নিকলসনের সৈন্য যেদিন পৌঁছলো, সেদিন কিছুসংখ্যক সেপাইকে মার্চ করে বেরিয়ে আসতে দেখা গেলো। অবশেষে সেপাইরা অনুভব করেছে যে তাদের আক্রমণ করার প্রাথমিক পর্যায়ে বার্নাডের সময়ে হাজার চেষ্টা করেও দূর এলাকার সেনাবাহিনীর যোগাযোগ-ব্যবস্থা রক্ষা করতে পারেনি। সেপাইরা পুরোপুরি সাফল্যের সঙ্গেই ইংরেজ সৈন্যের পাঞ্জাব থেকে রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে পেরেছিলো। ঝিন্দের সৈন্যরা নৌকার সেতু রক্ষা করতে পারেনি। দিল্লীর সেপাইরা তা মিসমার করে দিয়েছিলো। এ ব্যাপারে পাতিয়ালার সৈন্যরাও কোনো সাফল্যের পরিচয় দিতে পারেনি। কিন্তু বর্তমানে অবস্থান সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। নতুন সংগৃহীত দু’শ সৈন্যসহ হডসনকে সৈন্যদের ওপর দৃষ্টি রাখতে নির্দেশ দেয়া হলো। কিন্তু হডসনও এ যুগের মানুষ ছিলেন না। মধ্যযুগে হয়তো তিনি সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব বলে পরিচিত হতে পারতেন। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে যারা তাঁর যোদ্ধা মনোবলের প্রশংসা করতেন, তারাও তার দম্ভকে পছন্দ করতেন না। তাঁর নিজ মাতৃভূমির সেবা করতে গিয়ে আপন স্বার্থোদ্ধারের কথাও ভুলে যাননি তিনি। তাঁর সাহসিকতা এবং অপরাজেয় শৌর্য যেমন একদিকে অনেক ভালো লোকের বন্ধুত্বলাভে সাহায্যে এসেছে তেমনি তার খেয়ালী নির্মমতার কারণেই অনেকে আবার তার ওপর বিরূপ ছিলেন।
হডসনের অনিয়মিত অশ্বারোহী বাহিনীর এখনো বিশৃঙ্খল অবস্থা। শিখ, পাঞ্জাবী, পাঠান, মুসলমান, আফ্রিদি, সীমান্তের অন্যান্য গোত্রের লোক, এমনকি হিন্দুস্থানী সেপাইরা এখনো ইংরেজের প্রতি অনুগত রয়েছে, তাদের সকলকে নিয়েই এ পাঁচমিশেলী অশ্বারোহী বাহিনী গঠন করা হয়েছে। তাদের নিয়ে হডসন প্রথমে একটি সুরক্ষিত গ্রামে আশ্রয়গ্রহণকারী কতিপয় অশ্বারোহী সেপাইকে আক্রমণ করেন। কিন্তু তারা ইংরেজদের প্রতি অনুগত ছিলেন না। বিদ্রোহের পরে ভয়ে ডিউটিতে যেতে পারেনি। প্রথম অনিয়মিত অশ্বারোহী বাহিনীর একজন স্বদেশী অফিসার হডসনকে অভ্যর্থনা জানাতে এলেন, কিন্তু তাঁকে তখনই গ্রেফতার করা হলো। এ খবর শুনে অন্যান্য অশ্বারোহী সেপাইরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। তারা ছোটো ছোটো অট্টালিকাসমূহের মধ্যে আত্মগোপন করে রইলো। সমগ্র গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হলো এবং একজন বাদে অপর সকলকে হত্যা করা হলো।
তারপরে হডসন রোহতকের দিকে যাত্রা করলেন। কাছেই একটা পুরোনো দুর্গ, যেখানে বেশকিছু সশস্ত্র অশ্বারোহী সেপাই অবস্থান করছিলেন। হডসন শহরে গেলেন। শহরের লোকেরা আপন পৌরসীমার মধ্যে শত্রুকে আক্রমণ করা অধর্মের কাজ মনে করে, তার সৈন্যদলের রসদপত্র যোগাড় করে দিলেন। হডসন তাদের নগর সীমার বাইরের যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাবার জন্য এক ফন্দী আঁটলেন। তিনি প্রত্যাবর্তনের ভান করলেন। রোহতকের অশ্বারোহীরা যখন পেছন পেছন বেরিয়ে এলো, তার সেনাদল তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের পরাজিত করে। চারদিনের মধ্যে দু দু’বার বিজয় অর্জন করে তিনি দিল্লীতে প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি যেভাবে বিদ্রোহীদের দমন করেছেন, সেজন্য শতমুখে তার প্রশংসা করতে লাগলো সকলে।
ব্রিটিশরা দেখলো যে নগরের অভ্যন্তরে তাদের গোপন বন্ধু থাকলেও আপন সেনাবাহিনীর মধ্যেও বহু গুপ্ত শত্রু রয়েছে। হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদের কাছে একটি ষড়যন্ত্র ধরা পড়লো। দু’টি কামানের বারুদের মধ্যে নুড়িপাথর দিয়ে অকেজো করে দেয়ার চেষ্টা করা হলো। এ খবর কাউকে জানানো হয়নি। খালাসীদের মধ্যে কয়েকজন কামান দাগতে না পারার জন্য অথবা দাগলেও গোলা যাতে আশানুরূপ দূরে গিয়ে না পৌঁছে সেজন্য বারুদের সঙ্গে নুড়ি পাথর মিশিয়ে দিয়েছে। তাদের দু’জনকে ফাঁসিতে লটকানো হলো। জেনারেল উইলসন সবসময় ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর লোকদের সন্দেহ করতেন এবং তাদের অনেকেই ছিলো পুরবীয়া। ভাগ্যের এমন পরিহাস, তিনি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সৈন্যদের বাদও দিতে পারেন না, আবার তাদের বিশ্বাসও করতে পারেন না। কীথ ইয়ং-এর মতে, এ পর্যন্ত গুর্খা এবং পাঞ্জাবীদের সন্দেহ করার মতো কিছু ঘটেনি। কিন্তু শিখদের কথা বলা যায় না। তারা যেমন নগরের ভেতরে আছে, তেমনি বাইরেও আছে।
সেপাইরা এখন মর্মে মর্মে আসন্ন ভয়ঙ্কর বিপদের কথা উপলব্ধি করছে। তারা জানতে পারলো যে অবরোধ করবার জন্য সেনাবাহিনী পথ দিয়েছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অবরোধ ব্যর্থ করে দেবার জন্য তারা অনেক দিন থেকে চেষ্টা করে আসছে। মাঝপথে যদি আগত বাহিনীকে বাধা দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা যায়, তাহলে আরো কিছুদিনের জন্য রাজধানী রক্ষা করা সম্ভবপর হবে। সুতরাং তারা ২৪শে আগস্ট তারিখে ১৮টি কামান নিয়ে যাত্রা করলো কিন্তু তাদের অভিযানের কথা গোপন রইলো না। প্রকৃত প্রস্তাবে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ এত তৎপর ছিলো যে নগরীর অভ্যন্তরের যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ইংরেজ সদর দফতরে এসে অবশ্যই পৌঁছাতো। পরের দিন নিকলসন ২ হাজার পদাতিক এবং ১৬টি অশ্ববাহী কামানসহ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলেন। দুর্গম পথ, আবহাওয়া আর্দ্র। বালু এবং কাদার মধ্য দিয়ে ১৬টা কামান টেনে টেনে নিয়ে যাওয়া খুব সহজ কাজ ছিলো না। কিন্তু নিকলসন ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সেপাইদের তিনি কামান টেনে নেয়ার কাজে নিয়োজিত রাখলেন। নজফগড় খালের ওপারে তিনি শত্রুদের দেখা পেলেন এবং শত্রুর শিবির আক্রমণ করতে মনস্থ করলেন। কামানের গোলা বর্ষণ উপেক্ষা করে ব্রিটিশ সৈন্য সামনে এগুতে লাগলো। কামান থেকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরে ব্রিটিশ সৈন্য এসে পড়েছে। এখনো যুদ্ধ শেষ হয়নি। কিন্তু সঙ্গীন আক্রমণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেপাইরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করতে আরম্ভ করলো। আর কিছুসংখ্যক একটি গ্রামের কাছে ছাউনি পেতে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছিলো। সেদিনের জন্য যুদ্ধ বন্ধ হলো। কিন্তু রাত্রির অন্ধকারে সেপাইরা সে গ্রাম ছেড়ে পলায়ন করলো। নিকলসনের কাজ শেষ হয়েছে, তিনি আবার টিলার ওপর চলে এলেন। আশ্চর্যের বিষয়, আগত সৈন্যদলকে বাধা দেবার জন্য দিল্লী থেকে আর কোনোও প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি। ৩রা সেপ্টেম্বরে ৩০টি ভারী কামান এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্রসহ নতুন সৈন্যদল দিল্লীতে এসে ব্রিটিশ সৈন্যের সাথে যোগ দিলো। বখত খান এবং নিমক রেজিমেন্টের বিদ্রোহীদের সেনাপতি গওস খানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতোখানি দায়ী, তা আমরা জানি না। প্রকাশ্যে বখ্ত খান অভিযোগ করেছেন যে তার নির্দেশ প্রতিপালিত হয়নি এবং পরে তিনি প্রধান সেনাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন।
