সে সময়ে ভারতীয় দেশীয় রাজারা ভারত সরকারের পরিষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্রিটেনে কোর্ট অব ডিরেক্টর্সদের সভায় আপীল করতেন। বৃত্তিহারা সমস্ত দেশীয় রাজপুরুষদের মতো নানা সাহেবও আশা করেছিলেন, তার আবেদন বৃথা যাবে না এবং তাঁর ওপর সুবিচার করা হবে। লেফটেনান্ট গভর্ণর এবং গভর্ণর জেনারেলের কাছে আবেদন করার পরে যখন কোনো ফলোদয় হলো না, তখন তিনি কোর্ট অব ডিরেক্টর্সের সভায় আবেদন করলেন। কোর্ট অব ডিরেক্টর্সের সভা ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে রাজী না হলে তিনি লন্ডনে তাঁর একজন ব্যক্তিগত প্রতিনিধি পাঠাবার কথা স্থির করলেন।
তাঁর প্রতিনিধি আজিমুল্লাহ খান অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন। এক সময় তিনি পরিচারকের কাজ করতেন। নীচকুলে জন্ম হলেও তিনি আপন চেষ্টার বলে নিজেকে সুশিক্ষিত করে তোলেন। ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষা শিক্ষা করে তিনি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার বৃত্তি গ্রহণ করেন। যে লোক এভোগুলো বাধার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন তাঁর জন্য এ কম কৃতিত্ব নয়। তাঁর ছিলো সুদর্শন চেহারা এবং মধুর ব্যক্তিত্ব, তদুপরি আপন ব্যক্তিত্ব তিনি সুচারুভাবে কর্ষণ করতে পেরেছিলেন, সে কারণে ইংল্যান্ডে যাওয়া মাত্রই তাঁকে সম্ভ্রান্ত সমাজ অতি সহজেই গ্রহণ করলো। ব্রিটিশ অভিজাত মহিলাদের প্রীতি এবং কুমারীদের ভালোবাসা যে আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন, তাও তাঁর পক্ষে কম কৃতিত্বের কথা নয়। কিন্তু শীগগিরই আজিমুল্লাহ উপলব্ধি করলেন যে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের ঘড়েল রাজনীতিবিদদের কাছে আবেদন নিবেদন করে, তার মনিবের কোনো উপকারই করা সম্ভব হবে না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কোর্ট অব ডিরেক্টরর্সদের সভা যেমন, তেমনি মহারাণীর উপদেষ্টাবৃন্দও তাঁর মনিবের আবেদনের কোনো মূল্য দিলেন না। তিনি দেশে ফিরে আসবেন স্থির করলেন। কিন্তু অন্যান্য ভারতীয় প্রতিনিধির মতো ভারতে আসার জন্য সোজাসুজি জাহাজে চড়ে বসলেন না। তিনি শুনেছেন, মালটাতে ইংরেজ এবং ফরাসী সৈন্য সম্মিলিতভাবে রুশ সৈন্যের হাতে পরাজিত হয়েছে। জাহাজে তিনি কনস্টান্টিনোপলের টিকিট কাটলেন এবং সেখানে বিখ্যাত সাংবাদিক উইলিয়াম হাওয়ার্ড রাসেলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। রাসেল এ অনুসন্ধিৎসু তরুণ মুসলিম সম্বন্ধে লিখেছেন, “কয়েকদিনের জন্য আমি কনস্টান্টিনোপল গেলাম। সেখানে মিশরীয় হোটেলে থাকার সময়ে একজন সুন্দর ছিপছিপে চেহারার ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম কয়েকবার। গাঢ় জলপাইয়ের রঙ তাঁর শরীর। পরনে প্রাচ্যের পোশাক। আঙুলে আংটি এবং অঙ্গে নানা সুন্দর বেশভূষা। তিনি হোটেলের টেবিলে বসে খাবার খেলেন, ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায় কথা বললেন। আমি অনুসন্ধান করে জানতে পারলাম, তিনি হচ্ছেন একজন ভারতীয় রাজপুত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীল করার জন্য তিনি ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন, এখন দেশে ফিরছেন।” আজিমুল্লাহ্ ক্রিমিয়াতে যেতে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। কারণ রাশিয়ান সে সকল বীর রুস্তমদের স্বচক্ষে দেখতে চান, যাদের হাতে ইংরেজ এবং ফরাসি বাহিনী এক সঙ্গে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। তিনি নিরাপদ দূরত্ব থেকে রাশিয়ান ব্যাটারী থেকে কিভাবে গোলা নিক্ষেপ করা হয়, নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি ধর্মীয় বিধিনিষেধ একদম পালন করতেন না বললেই চলে। জন রাসেলকে তিনি বলেছিলেন, এতো বোকা নই যে আমি ওসব বাজে জিনিসে বিশ্বাস স্থাপন করবো। আমি কোনো ধর্ম মানিনে। তারপরে রাসেল তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ক্রিমিয়াতে যা ঘটছে আপন চোখে দেখার এতো গভীর আগ্রহ দেখে কি অবাক না হয়ে পারা যায়? একজন ইউরোপবাসীর এ রকম কৌতূহল থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু অসামরিক গোত্রের একজন এশিয়াবাসীর এ কৌতূহল অস্বাভাবিক নয় কি? তিনি ব্রিটিশ সৈন্যদের ভীতিবিহ্বল অবস্থায় দেখেছেন। ফরাসীদের সঙ্গে স্বাস্থ্য এবং নৈতিকতার তুলনায় তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনী সম্পর্কে খুবই নিকৃষ্ট ধারণা পোষণ করেছেন।
এদিকে নানা সাহেব ধনী ভারতীয় দেশীয় রাজার স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেছেন। তিনি স্বেচ্ছায় কানপুরের ইংরেজ অফিসারদের খাতির করতে লাগলেন। নিমন্ত্রণ করে তাঁদের বর্ধিতভাবে আপ্যায়ন করতে শুরু করেছেন। মাঝে মাঝে তিনি শহরে যেতেন। কিন্তু তার ইউরোপীয় বন্ধুরা তাঁর আদর-আপ্যায়নের প্রতিদান দিতে পারতেন না। কারণ তিনি তাদের সঙ্গে পান ভোজন করতে রাজী ছিলেন না। নির্বাসিত জীবনের একঘেঁয়েমী দূর করার জন্য নানা সাহেব কাশী, প্রয়াগ, গয়া ইত্যাদি তীর্থকেন্দ্রে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কিন্তু তার গতিবিধির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছিলো। স্থান পরিবর্তনের কারণে তার মধ্যে প্রফুল্লতার সঞ্চার হয়েছে। বাড়িতে নানা সাহেবের ঘোড়া, ভালো জাতের কুকুর, নানা রকম হরিণ এবং ভারতের নানা স্থান থেকে সংগৃহীত জীবজন্তু ছিলো। নিষ্ক্রিয় জীবনের জড়তা ভাঙ্গার জন্য তিনিও সক্রিয় আনন্দের কথা ভাবলেন। ভ্রমণোপলক্ষে তিনি ১৮৫৬ সালে লখনৌ শহরে গেলেন। কাভানাগ তাকে সেখানে দেখেছেন।
রাসেল আরো বলেছেন, তীর্থযাত্রার ছলে তিনি গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডের সমস্ত সামরিক ঘাঁটি পরিদর্শন করেছেন, এমন কি সিমলাতে যাওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। তার তীর্থযাত্রার সহগামী ছিলেন আজিমুল্লাহ খান। একজন হিন্দু তীর্থযাত্রীর প্রকৃত সঙ্গী বটে। যে সকল ইঙ্গ-ভারতীয় কর্মচারীর অনুমতি ব্যতীত নানা তার প্রাসাদ থেকে এক মাইলও ভ্রমণ করতে পারেন না, রাসেল তাঁদের অসাবধানতার নিন্দা করেছেন। এমন কি কল্পি এবং লখনৌতে কোনো হিন্দু তীর্থ নাই জেনেও গ্রীফিথ তাঁকে ভ্রমণ করতে অনুমতি দিয়েছেন। সরকারী রেকর্ডপত্রে তাঁর সফরসূচির কোনো বিবরণী পাওয়ার যায় না। তবে মার্টিনো ১৮৫৭ সালে জানুয়ারি মাসে আজিমুল্লাহ খানকে আমবালাতে দেখেছেন, তখন তাঁর সঙ্গে নানা সাহেব ছিলেন না। বলা হয়ে থাকে লখনৌতে তাঁর গতিবিধি স্যার হেনরী লরেন্সের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছিলো। এ কথা টের পেয়ে তিনি আগে-ভাগে লখনৌ ত্যাগ করে চলে যান। কিন্তু সেখানে অবস্থান কালে তিনি সামরিক অফিসারদের সঙ্গে খোলাখুলি মেলামেশা করেছিলেন। হেনরী মেটকাফের মতে, নানা সাহেব লখনৌতে সামরিক খেলাধুলায় উপস্থিত ছিলেন। এ খেলাধুলা তিনদিন স্থায়ী ছিলো। এ তিনদিন সব সময়ে আমাদের অফিসারদের সঙ্গে দুষ্ট নানা কফি ইত্যাদি পান করেছেন এবং সর্বক্ষণ বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেছেন।
