নিকলসন পরিচালিত বাহিনী প্রাচীরের ভগ্ন অংশ অতিক্রম করে শীগগিরই মোরি দুর্গ অধিকার করলো। কাবুল ফটক দখল না করা পর্যন্ত নিকলসনের অধীন সেনাবাহিনী সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলো। কাবুল ফটকের পেছনে বার্ন দুর্গ পর্যন্ত তারা এগিয়ে গেলো। কিন্তু তার পরে আর অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। প্রতি ইঞ্চি মাটি ছেড়ে দেয়ার আগে সেপাইরা মরণপণ সংগ্রাম করছে। আক্রমণকারী সেনাদল সেপাইদের গোলাগুলির আঘাতে ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অফিসারেরা নিজেরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, সেপাইদের অনুপ্রাণিত করছেন। কিন্তু মানুষের সাহসেরও তো সীমা আছে। আক্রমণকারীরা বারবার সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। কিন্তু প্রতিরক্ষীদের অবিরাম কামানের গোলাগুলি তাদেরকে বারবার পেছনে হটিয়ে দিচ্ছে। মেজর জেকব গোলার আঘাতে আহত হয়ে পড়লেন। সামনে এলেন নিকলসন। তাঁর মানুষদের অনুসরণ করতে আদেশ দিয়ে তুমুল গোলাবর্ষণ অগ্রাহ্য করে তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন এবং গোলার আঘাতে মারা গেলেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতো ব্যাপক যে সেনাবাহিনী কাবুল ফটকে ফিরে যাওয়াই উপযুক্ত মনে করলো।
জোনস পরিচালিত দ্বিতীয় দল ভগ্নপ্রাচীর অতিক্রম করলো। কিন্তু নিকলসনের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। তৃতীয় বাহিনী পরিকল্পনা অনুসারে আক্রমণে সাফল্যলাভ করে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে। তারা কাশ্মীর ফটকে এসে দেখে যে সেতু আংশিকভাবে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু অবশিষ্ট দণ্ডগুলো বেয়ে তারা সেতু অতিক্রম করতে লেগে গেলো। গোলার পর গোলা এসে আঘাত করছে। আহত নিহত হয়ে নীচে পড়ছে। আবার তারা সামনে এগিয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত তারা আক্রমণ করতে সক্ষম হলো। ফটক প্রবল শব্দে ভেঙ্গে পড়লো। বিউগলের উচ্চনিনাদ তাদের সাফল্যের প্রতিধ্বনি করলো। এই আক্রমণের বীর হলেন, লেফটেন্যান্ট শ্যালকেল্ড, হোম, কর্পোরাল বার্গেস, সার্জেন্ট স্মীথ, কাৰ্মাইকেল, হাবিলদার মধু, হাবিলদার তিলক সিং এবং সেপাই রামনাথ। তৃতীয় বাহিনী তাদের অবস্থান দৃঢ় করে জামে মসজিদ পর্যন্ত অগ্রসর হলো। মসজিদ থেকে অবিরাম গোলাবর্ষণ অবশ্য তাদেরকে পেছনে হটতে বাধ্য করলো। দিনের শেষভাগে ব্রিটিশ সৈন্য নগর প্রাচীরের একাংশ দখল করে নগরের মধ্যে নিজেদের আধিপত্য প্রসারিত করলো। সে রাতে ব্রিটিশ সৈন্য স্কীনারের বাড়িতে ঘুমোলেন। গীর্জা এবং কলেজের অট্টালিকাও তাদের হাতে চলে এলো। ক্ষয়ক্ষতি যা হয়েছে মারাত্মক। ১১০৪ জন সৈন্য, ৬৬ জন অফিসার এবং প্রতি ৯ জনের ২ জন হয়তো মারা গেছে অথবা আহত হয়ে পড়ে আছে। ইঞ্জিনীয়ারদের সঙ্গে কর্মরত সতেরো জন অফিসারের মধ্যে আটজন ভয়ঙ্করভাবে আহত হয়েছেন এবং একজন নিহত হয়েছেন। স্বভাবতই উইলসন দুঃখিত হয়েছেন। সেলিমগড়ের সুরক্ষিত দুর্গপ্রাসাদ এবং অস্ত্রশস্ত্র এখনো সেপাইদের হাতে রয়েছে। সে দুর্গের ছিদ্র দিয়ে গোলাগুলি বর্ষণ করে দু’দিকে এখনো প্রত্যেকটা রাজপথ ওরা আগলে রাখতে পারবে। তিনি চিন্তা করলেন, তার সেনাবাহিনীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে, এখনো অপেক্ষা করা যুক্তিযুক্ত হবে কি? না কি তাঁর উচিত নগর পরিত্যাগ করে আবার টিলা-শ্রেণীর ওপর চলে গিয়ে নতুন সৈন্য আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা? এ হতাশাজনক পরামর্শের নিন্দা করলেন বেয়ার্ড স্মীথ। যাহোক শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সৈন্যরা সাহস করে নগরের মধ্যেই রয়ে গেলো।
চালর্স জন গ্রিফিথ, যিনি উইলসনের অধীনে চাকুরি করতেন, এভাবে ১৫ই সেপ্টেম্বরের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। “সব বয়সের সব সৈন্যরা এখন কড়া মদের নেশায় বিভোর। এটা ব্রিটিশ সৈন্যদের পক্ষে ভয়ঙ্কর লজ্জার কথা। কে এবং কার দ্বারা প্রথম এ কাজ হয়েছে আমি বলতে পারবো না। ১৫ তারিখ সকাল বেলা দেখা গেলো মদের ভাঁড়ারের দরজা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে এবং সৈন্যরা মদের নেশায় বিভোর হয়ে হৈ হল্লা শুরু করেছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক, সে সময়ে যদি শত্রু আমাদের ওপর আক্রমণ করতো, তাহলে আমাদেরকে বেকায়দায় পড়তে হতো। তাদের মদ খাওয়া থেকে বিরত করার জন্য চেষ্টা করা হলো। কিন্তু তাতে কোন ফল হলো না। শেষ পর্যন্ত প্রধান সেনাপতি মদের সমস্ত ভাড়ার নষ্ট করে ফেলার আদেশ দিলেন। এ কাজ পাঞ্জাবী এবং শিখদের দ্বারাই করা হয়েছিলো। দিল্লীর রাজপথে মদের স্রোত বয়ে গিয়েছিলো।” সেপাইরা এসব দিকে কিন্তু নজর রাখেনি। শুধুমাত্র সন্ধ্যে বেলাতেই তারা কলেজ চত্বরে বন্দুক এবং সেলিমগড়ের আশপাশের বাড়িগুলোতে কামানের গোলা ছুঁড়তে লাগলো।
১৬ তারিখে ইংরেজরা অস্ত্রাগার অধিকার করে নিলো। ১৭ থেকে ১৯ তারিখের মধ্যে সেলিমগড় দুর্গে ভারী কামানের গোলা বর্ষণ করতে লাগলো। ইংরেজদের অধিকারের সীমা এখন বিস্তার লাভ করেছে। ২০ তারিখে তারা প্রাসাদ এবং সেলিমগড় দুর্গের চারদিকে স্থান দখল করে নিলো। এ সুরক্ষিত দুর্গ প্রাসাদ রক্ষা করার জন্য কেউ ছিলো না। কেবল কয়েকজন প্রহরী প্রাণপণে বাধা দিয়ে সম্মান রক্ষার চেষ্টা করেছে। এই নামহারা বীরেরা সেদিন ইংরেজদের বাধা দিয়েছিলো, মৃত্যুবরণ করেছিলো। ইংরেজরাও এ বীরদের বীরত্বের প্রশংসা না করে পারেনি। জেনারেল উইলসন প্রাসাদের মধ্যেই ইংরেজদের সদর দফতর স্থানান্তরিত করলেন। দেওয়ান-ই খাসে নৈশ ভোজের আয়োজন করে ইংরেজরা বিজয় উৎসব করলো।
