহরী তাঁর দিকে তাক করে রাইফেল বাগিয়ে ধরলো। আমি তার হাতে আঘাত করে মহিলাটিকে রক্ষা করলাম। তার বুকে জড়ানো একটি শিশু সন্তান। পায়ে জুতো কিংবা মোজা কিছু নেই। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আমি তাকে উঠিয়ে ছাউনিতে নিয়ে আসলাম। তখনই তাকে চিনতে পারলাম। তিনি হচ্ছেন এক ধনী পরিবারের মহিলা মিসেস গ্রীনওয়ে। তাঁরা কানপুর বাস করতেন এবং ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে ব্যবসা করছিলেন। মিসেস গ্রীনওয়ের সঙ্গে ইংরেজিতে লেখা কোনো নাম-স্বাক্ষরবিহীন একখানি পত্র ছিলো। তাতে সম্বোধন করা হয়েছে। অশেষ মমতাময়ী সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার প্রজাবৃন্দের মধ্যে যারা লর্ড ডালহৌসির কার্যকলাপের সঙ্গে কোনো প্রকারে সংযুক্ত নয়, তারা অস্ত্র সংবরণ করে নিরাপদে এলাহাবাদ চলে যেতে পারে।” প্রধান সেনাপতির কাছে পত্রখানি নিয়ে যাওয়া হলো। জেনারেল হুইলার তখনো কলকাতা থেকে সাহায্যের প্রত্যাশা করেছিলেন। সেজন্য নানা সাহেবের সঙ্গে কোনো রকমের আপোষ-মীমাংসার আলোচনায় তিনি আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু মুর সেনাপতিকে বোঝালেন যে মহিলা এবং শিশুদের খাতিরে তাদের এলাহাবাদে গমন করাই অধিকতররা সঙ্গত। ব্রিটিশ সৈন্যদের অবস্থা তখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ ছাড়া তাদের কাছে অপর কোনো সম্মানজনক পন্থা খোলা ছিলো না। তার পরের দিন আজিমুল্লাহ এবং জাওলা প্রাসাদ ইংরেজদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে এলেন। কথাবার্তায় ব্রিটিশ সৈন্যদের ছাউনি ত্যাগ করার কথা স্থির হলো। আরো স্থির হলো প্রত্যেক সৈন্যকে তার অস্ত্র এবং ৬০ রাউণ্ড গুলিগোলা নিয়ে যেতে দেয়া হবে। আহতদের জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা করা হবে। রসদসহ সৈন্যদের বয়ে নিয়ে যাবার জন্য নৌকা ঘাটে অপেক্ষা করবে, এ রকম কথাবার্তা পাকা হলো। আজিমুল্লাহ নানা সাহেবের কাছে এ সকল প্রস্তাব নিয়ে গেলেন, কিন্তু নানা সাহেব জিদ করলেন, সৈন্যদেরকে রাতের অন্ধকারেই ছাউনি ছাড়তে হবে। কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্য পরদিন সকাল হওয়ার আগে ছাউনি ত্যাগ করতে অক্ষমতা জানালো। অবশেষ দূত এসে নানা সাহেবের মৌখিক অনুমতি জানিয়ে গেলো।
পরের দিন ছাউনির সৈন্যদের নৌকায় বয়ে নেওয়ার জন্য এলো ১৬টি হাতী এবং ৭০ থেকে ৮০খানা পাল্কী। তাতে সকলের স্থান হয়নি। ক্যাপটেন মুর, যিনি ছাউনি ত্যাগের সবকিছু রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছিলেন। তাঁকে দ্বিতীয়বারে নৌকাতে আসতে হয়। নারী এবং শিশুদের হাতির পিঠে এবং গরুর গাড়িতে বসানো হলো। তাছাড়া পদমর্যাদা নির্বিশেষে সকল পুরুষ মানুষকে হেঁটে আসতে হলো। প্রথম দল ছাউনি ছাড়ার পরে সেপাইরা ছাউনিতে এসে প্রবেশ করলো। সেপাইরা তাদের পুরোনো অফিসারদের মধ্যে কে কে মৃত্যু বরণ করেছেন জানতে চাইলো। ম্যারী থমসন বলেছেন, অফিসারদের মৃত্যু সংবাদ শুনে সেপাইরা অত্যন্ত দুঃখিত হলো। হতভাগ্য বুড়ো স্যার হাফ হুইলারের পত্নী এবং কন্যাকেও হেঁটে নৌকাতে আসতে হলো। মেজর ভাইব্রাট সকলের শেষেই ছাউনি ত্যাগ করেছিলেন। বিদ্রোহী সেপাইদের অনেকে যারা এই অফিসারের অধীনে চাকুরি করতো তাঁর মালপত্র বয়ে আনার জন্য জেদ করতে লাগলো। গরুর গাড়িতে মালপত্র বোঝাই করে মেজরের পত্নী এবং পরিবারকে নৌকা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলেন। বেলা ৯টার সময়ে সর্বশেষ নৌকাতে যাত্রী বোঝাই করা হলো। পথে যে তাদের কোনো বিপদ ঘটতে পারে, এ প্রসঙ্গে ম্যারী থমসন এবং ভালফোসে ছিলেন সম্পূর্ণ রকমের অজ্ঞ। নদী অগভীর। নৌকাগুলো ভেসে চলছিলো না। নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সকল যাত্রীকেই নৌকা ঠেলে নিয়ে যেতে হচ্ছিলো।
