সমগ্র নগরী এখন বিজয়ীদের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি নভেম্বর মাসেও তাদের লুণ্ঠনকার্য থামেনি। শুধু সম্পত্তির নিরাপত্তা নয়, মানুষের প্রাণেও কোনো নিরাপত্তা ছিলো না। সে সময়ে উর্দু কবি গালিব দিল্লীতে ছিলেন। তিনি শোক-সন্তপ্ত মনে লিখেছেন, আমার সামনে রক্তের বিশাল দরিয়া। আমার সহস্ৰ সখা প্রাণ হারিয়েছে। কার কথা আমি স্মরণ করবো? কাকে আমি নালিশই বা জানাবো? সম্ভবতো আমার মৃত্যুর পরে আমার জন্য অশ্রুপাত করবার মতোও কেউ নেই। আমরা কবিসুলভ অত্যুক্তির প্রতি পুরোপুরি আস্থা নাও রাখতে পারি। তাহলেও সেপাইদের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদেরকেও যে একই ভাগ্যের শিকার হতে হয়েছে, তার অন্য প্রমাণ মিলে। জহির দেহলভী দস্তানী গফর’ গ্রন্থে লিখেছেন, অনেক সময় দোষীদের সঙ্গে নির্দোষ মানুষদেরও হত্যা করা হয়েছে। বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ের এ হলো এক নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ইংরেজ সৈন্যরা রাস্তায় যাকে দেখা পায় তাকেই গুলিকরে মারতে লাগলো। নগরের মধ্যে এমন কতিপয় মানুষ ছিলেন যাদের সমান প্রতিভাধর মানুষ অতীতে জন্মগ্রহণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও জন্ম গ্রহণ করবে না। মিয়া মুহম্মদ আমিন পাঞ্জাকুশী নামে একজন বিখ্যাত লেখক মৌলভি ইমান বক্স এবং তাঁর দু’পুত্রও কাঁচা চেহলানের অন্যান্য সকলকে বন্দী করে রাজঘাট ফটকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সেখানে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের মৃতদেহ যমুনা গর্ভে নিক্ষেপ করেছে। মহিলারা তাদের সন্তানের হাত ধরে বেরিয়ে এসে কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কাঁচা চেহলানের সমস্ত কুয়া মৃতদেহে ভরে উঠেছিলো। আমার লেখনীর সাধ্য নেই আর বেশি কিছু লেখে । কত জনকে যে ফাঁসি দেয়া হয়েছে একমাত্র আল্লাহই তার সংখ্যা বলতে পারে। এ কথা লিখেছেন গালিব তাঁর দাসতাম্বু’ কাব্যগ্রন্থে। প্রধান রাজপথ দিয়ে বিজয়ী বাহিনী নগরে প্রবেশ করেছিলো। পথে যার সঙ্গেই দেখা হয়েছে তাকেই হত্যা করেছে। গোরা সৈন্যরা নগরে প্রবেশ করে নির্দোষ এবং নিরপেক্ষ মানুষদের হত্যা করতে লাগলো। দু’টো তিনটে মহল্লাতে ইংরেজরা সম্পদও লুট করেছে এবং মহল্লাবাসীদেরও নির্মমভাবে হত্যা করেছে।”
রাজনীতি এবং ধর্মের মধ্যে কোনোরকম ভেদাভেদ ব্যতিরেকেই ব্রিটিশ সামরিক অফিসারেরা সমস্ত ভারতীয়দের প্রতি একই রকমের ব্যবহার করতে লাগলো। অধ্যাপক রামচন্দ্র ছিলেন একজন খ্রীস্টান। প্রাণের ভয়ে তাঁকেও ১১মে তারিখে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো। উচ্চ মহলে তাঁর বন্ধু-বান্ধব ছিলেন। মি. মুঈর (পরে স্যার উইলিয়াম মুঈর) তাঁকে মুক্তি দিলেন এবং পরে দিল্লীর পুরোনো কাগজপত্র রক্ষা করার জন্য তাকে দিল্লীর প্রাইজ এজেন্টের অফিসে নিয়োগ করলেন। অঙ্কিত চিত্র, দলিলপত্র, আসবাবপত্র, গৃহসজ্জার উপকরণ কিছুই সেপাইদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। অধ্যাপক রামচন্দ্র নিজেকে খ্রীস্টান এবং সরকারি কর্মচারী বলে পরিচয় দিলেও শিক্ষিত খ্রীস্টান সামরিক অফিসারেরা তাকে অপমান এবং অসম্মান হতে রেহাই দেয়নি।
শুধু তিনি একা নন, তাঁর মতো অন্যান্যেরাও রাজভক্তির কারণে লাঞ্ছিত এবং নিগৃহীত হয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। সম্পত্তি লুণ্ঠিত হয়েছে। সশস্ত্র বিদ্রোহীদের মতো তাদেরও গৃহত্যাগী হতে হয়েছে। তারা যে নির্দোষ, তা তাদের এ দুঃখ-যন্ত্রণার উপশম করতে পারেনি।
সৌভাগ্যবশতঃ বেসামরিক অফিসারেরা সামরিক অফিসার বন্ধুদের চোখে চোখে তাকাতে পারতো না। সকলের প্রতি যেভাবে সমান অত্যাচার করা হচ্ছে, যার ফলে সকলকেই শাস্তিভোগ করতে হচ্ছে সে বিষয়ে মিঃ স্যান্ডার্স পুরোপুরি সজাগ ছিলেন। তিনি নাগরিকদের দুঃখ-যন্ত্রণা এবং অসুবিধার কথা কঠোরভাবে ব্যক্ত করলেন। তার মত অনেক উচ্চপদস্থ বেসামরিক কর্মচারী সমর্থন করলেন, তার মধ্যে স্যার জন লরেন্স একজন। মুঈর বিডনের কাছে ১৮ নভেম্বর লিখেছিলেন, সামরিক কর্তৃপক্ষ যে নীতি অনুসরণ করছে, তাতে অপরাধী এবং নিরপরাধের মধ্যে যে কোনো প্রভেদ করা হয়নি, তা এক রকম স্পষ্ট এবং তার ফলে নাগরিকেরা যে পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তার অন্ত নেই। এমনকি যারা বিদ্রোহীদের হাতে চরমভাবে নির্যাতিত হয়েছে তাদের রেহাই দেয়া হয়নি। আমার মনে হচ্ছে বর্তমানে এর কোনো বিকল্প নেই। আমি আশা করছি, দিন গত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকতরো ন্যায়ানুগ নীতি অনুসরণ করা হবে। যে সকল লোক আগ্রার সঙ্কটের সময় অটলভাবে আমাদের সমর্থন করেছে যার জন্য তাদের পরিবারকে চরম দুর্ভোগ ভোগ করতে হয়েছে। কাপড়চোপড়, খাদ্য, আশ্রয় এমন কি জীবনের ভয়েও কম্পিত শিহরিত ছিলো, তাদের প্রতি সুবিচারের জন্য অন্ততঃ সুশাসনের প্রয়োজন। সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের মানুষের অভাবের দরুন নগরীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো।
প্রহরার সুবন্দোবস্ত করতে না পারায় দু’টো ছাড়া দিল্লীর আর সব ফটকগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হলো। নগরে প্রবেশের জন্য কাশ্মীর ফটক এবং নগর থেকে বেরোবার জন্য লাহোর ফটক ভোলা রাখা হলো। প্রাক্তন শাসন ব্যবস্থার সমর্থকদের ওপর জরিমানা করা হলো। ইংরেজদের ধারণা, হিন্দুরা মুসলমানদের চাইতে ইংরেজদের প্রতি অধিকতররা প্রসন্ন। আর মুসলমানেরা পুরোপুরি ইংরেজ বিদ্বেষী । সেজন্য হিন্দুদের জরিমানার অর্থ পরিশোধ করার দায় থেকে রেহাই দেয়া গেলো। জরিমানা পরিশোধ করতে গিয়ে অধিবাসীরা, তাদের সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি হারালো। তাদের শূন্য ঘরের চারটি দেয়াল ছাড়া আর কিছুই রইলো না। তারপর দিল্লীকে পাঞ্জাবের সঙ্গে সংযুক্ত করা হলো।
৪. কানপুর : ধাবমান দাবানল
দিল্লিতে সম্রাট ছিলেন। আর কানপুরের সেপাইরা মহারাষ্ট্রের রাজবংশের কারো নেতৃত্ব গ্রহণ করার অপেক্ষা করছিলো। ১৮১৭ সালে পেশবা দ্বিতীয় বাজীরাও ব্রিটিশ শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, পরে মে মাসে তাঁকে ইংরেজ সৈন্যের হাতে সম্পূর্ণভাবে পরাজয় বরণ করতে হয়। তাঁকে সাম্রাজ্য থেকে দূরে নির্বাসিত করা হলো। এ নির্বাসনের স্থান হিসেবে তিনি কাশীকে পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁর পছন্দে মত দিতে পারলেন না, কারণ সেখানে অনেক রাজপুত্র রয়েছে। তদুপরি কাশী হলো, প্রাচীন হিন্দু সাম্রাজ্যের রাজধানী। সেখান থেকে তিনি অতি সহজেই হারানো সাম্রাজ্যের প্রজাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ মুঙ্গের অথবা গোরক্ষপুরকে তার নির্বাসনের স্থান হিসেবে মনোনীত করলেন। কিন্তু পেশবা আপত্তি করলেন, মুঙ্গেরে অত্যধিক গরম এবং গোরক্ষপুরে কোনো উপাসনা মন্দির নেই, সুতরাং যেতে রাজী নন। তিনি গঙ্গা তীরবর্তী কোন স্থান এমনকি বংশানুক্রমিক শত্রুতার কেন্দ্র দিল্লীতেও যেতে রাজী ছিলেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ পেশবার রাজধানী কানপুর থেকে কয়েক মাইল দূরে বিঠোরে তাঁকে নির্বাসিত করতে মনস্থির করলেন। সেখানে পেশবাকে একটি জায়গীর দেয়া হলো। তার এবং তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য বার্ষিক ৮০ লক্ষ টাকা বৃত্তি ধার্য করা হলো। বৃত্তির ওপর নির্ভর করে তিনি দৈনন্দিন জীবন ধারণের নিষ্ক্রয়তায় অভ্যস্ত হয়ে পড়লেন। এখনো অনেক প্রজা রয়েছে যারা তাঁর প্রতি মহারাজোচিত সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। তার পুরোনো খেতাব পান্থপ্রধান এবং মহারাজ খেতাব ইংরেজ মেনে না নেয়ার ফলে তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হলেন সবচেয়ে বেশি। তাঁর সঞ্চিত অর্থ থেকে তিনি সরকারী ঋণ পরিশোধ করতে সমর্থ হলেন, কিন্তু তিনি তাঁর ঘোড়ার ঘেসুড়ের নৌকা ভাড়া দিতে অস্বীকার করলেন, কারণ তা তাঁর মতো সামন্তরাজ্যের মর্যাদার পরিপন্থী। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ রাজ্যহারা সামন্তরাজ্যের এ রকম সামান্য বিষয়ে আহত হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না। বাজীরাও এখন ইংরেজদের রীতিমতো উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। গুজব রটলো এক সময়ে তিনি নেপাল দরবারের সঙ্গে মতলব আঁটছেন। আরেক সময় ব্রহ্মদেশ এবং তিব্বতের সঙ্গে মিলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাঁর ষড়যন্ত্রের কথা ব্যাপক জনশ্রুতি লাভ করে। পেশবা বংশের কেউ দীর্ঘদিন ধরে বাঁচে না। ব্রিটিশ সরকার আশা করেছিলো যে বৃত্তির টাকাও পেশবা বেশিদিন ভোগ করতে পারবেন না, খুব শীগগিরই মারা যাবেন এবং পেশবা মারা গেলে ইংরেজদের হাড় জুড়াবে। বিঠুড়ের নিরুদ্বেগ সহজ জীবন তাঁর আয়ুসীমাকে সত্তর বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিলো। তিনি ১৮১৫ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বেঁচেছিলেন।
