ইতিমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে চিমনজী আপ্পার তরফ থেকে একখানা মামলা দায়ের করা হলো, কিন্তু তা আদালত বাতিল করে দিলো।
তখন কানপুর ছিলো একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। যে জেলার সদরে সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত ছিলো, অযোধ্যার নবাবই ছিলেন তার আসল মালিক। এ জেলার সংগৃহীত রাজস্ব থেকে একদল অতিরিক্ত ব্রিটিশ সৈন্য পোষণ করা হতো। সৈন্যদের আস্তানা ছিলো ক্যান্টনমেন্ট। এ জেলাটি ১৮০১ সালে ব্রিটিশকে ছেড়ে দেয়া হয়। গঙ্গা তীরবর্তী এ শহরটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিলো। সারা বছর ক্ষুদ্র নৌকা এবং বর্ষাকালে বড়ো বড়ো নৌকা যাতায়াত করতো এই শহরের পাশ দিয়ে। লখনৌর প্রসারমান চর্ম ব্যবসার কেন্দ্র ছিলো এ শহর। এলাহাবাদ থেকে একশ মাইল এবং লখনৌ থেকে চল্লিশ মাইল দূরবর্তী এ স্থান থেকে একদিকে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড এবং অন্যদিকে অযোধ্যার উঁচু সড়ক পাহারা দেয়া যায়। কানপুরের সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৮৭৫ সালে মে মাসে কানপুরে ৬১ জন ইউরোপীয় গোলন্দাজ, ৬টি কামান এবং ৩টি ভারতীয় পদাতিক বাহিনী ছিলো। সবশুদ্ধ সৈন্য সংখ্যা ছিলো তিন হাজারেরও কম। মেজর জেনারেল হাফ হুইলার ছিলেন দলের অধিনায়ক। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় তিনি কৃতিত্বের সাথে সামরিক বাহিনীতে কাজ করে আসছেন। তিনি লর্ডলেকের অধীনে চাকুরি করেছেন এবং ১৮০৪ সালে দিল্লী অধিকারের সময় তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ করেছিলেন। বয়স বেড়ে গেলেও পরবর্তীকালে তিনি আফগানিস্তান এবং পাঞ্জাবে যুদ্ধ করে রেকর্ড স্থাপন করেছেন। তার সুনাম সৈন্যবাহিনীতে এতো ছড়িয়ে পড়েছিলো যে দিল্লীর টিলার ওপর অল্পসংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য সব সময়েই প্রত্যাশা করেছিলো যে আর কেউ না এলেও তিনি তাদের সাহায্য করতে ছুটে আসবেন। স্যার হেনরী লরেন্সের মতে, “হুইলার হচ্ছেন সময়োচিত মানুষ, এই বিপদের সময়ে শক্তির একটি দৃঢ় মিনারস্বরূপ।”
১৪ই মে তারিখে মীরাট এবং দিল্লীর খবর কানপুরে এসে পৌঁছালো। তার ফলে সামান্য উদ্বেগেরও সঞ্চার হয়নি। এ সম্বন্ধে হুইলার পুরোপুরি সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন। ১৮ তারিখে তিনি গভর্ণর জেনারেলকে টেলিগ্রাম করে জানালেন যে কানপুরে কোনো গোলমাল হয়নি। তার অধীনস্থ সেপাইদের প্রভাবিত করার মতো অশুভ যদি কিছু না ঘটে অন্য কোথাও, তাহলেও ঘাঁটি রক্ষা করতে প্রত্যাশী। ঘাঁটি ছেড়ে যাওয়ার তো কোনো কথাই উঠে না। উত্তর-পশ্চিম ভারতের প্রদেশগুলোর মতো কানপুরের ইউরোপীয় এবং খ্রীস্টান অধিবাসীদের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। মহারাণীর ৩২নং রেজিমেন্টের অনেক অফিসার তাঁদের পরিবার-পরিজনকে লখনৌতে রেখে গেছেন। তার অধীনস্থ সেপাইরা বিদ্রোহ করলে তাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সামরিক অফিসারদের পরিবারবর্গকে নিরাপদ স্থানে প্রেরণ করার কোনো প্রচেষ্টাই হুইলার গ্রহণ করেন নি। সেপাইদের মধ্যে বৈরীভাবের সামান্যতম চিহ্নও পরিদৃশ্যমান নয়। যে হুইলার অর্ধশতাব্দী ধরে সেপাইদের সঙ্গে রয়েছেন, তিনি ভালোভাবে জানেন যে তিনি একটু অসতর্ক হলেই বিক্ষোভ ফেটে পড়তে পারে। পক্ষান্তরে তিনি যদি একটুকুও অবিচলিতভাব না দেখাতেন তা হলে একটা গুলি খরচ না করেও সেপাইদের আয়ত্বের মধ্যে রাখতে পারতেন। ১৯ তারিখে তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে এ মর্মে টেলিগ্রাম পেলেন, ক্যান্টনমেন্টে ইউরোপীয় সৈন্য আসছে এবং তাদের স্থান দেয়ার জন্য সমস্ত ব্যবস্থা করার নির্দেশ তাঁকে দেয়া হয়েছে এবং আরো নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সে খবর যেনো তিনি প্রচার করেন। সময়মতো ইউরোপীয় সৈন্য এসে পৌঁছালে খবর প্রকাশ করার পরেও হুইলারের ভয় করার মতো কিছু ছিলো না। কিন্তু এখন খবর প্রকাশ করার অর্থ হলো, সেপাইদের জানিয়ে দেয়া, সরকার তাদের প্রতিও বিশ্বাস হারিয়েছেন এবং তাদের চক্রান্ত সম্বন্ধে সজাগ হয়ে উঠেছেন। ২১শে মে তারিখে ২নং অশ্বারোহী বাহিনী অস্থির হয়ে উঠলো। গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে তাদের কাছ থেকে ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি কেড়ে নিয়ে ইউরোপীয়দের মধ্যে বিতরণ করা হবে। অবশ্য গুজবের কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিলো না। অশ্বারোহী সেপাইরা পদাতিক সেপাই ভাইদের সঙ্গে আলোচনা করতে লাগলো, ঘোড়া এবং অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার আগে তাদের কি করা উচিত।
২২শে মে তারিখে সত্যি সত্যি ৫৫ জন ইউরোপীয় অনিয়মিত অযোধ্যা অশ্বারোহী দলের ২৪০ জন অশ্বারোহীসহ এসে হাজির হলো ক্যান্টনমেন্টে। সব কিছু যদিও শান্তভাবে চলছে, তবু কানপুরের সেপাইদের মধ্যে ভেতরে ভেতরে বিক্ষোভ জমা হতে থাকে, এর জন্য সেপাইদের দোষী করা যাবে না। ইউরোপীয় ও বঙ্গ ভারতীয় সৈন্যরা অস্পষ্টভাবে বিপদের আঁচ করতে চেষ্টা করেছেন। ছাউনির সকলেই প্রত্যাশা করতে লাগলো মারাত্মক কিছু, ভয়ঙ্কর কিছু অনিবার্যভাবেই ঘটবে। কিন্তু তা কি কেউ স্পষ্টভাবে ধরতে পারছে না। দেশীয় সেপাইরা তখনো শান্ত ছিলো রোজকার মতো। তা সত্ত্বেও সকলের মনে মনে প্রবল আতঙ্ক বাসা বেঁধে আছে।
ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের ধনসম্পদ সব কিছু চাকরবাকরের হেফাজতে রেখে এলাহাবাদ চলে যাবার জন্য নৌকা ভাড়া করেছেন। প্রত্যেক লোক তার সাধ্য সঙ্গতি অনুসারে চৌকিদার নিয়োগ করতে লেগে গেলো। সংঘর্ষ যদি হয়, তাহলে অবশ্যই ছড়িয়ে পড়বে। বাইরে শান্ত অবস্থা বজায় থাকলেও ভেতরে ভেতরে সেপাইরাও কম আতঙ্কিত হয়নি। একজন তো তার বন্ধুদের বললো, সাহেব লোকেরা যেভাবে আমাদেরকে ধ্বংস করতে চায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। ৩নং কোম্পানী এবং ৬নং ব্যাটালিয়নের কামান সম্পূর্ণ তৈরি এবং অশ্বারোহী বাহিনীর ওপর গুলি চালাবার অপেক্ষায় রয়েছে। সে সেপাইকে গ্রেফতার করা হলো, বিচার করে ফাঁসিকাষ্ঠে লটকানো হলো, কিন্তু এ ঘটনা তার সাথীদের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুললো। এ সময়ে লখনৌর সৈন্যদের উপস্থিতিতে তাদের আতঙ্ক আরো বেড়ে গেলো। আবার সেপাইদের দমন করার মতো লখনৌর সৈন্যরাও সংখ্যায় যথেষ্ট নয়।
