শিবিরের মালপত্রবাহক নিরীহ লোকেরা ইংরেজ সৈন্যদের রোষানল থেকে রক্ষা পায়নি। তারা ভালোভাবে তাদের প্রভুদের সেবা করতো। অনেক সময় মনিবদের খাবার খাওয়াতে গিয়ে তাদের জীবন-মরণের ঝুঁকি গ্রহণ করতে হতো। তারা অবিস্ফোরিত গোলাগুলি সংগ্রহ করে শুণ্য ভাণ্ডার পূরণ করতো। ব্রিটিশ সৈন্য তাদের ছাড়া এক কদমও চলতে পারতো না।
১৪ তারিখে আরেকটা খণ্ডযুদ্ধ হয়ে গেলো। সেপাইরা হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদ এবং সবজীমণ্ডির ঘাঁটি আক্রমণ করলো। নগরের প্রাচীর থেকে সারাদিন প্রবলভাবে গোলাবৃষ্টি করলো। সন্ধ্যার সময় ব্রিগেডিয়ার চেম্বারলেন কিছু সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তাদের তাড়িয়ে দিতে গেলে তিনি ঘাড়ে চোট পেয়ে আহত হয়ে পড়েন। দিল্লীর পতন পর্যন্ত তিনি কোনো আক্রমণ কিংবা প্রতি-আক্রমণে অংশ নিতে পারেননি।
অতি অল্প সময়ের মধ্যে পরপর তিনজন সেনাপতি হারানো-যে কোনো ভারতীয় সেনাবাহিনী সহজে তার ক্ষতিপূরণ করতে পারতো না। কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্যরা আঘাত সামলে উঠলো না শুধু, বিপদের সময়ে বলতে গেলে প্রায় বিশৃঙ্খল সেনাবাহিনীতে শৃখলাও ফিরিয়ে আনলো। বর্তমান প্রধান সেনাপতি আর্কডেল উইলসন শিবিরের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ অফিসার ছিলেন না। ১০ তারিখে রাতে মীরাটের বিদ্রোহের সময়েও তিনি কোনো সাহস কিংবা বীরত্বের পরিচয় দিতে পারেননি। কিন্তু তিনি ছিলেন ধীরস্থির প্রকৃতির মানুষ। গাজীউদ্দিন নগর এবং হিন্দালে সেপাইদের পরাজিত করে তিনি ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীতে সুনাম অর্জন করেন। ক্ষমতা বুঝে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেনাশিবিরের দৈনন্দিন কর্মপদ্ধতির প্রতি তিনি মনোযোগী হয়ে উঠলেন। কীথ ইয়ং ২২শে জুলাই তারিখে লিখেছেন, “ব্রিগেডিয়ার উইলসন প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, এখন শিবিরের দৈনন্দিন কাজ আগের তুলনায় দ্রুতগতিতে এবং মসৃণভাবে চলছে। তিনি খুবই দ্র, ধীরস্থির। সব কিছু নিজেই দেখাশোনা করেন এবং তাঁর নির্দেশ পরিষ্কার সুস্পস্ট। আমরা সকলে নিশ্চিন্ত অনুভব করছি যা আমার পূর্ববর্তী সেনাপতির কাছ থেকে পাইনি। তিনি অতি সাবধানী, কিন্তু তাও আবার দক্ষিণপন্থী প্রমাদ। তাঁর সাহসের অভাব সে সময়ে কোনো ক্ষতির কারণ হয়নি, কারণ বিদ্রোহীদের রাজধানী আক্রমণ করার কোনো সম্ভাবনা ছিলো না। হার্ভে গ্রীথিড বিলম্বের জন্য তো খুশি হয়েছেনই, বরঞ্চ প্রাথমিক আক্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করলে আরো বুদ্ধিমানের কাজ করা হতো বলে মনে করেন। ২৯ শে জুলাই তারিখে তিনি লিখেছেন, স্রোতের গতি এখন ফিরতে শুরু করেছে। জোয়ারের ঢেউ আমাদের প্রতিরক্ষার শিলাদৃঢ় প্রাচীরে দুর্বলভাবে আঘাত করেছে। সমস্ত অসুবিধা অপসারিত করার জন্য এ সেনাবহিনী যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা আমি মনে করিনে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেবে। সেনাবাহিনী হয়তো আরো সাহসিকতা এবং বীরত্বের পরিচয় দিতে পারতো, কিন্তু সামান্য রকম ভুলচুকের জন্য মারাত্মক ফলও করতে পারতো। এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দেরী করলে সাম্রাজ্যের কোনো ক্ষতি হবে না। যে সময়ে প্রচণ্ড হত্যাকাণ্ড চলেছিলো, লুটপাট হয়েছিলো এবং দিল্লী দখল করে নিয়েছিলো, আমি মনে করি সে সকল দিনের উল্লেখ করে লাভ নেই, কারণ আমরা আসার আগেও সেপাইরা দিল্লী অধিকার করে নিয়েছিলো। পূর্বদিক থেকে দুঃসংবাদ আসছে। কানপুরে হুইলারের পরিণতির কথাও তাদের অজানা নয়। তবে আমার কথা, নগরের অভ্যন্তরের অবস্থাও ভালো নয়। খবর আসছে, সেপাইরা মাইনে তলব করছে, না পেয়ে চলে যাচ্ছে দলে দলে, অপমানিত লাঞ্ছিত ব্যাংক মালিক, দোকানদারেরা অধীর আগ্রহে ইংরেজদের প্রত্যাগমনের প্রতীক্ষা করছে। সেপাইদের নেতৃবৃন্দ এবং সম্রাটের পরামর্শদাতাদের মধ্যে মতান্তর চলছে। অস্ত্রশস্ত্রে ঘাটতি এবং সর্বোপরি ঈদের কোরবানী নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিবাদের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
কিন্তু সংবাদ সবগুলো সত্য নয়। বেনিয়ারা যদিও ব্রিটিশ শিবিরে বন্দুকের ঝাঁকুনি দেয়ার ক্যাপ বিক্রয় করছে তথাপি নগরের অভ্যন্তরে গোলাগুলির কোনো অভাব দেখা দেয়নি। বারুদের অভাব পড়েছে এ কথা সত্যি। ১৮ই জুলাই তারিখে অস্ত্রাগারের দারোগা রজব আলী জানাচ্ছেন যে বারুদের অভাব পড়েছে। ২৪শে মে জুলাই তারিখে মুহম্মদ বখত খানও সম্রাটের কাছে একই ধরনের তথ্য পেশ করেছেন। নগরের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত পরিমাণে সালফার পাওয়া যায় না এবং সেপাইরা যে বারুদ তৈরি করে, তা মানের দিক দিয়ে ব্রিটিশদের তৈরি বারুদের মতো উৎকৃষ্ট নয়। জুলাই মাসের প্রথম দিকে সম্রাট প্রধান সেনাপতিকে কোষাগারিক এবং বণিকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাজকোষে আর কোনো টাকা ছিলো না। ঋণ এবং চাদা তুলে আশু প্রয়োজন মেটাবার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিলো। সত্যি সত্যি সম্রাট বৃন্দাবন নামক এক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা ধার করেছিলেন। রেওয়ারীর রাও তুলারামকে তার এলাকার রাজস্ব আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং অন্যান্য এলাকার রাজস্ব আদায়কারীদের প্রতিও একই নির্দেশ জারী করা হয়েছিলো। জুলাই মাসে সম্রাটের খুব বেশি টাকা প্রয়োজন পড়েছিলো বলে মনে হয় না, কারণ তিনি চাঁদার উপর জোর না দিয়ে ঋণ চেয়েছিলেন। রামজী মল নামে একজন ব্যাংক মালিকের কাছে তিনি লিখেছিলেন, আমি আপনার কাছে কর হিসেবে টাকা চাইনি, ঋণ দিতে বলেছিলাম। দেখুন আমার বন্ধু জ্যোতিপ্রসাদ ইংরেজদেরকে ৩০ হাজার টাকা অগ্রিম ধার দিয়েছেন, কি অজুহাতে আপনি টাকা দিতে আমাকে অস্বীকার করেন?
