২৪ তারিখে নেভিলি চেম্বারলেন ব্রিটিশ শিবিরে এলেন। প্রথমে তাকে পাঞ্জাবের ভ্রাম্যমাণ বাহিনীর অধিনায়কের পদে নিয়োগ করা হয়েছিলো। কর্ণেল চেষ্টারের মৃত্যুর পর এ্যাডজুট্যান্ট জেনারেলের পদ এতোদিন খালি পড়েছিলো। তাঁকে সে পদে বৃত করে পাঠানো হয়েছে। তার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে টিলা-শ্রেণীর উপরের সেনাবাহিনীর মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার হলো। একটি প্রধান আক্রমণ পরিচালনা করে দিল্লী ছিনিয়ে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে উঠলো। উইলবার ফোর্স গ্রীথিড় এখনো তার পরিকল্পনার কাজে রূপদানের জন্য পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সেই দিনই তাঁর আপন ভাই হার্ভে তার স্ত্রীর কাছে লিখেছিলেন, নেভিলী চেম্বারলেন এসে পড়েছেন, তার ফলে আমরা সকলে আনন্দিত। এবারে জেনারেল উইলবির দুঃসাহসী পরিকল্পনা কাজে রূপায়িত হতে পারে। জেনারেল বানার্ড সব সময়ে এ সম্বন্ধে আশাবাদী, কিন্তু তিনি আরো সমর্থন চাইতেন। জেনারেল চেম্বারলেনের সঙ্গে লেফটেনান্ট আলেকজান্ডার টেইলার নামে একজন তরুণ ইঞ্জিনীয়ার এসেছেন। কর্ণেল বেয়ার্ড স্মীথের সঙ্গে তাঁকেই সেপ্টেম্বরের চূড়ান্ত আক্রমণ পরিচালনার পরিকল্পনা সংশোধনের ভার দেয়া হয়েছে। কর্ণেল বেয়ার্ড স্মীথকেও রুঢ়কি থেকে ডেকে আনা হয়েছে। মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করে ২৯শে জুন তিনি দিল্লীর উদ্দেশ্যে পথ দিলেন। পাঞ্জাব থেকে সৈন্য এসে ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। বর্তমানে ইংরেজ দলের সৈন্য সংখ্যা ছ’শ থেকে ছ’হাজারে উন্নীত হয়েছে। পরিস্থিতি সুবিধাজনক, পরিকল্পনা প্রস্তুত, শিবিরে এখন সাহসী সেনাপতির অভাব নেই। হডসন এখন গোয়েন্দা বিভাগের কর্তা। এক চোখ কাণা সৈয়দ রজব আলী শুধু গুপ্তচর বৃত্তিই করছে না শত্রুদের মধ্যে বিভেদের বীজও রোপণ করে চলেছে। বানার্ড জানতে পেলেন বিদ্রোহীরা তাঁদেরও নির্দিষ্ট তারিখ ৩রা জুলাইয়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের আক্রমণ করা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ইংরেজদের পরিকল্পনার প্রধান সাফল্য নির্ভর করছে, নিরস্ত্র এবং অপ্রস্তুত অবস্থায় শক্রদের আক্রমণ করার ওপর। সেভাবে যদি আক্রমণ না করা যায় তাহলে এক থাবায় নগর ছিনিয়ে নেয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা নেই। তিনি কোনো ব্যর্থতার ঝুঁকি বহন করতে রাজী ছিলেন না।
দিল্লীর বিদ্রোহী সেপাইরাও আঁটঘাট বেঁধে তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ের ১ এবং ২ তারিখে বেরিলীর সেপাইরা এসে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। ২ তারিখে অধিনায়ক বখৃত খান স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সম্রাটকে সহায়তা করার প্রস্তাব দান করলেন। তিনি হচ্ছেন চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গোলন্দাজ বাহিনীর একজন সুবাদার। তিনি প্রথম আফগান যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ১৮৫৭ সালে আর তার শরীরে যৌবনের সে অমিততেজ ছিলো না। এখন ঘোড়ার পিঠে চড়তে রীতিমতো কষ্ট হয়। জীবনলালের মতো তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশের মানুষ। দিল্লীর সম্রাট এবং তাঁর বংশ একই। কিন্তু জীবনলাল তাকে অন্যত্র অযোধ্যার নওয়াব পরিবারের আত্মীয় বলে বর্ণনা করেছেন। সম্রাটের সঙ্গে বখত খানের গোপন আলোচনার পর মীর্জা মোগলকে সরিয়ে তাকে প্রধান সেনাপতির পদ দেয়া হলো এবং একই দিনে মীর্জা মোগলকে সেনাবাহিনীর এ্যাডজুট্যান্ট জেনারেলের পদে রত করা হলো। সবদিক দিয়ে বিচার করলে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, প্রধান সেনাপতি হওয়ার যোগ্য কোনো গুণ বখ্ত খানের ছিলো না। তিনি তার অধীনস্থ সেনাবাহিনীকে ছ’মাসের মাইনে আগাম পরিশোধ করেছেন। টাকার জন্য সম্রাটকে চাপ দেবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বখ্ত খান বেরিলী থেকে প্রচুর টাকা-পয়সা নিয়ে এসেছিলেন এবং তাকে প্রধান সেনাপতি পদে নিয়োগ করার কারণে সম্রাট কিছুকাল টাকা-পয়সার ভাবনা থেকে নিশ্চিন্ত হতে পারলেন।
অন্যদিকে আবার সম্রাটের উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। শান্তিপ্রিয় মানুষ তিনি, সামরিক প্রবৃত্তিকে শাসনে রাখবার মতো ক্ষমতা তার নেই। সেজন্যই তিনি নগরে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বখৃত খানকে নির্দেশ দান করেছেন। ২৩শে জুনের পরাজয় স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়ীশ্রেণীর মধ্যে আতঙ্কের সঞ্চার করে। সতর্কতা স্বরূপ তারা দোকানপাট বন্ধ করলো এবং ব্যবসাপত্র গুটিয়ে ফেললো। এ অবস্থা কিছুতেই চলতে দেয়া যায় না। তাই ম্রাট জোর করে দোকান-পাট খুলবার নির্দেশ দিলেন। এ নির্দেশ দিয়ে তিনি ভেবেছিলেন, সেপাইরা নগরীর মানুষদের শান্তিতে থাকতে দেবে এবং তাদের যা প্রয়োজন আইনসঙ্গত উপায়ে খরিদ করবে। কিন্তু সেপাইদের তখন শৃঙ্খলা মেনে চলার মতো অবস্থা নয়। ১৪ তারিখে তারা যমুনা দাসের দোকান লুট করলো, কারণ সে নির্ধারিত দামের চাইতে আটার বেশি দাম চেয়েছিলো। ২০ তারিখে সেপাইরা বিল্লী মহল্লাতে লুটতরাজ এবং বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। তাদের হাতে পাহারাগঞ্জ এলাকার অধিবাসীরাও নিষ্ঠুরভাবে লাঞ্ছিত হলো। দু’জন নাগরিক সম্রাটের কাছে এ-মর্মে নালিশ করেছে যে সেপাইরা দাম না দিয়ে জোর করে দোকানের জিনিসপত্র নিয়ে গেছে এবং দরিদ্র মহল্লাবাসীদের ঘরে ঢুকে তাদের বালিশ, বিছানা, ঘটিবাটি সবকিছু জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। বাহাদুর শাহের আর যাই দোষ থাকুক, তিনি সভাবে অমাত্যদের দ্বারা কাজ করাতে চেয়েছিলেন। অশক্ত, বৃদ্ধ এবং দুর্বল হলেও তিনি কখনো কর্তব্য কর্মে ফাঁকি দেননি। পৌনপুনিক নালিশে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ২৭শে জুন তারিখে মীর্জা মোগল এবং মীর্জা খায়ের সুলতানের কাছে লিখলেন। সেপাইরা আসার এবং শহরে ডেরা পাতার একটি দিনও অতীত হয়নি, ইতিমধ্যে পদাতিক সেপাইদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দরখাস্তের স্তূপ জমে গেছে। সম্রাটকে আইন শৃঙখলার রক্ষা করার জন্য যে রাজকুমারদের ওপর সব সময় নির্ভর করতে হতো, তারাও অনেক সময় অন্যের সম্পদ হরণ করার ব্যাপারে সক্রিয় সহযোগিতা করার লোভ সামলাতে পারতেন না। যুগল কিশোর এবং শিও প্রসাদের তারিখবিহীন একটি অভিযোগপত্র থেকে আমরা জানতে পারি, রাষ্ট্রের কর্মচারি এবং শাহজাদারাই তাদের নানাভাবে হয়রানি করে। এতেই লাঞ্ছনার শেষ নয়। সরকারি সেপাই এসে তাদের ঘরবাড়ি লুট করে এবং বেঁধে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখায়। ৪ঠা জুলাই বখত খানের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণের দুদিন পরে আহসান-উল হক নামে এক ব্যক্তি, সম্রাটের নাতি আবু বাকারের বেআইনী কার্যকলাপের কথা উল্লেখ করে সম্রাটের দরবারে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তারপরের দিন সম্রাট প্রথম বাহাদুর শাহের দৌহিত্রী ঈমানী বেগমের মতো একজন মহিলা সম্রাটের কাছে অভিযোগ করে বলেছেন, আগের রাত মীর্জা আবু বাকার সুরামত্ত অবস্থায় কয়েকজন সওয়ারসহ তাঁকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য আসেন এবং রাইফেল আর পিস্তলের আওয়াজ করেন ও মহল্লার কিছু লোককে প্রহার করেন। আবু বাকারকে ধরতে গেলে তিনি তরবারির সাহায়্যে কোতোয়ালকে আহত করেন। তাকে আটক করেন। আরো নানাভাবে অসম্মান করার পর শেষমেষ তাঁর বাড়ি লুঠ করে। খবর শোনার পর সম্রাট ভীষণভাবে কুপিত হয়ে উঠলেন। তার সামরিক পদ কেড়ে নিলেন এবং গ্রেপ্তার করতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু শাহজাদার পক্ষে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া বেশি কিছু অসম্ভব ছিলো না। সম্রাট শাহজাদাদের সম্মান কেড়ে নিলেন এবং প্রতি মহল্লার প্রধান পাহারাদারদের নির্দেশ দিলেন, শাহজাদারাও যদি আইন ভঙ্গ করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে, তাহলে তাঁদের সঙ্গেও অন্যান্য দুষ্কৃতিকারীর মতো আচরণ করতে হবে। সম্রাটের অসন্তুষ্টি যে এ সকল অকর্মণ্য যুবকদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পেরেছিলো তার কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি।
