মৃতদেহ ভালোভাবে সমাহিত করার অবকাশ কই? কোনো রকমে রাতের বেলা একটু গর্ত খুঁড়ে চাপা দিলেই হলো। প্রথম সকালের প্রথম নিহত লাশকে কফিনে ঢেকে সমাহিত করা হয়েছিলো। তার পরে আর কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধিস্থ করা হয়নি।
মানুষ যখন মানুষের বুকে মৃত্যুবাণ ছুঁড়ে মারছে, তখনো প্রকৃতি তার সৃষ্টিকার্য বন্ধ করেনি। এই ভয়ংকর দুঃসময়েও শিশু জন্ম নিচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। কিছুসংখ্যক গর্ভবতী মহিলা মাতৃত্বের সংকটকালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ছেলেমেয়েরা মা বাবাদের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাইরের বিপদ সম্পর্কে অজ্ঞান এবং ভেতরের একটানা একঘেঁয়ে জীবনে বিরক্ত হয়ে মা-বাবার দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে তারা দেয়ালের বাইরে চলে আসতো। কিন্তু গুলি নারী-পুরুষ, শিশু এবং বৃদ্ধের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করতো না।
এ ছিলো এক ভয়ংকর যুদ্ধ। এতে অতীত প্রথা এবং মানবিক আইনের প্রতি কোনো শ্রদ্ধাই প্রদর্শন করা হয়নি। দু’পক্ষের কোনো পক্ষই অপর পক্ষের বন্দীকে রেহাই দেয়নি। অবরুদ্ধদের হাতে প্রথমে যে বিপক্ষের সেপাইটি ধৃত হয়েছিলো, সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলো। ম্যারী থমসন লিখেছেন, “এটা আমাদের কাছে আকাঙ্ক্ষিত ছিলো না। আমরা কিছুতেই চাইনি যে আমাদের এ দুরবস্থার কথা বিদ্রোহীরা জানতে পারুক। এ ভুলের প্রতিকার স্বরূপ সিদ্ধান্ত নিলাম, ভবিষ্যতে কোনো সেপাইকে বন্দী করা হলে সদর দপ্তরের অনুমতি না নিয়েই হত্যা করবো।”
অল্প সংখ্যক রসদপত্র এবং উপাদান নিয়ে ক্রমশঃ ক্ষীয়মাণ প্রতিরক্ষা বাহিনী অনির্দিষ্ট কালের জন্য রুদ্ধ অবস্থায় থাকতে পারে না। যদিও পূর্বদিক থেকে ইউরোপীয় সৈন্যের আগমন সম্ভব, তবু কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন। হয়ে গেছে। লখনৌ হচ্ছে একমাত্র স্থান যেখান থেকে অবরুদ্ধরা অবিলম্বে সাহায্য চাইতে পারে। লখনৌতে জেনারেল হুইলার অবরোধের ২য় সপ্তাহেই সাহায্যের জন্য আবেদন করেছেন। “আমরা গত ৬ তারিখ থেকে নানা সাহেব কর্তৃক অবরুদ্ধ অবস্থায় আছি। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে ৪ঠা মে তারিখের বিদ্রোহী সব দেশীয় সেপাইরা।” শত্রুর কাছে ২টা ২৪ পাউন্ড গুলি ছোঁড়ার মতো কামান এবং আরো কয়েকটি কামান রয়েছে। আমাদের কাছে আছে মাত্র ৯ পাউন্ড গুলি ছোঁড়ার মতো আটটি কামান। সমস্ত খ্রীস্টান অধিবাসীরা অমাদের সঙ্গে রয়েছে পরিখা প্রাচীরের অন্তরালে। আমরা অত্যন্ত মহৎ এবং বিস্ময়করভাবে প্রতিরক্ষা করে আসছি। আমাদের ক্ষয়ক্ষতি সীমাহীন এবং মর্মন্তুদ। আমরা সাহায্য চাই, সাহায্য, সাহায্য। যদি মাত্র দু’শ মানুষ আমরা পাই তাহলে বদমায়েশদের শায়েস্তা করতে পারি এবং তোমাদের সাহায্য করতে পারবো। কিন্তু লখনৌরও নিজস্ব অসুবিধা রয়েছে। এখন লখনৌ কর্তৃপক্ষ একজন সৈন্যকে বাইরে যেতে দিতে পারেন না। এখনো অবরোধ কাজ শেষ করা হয়নি, শত্রুসৈন্য খুব দূরে নয়। হেনরী লরেন্স এবং তাঁর উপদেষ্টাবৃন্দ কানপুরের তাদের দেশীয় ভাইদের ভগবানের দয়ার উপর সোপর্দ করলেন। স্যার হেনরী লরেন্স লিখলেন, “আমরা এখানে শক্তিশালী, কিন্তু নদী পার হয়ে আপনাদের সাহায্য করতে গেলে আমরা একটা বিরাট প্রতিরোধের সুযোগ হারাবো। আমাকে স্বার্থপর মনে করবে না।” সুতরাং গভর্ণর জেনারেল সাহায্যের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া ইউরোপীয় সৈন্যদের সামনে আর কোন পথ খোলা রইলো না। শত্রুদের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
জেনারেল হুইলার কিন্তু আশা ছাড়লেন না। ছাউনিতে ছিলো অনেক ইউরোপীয় লোক তারা স্থানীয় ভাষা ভালো রকমভাবে বলতে পারতেন। স্বদেশীদের মতো তাদের অনেকেই ছিলো কৃষ্ণাঙ্গ। কেউ তাদেরকে কোনো সন্দেহ করতো না। ব্লেনম্যান নামে একজন ইউরোপীয় ভদ্রলোক একবার কি দু’বার ছদ্মবেশে নানার শিবিরে গিয়ে কোনো প্রকার ক্ষতির সম্মুখীন না হয়েই ইউরোপীয় ছাউনিতে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। তার ওপর আদেশ হলো, তিনি যেনো এলাহাবাদ যেতে চেষ্টা করেন। কিন্তু পথে তিনি ধরা পড়লেন। যাবতীয় জিনিস-পত্র হারিয়ে কোনো রকমে ফিরে আসতে সক্ষম হলেন। পূর্বদিকের দেশের অধিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টাও করা হয় কয়েকবার। কিন্তু তাতে কোনো ফলোদয় হয়নি। তারপরে শেপার্ড নামে এক ভদ্রলোকের ওপর নির্দেশ দেয়া হলো তিনি যেনো শহরে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে আনেন। শুধু সংবাদ যোগাড় নয়, ব্রিটিশের প্রতি মৈত্রীভাবাপন্ন প্রভাবশালী স্বদেশীয়দের সাহায্যে বিদ্রোহী সেপাইদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরাতে চেষ্টা করারও নির্দেশ তাঁকে দেয়া হলো। শেপার্ড বলেছেন, সেনাপতি আমাকে শত্রুদের কার্যকলাপ এবং প্রকৃত ইচ্ছা কি, এ সম্বন্ধে সঠিক সংবাদ আনতে নির্দেশ করলেন। তা ছাড়া, লখনৌ কিংবা এলাহাবাদ হতে কোনো সাহায্য পাওয়া যেতে পারে কীনা সে সম্বন্ধেও নিশ্চিত হয়ে আসার কথা বললেন। তারপরে আরো কিছুক্ষণ এটা সেটা বলার পর তিনি আমাকে নান্নে নওয়াবের (মুহম্মদ আলী খান) সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বললেন। প্রধান সেনাপতি আমাকে জানালেন তিনি আমাদের প্রতি বিশ্বস্ত এবং আমরাও তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারি। বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো রকমের ভাঙ্গন ধরাতে পারা যায় কিনা, তাঁকে সে চেষ্টা করে দেখতে বলবে এবং তারা যদি আমাদেরকে নাজেহাল না করে এবং আপোষে এ স্থান থেকে চলে যেতে দেয়, তাহলে তাদেরকে আমি ভালোমতো সন্তুষ্ট করবো।” তিনি আরো জানালেন, যদি আমি নান্নে নওয়াবের সঙ্গে ব্যর্থ হই, তাহলে যেনো মহাজন এবং অন্যান্য প্রভাবশালী দেশীয় ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে স্বীয় অভিলাষ ব্যক্ত করি। তারা সাহায্য করতে রাজী হলে তদেরকে পুরস্কার দেয়ার কথা বলতেও আমাকে বলা হলো। ব্যক্তিগতভাবে আমাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেয়ার অধিকার দেয়া হলো। তা ছাড়া, আমাদের কাজ করতে দিয়ে কোনো লোক যদি প্রাণ হারায় তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ করার কথা বলার অধিকারও আমাকে দেয়া হলো।
