এ খবর কর্ণেল জানতেন না। প্যারেড বন্ধ করার জন্য তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। কারণ তিনি শুনেছেন যে সেপাইরা বিদ্রোহ করতে যাচ্ছে। মীরাটে কোনো বিদ্রোহের সম্ভাবনা ছিলো না। কারণ অল্প যে ক’টি সামরিক ঘাঁটিতে সশস্ত্র ইউরোপীয়রা অধিক সংখ্যায় ছিলো, তার মধ্যে মীরাট অন্যতম। সুতরাং কর্ণেল মনে করলেন, ভীত হয়ে প্যারেড বন্ধ করলে কাপুরুষতার পরিচয় দেয়া হবে। আবার, তিনি প্রধান নির্দেশনা পরিষদকে একটি অ্যুত্থানের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে কোন পূর্বাভাষ দান করেননি। শুধুমাত্র নব্বইজন সেপাই প্যারেড করতে এলো সকালে। নতুন নির্দেশকে তারা কিভাবে বুঝেছে, কর্ণেল সে কথা বুঝিয়ে দিলেন। তাঁর ব্যাখ্যাতে কোন কাজ হলো না। একটি অনুসন্ধান কমিটি নিয়োগ করা হলো, তারা দেখতে পেলেন, অশ্বারোহীদের ভীতিই তাদের বিরূপ মনোভাবের কারণ। প্রধান সেনাপতি আদেশ দিলেন, স্বদেশীয়দের দ্বারা পরিচালিত কোর্ট মার্শালে অপরাধীদের বিচার করা হবে। অপরাধীদের মধ্যে অভিজাত যারা তাদেরকে দিয়ে বিচার করানো ছাড়া ব্রিটিশ আইনে আর কোন ভালো ব্যবস্থা ছিলো না। কিন্তু দেশীয়দের দৃষ্টিতে সেপাইদের দ্বারা পরিচালিত কোর্ট মার্শালের মধ্যে দুর্নীতির অন্ত ছিলো না। তারা ধরে নিলো যে স্বদেশীয় কোর্ট মার্শালের কর্মকর্তারা আপন আপন রেজিমেন্টের কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট করবে কিন্তু তারা এ সম্বন্ধে মন খুলে কিছু বললো না। জেনারেল হাফগাফ তখন মীরাটে ছিলেন, তিনি বলেছেন, “পরিদর্শনকারী অফিসার বলে একজন ইউরোপীয় অফিসার সাহায্য করার জন্য স্বদেশীয়দের দ্বারা পরিচালিত মার্শাল কোর্টে ছিলেন। তাঁর উপদেশ এবং আইন সম্পর্কে পরামর্শ সম্ভবত তাদের মতামতকে প্রভাবিত করেছিলো।” কয়েদীরা আত্মপক্ষ সমর্থন করলো না, সাক্ষীদের কোনো জেরা করা হলো না, যদিও একইভাবে উচ্চস্বরে মেলভিল ক্লার্কের কাছে তারা নির্জলা মিথ্যা কথা বললেন। কোর্টের সকলে একমত হতে পারেননি। বিচারকদের পনেরো জনের মধ্যে একজনকে সেপাইদের দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দান করার বিপক্ষে রায় দিতে দেখা যায়। অবশ্য রায়ে এ সুপারিশ করা হয়েছিলো যেহেতু সেপাইদের পূর্ববর্তী রেকর্ড ভালো এবং ভিত্তিহীন গুজব তাদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে, সে জন্য তাদের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। বিভাগীয় কম্যান্ডার জেনারেল হিওইট ছিলেন সাদাসিধা মানুষ, বয়সের কথা বিবেচনা করে ১১ জন ছাড়া অন্যান্যদের কারাবাসের মেয়াদ কমানোর কোনো কারণ তিনি খুঁজে পাননি।
হোমস্ বলেছেন, ৮ই মে তারিখের সকালবেলা মেঘাচ্ছন্ন এবং এলোমেলো প্রবল ঝড়ো হাওয়া আক্রান্ত অবস্থায় ব্রিগেডের সমস্ত মানুষ সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীদের দেখতে এলো। তাদের ইউনিফর্ম ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে, কামার এনে তাদের হাতে পায়ে লোহার বেড়ি পরানো হয়েছে। কামারেরা আস্তে আস্তে এক ঘন্টারও অধিককাল সময় বেড়ি পরাতে ব্যয় করলো এবং সেপাইরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাথীদের এ শোচনীয় দুর্দশা দেখলো। বিচারে তারা অপরাধী হতে পারে কিন্তু তারা এ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিকর কাজ অথবা ওজাতীয় কিছু করেনি। জেনারেল গাফ বলেন, “তাদের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক বিশিষ্ট লোক ছিলো।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের রেজিমেন্টের সৈন্যদের মধ্যে ব্রিটিশ অফিসারদের উপস্থিতিতেই বেশ শোরগোল উঠে। ব্রিটিশ অফিসাররা না থাকলে কি ঘটতে তা বলা যায় না। কিন্তু কোনো কিছুই ঘটলো না। শান্তভাবে প্যারেড শেষ হলো। কোনো কোনো সেপাইকে বিষণ্ণ দেখালেও কোনো রকমের বিক্ষোভ কিংবা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত কয়েদীরা যখন দেখলো তাদের সবকিছুই হারাতে হচ্ছে… তখন তারা একেবারে অধৈর্য হয়ে উঠলো। বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগলো।” জেনারেল গাফ বলেন, “এ বুড়ো সেপাইরা বহু সংগ্রামে ইংরেজ প্রভুদের জন্য বেপরোয়া সংগ্রাম করেছে, ইংরেজদের জন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছে, তাদের ভবিষ্যত করেছে উজ্জ্বল। তরুণেরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। সমস্ত জীবনে আমি এরকম মর্মান্তিক দৃশ্য কোনদিন দেখিনি। আমি হচ্ছি চার বছরের চাকুরীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক তরুণ সৈনিক। আমার মনে হয়, তাদের দুঃখে সমবেদনা জানাবার ক্ষমতা আমার নেই। এ সকল ঘটনা ঘটতে পারে, আমরা কিংবা তারা কেউ কখনো ধারণা করতে পারেনি।
গ্রীষ্মের সুদীর্ঘ দিনের অবসান হয়ে এলো। কোন বিশৃঙ্খলার চিহ্নমাত্রও নেই। সে রাতে নতুন করে কোনো অগ্নি সংযোগ করা হয়নি। সকালেও সেপাইরা শান্ত ছিলো। এর বিরুদ্ধে কোনো আপীল সম্ভবপর কিনা জানার জন্য কেউ কেউ আইনজীবীর কাছে ছোটাছুটি করলো। গাফের বাহিনীর একজন দেশীয় অফিসার তাঁকে সন্ধ্যাবেলা জানালো যে পরদিন সেপাইরা বিদ্রোহ করবে। কিন্তু কর্ণেল মাইকেল স্মীথ খবরটাকে অবজ্ঞা করে উড়িয়ে তো দিলেনই, তদুপরি অলস গুজবে কান দেয়ার জন্য তিরস্কার করলেন। একইভাবে ব্রিগেডিয়ার উইলসনও বিশ্বাস স্থাপন করলেন না। অন্যান্য দিনের মতো সেপাইরা বাজারে তাদের আড্ডার জায়গায় গিয়ে জমায়েত হলো। লোহার বেড়ি পরানো কয়েদীদেরকে সিভিল জেলে ঢুকানো হলো। কোথাও আসন্ন ঝড়ের কোনো রকম পূর্বাভাস নেই। কিন্তু গুজবের শেষ নেই।
