সরকার এ বিপদের কথা বেশ ভালোভাবেই জানতেন। তাঁরা অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য রাজবংশের উচ্ছেদ সাধন করেছেন। আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারীদেরকে রাজ্যের বাইরে নির্বাসিত করেছেন। যে পেশবা বংশের উপর অর্পিত ছিলো সমগ্র মারাঠা জাতির আনুগত্য, তাঁকে উত্তর ভারতের একটি গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। টিপু সুলতানের উত্তরাধিকারীদের বেলুড় থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছে। রণজিৎ সিংয়ের ছেলেদের গ্রেটব্রিটেনে স্থানান্তরিত করেছে। কিন্তু নামমাত্র সম্রাট এখনো পূর্বপুরুষ শাজাহানের প্রাসাদে অবস্থান করছেন। এক সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী দিল্লীর সম্রাটের অপ্রতিহত ক্ষমতার থিয়োর প্রচার করে নিজের সুবিধা আদায় করেছিলেন। বাঙলা ও কর্ণাটকে তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে এবং মারাঠা ও শিখ শক্তি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেলে দিল্লীর সম্রাটের পদবী রাজনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেললো। পক্ষান্তরে, কিন্তু দিল্লীর সম্রাট প্রকৃত শাসক ও আসল সরকারের বিপদের জীবন্ত কারণ হিসেবে রয়ে গেলো। সুতরাং সম্রাটের পদবীর বিলুপ্তি এবং দিল্লীর সুসজ্জিত প্রাসাদ থেকে তাঁকে বের করে আনা কোম্পানীর সরকারের কাছে আশু প্রয়োজন হয়ে দেখা দিলো।
১৮৩৭ সালে বাহাদুর শাহ সম্রাট হলেন। তাঁর পিতার মতো তিনিও বাদশাহ এবং গাজী উপাধি ধারণ করলেন। রাজ্যহীন সম্রাটের এবং বিনাযুদ্ধে গাজীকে জনসাধারণ সহ্য করে নিয়েছিলো। এ রকম একটি সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা তার ছিলো না। স্বাভাবিক সময়ে অল্পস্বল্প আড়ম্বরের সাথে নিজের মুখোশটা রক্ষা করা ছাড়া তাঁর কাছে আর কিছু আশা করা যেতো না। যুদ্ধপ্রিয় পূর্বপুরুষদের অজেয় সাহস তার ছিলো না। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো কোনো পূর্বপুরুষের সাহিত্য রুচি লাভ করেছিলেন। অবসর সময়ে তিনি নিজেই কবিতা রচনা করেন। তিনি জন্মেছেন এবং বড়ো হয়েছেন প্রাসাদের শঠতা, ছলনা এবং ষড়যন্ত্রপূর্ণ পরিবেশে। যুগের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না, তাই দায়িত্বহীন অভিযানের দ্বারা তিনি চালিত হতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর মন্ত্রণাদাতা হাসান আসকারী তোষামুদে বাকসর্বস্ব মানুষ। প্রত্যেক মোঘল শাহজাদা পরিবারের সম্মান ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু বাহাদুর শাহের মনে ইংরেজ প্রভুদের সঙ্গে সামান্যতম বিবাদে লিপ্ত হওয়ার আকাভ ক্ষাও ছিলো না। তার পিতার মতো তিনিও কোম্পানীর কাছে পেনশন বৃদ্ধি করার জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু কোম্পানীর সরকার সম্রাট পদবী এবং রাজপ্রাসাদ ত্যাগ না করলে পেনশন বৃদ্ধি করতে রাজী ছিলো না। বর্তমানে তিনি অন্য বিষয়ের প্রতি সম্পূর্ণভাবে মনোযোগী হয়ে উঠেছেন। তিনি বেগম জিনাতমহলের গর্ভজাত শেষ বয়সের নাবালক সন্তান জওয়ান বখৃতকে সিংহাসনের নিরাপদ উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করতে চান। কিন্তু পদবী এবং নাবালক ছেলের মাঝামাঝি ছিলেন কয়েকজন শাহ্জাদা। কোম্পানীকে এজন্য চাপ প্রয়োগ করার সকল সুযোগের সদ্ব্যবহারই করেছেন সম্রাট। অন্যদিকে সরকার নামমাত্র সম্রাটকে প্রাসাদের বাইরে এনে, পদবী ছাড়তে প্রলুব্ধ করে নিকটবর্তী কুত্ব-এ পাঠিয়ে দিতে একটা সুযোগের অপেক্ষা করেছিলেন।
বাহাদুর শাহ তাঁর খান্দানের প্রতি অসম্মানজনক এ প্রস্তাবে রাজী হতে পারেননি। ব্রিটিশ সরকার সম্রাটের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর প্রহসন সহ্য করতে রাজী ছিলো না। কিন্তু তারা শক্তি প্রয়োগ করতেও আগ্রহী ছিলো না। বহুযুগ আগের মতো এখনও মোঘল দরবার লক্ষ লক্ষ মানুষের নিষ্ক্রিয় শ্রদ্ধা পেয়ে আসছে। তাতে কিন্তু ইংরেজদের কোনো ক্ষতি হয়নি। আনুগত্যের বাহ্যিক চিহ্নগুলো তারা একের পর এক দূর করতে লাগলো। লর্ড এলেনবোরো তার পক্ষ থেকে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কোনো নজর দিতে রেসিডেন্টকে বারণ করেছিলেন, যদিও সমপরিমাণ অর্থ অন্যভাবে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ তাঁর খান্দানের মর্যাদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। বাহাদুর শাহ এবং পরিবারের সকলে চরম অপমানবোধ করলেও প্রকাশ্যে তিনি কোনো নালিশ করলেন না। লর্ড ডালহৌসী সম্রাটের পদবী কেড়ে নেয়া এবং প্রাসাদ থেকে অন্য কোনো উপযুক্ত পরিবেশে স্থানান্তরের জন্য বিলাতের কর্তাদের ওপর চাপ দিতে থাকেন, তা করা সঙ্গত হবে কি না এ নিয়ে কোর্ট অব ডিরেকটরস, বোর্ড অব কন্ট্রোলের সঙ্গে একমত হতে পারছিলো না। গভর্ণর জেনারেল এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ক্ষমতা লাভ করার পরেও এ ব্যাপারে তাকে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হলো। অবশেষে বৃদ্ধ, অশক্ত সম্রাট বাহাদুর শাহের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করাই স্থির করলেন। ১৯৪৯ সালে আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারী মারা গেলো, দিল্লীর রেসিডেন্ট পরবর্তী উত্তরাধিকারী শাহজাদা ফকরুদ্দীনের সঙ্গে একটা বোঝা-পড়ায় এলেন। তাঁর পিতার অন্তর্ধানের পর তাকেই সম্রাটের বংশের প্রধান বলে স্বীকার করে নেয়া হবে। তার পদবী থাকবে শাহজাদা। কিন্তু তার বিনিময়ে প্রাসাদ, রাজধানী, দুর্গ সবকিছু ত্যাগ করতে হবে। এ ব্যবস্থা গোপন রইলো না। অধিকাংশ রাজপুত্র তাতে অস্বীকৃতি জানালেন। ১৮৫৬ সালে শাহজাদা ফখরুদ্দীনও মারা গেলেন। তাঁকে বিষপান করিয়ে হত্যা করানো হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়। এ সময়ে সম্রাটের ওপর বেগম জিনাত মহলের অপ্রতিহত প্রভাব ছিলো। জওয়ান বখতের ভাগ্যকে নিষ্কন্টক করার জন্য আবার চেষ্টা করা হলো, কিন্তু তাতে বিশেষ ফলোদয় হলো না। দিল্লী সাম্রাজ্যের অন্তিমক্ষণ ঘনিয়ে আসছিলো। বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পরে শাহজাহান এবং আলমগীরের অযোগ্য বংশধরেরা অস্বাভাবিক কিছু একটা না ঘটলে পূর্ব পুরুষের প্রাসাদ থেকে বিতাড়িত হবে এ সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ রইলো না।
