দুর্ভাগ্যবশতঃ সে সময়ে সামরিক বাহিনীর জন্য বরাদ্দকৃত কিছু পঁচে যাওয়া আটা বাজারে নিয়ে যাওয়া হলো এবং সস্তা দামে বিক্রি করা হলো। সে পুরোনো আটা দিয়ে রুটি তৈরি করলে পরে দুর্গন্ধ ছড়াতে লাগলো, তখনো স্বাভাবিকভাবেই সকলে সন্দেহ করতে লাগলো আটায় গরু-শুয়রের হাড্ডি গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেখা হয়েছে। সেপাইরা ভয়ঙ্কর রকম উত্তেজিত হয়ে উঠলো। অনুসন্ধান করে দেখা গেলো, তাদের সন্দেহ অমূলক। তাহলেও কিন্তু সন্দেহপ্রবণ ধর্মান্ধ মানুষের দ্বিধা গেলো না। তারা এজন্য শুধু দোকানদারদের একা দায়ী করলো না।
২১ তারিখে একটি বিক্ষোভ ঘটবে অনুমান করে, হুইলার আগে থেকেই তৈরি ছিলেন। কিন্তু সেদিন কিছুই ঘটলো না। তিনি সুখবরটা গভর্ণর জেনারেলকে জানিয়ে দিলেন। লখনৌ থেকে নতুন সৈন্য আসার সংবাদটা কলকাতায়ও জানিয়ে দেয়া হলো। আরো সুখের খবর বিড়ের মহারাজ ৩০০ সেপাই দু’টি কামানসহ প্রেরণ করেছেন। কলকাতা থেকে ইউরোপীয় সৈন্যেরা এসে পৌঁছালে তিনি প্রধান সেনাপতির কাছে জানালেন, আমি আশা করছি, সবকিছু ভালোয় ভালোয় কেটে যাবে। বর্তমানের অবস্থা শান্ত, পরে কি ঘটবে সে সম্বন্ধে কিছু বলা যায় না। কলকাতা থেকে ইউরোপীয় সৈন্যেরা অত্যন্ত দেরীতে এসে পৌঁছালো। কিন্তু অন্যদিকে মারাঠারা পশ্চিম দেশীয় হিন্দু এবং মুসলমান সেপাইদের প্রভুত্বসুলভ প্রভাবে ইতিমধ্যে বশ করে ফেলেছে।
এখানে অত্যন্ত একটা জরুরী প্রশ্ন উঠে। তাহলে নানা সাহেব কি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সৈন্য পাঠিয়েছিলেন? নাকি ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন? অবশ্য তিনি ইংরেজ মহিলাদের রক্ষার জন্য এবং বিস্তুড়ে তাঁদের পাঠিয়ে দেবার প্রস্তাব করেছিলেন, সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এখন কথা হলো, তিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সৈন্যদের সশস্ত্র বিদ্রোহে কোনো ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন কী না?
শেফার্ডের ধারণা হলো, অবশ্যই তিনি সশস্ত্র বিদ্রোহের সহায়তা করেছেন। কারণ তিনি লক্ষ্য করেছেন, নগরীর অনেক দেশীয় সামরিক অফিসারের সঙ্গে তার হৃদ্যতা ছিলো। তিনি ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টর মিঃ হিলাসডনকে এমনভাবে রাজী করিয়েছিলেন-বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পূর্বে, তাঁরা যেনো তাঁদের পরিবারবর্গকে তাঁর হেফাজতে প্রেরণ করেন। তাঁরা রাজী হয়েছিলেন, কিন্তু মহিলারা যেতে রাজী হননি। তাঁর ওপর এ গভীর বিশ্বাসের কারণেই নবাবগঞ্জের রাজকোষ রক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তাঁর অধীনে ৫০০ অশ্বারোহী এবং পদাতিক সেপাই ছেড়ে দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা মার্চ করে ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে গেলে তিনি তাদের সাহায্যেই অস্ত্রাগার অধিকার করেন। আমাদেরকে আরো বলা হয়েছে যে, নানা সাহেব নামে একজন বিঠুড়ের অধিবাসী এবং সরকারের ভক্ত প্রজা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সেপাইদের সঙ্গে সরকারি রাজকোষ রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে দেখে মনে হয়, তাকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা হয়েছে। তারপরে তিনি ৫০০ সৈন্য এবং ২টি ক্ষুদ্র কামানসহ রাজকোষের পাশাপাশি একটি বাঙলোতে গিয়ে উঠলেন। এ সময়ে হিলার্সডনের কথাকে বিশ্বাস করা যেত। কিন্তু পরিখা বেষ্টিত অবস্থায় তাঁকে নানা রকম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। ম্যারী থমসন ছিলেন বিদ্রোহের পরে জীবিত চারজনের একজন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “ম্যাজিস্ট্রেট নানা সাহেবকে রাজকোষের দায়িত্ব গ্রহণ করতে আমন্ত্রণ করেছিলেন। এ সময়ে হিলার্সর্ডনের ওপর প্রায় এক লক্ষ পাউন্ডের মতো অর্থ রক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিলো। তিনি মেজর হুইলারের সঙ্গে আলোচনা করে বিঘুড়ে নানা সাহেবের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন। দেহরক্ষীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে এলেন। রাজকোষ রক্ষা করার জন্য দু’শ অশ্বারোহী সেপাই এবং চার’শ পদাতিক বাহিনী নিয়োগ করা হলো। সে সঙ্গে রইলো মহারাজের নিজের সৈন্যদল। সৈন্য শিবিরের থেকে পাঁচ মাইল দূরে ছিলো রাজকোষ। বিঠুড়ের সৈন্যদল এবং ৫৩নং দেশীয় পদাতিক বাহিনীর উপর রাজকোষ রক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হলো। তা ছাড়া স্বয়ং নানা সাহেবও ক্যান্টনমেন্টের সিভিল লাইনে অবস্থান করতে লাগলেন। এ ভদ্রলোক এতো বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছিলেন যে তাঁর সম্বন্ধে কোনো রকমের সন্দেহ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের মনে উদিত হয়নি। তখন হিলার্সড়ন কিংবা হুইলারের দু’জনে নানা সাহেবকে সন্দেহ করেননি, তাঁর কোনো কারণও ছিলো না।
স্বভাবতঃই স্যার হাফ হুইলার শহর এবং সেপাই লাইনের খবর জানার জন্য কিছু সংখ্যক গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁরা তাঁদের সংবাদ শুধু মাত্র সেনাপতিকেই জ্ঞাত করেননি, নিজেদের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও এ নিয়ে গল্প গুজব করেছেন। তার ফলে কিন্তু কম ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়নি। ২৪ তারিখে একটি নিশ্চিত বিদ্রোহের আশঙ্কা করা গিয়েছিলো, কিন্তু সেদিন কিছুই ঘটলো না। ইউরোপীয় এবং ইঙ্গ-ভারতীয়দের কাছে সেপাইরাই একমাত্র ভয়ের কারণ নয়, দুর্ধর্ষ গুর্জরদের ভয়ে তারা ক্ষণে ক্ষণে শঙ্কিত হয়ে উঠতে থাকলো। সর্বক্ষণব্যাপী উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা এবং অব্যবস্থিত চিত্ততার কারণে অনেকেই কাণ্ডজ্ঞান এবং সাহস হারিয়ে ফেলেছিলেন। এ উৎকণ্ঠাজনক পিরিস্থিতির মধ্যে তারা যে কোনো কাজ করতে পারতেন। তাঁদের মধ্যে একজন স্বদেশে লিখেছেন, “আমার একমাত্র ইচ্ছা হলো আমার রেজিমেন্টসহ অথবা একা আমাকে এ সকল লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হোক। যাতে করে যে সকল লোক আমাদেরকে এতোকাল ধরে উৎকণ্ঠাজনক পরিস্থির মধ্যে রেখেছে। তারা আমাদের সঙ্গে থাকতে চায় নাকি বিরুদ্ধাচরণ করতে চায় সে সম্বন্ধে আমরা নিশ্চিত হতে পারি। ৩০শে মে তারিখে কর্ণেল এওয়ার্ট লিখেছেন, আমি দুঃখিত হয়ে লিখতে চাইনে, আমরা চরম বিপদের মধ্যে পড়েছি সে সম্বন্ধে রাখা ঢাকা করে কোনো লাভ নেই। আমি আগেই বলেছি, সেপাইরা যদি বিদ্রোহ করে, তাহলে নিশ্চিতভাবে আমাকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে। তবে এ সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত যে তারা ইউরোপীয় সৈন্যদের আক্রমণ করতে সাহস করবে না। মিসেস এওয়ার্ট নারীমনের সূক্ষ্মতার সাহায্যে আরো নিখুঁতভাবে পরিস্থিতি যাচাই করেছেন। তিনি লিখেছেন, একটা মাত্র স্ফুলিঙ্গ উড়ে এসে পড়লেই সমস্ত পদাতিক এবং অশ্বারোহী রেজিমেন্টগুলো বিদ্রোহ করবে। যেখানে পরিখা বেষ্টিত অবস্থায় আমরা আছি, সেখানে ছটি কামান আছে। তার ফলে আমরা রক্ষা পেলেও আমাদের অফিসারদের প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে। গোপন করে লাভ নেই, সমস্ত সেনাবাহিনীতে আমার স্বামীকেই সর্বাধিক বিপদের ঝুঁকি ঘাড়ে নিতে হবে।
