এভাবে দিল্লী দখল করা হলো, কিন্তু কতো মানুষকেই না এজন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। ৩০শে মে হতে ২০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধুমাত্র ব্রিটিশ পক্ষেই ৩,৮৩৭ জন লোক নিহত, আহত অথবা নিখোঁজ হয়েছে। রেজিমেন্টগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও সামান্য নয়। গুর্খা সৈন্য, যারা হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদে ব্রিটিশ সৈন্যের ডান দিকে ছিলো তাদের ৫৫০ জনের মধ্যে শতকরা ৬০ জন নিহত বা আহত হয়েছে। বিদ্রোহীদের মধ্যে কতজন নিহত কিংবা আহত হয়েছিলো সে খবর আমরা জানি না।
একদিক দিয়ে ধরতে গেলে এ বিজয় এখনো সম্পূর্ণ নয়। কারণ সম্রাট এবং শাহজাদারা এখনো মুক্ত অবস্থায় আছেন। প্রধান সেনাপতি বখৃত খান সম্রাটকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে অযোধ্যায় চলে গিয়ে সেখানে যুদ্ধ শুরু করতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু ইলাহী বক্স শৰ্তমূলকভাবে আত্মসমর্পণ করতে উপদেশ দিলেন। মহিষীর প্ররোচনাতেই তিনি এ পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ মহিষী তাঁর ছেলে, স্বামী এবং তাঁর কিছু রত্ন-অলঙ্কার ফিরে পাবার প্রত্যাশা করেছিলেন। একজন ছাড়া সম্রাটপুত্রদের কারো বাবুরের সে অদম্য সাহসের একবিন্দুও ছিলো না। শাহজাদা ফিরোজ শাহ তখন দিল্লীতে ছিলেন না। মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান এবং আবু বাকার এতাদিন পর্যন্ত সাম্রাজ্যের পুনর্জীবনের অসম্ভব আশায় মেতে উঠেছিলেন, কিন্তু বর্তমানে তারা আপন আপন প্রাণ বাঁচাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। সম্রাট পয়লা কাতবে গিয়েছিলেন। মীর্জা ইলাহী বক্স তাঁকে হুমায়ুনের মাজারে আশ্রয় গ্রহণ করতে বললেন। ব্রিটিশ গুপ্তচর মৌলবি রজব আলী ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগকে পলাতকদের অবস্থান জানিয়ে দিলেন। হডসন উইলসনের কাছে গেলেন, শুধুমাত্র প্রাণের দাবিতে সম্রাটের আত্মসমর্পণের বিষয়ে মীর্জা ইলাহী বক্সের মাধ্যমে আলোচনা চালাবার জন্য অনুমতি পেলেন। এটা ছিলো বেসামরিক অফিসারের দায়িত্ব। কিন্তু বেসামরিক অফিসার হার্ভে গ্রীথিড ২০ তারিখে কলেরায় মারা গেলেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মিঃ স্যাণ্ডার্স। হডসন মৌখিকভাবে তাঁকে জানালেন যে শুধুমাত্র প্রাণ রক্ষার তাগিদে, সম্রাটের আত্মসমর্পণের ব্যাপারে আলোচনা চালাবার অনুমতি তিনি প্রধান সেনাপতির কাছ থেকে লাভ করেছেন। হডসন শাহজাদা জওয়ান বস্তৃত এবং তার শ্বশুর আহমদ কুলী খানকেও প্রাণের দায় থেকে রেহাই দিয়ে তার ওপর প্রদত্ত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করলেন। সে সময়ে সম্রাটের মুক্তির জন্য তার আলোচনার কড়া সমালোচনা করেছেন অনেক দায়িত্বশীল ইংরেজ, কারণ প্রাসাদের অনেক ইংরেজকে হত্যার জন্য তাঁরা সম্রাটকেই দায়ী মনে করেন।
২১শে সেপ্টেম্বর তারিখে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ হডসনের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন, তাঁকে দিল্লীতে আনা হলো। তারা পরের দিন হডসন হুমায়ূনের মাজারে অভিযান চালিয়ে শাহজাদাদের শর্তহীন আত্মসমর্পণ দাবি করলেন। শাহজাদারা প্রাণ রক্ষার নিশ্চয়তা পেতে চেয়েছিলেন। মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান এবং মীর্জা আবু বাকারকে একটি গরুর গাড়িতে ভোলা হলো। হডসন বলেছিলেন শাহজাদাদের এ অবস্থা দেখে একদল সশস্ত্র জনতা জমা হয়েছিলো। কিন্তু তাদের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিতে তাঁকে বেগ পেতে হয়নি। তারপর তিনি বন্দীদের নিয়ে দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করলেন, জনতাও তাঁকে অনুসরণ করতে লাগলো। তারা দিল্লীর ফটকের কাছে এসে পৌঁছালে হডসন বন্দীদের কাপড় খুলতে আদেশ করলেন। তারপর আপন হাতেই তিনজনকে গুলি করে মারলেন। তার একটু পরেই সম্রাটের বংশের ২১ জন শাহজাদাকেই ফাঁসিকাষ্ঠে লটকানো হলো। বল্লভগড়ের রাজা এবং ঝজঝরের নবাবকেও ফাঁসি দেয়া হলো।
সম্রাট আপন প্রাণ রক্ষার জন্য দরাদরি না করলেই হয়তো ভালো করতেন। জঘন্য অপরাধীর সঙ্গে যে ব্যবহার করা হয়, তার সঙ্গেও তেমন ব্যবহার করা হলো। তাঁকে শেকল পরানো হয়নি এ কথা সত্য। কিন্তু এমন খারাপ জায়গায় তাঁকে রাখা হয়েছে যে প্রত্যেক ইংরেজ নরনারী সম্রাটের গোপনীয়তা ভঙ্গ করতো এবং তার দিকে রোষকষায়িত লোচনে তাকাতো। গ্রীফিথ ২২শে সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ করার পরের দিন একটি সাধারণ চারপায়ার কুশনের উপর সম্রাটকে উপবিষ্ট দেখেছিলেন এবং লিখেছেন, “মোগল সাম্রাজ্যের শেষ বংশধর দরবারের বারান্দা অথবা বিছানায় একখানা সাধারণ দেশী চারপায়ার কুশনের উপর বসে আছেন হাঁটু বাঁকা করে। বুকের ধার অবধি নেমে আসা লম্বা দাড়ি ছাড়া তাঁর চেহারার মধ্যে আর কোন আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য নেই। মাঝামাঝি দীর্ঘ, সত্তর বছরের উপরে বয়স, পরনে সাদা কাপড়, মাথায় চূড়াকৃতি একটি সাদা পাগড়ি। পেছনে দু’জন পরিচারক দাঁড়িয়ে বৃহৎ ময়ূরের পালকের পাখা দিয়ে হাওয়া করছে। এ হলো তার সার্বভৌমত্বের প্রতীক। কিন্তু যে সম্রাট শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, তারপরেও তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রহসন দেখে মনে করুণারই উদয় হয়। তাঁর মুখ থেকে একটা কথাও বেরুচ্ছে না। রাতদিন তিনি স্থির হয়ে মাটির দিকে চেয়ে চুপচাপ বসে আছেন। দেখে মনে হয় যে অবস্থার মধ্যে পড়েছেন, তার বিপত্তি সম্বন্ধে তিনি পুরোপুরি সজাগ। তার থেকে মাত্র তিন ফুট দূরে আরেকটি বিছানায় বসে আছেন প্রহরারত অফিসার। দুপাশে দু’জন ইউরোপীয় প্রহরী যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের রাইফেলের সঙ্গিনগুলো চকচক করছে। প্রহরারত অফিসারের কাছে নির্দেশ দেয়া আছে, সম্রাট যদি পালাবার কোনো চেষ্টা করেন, তিনি যেন নিজের হাতে সম্রাটকে গুলি করেন। রেইকস তাঁকে ১৮ই ডিসেম্বর তারিখে দেখে ১৯ তারিখে লিখেছিলেন, আমার অনেক ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলাকে নিয়ে গতকাল সম্রাটকে দেখতে গিয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে মিঃ ও মিসেস স্যাণ্ডার্সও ছিলেন। সম্রাট নব্বই বছরের একজন আশাহত বৃদ্ধ। আমি দেখলাম, তিনি একটি ছোটো ঘরে, আগে যেখানে সামান্য চাকর থাকতো সেখানে কুশনের ওপর বসে আছেন। আমি তার পাশে গিয়ে চেয়ারে বসলাম এবং তাঁকে স্বপ্নের কথা বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম। তারপরে তিনি স্বরচিত কবিতা আবৃতি করতে লাগলেন অনুচ্চস্বরে। সম্রাটকে কিছু না বলে আমি স্থান পরিত্যাগ করলাম।”
