১৮৫৭ সালের ১১ই জুন সকালবেলা মীরাটের বিদ্রোহীরা নৌকা দিয়ে সেতু বানিয়ে যমুনা পার হয়ে দিল্লীতে এলো। গরমের দিনে সকালবেলা কলেজ বসেছে। গোটা দিনে কি ঘটবে না জেনে অধ্যাপক রামচন্দ্র সেখানে গেলেন। বিখ্যাত ভ্রমণকারী মুনশী মোনেলাল তাঁর এক ইংরেজ বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলেন। কলকাতা থেকে গতদিনের সংবাদপত্র এসে পৌঁছেছে। ঝিজ্জার নওয়াবের এজেন্ট কালীপ্রসাদ প্রতিদিনের মতো সকালবেলা অশ্বারোহণে বেড়াতে বেরিয়েছেন। তিনি আসন্ন বিপদের কোনো সূচনাই দেখতে পেলেন না। মুনশী জীবনলাল ক্যাপ্টেন ডগলাসের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং বাড়িতে ফিরে গিয়ে কোর্টে যাবার পাল্কী তৈরি করতে আদেশ দিলেন। থানার অফিসার ইনচার্জ মুইনুদ্দীন হাসান একটি ফৌজদারী মামলার ব্যাপারে কালেক্টরের কোর্টে এসে হাজির হয়েছেন। কমিশনার সাইমন ফ্রেসার এখনো ঘুমিয়ে আছেন। হঠাৎ খবর রটলো-মীরাটের অশ্বারোহীরা নগরীর ফটকের সামনে এসে হাজির হয়েছে। তারা উসুলী কালেক্টরকে হত্যা করেছে এবং তাঁর অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছে। কালেক্টর হাচিনসন তাড়াতাড়ি কমিশনারের বাঙলোতে পালিয়ে এলেন। শান্তভাবে শুরু হওয়া গ্রীষ্মের মনোরম সকাল পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লীর রাজপথে নৃশংস বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড চলতে লাগলো।
কমিশনারের মতো সম্রাট নিজেও আশ্চর্য হয়ে গেছেন। প্রাসাদের গবাক্ষর কাছে একটা আওয়াজ শুনে বুড়ো সম্রাট বুঝতে পারলেন যে বিদ্রোহীরা এসেছে। আগেকার দিনে, সাম্রাজ্য যখন প্রাণপূর্ণ ছিলো, সম্রাটেরা অলিন্দে দাঁড়িয়ে নীচের প্রজাদের দেখতেন। অবাধ্য জনতার সামনে এসে দাঁড়াবার মতো সাহসও বাহাদুর শাহের ছিলো না। তিনি ক্যাপ্টেন ডগলাসকে ডেকে পাঠালেন। ডগলাস তাদেরকে চলে যেতে বললেন, কারণ তাদের শোরগোল সম্রাটের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। তারপরে বিদ্রোহীরা কলকাতা ফটকের দিকে গেলো। কিন্তু আগে থাকতেই ফটক বন্ধ ছিলো। ইতিমধ্যে কমিশনার সাইমন ফ্রেসার এবং হাচিনসন অকুস্থলে এসে হাজির হলেন। তারা এসে ক্যাপ্টেন ডগলাসের সঙ্গে যোগ দিলেন। সবগুলো ফটক আগে থাকতে বন্ধ রাখা হলে নগরে প্রবেশ করা অসাধ্য না হলেও বেশ কষ্টসাধ্য হতো বিদ্রোহীদের পক্ষে। কিন্তু নগরের অভ্যন্তরে সেপাইদের সমমর্মীর অভাব ছিলো না। গুজব রটে গেলো যে সেপাইরা মীরাটের ইউরোপীয়দের হত্যা করে দিল্লীতে ধর্মের জন্য সগ্রাম করতে এসেছে। কৌতূহলী জনতার ভিড়ে রাজপথ মুখরিত হয়ে উঠলো। তারপরেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। তাদের অনেকেই ইংরেজদের জবরদখলকারী এবং বহিরাগত বলে ঘৃণা করতো। দিল্লীর নাগরিকদের ইংরেজদের বিতাড়িত করতে আবেদন জানিয়ে ইরানের শাহ মাত্র কিছুদিন আগে একটি ফরমান পাঠিয়েছেন। কে রাজঘাট ফটক খুলে দিয়েছিলো, জানা সম্ভবপর হয়নি। সেপাইরা পরে সেখানে গিয়ে হাজির হলো। তাদের মনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিলো না। লুট করার লোভ ছিলো প্রবল, তাও বলবার উপায় নেই। দুর্ধর্ষ অশ্বারোহীরা নগরে প্রবেশ করার পরে তাদের সঙ্গে স্থানীয় দুষ্কৃতিকারীরাও যোগ দিলো।
ডঃ চমনলাল নামে ডিসপেনসারীর সামনে দণ্ডায়মান একজন ভারতীয় খ্রীস্টান হলেন নগরীর প্রথম নিহত ব্যক্তি। তারপরে সেপাইরা দলে দলে প্রাসাদ অভিমুখে ধাওয়া করলো। প্রাসাদের প্রহরীরা কোনো বাধা দিলো না, আবার সেপাইদের সঙ্গে যোগও দিলো না। হাচিনসন, ফ্রেসার এবং ডগলাস প্রাসাদে ফিরে এলেন এবং সেখানেই নিহত হলেন। যাজক মিঃ জেনিংস, তাঁর পত্নী এবং কন্যাকেও বিদ্রোহীরা নিহত করলো। বিদ্রোহীরা বাদশাহকে আহ্বান করে নেতৃত্বদান করতে বললো। সম্রাট দারিদ্র্যের কথা বললেন, বুড়ো বয়সের কথা বলে নিরস্ত করতে চেষ্টা করলেন। সেপাইরা সে কথা শুনবে কেনো? তারা তাদের আসল প্রভুর সেবা করতে এসেছে, ধর্ম রক্ষা করতে এসেছে, বেতন এবং প্রমোশনের কথা উঠবে কেনো? কিন্তু তিনি বন্ধু এবং শুভানুধ্যায়ীদের অনুরোধে এখনো বিষয়টি চিন্তা করে দেখবেন। তাঁর বন্ধু এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক হেকিম আহসানউল্লার পরামর্শ অনুসারে আগ্রায় লেফটেন্যান্ট গভর্ণরের কাছে মীরাটের বিদ্রোহ এবং সেপাইদের দিল্লী আগমনের সংবাদ উটযোগে পাঠাবেন কিনা গভীরভাবে চিন্তা করছেন। তিনি দৃঢ়বিশ্বাস পোষণ করছিলেন মীরাট থেকে ইউরোপীয় সৈন্যরা সাহায্যের জন্য ছুটে আসবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেলো, কিন্তু কোনো দিক থেকে কোনো সাহায্য এলো না। অবস্থা প্রতি মুহূর্তে ভয়াবহ আকার ধারণ করছিলো। প্রথমতঃ সম্রাট ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন, কারণ সেপাইরা অশ্বারোহণে ভেতরে ঢুকে তাঁর প্রাসাদের সম্মান নষ্ট করেছে, যে প্রাসাদে ঢুকতে সকল সম্ভ্রান্ত বংশের লোক, এমন কি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর এজেন্টদের পর্যন্ত ঘোড়া থেকে অবতরণ করতে হয়। কিন্তু ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসের মুখে বুড়ো সম্রাট কাবু হয়ে পড়লেন। সূর্য ডোবার পরে তাঁকে স্বেচ্ছায় অনিবার্যকে মেনে নিতে হলো। এ বিয়োগান্তক নাটকে শাহজাদারা কোন্ ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, সে সম্বন্ধে আমরা জানতে পারিনি। স্বভাবতঃই তাঁরা আরো আন্তরিকভাবে সেপাইদের অভিনন্দন জানিয়ে থাকবেন। তাদের বংশের লুপ্তপ্রায় গৌরব পুনরুজ্জীবিত করার একটা সুযোগ পেয়ে সম্ভবতো তাঁরা আনন্দিত হয়ে উঠেছিলেন। তা না হলে তো তাদেরকে সম্রাটের প্রাসাদ ছেড়ে চলে যেতে হবে এবং চিরদিনের জন্য সম্রাট পদবী ত্যাগ করতে হবে। সহজেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান এবং আবুবকর অবস্থার সবচেয়ে বেশি সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন, ঘটনা পরম্পরা বিচার করলে আমরা তাই দেখতে পাই। মধ্যরাতে একুশটা তোপধ্বনি করে ঘোষণা করা হলো বাবুরের বংশধর আবার স্বহস্তে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
