মহিষীকেও রেহাই দেয়া হয়নি। ইউরোপীয় মহিলারা তার দিকে ঘৃণাব্যঞ্জক দৃষ্টিতে তাকাতেন এবং অনেক সময় কঠোর মন্তব্যও করতেন। মিসেস কুপল্যাণ্ড যার স্বামী গোয়ালিয়রে নিহত হয়েছেন, তিনিও সম্রাটকে দেখতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর মধ্যে রাজ্যহারা সম্রাটের কোনো মহিমা, কোনো মহানুভবতা তিনি প্রত্যক্ষ করেননি। তিনি লিখেন, আমরা সিঁড়ি বেয়ে কয়েক কদম অগ্রসর হয়ে একটা নোংরা ঘরে প্রবেশ করলাম। ঘরের সামনে প্রহরীরা ঘোরাফেরা করছে। তারপরে রাজার রাজা মোগল সম্রাটের ঘরে প্রবেশ করলাম। তারপরে পর্দা ঠেলে আমরা নিচু নোংরা একটি কক্ষে এসে ঢুকলাম। সেখানে একটি নিচু চারপায়ার ওপরে সাদা সুতী কাপড়ের পোশাক পরা ক্ষীণাঙ্গী এক বুড়ো মহিলাকে দেখতে পেলাম। শীতের জন্য তিনি ময়লা চাদর এবং লেপে সারা শরীর ঢেকে আছেন। আমাদের প্রবেশ পথে তিনি হুঁকাটা রেখেছেন। যে সম্রাট অতীতে তাঁর সামনে কেউ বসলে সে অপমান সহ্য করতে পারতেন না, অত্যন্ত দীনভাবে আমাদের সালাম করে বলতে লাগলেন, আমাদের দেখে তিনি খুবই খুশি হয়েছেন।”
শাহজাদা জওয়ান বখতের অবস্থাও ভালো নয়। তিনি অসুখে ভুগছেন। তথাপিও তাঁকে প্রত্যেক দর্শককে সম্মান জানাবার জন্য উঠে দাঁড়াতে হয়। কমিশনার বসবার অনুমতি না দিলে বসতে সাহস করতেন না। বিচারের সময় বিচারক এবং প্রসিকিউটাররা সম্রাটকে সাধারণ ভদ্রতাটুকুও দেখাতে পারেননি। এখনো তিনি কবিতা লিখতে চান। কিন্তু তাঁকে কাগজ-কলম দেয়া হয়নি। তার অভাবে কয়লা দিয়ে তিনি বদ্ধঘরের দেয়ালে কবিতা লিখতেন। এক সময় বলা হলো তাঁকে আন্দামানের বন্দী উপনিবেশে আফ্রিকায় অথবা অন্য কোনো দেশে পাঠিয়ে দেয়া হোক। সিসেন বিডন তাকে চীনা উপকূলের হংকং শহরে পাঠিয়ে দিতে পরামর্শ দিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ব্রহ্মদেশের রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হলো। কয়েক বছর পর সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাহাদুর শাহ নিজের মন্দভাগ্যের জন্য কাউকে দোষ দিতে পারেন না। তিনি যদি সাহসিকতায় ভর করে সেপাইদের সঙ্গে যেতেন এবং বীরের মতো মৃত্যুকে যুদ্ধক্ষেত্রে আলিঙ্গন করতেন তাহলে দেশবাসী এমন কি শত্রুদের শ্রদ্ধাও তিনি আকর্ষণ করতে পারতেন। প্রথমে সেপাইদের দ্বারা প্রলুব্ধ হলেন ক্ষমতার জন্য, তারপরে রজব আলী এবং ইলাহী বক্সের দ্বারা প্রলুব্ধ হলেন আপন প্রাণের জন্য। নিষ্ঠুর ভাগ্যের হাতের ক্রীড়নক বাহাদুর শাহ আপন সাম্রাজ্য থেকে দূরে বন্দী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন।
দিল্লী এবং তার অধিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশার অন্ত নেই। জেনারেল উইলসন নারী এবং শিশুদের প্রতি কোনো রকমের নৃশংসতা না করার জন্য কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এমন সৈন্য কোথায় আছে যে বিজয়ের মহেন্দ্রলগ্নে করুণা দেখবার আদেশ মেনে নেবে? এখন শিখরা মনে করতে লাগলো, গুরু যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তাঁর শিষ্যেরা দিল্লীকে ছারখার করে দেবে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছে। লুণ্ঠনের আশা এবং পূরবীয়া সম্প্রদায়ের ওপর প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করার প্রবল বাসনায় তারা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে লাগলো। ব্রিটিশ সৈন্যরা শুনেছে শিশু হত্যা এবং মহিলাদের অসম্মানের কথা এবং শুনেছে তাদের বন্ধুদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এতোদিন তাদের মনে প্রতিহিংসার আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিলো। এমনকি খ্রীস্টান ধর্মযাজকেরা একে ধর্মসঙ্গত কাজ বলে মেনে নিতেও কোনো আপত্তি করেনি।
২১শে সেপ্টেম্বর গ্রফিথ দিল্লীর রাজপথ এবং জনাকীর্ণ দিল্লী নগরী সম্বন্ধে লিখেছেন, “রাজপথে একজন মানুষও নেই। বিপত্তির কারণে সমগ্র নগরীকে মৃত মানুষের শহর বলে ভ্রম হয়। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় আমরা যে রাজপথ দিয়ে যাচ্ছিলাম, মাত্র কয়েকদিন আগেও তার দু’দিকে হাজার হাজার লোক বাস করতো, সেপাই এবং নগরবাসীদের শব চারদিকে ছড়ানো রয়েছে। অনেক দিন ধরে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। শ্বাস নেয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু পরিকল্পিত লুণ্ঠনের কাজ অব্যাহত গতিতে চলছে। পরিত্যক্ত গৃহের মেজ খনন করে গুপ্ত ধনের সন্ধান করতে লাগলো। গুপ্তধন পাওয়া গেলে অফিসারেরা তার অংশগ্রহণ করতে লাগলেন কোনো রকমের কুণ্ঠা না করে। সোমনাথের কাহিনী এখনো জীবন্ত। হিন্দু প্রতিমাগুলোকে অপসারণ করা হলে রহমাণিক্যের সন্ধানে কতোগুলোকে ভেঙ্গে ফেলা হলো। ৩১শে অক্টোবর তারিখে গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী সার্জনের রিপোর্টের উপর নির্ভর করে মুঈর শেরারকে লিখলেন, “এখনো দিল্লী তার সবরকম ঐশ্বর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কামান কিংবা গুলির সামান্যতম চিহ্ন কোথাও দৃষ্টিগোচর হয় না, কিন্তু বাড়িগুলো সব পরিত্যক্ত এবং লুণ্ঠিত। হতভাগ্য অধিবাসীরা পালিয়ে উপোস করছে এবং আমি কিছুতেই মনে করতে পারি না যে তাদের ওপর নির্মম ব্যবহার করা হয়েছে। সেপাইদেরকে নির্দয়ভাবে হত্যা করার জন্য আপনি আমাকে দোষারোপ করতেন, কিন্তু আমারও মনে হয় সরকার হতভাগা বেনিয়া এবং কায়েতদের প্রতি খুবই রূঢ় ব্যবহার করছেন। নগরে প্রতিদিন বর্ধিত হারে লুণ্ঠনকার্য চলছে। আমার ধারণা প্রত্যেক অফিসার যারা অবরোধ কাজে লিপ্ত আছেন, এ মুহূর্তে অবসর গ্রহণ করলেও কোনো ক্ষতি হবে না। এটা কোনো অহেতুক অনুমান ছিলো না। গ্রীফিথ এমন একজন অফিসারের কথা বলেছেন যার অন্যায়ভাবে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ছিলো দু’লাখ টাকা। তিনি আরো বলেছেন, “ আমার রেজিমেন্টের অনেক সৈন্য লুণ্ঠনের অনেক দুর্মূল্য বস্তু সামগ্রীর অধিকারী হতে পেরেছিলেন। আমাদের ইংল্যান্ডে ফিরে আসার পরই পুরোপুরি দেখতে পেয়েছিলাম। অধিকসংখ্যক নকমিশন্ড অফিসার এবং সৈন্য স্বেচ্ছায় চাকুরি ছেড়ে দিয়েছিলেন, কারণ মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী যা দিল্লীতে হস্তগত করেছেন এবং তিন বছর ধরে রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন, এখন বিক্রয় করার উপযুক্ত সুযোগের সন্ধান করছেন। অনেক দোকানে রত্ন-অলঙ্কার বিক্রয়ের জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। দেখলেই প্রাচ্যের অণুকরণীয় সূক্ষ্ম শিল্পের কথা মনে পড়ে যায়। আমরা জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছি সৈন্যদের কাছ থেকেই তারা সে সব খরিদ করেছে।”
