প্রথম থেকেই হেকিম আহসান উল্লাহর কোনো সহানুভূতি ছিলো না সেপাইদের প্রতি এবং সেপাইরাও এ কথা জানতো। কিভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে কেউ জানে না। হতে পারে একটা দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা, অথবা ইংরেজদের কোনো লোক ইচ্ছাকৃতভাবে এ নাশকতামূলক কাজ করেছে। কিন্তু হেকিমের অস্ত্রাগার পরিদর্শন করার পরেই বিস্ফোরণ ঘটে। ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে তাকে সন্দেহ করা হলো। হেকিমের বাড়ি আক্রমণ করে যখন তালাস করা হলো, সন্ধিসূচক একখানি চিঠিও পাওয়া গেলো। কুপার বলেন, “হেকিমকে সন্ধিপ্রার্থী হিসেবে প্রমাণ করাবার জন্যই রজব আলী চক্রান্ত করে পত্রখানা তার বাড়িতে রেখেছিলো।” হেকিমকে যে তারপরে কয়েদ করা হবে সে তো একদম জানা কথাই। অবশ্য জীবনলাল বলেছেন সম্রাট বিশ্বস্ত বন্ধুকে প্রাসাদের কোনো গোপন কক্ষে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সম্রাটকে আবার হেকিমকে সেপাইদের হাতে সমর্পণ করতে হলো। হেকিমের পরিবার-পরিজনেরা আগে থাকতেই পলায়ন করেছিলো।
সম্রাটের এ রকম বিশ্বস্ত পরামর্শদাতার বিশ্বাসহানির ফলে সেপাইদের নৈতিক বল হ্রাস পেয়েছিলো এবং দরবারের প্রতি শ্রদ্ধাও তারা হারিয়ে ফেললো। সেপাইরা জানতো যে এ ব্যাপারে সম্রাট ও হেকিমের মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। তিনি জুন মাসের পয়লা থেকেই ইংরেজদের সঙ্গে পত্রালাপ শুরু করেছেন। কিন্তু সম্রাট একাকীই তার সৈন্যদলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং ধর্মহানির অভিযোগে অভিযুক্ত হলেন। সেপাইদের বিদ্রোহ তার বহুদিনের লালিত পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দিয়েছে। তিনি তাঁর পুত্র জওয়ান বখৃতকে সিংহাসনে বসাবার চেষ্টা করে আসছেন। দু’জন প্রতিদ্বন্দির স্বাভাবিক অথবা অস্বাভাবিক মৃত্যু তার সংকল্পের পথ অনেকটা পরিষ্কার করে দিয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে রাজী করাতে পারলেই জওয়ান বখৃতকে সিংহাসনে বসিয়ে সম্রাট উপাধিতে ভূষিত করা অসম্ভব হবে না। বিদ্রোহের কারণে মীর্জা মোগল এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ শাহজাদারাই পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছেন। ইংরেজরা পরাজিত হলে সেনাবাহিনী সম্রাট হিসাবে মীর্জা মোগলকেই পছন্দ করবে, জওয়ান বখৃতকে নয়। মীর্জা ইলাহী বক্স ইংরেজের স্বপক্ষে প্রাণপণে কাজ করছিলেন। হতে পারে হেকিম আহসান উল্লাহ্ এ সময় তাঁকে সহায়তা করে থাকবেন। এ যোগাযোগের ব্যাপারে মৌলবি রজব আলীর সক্রিয় ভূমিকাই সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য। পরিকল্পনা ছিলো অতি সরল। ইংরেজরা সম্রাটকে আগের মতো বৃত্তি দিতে এবং প্রাসাদে অবস্থান করতে দিতে রাজী হয়েছেন। বিনিময়ে সম্রাটের লোকেরা নৌকার সেতু উড়িয়ে দেবে, যাতে করে অশ্বারোহী বাহিনীকে পরাজিত করা যায়, তারপর পদাতিক বাহিনীকে পরাজিত করে ইংরেজরা নগরীতে প্রবেশ করবে। বর্তমানে ব্রিটিশের সামরিক অবস্থা অনেক সুবিধাজনক এবং তারা দুর্বল মুহূর্তে এ সকল যোগাযোগ করছিলো। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বিজয়লাভ সম্বন্ধে নিশ্চিত হলে সে সকল প্রস্তাব কানেও নিলো না।
ঠিক কখন সম্রাট এবং ইংরেজদের মধ্যে আবার নতুন করে যোগাযোগ শুরু হলো সে সম্বন্ধে নিশ্চিত করে বলা যায় না। ৬ই আগস্ট তারিখের একখানা পত্রে গ্রীথিড স্যার উইলিয়াম মুইরকে জানাচ্ছে, মেটকাফ ডাকযোগে সম্রাটের একখানা চিঠি পেয়েছেন এবং তাতে সম্রাট তাঁর শারীরিক কুশল জানতে চেয়েছেন। এতে কোনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ২০শে আগস্ট গভর্ণর জেনারেলের কাছে সম্রাটের প্রস্তাব এসেছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লো। এডমনস্টোন কলভিনকে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে এ তথ্য ওয়াকেবহাল করেছিলেন। সম্রাট দিল্লীর সেনাবাহিনীর প্রধানের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন যে দিল্লী এবং মীরাটে বিদ্রোহের আগে সম্রাট যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন, তা মেনে নিলে হয়তো নতুন করে আপোষ করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু গভর্ণর জেনারেল মনে করেন সম্রাটকে আগের সুযোগ-সুবিধা দান করার ব্যাপারে বর্তমানে এ সরকার কিছুতেই সমর্থন প্রদান করতে পারে না। ২৭শে আগস্ট মুইর হ্যাভলকের কাছে লিখেছেন, মিঃ গ্রীথিডের কাছ থেকে দু’খানা কি তিনখানা চিঠি পেয়েছেন। তাঁরা সাহায্য করার প্রস্তাব করেছেন, কিন্তু তাঁদের কোনো জবাব দেয়া হয়নি। গ্রীথিডের কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে শাহজাদারা ব্রিগেডিয়ার উইলজনের সাথে পত্রালাপ শুরু করলেন। সে সম্বন্ধে পরে মুইর হ্যাভলককে বলেছেন, “কয়েকজন সম্রাট পুত্র সহায়তা করার যে প্রস্তাব করেছেন মিঃ গ্রীথিড তা সরাসরি বাতিল করে দিয়েছেন। অন্যভাবে সম্রাট পুত্রেরা আবার জেনারেল উইলসনের কাছেও একই প্রস্তাব করেছেন। সেতু ধ্বংস করে অশ্বারোহী বাহিনীর সাহায্যে পদাতিক বাহিনীকে পরাজিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, কিন্তু তার বিনিময়ে সম্রাট পরিবারের পূর্ব সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। জেনারেল উইলসন প্রাসাদের সঙ্গে কোনো রকম পত্রালাপ করতে সরাসরিই অস্বীকার করলেন। সুতরাং অনুমান করতে কষ্ট হয় না, বিশ্বাসী অনুচরগণের মাধ্যমেই কথাবার্তা হতো। চিঠি লেখার পথ তাঁরা এড়িয়ে চলতেন। ২১শে আগস্ট সম্রাটের প্রধানা মহিষী বেগম জিনাতমহলের পক্ষ থেকে একজন দূতকে পাঠানো হলো। তিনি প্রস্তাব করেছেন সম্রাটের সঙ্গে ইংরেজদের আপোষ মীমাংসার জন্য তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব কাজে খাটাতে পারেন। গ্রীথিড বলেছেন, “আমরা ব্যক্তিগতভাবে তার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করলাম, কারণ মহিলা এবং শিশুদের সঙ্গে আমাদের কোনো বিবাদ নেই। কিন্তু জানিয়ে দিলাম সম্রাট প্রাসাদের কারো সঙ্গে আমরা কোন যোগাযোগ রাখতে ইচ্ছুক নই। মহিষীকে সন্দেহ করা হলো, তার ষড়যন্ত্রের সবটা জানতে পারলে তাকে ছেড়ে দেবে না। সেপাইদের প্রতি সম্রাটের কোনো ভালো মনোভাব যে ছিলো না, সে তো এক রকম জানা কথাই। ব্রিটিশ সৈন্যদের বারবার চেষ্টা করেও টিলাশ্রেণী থেকে তাড়িয়ে দিতে না পারায় তাদের পারঙ্গমতার প্রতি সম্রাটের কোনো বিশ্বাসই রইলো
