৩নং অশ্বারোহী দল পুরোনো কারাগার ভাঙতে যাওয়ার পরে ২০নং রেজিমেন্ট এবং ১১নং রেজিমেন্ট প্যারেড ময়দানে গিয়ে জমায়েত হলো। তাদের কম্যান্ডার কর্ণেল ফিনিস তাড়াতাড়ি ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চেষ্টা করলেন। প্রথম দিকে তিনি কিছু সাফল্যও লাভ করেছিলেন। এমনকি ২০নং রেজিমেন্টও তার নির্দেশ মানার কথা চিন্তা করেছিলো। এ সময়ে ৩নং অশ্বারোহী বাহিনীর একন অশ্বারোহী ঘোড়ায় চেপে এসে সংবাদ দিয়ে গেলো ইউরোপীয়রা আসছে। একজন তরুণ সেপাই গুলি করে কর্ণেল ফিনিসকে হত্যা করলো। কম্যান্ডারকে হত্যা করার পর ১১নং রেজিমেন্টের দোদুল্যমানতা ঘুচে গেলো ২০নং রেজিমেন্ট সত্যি সত্যি বিদ্রোহীরা আক্রমণ শুরু করে দিয়েছিলো। কিন্তু তারা ভয় করছিলো কর্ণেল ফিনিসের মৃত্যুর পর সেপাইদের সঙ্গে যোগ দেয়াটাই যুক্তিযুক্ত মনে করলো। ১১নং কিংবা ২০নং রেজিমেন্ট তাদের নিজেদের অফিসারদের কোনো ক্ষতি করেনি। কর্ণেল গাফ বলেন, আমাদের নিজেদের অধীনস্থ সেপাইরা একজন অফসারকেও হত্যা করেনি। ওয়াজির আলী খান নামে একজন ডেপুটি কালেক্টর বলেছেন যদিও রাতভর লুঠতরাজ চলছিলো, সেপাইরা কিন্তু একটা জিনিসও স্পর্শ করেনি। তারা শুধু বাঙলোতে আগুন লাগিয়েছিলো এবং ইউরোপীয়দের হত্যা করেছিলো-সদরে এবং শহরে এ খবরই প্রচারিত হয়েছিলো। এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়, সেপাইরা নিরস্ত্র মানুষের ওপর আক্রমণকারী লুঠেরাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেছে।
বস্তী অঞ্চল এবং ফটক মুক্ত কারাগার থেকে দুর্ধর্ষ অপরাধীরা বেরিয়ে এসেছিলো। শহরের পুলিশেরাও তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলো। ক্ষমতাসীন কোতোয়াল ধনা সিং ছিলো জাতে গুর্জর এবং গুর্জরেরা নিকটবর্তী বস্তী অঞ্চলের অধিবাসী ছিলো। সঙ্কটকালে ধনা সিংয়ের কোন কর্তৃত্ব ছিলো না, তাদের উপর। নিরীহ নাগরিকদের অর্থ তারা লুণ্ঠন করলো, নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করলো। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হলো। এবং কৈলাশ চন্দ্র ঘোষ নামে বাঙালির শুড়িখানা আক্রান্ত হলো। মিঃ ক্রেইগীর বাঙলোতে একা ছিলেন মিসেস চেম্বার্স। সামরিক ঘটিতে তিনি এসেছেন নতুন। তাঁর স্বামী ডিউটি করতে বাইরে গেছেন। তিনি ছিলেন পরিণত অন্তঃসত্ত্বা। অনুগত অশ্বারোহীরা মিঃ ক্রেইগীর বাঙলো পাহারা দিচ্ছিলো। মিসেস চেম্বার্স প্রতিবেশীর কথা ভুলে যাননি। তিনি চাকরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু দুষ্কৃতিকারীদের একজন চাকরকে জবাই করে ফেললো। সে ছিলো একজন সেপাই, পরে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। তারপর মিসেস চেম্বার্সকে হত্যা করা হলো। মিসেস চেম্বার্সের নৃশংস হত্যাই ইউরোপীয়দের প্রচণ্ড প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তুলেছিলো এবং তারা সর্বত্র সেপাইদেরকে এর জন্য দায়ী করছিলো।
বিদ্রোহের ফলে প্রহরীরা ঘাটি ছেড়ে দিয়েছিলো। লেফটেন্যান্ট গাফ ডিউটিতে যাওয়ার জন্য পোশাক পরছিলেন, দু’জন সামরিক যাজক গীর্জাতে গেছে। মিঃ ম্যাকেঞ্জী তাঁর বাঙলোতে নীরবে একটা বই পড়ছিলেন। মিসেস ম্যাকেঞ্জী এবং মিসেস ক্রেইগী সান্ধ্যভ্রমণে বের হচ্ছিলেন। এ সময়েই সেপাই লাইনে হল্লা শুরু হয়। তাড়াতাড়ি গাফ ঘোড়ায় চেপে সেপাই লাইনে না গিয়ে ২০নং রেজিমেন্টের পাশ দিয়ে প্যারেড ময়দানে এলেন। দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক লোমহর্ষক দৃশ্য আমার মনে গেঁথে গেলো-বলেছেন গাফ। কুটিরগুলোতে আগুন দাউ দাউ জ্বলছে। সশস্ত্র সেপাইরা পরস্পরকে ডাকাডাকি করে দানবীয় অট্টহাস্যে নর্তন-কুর্দন করছিলো। বন্য উন্মত্ত ক্ষিপ্ত কাঁপালিকের মতো অফিসারদের এবং সাধারণত: ইউরোপীয়দের রক্তের তৃষ্ণায় তারা পাগল হয়ে উঠেছে। তিনি কোনোরকমে তাঁর আপন অধীনস্থ সেপাইদের মধ্যে চলে এলেন। তাঁর জীবনের উপর কোনো হামলা করা হয়নি এবং তাঁর উপস্থিতির কোনো গুরুত্বই তারা দিলেন না। সবকিছু এলোমেলো বিশৃঙ্খল। আসবার পথে তিনি গ্রেটহেডদেরকে সাবধান করে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তখন তারা পালিয়ে গেছেন এবং তাঁদের বিশ্বস্ত চাকরটি তাঁকে পালাবার পথ প্রদর্শন করলো। ম্যাকেঞ্জীও নিজেকে অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত করে সাহসের সঙ্গে ঘোড়ায় চেপে সেপাই লাইনের দিকে ছুটলেন। তিনি পথে অগণিত অশ্বারোহী সেপাই দেখতে পেলেন এবং পরে ঘটনাক্রমে ক্যাপ্টেন ক্রেইগীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সেপাইরা তাকে কয়েকটি কোপ দিতে চেষ্টা করে অন্যদিকে ধাওয়া করলো। তারা বুঝতে পারলো তাদের স্থান হচ্ছে প্যারেড ময়দান। দু’জন ব্রিটিশ অফিসার প্যারেড ময়দানে গেলেন। রেজিমেন্টের প্রায় প্রতিটি অফিসারই প্যারেড ময়দানে এসেছিলেন, শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা করলেন। এমনকি ভয়ও দেখালেন। তাতে কোনোও ফলোদয় হলো না। সেপাইদের ধন্যবাদ তারা অফিসারদেরকে আক্রমণ করেনি এবং ফিরে যেতে বলেছে এবং বলেছে চীৎকার করে কোম্পানীর রাজত্বের শেষ হয়েছে। ক্রেইগী দেখলেন, কিছু সংখ্যক সেপাই বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিতে সংশয় এবং দ্বিধাবোধ করেছে। তিনি সাহস করে তাঁদের আপন ভাষায় তাঁদের নির্দেশ দিলেন। এতে কাজ হলো, চল্লিশজন সেপাই তার চারপাশে এসে জড়ো হলো। তাদের নিয়ে তিনি পুরোনো জেলখানার দিকে ছুটলেন। কিন্তু তারা অনেক দেরী করে ফেলেছেন। কয়েদীরা বেরিয়ে এসেছে এবং প্রহরীরাও বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। এ সময়ে সমস্ত ক্যান্টনমেন্টে আগুন লাগানো হয়ে গেছে। ক্রেইগী এবং ক্লেয়ার্ক অনুগত সেপাইদের নিয়ে প্যারেড ময়দানে এলেন। ক্ষুদ্র একটি দেহরক্ষী দল কর্তৃক পরিবেষ্টিত হয়ে তার বোন এবং ম্যাকেঞ্জীর স্ত্রীর খবর নেয়ার জন্য দ্রুতবেগে ছুটলেন। কোচম্যানের সাহস এবং উপস্থিত বুদ্ধিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারা বাঙলোয় এসে পৌঁছলেন। চারদিকে মৃত্যু এবং আগুনের তাণ্ডবলীলা চলেছে। তখন ম্যাকেঞ্জী তাঁর সেপাইদের কাছে সম্মান রক্ষার আবেদন করলেন। আমি অসমসাহসিক কাজ করার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছিলাম। আমি মহিলাদের ঘরের দরোজার কাছে নিয়ে এলাম। সঙ্গে সঙ্গে সেপাইরা অশ্ব থেকে অবতরণ করে মহিলাদের পায়ে হাত দিয়ে অশ্রুসিক্ত স্বরে প্রাণপণে তাঁদের রক্ষা করবেন বলে শপথ করলেন।
