আগস্ট মাসে সম্রাটের অর্থসঙ্কট ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো। এখন আর ঋণ করার ভড়ং নেই, ঋণদাতাদের দলিল দেয়ার সময় বয়ে গেছে। সুদের প্রশ্নই তো উঠে না। দিল্লীতে একটা টাকশাল বসানো হলো। তার ফলেও কিন্তু কোনো সুবিধা হলো না। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছ থেকে একইভাবে দাবি করা হতে লাগলো। বড়ো ব্যাংক মালিক এবং ক্ষুদ্র দোকানদার সকলকেই সমর তহবিলে চাঁদা দিতে নির্দেশ জারী করা হলো। শুধু মাত্র দরিদ্র জনসাধারণকেই এ সময় কর থেকে রেহাই দেয়া হলো। কিন্তু ব্যাংক মালিকেরা সরকারের আসন্ন পতন লক্ষ্য করে চুপ করে রইলো। পরোয়ানা এলেও দরবারে হাজির হলো না। অন্যেরা নিজেদের ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখলো। আবার অতি অল্পসংখ্যক লোক সাহস সঞ্চয় করে চাঁদা দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। সম্রাটের বৃহত্তর স্বার্থের দিকে নজর না দিয়ে সরকারি কর্মচারিরা নিজেদের ব্যক্তিগত লাভ-লোভের জন্য উৎকোচ গ্রহণ করতে লাগলো। এতে করে অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে উঠলো। পাতৌদির মুহম্মদ আকবর আলী খান নামে এক ব্যক্তি সম্রাটের কাছে অভিযোগ পেশ করেছেন যে, লখনৌর সেপাইদের রিসালদার আকবর আলী খান নামে এক ব্যক্তি তার কাছে থেকে অনেক চাঁদা নেওয়ার পরেও তাঁর সম্পত্তি লুঠ করেছে। দুর্ভাগ্যবশতঃ চাঁদা এবং ঋণ গ্রহণের ভার নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত ছিলো না। সেনাবাহিনী, শাহজাদাবৃন্দ, প্রধান সেনাপতি বখৃত খান, বিদ্রোহী দরবার সকলেই অর্থ সংগ্রহ করছিলেন আলাদা আলাদাভাবে। একজনের কাছ থেকে দুতিনবার চাঁদা দাবি করা হলো। যে সমস্ত লোক ইংরেজদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন বলে সন্দেহ করা হলো। তাদের আলাদা করে মোটা টাকা দাবি করা হলো। এ ব্যাপারে জীবনলাল একা ছিলেন না। আগস্ট মাসে তাঁকে পঁচিশ হাজার টাকা দিতে বলা হলো। মীর্জা ইলাহী বখশ তার পক্ষ সমর্থন করে অনুরোধ করলে জীবনলালকে কিছু দিনের জন্য রেহাই দেয়া হয়। কিন্তু পরে জীবনলালকে আটক এবং তার বাড়ি লুঠ করা হয়। মুফতি সদর উদ্দীন নামে আরেক ব্যক্তিকে সন্দেহ করা হলো। সেপাইরা তাঁর কাছ থেকে দু’লাখ টাকা দাবি করলো। টাকার দাম ভয়ংকরভাবে কমে গিয়েছিলো। নতুন এক টাকার পরিবর্তে পুরোনো এক আনার চেয়ে বেশি দাবি করা হলে শাস্তি দেবার জন্যে কোতোয়ালকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। গুজব উঠলো যে সলিমগড় দুর্গের মধ্যে গুপ্তধন রক্ষিত আছে। সেপাইদের অনেক গুপ্তধনের সন্ধানে ছুটলো। সে যাকগে, ৩১শে আগস্ট ঘোষণা করা হলো চাঁদা এবং ঋণ আদায় করার একমাত্র ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ হলো দরবার।
ইতিমধ্যে বারুদ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র ফুরিয়ে এসেছে। খোলাবাজারে সালফার পাওয়া গেলো না। দেবী দাস নামে এক ব্যক্তির দোকান অবরোধ করে প্রচুর সালফার পাওয়া গেলো। ইংরেজদের জিনিসপত্র সরবরাহ করছে, এ সন্দেহে অনেককে গ্রেপ্তার করা হলো। চাঁদনী চক থানার দারোগা সৈয়দ নাজির আলীর কয়েকখানা চিঠি থেকে আমরা জানতে পারি যে ঐ অঞ্চলে কোনো কসাই পাওয়া যাচ্ছে না, পাটের বস্তা অদৃশ্য হয়েছে, আগের বাকি শোধ না করায় রুটিওয়ালারা রুটি সরবরাহ করতে রাজী হচ্ছিলো না। তিনি একবারের বেশি কুলি এবং দুলিবাহক পাঠিয়েছেন, কিন্তু কোনো মুচি কিংবা কোনো ঘোড়া বা উট যোগাড় করতে পারেননি। চাঁদনী চকে ময়লা জমে স্থূপাকার হয়ে রয়েছে। কোনো মেথর কিংবা ঝাড়ুদার তা পরিষ্কার করছে না। অফিসারদের কাঠ সরবরাহ করা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক সেপাইয়ের অতীব প্রয়োজনীয় তাম্রপাত্র কিংবা হুঁকা দেয়া হয়নি। নাজির আলী আরো অভিযোগ করেছেন, তিনি যে মহিষের গাড়ি যোগাড় করেছিলেন, সেপাইরা তা ছেড়ে দিয়েছে। সেনাপতির পক্ষে যা না হলে চলে না, সে কুলি এবং কারিগরদের অত্যন্ত অভাব ছিলো। সেপাইদের ওপর নাগরিকদের কোনো শ্রদ্ধা ছিলো না, দোকানদারদের তারা নাজেহাল করতো এবং ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের টাকাকড়ি লুট করে নিতো। প্রধান সেনাপতি নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে বিশেষ ফলোদয় হয়নি। একজন অশ্বারোহী কর্তৃক এক মেয়েকে ধর্ষণই হলো সবচেয়ে মারাত্মক। এমনকি সেনাবাহিনীর ঘোড়ার ঘাস কাটিয়েরাও নিজেদের পদ্ধতিতে সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছিলো। ইংরেজদের মতে, দলে দলে সেপাইরা চলে যাচ্ছিলো, তা সত্য হতে পারে, নাও হতে পারে।
নতুন সৈন্য এবং অস্ত্রশস্ত্র এসে পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারেরা মনে-প্রাণে আক্রমণের পরিকল্পনা করতে লাগলেন। একটা পরিখা খনন করা হলো এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের একেবারে দক্ষিণ দিক ঘেঁষে কামানের ব্যাটারী পাতা হলো। সেপাইদের আকস্মিক আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করার জন্যে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো। জুনের প্রথম থেকে যখন অল্পসংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য টিলা অধিকার করেছিলো, তখন থেকে চূড়ান্তভাবে নগর আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা পর্যন্ত হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদে ব্রিটিশ সৈন্যের দক্ষিণ বাহুর সৈনিকদের কঠোর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হয়েছে। যদি বিদ্রোহীরা এখান থেকে ব্রিটিশ সৈন্য সরাতে পারতো, তাহলে অন্যান্য স্থান থেকে তাদের তাড়িয়ে দিতে বিশেষ বেগ পেতে হতো না। সুতরাং সেপাইরা মনে করলো, ডান দিক থেকেই নগর আক্রমণ করা হবে। পরিখা খননের জন্যে পুরষ্কার ঘোষণা করা হলো। এ যুদ্ধে যারা মারা যাবে বিদ্রোহী দরবার তাদের পরিবার পরিজনদের ভরণপোষণের প্রতিশ্রুতি দান করলো। কিন্তু ইংরেজরা বাম দিকের অরক্ষিত কাশ্মীরি ফটক, লাভলো ক্যাসল এবং জলের ট্যাঙ্ক থেকেই আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। টেইলর একাই লাভলো ক্যাসলে প্রবেশ করে আক্রমণের সব বিধি-ব্যবস্থা সেরে নিরাপদে ফিরে এলেন। লাভলো ক্যাসেল দখল করার পর ইংরেজরা সেখানে প্রহরার স্থান বাছাই করে দিলেন। নগর প্রাকারের বাইরের এ পুরানো আট্টালিকাগুলো শক্রর জন্যে এতো সুবিধাজনক হবে, আগেভাগে চিন্তা করে তা ভেঙ্গে ফেলার ইচ্ছা সেপাইদের মনে একবারও উদিত হয়নি। লাভলো ক্যাসলের সামনে তিনটা ব্যাটারী, জলের ট্যাঙ্কের কাছে একটা এবং কাঁদেসিয়া বাগে একটা ব্যাটারী তাড়াতাড়ি স্থাপন করলো।
