মীরাটের মতো দিল্লীতে কোনো ইউরোপীয় সৈন্য ছিলো না। দিল্লীর কতেক সেপাই অফিসার কোর্ট মার্শালে সেপাইদের বিচার করেছিলেন। চর্বি মাখানো কার্তুজ হতভাগ্য সেপাই যাদেরকে তারা দণ্ডদান করেছিলো তাদের কাছে যেমন, তেমনি অফিসারদের কাছেও অনুরূপ ভয়ের কারণ ছিলো। আমরা সে দণ্ডিত জমাদারের কর্ম কিভাবে বিচার করবো? সত্যি কি সে রাজদ্রোহের অপরাধী ছিলো? তার প্রাণদণ্ডাজ্ঞা কি আইনসঙ্গত হয়েছে? ধর্মের কারণে শহীদ? নাকি ব্রিটিশ প্রতিহিংসার সময়ের শিকার? সে বিশেষ দলিলটি ইংরেজদের মে মাসের ১১ তারিখে প্রচার করা উচিত ছিলো। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ইংরেজরা করেনি। ঐ একই দিনে ৩৮নং রেজিমেন্ট ব্রহ্মদেশে যেতে অস্বীকার করলো। এ সকল ঘটনা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অনেক সময় দুর্ঘটনাই ইতিহাসের গতিধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে বর্তমানে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানেই রাজাপুর গ্রামে অবস্থিত ছিলো ক্যান্টনমেন্ট। অল্পক্ষণ পূর্বে ব্রিগেডিয়ার গ্রেভস বিপদের আঁচ করতে পেরেছেন। সেপাইরা মারমুখো হয়ে রয়েছে। কর্ণেল রিপ্লের নেতৃত্বে ৫৪নং দেশীয় বাহিনী কাশ্মিরী ফটকের দিকে যাত্রা করলো। তাদের অধিনায়ককে কেটে ফেলা হলো, অফিসারদের গুলী করে মারা হলো, কিন্তু তারা যুদ্ধ করতে স্বীকৃত হলো না। মেজর এ্যাবোট পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে পারলেন না। দ্বিপ্রহর পর্যন্ত শহরের প্রধান প্রতিরক্ষীরা বাধা দিয়ে আসছিলো। বিকেলবেলা ৩৮নং-এর সেপাইরা তাদের অফিসারদের গুলি করতে থাকে। মহিলাদের কোনো রকমে সঙ্গে নিয়ে অফিসারদের পলায়ন করতে হয়। এ সময়ে শহরে একজনও ইউরোপীয় কিংবা ভারতীয় খ্রীস্টান ছিলো না। দারিয়াগঞ্জ অঞ্চলে ভারতীয় এবং ইউরোপীয় খ্রীস্টানেরা থাকতো। সে এলাকা ছারখার করে দেয়া হলো, প্রত্যেক খ্রীস্টানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। ব্যাঙ্ক লুট করা হলো। ম্যানেজার এবং তার পরিবারকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। স্থানীয় সংবাদপত্র অফিস আক্রমণ করে একজন ছাড়া কম্পোজিটরদের মেরে ফেলা হলো। কিষেণগড়ের রাজার বাড়িতে দুদিন ধরে বহু নরনারী লুকিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। রাজা তাদের রক্ষা করার জন্য তার বড়ো ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি হয়তো দেরীতে পৌঁছেছিলেন, অথবা সময় মতো এসেও তাদেরকে নিবৃত্ত করতে পারেননি। আত্মগোপনকারীদের সকলকেই নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। পঞ্চাশজনকে বন্দী করে প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হলো, সেখানে তাদেরকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। অধিকাংশ আশ্রয়প্রার্থী ফ্যাগ স্টাপ টাওয়ারে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো, কিন্তু সেখানে নিরাপদ মনে না করায় তারা রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বিভিন্ন দিকে বেরিয়ে পড়লো। কেউ কেউ নিরাপদে মীরাটে এসে পৌঁছালো, কেউ কেউ আমবালা এবং কর্ণাটকের দিকে এগুতে লাগলো। তারা দিনের বেলায় রাস্তার পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতো এবং রাতের বেলায় পথ চলতো। ক্লান্ত পায়ে নানারকম ঘুরতি পথে বহু কষ্ট করে এগিয়ে যেতে লাগলো। গ্রামাঞ্চলের বহু কৃপালু মানুষ তাদেরকে দয়া করে খাদ্য এবং আশ্রয় দান করেছে।
পরবর্তীকালের গৌরবময় বীরত্বই তাদের এ বিপত্তি অতিক্রমণে সাহায্য করেছে। শহর খালি হয়ে গিয়েছিলো, ক্যান্টনমেন্ট পরিত্যাগ করতে হলো, কিন্তু অস্ত্রাগার এখনো পুরোপুরি তাদের দখল থেকে যায়নি। দুর্গরক্ষী ছিলেন নয়জন পরাক্রান্ত ইংরেজ। সকালবেলা স্যার থিওফিলাস মেটকাফ অস্ত্রাগারে এসে দু’টো কামান নিয়ে গোলার সাহায্যে সেতু উড়িয়ে দেবার জন্য এসেছিলেন। কামান স্থানান্তর করার জন্য গরুর গাড়ি পাওয়া গেলো না। ইতিমধ্যে বিদ্রোহীরা সেতু পার হয়ে এসেছে। লেফটেনান্ট উইলোবি অস্ত্রাগার রক্ষা করার জন্য তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করলেন এবং শেষ পর্যন্ত না পারলে অস্ত্রাগার উড়িয়ে দেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনি কোনো সাহায্যের প্রত্যাশা করতে পারছিলেন না এবং বাইরের উচ্ছখল জনতা বারে বারে ভীতিপ্রদ হয়ে উঠছে।
তাঁদের আত্মসমর্পণের দাবি জানানো হয় সম্রাটের নামে। অবশেষে জোর করে প্রাচীর অতিক্রম করার জন্য মই আনা হলো। শেষ পর্যন্ত পূর্বসংকেত অনুসারে গোলা নিক্ষেপ করা হলো। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ সেপাইরা সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয়ই রয়ে গেলো। মীরাট থেকে তাদের দমন করার জন্য কোনো সৈন্যসামন্ত এলো না। কোথায় কি ঘটলো, তা সেপাইদের জানা নেই। সম্রাটের কিন্তু দুর্দশার অন্ত নেই। আগে তাঁর জন্য সকল ব্যবস্থা করতে অন্যেরা। এখন তার ঘাড়ে সেপাইদের প্রতিপালন করবার দায়িত্ব এসে পড়েছে। তার বিশ্বস্ত বন্ধু হেকিম আহসান উল্লাহও ছিলেন, সম্রাটের মতো একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ। শাসনকার্যে অভিজ্ঞতা বলতে যা বোঝায় তার একটুকুও ছিলো না। তাছাড়া সেপাইদের ওপর তার আস্থা ছিলো না, সেপাইরাও তাকে বিশ্বাস করতো না। তার দৃঢ় বিশ্বাস শীগগির হোক অথবা দেরীতে হোক ইংরেজ ফিরে আসবেই আসবে। সুতরাং বিদ্রোহে নেতৃত্বদান করতে হলে যে অটুট মনোবলের প্রয়োজন তা তার ছিলো না। সম্রাট ১২ তারিখে সম্ভ্রান্ত মুসলমান রাজপুরুষদের দরবারে আহ্বান করলেন। নিমন্ত্রিতদের মধ্যে ঝিজ্জরের নওয়াবের পিতৃব্যও ছিলেন একজন। একটা শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করার জন্য সকলকে আহ্বান করা হয়েছে। নগরে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে, সেপাইদের রসদ এবং বাসস্থানের সংস্থান করতে হবে। নতুন সেপাইদের ভর্তি করতে হবে। রাজধানীর সর্বত্রই হট্টগোল আর বিশৃঙ্খলা। দুষ্কৃতিকারীরা খ্রীস্টান এবং ইউরোপীয়দের সন্ধান করবার অজুহাতে সম্পদশালী মানুষদের ভয়ানক দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। রাজকোষে টাকা নেই অথচ সেপাইদের ব্যয়ভার মেটাতে অর্থের প্রয়োজন। এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ের মোকাবেলা করার জন্য যে রকমের সাহসী এবং উদ্যমশীল পুরুষের প্রয়োজন ছিলো, দুর্ভাগ্যবশতঃ নব আহূত দরবারে সে রকম মানুষ একজনও ছিলো না। সম্রাটের ‘ আবেদনে যে কাপুরুষেরা কান দেননি, তাতে আশ্চর্য হওয়ার বেশি কিছুই নেই। একজন তো সরাসরি সম্রাটকে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানালেন। সে যাকগে, তারপরে একজন শাসনকর্তা নিয়োগ করা হলো। মীর্জা মোগলকে দেয়া হলো প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব এবং অন্যান্য সম্রাটপুত্রদের উচ্চ সামরিক পদসমূহে বসানো হলো। সম্রাটের মতো, সম্রাটপুত্ররাও উজ্জ্বলতার স্বাদ পাওয়া সেপাইদের মধ্যে নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার উপযুক্ত ছিলেন না। সম্রাট হাতীর পিঠে চড়ে নগর প্রদক্ষিণ করলেন, ব্যবসায়ী এবং অন্যান্যদের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে আবেদন জানালেন। কিন্তু এতো সহজে আতঙ্ক কাটলো না। প্রাসাদের বাগানে সেপাইরা ডেরা পেতেছে। তারা সকল উপায়ে নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি করে যাচ্ছে। এ সম্বন্ধে মুন্সী জীবনলাল লিখেছেন। প্রতিটি বাড়ি থেকে আবেদন, নালিশ অনিচ্ছুক সম্রাটের কানে আসতে লাগলো। নিহত ইউরোপীয়দের চাকর-বাকরেরা আবেদন করছে। আবেদন করছে দোকানদার-যাদের দোকান লুট হয়ে গিয়েছে। তৎক্ষণাৎ প্রতিকারের জন্য সকল সম্রাটের দিকে তাকাতে লাগলো। লুণ্ঠন এবং অত্যাচার বন্ধ করার জন্য সম্রাটের কাছে আবেদনের পর আবেদনপত্র আসতে থাকে। সম্রাট যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন কিন্তু একজন দুর্বল অশক্ত অশীতিপর বৃদ্ধের যথাসাধ্য চেষ্টার কীই-বা ফল ফলবে। তিনি সেপাইদের আবেদন করলেন, অনুরোধ করলেন, শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত করে দেবার নির্দেশ দিলেন। সম্রাট তো নির্দেশ দিলেন কিন্তু সে অনুসারে কাজ করা হলো না। দুর্বল মানুষের সম্রাট হওয়া সাজে না। শেষ মোগলদের কেউই বিপ্লবী সংগ্রামে নেতৃত্বদানের জন্য উপযুক্ত ছিলেন না।
