একজন দাসী একটি কাশ্মিরী মেয়ে অথবা তার মায়ের কাছে শুনেছে যে সেপাইরা একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র করেছে। সেপাইরা শুনলো, দু’হাজার বেড়ি নাকি তৈরি হয়ে গিয়েছে। তা সমস্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ভেঙ্গে দেবার জন্যই করা হয়েছে। নাগরিকেরা এসব কথায় কান দিলো না। প্রতিদিনের মতো দোকানগুলো ভোলা হলো, ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকমতো চলতে লাগলো এবং শহরে রাস্তা এবং গলিতে লোকজন চলাফেরা করেছিলো ঠিক আগের মতোই।
হঠাৎ বেলা পাঁচটার পরে ভেঙ্গে পড়লো ঝড়। একটি পাঁচক বালক সেপাই লাইনে দৌড়ে গিয়ে খবর জানালো যে গোলন্দাজ এবং রাইফেল বাহিনী রেজিমেন্টের অস্ত্রাগার দখল করার জন্যে ধাওয়া করছে। এ সংবাদ শুনে সেপাইরা হতচকিত হয়ে গেলো। কাপড়চোপড় না পরে নিরস্ত্র অবস্থায় কি করতে হবে স্থির করতে না পেরে আপন আপন লাইনের দিকে ছুটতে শুরু করলো। ৩নং অশ্বারোহী বাহিনীর লোকেরা পুরানো জেলখানায় দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে পুরোনো সাথীদের মুক্ত করে আনলো। ২০নং রেজিমেন্টে প্যারেড ময়দানে এসে সাবধানী ঘন্টা বাজিয়ে দিলো। ১১নং রেজিমেন্টও সমানভবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়েছে, তবে তারা অতোটা বিশৃখল নয়। দোকানদারেরা তাড়াতাড়ি তাদের দোকানের দরোজা জানালা বন্ধ করে ফেললো। বাজারের চোর-গুণ্ডারা একটা সুযোগ পেয়ে গেলো।
চার ঘণ্টা অতীত হবার পর পাশের গ্রামের দুর্ধর্ষ গুর্জরেরা গোলমালের খবর আঁচ করতে পেরে দলে দলে শহরে এসে পড়লো। সাহসী কর্ণেল মাইকেল স্মীথ প্রায়শঃ অনুপস্থিত থাকতেন। তার অধীনস্থদের হাতে দায়িত্ব অর্পন করে তিনি তাড়াতাড়ি কমিশনার, পরে ব্রিগেডিয়ার এবং তার পরে প্রধান কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করে গোলন্দাজ বাহিনীর পাহারায় ক্যান্টনমেন্ট রাত্রি যাপন করলেন। গোলন্দাজ বাহিনীতে সাহসী অফিসারের অভাব ছিলো না। মেজর টমর এ বাহিনী পরিচালনা করছিলেন। পরে তিনি দিল্লীর প্রাচীরের সামনে যথার্থ বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। তাছাড়া ছিলেন তরুণ গাফ, যিনি হডসনের অভিযানে অংশগ্রহণ করে ভিক্টোরিয়া ক্রস পেয়েছিলেন। আরো ছিলেন জন, যিনি দিল্লীতে একটি অগ্রবর্তী বাহিনীর পরিচালনায় ছিলেন। বিগ্রেডিয়ার আর্কডেল উইলসন দৃঢ় সিদ্ধান্তের মানুষ না হলেও দিল্লী দখলে তিনি সাফল্য অর্জন করেছিলেন।
প্রধান কম্যাণ্ডার জেনারেল হিওইট এ সময়ে যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেননি। সত্তর বছর বয়স্ক এ বৃদ্ধ নিজের বয়সের ভারেই কাবু হয়ে পড়েছিলেন। এ ছাড়া তাঁর নিজস্ব অসুবিধা ছিলো। তার অধীনস্থ সেপাইরা অনেকেই ঘোড়ার পিঠে চাপতে জানত না, যারা জানতো তাদের ঘোড়া ছিলো না। আক্রমণকারীরা অনেকে আগেই অস্ত্রশস্ত্র দখল করে ফেলেছে। কিন্তু কোথায় শত্রুর সন্ধান করতে হবে তাদের কেউ জানতো না। কারণ সেপাইদের কোনো পূর্বনিধারিত পরিকল্পনা ছিলো না। প্রত্যেক দল আপন অভিরুচি অনুসারেই ধাওয়া করলো। পরিস্থিতি এখনো আয়ত্বের বাইরে চলে যায়নি। অল্প চেষ্টা এবং উদ্যম ব্যয় করলে অবস্থাকে বশে আনা যায়। জেনারেল হিওইটকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কিন্থালে নাসিরী রেজিমেন্টের বিদ্রোহ করার সময়ে জেনারেল পেনী এবং তার সহ-অফিসারেরা এবং সে অশুভ রোববারে কলকাতার ইংরেজরাও সাহসের পরিচয় দিতে পারেননি।
পাঁচক বালকেরা চীঙ্কারে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু তার আরো একটি দিক আছে। তখন রাইফেল বাহিনী গীর্জার প্যারেডের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তাদের আচরণে প্রাথমিক গুজবের কিছুটা সত্যতা পরিলক্ষিত হয়। নরমপন্থীরা উকিলের পরামর্শ নিতে গিয়েছিলো যখন, তখন চরমপন্থীরা কারাগার ভেঙ্গে ফেলে সাথীদের সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে মুক্ত করার জন্য তোড়জোড় করেছিলো। এ সংশয় বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কারাগারের ফটক ভেঙ্গে ফেলতে লেগে গেলো। তার নিজেদের লোকদেরকে শুধু মুক্ত করতে চেয়েছিলো; নাকি সমস্ত কয়েদীদের মুক্তি দিতে ইচ্ছে করেছিলো তা জানা যায় না। কারাগারের ডিউটিরত প্রহরী তাদেরকে কোন বাধা দেয়নি। তারা কারাধ্যক্ষ এবং তার পরিবারের ওপর অত্যাচার করেনি। কিন্তু পরবর্তীকালে নারী-পুরুষ, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ সবকিছু যে তারা করেছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে প্রচুর। ভয়ের কারণে সেপাইরা উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলো, কিন্তু তাদের দিয়ে খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি সংসাধিত হয়নি। প্রকৃতপ্রস্তাবে, যারা ডিউটি করেছিলো, তারা ঘাঁটিতেই ছিলো। তৃতীয় অশ্বারোহী বাহিনীর একজন বাজারে এসে ম্যাক কার্টনি, ম্যাক অলরয় এবং ম্যাক কেওকে পালিয়ে যেতে অনুরোধ করলো। একজন ইউরোপীয় মেডিকল অফিসারকে একজন ১১নং রেজিমেন্টের হাবিলদার মেজর সতর্ক করে কর্ণেল ফিনিশের মৃত্যু এবং বিদ্রোহের খবর জানিয়েছিলো। একজন রাজভক্ত ননকমিশণ্ড অশ্বারোহী ঘোড়ায় চেপে কর্ণেল গাফের বাঙলোয় এসে ব্যক্তিগতভাবে পুরুষ এবং ভদ্রমহিলাদের বিদ্রোহের খবর জানিয়েছিলো। ভদ্রমহিলারা অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে সে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ দিনের ঘটনা লিখে রেখে গেছেন। কিন্তু তা সম্পূর্ণ নয়। পরদিন জেনারেল হিওইট যে সরকারি রিপোর্ট লিখেছেন, তাও সম্পূর্ণ নয়। একেকটা হিংস্র আক্রমণের পরে আরেকটা আক্রমণ এবং নৃশংসতা ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত হয়েছিলো কিনা তা আমরা জানতে পারি না। কোনো রেজিমেন্টকে সম্পূর্ণভাবে দোষযুক্ত বলা যায় না-আবার রেজিমেন্টের অনুগত সেপাইও ছিলো। ৩নং অশ্বারোহী বাহিনীর ভূমিকাই সবচেয়ে দুঃখজনক। এক’শ অশ্বারোহী বাহিনীর ভূমিকাই সবচেয়ে দুঃখজনক। এক’শ অশ্বারোহী সৈনিক স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলো। ১১নং রেজিমেন্টের ক্ষতি সবচেয়ে কম, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পরেই তারা শান্তভাবে প্রস্থান করেছে এবং তাদের মধ্যে থেকে একশো বিশজন পরে মীরাটে ফিরে এসেছিলো। এমনকি দুর্ধর্ষ ২০নং রেজিমেন্টেও কিছু অনুগত সেপাই ছিলো। যারা বেশিরভাগ সেপাইদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলো, তার অনুগত সেপাইদের মতামত গ্রাহ্য করেনি। একজন নকমিশণ্ড দেশীয় অফিসার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ব্রিটিশ মনিবদের পক্ষই সমর্থন করেছিলো। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের উর্ধ্বে রেজিমেন্টের প্রতি আনুগত্যকে স্থান দিয়েছিলো। সে এবং তার রেজিমেন্টের অন্য দু’জন সেপাই নিরাপদে লেফটেন্যান্ট গাফকে গোলন্দাজ বাহিনীতে পৌঁছে দিয়ে মৃত্যুকে পরোয়া না করে রেজিমেন্টে ফিরে এসেছিলো।
