কিছু প্রাণহানি ছাড়া এটা করা সম্ভব হতো না। কিন্তু সশস্ত্র সৈনিকেরা কেউ মারা গেলো না। যারা মরলো তারা সকলেই নিরস্ত্র এদেশীয় মানুষ। ১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের যুদ্ধে টিলার ওপর যে সকল সংগ্রামরত সৈনিক ছিলো, তার অর্ধেকেরও বেশি ছিলো ভারতীয় এবং সমস্ত শিবির পরিচারক যাদের সংখ্যা সগ্রামী সৈন্যদেরও ছাড়িয়ে যায়, তাদেরও সকলে ভারতীয়। এই নীরব সাহসী মানুষদের কোনো তুলনা হয় না। গোলার আঘাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিঁড়ে যাচ্ছে, তাদের কোনো ভাবান্তর নেই। ১০ই সেপ্টেম্বরে তৃতীয় ব্যাটারী স্থাপন করার সময় দেখা গেলো তাদের মধ্যে ৩৯জন হতাহত হয়েছে।
চার রাতের মধ্যে পরিখা খনন এবং তিনটা ব্যাটারী স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। চার নম্বর ব্যাটারীর কাজ সমাপ্ত প্রায়। ইঞ্জিনীয়ারেরা আরো তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে পারবেন বলে আশা দিয়েছিলেন। এ বিলম্বের জন্য সহযোদ্ধারা বারংবার ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। ৩নং ব্যাটরী প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ হওয়ার আগে ১৬ তারিখে কীথ ইয়ং লিখেছিলেন, “ইঞ্জিনীয়ারেরা প্রধান সেনাপতিকে ব্যাটারী স্থাপন করার জন্য যে সময়ের কথা বলেছিলেন, সে সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেনি। সে জন্য তাঁরা ভয়ংকরভাবে দায়ী। এক রাতের মধ্যে সবকিছু শেষ করতে পারবেন বলে বলেছিলেন। আমরা মনে করেছিলাম, হয়তো দু’তিনদিন লাগতে পারে। কিন্তু আজকে চারদিন অতিবাহিত হতে চলেছে, এখনো শেষ হয়নি। ইঞ্জিনীয়ারেরা চমৎকার মানুষ, কিন্তু তাঁরা অসম্ভবকে সম্ভব করার বাসনা পোষণ করেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন তরুণ, তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা সম্ভাব্য বিপদ সম্বন্ধে কিছুই ভাবেননি। কিন্তু বয়স্কেরা সে সম্বন্ধে আগেই ভাবনা-চিন্তা করতেন। কিন্তু তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। ইতিহাস দিল্লী অধিকারের মাধ্যমে তাঁদের পুরস্কৃত করেছেন।
১১ই সেপ্টেম্বর সকাল থেকে ব্যাটারী হতে নগর প্রাচীরে গোলা নিক্ষেপ করা হতে লাগলো। ১৩ তারিখে নগর প্রাচীরের দুটি স্থান বিদীর্ণ হয়ে গেলো। লেফটেন্যান্ট মেডলী রাতের অন্ধকারে প্রাচীরের ভগ্নস্থান পরীক্ষা করে জানালেন যে ওতে তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে। পরদিন সকালে নগরীর মধ্যে ঝড়ের বেগে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। প্রতীক্ষার দিনের অবসান হয়েছে, আক্রমণের প্রত্যাশিত মুহূর্তটি এসেছে হাতের কাছে। জন নিকলসন হচ্ছেন সময়ের উপযুক্ত মানুষ। কোনো দ্বিধা, কোনো সন্দেহ তাঁকে দমাতে পারে না। কোনো ভয় কোনো ভীতি তাঁর বিশ্বাসকে টলাতে পারে না। সুতরাং তাঁকেই নগর আক্রমণের নেতা নির্বাচন করা হলো। আক্রমণকারী সেনাবাহিনীকে চারটি দলে বিভক্ত করা হলো। প্রথম দল স্বয়ং নিকলসনের পরিচালনাধীনে কাশ্মীর দুর্গের পাশ দিয়ে ঝটিকা বেগে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিলো। দ্বিতীয় বাহিনী ব্রিগেডিয়ার জোনসের অধীনে জলের ট্যাঙ্কের কাছের ভগ্ন অংশ দিয়ে এবং তৃতীয় বাহিনী কর্ণেল ক্যাম্পবেলের নেতৃত্বে কাশ্মীর ফটক উড়িয়ে দিয়ে নগরে প্রবেশ করবে বলে স্থির হলো। চতুর্থ দল পাহারপুর এবং কিষাণগঞ্জের সেপাইদের হটিয়ে দিয়ে উপকণ্ঠ ঘুরে লাহোর ফটক দিয়ে নগরে প্রবেশ করার কথা ঠিক হলো। মেজর রীড, যিনি হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদের অসংখ্য সেপাই আক্রমণ বহুবার প্রতিহত করেছেন, তিনিই চতুর্থ বাহিনীর অধিনায়ক। বাদবাকী সেপাইদের ব্রিগেডিয়ার লংফিল্ডের অধীনে রাখা হলো। সেনাবাহিনী প্রস্তুত কিন্তু আক্রমণ স্থগিত রাখতে হলো। রাতের মধ্যে প্রাচীরের ভগ্ন অংশ মেরামত করে ফেলা হয়েছে। ইংরেজদের সৌভাগ্য, এ ভগ্ন অংশে ইট এবং কামান না বসিয়ে সেপাইরা বালির বস্তা স্থাপন করেছে। আবার কামান থেকে গোলা বর্ষণ করা হলে মেরামতকৃত ভগ্নস্থানসমূহ পুনরায় ফাঁক হয়ে গেলো।
বেয়ার্ড স্মিথ দিল্লীকে ভালোভাবে চিনতেন। তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা মিলে যে পরিকল্পনা করেছেন, তাতে খুঁটিনাটি কিছুই বাদ পড়েনি। প্রত্যেক অধিনায়ককে এ পরিকল্পনার এক একটি কপি দেয়া হলো। কিন্তু যুদ্ধেরও তো দুর্ঘটনা আছে। রীডের বাহিনী লক্ষ্যে তো পৌঁছাতে পারলোই না, বরঞ্চ ফিরে আসতে হলো। আর, সি, লরেন্সের অধীন গুর্খা বাহিনীও তাঁর সঙ্গে যোগদান করেছিলো। দক্ষিণ দিক থেকেই সেপাইরা প্রচণ্ড আক্রমণের প্রতীক্ষা করছিলো, সে জন্য সেখানে তারা বেপরোয়াভাবে বাধা দিতে থাকে। জম্মু বাহিনীকে ফিরে আসতে বাধ্য হতে হলো। অন্যান্য বাহিনীও সাফল্যের পরিচয় দিতে পারলো না। সমগ্র বাহিনীকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়া হলো। হোপ এ্যান্টের সেনাদলকে লাহোর ফটকের কাছ থেকে গোলন্দাজদের নির্মম আক্রমণের মুখে ফিরে আসতে হলো। সেপাইদের যদি একজন প্রতিভা এবং পারঙ্গমতাসম্পন্ন নেতা থাকতো তাহলে এ সাফল্যের ওপর নির্ভর করে অনেক কিছু করতে পারতো। যদি সম্মুখভাগে ব্রিটিশ সৈন্যদের আক্রমণ করা হতো, তাহলে শুধুমাত্র নগর রক্ষাই হতো না, শত্রুরা দু’দিকের গোলা বর্ষণের পাল্লায় পড়ে হতাশ হয়ে যেতো। দুর্ভাগ্য, দিল্লীর সেপাইদের মধ্যে এমন একজন নেতাও ছিলো না, কখন এবং কোথায় আঘাত করতে হবে এ জ্ঞান যার ছিলো। চতুর্থ সেনাবাহিনীর ওপর জয়লাভ করার পরেও সেপাইরা দিল্লীর পতন রোধ করতে পারলো না।
