এবং প্রকাশ্যেই অভিযোগ করলেন, পাঁচ’শ বছর ধরে যে সাম্রাজ্য চলে আসছে, তারা সে সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছে। হেকিম আহসান উল্লাহকে কয়েদ করা হলে তিনি আত্মহত্যার ভয় দেখালেন। সামরিক অত্যাচার থেকে নগরের লোকদের রক্ষা করতে না পারার জন্য তিনি প্রকাশ্যে দুঃখ করতেন। অনেক সময় তিনি কাবের কথা উল্লেখ করতেন এবং প্রাসাদ ও পদবী চিরতরে ছেড়ে দিয়ে মক্কা শরীফ গিয়ে অবস্থান করার কথাও উল্লেখ করতেন। শাহজাদারা তাকে মানতেন না। সেপাইরা তাকে অপমান করতো। মাঝে মাঝে তিনি কবিতা রচনা করে শান্তি খুঁজে পেতে চেষ্টা করতেন।
একবার তিনি লিখলেন–
‘কাফন বস্ত্রে শরীর ঢেকে
শেষ দিনগুলো আমি কোনো বাগানে একাকীই কাটিয়ে দেবো।’
কিন্তু ভাগ্য তার জন্য কি রেখেছে তা জানতেন না। মহিষী এবং শাহজাদারা আশা করছেন যে তাদের আগের অবস্থায় ফিরে গিয়ে নিরাপদে জীবনযাপন করার এখনো সুযোগ আছে।
পত্রালাপ এবং প্রস্তাব বিনিময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যাপার। সমস্ত ব্রিটিশ সৈন্যের বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার আরো কারণ ছিলো। ব্যবসায়ীরা এখন আবিষ্কার করলো যে টিলা হচ্ছে ব্যবসায়ের জন্য একটি খাসা জায়গা। সেপাইরা যে সকল জিনিসপত্রের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন থেকে অনুভব করে আসছিলো, ব্যবসায়ীরা সে সকল জিনিসপত্র নিয়ে দোকান খুলে বসলো। ১৮ তারিখে কীথ ইয়ং তাঁর স্ত্রীর কাছে লিখেছেন, “তোমাকে আমি বলেছি কি পিক এণ্ড এ্যালেন এখানে অনেক প্রতিনিধি পাঠিয়ে অনেকগুলো দোকান খুলে দিয়েছেন। শিবিরে দু’জন পার্সি ব্যবসায়ীও আছেন। জাহাঙ্গীর এবং কাওয়াসজী নামে এ দু’জন ব্যবসায়ীর বিক্রয়ের প্রচুর জিনিসপত্র মজুত রয়েছে। বিশেষ করে, বীয়ার, ব্রাণ্ডি এবং সোডা ওয়াটার। প্রথমে প্রতি ডজন বীয়ারের বোতলের জন্য ২৩ টাকা দাবি করছিলো, কিন্তু পরে তাঁরা সেরা ইংলিশ পানীয় ৫ টাকা ডজনে বিক্রয় করতে রাজী হয়েছে। সদর দফতরের মেস একশো ডজন ঐ দামে খরিদ করেছে।” লাভের আশায় পার্সিরা দোকান পেতেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের আগমনের ফলে ইংরেজরা নিশ্চিত হলো যে রাস্তাঘাটে এখন সেপাইদের উপদ্রব নেই।
বিদ্রোহী সেপাইরা আকাঙ্খিত বিশ্বাসঘাতকতার কথা কিছুই জানে না, তাই এখনো সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আশা পোষণ করে। আগস্ট মাসেও টিলার ওপরে শিবিরের ইংরেজদের কোনো অসুবিধা পোহাতে হলো না। বরং তার নতুন আশা এবং উদ্দীপনায় অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেছে। ৭ তারিখে জন নিকলসন তাঁর বাহিনীর আগে অশ্বারোহণে শিবিরে এসে পৌঁছেছেন। মানসিক দিক দিয়ে নিকলসন ছিলেন বীরত্বের গৌরব-গাঁথার যুগের মানুষ। দুর্দান্তভাবে সাহসী এবং যমের মতো নির্মম। একখানা মাত্র তলোয়ার হাতে তিনি সবচেয়ে হিংস্র বাঘের মুখোমুখী দাঁড়াতে পারতেন। তিনি ক্লান্তি কাকে বলে জানতেন না। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে সুদীর্ঘ পথ অশ্বারোহণেও তিনি এতোটুকু শ্রান্ত হয়ে পড়েননি। নানা অসুবিধার মধ্যেও যুদ্ধ করবার জন্য তিনি প্রস্তুত। বিদ্রোহীদের প্রতি তার মনে কোনো দয়া কিংবা অনুকম্পার স্থান ছিলো না। আনন্দিত মনে সেপাইদের হত্যা, তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালাননা এবং স্ত্রী ও শিশুকে নির্মূল করার অনুমতি দিতে পারতেন তিনি। তাঁর সমসাময়িক অন্যান্যদের মতো তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান খ্রীস্টান। সীমান্তে তাঁকে সবাই যেভাবে ভয় করে এবং তিনি যে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন, তাতে করে দেবতা হয়ে উঠেছেন। ভারত এবং ভারতের অধিবাসীদেরকে তিনি পছন্দ করতেন না। চেম্বারলেনের স্থলাভিষিক্ত হতে যখন তাঁকে আহ্বান করা হলো তাঁর বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ। যদিও তখন তিনি সেনাবাহিনীর মাত্র একজন ক্যাপ্টেন, তাঁকে ব্রিগেডিয়ারের পদ প্রদান করা হলো। তিনি পিলাউয়ের সেপাইদের নিরস্ত্র করে এবং শিয়ালকোট থেকে বিদ্রোহী সেপাইদের তাড়িয়ে দিয়ে নিজেকে সে পদের যোগ্য বলে প্রমাণিত করেছিলেন। তিনি তাঁর সেনাবাহিনীর পূর্বেই আমবালা থেকে যাত্রা করেছিলেন দিল্লীতে জেনারেল উইলসনের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য। ১৪ তারিখে ২ হাজার ৪’শ জন পদাতিক সৈন্য, ৬টা কামান এবং কিছু সংখ্যক অশ্বারোহী সৈন্য দিল্লীতে এসে পৌঁছালো।
নিকলসনের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই একটি প্রধান আক্রমণ করার কথা আবার জীবন্ত হয়ে উঠে। নিকলসন ছিলেন গরম মানুষ, তখন আক্রমণ করতেই তিনি প্রস্তুত ছিলেন। অস্ত্রশস্ত্রের সম্পূর্ণ উপস্থিতি, কামানের ব্যাটারী পোঁতা এবং শত্রুদের অবস্থান সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান অর্জন, ইত্যাদি ছাড়া অন্য কোনো অজুহাতে অপেক্ষা করার মানুষ তিনি ছিলেন না। কিন্তু উইলসন তখনও মনস্থির করে উঠতে পারেননি। তখন একমাত্র তিনিই ভালোভাবে জানতেন যে একবার ব্যর্থ হলে তার সেনাবাহিনীর নয়, সমগ্র ভারত সাম্রাজ্যে তাঁদের প্রভুত্বের অবসান ঘটবে। এতোদিন পর্যন্ত পাঞ্জাব শান্ত ছিলো, কিন্তু সেখানেও এখন বিদ্রোহের দোলা লাগতে শুরু করেছে। প্রত্যেক গ্রামে ব্রিটিশ-বিরোধী প্ল্যাকার্ড পোঁতা হয়েছে। বোম্বাইয়ে প্রচণ্ড তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। এই বুঝি ভারতবর্ষ ইংরেজদের হাত থেকে সরে পড়লো। উইলসনের প্রকৃতিতে বীরত্ব ছিলো না। তাই স্বভাবতঃই ভাগ্যকে নিয়ে জুয়া খেলতে তিনি রাজী ছিলেন না। বিজয় লাভ সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হলেই তিনি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নগরের ভেতর থেকে সংবাদ পেয়েছেন, বিদ্রোহী সেপাইদের সংখ্যা ব্রিটিশ সৈন্যদের চাইতে চল্লিশগুণ বেশি। চরম সঙ্কটের দিনে শত্রুরা যদি সম্মুখভাগে আক্রমণ করতো তাহলে প্রকৃত প্রস্তাবে উইলসনকে শত্রুদের হাতে শিবির ছেড়ে দিয়ে পলায়ন করতে হতো। কেননা ব্রিটিশ সৈন্য সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, সে সময়ে সেপাইরা একটু বুদ্ধি করে আক্রমণ করলে সহজেই ব্রিটিশ বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে দিতে পারতো।
