৪ তারিখ রাতের শেষ দিকে সেপাইরা বিদ্রোহ করলো। অনেক দিনের উৎকণ্ঠারও অবসান ঘটলো।
মনে হয়, অশ্বারোহী বাহিনীই বিদ্রোহে নেতৃত্বদান করেছিলো। শীগগির তারা ১ম পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিলো। কিন্তু তারা অফিসারদের ওপর কোনো রকম হামলা করেনি। ৫ তারিখে সকাল পর্যন্ত ৫৩ এবং ৫৬ নং রেজিমেন্ট লাইনে ছিলো। কিন্তু শীগগির ৫৬নং রেজিমেন্ট তাদের সেপাই ভাইদের ডাকে সাড়া দিলো। এ সম্বন্ধে থমসন লিখেছেন,সেনাপতির ভুলবশতঃ তাদের ওপর গুলি চালানো পর্যন্ত ৫৩নং রেজিমেন্ট স্থির ছিলো। এই কাজের ফলাফলের কথা চিন্তা করে আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম। সেপাইরা শান্তভাবে তাদের লাইনে অবস্থান করছিলো, কেউ কেউ পাক চড়িয়েছে, বিদ্রোহ করার কোনো লক্ষণ পর্যন্ত নেই। বিদ্রোহীরা তাদের সঙ্গে যোগ দিতে বার বার অনুরোধ করেছে, কিন্তু তাতে তারা কর্ণপাত করেনি। যখন স্যার হাফ হুইলারের নির্দেশে ব্যাটারী থেকে তাদের গোলাবর্ষণ করা হতে থাকলো, বলতে গেলে তখই তারা বিদ্রোহে যোগ দিয়েছে। তারা আগে পরিখা ও প্রাকারের অভ্যন্তরস্থ দেশী সেপাইদের আহ্বান করেছিলো! কিন্তু তাদের সকলেই শেষ পর্যন্ত আমাদের পক্ষে ছিলেন। ১৫০ জন প্রাইভেট সেপাই ছাড়া তাদের আর বাকী সকলে ছিলো গোলন্দাজ বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত। ৫৩নং রেজিমেন্টের যে দলটিকে রাজকোষ রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিলো, তারা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চার ঘণ্টা কঠোর সংগ্রাম করেছে। দূর থেকে আমরা তাদের বন্দুকের শব্দ শুনতে পেলাম, কিন্তু তাদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারলাম না। এই রাজভক্ত রেজিমেন্টের অবশিষ্ট সেপাইরা শেষ পর্যন্ত তাদের অফিসারদের হয়ে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত ছিলো। পরিখা থেকে ছ’শ গজ পূর্বদিকে তাদেরকে রাখা হয়েছিলো। ব্যারাকে আগুন না ধরা পর্যন্ত তারা নয় দিন তাদের অবস্থান রক্ষা করেছিলো। স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে তাদেরকে পরিখা প্রকারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। কিছু টাকা এবং বিশ্বস্ততার একখানা সার্টিফিকেটসহ বিদায় করে দেয়া হলো। স্যার জর্জ ফরেস্ট অবশ্য শেফার্ডের কথার উপর নির্ভর করে হুইলারের এ কাজের প্রতিবাদ করেছিলেন। কানপুর বিদ্রোহের ঘটনাবলী সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অল্প; তবু আমরা নিশ্চিত যে বিদ্রোহ হয়েছিলো, জুন এবং জুলাই মাসের নিমর্ম হত্যাকাণ্ডের কথাও সত্য। সেপাইরা রাজকোষ অভিমুখে ধাওয়া করলো। তালা ভেঙ্গে তারা রাজকোষ লুট করলো। কারাগারও আক্রমণ করা হলো, তারপরে বন্দীদের মুক্তি দেয়া হলো। তারপরে তারা দিল্লীর পথে মার্চ করে গেলো এবং কল্যাণপুরে গিয়ে থামলো। আকস্মিকভাবে সেপাইরা যখন কানপুরে ফিরে এলো, তখন নানা সাহেব জেনারেল হুইলারকে লিখে জানালেন যে তিনি পরিখা প্রাকার আক্রমণ করতে যাচ্ছেন, এ থেকে জেনারেল হুইলারের ভবিষ্যদ্বানী সত্য মনে হয়। মধ্যবর্তী সময়ে কি ঘটেছিলো? তাঁতিয়া টোপী নানাকে বলপূর্বক সেপাইদের সংগ্রামের নেতৃত্বদান করতে বাধ্য করেছিলেন। প্রথমে তিনি দিল্লী যেতে কিংবা কানপুরে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজী হননি। পরে তাঁর ওপর জোর প্রয়োগ করে তাকে রাজী করানো হয়েছিলো। ব্রিটিশ সরকার কোনো বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে তোপধ্বনি করার জন্য দ্বিতীয় বাজীরাওকে দুটো কামান উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের কাজে সেগুলোকে একেবারেই অকেজো বলা চলে। নানার অধীনে যে সকল সেপাই ছিলো তাদের সর্বমোট সংখ্যা ছিলো তিন’শ, তারা তিনটি পদাতিক এবং একটি অশ্বারোহী রেজিমেন্টকে বাধা দিতে পারতো তা বিশ্বাস করা কষ্টকর। সুতরাং তাতিয়া টোপী বাধ্য করেছে বলে গুজব শোনা যায়, তার মধ্যে কিছু পরিমাণ সত্য থাকলেও থাকতে পারে। একবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে নানার সেপাইরা ইন্দোর এবং গোয়ালিয়রেযেমন হয়েছে, তেমনিভাবে সেপাইদের সঙ্গে হাত মিলাতে পারতো।
অন্য বর্ণনা থেকে জানা যায়, দেশীয় কিছুসংখ্যক অফিসারের একটি প্রতিনিধিদল নানার সঙ্গে দেখা করে জানান যে গোটা একটা রাজত্ব তার জন্য অপেক্ষা করে আছে, তিনি যদি গ্রহণ না করে শত্রুর পক্ষ সমর্থন করেন তাহলে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। সম্ভবতো নানা দু’দিক চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের টোপই গিলেছিলেন। এর সঙ্গে তাঁতিয়া টোপী তাঁকে জোর করেছিলেন বলে যে বণর্না আছে, তার কোনো মিল নেই। নানা চরিত্র সম্বন্ধে অল্প হলেও যেটুকু জানতে পারা যায় তার সঙ্গেও কোনো সঙ্গতি নেই। তবে এ দু’টো গল্পের মধ্যে কোনটা সত্য সে সম্বন্ধে আমাদের মতামত ব্যক্ত করার কোনো অবকাশ নেই। নানা নিজে সেপাইদের কল্যাণপুর গিয়ে তাদেরকে ফিরে আসতে প্রলুব্ধ করেছিলেন, না কি তাঁর প্রতিনিধি কল্যাণপুরে সেপাইদের সঙ্গে দেখা করে, অতিরিক্ত পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে পরিখা প্রকারের অল্প সংখ্যক ইংরেজ সৈন্যকে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করেছিলেন, সে সম্বন্ধে কোনো কিছু নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। নানক চাঁদ নামে নানা সাহেবের এক চরম শত্রুর মতে, মারাঠা রাজপুত্রদের সঙ্গে সেপাই নেতৃবৃন্দের দীর্ঘদিন থেকে যোগাযোগ ছিলো। বিদ্রোহ হওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে তাদের কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু শেরারের মত হলো, পূর্বাহ্নে সেপাইদের সঙ্গে নানার কোনো স্পস্ট যোগাযোগ ছিলো না। তাই যদি থাকতো, তাহলে রাজপথে গিয়ে প্ররোচিত করে; অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনতে হতো না। থর্ণহিলও ভিন্নভাবে একই সিদ্ধান্তে এসেছেন, তিনি বলেন, “নানার সঙ্গে সেপাইদের কোনো যোগাযোগ থাকলে তারা দিল্লী অভিমুখে ধাওয়া করতো না। কর্ণেল উইলিয়াম কানপুর বিদ্রোহ সম্পর্কে তদন্ত করেছেন, কিন্তু তিনি নানার সঙ্গে সেপাইদের কোনো ষড়যন্ত্র কিংবা পূর্ব সম্পর্ক খুঁজে পাননি। ঘটনার গতি থেকে এটুকু অনুমান করা যায় যে সেপাইরা সম্ভ্রান্ত বংশের কোনো নেতার প্রয়োজন অনুভব করছিলো। সে কারণে ভয় এবং প্রলোভন দু’টিই নানার চোখের সামনে তুলে ধরেছিলেন, প্রথমে তিনি দ্বিধা করেছিলেন, পরে অবশ্য তিনি তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ১৮৫৯ সালে লিখিত এক পত্রে নানা স্বীকার করেছেন যে তখন তিনি এবং তার পরিবার ছিলো সেপাইদের কৃপার উপর নির্ভরশীল। সেজন্য তিনি তাদের সঙ্গে যোগ দিতে রাজী হয়েছেন। জনশ্রুতি আছে, দিল্লী যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু আজিমুল্লাহ্ তাকে এই বলে বুঝিয়েছিলেন যে দিল্লীতে তিনি প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন না, কিন্তু কানপুরে তিনি প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করতে পারবেন। তারপরে সেপাইরা শহরে ফিরে এসে ধনী ব্যক্তিদের বাড়ি আক্রমণ করতে লাগলো। নানা পরিখা প্রাচীর আক্রমণ করবেন, এ খবর হুইলারকে কেননা জানিয়েছিলেন তা ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রতিদিন পরিখা প্রকারের ওপর কামানের গোলা ছোঁড়া হতে লাগলো। বিদ্রোহীদের সুযোগ-সুবিধা যথেষ্ট থাকলেও তারা একটাও প্রধান আক্রমণ পরিচালনা করেনি।
