সে সময়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের মনোবলও ভেঙ্গে গিয়েছিলো। শুখাদের নাসিরি রেজিমেন্টকে সিমলার নিকটস্থ জুতোঘে স্থাপন করা হয়েছিলো। অন্যান্য পার্বত্য বাহিনীর মতো তাদেরকেও আমবালা যেতে নির্দেশ দেয়া হলে তারা অবিলম্বে পথ দিতো। কিন্তু তাদের বাকী মাইনে পরিশোধ করা হয়নি। তাদের অবর্তমানে স্ত্রী পুত্রদের খাওয়া-পরার জন্য কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়নি। স্ত্রী-পুত্রদের ভরণ পোষণের কোনো সন্তোষজনক ব্যবস্থা না করে অতোদূরে যাওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলো না। তারা অসন্তুষ্ট হলো, দু’পক্ষে কড়া বাক্য বিনিময় হলো। এমনকি তাদের আচরণে অনানুগত্যও প্রকট হয়ে উঠলো। গ্রীষ্মবাসের ইউরোপীয়েরা শুনতে পেলো গুর্খারা বিদ্রোহ করেছে এবং সিমলার দিকে এগিয়ে আসছে। খবর শুনেই হৈ চৈ পড়ে গেলো। এ গোলমালের মধ্যেও লর্ড উইলিয়াম মে নামক একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মাথা ঠিক রেখেছিলেন। তিনি অরক্ষিত শিশু এবং নারীদের ব্যাংক প্রাঙ্গণে এনে জমায়েত হতে বললেন, যাতে করে বিপদের সময়ে তাদের রক্ষা করা যায়। কিন্তু ভীত-সন্ত্রস্ত আতঙ্কিত ইউরোপীয়দের কেউই তাঁর পরামর্শে কান দিলো না। অল্প সময়ের মধ্যে বিক্ষুব্ধ নগরীর বাইরে চলে যেতে শুরু করলো, যাতে বিদ্রোহীরা তাদের নাগাল না পায়। দুর্ভাগ্যবশতঃ কিছু সামরিক অফিসারও সাহসের পরিচয় দিতে পারেননি। তাঁরা কিয়োন্থালের রাজার সিমলার প্রাসাদ নিরাপদ মনে করতে পারেননি। অধিকতররা নিরাপত্তার আশায় তারা রাজধানীর প্রাসাদের উদ্দেশ্যে ধাওয়া করলেন। মেজর জেনারেল পেনি, লেফটেনান্ট কর্ণেল কিথ, ইয়ং গ্রীথিড, কুইন কোলিয়ার চারজন ক্যাপটেন এবং তিনজন লেফটেনান্ট রাজা সংসার সেনের রাজধানীতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু গুর্খারা সিমলাতে হামলা করলো না এবং পলাতকেরা নিরাপদে ঘরে ফিরে এলেন।
পূর্বদিকে যাত্রা শুরু করার আগে হিওইটের সঙ্গে যোগাযোগ করে মীরাটের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন মনে করলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিলো, মীরাটের সৈন্যরা ভগপতে এসে তাঁর সঙ্গে যোগ দেবে এবং সম্মিলিত বাহিনী দিল্লী অভিযানে যাত্রা করবে। প্রধান সেনাপতির নির্দেশ পেয়ে কিছু সংখ্যক শিখ অশ্বারোহী সমেত লেফটেনান্ট হডসন মীরাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তৃতীয় অশ্বারোহী বাহিনীর বিশজন সেপাইসহ ক্যাপটেন স্যানফোর্ডও পথ দিলেন। অফিসার দু’জনে কেউ পথে কোনো বাধার সম্মুখীন হননি। পাতিয়ালার রাজা, ঝিন্দের রাজা, কর্ণেলের নওয়াব ইংরেজের প্রতি অনুগত থাকতে মনস্থ করলেন এবং তাদের সাধ্যমতো সর্বপ্রকারে ইংরেজদের সহায়তা করতে লাগলেন। ওদের উপর আমবালা থেকে দিল্লী যাওয়ার পথের পাহারা ভার দেয়া হলো। এভাবে নিশ্চিন্ত হয়েই ব্রিটিশ বাহিনী গৌরবময় মুসলিম রাজধানী দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলো। কিন্তু আনসন এতো সহজে দিল্লীতে পৌঁছাতে পারলেন না। গ্রীষ্মকালে উত্তর ভারতের উত্তপ্ত সমভূমির উপর দিয়ে মার্চ করতে ব্রিটিশ সৈন্যরা অভ্যস্ত ছিলো না। সুতরাং দিবাভাগের অধিকাংশ সময় বিশ্রাম করতে হতো এবং রাতে তারা পথ চলতো। শিবিরের স্বাস্থ্যরক্ষা বিধি একেবারেই সন্তোষজনক ছিলো না। কলেরা এবং সর্দিগর্মি রোগে মৃত্যু ছিলো একটি অতি সাধারণ ব্যাপার। ২৭শে মে তারিখে রুগ্ন এবং উৎকণ্ঠিত প্রধান সেনাপতি জেনারেল আনসন মারা গেলেন। তাঁর স্থলে জেনারেল স্যার হেনরী বার্নাড সেনাবাহিনীকে পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
বার্নাড ছিলেন ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সৈনিক। দিল্লীতে তিনি নতুন এসেছেন। ব্রিগেডিয়ার উইলসনের নেতৃত্বাধীন মীরাট বাহিনী পরিকল্পনা অনুসারে ভগপতে এসে তাঁর সঙ্গে যোগ দিলো। গন্তব্যে উপনীত হবার পূর্বে গাজী উদ্দীন নগর এবং হিন্দান নদীর তীরে বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাদের দু’টি সংঘর্ষ হয়। এতে ইংরেজরাই জয়লাভ করে । ৮ই জুন তারিখে দিল্লী থেকে পাঁচ মাইল দূরে বাদল-কি সরাইতে তারা বিদ্রোহী সৈন্যেদের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। সামনাসামনি যুদ্ধে বিদ্রোহীরা পরাজিত হলো এবং ২৪টি কামান তাদের হারাতে হলো। সেপাইরা অধিক সংখ্যক এবং বেশি অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সুযোগ্য সেনাপতির পরিচালনার গুণে ইংরেজেরাই জয়লাভ করলো। তাদের পক্ষে নিহতের সংখ্যা ছিলো চার এবং কয়েকজন আহত হয়েছিলো। সেনাবাহিনীর এ্যাডজুটেন্ট জেনারেল কর্ণেল চেষ্টারও ছিলেন নিহতদের মধ্যে একজন। সেদিনই বিজয়ী বাহিনী সামনে অগ্রসর হতে থাকে এবং দিল্লীর বহিঃপ্রকারের ধারের নীচু টিলা-শ্রেণী দখল করে। সেপাইদের মধ্যে সাহসের অভাব ছিলো না, কিন্তু তাদের পরিচালনা করার মতো কোনো সামরিক প্রতিভা ছিলো না। তা না হলে প্রচণ্ড সংগ্রাম ছাড়া ইংরেজেরা এসে সহজে টিলা শ্রেণী দখল করতে পারতো না। ব্রিটিশ সৈন্য ১১ই মে তারিখে দিল্লী অভিযান শুরু করে এবং ৮ই জুন এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তারা ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসতে সক্ষম হয়।
টিলা-শ্রেণী নগরের উত্তর দিকে অবস্থিত ছিলো। তিনটি প্রধান ফটক নিয়ন্ত্রিত করা যেতো এ টিলা-শ্রেণী থেকে। জেনারেল বার্নাডের সেনাবাহিনী আর কোনো আক্রমণ করেনি বললেই চলে। ১৮৫৭ সালে দিল্লী প্রাচীরের অভ্যন্তরে বিদ্রোহী কিংবা টিলার ওপরে মোতায়েন বিরোধী সেনাবাহিনী কেউ কাউকে আক্রমণ করেনি। মথুরার রাস্তা খোলা ছিলো। অযোধ্যা, রোহিলাখণ্ড, ঝাঁসী, কানপুর এবং নাসিরাবাদ থেকে দলে দলে বিদ্রোহীরা নগরের ভেতরে প্রবেশ করে সেপাইদের শক্তি বৃদ্ধি করছিলো। এতে তারা সামান্যতম বাধার সম্মুখীনও হয়নি। অন্যদিকে আমবালার সঙ্গে ব্রিটিশ সৈন্যের যোগাযোগও অব্যাহত ছিলো। সে ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার জন্যও বিদ্রোহীরা কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি। সুতরাং রসদ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র পেতে ব্রিটিশ সৈন্যদের কোনো অসুবিধা হচ্ছিলো না। টিলা-শ্রেণীর সামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করাই হলো বার্নাডের প্রথম কাজ। সোজাসুজি দক্ষিণে যেখানে নগরীর উপকণ্ঠের সবজীমণ্ডির কাছে টিলা ঢালু হয়ে নেমে এসেছে, সেখানে দণ্ডায়মান একখানা পাথরের প্রাসাদ। সে প্রাসাদ হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদ নামেই খ্যাত। দৌলতরাও সিন্ধিয়ার নিকট-আত্মীয় মৃত হিন্দু রাওয়ের বাড়িটাতে সে সময়ে কোনো ভাড়াটে ছিলো না। গুর্খা সেনাবাহিনীসহ মেজর রীড এখানেই তাঁর ঘাঁটি স্থাপন করলেন। টিলার বামে ছিলো ফ্ল্যাগস্টাফ টাওয়ার-একটি ইস্টক নির্মিত দ্বিতল গোলাকার অট্টালিকা। সামরিক পর্যবেক্ষণের উপযুক্ত জায়গা। সেখানে কিছু সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন রাখা হলো। টাওয়ার থেকে অল্প দূরেই একটা পুরানো পাঠান মজিদ এবং হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদের কাছেই ছিলো একটি মানমন্দির। এ দু’টো অট্টালিকাকেই প্রহরাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হলো। ফ্ল্যাগস্টাফ টাওয়ারের পেছনে নদীর তীরে স্যার থিয়োফিলাস মেটকাফের গ্রামনিবাস। সুরক্ষিত প্রাসাদের মধ্যে থেকে সেপাইরা ব্রিটিশ বাহিনীর বামদিকে আক্রমণ করতে পারতো। লাডলো ক্যাসেল নামে একটি গম্বুজবিশিষ্ট ইস্টক প্রাসাদ থেকে সেপাইরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মর্মকেন্দ্রে হানা দিতে পারতো। কিন্তু সেপাইরা এ সকল অবস্থানের সুযোগ খুব অল্পই গ্রহণ করেছে। হিন্দু রাওয়ের প্রাসাদে যে প্রচণ্ড আক্রমণ করা হবে সে কথা ব্রিটিশ অফিসারেরা তখনই মাত্র বুঝতে পারলো। নগর আক্রমণ করে শত্রুদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরবে কিনা পরক্ষণেই বার্নাডকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলো।
