এখনো চাঁদা দাবি করা হয়নি। কিন্তু সেপাইরা আইন হাতে তুলে নিয়েছে। তাদের হাতে নাগরিকদের ভোগান্তির অন্ত নেই। আবার যারা ইংরেজের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ হতো, তাদেরকে কড়া নজরে রাখাও তাদের কর্তব্য ছিলো। ৭ই জুলাই তারিখে কর্ণেল বেচার কীথ ইয়ং-এর কাছে বল্লভগড়ের রাজা নাহার সিংহের একখানি চিঠি দিলেন। এ পর্যন্ত রাজা রসদপত্র এবং লোকজন দিয়ে দিল্লীর সম্রাটের সহায়তা করে আসছেন। এখন তিনি ইংরেজদেরকেই সাহায্য করবেন বলে নিশ্চয়তা দান করেছেন এবং শিবিরে আসতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। একই অফিসার মাসের শেষ তারিখে ঝুঝঝুরের নওয়াবেরও একখানা পত্র এনে হাজির করলেন। একইভাবে নওয়াবও ইংরেজ শিবিরে এসে সালাম জানাবার বাসনা প্রকাশ করেছেন। প্রধান সেনাপতি বখৃত খান সম্রাটের কাছে অভিযোগ করলেন যে কতেক দুষ্ট লোক রটাচ্ছে। তিনি ইংরেজদের সঙ্গে গোপন চুক্তি করেছেন। রাও তুলারাম দু’দিকেই হাত রেখেছেন। সম্রাটকে নজর এবং মৌখিক সমর্থন জানাচ্ছেন, আবার অন্যদিকে ইংরেজদের সর্বপ্রকারে সাহায্য করছেন। যে সকল সামন্ত সম্রাটকে সমর্থন জানিয়েছিলেন প্রকাশ্যে, তারাই আবার সেপাইদের কোনো উল্লেখ্য পরাজয় বরণ করার আগে, গোপনে ইংরেজদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। এ সামন্তদের বিশ্বাসঘাতকতা বেশির ভাগই অনুদঘাটিত ছিলো।
কোরবানীর ঈদ এগিয়ে আসছে। হডসন একরকম নিশ্চিত আশা করতে লাগলেন যে জামে মসজিদে গরু কোরবানী নিয়ে ধর্মান্ধ মুসলমান এবং হিন্দুদের মধ্যে একটা বিরোধ বাধবে। তাঁর চরেরা খবর দিয়েছে বিরোধ আরম্ভ হয়ে গেছে। গোড়া মুসলমানেরা তাদের ধর্মীয় অনুশাসন পালন করা থেকে বিরত থাকবে না। তাতে করে হিন্দু মুসলমানে যে একটা প্রচণ্ড বিবাদ বাধবে সে সম্বন্ধে ইংরেজরা এক রকম নিশ্চিত ছিলো। দিল্লীর অধিক সংখ্যক মোগল নিজেদেরকে জেহাদী বা ধর্মযোদ্ধা বলে ঘোষণা করলো। টঙ্ক থেকে আগত সেপাইদের সমবায়ে সৈনিক সংখ্যা অনেকগুণে বেড়ে গেলো। জেহাদীরা সামরিক শিক্ষাপ্রাপ্ত সৈনিক ছিলো না। তারা মৃত্যুকে ভয় করতে না বটে, কিন্তু উন্নত ধরনের কোনো যুদ্ধের কৌশলও তাদের জানা ছিলো না। মাথার উপর দিয়ে তলোয়ার ঘোরানো ছাড়া আর কোনো কৌশল তারা জানতো না। তাদের মধ্যে একজন মহিলাও ছিলেন, যিনি কামান দেগে দু’জন ইংরেজ সৈন্যকে ধরাশায়ী করেছেন। বিরোধী সৈন্যের গুলির আঘাতে আহত হওয়ার পর তিনি বন্দিনী হন। এই জেহাদী সেপাইয়েরা সম্রাট এবং তাঁর মন্ত্রীদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের যুদ্ধ না করতেও বলা যায় না, আবার তারা ধর্মযুদ্ধ বা জেহাদ ঘোষণা করেছে তাও উৎসাহিত করা যায় না। লখনৌতে ওয়ালী নিজে জেহাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, কিন্তু দিল্লীতে তা হতে পারে না, কারণ সেপাইদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা প্রচুর এবং প্রভাবশালী মুসলমানেরা হিন্দুদের আলাদা করে রাখতে রাজী ছিলেন না। একই কারণে বেরিলীতে খান বাহাদুর খান গরু জবাই নিষিদ্ধ করেছেন যাতে করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে হিন্দুরাও সহযোগিতা করতে পারে। একথা রক্ষা করার জন্য সম্রাট কি উপায় অবলম্বন করেন সে বিষয়ে সকলে অবাক হয়ে ভাবছিলেন। এটা জানা কথা যে এ সকল বিষয়ে কোনো বিকল্প সিদ্ধান্ত জনসাধারণের সমর্থন লাভ করতে পারে না। হেকিম আহসান উল্লাহ দীর্ঘদিনের প্রথা বন্ধ করতে ভয় পাচ্ছিলেন এবং মৌলভীদের তিনি সবচেয়ে বেশি ভয় করেছিলেন। কিন্তু সম্রাট অপূর্ব সাহসের পরিচয় দিলেন। প্রধান সেনাপতি এবং অপরাপর সামরিক কর্মচারিদের তিনি জানিয়ে দিলেন, ঈদপর্বে নগরের মধ্যে কোনো গরু জবাই হতে পারবে না। যদি কেউ গরু কোরবানী করে তাহলে তাকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেয়া হবে এবং কোনো মুসলমান তিনি যেই হোন না কেন গরু জবাই করতে সাহায্য করলে, তাকেও হত্যা করা হবে। ঈদগার ময়দানে একটা ভেড়া কোরবানী করে সম্রাট নিজেই প্রজাদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। সুতরাং আগস্ট মাসের পহেলা তারিখে কোরবানীর ঈদের দিনে কোনো সাম্প্রদায়িক বিবাদ বাধলো না।
সকালে নামাজ পড়া হলো। দ্বিপ্রহর থেকে যুদ্ধ শুরু হলো। সারারাত যুদ্ধ চললো এবং পরের দিন দুপুরেই বন্ধ হলো। কামান থেকে অবিরাম গোলাবর্ষণ অগ্রাহ্য করে সেপাইরা ব্রিটিশ সৈন্যের রক্ষণভাগে বারবার প্রচণ্ডভাবে হামলা চালাতে থাকে। কিন্তু গুলীর আঘাতের জন্য বারবার তাদের ফিরে আসতে হচ্ছিলো। সেপাইদের সাহসের প্রশংসা করতে হয়, কিন্তু তার পেছনে বিজ্ঞানের শক্তি না থাকায় কিছুই করতে পারলো না। টিলার ওপর ছাউনি পাতা সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীর কাছেও তারা ঘেঁষতে পারলো না। তারা দু’মাস ধরে শত্রুদের অসুবিধাজনক স্থান থেকে বিতাড়িত করার জন্য চেষ্টা করে আসছে। সবসময় ডান দিকেই আক্রমণ করেছে। সম্মুখ ভাগে এবং মাঝে মাঝে দু’য়েকবার হামলা মাত্র করা করেছে। সামনে, পিছে, ডান, বাম চারদিক থেকে ঘিরে কখনো শত্রুর ওপর আক্রমণ করেনি। নতুন কোনো সেপাইদল দিল্লীতে এসে পৌঁছালেই তাদের ব্যর্থতা এবং বুদ্ধিহীনতার পরিচয় দেয়ার জন্য টিলার ওপর আক্রমণ চালাতো। আক্রমণ পরিচালনা করার জন্য কোনো সুচিন্তিত পরিকল্পনা ছিলো না এবং অভিযান সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য কোনো সামরিক প্রতিভার সত্যিই অভাব ছিলো। সংখ্যার দিক দিয়ে বেশি হওয়া অনেক সময় শক্তিবৃদ্ধির কারণ না হয়ে অসুবিধার কারণ হয়েই দাঁড়ায়। শিক্ষিত সৈন্যদের সঙ্গে উচ্ছল সৈন্যদের মেশামেশি ঘটলে সাফল্যের বদলে ব্যর্থতাকে বরণ করতে হয়। বারবার পরাজয়ের ফলে তাদের সাহস কমে গেছে এবং সেপাইরা উচ্চতর মহলের বিশ্বাসঘাতকতা আবিষ্কার করার কাজে নিজেদের নিয়োগ করেছে। আগস্ট মাসের ৭ তারিখে অস্ত্রাগার বিস্ফোরণ হওয়ার পর তারা হেকিম আহসান উল্লাহ্কে বিশ্বাসঘাতক বলে সন্দেহ করতে লাগলো।
