হতাশার দুর্গে আশ্রিত যারা তার মধ্যে অধিক হচ্ছে নারী এবং শিশু। প্রত্যেক সক্ষম পুরুষ মানুষ ছুটির সময়ে হলেও যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক ছিলেন। তা ছাড়া, অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের রাতদিন অত্যন্ত সতর্কভাবে থাকতে হতো। স্যার হাফ হুইলারও বৃদ্ধ বয়সের জন্য যুদ্ধের পুরোপুরি দায়িত্ব বহন করতে পারছেন না। অনেক ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত তরুণ সুদক্ষ ক্যাপটেন মুরকেই বহন করতে হচ্ছে। অস্ত্রশস্ত্রের কোনো অভাব নেই। একেক জন সৈন্যের জন্য তিনটা থেকে সাতটা এমনকি আটটা পর্যন্ত বন্দুক বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য সরবরাহও হয়ে উঠছিলো না। খুব শীগগির খাদ্য নিঃশেষ হয়ে এলো। তারপরে সকলে দিনে একবেলা আহার করতে লাগলেন। খাদ্যের অভাব মেটানোর জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা করা হলো। একাধিকবার ব্রাহ্মণী ষাড় চরতে এলে গুলি করে মারা হলো। কিন্তু জন্তু শিকার করার চেয়ে প্রাকারের ভেতরে নিয়ে আসাই হচ্ছে সবচেয়ে কষ্টকর। যাহোক ষাঁড়ের মাংস দিয়ে তাড়াতাড়ি সূপ তৈরি করা হলো। সে মাংসের পরিমাণ এতো কম যে বাইরের পোস্টে পাহারা রত মানুষের ভাগে একটুকু মাংসও পড়লো না। একবার একটা ঘোড়ার মাংস দিয়েও অনুরূপ সূপ তৈরি করা হয়েছিলো, কিন্তু মহিলারা ঘোড়ার মাংস খেতে রাজী হলেন না। ক্যাপটেন হ্যালি ডে ঘোড়ার সূপ বানানোর সময়ে বিদ্রোহীদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। এমন কি দেশী পেঁকি কুকুরের মাংস খেয়েও জীবন ধারণ করতে হয়েছে।
ব্যারাকের হাল্কা দেয়াল জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে কোনো বাধা দিতে পারলো না। অনেকেই গর্মী রোগে প্রাণ হারালো। বন্দুক ধরা অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো অনেক সময়। দ্বিপ্রহরের প্রচণ্ড গরমে বন্দুকের ক্যাপে বিস্ফোরণ হয়ে যেতো। অথবা অসহ্য গরমের জন্য নল স্পর্শ করা যেতো না। প্রচণ্ড উত্তাপে শীগগিরই মরা জন্তু জানোয়ারের শরীর থেকে গন্ধ ছুটতে লাগলো। বাতাস দূষিত হয়ে উঠলো। অবরুদ্ধ প্রাকার বাসীদের জীবন অতীষ্ঠ হয়ে উঠলো।
শুধু খাদ্য নয়, পানীয় জলেরও অভাব পড়েছে। দুর্গ প্রকারের একমাত্র কুয়োর কোনো ঢাকনা ছিলো না। কেউ পানি আনতে গেলে সেপাইরা তাদের উপর গুলি করে। এমন কি গভীর রাতেও পানি আনা সম্ভব ছিলো না। এক বালতি পানির মূল্য ছিলো দশ থেকে বারো শিলিং। জন ম্যাক কিলপ নামে একজন বেসামরিক কর্মচারি নিজেকে কুয়ো ক্যাপটেন’ বলে ঘোষণা করে কষ্টেসৃষ্টে পানি এনে দুর্বল অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করতে লাগলেন। তিনি অনেকবার পানি আনতে সমর্থ হলেন, কিন্তু একবার গিয়ে গুলির আঘাতে আহত হলেন এবং তার একটু পরেই প্রাণত্যাগ করলেন। মারী থমসনের ভাষায়, মহিলা এবং শিশুরা ভয়ঙ্করভাবে জলকষ্ট ভোগ করতে লাগলো। পুরুষ মানুষেরা জলকষ্ট বিশেষ করে শিশুদের পানি পানি’ বলে চীৎকার কিছুতেই সহ্য করতে পারতেন না। অনেক সময় বিপদের কথা জ্ঞান না করে ছুটে যেত। বহু কষ্ট করে অল্প পরিমাণ পানি সংগ্রহ করা যেতো। আমি নিজে দেখেছি, আমার ভায়ের ছেলেমেয়েকে জলের বদলে পুরোনা জলের ব্যাগের এক টুকরো চামড়া চুষতে দেয়া হয়েছিলো।
অবরোধ করার এক সপ্তাহ পরেই অবরুদ্ধ ব্যক্তিবৃন্দ এক ভয়াবহ বিপত্তির সম্মুখীন হলেন। গুলি বা অন্য কিছু থেকে ব্যারাকের খড়ের চালে আগুন ধরে গেলো। তারই তলায় অসুস্থ লোকেরা ঠাঁই নিয়েছে। আগুন নেভাবার জন্য সাধ্যমতো সকল রকমের চেষ্টা করা সত্ত্বেও গোলন্দাজ বাহিনীর দু’জন সৈন্য আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেলো। সমগ্র ব্যারাক পুড়ে যাওয়ার দরুন আহতদের কোনো ঔষুধপত্র দেয়াও সম্ভবপর হয়নি। তৃষ্ণার্তদের জলের জন্য কাতরানি, জ্বরের উত্তাপ এবং দগ্ধীভূত শরীর এসব দেখলে বুক ভেঙ্গে যায়। আমরা কি করবো জানতাম না। মাথায় উপরের ছাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে কোনো মহিলা পরিখার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানে মাটির উপর তাঁদেরকে ঘুমোতে হতো।
সবসময় মানুষ মরছে। মেজর লিন্ডসে একটা গুলির আঘাতে অন্ধ হয়ে কদিন পরেই মারা গেলেন। তার একদিন কি দু’দিন পরে তাঁর স্ত্রীও মারা গেলেন। হেভারডেন এক মহিলাকে কিছু পানি দেয়ার সময় আহত হলেন, এক সপ্তাহ অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগে প্রাণ হারালেন। লেফটেনান্ট এফফোর্ড বারান্দায় উপবিষ্ট অবস্থায় গুলির আঘাতে নিহত হলেন। মিসেস হোয়াইট দু’বাহুর আড়ালে দুটি যমজ শিশু নিয়ে স্বামীসহ দেয়ালের পাশে হাঁটছিলেন। মাত্র একটি গুলি তাঁর স্বামীকে নিহত করলো এবং তার দুটি বাহু ভেঙ্গে দিলো। ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ হিলার্সর্ডন বারান্দায় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময়ে আহত হলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মারা গেলেন। সেনাপতির সন্তান লেফটেনান্ট হুইলার পরিখাতে আহত হয়েছিলেন। তিনি তার কক্ষে একটি সোফার উপর উপবিষ্ট অবস্থায় গুলি খেয়ে বৃদ্ধ বাবা এবং বোনের সামনে ধড়ফড় করে মারা গেলেন।
ইউরোপীয় অফিসারদের ভারতীয় পরিচারকেরাও তাদের প্রভুদের দুঃখে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। পরিখা প্রাকারে যে সকল ভারতীয় পরিচারক ছিলো, তাদের সংখ্যা অল্প ছিলো না। থমসন বলেন, লেফটেনান্ট ব্রিজকে সাহায্য করবার সময় গুলির আঘাতে তাদের তিনজনেই প্রাণ হারায়। লেফটেনান্ট গোডের এক চাকর কিছু খাবার হাতে এক ব্যারাক থেকে অন্য ব্যারাকে যাবার সময় মাথায় গুলি লেগে প্রাণ হারায়। আরো বহু ভারতীয় চাকর মারা যায়।
