তিন তিনটি পরাজয়ের পর সেপাইরা যে দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করতে পারবে না, এ আশা পোষণ করেছিলো ইংরেজরা। তড়িৎগতিতে মোগল রাজধানী দখল করা এবং মোগল সম্রাটকে পরাজিত করতে পারলে যে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে, তার তুলনা হয় না কোননা। স্যার জন লরেন্স এ ব্যাপারে সেনাপতিকে দুঃসাহস দেখাতে সর্বপ্রকারে প্ররোচিত করতে লাগলেন। রবার্ট ক্লাইভ এবং প্রাথমিক ব্রিটিশ বীরদের নাম প্রবল আশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারিত হতে লাগলো। কলকাতায়ও সকলে বিশ্বাস করতে লাগলো যে দিল্লীর ফটক ভাঙতে পারলেই নগরী অধিকার করা সম্ভব। একবার দিল্লী অধিকৃত হয়ে গেলে অন্যান্য স্থানের বিদ্রোহ সমূলে ধ্বংস করা সম্ভবপর। টিলা-শ্রেণীর ওপরের সেনা শিবিরে জুনিয়র অফিসারেরা এ সকল বিশ্বাসে আস্থাবান হয়ে উঠেন। কিন্তু তাদের সাহস এবং বীরত্বের কোনো পরীক্ষা এখনো হয়নি। ইঞ্জিনীয়ারদের মধ্যে উইলবার ফোর্স গ্রীথিড একটি আক্রমণের পরিকল্পনা খাড়া করলেন, অনেক ভাবনা-চিন্তার পর জেনারেল বার্নাড সে পরিকল্পনা অনুমোদন করলেন। বার্নাডের ভারত সম্বন্ধে কোনো অভিজ্ঞতা ছিলো না। সে জন্য তাঁকে বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যেই কাল কাটাতে হচ্ছে। এ রকম অবস্থায় যে সামরিক দিকের চাইতে রাজনৈতিক দিকে অধিকতররা গুরুত্বদান করতে হয়, সে সম্বন্ধে তিনি সজাগ ছিলেন। গ্রীথিডের পরিকল্পনা ছিলো রাতের অন্ধকারে নগরের দু’টি প্রধান ফটক উড়িয়ে দেয়া এবং দিবাভাগে শহরের অভ্যন্তরে সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান আক্রমণ পরিচালনা করা। সম্পূর্ণ গোপনীয়তার ওপরেই এ পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করছিলো। রাতে দু’টি বাহিনীর প্রস্তুতিপর্ব যখন সমাপ্তপ্রায়, সেদিনের ফিল্ড অফিসার ব্রিগেডিয়ার গ্রেভস্ শুধুমাত্র মৌখিক আদেশে অভিযান চালাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। অশ্বারোহণে তিনি জেনারেল বার্নাডের তাবুতে গেলেন। জেনারেল বার্নাড এ আক্রমণের সাফল্য সম্বন্ধে নিশ্চয়তা দাবি করলেন। নগর না হয় নেয়া হলো, পরিশেষে কিভাবে তা রক্ষা করা হবে, সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। শিবিরের সকলের চেয়ে গ্রেভস্ দিল্লী সম্বন্ধে অনেক বেশি ওয়াকেবহাল। সুতরাং তার মতামত হাল্কাভাবে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু কোনো রকমে পরিকল্পনার কথা একবার প্রকাশ হয়ে গেলে তার সাফল্যের আশা তিরোহিত হবে। কিন্তু সকলে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন যে ইতিমধ্যে আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। সুতরাং পরিকল্পনা বাদ দিতে হলো। তার ফলে ভয়ঙ্কর অসন্তোষের সঞ্চার হলো। কেউ পরিকল্পনার সামান্য সমালোচনাও করলো না। পরে অবশ্য সকলেই বুঝেছিলেন, বিজ্ঞোচিত কাজই করেছেন বার্নাড। সে সঙ্কটকালের ব্যর্থতা বড়ো মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারতো। রটন মনে করেন অল্পসংখ্যক সৈন্য এবং অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দিল্লী আক্রমণ করা বোকামীরই পরিচয় হতো। তিনি বলেন, নগরের অভ্যন্তরের শত্রুরা যদি এশীয় না হয়ে ইউরোপীয় হতো তাহলে কোনো জেনারেলই সে সময়ে তাদেরকে আক্রমণ করতে সাহস করতো না।
টিলাতে শিবির স্থাপন করে তিন দিনের ভেতর ব্রিটিশ সৈন্যরা যেমন একটি প্রধান আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিলো, অন্যদিকে সেপাইরাও বসে ছিলো না। চালনা করার মতো সামরিক প্রতিভা না থাকলেও তাদের সাহস এবং উদ্দীপনার অভাব ছিলো না। ৯ই জুন, বাদল-কি সরাইয়ের যুদ্ধের পরের দিন তারা হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদে আক্রমণ চালায়, ব্রিটিশের সৌভাগ্যই বলতে হবে, যেদিনই ৫৮০ মাইল অবিরাম মার্চ করে বিখ্যাত ডেলীজ গাইড বাহিনী পেশোয়ারের নিকটস্থ মর্দান থেকে এসে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। পরের দিন সেপাইরা ব্রিটিশ সৈন্যের সম্মুখভাগে আক্রমণ চালালো। কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্য মেটকাফ হাউজ দখল করে তাদের বামদিকের রক্ষণভাগকে নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত করলো। তারপরে উভয় দলের গোলন্দাজদের মধ্যে একদিন গুলি বিনিময় চলে। ১৫ তারিখে সেপাইরা মেটকাফ হাউজ অধিকার করার জন্য আবার আক্রমণ চালায়। কিন্তু তাদের আক্রমণ ব্যর্থ করে দেয়া হলো। দুদিন পর তার আরো বেপরোয়াভাবে আক্রমণ চালাতে শুরু করে। তারা হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদের নিকটবর্তী ঈদগাঁর প্রাকার ঘেরা ময়দানে একটা ব্যাটারী স্থাপন করতে চেষ্টা করে। বিচক্ষণ বার্নাড বুঝতে পারলেন, ব্যাটারী স্থাপনে সেপাইরা সক্ষম হলে পরে তাদের ডানদিকের রক্ষণভাগের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে দাঁড়াবে। যে কোনো উপায়ে বাধা দিতে সংকল্প গ্রহণ করলেন। ইংরেজদের সৌভাগ্য সেপাইদের কোনো উপযুক্ত সেনাপতি ছিলো না। ঈদগাঁতে ব্যাটারী স্থাপন করতে পারলেও কিভাবে কামান দাগাতে হয়, সে সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান ছিলো না।
১৯ তারিখে ব্রিটিশ সৈন্যদের রক্ষণভাগ ভয়ঙ্করভাবে ভীত হয়ে পড়লো। টমের গোলন্দাজ বাহিনীর পরাজয় এক সময় প্রায় অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। ব্রিগেডিয়ার হোপ গ্র্যান্ট আহত হয়ে পড়লেন। একজন নিঃস্বার্থ মুসলিম ঘোড়সওয়ার তার প্রাণরক্ষা করতে অত্যন্ত সাহসের পরিচয় দিয়েছে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে অমীমাংসিতভাবেই সেদিনকার সংগ্রাম শেষ হলো। তারপরে শত্রুরা কোনদিকে আক্রমণ করবে সে সম্বন্ধে সেপাইরা কোনো স্থির ধারণা পোষণ করতে পারছিলো না। ব্রিটিশ সৈন্য যদি অনড়ভাবে টিলা-শ্রেণীতে অবস্থান করতো, তাহলে তাদের পাঞ্জাবের যোগাযোগ সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। সকালবেলা ব্রিটিশ সৈন্য যুদ্ধ করতে এসে দেখে, রাতের অন্ধকারে সেপাইরা সকলেই চলে গেছে। টিলার ওপরের অনেক ইংরেজ অকপটভাবে বিশ্বাস করলেন যে সৃষ্টিকর্তা তাদের পক্ষে। তিনিই রাতের বেলা সেপাইদের নিয়ে গিয়েছেন। ক্লাইভের পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের একশ বছর অতীত হয়ে গেছে। সকলে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতো-এক’শ বছর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানীর রাজত্বের অবসান হবে। সব সময় তারা বেপরোয়া সগ্রাম করলো এবং বিশ্বাস করতে থাকলো ভাগ্য তাদের স্বপক্ষে। মেজর রীড, যার অবস্থান ছিলো হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদের নিকটে, ভীষণ বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন কোনো সেনাবাহিনী এর চাইতে কঠোরভাবে সংগ্রাম করতে পারে না। তারা রাইফেল বাহিনী, গাইড বাহিনী, এমনকি আমার পরিচালনাধীন সৈন্যদের উপর আক্রমণের পর আক্রমণ চালাচ্ছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো, এই বুঝি হেরে গেলাম। নগরের কামানের অগ্নিবৃষ্টি, এবং যে সকল ভারী কামান বের করে নিয়ে এসেছিলো সেগুলোর ভয়ঙ্কর গোলা বর্ষণের সামনে আমি বারবার অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু বিজ্ঞান শেষ পর্যন্ত সংখ্যার ওপর জয়লাভ করলো। মগজের শক্তি পেশীর শক্তির চাইতে অধিক প্রমাণিত হলো। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সেপাই-এই দুই প্রবল বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে লড়তে হচ্ছিলো।
