সে আকাক্ষিত স্ফুলিঙ্গটি ছড়িয়ে দিলো একজন অফিসার। তিনি মাতাল অবস্থায় ২নং অশ্বারোহী বাহিনীর কয়েকজন সেপাইকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লেন। তাকে কোর্ট মার্শালের সামনে হাজির হতে হলো। কিন্তু এ যুক্তিতে তাকে ছেড়ে দেয়া হলো যে তিনি মাতাল ছিলেন, স্বাভাবিক বোধ তাঁর ছিলো না। এটা একটা মহৎ উদারতা। আইনে মাতাল অবস্থার জন্য রেহাই দেয়ার কোনো শর্ত নেই। তার ফলে সেপাইদের মনের সন্দেহ আরো দৃঢ় হলো যে তাদের অফিসারেরা তাদের গুরুতর শাস্তি দেয়ার জন্য মতলব ফাঁদছেন। শেফার্ড কিছু সংখ্যক ক্রুদ্ধ ঘোড়সওয়ার সেপাইয়ের দেখা পেয়েছিলেন। তারা মনের এ ভাব গোপন করেনি। একজন অভিযোগ করলো যে গরু এবং শূয়রের চর্বি মিশ্রিত কার্তুজ তাদের দিয়ে ব্যবহার করাতে ব্যর্থ হয়ে অফিসারেরা প্রতিহিংসার বশে রুঢ়কি থেকে গরু এবং শূয়রের চর্বি মেশানো আটা আমদানি করেছেন ধর্মনাশ করার জন্য। আরেকজন নালিশ করলো, অফিসারদের মনে দুরভিসন্ধি না থাকলে তারা কেন পরিখা বেষ্টিত অবস্থার মধ্যে রয়েছেন? আরেকজন বললো, অফিসারদের উপর আর কোনো বিশ্বাস নেই, কারণ তারা অস্ত্রাগার এবং রাজকোষে দেশী অফিসারদের বদলে ইউরোপীয় প্রহরী নিয়োগ করার চেষ্টা করছে। মিরাটের অশ্বারোহী সেপাই যারা কার্তুজ দাঁতে কামড়াতে অস্বীকার করছে, তাদের সঙ্গে কী রকম ব্যবহার করা হয়েছে, সে সম্বন্ধেও আলোচনা করা হলো। ইউরোপীয়ান সৈন্য কানপুরে এসে পড়লে আমাদের সঙ্গেও একই রকম ব্যবহার করা হবে। আমরা ততোক্ষণ অপেক্ষা করবো না। আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েক রাত আগে আমাদের একজনকে টহল দেবার সময় একজন অফিসার গুলি করে হত্যা করেছে। কোর্ট রায় দিয়েছে অফিসারটি পাগল। আমাদের একজন যদি কোনো ইউরোপীয় অফিসারের উপর গুলি ছুঁড়তো তাহলে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হতো। এটাই হলো সেপাইদের চরমতম ক্ষোভের কারণ, কিন্তু তৃতীয় রাতও শান্তভাবে অতিবাহিত হয়ে গেলো।
যে পরিখাবেষ্টিত শিবির সেপাইদের মধ্যে এত বেশি অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে, আদতে তা সুরক্ষিত এবং দুর্ভেদ্য নয়। দু’টো ইষ্টক নির্মিত ইটের ব্যারাক মাত্র। একতলা আবার খড়ের ছাউনি। চারপাশে পরিখাও যথেষ্ট গভীর নয়। দেয়াল উঁচু এবং মজবুত নয়, হাল্কা। আজিমুল্লাহ্ একে উপহাস করে বলেছিলেন, ‘হতাশার দুর্গ’। এটা স্যার হুইলারের অস্থায়ী বাসস্থান হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছিলো। গোয়েন্দাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, সেপাইরা বিদ্রোহ করলে এদিকে আক্রমণ করবে না, সোজাসুজি দিল্লী অভিমুখেই অভিযাত্রা করবে। কারণ কানপুরের ইংরেজ এবং খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের কোনো বিদ্বেষ নেই, কড়া আক্রমণের মুখে দুর্গের প্রতিরোধ গুড়ো হয়ে যাবে, বেসামরিক কর্মচারির দৃষ্টিভঙ্গী অনুসারে অস্ত্রাগার নিরাপদ স্থানেই অবস্থিত রয়েছে। কিন্তু স্যার হাফ হুইলার সেপাই লাইনের চাইতে দূরে যেতে চাইলেন না। সে জন্য সে ইটের একতলা দালানেই ঘুমোত নির্দেশ দিলেন। তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে সেপাইদের সন্দেহ নিরসন করতে চেষ্টা করেছিলেন এবং ইউরোপীয় অধিবাসীদেরকে হঠাৎ বিক্ষোভে ফেটে পড়লে তাড়াতাড়ি কোনো নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। প্রত্যেক বিপদ সঙ্কেত শুনেই শাসকগোষ্ঠির নারী এবং শিশুরা পরিখার অভ্যন্তরে চলে আসতো। বিপদ সঙ্কেত মিথ্যা প্রমাণিত হলেই আবার তারা গৃহে প্রত্যাবর্তন করতো। সেপাইরা এ সিদ্ধান্তে এলো যে অফিসারদের তাদের প্রতি আর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। কোন দৃঢ় নীতি অবলম্বন করলে, কানপুরকে হয়তো রক্ষা করা সম্ভবপর হতো। যদি হুইলার ইউরোপীয় সামরিক, বেসামরিক অধিবাসীদের নিয়ে অস্ত্রাগার দখল করে ফেলতেন তাহলে সেপাইরা এভাবে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি করার জন্য সাহসী হতে পারতো না। তিনি যদি ভারতীয় সৈন্যদের সম্মানের ওপর নিজের বিশ্বাস স্থাপন করতেন, তাদেরকে অত্যাচার না করার নিশ্চয়তা দিতেন, তাহলে অবস্থা আয়ত্বের মধ্যে আসতে পারতো। শান্তির পর্দার অন্তরালে অবিশ্বাস এবং অর্ধবিশ্বাসে এ মিশ্রিত নীতি কোনো কাজে আসেনি। খোলামেলা আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সবকিছু নিষ্পত্তি করার সময় অতীত হয়ে গেছে।
৩০ মে তারিখে স্যার হাফ হুইলার মহারাণীর ৩২নং রেজিমেন্টকে লখনৌতে পাঠিয়ে দিতে মনস্থ করলেন। কারণ এখনো কানপুর শান্ত আছে, কিন্তু সেখানে বিদ্রোহের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখনো তাঁর নিজস্ব বাহিনী তাঁর সঙ্গে রয়েছে। তা ছাড়া আছে মহারাণীর ৮৪নং পদাতিক বাহিনীর কতিপয় সৈন্য এবং অফিসার। তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদলে বিভক্ত হয়ে কলকাতা থেকে এসেছিলেন। ৩০ মে তারিখে লখনৌতে প্রকাশ্য বিদ্রোহ দেখা দিলো এবং ৩রা মে তারিখে ২জন অফিসার এবং ৫০জন সৈন্য সেখানে পাঠানো হলো। হুইলার লর্ড ক্যানিংকে লিখেছিলেন, “আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি। আরো ইউরোপীয় সৈন্য না আসা পর্যন্ত আমার নিজের সৈন্য নিয়ে আমি প্রতিরক্ষা করে যাবো বলে স্থির করেছি।” সেদিন বিকেলবেলা খবর পৌঁছালো যে একটি অভ্যুত্থান অত্যাসন্ন হয়ে পড়েছে। যারা ওতে যোগ দেবে না, তাদেরকে পরিখা দুর্গের অভ্যন্তরে চলে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পরের দিন রাজকোষ থেকে এক লাখ টাকা ওঠানো হলো। পরিখার ভেতরের সকলকে এক মাসের টাকা অগ্রিম দেয়া হলো। এ কাজ বিদ্রোহের পূর্বে সঙ্কেত হিসেবেই কাজ করেছে। উত্তেজিত সেপাইরা শেফার্ডকে বলেছে, ইউরোপীয় সৈন্য আসা পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবে না, বাস্তবে করেওনি।
