পেশবার কোনো পুত্র সন্তান না থাকায়, তিনি তিনজনকে দত্তক সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন। সে তিনজন হলো, ধুন্ধু পান্থ অথবা নানা, সদাশিব পান্থ অথবা দাদা এবং গঙ্গাধর রাও অথবা বালা। পেশবার মৃত্যুকালে নানা সাহেব এবং বালা সাহেব জীবিত ছিলেন। দাদা সাহেব পান্ডুরঙ্গ রাও বা রাও সাহেব নামে একটি শিশুসন্তান ফেলে আগেই প্রাণত্যাগ করেছিলেন। দু’জন নাবালিকা কন্যাসন্তান যোগ বাই এবং রুশমাবাইও বাজীরাওয়ের মত্যুর পরে বেঁচেছিলেন। পেশবার ভাই চিমনজী আপ্পার কন্যা দ্বারকা বাইয়ের সন্তানও মৃত পেশবার ওপর ভরণপোষণের জন্য নির্ভরশীল ছিলেন। ১৮৩৯ সালে দ্বিতীয় বাজীরাও লিখিতভাবে দলিল সম্পাদন করে তার খেতাব এবং জায়গীর জ্যেষ্ঠ দত্তক পুত্র নানা সাহেবকে দিয়ে যান।
নানা সাহেবের বাল্যকাল এবং শিক্ষাদীক্ষা সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না। কিন্তু তিনি ছিলেন অসাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন অনেক গুণে গুণান্বিত একজন পুরুষ। কিন্তু সমসাময়িক ইংরেজ অফিসার যারা তার সঙ্গে এসেছেন, মিশেছেন, তার মধ্যে অসাধারণত্বের কোনো সন্ধান খুঁজে পাননি। তারা তাকে একজন সাধারণ মারাঠা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অবশ্য শান্তির সময়ে নামে মাত্র মারাঠা প্রধানের দক্ষতা প্রতিনিধি এবং কর্মচারীদের জানার কথা নয়।
দ্বিতীয় বাজীরাও তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্য অনেক টাকা-কড়ি রেখে গিয়েছিলেন কিনা বলা কষ্টকর। সরকারি রেকর্ডপত্র থেকে জানা যায়, তাঁর রক্ষিত টাকার পরিমাণ কিছুতেই তিরিশ লাখের বেশি ছিলো না। নানা সাহেব এ টাকা থেকে তাঁর এবং বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের ব্যয়ভার বহন করবেন, তাই আশা করেছিলেন ইংরেজ সরকার। মুরল্যান্ড নানা সাহেবকে ভালোভাবে চিনতেন, তিনি লিখেছেন, “যদিও নানা খুব দরাজ হাতের যুবক নন এবং তাঁর কোনো খারাপ স্বভাব নেই, তবু তিনি এ আয়ের মধ্যে জীবন ধারণ করতে পারবেন না।” সরকার দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের জীবদ্দশায় পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে তাঁর মৃত্যুর পরে, উত্তরাধিকারীরা আর বৃত্তি পাবে না। এ নীতি অনুসারে তাঁরা ১৮৩২ সালে চিমনজী আপ্পার মৃত্যু হলে তাঁর বিধবা পত্নী এবং কন্যার ভাতা বন্ধ করে দিলেন।
সুতরাং বাজীরাওয়ের মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরদের ভাতাও যে বন্ধ হয়ে যাবে, তাতে আশ্চর্যের কিছুই ছিলো না। কিন্তু ব্রিটিশ উদারতা এবং ন্যায়পরায়ণতার ওপর নানা সাহেব অবিমিশ্র শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। অনেক ইংরেজ মনে করতে লাগলেন বিধিগত ব্যবস্থা যাই হোক না কেননা, পেশবার বৃত্তির কিছু অংশ অন্ততঃ তাঁর পরিবারবর্গকে প্রদান করা উচিত। নানা এবং তার সমর্থকদের যুক্তি হলো মৃত পেশবা এবং তার আত্মীয়-স্বজনের ভরণপোষণের জন্য বৃত্তি মঞ্জুর করা হয়েছিলো, জীবদ্দশায় পেশবা যতো টাকাই রেখে যান বৃত্তির প্রতি তার পরিবারের আইনতঃ দাবি রয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশতঃ পেশবা পরিবার আবার নিজেদের মধ্যে দু’ভাগ হয়ে গেলো। দু’টি শিশুকন্যার পক্ষ থেকে তাদের পিতা বলবন্ত রাও যে দাবি করলেন, তা অধিক জোরালো হয়ে দেখা দিলো। বলবন্ত রাওয়ের পক্ষে যুক্তি হলো, হিন্দু আইন অনুসারে পিতা পুত্র-সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেলে কন্যা-সন্তানেরা পুত্র-সন্তানের মতো পিতৃসম্পত্তি দাবি করতে পারে। কন্যা-সন্তানদের দাবিকে অগ্রাহ্য করে পালিত পুত্র-পুত্রসন্তানদের দাবিকে অগ্রাধিকার দান করা কিছুতেই সঙ্গত নয়। সরকার এ আবেদন নাকচ করে দিলেন এবং জানালেন যে পেশবাই আসল এবং একমাত্র দাবিদার। এ ব্যাপারে মৃত দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের বিধবা পত্নীরা কি ভূমিকা পালন করেছিলেন সে সম্বন্ধে অমরা জানতে পারিনি। তবে সম্ভবত চিমনজী আপ্পার দৌহিত্র চিমনজী থাষ্ট্রেও একইভাবে নিজের দাবিকে উপস্থিত করেছিলেন। মৃত পেশবার চাকর-বাকর এবং আশ্রিত অনুগৃহীতরাও এ পারিবারিক বিবাদে যে ইন্ধন যোগাননি, সে কথা সত্যি নয়।
১৮৩২ সালের আইন অনুসারে, পেশবা এবং তার সঙ্গে তার জায়গীর বিড়ের মধ্যে যারা অবস্থান করছিলেন, সকলকেই আদালতে উপস্থিত না হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছিলো। কিন্তু পেশবার পরলোক গমনের সঙ্গে সঙ্গেই সে অধিকার কেড়ে নেয়া হলো। এ আঘাতও হয়তো কালের প্রভাবে মৃত বাজীরাওয়ের পরিবার কাটিয়ে উঠতে পরতো, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর পরই দেখা গেলো গোটা পরিবারের আপন বলতে এক ইঞ্চি জমি কোথাও নেই। একজন পেশবা মৃত্যুমুখে পতিত হলে ব্রাহ্মণেরা শ্রাদ্ধ উপলক্ষে পাঁচ রকমের মহাদান (হাতী, ঘোড়া, সোনা, মণি-মাণিক্য এবং জমি) তাঁর বংশধরদের কাছে পায়, এটাই হলো রেওয়াজ। কিন্তু দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের শ্রদ্ধে তাঁর বংশধরেরা চার রকমের দান ব্রাহ্মণদের করলেও জমি দিতে পারলেন না। তারা এক কণা জমির মালিক নন। এ সময়ে সর্দার রঘুনাথ রাও ভিনচরকর বিষুড়ে ছিলেন, জমি সম্প্রদান করতে না পারায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তিনি নানা সাহেবের কাছে বিনীতভাবে নিবেদন করেছিলেন, তার জায়গীর এবং যৌতুক সূত্রে প্রাপ্ত গ্রামসমূহের আসল মালিক পেশবা এবং তিনি সেখান থেকে মৃত পেশবার শ্রাদ্ধে যতো ইচ্ছা জমি দান করতে পারেন। এতে নানা সাহেব কেঁদে ফেলেন।
একটু সহানুভূতি সহকারে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যদি এসব ছোটোখাটো ব্যাপারে নজর করতেন, তাহলে অনেক অসন্তুষ্টি রোধ করতে পারা যেতো। কিন্তু তাঁদের সে মন ছিলো না। ন্যায়সঙ্গতভাবে তিনি পেশবার শীলমোহর ব্যবহার করতে পারেন। জনসাধারণের কাছে তিনি তার ন্যায্য উত্তরাধিকারী। এমন কি ইংরেজ অফিসারেরাও তাঁকে মহারাজ’ সম্বোধন না করে পারেন না। ইংরেজ কমিশনার মিেরল্যাণ্ড তাঁকে পেশবার শীলমোহর ব্যবহার করতে দিলেন না। তিনি নিজের নামে ‘পেশবা বাহাদুর’ খেতাব যুক্ত করে নতুন শীলমোহর তৈরি করলেন, কমিশনার তাতেও আপত্তি তুললেন। জানিয়ে দিলেন শীলমোহরে তিনি শুধু শ্ৰীমান নানা ধুন্ধু পান্থ বাহাদুর খেতাব ব্যবহার করতে পারবেন। বৃত্তি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ কর্তৃপক্ষের এ অপ্রীতিকর ব্যবহার তার অসন্তোষকে বাড়িয়েই তুললো।
