নগরবাসীরা বিদ্রোহীদের হাতে যেমন, তেমনি যে সকল শাহজাদা সেপাইদের নেতৃত্ব দিতেন, তাদের হাতেও তেমনি একইভাবে লাঞ্চিত হতেন। প্রামাঞ্চলের অবস্থাও ভালো নয়। সে কথা আমরা ১৮৫৬ সালের ২৯শে জুন তারিখে লিখিত সৈয়দ আবদুল্লাহর একখানি অভিযোগপত্র থেকে জানতে পারি, তিনি লিখেছেন, গোটা শস্য বছরের হৈমন্তিক ফসল ধ্বংস হয়ে গেছে। তদুপরি কৃষির প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি যেমন লাঙ্গল এবং কুয়ো থেকে জল উঠাবার কাঠের সরঞ্জাম সব সৈন্যরা লুঠ করে নিয়েছে। লুঠতরাজ করে গুর্জরেরা দেশের লোকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে।
শান্তির সময়ে যুদ্ধের সময়ের মতো রাস্তায় বের হতে মানুষ নিরাপত্তাবোধ করতো না। দেশের জনগণ সরকার এবং সরকারি আমলা উভয়ের দ্বারাই লাঞ্ছিত হতে লাগলো। সেপাই নেতৃবৃন্দের এ সকল কাজের সমর্থনে বলা যায় তাদের ইংরেজদের দালালদের বিরুদ্ধে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য এ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছিলো। কিন্তু নগর প্রাচীরের অভ্যন্তরে ইংরেজ সমর্থকদের সংখ্যা কম ছিলো। কেউ সন্দেহের উর্ধ্বে ছিলো না। সম্রাটের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং মন্ত্রী হেকিম আহসান উল্লাহ্ খানকে সন্দেহ করা হলো, তাঁকে প্রাসাদের অভ্যন্তরের একটি কক্ষে আটক রাখা হলো। সম্মানী এবং বিত্তবান অনেক ভদ্রলোককে অকারণে সন্দেহ করে হয়রানি করতে লাগলো। পাতিয়ালার মহারাজা হচ্ছেন ইংরেজদের মিত্র, তাঁর সেনাবাহিনী ইংরেজদের যোগাযোগ পথে পাহারা দিচ্ছে। সে সময়ে অজিত সিং নামে পাতিয়ালার মহারাজের এক বৈমাত্রেয় ভাই দিল্লীতে অবস্থান করছিলেন। ১০ই জুন তারিখে কতিপয় সেপাই তাঁকে সম্রাটের কাছে বন্দী করে নিয়ে আসে। আহসান উল্লাহ খান যখন সম্রাটকে বোঝালেন অজিত সিং আর তার ভাইয়ের মধ্যে সদ্ভাব নেই, তখন তাঁকে মুক্তি দিলেন। কুলী খান নামে একজন গোলন্দাজ সৈন্য সম্রাটের পক্ষের বিশিষ্ট লোক বলে পরিচিতি লাভ করেছিলেন, কিন্তু ২৩শে জুন তারিখে সারাদিন যুদ্ধ করে ফেরার সময় তার গোলার আঘাতে তিনজন সেপাই আহত হলো। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ইংরেজের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছে বলে ঘোষণা করে গ্রেফতার করা হলো। ইংরেজদের যদি একবারও পরাজিত করতে পারতো তাহলে পরিস্থিতি একটু সন্তোষজনক রূপ পরিগ্রহ করতো। ভীতি এবং সন্দেহের কারণেই সবদিকে বিশ্বাসঘাতকতা আবিষ্কার করছিলো। সেপাইরা নিরাপত্তাবোধ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলতে লাগলো।
যদিও ব্রিটিশ সৈন্যদের নৈতিকতা অপেক্ষাকৃত উন্নত, তবুও সেখানকার পরিস্থিতিও ভুল বোঝাবুঝি থেকে মুক্ত নয়। ভারী কামান চালাবার মাল-মশলা সুপ্রচুর নয়। শক্রর অবিস্ফোরিত কামানের গোলাগুলি সংগ্রহ করে আবার শত্রুর প্রতি ছোঁড়া হতো। রটনের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি অল্পসংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য এবং সেপাইদের সংখ্যার স্ফীতির ফলে প্রথম তিন সপ্তাহে যুদ্ধের ভাবী ফলাফল সম্পর্কে কোনো অনুমান করা সম্ভবপর হয়নি। যখন তারা শুনলো স্যার হাফ হুইলার একদল শক্তিশালী সৈন্যসহ পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছেন, তখন তাদের মনে সাহস সঞ্চার হলো। আবার নানা গুজবও কানে আসতে লাগলো। ভারতীয় সেপাইদের আনুগত্যের ওপর কিছুতেই আস্থা রাখতে পারছিলো না। অথচ তারাই জীবন এবং শরীরকে তাদের বিজয়ের খাতিরে নিয়োগ করেছে। শত্রুদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন সংবাদ থেকে নিশ্চিত ধরে নিলো যে তাদের শিবিরের মধ্যেও বিশ্বাসঘাতক রয়েছে। তিনজন পুরবীয়াকে ফাঁসিকাষ্ঠে লটকাতে হলো এবং গোটা কোম্পানী ভেঙে দিতে হলো। গোটা মাস ধরে বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে সেপাইদের বিদ্রোহের সংবাদ আসতে থাকলো। তদুপরি, প্রধান সেনাপতির নেতৃত্বের ওপর তাদের কোনো ভরসা ছিলো না। কীথ ইয়ং প্রধান সেনাপতি সম্বন্ধে লিখেছেন, “যদিও জেনারেল বার্নাড চমৎকার মানুষ, দয়ালু এবং অত্যন্ত সাহসী তবু এ বুড়ো বয়সে তিনি সেনাপতির চাইতে রোমের পোপ হওয়ারই অধিক যোগ্য। আমার মতে, জেনারেল রীডও এমন কিছু ভালো না, তবে তিনি বিজ্ঞোচিত পদ্ধতিতে কোনো সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেন । জেনারেল বার্নাড কড়াকড়িভাবে দায়িত্ব পালন করতেন এবং একটুকুও চ্যুতি প্রদর্শন করেনি। ভারতের জল-হাওয়ার সঙ্গে অপরিচিত বুড়ো মানুষটি সর্বক্ষণই শিবিরে কাটাতেন, রাতে একবারও ঘুমোতেন না। অবশেষে অতিরিক্ত শারীরিক চাপ এবং মানসিক দুর্ভাবনায় ৫ই জুলাই তারিখে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। দিল্লীর দরবারে খবর গেলো ইংরেজ সেনাপতি আত্মহত্যা করেছেন।”
জেনারেল রীড স্যার হেনরী বানাডের স্থলে দিল্লী সৈন্যদের অধিনায়ককের পদ অধিকার করলেন। তিনি ছিলেন বলতে গেলে এক রকম অকর্মণ্য। যুদ্ধ করার চাইতে বিছানায় শুয়ে থাকারই অধিক উপযুক্ত। আরো কিছুদিন না গেলে আক্রমণ করে নগর অধিকার করার কোনো কথাই উঠতে পারে না। তাছাড়াও সৈন্যরা রসদের অভাবে কষ্ট পেতে লাগলো। ৮ই জুলাই তারিখে লবণাক্ত প্রতি পাউণ্ড শূয়রের মাংসের দাম আট টাকা এবং অতি প্রয়োজনীয় মোমবাতি প্রতি পাউণ্ডের দাম ছিলো তিন টাকা। অবশ্য অন্যান্য জিনিষপত্রের দাম তুলনামূলকভাবে সস্তাই ছিলো। ৯ তারিখে একদল বিদ্রোহী অশ্বারোহী সৈন্য সাহস করে একটি কামান পাহারা অতিক্রম করে আক্রমণকারীদের পর্যদস্ত করে সেপাইদের কামান ঘাঁটিতে চলে গেলো। সবজীমণ্ডিতে দু’দলের মধ্যে প্রবল সংঘর্ষ বাঁধে। উভয় দলের ক্ষয়ক্ষতি বিস্তর হয়েছিলো। ব্রিটিশ পক্ষে নিহত এবং আহতদের সংখ্যা ছিল ২২৩ আর সেপাইদের ১৫০০। এই যুদ্ধেই লেফটেনান্ট হিলস্ এবং মেজর টমস্ ভিক্টোরিয়া ক্রস লাভ করেছিলেন।
