শেষ পর্যন্ত বেসামরিক এবং সামরিক বিভাগের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সকল রকম অব্যবস্থার নিরসন করার জন্য একটি সামরিক এবং বেসামরিক কমিটি বা আদালত গঠন করা হলো। কমিটির সভ্য সংখ্যা ছিলো দশ। তার মধ্যে সেপাইরা দু’জনকে নির্বাচিত করেছিলো, পদাতিক অশ্বারোহী এবং গোলন্দাজ প্রতিটি বিভাগের দু’জন করে প্রতিনিধির সমবায়ে। বাকী চারজনের উপর অর্পণ করা হয়েছিলো বেসামরিক দায়িত্ব। সামরিক প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ছিলো সেনাবাহিনীর সবকিছু দেখাশোনা করা। কারা বেসামরিক প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করেছিলো এবং সে নির্বাচনের ভিত্তি কি ছিলো তাও জানা যায়নি। কিন্তু সামরিক প্রতিনিধিদের নির্বাচনের বেলায় অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতা বিচার করা হতো সে সঙ্গে সংখ্যাধিক্যের মতামতকেই প্রাধান্য দেয়া হতো। কমিটিকে একজন সভাপতি নির্বাচন করার অধিকার এবং নির্বাচিত সভাপতিকে আরেকটা অতিরিক্ত ভোটের অধিকার দেয়া হয়েছিলো। এই আদালত অথবা কমিটি প্রধান সেনাপতির অধীনে ছিলো। তাঁর অনুমোদন না পেলে কমিটির কোনো সিদ্ধান্তই কার্যকরী হতো না। প্রধান সেনাপতি দরবারের কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে না পারলে সে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার জন্য দরবারে ফেরত পাঠাতে পারতেন। তারপরেও যদি দরবারীরা তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকতেন, তা হলে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সম্রাটের কাছে পাঠাতে হতো। সম্রাট এবং প্রধান সেনাপতি ইচ্ছা করলেই এ কমিটির সভায় উপস্থিত থাকতে পারতেন। কাগজে কলমে এ কমিটি ছিলো গণতান্ত্রিক, কিন্তু কার্যতঃ তার কোনো প্রভাব ছিলো না বললেই চলে। কখন যে এ আদালত গঠন করা হয়েছিলো, সে সম্বন্ধে সঠিকভাবে কিছু জানার উপায় নেই। কারণ শাসনতন্ত্রে কোনো সন তারিখের উল্লেখ নেই। দিল্লীর পতনের পূর্বেও এ কমিটি সক্রিয় ছিলো। সক্রিয় থাকলে কি হবে, এ কমিটি ক্ষণস্থায়ী সরকারের সেনাবাহিনী অথবা বেসরকারি কর্মচারিবৃন্দের উপর বিশেষ প্রতিপত্তি বিস্তার করতে পারেনি। মে মাসে সম্রাট নতুন বিপদের সম্মুখীন হলেন। ২৮শে মে তারিখের একটি রিপোের্ট মতে সেপাইরা তিনদিন ধরে দিল্লীতে লুঠতরাজ করেছে। তারা বেগম জিনাতমহলকে ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে সন্দেহ করতে লাগলো। সম্রাট আশেপাশের জমিদারদেরকে সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ করতে নির্দেশ দান করলেন। টাকার অভাবে শাসনকার্য প্রায় অচল হয়ে পড়লো। শহরের কোষাগারিকদের পরোয়ানাজারী করে দুর্গে নিয়ে যাওয়া হলো এবং রাজকোষে টাকা দেয়ার জন্য নির্দেশ দান করা হলো। নবনিযুক্ত কোষাগারিক এবং কর্মচারীরা সম্রাটের চাপ সহ্য করতে না পেরে সেপাইদের বেতন মিটিয়ে দেবার জন্য কোনো মতে এক লাখ টাকা আদায় করে রাজকোষে জমা দিলো। এক লাখ টাকাতে সাক্ষাৎ প্রয়োজনের অল্পও মিটলো না। কিছুদিনের মধ্যেই সেপাইরা হায়দারাবাদের একজন সম্পদশালী ব্যক্তির বাড়ি লুঠ করলো। যে সকল কোষাগারিক এবং সম্পদশালী লোকদের সঙ্গে ইংরেজদের বন্ধুত্ব আছে, তাদের আটক করে টাকা আদায় করার কথা ঘোষণা করা হলো। মে মাসের শেষ সপ্তাহে রোহতক থেকে এক লাখ সত্তর হাজার টাকা আসার ফলে অবস্থার অল্প একটু উন্নতি হলো। কিন্তু পরিবেশ এখনো সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের বাষ্পে আচ্ছন্ন।
ইসলামগড় দুর্গের কামানগুলোকে কে বা কারা অকেজো করে দিলো। এ সম্বন্ধে গুজব ছড়িয়ে পড়লো, সম্রাটের বিশ্বস্ত মন্ত্রী এবং বন্ধু আহসান উল্লাহ্ খানের সঙ্গে এর গোপন যোগাযোগ রয়েছে। দিল্লী এবং মীরাটের বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিলো না। তার ফলে অবস্থা আরো ঘোরালো হয়ে উঠলো। মীরাটের সেপাইরা নালিশ করতে লাগলো যে দিল্লীর সেপাইরা স্থানীয় রাজকোষ লুট করে প্রচুর বিত্তের অধিকারী হয়েছে, অথচ তাদের দুঃখ-দুর্দশার সীমা নেই।
ইংরেজ সরকারের প্রস্তুতির অভাবই বিদ্রোহীরা এবং তাদের নেতৃবৃন্দকে দীর্ঘদিন নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ দান করেছিলো। ১২ই মে থেকে ৮ই জুন অর্থাৎ বাদল কি সরাইর খণ্ডযুদ্ধ এবং ঢিলা দখলের পর থেকে দিল্লী দখল পর্যন্ত বিদ্রোহীদের নেতৃবৃন্দ আপন ঘর সামলে নিয়ে চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হওয়ার প্রচুর সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা সব সুযোগ নষ্ট করলেন। জুন মাসে দেখা গেলো সেপাইদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরেছে এবং ব্যবসায়ী শ্রেণীর সৈন্যদের প্রতি বিদ্বেষের অন্ত নেই। শাহজাদাদের অত্যাচার থেকে প্রজাদের রক্ষা করার জন্য বৃথাই চেষ্টা করলেন সম্রাট।
ইংরেজ সেনাপতি জেনারেল আনসনের স্বাস্থ্য বিদ্রোহের প্রথম সূত্রপাতের সময় ভালো ছিলো না। অন্যান্য অক্ষম ইংরেজরা যেমন যায়, তেমনি তিনিও হিমালয়ে গিয়ে আরোগ্য লাভ করলেন। দাগসাই, কাসৌলি এবং সুবাতু ইত্যাদি গ্রীষ্মকালীন ঘাঁটিগুলোতে ব্রিটিশ সৈন্য মোতায়েন করা হলো। পাঞ্জাবের কমিশনার জন লরেন্স তখন রাওয়ালপিন্ডি থেকে মারী আসছিলেন। কিন্তু বৈদ্যুতিক তার সেপাইদের বিদ্রোহের খবর জানিয়ে দিলে, তিনি তাঁর কর্মসূচি বদল করলেন এবং তাড়াতাড়ি লাহোর এবং পেশোয়ারে সহকর্মীদের কাছে ফিরে গেলেন। আনসন দাগসাইয়ের ব্রিটিশ সৈন্যদের যাত্রা করতে নির্দেশ করলেন। দেরাদুন থেকে মীরাটে একটি গুর্খা রেজিমেন্ট তলব করা হলো। আমবালার সেপাইরা তখনও সম্পূর্ণ অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ১৬ তারিখে জেনারেল আনসন সেখানে গিয়ে পৌঁছালেন। এখনো সময় আছে, দিল্লী যদি রক্ষা করা যায়, তাহলে হয়তো সমগ্র ভারতবর্ষও রক্ষা করা যেতে পারে। লরেন্স তাড়াতাড়ি অগ্রসর হওয়ার জন্য আনসনকে চিঠির পর চিঠি লিখছেন। কিন্তু আনসনের নিজস্ব অসুবিধা আছে। তাঁকে যানবাহন পেতে হবে, প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র তাঁর হাতে থাকা চাই, তাঁবুর সরঞ্জামপত্রের ব্যবস্থা করতে হবে, তা নইলে সাত মাইল পরিধির একটি সুরক্ষিত নগরী কীভাবে তিনি আক্রমণ করবেন। তদুপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ অফিসারদের কাছে ট্রেনিংপ্রাপ্ত স্বদেশীয় সশস্ত্র সেপাইরা সে নগর রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। এক আঘাতে দিল্লীর দুর্গ প্রাচীর চূর্ণ করা যায় এমন আশা করা কিছুতেই উচিত হবে না। সবচেয়ে সাহসী সৈন্যরাও হাওয়াতে লাফ দিতে পারে না। অসাবধানে যদি কিছু করে বসে, তাহলে সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ত্যাগ করাই হবে সে অসাবধানতার মূল্য। সেজন্য আনসনকে ধীরে ধীরে যেতে হচ্ছিলো। সৈনিক হিসেবে তাঁর নিজের এবং সহকর্মীদের দায়িত্ব তিনি বোঝেন, সেজন্য একজন বেসামরিক কর্মচারির তাড়াহুড়ায় কান দিয়ে সমগ্র পরিকল্পনা বানচাল করতে তিনি রাজী ছিলেন না।
